অজ্ঞতা, অলসতা ও ষড়যন্ত্রের গভীর ফাঁদে বিশ্বমুসলিম -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

তৃতীয় বিশ্বের ছোট্ট দেশ এবং বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মতো সেই প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে খ্রিস্টান মিশনারিরা। মানুষের অভাব, অনটন ও সুখ-সুবিধার চাহিদা পূরণ করে তারা বিপুল সংখ্যক পাহাড়ি দরিদ্র মানুষকে এরই মধ্যে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করেছে। এমনকি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ব্যাপকভাবে কাজ করছে খ্রিস্টান মিশনারি দল। অশিক্ষিত ও অভাবী রোহিঙ্গা মুসলমানদের নানাভাবে সহযোগিতা করে এবং আরো বহুবিধ সুবিধা প্রদানের আশ্বাস দিয়ে এই উদ্বাস্তু মানুষগুলোকে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে।
অপরদিকে, পৃথিবীর নানা প্রান্তে মুসলিম দেশগুলোতে হয় গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রাখা হয়েছে, অথবা সন্ত্রাস দমনের নামে হত্যাযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। আর এমনই এক সঙ্কটময় মুহূর্তে মুসলমানরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদে লিপ্ত, যেটাকে অনেকেই মজা করে বলেন হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি। এক সময়ের সবচেয়ে সাহসী, পরিশ্রমী, মানবিক গুণসম্পন্ন ও সবার চেয়ে জ্ঞানী সেই মুসলিমদেরই একটি বড় অংশ আজ সবচেয়ে বেশি অলস, বিস্মৃতিপরায়ণ এবং এক চরম অজ্ঞ জাতিতে পরিণত হয়েছেন। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত চক্রান্ত সম্পর্কেও তারা সচেতন নন।

বাংলাদেশের প্রয়াত রাজনীতিবিদ, সিনিয়র সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা ড. ফেরদেীস আহমদ কোরেশী সেই ২০১৩ সালের এপ্রিলে “পার্বত্য চট্টগ্রাম, খ্রিস্টান মিশনারি ও বৌদ্ধধর্মের ভবিষ্যৎ”- এই শিরোনামে দুই পর্বের দীর্ঘ কলাম লিখেছিলেন যা পার্বত্য নিউজ নামে একটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি তৎকালীন আইনমন্ত্রীর বরাত দিয়ে লিখেছিলেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান মিশনারিরা ইতোমধ্যে ১৫ হাজার পাহাড়িকে খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলেছে এবং সেখানে ১৪৯টি এনজিও কাজ করছে।
কোরেশী আরো লিখেছেন: “আমাদের স্বাধীনতার সময় এই সমগ্র পার্বত্য এলাকায় ১৫ হাজার দূরে থাক, এক ডজন খ্রিস্টান ছিল কিনা সন্দেহ। বিষয়টা নিছক ধর্মপ্রচার হলে কিছু বলার ছিল না। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের ধর্মকথা শুনিয়ে যদি কিছু মানুষ মহামতি যিশুর শিক্ষায় দীক্ষিত হন, তাতে মানবজাতির অকল্যাণ হওয়ার কোনো কারণ দেখি না। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যাটা অন্যত্র। প্রথমত, খ্রিস্টীয়করণের এ প্রক্রিয়াটা নিছক ধর্মপ্রচার নয়। এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ‘রাজনৈতিক’ এজেন্ডা’।”
খ্রিস্টান মিশনারিরা বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতেও ব্যাপক কাজ করছে। মানুষের অভাব-অনটন ও অসহায়ত্বকে সম্বল করে তারা বেশ কিছু রোহিঙ্গাকে এরই মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করেছে। “সাহায্যের আড়ালে খ্রিস্টান বানানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের”- এই শিরোনামে দৈনিক নয়া দিগন্তে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়: “রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছে খ্রিস্টান মিশনারি গ্রুপগুলো। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত রোহিঙ্গাদের সাহায্যের নামে সহজেই চলছে মিশনারি গ্রুপগুলোর ধর্মান্তরিত করার কাজ।”

