অক্সফোর্ড, বিশ্বভারতী বনাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় -দেলোয়ার হোসেন ফাহিম

ধর্ম বা ধর্মস্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার রীতি বহু দেশেই আছে। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় চার্চকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে আশ্রমের সম্পর্ক আছে। মজার বিষয় হচ্ছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত আমাদের ঢাবিতে আধুনিকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতার ধোয়া তুলে ইসলাম ঠেকানো কর্মসূচি চললেও প্রকৃত অক্সফোর্ড খ্রিস্টধর্মকে সযতেœ আগলে রেখেছে, যেমনটি কবি গুরুর বিশ্বভারতীতে আগলে রাখা হয়েছে হিন্দু দর্শনকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে লেখা রয়েছে উড়সরহঁং ওষষঁসরহধঃরড় গবধ (খধঃরহ) যার ইংরেজি “ঞযব খড়ৎফ রং সু খরমযঃ”. অক্সফোর্ডের কলেজ প্রার্থনায় লেখা আছে, ঙঁৎ যবষঢ় রং রহ ঃযব ঘধসব ড়ভ ঃযব খড়ৎফ. অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠার পরপরই এর অধীন ‘ক্রিস্ট চার্চ’ নামক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে পড়ে এ পর্যন্ত তেরো জন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন যা অক্সফোর্ডের যেকোনো শাখা থেকে বেশি। এই কলেজের প্রার্থনাসঙ্গীত হলো, ‘হে প্রভু আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি যাতে তুমি আমাদেরকে পবিত্র খাদ্যে, স্বর্গীয় রুটি এবং যিশুর বাণী দিয়ে পরিচালিত করো। যার ফলে যিশুর জন্য আমাদের প্রত্যেকের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আমাদের টিকে থাকা, সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং শক্তি সঞ্চার করা সবই যেন যিশুর রক্ত এবং মাংসের মাধ্যমেই হয়।”
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রনাট্যও একই ধরনের। তাদের নীতিবাক্যতেও স্রষ্টা আছেন। ক্যামব্রিজ থেকে ডিগ্রি নেয়ার সময় কলেজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ডান-হাত ধরে শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরের সামনে ধর্মীয় সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ধর্মীয় কায়দায় শপথ নিতে হয়। তা ছাড়া জেসাস কলেজ, এসটি ক্রস কলেজ, ট্রিনিটি (ত্রিত্ববাদ) কলেজ, ক্যাবল কলেজসহ অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজের অধীন অধিকাংশ কলেজেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর অনুষ্ঠানের আগে ও পরে, ডিনার পরিবেশনের আগে ও পরে যিশুকে নিয়ে প্রার্থনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয় যেমনটি হিন্দুদের স্নাতক বা মুসলিমদের আলেম, মুফতি অনুষ্ঠানে করা হয়। এখানে পড়ুয়াদের শেখানো হয় কিভাবে যিশুকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতে হয়। কিভাবে তিনি মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর চেহারাও এর ব্যতিক্রম নয়। কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে ২০ বিঘা জমি কিনে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের মন্দির হিসেবে। পরে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনে হিন্দুরা ছাড়া অন্য কেউ লেখাপড়া করতে পারতো না। পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন দেখা দিলে হায়দরাবাদের নিজাম এক লাখ টাকা সহায়তা দেন। এক লাখ তখন ছিল অনেক টাকা। এরপর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীতে কিছু মুসলমান ছাত্রের পড়ার ব্যবস্থা করেন। যে ক’জন মুসলিম ছাত্র বিশ্বভারতীতে পড়ার সুযোগ পান, তাদের মধ্যে একজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। বলা বাহুল্য, হায়দরাবাদের নিজাম যদি চাঁদা না দিতেন তবে বিশ্বভারতীতে মুসলমান ছাত্র পড়ার ব্যবস্থা আদৌ হতো বলে মনে হয় না।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সূতিকাগার অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রিস্টীয় রেওয়াজ অথবা অসাম্প্রদায়িকতার চাদরে আবৃত কবি গুরুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরেট হিন্দুয়ানি রীতি-নীতি চালু থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা পায় আর মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম থাকলে নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার জাত চলে যায়! মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধদের জন্যও এই ভার্সিটির দরজা উন্মুক্ত ছিল। তাইতো ঢাবিতে মুসলিম হলের পাশাপাশি জগন্নাথ হলও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯২১ সালে গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে হিন্দু, খ্রিস্টান আর মুসলমানের মিশেলও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (সলিমুল্লাহ হলে মুসলিম শব্দটি অবশ্য ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে) ফজলুল হক মুসলিম হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামের ‘রাব্বি জিদনি ইলমা’ মুসলমানিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে না পারলেও ঢাবির জগন্নাথ হল টিকে আছে স্বমহিমায়। আমরা বলছি না যে, জগন্নাথ শব্দটি বাদ দেয়া উচিত ছিল। আমরা শুধু এটুকুই বুঝাতে চাচ্ছি যে, যে অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে মুসলিম, ইসলাম শব্দকে ছাঁটাই করা হয়েছে, সেই একই সূত্রে হিন্দুদের ঈশ্বরসূচক জগন্নাথ ও পূজামন্ডিত শব্দ স্নাতক টিকে থাকে কিভাবে?
আর্য যুগে ছাত্ররা গুরুর আশ্রম থেকে লেখাপড়া করতো এবং শিক্ষা শেষ হলে গুরু শিষ্যটিকে ব্রহ্মাচর্য সমাপ্তিসূচক স্নান করিয়ে গলায় পৈতা পরিয়ে শিক্ষা সমাপনের স্বীকৃতি দিতেন। এটা এক ধরনের ধর্মীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। যেমন করে আমাদের মাদরাসা শিক্ষা সমাপনান্তে ছাত্রদের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষা শেষে স্নান এবং পৈতা পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল স্নাতক। সংস্কৃত পন্ডিত হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় স্নাতকের অর্থ করেছেন এভাবে : ব্রহ্মাচর্যের পরে গৃহাশ্রমগত ব্রাক্ষণ। এতদসত্ত্বেও আমাদের কিছু গোঁ-ধরা ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে ধর্ম তথা ইসলামকে বাদ দেয়ার বয়ান করেন। অথচ তাদের অর্জিত স্নাতক ডিগ্রিটা যে ধর্মীয় শিক্ষার নিদর্শন তা বেমালুম ভুলে যান। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্ম হটাও স্লোগান শিখানেওয়ালা আধুনিক ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে খ্রিস্টীয় দর্শন স্বমহিমায় টিকে আছেন তা এদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরও হুঁশ হয় না, কেননা উনারা জেনে বুঝেই ইসলামের বিরুদ্ধে লেগেছেন। তাই উনাদেরকে বুঝ দেয়ার সাধ্য কারও আছে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না।
“অধ্যাপক নুরুল হাসান ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি পন্ডিত হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। নিজেকে সাচ্চা ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করতেন। ধর্মকর্মে রুচির ভাটা থাকত সবসময়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দুবার ঢাকায় আসেন। সেই সময় নতুন সরকারের (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) উদ্যোগে মহাসমারোহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দুটো ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়ে যায়। কারণ হিসেবে বলা হতো-শব্দ দুটোর পরতে পরতে নাকি সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পাওয়া যায়, যা বিশ্বদরবারে নবগঠিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে বৈকি। নুরুল হাসানের মতো নিষ্ঠাবান কংগ্রেসম্যানও আওয়ামী লীগের এই ইসলামবিদ্বেষ দেখে হতবাক হয়ে যান। তিনি এ দেশের কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সাথে আলোচনার সময় বলেছিলেন, ‘তোমরা এসব কি করছ! এগুলো তো তোমাদের ঐতিহ্য। আমরা ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছি কিন্তু ঐতিহ্য ছুড়ে ফেলেনি। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। কিন্তু তাতে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো লাভ ক্ষতি হয়নি।”
যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কি করার আছেÑ ধর্মনিরপেক্ষতার এরকম নিত্য নতুন থেরাপির প্রয়োগ মুসলিমদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই দেখা যায়। অথচ ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণার প্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতার আগমন ঘটলেও কিছু কাল পরেই সেই বিতৃষ্ণার ঘোর কেটে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার চারণভূমি খ্যাত খোদ ইউরোপই আন্তরিকতার সাথে খ্রিস্টধর্মকে শিক্ষাব্যবস্থায় পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সত্যিকারার্থে খন্ডকালীন বিতৃষ্ণা ছাড়া ইউরোপের ইতিহাস খ্রিস্টধর্মকে বাদ দিয়ে লিখা লেখা সম্ভব নয়। কেননা রাষ্ট্র বা শাসন ব্যবস্থার সাথে ধর্ম কিংবা স্রষ্টার ধারণার সম্পর্ক আজ কালের নয় বরং একদম শুরুর দিক থেকেই। জাতিরাষ্ট্রের জন্মের বহু আগ থেকেই এ দুয়ের মাঝে অবিচ্ছেদ্য মৌলিক সম্পর্ক বিরাজ করে আসছিল। স্রষ্টার বিশেষ ধারণা কিংবা ধর্মের বিশেষ গঠনই তখনকার শাসন কিংবা রাষ্ট্রের বিশেষ ধরনকে ন্যায্যতা প্রদানের চূড়ান্ত হাতিয়ার ছিল। হতে পারে সেটা তাওহিদবাদী ধর্ম কিংবা বহুত্ববাদী প্যাগান কিংবা মিথিক ধারণার ওপর গড়ে ওঠা ধর্ম কিংবা স্রষ্টার ধারণা। আধুনিক সময়ের জাতীয়তাবাদী সেকুলার রাষ্ট্র ধারণার আগ পর্যন্ত যে কোন ধরনের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি সত্য সেটা সেক্যুলাররা স্বীকার করুক আর না করুক। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা তার পূর্বোক্ত যে দুটি সভ্যতার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী তা হলো গ্রিক এবং রোমান সভ্যতা। রোমান এবং গ্রিক সভ্যতায় স্রষ্টা কিংবা দেবতাদের নিয়ে মিথলজি (পৌরাণিক কাহিনীসমূহ) গড়ে ওঠে। তাদের কোন কোন দেবতা নির্মমতার প্রতীক, কেউ সাহসিকতার প্রতীক, কেউ আবার প্রেমের। এর সাথে কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যের প্রকৃতি এবং গড়ে ওঠা জীবনাচরণের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ সাম্রাজ্য টিকে থাকতে হলে তার ওপর মহত্ত্ব বা পবিত্রতা আরোপ করতে হয়। অন্যভাবে বলতে পারি এর জন্য দরকার পড়ে একটা মহান সত্তা বা অস্তিত্বের। স্রষ্টা কিংবা দেবতার সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এর চেয়ে ভালো কোন পবিত্র মেটাফিজিক্যাল (আধ্যাত্মিক) ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। সমগ্র ইউরোপে যখন রোমানদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো, রোমান শাসকরা নিজেদের সামরিক-রাজনৈতক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপশি ক্যাথলিজেমর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারেও অংশ নিয়েছিলেন। ফলে একটি সময় কার্যত ইউরোপে রোমান আধিপত্য আর ক্যাথলিজম একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই রোমান সাম্রাজ্যকে হোলি রোমান এম্পায়ার বলা হয়ে থাকে। আরও মজার বিষয় আঠারশো শতাব্দীতে যখন ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হয় ঠিক সেই সময়কালে অন্য দেশে গিয়েও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে দেখা গেছে ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপকে। তাই তো ভারতীয় উপমহাদেশের মতো উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলো যখন পশ্চিমের ছেলে ভুলানো গল্প শুনে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ইউরোপ তখন সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে খ্রিস্টধর্মকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে মিশনারি ধর্ম হিসেবে রফতানি করে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের ওপরও বেশ জোর দিয়েছিল। আর এই কারণেই ঘটতে পেরেছিল সিপাহি বিপ্লবের মতো মহা অভ্যুত্থান। ভারতের গোয়া উপকূলে ভাস্কোদাগামার সাথে যেসব পর্তুগিজ এসেছিল তাদের বংশধরেরাও খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন। ইউরোপীয় কোম্পানি তথা ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই বাংলায় খ্রিস্টধর্মের প্রসার বাড়তে শুরু করে। ১৫৯৯ সালে বান্ডেলে ওলান্দাজের নির্মিত চার্চ এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। ১৮০০ সালে কেরি কর্তৃক কলকাতার শ্রীরামপুরে খ্রিস্টান মিশন স্থাপন করার ফলে ইংরেজদের পক্ষে খ্রিস্টধর্ম অনুযায়ী জীবন যাপন সহজ হয়ে ওঠে। হিন্দু ধর্মের নানা অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিশনারিরা। নাটক মঞ্চায়ন (চবৎংবপঁঃবফ, ১৮৩১), পত্রিকায় (ঊহয়ঁবৎবৎ) লেখনী, বিভিন্ন সভা-সেমিনার (সোসাইটি ফর দ্য একুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ) এর মাধ্যমে মিশনারিরা তাদের ধর্ম প্রচার করতেন। এ বিষয়ে কবি ইকবাল বেশ ভালোই বলেছেন,
‘রাষ্ট্রশক্তি মুক্ত হল চার্চের হাত থেকে।
ইউরোপীয় রাজনীতি সেই দানব যার শিকল কেটেছে;
কিন্তু অন্যের সম্পত্তি যখন দানবের চোখে পড়ে,
চার্চের দূতেরা চলে যুদ্ধ বাহিনীর আগে আগে।’
এ অঞ্চলের সো-কল্ড বুদ্ধিজীবীদের ইসলামের পেছনে লেগে থাকার অভ্যাসটা আজ কালের নয়। ব্রিটিশ শাসনকালেও ওনারা ব্রিটিশদের খেয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দু’কলম লিখে ঘুমাতে যেতেন। তাইতো ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুর দিকে ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমালোচনা করলেও একটা সময় পরে হিন্দু ধর্মের প্রতি কোম্পানির ধর্মপ্রচারকদের সব ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যায়। থেকে যায় মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষসুলভ মনোভাব। তাই সিদ্ধান্ত হয় কূটকৌশলে মুসলিম জাতিকে হতদরিদ্র করে দেয়া হবে। ফলে লেখাপড়ার প্রভাব বা প্রকৃত আলো নিভে যাবে তাদের। মুসলিমদের নিকট তখন জীবননির্বাহ করাই দুরূহ হয়ে পড়বে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুসলিমসমাজের ওপর হানা হলো একটা বড় বজ্রাঘাত। ঘোষণা করা হলো অখণ্ড ভারতে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হবে। সেই সময় হিন্দু-মুসলিম সবাই ছিল ফার্সি ভাষায় শিক্ষিত। এটা ছিল একপ্রকার হঠকারী সিদ্ধান্ত। ইংরেজদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করাই ছিল এ সিদ্ধান্তের পেছনের গল্প। আর সেই পালে হিন্দুরা চড়েই ক্ষান্ত হয়নি, বাতাসও দিয়েছিল। ব্রিটিশদের অধিকাংশ অন্যায় আবদার যদি না তা হিন্দুদের বিরুদ্ধে যায়, হিন্দুরা তা সানন্দে মেনে নিতো। ইংরেজি শেখার বিষয়টিও হিন্দুরা আগে থেকেই জানত। কিন্তু মুসলিমদের নিকট তারা তা গোপন রেখেছিলেন কিংবা রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইংরেজ সাহেবগণ উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের তাদের বাংলো বা বাসায় ভৃত্যের কাজে নিয়োগ দিতেন। এই সুযোগে হিন্দু বাবুরাও ‘ইয়েস’, ‘নো’, ‘ভেরি গুড’ আয়ত্ত করে ফেলেন। অতঃপর শুরু হয় ইংরেজি বর্ণমালা শেখানোর মারাত্মক মহড়া। তখনো মুসলিমরা বুঝতে পারেনি, কেন তাদের প্রতিবেশী হিন্দুরা ইংরেজি বর্ণমালা আয়ত্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কলকাতায় তৈরি হয় হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ। ওগুলোতে হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি ইংরেজিসহ অন্যান্য দর্শনও পড়ানো হতো। ফলে কিছু কালের মধ্যেই এইসব কলেজ থেকে ইংরেজিতে দক্ষ হিন্দু বুদ্ধিজীবী, বিদ্যাজীবী, অফিসার, আমলা, বিচারপতি তৈরি হওয়া শুরু হলো। আর মুসলিমদের জন্য স্থাপিত আলিয়া মাদ্রাসায় শুধু উর্দু, আরবি, আর ফার্সিই শিখানো হতো। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা পিছিয়ে গেল কয়েক শ’ গুণ। অতঃপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বঙ্গভঙ্গ হয়েও হলো না। তার ক্ষতটা শুকানোর তাগিদে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতাদের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল। তাতেও আপত্তি বাধায় হিন্দুরা। ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ তার ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়াারি ড. রাশবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন? শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন।
যে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ আমলে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্য তৈরি হয়েছে, আজ তাদেরই জায়গা হচ্ছে না সেখানে। মুসলিম পরিচয় বলেই তারা আজ নিগৃহীত। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কপালে টিপ, মাথায় পৈতা পরে যাওয়ার কারণে ক্লাসে ছাত্র বা শিক্ষক কর্তৃক কোন হিন্দুকে অপমানিত হতে না হলেও ঢাবিতে মুখে সুন্নতি দাড়ি বা হিজাব পরা শিক্ষার্থীকে একধরনের মানসিক আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন না জানি তাকে হেনস্তা হতে হয়। কখন না জানি ফুল হাতা জামার হাতা কেটে রাখা হয়! এমনকি ইসলামী রীতির অনুসরণকারীদের পক্ষে ভার্সিটি হলে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। উপায়ান্তর না দেখে অনেকে নিজেকে ইসলামের অনুসারী বলে পরিচয় দিতেই ভয় পায়। এখানে নামাজ পড়তে হয় লুকিয়ে লুকিয়ে। কুরআন পড়তে হয় এনড্রয়েট সেটে। ব্রিটিশরা যেমন তৎকালীন সময়ে মুসলিমদের না জানিয়েই এ অঞ্চলে ইংরেজি চালু করে, ঠিক একইভাবে ঢাবিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চমাধ্যমিকে দু’শো নাম্বারের ইংরেজি না পড়ার অজুহাতে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মাদরাসা ছাত্রদেরকে। বলা হচ্ছে এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম। মানলাম। কিন্তু আমাকে তো সময় দিতে হবে। সঠিক সময়ে জানাতে হবে। ভারতে বন্দে মাতারম পাঠকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক করা হলেও আমাদের এখানে ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বললে ভাইভায় নাম্বার কম পেতে হয়।
এতো গেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামবিরোধিতার খবর। ইসলাম বাদে বাকি ধর্মসমূহ যেমন হিন্দু, খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমোট করার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের খুব একটা আপত্তি করতে দেখা যায় না। সে জন্যই ইসরাইলের মতো কট্টর ইহুদি রাষ্ট্র সারা বিশ্বে দাবড়িয়ে বেড়ালেও তা নিয়ে খুব একটা হইচই হতে দেখা যায় না। সেক্যুলার খ্যাত ভারতের সংবিধান, পার্লামেন্ট, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে সবখানেই হিন্দু ধর্মের সরব উপস্থিতি থাকলেও ধর্মনিরপেক্ষ মিডিয়া পাড়ায় তা নিয়ে মাতামাতি হয় না। আমেরিকা, রাশিয়ায়সহ অনেক দেশেই প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে খ্রিস্টধর্মের সংস্পর্শ আছে, সেটা কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে ইসলাম দমানোর সূত্রগুলো তাদের জন্য প্রযোজ্য হয় না। গরু আর গঙ্গার ইজ্জত ও পবিত্রতা রক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের চেষ্টা যখন তুঙ্গে, গঙ্গায় থুতু ফেলার জন্য জেল-জরিমানার বিধান যখন বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীতে এ দেশের রাস্তাঘাটে এখানে-সেখানে প্রস্রাব করা প্রতিরোধ করতে আরবি হরফে দেয়ালিকা লেখা হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত তামাশা। সংখ্যালঘু বলে ভারত-চীন ও মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠী যখন নিয়ত বৈষম্য, নির্যাতন ও আগ্রাসনের শিকার তখন সংখ্যাগুরু বলেই এই দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠী একই পরিস্থিতির বলি যেন! সংখ্যাগুরু মানুষ কেন এখানে মুসলমান এটিই যেন অপরাধ? বাস্তবতা এখন এমন যে চিন্তা ও গবেষণামূলক ইসলামী গ্রন্থ ঘরে রাখতেও মানুষ ভয় পায়, যদিও তা আইনত নিষিদ্ধ নয়। অথচ বেদ, গীতা বা বাইবেলে কোনো সমস্যা নেই বরং তাতে নিরাপত্তা বোধটাই আরো মজবুত হয়। এক সময়ের আফ্রিকার কালো মানুষগুলোর মতো আজ এ দেশে জুলুমের শিকার হওয়ার জন্য মুসলমান পরিচিতিটাই যেন যথেষ্ট। তাই কেন যে সংখ্যালঘু হলাম না আগামী প্রজন্মের জন্য এটিই হবে হয়তো আফসোসের কারণ! হ

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ম বা ধর্মস্থানকে কেন্দ্র করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার রীতি বহু দেশেই আছে। অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় চার্চকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে আশ্রমের সম্পর্ক আছে। মজার বিষয় হচ্ছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত আমাদের ঢাবিতে আধুনিকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতার ধোয়া তুলে ইসলাম ঠেকানো কর্মসূচি চললেও প্রকৃত অক্সফোর্ড খ্রিস্টধর্মকে সযতেœ আগলে রেখেছে, যেমনটি কবি গুরুর বিশ্বভারতীতে আগলে রাখা হয়েছে হিন্দু দর্শনকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোতে লেখা রয়েছে উড়সরহঁং ওষষঁসরহধঃরড় গবধ (খধঃরহ) যার ইংরেজি “ঞযব খড়ৎফ রং সু খরমযঃ”. অক্সফোর্ডের কলেজ প্রার্থনায় লেখা আছে, ঙঁৎ যবষঢ় রং রহ ঃযব ঘধসব ড়ভ ঃযব খড়ৎফ. অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠার পরপরই এর অধীন ‘ক্রিস্ট চার্চ’ নামক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে পড়ে এ পর্যন্ত তেরো জন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন যা অক্সফোর্ডের যেকোনো শাখা থেকে বেশি। এই কলেজের প্রার্থনাসঙ্গীত হলো, ‘হে প্রভু আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি যাতে তুমি আমাদেরকে পবিত্র খাদ্যে, স্বর্গীয় রুটি এবং যিশুর বাণী দিয়ে পরিচালিত করো। যার ফলে যিশুর জন্য আমাদের প্রত্যেকের মনে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আমাদের টিকে থাকা, সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং শক্তি সঞ্চার করা সবই যেন যিশুর রক্ত এবং মাংসের মাধ্যমেই হয়।”
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রনাট্যও একই ধরনের। তাদের নীতিবাক্যতেও স্রষ্টা আছেন। ক্যামব্রিজ থেকে ডিগ্রি নেয়ার সময় কলেজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ডান-হাত ধরে শিক্ষার্থীকে ভাইস চ্যান্সেলরের সামনে ধর্মীয় সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ধর্মীয় কায়দায় শপথ নিতে হয়। তা ছাড়া জেসাস কলেজ, এসটি ক্রস কলেজ, ট্রিনিটি (ত্রিত্ববাদ) কলেজ, ক্যাবল কলেজসহ অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজের অধীন অধিকাংশ কলেজেই স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর অনুষ্ঠানের আগে ও পরে, ডিনার পরিবেশনের আগে ও পরে যিশুকে নিয়ে প্রার্থনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয় যেমনটি হিন্দুদের স্নাতক বা মুসলিমদের আলেম, মুফতি অনুষ্ঠানে করা হয়। এখানে পড়ুয়াদের শেখানো হয় কিভাবে যিশুকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতে হয়। কিভাবে তিনি মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ ক্রুশবিদ্ধ হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীর চেহারাও এর ব্যতিক্রম নয়। কবির পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে ২০ বিঘা জমি কিনে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের মন্দির হিসেবে। পরে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনে হিন্দুরা ছাড়া অন্য কেউ লেখাপড়া করতে পারতো না। পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন দেখা দিলে হায়দরাবাদের নিজাম এক লাখ টাকা সহায়তা দেন। এক লাখ তখন ছিল অনেক টাকা। এরপর রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীতে কিছু মুসলমান ছাত্রের পড়ার ব্যবস্থা করেন। যে ক’জন মুসলিম ছাত্র বিশ্বভারতীতে পড়ার সুযোগ পান, তাদের মধ্যে একজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। বলা বাহুল্য, হায়দরাবাদের নিজাম যদি চাঁদা না দিতেন তবে বিশ্বভারতীতে মুসলমান ছাত্র পড়ার ব্যবস্থা আদৌ হতো বলে মনে হয় না।
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সূতিকাগার অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে খ্রিস্টীয় রেওয়াজ অথবা অসাম্প্রদায়িকতার চাদরে আবৃত কবি গুরুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরেট হিন্দুয়ানি রীতি-নীতি চালু থাকলে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা পায় আর মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম থাকলে নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার জাত চলে যায়! মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও হিন্দু, খ্রিস্টান কিংবা বৌদ্ধদের জন্যও এই ভার্সিটির দরজা উন্মুক্ত ছিল। তাইতো ঢাবিতে মুসলিম হলের পাশাপাশি জগন্নাথ হলও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯২১ সালে গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিতে হিন্দু, খ্রিস্টান আর মুসলমানের মিশেলও ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (সলিমুল্লাহ হলে মুসলিম শব্দটি অবশ্য ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে) ফজলুল হক মুসলিম হল, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রামের ‘রাব্বি জিদনি ইলমা’ মুসলমানিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে না পারলেও ঢাবির জগন্নাথ হল টিকে আছে স্বমহিমায়। আমরা বলছি না যে, জগন্নাথ শব্দটি বাদ দেয়া উচিত ছিল। আমরা শুধু এটুকুই বুঝাতে চাচ্ছি যে, যে অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে মুসলিম, ইসলাম শব্দকে ছাঁটাই করা হয়েছে, সেই একই সূত্রে হিন্দুদের ঈশ্বরসূচক জগন্নাথ ও পূজামন্ডিত শব্দ স্নাতক টিকে থাকে কিভাবে?
আর্য যুগে ছাত্ররা গুরুর আশ্রম থেকে লেখাপড়া করতো এবং শিক্ষা শেষ হলে গুরু শিষ্যটিকে ব্রহ্মাচর্য সমাপ্তিসূচক স্নান করিয়ে গলায় পৈতা পরিয়ে শিক্ষা সমাপনের স্বীকৃতি দিতেন। এটা এক ধরনের ধর্মীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠান। যেমন করে আমাদের মাদরাসা শিক্ষা সমাপনান্তে ছাত্রদের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দেয়া হয়। শিক্ষা শেষে স্নান এবং পৈতা পর্বটি অনুষ্ঠিত হয় বলে এর নামকরণ করা হয়েছিল স্নাতক। সংস্কৃত পন্ডিত হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় স্নাতকের অর্থ করেছেন এভাবে : ব্রহ্মাচর্যের পরে গৃহাশ্রমগত ব্রাক্ষণ। এতদসত্ত্বেও আমাদের কিছু গোঁ-ধরা ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গন থেকে ধর্ম তথা ইসলামকে বাদ দেয়ার বয়ান করেন। অথচ তাদের অর্জিত স্নাতক ডিগ্রিটা যে ধর্মীয় শিক্ষার নিদর্শন তা বেমালুম ভুলে যান। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্ম হটাও স্লোগান শিখানেওয়ালা আধুনিক ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে খ্রিস্টীয় দর্শন স্বমহিমায় টিকে আছেন তা এদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার পরও হুঁশ হয় না, কেননা উনারা জেনে বুঝেই ইসলামের বিরুদ্ধে লেগেছেন। তাই উনাদেরকে বুঝ দেয়ার সাধ্য কারও আছে বলে মনে হয় না। এ প্রসঙ্গে একটা মজার ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না।
“অধ্যাপক নুরুল হাসান ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি পন্ডিত হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। নিজেকে সাচ্চা ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করতেন। ধর্মকর্মে রুচির ভাটা থাকত সবসময়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি দুবার ঢাকায় আসেন। সেই সময় নতুন সরকারের (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) উদ্যোগে মহাসমারোহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের নাম থেকে ইসলাম ও মুসলিম শব্দ দুটো ছাঁটাইয়ের হিড়িক পড়ে যায়। কারণ হিসেবে বলা হতো-শব্দ দুটোর পরতে পরতে নাকি সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ পাওয়া যায়, যা বিশ্বদরবারে নবগঠিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করবে বৈকি। নুরুল হাসানের মতো নিষ্ঠাবান কংগ্রেসম্যানও আওয়ামী লীগের এই ইসলামবিদ্বেষ দেখে হতবাক হয়ে যান। তিনি এ দেশের কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সাথে আলোচনার সময় বলেছিলেন, ‘তোমরা এসব কি করছ! এগুলো তো তোমাদের ঐতিহ্য। আমরা ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছি কিন্তু ঐতিহ্য ছুড়ে ফেলেনি। আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় পাশাপাশি অবস্থান করছে। কিন্তু তাতে ধর্মনিরপেক্ষতার কোনো লাভ ক্ষতি হয়নি।”
যার ধর্ম তার কাছে, রাষ্ট্রের কি করার আছেÑ ধর্মনিরপেক্ষতার এরকম নিত্য নতুন থেরাপির প্রয়োগ মুসলিমদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই দেখা যায়। অথচ ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় খ্রিস্টধর্মের প্রতি বিতৃষ্ণার প্রেক্ষিতে ধর্মনিরপেক্ষতার আগমন ঘটলেও কিছু কাল পরেই সেই বিতৃষ্ণার ঘোর কেটে যায়। ধর্মনিরপেক্ষতার চারণভূমি খ্যাত খোদ ইউরোপই আন্তরিকতার সাথে খ্রিস্টধর্মকে শিক্ষাব্যবস্থায় পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সত্যিকারার্থে খন্ডকালীন বিতৃষ্ণা ছাড়া ইউরোপের ইতিহাস খ্রিস্টধর্মকে বাদ দিয়ে লিখা লেখা সম্ভব নয়। কেননা রাষ্ট্র বা শাসন ব্যবস্থার সাথে ধর্ম কিংবা স্রষ্টার ধারণার সম্পর্ক আজ কালের নয় বরং একদম শুরুর দিক থেকেই। জাতিরাষ্ট্রের জন্মের বহু আগ থেকেই এ দুয়ের মাঝে অবিচ্ছেদ্য মৌলিক সম্পর্ক বিরাজ করে আসছিল। স্রষ্টার বিশেষ ধারণা কিংবা ধর্মের বিশেষ গঠনই তখনকার শাসন কিংবা রাষ্ট্রের বিশেষ ধরনকে ন্যায্যতা প্রদানের চূড়ান্ত হাতিয়ার ছিল। হতে পারে সেটা তাওহিদবাদী ধর্ম কিংবা বহুত্ববাদী প্যাগান কিংবা মিথিক ধারণার ওপর গড়ে ওঠা ধর্ম কিংবা স্রষ্টার ধারণা। আধুনিক সময়ের জাতীয়তাবাদী সেকুলার রাষ্ট্র ধারণার আগ পর্যন্ত যে কোন ধরনের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি সত্য সেটা সেক্যুলাররা স্বীকার করুক আর না করুক। আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রব্যবস্থা তার পূর্বোক্ত যে দুটি সভ্যতার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী তা হলো গ্রিক এবং রোমান সভ্যতা। রোমান এবং গ্রিক সভ্যতায় স্রষ্টা কিংবা দেবতাদের নিয়ে মিথলজি (পৌরাণিক কাহিনীসমূহ) গড়ে ওঠে। তাদের কোন কোন দেবতা নির্মমতার প্রতীক, কেউ সাহসিকতার প্রতীক, কেউ আবার প্রেমের। এর সাথে কিন্তু তাদের সাম্রাজ্যের প্রকৃতি এবং গড়ে ওঠা জীবনাচরণের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ সাম্রাজ্য টিকে থাকতে হলে তার ওপর মহত্ত্ব বা পবিত্রতা আরোপ করতে হয়। অন্যভাবে বলতে পারি এর জন্য দরকার পড়ে একটা মহান সত্তা বা অস্তিত্বের। স্রষ্টা কিংবা দেবতার সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এর চেয়ে ভালো কোন পবিত্র মেটাফিজিক্যাল (আধ্যাত্মিক) ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব নয়। সমগ্র ইউরোপে যখন রোমানদের নিয়ন্ত্রণ ছিলো, রোমান শাসকরা নিজেদের সামরিক-রাজনৈতক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপশি ক্যাথলিজেমর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচারেও অংশ নিয়েছিলেন। ফলে একটি সময় কার্যত ইউরোপে রোমান আধিপত্য আর ক্যাথলিজম একাকার হয়ে গিয়েছিল। এই কারণেই রোমান সাম্রাজ্যকে হোলি রোমান এম্পায়ার বলা হয়ে থাকে। আরও মজার বিষয় আঠারশো শতাব্দীতে যখন ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচিত হয় ঠিক সেই সময়কালে অন্য দেশে গিয়েও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে দেখা গেছে ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপকে। তাই তো ভারতীয় উপমহাদেশের মতো উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলো যখন পশ্চিমের ছেলে ভুলানো গল্প শুনে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ইউরোপ তখন সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে খ্রিস্টধর্মকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে মিশনারি ধর্ম হিসেবে রফতানি করে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের ওপরও বেশ জোর দিয়েছিল। আর এই কারণেই ঘটতে পেরেছিল সিপাহি বিপ্লবের মতো মহা অভ্যুত্থান। ভারতের গোয়া উপকূলে ভাস্কোদাগামার সাথে যেসব পর্তুগিজ এসেছিল তাদের বংশধরেরাও খ্রিস্টধর্ম প্রচার করেন। ইউরোপীয় কোম্পানি তথা ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই বাংলায় খ্রিস্টধর্মের প্রসার বাড়তে শুরু করে। ১৫৯৯ সালে বান্ডেলে ওলান্দাজের নির্মিত চার্চ এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। ১৮০০ সালে কেরি কর্তৃক কলকাতার শ্রীরামপুরে খ্রিস্টান মিশন স্থাপন করার ফলে ইংরেজদের পক্ষে খ্রিস্টধর্ম অনুযায়ী জীবন যাপন সহজ হয়ে ওঠে। হিন্দু ধর্মের নানা অসঙ্গতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিশনারিরা। নাটক মঞ্চায়ন (চবৎংবপঁঃবফ, ১৮৩১), পত্রিকায় (ঊহয়ঁবৎবৎ) লেখনী, বিভিন্ন সভা-সেমিনার (সোসাইটি ফর দ্য একুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ) এর মাধ্যমে মিশনারিরা তাদের ধর্ম প্রচার করতেন। এ বিষয়ে কবি ইকবাল বেশ ভালোই বলেছেন,
‘রাষ্ট্রশক্তি মুক্ত হল চার্চের হাত থেকে।
ইউরোপীয় রাজনীতি সেই দানব যার শিকল কেটেছে;
কিন্তু অন্যের সম্পত্তি যখন দানবের চোখে পড়ে,
চার্চের দূতেরা চলে যুদ্ধ বাহিনীর আগে আগে।’
এ অঞ্চলের সো-কল্ড বুদ্ধিজীবীদের ইসলামের পেছনে লেগে থাকার অভ্যাসটা আজ কালের নয়। ব্রিটিশ শাসনকালেও ওনারা ব্রিটিশদের খেয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে দু’কলম লিখে ঘুমাতে যেতেন। তাইতো ঔপনিবেশিক শাসনের শুরুর দিকে ব্রিটিশরা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমালোচনা করলেও একটা সময় পরে হিন্দু ধর্মের প্রতি কোম্পানির ধর্মপ্রচারকদের সব ক্ষোভ প্রশমিত হয়ে যায়। থেকে যায় মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষসুলভ মনোভাব। তাই সিদ্ধান্ত হয় কূটকৌশলে মুসলিম জাতিকে হতদরিদ্র করে দেয়া হবে। ফলে লেখাপড়ার প্রভাব বা প্রকৃত আলো নিভে যাবে তাদের। মুসলিমদের নিকট তখন জীবননির্বাহ করাই দুরূহ হয়ে পড়বে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মুসলিমসমাজের ওপর হানা হলো একটা বড় বজ্রাঘাত। ঘোষণা করা হলো অখণ্ড ভারতে ফার্সির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হবে। সেই সময় হিন্দু-মুসলিম সবাই ছিল ফার্সি ভাষায় শিক্ষিত। এটা ছিল একপ্রকার হঠকারী সিদ্ধান্ত। ইংরেজদের শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করাই ছিল এ সিদ্ধান্তের পেছনের গল্প। আর সেই পালে হিন্দুরা চড়েই ক্ষান্ত হয়নি, বাতাসও দিয়েছিল। ব্রিটিশদের অধিকাংশ অন্যায় আবদার যদি না তা হিন্দুদের বিরুদ্ধে যায়, হিন্দুরা তা সানন্দে মেনে নিতো। ইংরেজি শেখার বিষয়টিও হিন্দুরা আগে থেকেই জানত। কিন্তু মুসলিমদের নিকট তারা তা গোপন রেখেছিলেন কিংবা রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। ইংরেজ সাহেবগণ উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের তাদের বাংলো বা বাসায় ভৃত্যের কাজে নিয়োগ দিতেন। এই সুযোগে হিন্দু বাবুরাও ‘ইয়েস’, ‘নো’, ‘ভেরি গুড’ আয়ত্ত করে ফেলেন। অতঃপর শুরু হয় ইংরেজি বর্ণমালা শেখানোর মারাত্মক মহড়া। তখনো মুসলিমরা বুঝতে পারেনি, কেন তাদের প্রতিবেশী হিন্দুরা ইংরেজি বর্ণমালা আয়ত্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কলকাতায় তৈরি হয় হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ। ওগুলোতে হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি ইংরেজিসহ অন্যান্য দর্শনও পড়ানো হতো। ফলে কিছু কালের মধ্যেই এইসব কলেজ থেকে ইংরেজিতে দক্ষ হিন্দু বুদ্ধিজীবী, বিদ্যাজীবী, অফিসার, আমলা, বিচারপতি তৈরি হওয়া শুরু হলো। আর মুসলিমদের জন্য স্থাপিত আলিয়া মাদ্রাসায় শুধু উর্দু, আরবি, আর ফার্সিই শিখানো হতো। ফলশ্রুতিতে মুসলিমরা পিছিয়ে গেল কয়েক শ’ গুণ। অতঃপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বঙ্গভঙ্গ হয়েও হলো না। তার ক্ষতটা শুকানোর তাগিদে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতাদের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেল। তাতেও আপত্তি বাধায় হিন্দুরা। ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ তার ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়াারি ড. রাশবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন? শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন।
যে প্রতিষ্ঠানটি ব্রিটিশ আমলে পিছিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্য তৈরি হয়েছে, আজ তাদেরই জায়গা হচ্ছে না সেখানে। মুসলিম পরিচয় বলেই তারা আজ নিগৃহীত। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কপালে টিপ, মাথায় পৈতা পরে যাওয়ার কারণে ক্লাসে ছাত্র বা শিক্ষক কর্তৃক কোন হিন্দুকে অপমানিত হতে না হলেও ঢাবিতে মুখে সুন্নতি দাড়ি বা হিজাব পরা শিক্ষার্থীকে একধরনের মানসিক আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন না জানি তাকে হেনস্তা হতে হয়। কখন না জানি ফুল হাতা জামার হাতা কেটে রাখা হয়! এমনকি ইসলামী রীতির অনুসরণকারীদের পক্ষে ভার্সিটি হলে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। উপায়ান্তর না দেখে অনেকে নিজেকে ইসলামের অনুসারী বলে পরিচয় দিতেই ভয় পায়। এখানে নামাজ পড়তে হয় লুকিয়ে লুকিয়ে। কুরআন পড়তে হয় এনড্রয়েট সেটে। ব্রিটিশরা যেমন তৎকালীন সময়ে মুসলিমদের না জানিয়েই এ অঞ্চলে ইংরেজি চালু করে, ঠিক একইভাবে ঢাবিসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই উচ্চমাধ্যমিকে দু’শো নাম্বারের ইংরেজি না পড়ার অজুহাতে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে মাদরাসা ছাত্রদেরকে। বলা হচ্ছে এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম। মানলাম। কিন্তু আমাকে তো সময় দিতে হবে। সঠিক সময়ে জানাতে হবে। ভারতে বন্দে মাতারম পাঠকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক করা হলেও আমাদের এখানে ইনশাআল্লাহ, মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বললে ভাইভায় নাম্বার কম পেতে হয়।
এতো গেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইসলামবিরোধিতার খবর। ইসলাম বাদে বাকি ধর্মসমূহ যেমন হিন্দু, খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রমোট করার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের খুব একটা আপত্তি করতে দেখা যায় না। সে জন্যই ইসরাইলের মতো কট্টর ইহুদি রাষ্ট্র সারা বিশ্বে দাবড়িয়ে বেড়ালেও তা নিয়ে খুব একটা হইচই হতে দেখা যায় না। সেক্যুলার খ্যাত ভারতের সংবিধান, পার্লামেন্ট, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে সবখানেই হিন্দু ধর্মের সরব উপস্থিতি থাকলেও ধর্মনিরপেক্ষ মিডিয়া পাড়ায় তা নিয়ে মাতামাতি হয় না। আমেরিকা, রাশিয়ায়সহ অনেক দেশেই প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে খ্রিস্টধর্মের সংস্পর্শ আছে, সেটা কেউ স্বীকার করুক বা নাই করুক। অথচ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে ইসলাম দমানোর সূত্রগুলো তাদের জন্য প্রযোজ্য হয় না। গরু আর গঙ্গার ইজ্জত ও পবিত্রতা রক্ষায় ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের চেষ্টা যখন তুঙ্গে, গঙ্গায় থুতু ফেলার জন্য জেল-জরিমানার বিধান যখন বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীতে এ দেশের রাস্তাঘাটে এখানে-সেখানে প্রস্রাব করা প্রতিরোধ করতে আরবি হরফে দেয়ালিকা লেখা হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত তামাশা। সংখ্যালঘু বলে ভারত-চীন ও মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠী যখন নিয়ত বৈষম্য, নির্যাতন ও আগ্রাসনের শিকার তখন সংখ্যাগুরু বলেই এই দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠী একই পরিস্থিতির বলি যেন! সংখ্যাগুরু মানুষ কেন এখানে মুসলমান এটিই যেন অপরাধ? বাস্তবতা এখন এমন যে চিন্তা ও গবেষণামূলক ইসলামী গ্রন্থ ঘরে রাখতেও মানুষ ভয় পায়, যদিও তা আইনত নিষিদ্ধ নয়। অথচ বেদ, গীতা বা বাইবেলে কোনো সমস্যা নেই বরং তাতে নিরাপত্তা বোধটাই আরো মজবুত হয়। এক সময়ের আফ্রিকার কালো মানুষগুলোর মতো আজ এ দেশে জুলুমের শিকার হওয়ার জন্য মুসলমান পরিচিতিটাই যেন যথেষ্ট। তাই কেন যে সংখ্যালঘু হলাম না আগামী প্রজন্মের জন্য এটিই হবে হয়তো আফসোসের কারণ! হ

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply