অক্টোবর আল্লাহর পথে দ্বীনের মুজাহিদদের সর্বোচ্চ কোরবানির মাস -মু. আতাউর রহমান সরকার

২০০৬ সালের অক্টোবর মাস। একটা বড় দুর্যোগের আগে ঠিক যেমন আবহাওয়া থমথমে হয়ে ওঠে, সুনামি, জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্পের আগে যেমন সমুদ্র তার প্রস্তুতি নিতে থাকে ঠিক সে রকম দুর্যোগের ঘনঘটা ছিল রাজনীতির আকাশে। খুব বড় কোনো রাজনৈতিক সংঘাত ঘটতে যাচ্ছে এমনটাই বোঝা যাচ্ছিল। আমি তখন ছাত্র ইসলামী আন্দোলনের বি’বাড়িয়া জেলা সভাপতি। সে সময় রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘাত প্রথমে এই জেলায় শুরু হয়। এ সংঘাত মোকাবেলার জন্য কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। সম্মিলিতভাবে এই প্রস্তুতি নিতে আমরা জেলায় সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য গঠন করি। শান্তিপূর্ণভাবে সব করতে থানায় থানায় ছাত্রসমাবেশ করে আওয়ামী মিথ্যাচার, অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই।
২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় তৎকালীন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন এই ঘোষণা এলো। ২০০১-২০০৬ এই পাঁচটি বছর ধরে আওয়ামী লীগের প্রধান টার্গেট ছিল চারদলীয় জোট ভাঙা। বহু কৌশল, অর্থসম্পদ ব্যয় করে, দুর্বল জায়গায় আঘাত করেও এই জোট ভাঙা সম্ভব হয়নি। আর এই জোট পাঁচ বছর যেভাবে সরকার পরিচালনা করেছে তাতে আগামী পাঁচ বছরও যদি সরকার পরিবর্তন না হয় তাহলে আওয়ামী লীগ আর কখনও জনসাধারণের কাছে ঘেঁষতে পারবে না এবং স্বার্থসিদ্ধি ও ইসলামপন্থীদের ধ্বংস করার কাজ করতে পারবে না- এটা তাদের কাছে পরিষ্কার ছিল। আর তাই অরাজকতা সৃষ্টি করে, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, সন্ত্রাস ও মিথ্যাচারের মাধ্যমে তারা জোট সরকারের বিদায় সময়টাকে জটিল করার চেষ্টা করছিল। স্বাভাবিক ও নিয়মমাফিক পদ্ধতি নষ্ট করে অস্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করতে পরিবেশ সৃষ্টি করাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। ইস্যুবিহীন হরতাল, অবরোধ, ডেডলাইন, ট্রাম্পকার্ডের ঘোষণা, লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীতে আসার ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। সারাদেশে টান টান উত্তেজনা। বি’বাড়িয়ায়ও সে পরিবেশ বিরাজ করছিল। প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে ভাষণের পর পর সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের পক্ষ থেকে জেলা সদরে মিছিল করা হবে ঘোষণা দেয়া হয়। আমরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিই। মাথায় লাগানোর জন্য ৫০০ ফেস্টুনের অর্ডার দেই। তৎকালীন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি সৈয়দ গোলাম সারওয়ার ভাইয়ের বাসায় বসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনার সিদ্ধান্ত নিই। বক্তব্য শেষ হওয়ার সাথে সাথে বিএনপি এককভাবে প্রথমে জেলা সদরে মিছিল বের করলে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ কর্মীরা সে মিছিলে ব্যাপক বোমা নিক্ষেপ করে। আহত হয় শত শত বিএনপি কর্মী। রাজপথেই শাহাদাত বরণ করেন বি’বাড়িয়া জেলা বিএনপি যুগ্ম সম্পাদক জনপ্রিয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট শেখ হাবিবুল্লাহ। আমি যখন জেলা সেক্রেটারির বাসা থেকে মিছিলের জন্য বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখন এ খবর পাই। আওয়ামী তান্ডবে গোটা শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। গোটা শহর যেন ভূতুড়ে নগরী। অক্টোবরের প্রথম আঘাত আসে বি-বাড়িয়ায়। ২৭ অক্টোবর রাত থেকেই সারাদেশ থেকে খবর আসছিল ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ রাজনৈতিক সুনামির সৃষ্টি করবে। রাতটা কাটালাম অনেকটা পেরেশানিতে। সকালে খবর পেলাম গাজীপুরে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের এক কর্মীর শাহাদাতের। ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে কুরআন-হাদিস অধ্যয়ন করে জেলা অফিসে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসি। ঠিক করি আমাদের করণীয়। সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে সকালে দলবদ্ধভাবে যাই। বিকেলে রাতে আওয়ামী তান্ডবে শাহাদাতবরণকারী বিএনপি নেতার জানাজা ও পূর্বঘোষিত জনসভাকে কেন্দ্র করে গোটা শহরে চরম উত্তেজনা চলছিল। ২৭ অক্টোবর রাত থেকেই আমাদের জেলা সদরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল, তাই অন্য দিকে নজর দেয়ার সুযোগ ছিল না। জানাজা, সমাবেশ, মিছিলের মাধ্যমেই সময়টা চরম উত্তেজনায় কাটাচ্ছিলাম। ফাঁকে ফাঁকে ঢাকা থেকে খবর আসছিল আওয়ামী সুনামির। শত উত্তেজনার মাঝেও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে টিভি সেটে ঢাকার পল্টনের সংঘর্ষ দেখছিলাম। ফোনে খবর নিয়ে ও টিভিতে সেদিনকার ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের ওপর আওয়ামী সুনামির সে দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেলছিলাম। ২০০৮ সালের ২৮ অক্টোবরের সেদিনকার ন্যক্কারজনক ঘটনা জাতিকে যেমন লজ্জা দিয়েছে, তেমনি দেশের গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করেছে। আটাশে অক্টোবর ঢাকার বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতের সমাবেশে আওয়ামী লীগের হামলাটি ছিল একতরফা। মানুষ নামের কলঙ্ক একদল নরপিশাচ ও হায়েনার উন্মত্ততা ও জিঘাংসায় সেদিন প্রাণ দিয়েছিলেন সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথের অনেক যাত্রী। নিরস্ত্র জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের ওপর হামলে পড়া আওয়ামী কর্মীদের নির্যাতন ও উন্মত্ততার দৃশ্য সেদিন বিশ্বমানবতাকে কাঁদিয়েছিল। আওয়ামী লীগের সেদিনকার পৈশাচিক ঘটনার দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশ্য দিবালোকে সারাদেশে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারীদের তান্ডবে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ২৮ অক্টোবরের শাহাদাত আর অন্যান্য রাজনৈতিক হত্যার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য আছে। এটি সাধারণ হত্যা নয়। আল্লাহর পথে দ্বীনের মুজাহিদের সর্বোচ্চ কোরবানি। ১৯৬৩ সালে অক্টোবরে লাহোরে নিখিল পাকিস্তান জামায়াতের সম্মেলনে যখন সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করে তখন পাকিস্তান জামায়াতের আমীর সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী ভাষণ দিচ্ছিলেন। স্টেজ ও তাকে লক্ষ্য করে যখন সন্ত্রাসীরা গুলিবষর্ণ করেছিল তখন বারবার বলা হচ্ছিল মাওলানা বসে পড়ুন, বসে পড়ুন। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে শান্তকণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন, “আমি যদি বসে পড়ি তবে দাঁড়িয়ে থাকবে কে?” সেদিনকার মাওলানার সাহসী জবাব উপস্থিত সকলকে আন্দোলিত করেছিল। ২০০৬ সালের কলঙ্কিত ২৮ অক্টোবর জামায়াতের জনসভায় আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন তখন সন্ত্রাসীরা অনবরত গুলি ও বোমাবর্ষণ করছিল। উত্তেজনার মাঝেও তখন অত্যন্ত শান্তভাবে তিনি বক্তব্য রাখার সময় কর্মীদের ধৈর্য ধরার আহবান জানান। ঢাকার বুকে সেদিন প্রতিভাবান ৫ জনসহ সারা দেশে ২৯ জন আল্লাহর সৈনিক আওয়ামী হিংস্র রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন। সেদিনকার ঘটনা নিয়ে ৩০ অক্টোবর ২০০৬ জাতীয় একটি দৈনিকের শিরোনাম “এর জবাব দেবে কে? কী বীভৎস দৃশ্য!” কী নৃশংসতা, একটি মানুষকে রাস্তায় ফেলে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মেরে ফেললো আর কতগুলো মানুষ (?) লগি-বৈঠা হাতে যারা রাস্তায় পড়ে যাওয়া লোকটাকে পেটাচ্ছিল অনেকেই প্রশ্ন করেছেন ওরা আসলে মানুষ কি না। একজন মানুষকে এভাবে পিটিয়ে হত্যার দৃশ্য দেখে বিবেকবান মানুষ শিউরে উঠেছেন। সবার মনেই প্রশ্ন জেগেছে, কেন এই বর্বরতা, কেন এই পাশবিক আচরণ? কেন এই লাশ উপহার? কে বহন করবে এই লাশের বোঝা? পল্টনের নৃশংসতা আবালবৃদ্ধাবনিতা সবার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। ন্যূনতম মনুষ্যত্ববোধ যাদের আছে, তারা সবাই কেঁদেছে নব্য রক্ষীবাহিনীর এই বর্বরতা দেখে। শহীদ মুজাহিদের ছোট বোন মালিহার শুধু নয়, প্রত্যেকটি বিবেকবান ব্যক্তিরই জিজ্ঞাসা- আওয়ামী লীগের মানুষ মারার এ কোন রাজনীতি?
২৮ অক্টোবর বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে হত্যা, ইসলামী রাজনীতি বন্ধ, ইসলামী নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সূচনা করেছিল সেদিন আওয়ামী লীগ। তৎপরবর্তীতে ১/১১, ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত জোর করে ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের নানামুখী কার্যক্রম তার বাস্তব প্রমাণ। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে শীর্ষ ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হত্যার চেষ্টা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। ইতোমধ্যে শহীদ আ: কাদের মোল্লাকে কসাই কাদের সাজিয়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন আরেক জিন্দাদিল মুজাহিদ মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, মানসিক নির্যাতনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন দ্বীনের সাচ্চা মুজাহিদ অধ্যাপক এ কে এম নাজির আহমেদ, লাখো ভাইয়ের কারাবরণ, পঙ্গুত্ব বরণ, ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়নসহ শত জুলুমের মুখে ছাত্রশিবির কর্মীদের ত্যাগের যোজনা নতুন চেতনা সৃষ্টি করেছে তরুণদের মাঝে। আমাদেরকে মেরে চিরসত্য ইসলামকে বাংলাদেশ থেকে মুছে ফেলার মতো যতো পরিকল্পনাই করুক না কেন তাদের এই অবৈধ, অন্যায় প্রচেষ্টাকে আল্লাহ কখনো ফলপ্রসূ হতে দেবেন না বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জুলুমবাজ সরকার ইসলাম বিনাশ করতে নির্যাতনের মাত্রা যতই বাড়িয়ে দিয়েছে, রক্তের ¯্রােত যত বইয়ে দিয়েছে, যত মায়ের বুক খালি করেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমতের দুয়ার তত নিকটবর্তী হয়েছে। জেল, জুলুম, হত্যা, নির্যাতন বাংলার জমিনকে ইসলামী আন্দোলনের জন্য প্রতিনিয়ত উর্বর করে চলেছে। রাসূল (সা)-এর জিন্দেগিতে ঠিক একইভাবে কুফরি শক্তি নির্যাতনের সর্বোচ্চ মাত্রাকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই নির্যাতনের মাত্রা যত বেড়েছে আল্লাহর দ্বীনের বিজয় তত ঘনিয়ে এসেছে। আর আন্দোলনকে বিজয়ী করার উপযোগী নিখাদ ও নির্ভেজাল একদল সাচ্চাদিল মুমিন তৈরি হয়েছে। যারা শত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আল্লাহর দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের যে ময়দান শহীদ শিপন, মাসুম, মুজাহিদ, রফিক, জসিম, ফয়সালের মত নিষ্পাপ, নিষ্কলুষদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, যে ময়দান শহীদ আবদুল মালেক, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মত পূত-পবিত্র মানুষের রক্তের প্লাবনে রক্তাক্ত হয়েছে সে ময়দানে তাদের উত্তরসূরিদের হাত ধরেই কালেমার পতাকা উত্থিত হবে ইনশাআল্লাহ্।

SHARE

Leave a Reply