প্রতিবেদনে বলা হয় যে, কখনো গোপনে আবার কখনো প্রকাশ্যে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার কাজটি করছে কয়েকটি এনজিও। প্রাথমিক হিসেবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে প্রলুব্ধ করে খ্রিস্টান বানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের খ্রিস্টান বানানোর কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ঈসায়ী চার্চ বাংলাদেশ’ (আইসিবি) নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের প্রায় ১৫ জন নেতা উখিয়া ও টেকনাফে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। নগদ টাকা দেয়া ছাড়াও ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের।
নয়া দিগন্তের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরো বলা হয়- কক্সবাজার শহরের কয়েকটি অভিজাত হোটেলে তারা অবস্থান করে মুসলমানদের খ্রিস্টান বানানোর কাজ করে যাচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন তথ্য। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করে খ্রিস্টান বানানোর বিবরণ।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো- আমরা সবাই জানি ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্ট মিয়ানমারের আরাকানে (বর্তমান রাখাইন) দেশটির বর্বর সেনাবাহিনী ও কতিপয় চরমপন্থী বৌদ্ধদের চালানো হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়ে মাত্র কিছু দিনের ব্যবধানে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। আর এর ফলে সব মিলিয়ে কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প- যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ উদ্বাস্তু শিবির বলেও পরিচিত- সেখানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখেরও বেশি। নয়া দিগন্তে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০১৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি। অর্থাৎ- আরাকানে গণহত্যা পরবর্তী বাংলাদেশে শরণার্থীদের ঢল নামার মাত্র ৫ মাসের ব্যবধানে দুই হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। তাদের কাজ সমানগতিতে চলছে। সুতরাং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর বিগত চার বছরে বেশ কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে যে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয়েছে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। আরো লক্ষ করার বিষয় হলো- রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হওয়ার সাথে সাথেই খ্রিস্টান মিশনারিগুলো তাদের কাজ শুরু করে দেয়। সামান্য সময়ও তারা বিলম্ব করেনি। এতেই বোঝা যায় নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের প্রতি তাদের একাগ্রতা ও অধ্যবসায়।
এই নিবন্ধে আমি খ্রিস্টান মিশনারিদের গুণগান করতে আসিনি। আমি আসলে তাদের তৎপরতা তুলে ধরার মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করছি, মুসলমানরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও নিজ ধর্ম সুরক্ষায় যেখানে সিরিয়াস হতে পারেনি, সেখানে অন্যরা কতটা তৎপর। এমনকি এত কিছু যে হচ্ছে সেই ব্যাপারেও আজ কয়জন মুসলিম সচেতন রয়েছেন- তা নিয়েও আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

শিক্ষার নামে সা¤্রাজ্যবাদ

এবার একটু বহিঃবিশ্বের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চাই। এরই মধ্যে হয়তো অনেকেই জেনে গেছেন যে শিক্ষা সেবার নামে বা শিক্ষা সেবার ছদ্মাবরণে কিভাবে বিশ্বব্যাপী সা¤্রাজ্যবাদের বিস্তারে খ্রিস্ট ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কানাডায় ভারতীয় আদলের আবাসিক স্কুল পদ্ধতিতে সা¤্রাজ্যবাদকে যেভাবে প্রসারিত করা হয়েছে তার কিছুটা নমুনা সম্প্রতি দেখেছেন বিশ্ববাসী। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, কানাডার কয়েকটি আবাসিক স্কুলের গণ্ডির ভেতর গণকবরে এক হাজারেরও বেশি শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। কানাডার মতো একটি দেশে এমন ঘটনা উদঘাটিত হবে এটা অনেকেরই হয়তোবা কল্পনায়ও ছিল না।
এই ঘটনা আসলে পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীদের হাতে আদিবাসী মানুষ বা ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা যে সীমাহীন জুলুমের শিকার হতো তার এক জলজ্যান্ত অধ্যায়। খ্রিস্টবাদ ও তাদের মিশন প্রকারান্তরে তাদের বস্তুবাদী কায়েমি স্বার্থের ক্রীড়নক হিসেবেই যে কাজ করে এবং পশ্চিমা জগতের বাইরে তাদের আদর্শ প্রচারের জন্য যে অপতৎপরতা চালায় তারও প্রমাণ মেলে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে।
খ্রিস্টান মিশনারি শিক্ষা এবং পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক একদিকে যেমন খুবই শক্ত, তেমনি এর ইতিহাসও অনেক পুরনো। এটা ষষ্ঠদশ শতকের মাঝামাঝি সময়, ক্যাথলিক গির্জাসমূহ যখন সংস্কারবিরোধী যুগ অতিক্রম করছিল, তখনই ধর্মের অগ্রগতি ও সুরক্ষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তারা উপলব্ধি করেছিল।
প্রায় একই সময়ে ক্যাথোলিক চার্চের অনুপ্রেরণায় পুনর্গঠিত বিদেশী মিশনগুলো ফ্রান্স, স্পেন এবং পর্তুগালের মতো দেশের সা¤্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সক্ষার সাথে তাল মিলিয়ে চলছিল। বিশেষত ফ্রান্সিসকান এবং জেসুইত মিশনগুলো বিশাল এলাকাজুড়ে তাদের কার্যকলাপ চালাতো। সেই নিকট প্রাচ্যের অটোমান সা¤্রাজ্য থেকে শুরু করে আমেরিকা ও দূরপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তারা সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির সরাসরি অর্থনৈতিক ও কূটনীতিক সহায়তা নিয়ে তাদের মিশন চালাতো।

ভূ-আঞ্চলিক পরিবেশ পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে তারা তাদের কর্ম-পরিকল্পনা ঠিক করে সেই মোতাবেক কাজ করতো। তাদের লক্ষ্য শুধু অখ্রিস্টানই ছিলো না, তারা প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মাঝেও কাজ করত। যাদের মধ্যে গ্রিক অর্থোডক্স, আসিরিয়ান, আর্মেনিয়ান, মেলিকিটস ও নেস্তোরিয়ান গোষ্ঠীর খ্রিস্টানরা পর্যন্ত ছিল। এক্ষেত্রে ক্যাথোলিক শিক্ষাকে এমনভাবে পরিবেশন করা হতো যার মাধ্যমে পশ্চিমা আদলের খ্রিস্টবাদকে খুবই কার্যকর ও গ্রহণীয় করে জনে জনে পৌঁছে দেয়া হতো।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- ষষ্ঠদশ ও সপ্তদশ শতকে যখন নিকট প্রাচ্যে ফরাসি প্রভাব বাড়ছিলো তখন জুলিয়েত মিশনারিরা ইস্তাম্বুল, আলেপ্পো, বৈরুতসহ পৃথিবীর বহু স্থানে তাদের স্কুলগুলোতে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করছিল। তারা একই সাথে ক্যাথোলিকবাদকেও প্রোমোট করছিল।
এর ফলশ্রুতিতে, ক্যাথলিক মিশনগুলো যারা ফরাসি সা¤্রাজ্যবাদের দালালের ভূমিকায় ছিল তারা স্থানীয় খ্রিস্টান ও অখ্রিস্টানদের সম্পর্ককে চরম খারাপের দিকে নিয়ে যায়। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা মতভেদ ও বিভেদ সৃষ্টি করে। একইভাবে, ক্যাথোলিক ফ্রানসিসকান মিশনগুলো সপ্তদশ শতক থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে আমেরিকানদের মধ্যে স্পেনীয় সা¤্রাজ্যবাদের বিস্তারে লিপ্ত হয়। কিভাবে স্পেন সা¤্রাজ্যের প্রতি অনুগত খ্রিস্টান নাগরিক হওয়া যায় সেই গুণ অর্জন ও শিক্ষা দানের নামে তারা তাদের তৎপরতা চালাতেন। অষ্টাদশ শতকের শেষ এবং ঊনবিংশ শতকের শুরুর দিকে যে আধুনিক প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি আন্দোলন ব্রিটেন ও আমেরিকায় দানা বাঁধে, সেখানেও মানুষকে খ্রিস্টবাদ গ্রহণে একই ক্যাথলিক পদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়।

বর্তমানের এই চরম সা¤্রাজ্যবাদের যুগেও প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনগুলো সব জায়গায় তাদের স্কুলগুলোর মাধ্যমে কর্মতৎপর রয়েছে। নিকট প্রাচ্যে তাদের এমন বহু বিদেশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গ্রিসের থেসালোনিকিতে আনাতোলিয়ান কলেজ এবং ইস্তাম্বুলে রবার্ট কলেজের নাম বলা যায়। একই তৎপরতা নিয়ে মিশরের কায়রো এবং লেবাননের বৈরুতে আমেরিকান ইউনিভার্সিটিগুলো ১৯ শতকে তাদের যাত্রা শুরু করে।
সরাসরি প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদের প্রচারণা না চালিয়ে মিশনারি স্কুলগুলো খুব কায়দা করে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে নৈতিকতার নামে বস্তুবাদী প্রাধান্য উসকে দেয়। আর এভাবেই তারা বিশ্বব্যাপী অ্যাংলো-স্যাক্সোন সা¤্রাজ্যবাদের একনিষ্ঠ এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
সাবেক সাংবাদিক ও বর্তমানে তুরস্কভিত্তিক শিক্ষাবিদ জেরেমি সল্ট মিশনারিগুলোর তৎপরতা খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তারা কিভাবে তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে- সেটা সেই অটোমান সাম্রাজ্যেই হোক বা ভারত, চীন কিংবা সুদূর প্যাসিফিক দ্বীপেই হোক না কেন- তা সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। মিশনারিগুলো শুধুমাত্র খ্রিস্ট ধর্মগ্রন্থ গসপেলের সত্যতা নিরূপণই নয়, তারা অ্যাংলো-স্যাক্সোন শক্তির এজেন্ট হিসেবেই এসেছিলেন। আরো খোলাসা করে বলতে হলে বলা যায়- তারা পশ্চিমা সভ্যতার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসেই কাজ করে।

অলসতা, অজ্ঞতায় নিমজ্জিত মুসলিম

যাই হোক- এবার মুসলমানদের প্রসঙ্গে আসা যাক। পৃথিবীজুড়ে আজ খ্রিস্টানরা যেভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে এবং তাদের ওপর ভর করে বিশ্বব্যাপী ইহুদিরা সবার মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে এবং সর্বত্র তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে। এখন সব ধরনের দানবীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তারা তাদের কাক্সিক্ষত মাসিহ দাজ্জালের আগমনের আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো পৃথিবীকে একচেটিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে। আর এমনই এক পটভূমিতে, এখনো মুসলমানরা ভোগ-বিলাস, অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে নিমজ্জিত। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়ায় লিপ্ত।
তুরস্কের বিখ্যাত ইতিহাস গবেষক প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজের বিভিন্ন সময়ে দেয়া বক্তব্য নিয়ে অনূদিত জনপ্রিয় বই “বিশ্বায়নের যুগে ইসলাম, উম্মাহ এবং সভ্যতা” গ্রন্থ থেকে জানা যায়- আফ্রিকা মহাদেশের এমন অনেক অঞ্চল রয়েছে যেখানে কুরআনে কারিমের মুসহাফা (লিখিত পাণ্ডুলিপি) এখনো পৌঁছায়নি। যে কিতাবের ওপর ঈমান এনে তারা মুসলিম হয়েছেন সেই কিতাব দেখার সৌভাগ্য তাদের এখনো অনেকেরই হয়নি।

চীনের বিভিন্ন প্রদেশে মুসলমানদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন : “প্রথমে কানসু ও নিজিয়া প্রদেশে বসবাসকারী হুই মুসলমানদের সাথে দেখা করি। পরে সিংজাঙ্ক স্বায়ত্তশাসিত উরুমচি, কাশগর, হটন, তুরফান প্রদেশে যাই। কাশগরের মাহমুদ এবং ইউসুফ হাস হাজিবির সাথে দেখা করি। অসাধারণ এক সভ্যতার ওপর প্রতিষ্ঠিত সেই অঞ্চলকে খুঁজে পাওয়ার পর বিগত ২০০ বছর যাবৎ মুসলিম উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করার ফলে তারা যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন সেগুলো সরেজমিন দেখার সুযোগ হয়। ঐ অঞ্চলে ২০ জন মানুষ কেবল একটি মাসহাফ (কুরআন) দিয়ে হাফেজ হচ্ছিল। একজন পড়ার পর আরেকজন পড়ত।

অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো মনে হতে পারে- অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন তাদের ধর্ম বিস্তারে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে, তখন মুসলিম হয়েও কুরআনের হাফেজ হওয়ার জন্য একটি কুরআন ভাগে পাচ্ছেন না মুসলমানরা এমন অঞ্চলও রয়েছে। প্রতি ২০ জনের জন্য একটি কুরআন! সত্যি ভাবতে গেলেও হয়তো অনেকের চোখে পানি আসবে- কতটা দুর্ভাগ্য আজকের মুসলমানদের! অথচ আরব বিশ্বের মুসলমানরা এখনো আল্লাহর দেয়া নেয়ামত তেল পশ্চিমাদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের দেয়া কাগজের ডলার পেয়ে মহা খুশি এবং সেই ডলার খরচ করে আয়েশি জীবন যাপন করছেন, বড় বড় হোটেলে গিয়ে বিলাসিতা করছেন।
লেখার পরিসর আর না বাড়িয়ে শুধু এটাই বলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছি- মুসলমানদের প্রিয় শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সুন্নাত বা আদর্শ হলো কঠোর পরিশ্রম ও নিজ ধর্মের দাওয়াত নিরলসভাবে সবার কাছে পৌঁছে দেয়া। অলসতা ও অজ্ঞতা থেকে আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে তিনি প্রার্থনা করেছেন বহুবার। যেই সময় ইতোমধ্যেই অপচয় হয়েছে, সেটাকে ভুল হিসেবে গ্রহণ করে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষ করে আজকের তরুণ ও যুব মুসলিমদের উচিত ব্যাপক পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়া, অলসতা পরিহার করা এবং নিজেদেরকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রেখে দেশ, জাতি, মানবতা ও দ্বীনের সেবায় আত্মনিবেদিত করা। আর এভাবেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মুসলিম জাতি আবারো তাদের পুরনো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

লেখক : সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply