অধিকার বঞ্চিত নতুন প্রজন্ম আমাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

রাফিউল ইসলাম

৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ১৯৬৫ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে দিনটি। সাক্ষরতা বলতে সাধারণত অক্ষর জ্ঞানসম্পন্নতাকেই বোঝায়। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এর পরিধি। এখন শুধু স্বাক্ষর জ্ঞান থাকলেই সাক্ষরতা বলা চলে না। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। একে উন্নত দেশে পরিণত করতে জাতিকে সর্বাগ্রে শিক্ষিত করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু নতুন প্রজন্ম কিভাবে বেড়ে উঠছে? তাদের হাতে কি প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদা রক্ষিত হবে? ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন করা কতটুকু সম্ভব হবে এদের দ্বারা? সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেতেই লেখাটির অবতারণা

সাক্ষরতা ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ দেখা যায় ১৯০১ সালে লোক গণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০-এর দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৬২.৬৬ ভাগ। এ হিসাব বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত। উইকোপিডিয়া এবং ইউনেস্কোর তথ্য মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সাক্ষরতার হার ৪৭.৫০ ভাগ। বিশ্বে র‌্যাংকিং-এ এর অবস্থান ১৬৪তম। প্রথমে রয়েছে জর্জিয়া। সাক্ষরতার হার ১০০ ভাগ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যৌথভাবে কিউবা, ইস্টোনিয়া এবং পোল্যান্ড। এদের সাক্ষরতার হার ৯৯.৮০ ভাগ। ৯৯.৭০ ভাগ সাক্ষরতা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বারবাডোস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ১৮-তে। সাক্ষরতার হার ৯৯ ভাগ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১৪৭ ও ১৬০-এ। সাক্ষরতার হার ৬১ ও ৪৯ ভাগ। সাক্ষরতায় সর্বনিম্নে অবস্থানকারী দেশ বারকিনো ফ্যাসো। ১৭৭-এ অবস্থানকৃত এ দেশটির সাক্ষরতার হার ২৩.৬০ ভাগ। ১৭৬ স্থানে রয়েছে মালি। সাক্ষরতার হার ২৪ ভাগ।
বাংলাদেশের সাক্ষরতা সরকারি হিসেব মত ধরলেও এখনও প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। অথচ ২০১৫ সালের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে দীর্ঘমেয়াদী পিআরএসপি কৌশলপত্র বাস্তবায়নে প্রতিজ্ঞ বাংলাদেশ। অন্যদিকে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এসেছে এ সরকার। এ লক্ষে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এনরোলমেন্ট ১০০ ভাগ পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু তার সিকি ভাগও পূরণ হতে দেখা যাচ্ছে না।
সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে সাক্ষরতার আর সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দেশের সাক্ষরতার হার যত বেশি সে দেশ তত উন্নত। সাক্ষর জাতি সচেতন জাতি।
নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলন আমাদের দেশে অনেক আগ থেকেই শুরু হয়েছে। ফল আমরা সেভাবে পাইনি। এর অন্যতম কারণ ঝরে পড়া। এখানে আমরা শিশুদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছি। কারণ, আজকের শিশুই আগামী দিনে এ বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষে নিয়ে যেতে তৎপর হবে।

শিশুশ্রম
শিশুশ্রমিকের সমস্যা সমস্ত দেশের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এই সমস্যা আর্থ সামাজিক সমস্যার সাথে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তবুও দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার সাথেও এই সমস্যা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। সমাজের প্রতিটি স্তরের চেষ্টাতেই শুধু এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
১৯৭৯ সালে সরকার প্রথম গুরুপদস্বামী কমিটি তৈরি করে শিশুশ্রমিক, তার সমস্যা ও সমাধানের উদ্দেশ্যে। কমিটি সমস্যার গভীরে গিয়ে বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এবং কিছু  প্রস্তাব পেশ করে।  এটা দেখা যায় যে যতক্ষণ দারিদ্র্য থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত শিশুশ্রমিক একেবারে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। এবং আইনত শিশুশ্রম নিঃশেষ করার কথা ভাবলেও তা বাস্তবায়িত হবে না। কমিটি এটা ঠিক করে যে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে সমস্যাপ্রবণ এলাকায় শিশুশ্রমিক একেবারে আইন করে বন্ধ করে দিতে হবে, এবং অন্যান্য স্থানে এই সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সমস্যা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এই কমিটি অনেকগুলি পদ্ধতির কথা বলে শিশুশ্রমিকদের অবস্থার উন্নতির জন্য।
গুরুপদস্বামী কমিটির প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে শিশুশ্রম (রোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন তৈরি হয়। এই আইন বলে কিছু ক্ষতিকারক কাজে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করে এবং অন্যান্য কাজে শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগকে নিয়ন্ত্রণ করে। এবং বিপদসঙ্কুল ও ক্ষতিকারক কাজের তালিকা বর্ধিত করা হয় চাইল্ড লেবার টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটির প্রস্তাব অনুসারে যা এই আইনের নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়।
১৯৮৭ সালে শিশুশ্রমের ওপর জাতীয়স্তরে কিছু প্রস্তাব তৈরি হয়। এই প্রস্তাবের দ্বারা কর্মরত শিশুদের পুণর্বাসন ব্যবস্থার কথা বলা হয়।
শিশুশ্রমের কারণ
ইউনিসেফ অনুযায়ী শিশুদের কাজে লাগানোর কারণ তাদের সহজেই শোষণ করা যায়। দারিদ্র্য হলো একমাত্র কারণ যার ফলে শিশুরা তাদের বয়সের তুলনায় অনুপযুক্ত কাজ করতে বাধ্য হয়। তবে এর অন্য কারণও আছে, যেমন অতিরিক্ত জনসংখ্যা, সস্তায় উপলব্ধ শ্রম, বিদ্যমান আইনগুলি বাস্তবায়ন না করা, অভিভাবকের শিশুদের স্কুলে পাঠানোর অনিচ্ছা (তারা তাদের কাজে পাঠাতে চান যাতে পরিবারের অর্থোপার্জন বেড়ে যায়) এবং গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য। এবং যে ক্ষেত্রে পরিবারের জীবনধারনের জন্য শুধু শিশুই অর্থোপার্জন করতে পারে সে ক্ষেত্রে কি-ই বা করা যাবে!
শিশুশ্রম বন্ধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস
জীবনের তাগিদে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হচ্ছে। ফলে তারা নানা রকম শারীরিক ও মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেÑ এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে রাজধানীতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ আট হাজার যার মধ্যে তিন লাখ সাতাশি হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত (বাংলাবাজার পত্রিকা, ১৭/০১/২০১২)। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০০২-২০০৩ অনুযায়ী সারাদেশে ৩১ লাখ ৭৯,০০০ শিশুশ্রমিক রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিগত নয় বছরে আর কোনো শিশুশ্রম জরিপ সংঘঠিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের অর্থনৈতিক কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। এক সমীক্ষায় ৭০৯টি ফ্যাক্টরির মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, মোট ৯ হাজার ১৯৪ শ্রমিকের মধ্যে ৪১.৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ৮২০ জন শিশু যাদের বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে (বাংলাবাজার পত্রিকা, ১৭/০১/২০১২)। দৈনিক ইত্তেফাক, ০১/১২/২০১১ অনুযায়ী দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দোকান ও ১৭টি আবাসিক হলে প্রায় তিনশত শিশুশ্রমিক কাজ করছে।
শিশুশ্রম হলো সামাজিক শোষণের দীর্ঘস্থায়ী এক হাতিয়ার। যে কোনো দেশে শিশুশ্রমকে, সেদেশ উন্নয়নে কতটা পিছিয়ে দেয় তার নির্দেশক হিসেবে ধরা হয়। তাই শিশু অধিকার নিশ্চিত ও শিশুশ্রম বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে। এজন্য মিডিয়া, সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সকল স্তরের নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১, জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০সহ শিশুদের স্বার্থ রক্ষায় সকল আইন ও নীতিমালার বাস্তবসম্মত সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ করা খুবই প্রয়োজন।
শিশুশ্রম নিরসনে সর্বপ্রথম আমাদের শিশুর সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ও জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ মোতাবেক ১৮ বছরের কম বয়সী সকল ব্যক্তিকে শিশু বলা হবে। কিন্তু বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬-এ ‘শিশু’ ও ‘কিশোর’ এর সংজ্ঞা বয়স ভিত্তিক। এই আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তি ১৪ বছর পূর্ণ করেনি তিনি ‘শিশু’, আর যিনি ১৪ বছর পূর্ণ করেছেন অথচ ১৮ বছর পূর্ণ করেননি তিনি ‘কিশোর’। তবে শিশুশ্রমিকের কোনো সংজ্ঞা দেয়া হয়নি আইনটিতে। এ সংজ্ঞা মোতাবেক ‘শিশুশ্রমিক’ বলে কোনো ব্যক্তি বা শ্রমিক থাকা বাঞ্ছনীয় নয়, তদস্থলে ‘শ্রমে নিয়োজিত শিশু’ বা ‘শ্রমজীবী শিশু’ ব্যবহার করতে হবে।
যে নামই ব্যবহার করা হোক না কেন, সকল আইন ও নীতিমালায় শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ৩২ মোতাবেক এই সনদ স্বাক্ষরকারী দেশসমূহ অর্থনৈতিক শোষণ থেকে শিশুর অধিকারকে রক্ষা করবে এবং শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অথবা শিশুর শিক্ষায় ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী, কিংবা তার স্বাস্থ্য অথবা শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক বা সামাজিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কাজ যেন না করানো হয়, সে ব্যবস্থা করবে। প্রয়োজনে এ সংক্রান্ত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে; কর্মে নিয়োগের বয়স, কর্মঘণ্টা ও কাজের শর্তাবলি নির্ধারণ করবে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে সার্বক্ষণিককর্মী হিসেবে নিয়োগ হতে বিরত থাকতে হবে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনুকূল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, দৈনিক কর্মঘণ্টা, কর্মবিরতি এবং বিনিময় মজুরি নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মী শিশুর লেখাপড়া, আনন্দ-বিনোদন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখা ও যে কোনো রকম নির্যাতন থেকে রক্ষা করা নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কর্ণধার। কোমলমতি অথচ নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত শিশুদের মানবাধিকার সুরক্ষায় ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বৃদ্ধি, কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং আইনের সুষ্ঠু ও সুষম প্রয়োগ অপরিহার্য। যে সকল ব্যক্তি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করে কিংবা বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। শিশুশ্রমে বাধ্য করার শাস্তিগুলো প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়াগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
যে সকল নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য অক্লান্ত কাজ করে যাচ্ছেন, তাদেরকে বিভিন্ন ফোরাম ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংবর্ধনা দিয়ে অন্যদেরও এ কাজে অনুপ্রাণিত করতে হবে। সর্বোপরি ছিন্নমূল এ সকল শিশু, যারা ফুলের মতো কোমল ও সৌরভময় তাদের সুযোগ দিতে হবে সুগন্ধী ছড়িয়ে বিকাশ লাভের। তাদের মনের কথা আমাদের সকলকে শুনতে হবে, অনুধাবন করতে হবে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা নিশ্চিত করতে পারবো আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ।

মানসিক বিকাশে
পারিপার্শ্বিক আবহ
অমিত সম্ভাবনার আলো নিয়ে পৃথিবীতে আসে শিশু। এ সম্ভাবনার বিকাশ কতটুকু ঘটবে তা নির্ভর করে তাকে কিভাবে গড়ে তোলা হচ্ছে। শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক এবং মননে সমৃদ্ধ নাগরিকই আমাদের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ একে অপরের পরিপূরক হলেও আমরা এতদিন শিশুর শারীরিক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি। শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দু’টি ভিন্ন প্রক্রিয়া। শারীরিক বিকাশ বলতে শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বৃদ্ধিকে বুঝায়। আর মানসিক বিকাশ বলতে ব্যবহার, ভাষার যথাযথ প্রকাশ, চিন্তা চেতনা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্রমাগত অধিকতর ক্ষমতা অর্জনকে বুঝায়। তাই শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের যে অঙ্গ মানসিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে সেই অঙ্গ অর্থাৎ মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয় মাতৃগর্ভেÑ যা প্রায় শতকরা আশি ভাগ। আর অবশিষ্ট কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি হয় জীবনের প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত। জন্মলগ্নেই শিশুর মস্তিষ্কে কোটি কোটি কোষ বিদ্যমান থাকে। মূলত এই কোষগুলো এককভাবে কিছু করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন এক কোষের সাথে অন্য কোষের সংযোগ। শিশুর পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে মস্তিষ্কের ৮০-৯০ ভাগ কোষের সংযোগ ঘটে। তবে এর বেশির ভাগ সংযোগই ঘটে প্রথম ৩ বছর বয়সের মধ্যে। মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন ও বাড়ানোর জন্য এগুলোকে উদ্দীপ্ত করতে হয়। কোষগুলোকে উদ্দীপ্ত করার প্রধান উপায় হলো শিশুর সাথে ভাব বিনিময় ও পারস্পরিক ক্রিয়া।
এরূপ প্রতিটি পারস্পরিক ক্রিয়ার ফলে মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি হতে থাকে, ফলে মস্তিষ্কের একটি নেটওয়ার্ক বা কাজ করার উর্বর ক্ষেত্র গড়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় শিশুর মস্তিষ্ক পরিপক্ক হতে থাকে। শিশুর সাথে ভাব বিনিময় ও পারস্পরিক ক্রিয়াদি যত বেশি হয়; শিশুর শিখন ও মস্তিষ্কের বিকাশ তত দ্রুত হয়।
শিশুর সুস্থ ও সঠিক মানসিক বিকাশের সঙ্গে শিশুর পারিপার্শ্বিক আবহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক আবহ, সামাজিক আবহ, সর্বোপরি পরিবেশগত আবহ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট প্রভাব রাখে শিশুর মানসিক বিকাশের পর্যায়ে। জন্মের পর থেকেই শিশু শিখতে শুরু করে। প্রতিটি মুহূর্ত তার শেখার সময়, প্রতিটি ক্ষেত্রই তার পাঠশালা। তাই, এ সময় শিশুর যতেœ পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া দরকার। শিশুকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়। জন্মের পরই শিশুর বিভিন্ন ইন্দ্রিয় তথাÑ দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্বাদ ও স্পর্শ কাজ করতে শুরু করে। এগুলো উদগ্রীব থাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। আর এ অভিজ্ঞতা দিতে হবে বার বার অত্যন্ত মনোযোগ ও ভালোবাসার সাথে।
ছোট শিশুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ হচ্ছে কথা বলতে শেখা ও ভাষা বোঝা। শিশুকে গান শুনিয়ে, কথা বলে, ছড়া শুনিয়ে যা বলা হয়, তার মাধ্যমে শিশু সবচেয়ে ভালো শেখে। মনে রাখা দরকার, কথা বলতে পারার অনেক আগেই শিশু ভাষা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করে। তাই শিশুকে অনবরত ধ্বনি, শব্দ, কথা, ছবি দেখিয়ে ও অঙ্গভঙ্গি দিয়ে ভাবিয়ে রাখুন। ফলে শিশু শুনে, অনুকরণ করে এবং ধীরে ধীরে তার নিজস্ব ধ্বনিগুলোকে বোঝার মত শব্দে পরিণত করে কথা বলতে শিখবে।
শিশুকে প্রচুর খেলতে দিতে হবে। খেলা করে শিশুরা আনন্দ পায়। খেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। শিশুদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে বড়দের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বড়রা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভাব দেখায় তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। এতে তার মানসিকতা ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে থাকবে। এর বিপরীত আচরণের ক্ষেত্রে শিশুরা ক্রোধ, অন্যের কথা না মানা, সহিংস আচরণ রপ্ত করতে থাকবে। শিশুর আবেগ অনুভূতি বা আচরণ অনেক সময় বড়দের কাছে অযৌক্তিক বা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য এটা স্বাভাবিক ও বাস্তব। তাই এ ব্যাপারে পিতা-মাতা ও বড়দের যথেষ্ট সহানুভূতিশীল হতে হবে। শিশু নতুন কিছু শিখলে, তা যতই সামান্য হোক, তার সামনে সম্মতি, উৎসাহ ও আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।
সুস্বাস্থ্য, সুশিক্ষা, নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও ভালোবাসার দাবি পূরণ করে প্রতিটি শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকশিত করে তোলা সম্ভব। প্রত্যেক পিতা-মাতা ও অভিভাবকই তার শিশুকে হাসি-খুশি, স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিদীপ্ত ও পূর্ণ বিকাশমান দেখতে চায়। তাই প্রতিটি শিশুকে একইরূপে দেখার চেষ্টা করতে হবে।

নিরাপদে বেড়ে উঠা
নিশ্চিত করা
‘আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’-এ সত্য সমাজের বেশিরভাগ মানুষই উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু একটি শিশুকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে তার মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধিসহ মেধা ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে পিতা-মাতা, পরিবার বা সমাজের কী করণীয় সে বিষয়ে বোধকরি গোটা সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই সচেতন নন। এ ক্ষেত্রে অশিক্ষা, কুসংস্কার বা অজ্ঞতাই যে প্রতিবন্ধকতা তা নয়, এর সাথে যোগ হয়েছে পারিবারিক উদাসীনতা, ব্যক্তির জানার অনাগ্রহ এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্মিলিত ইচ্ছার অভাব। কিন্তু শারীরিক সুস্থতার পরিপূর্ণ এবং মেধা, মনন ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ একটি আগামী প্রজন্ম নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হলো শিশুর নিরাপদে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করা।
শিশুর বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে আমরা দু’টি স্তরে বিভক্ত করতে পারি। প্রথমত শিশুর জন্মপূর্ব অবস্থায় মাতৃগর্ভে ভ্রƒণ আকারে বেড়ে ওঠা। দ্বিতীয়ত শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর এ সুন্দর পৃথিবীতে নির্মল আলো-বাতাসে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে ওঠা। মানুষের কর্ম জগতের বিশালতায় মাতৃগর্ভে শিশু বেড়ে ওঠা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় খুব গৌণ এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হয়। আমরা ভুলে যাই, একটি ভালো বীজই নিশ্চিত করতে পারে একটি সবল বৃক্ষ।
সুস্থভাবে শিশু বেড়ে উঠছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পিতামাতা ও অভিভাবককে কতগুলো বিশেষ বিষয়ের উপর নজর দিতে হবে। একটি অনুকূল পরিবেশে যোগ্য নাগরিক হিসেবে শিশুদের গড়ে তোলা আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব।

পরিবারের ভূমিকা
শিশু হচ্ছে মহান আল্লাহতায়ালার নেয়ামত, মা-বাবার কাছে পবিত্র আমানত। সন্তান মা-বাবার চোখের শীতলতা, হৃদয়ের প্রশান্তি আনয়ন করে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হলো শিশু। শিশু নিষ্পাপ, অবুঝ। রাসূল (সা) বলেন, শিশুরা হলো জান্নাতের প্রজাপতি। (মিশকাত) সে পৃথিবীতে এসে চোখ মেলে দেখতে শেখে, কান পেতে শুনতে শেখে, আস্তে আস্তে শেখে কথা বলা; তাই সে জন্মের পর তার চার পাশে যা কিছু দেখবে, শুনবে সে তা-ই শিখবে।  সে জন্য তার জীবন সুন্দর করে  গড়ে তোলার ব্যাপারে বাবা-মা, বড় ভাই-বোন এমনকি আত্মীয়-স্বজন সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। শৈশবেই শিশুকে আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া আবশ্যক, যেন শিশু প্রশংসনীয় ও সুন্দর চরিত্রে সজ্জিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের মহৎ করে গড়ে তোলো এবং তাদের উত্তম আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও। (সহীহ মুসলিম) অপর হাদিসে রাসূল (সা) বলেন, সন্তানকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া সম্পদ দান করা অপেক্ষা উত্তম। (বায়হাকি)
একটি সুন্দর জীবন কিভাবে গঠন করা যায় এবং শিশুর শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু তা ওপরের হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত। একটি শিশু একটি সমাজের আগামীর সুন্দর রঙিন ঘুড়ি। মানুষ ও সমাজের জন্য সে হবে রাহবার, তার চারিত্রিক গুণাবলির মাধ্যমে সত্যের আলো ছড়াবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। অন্ধকার সমাজে প্রজ্বলিত করবে মুক্তির আলো, পথভোলা, দিকভ্রান্ত মানুষকে দেখাবে সত্যের পথ, মুক্তির পথ। হতাশায় ডুবন্ত জাতিকে তুলে আনবে আশার আলোর রঙিন ঠিকানায়। কিন্তু আজ তা হচ্ছে না। যা হচ্ছে তা হলো আমাদের শিশুরাই আগামী দিনের সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ। কেননা আমরা আমাদের শিশুদের সেই শিক্ষা দিচ্ছি না যা মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রিয় হাবিব (সা) আমাদের শিখিয়েছেন। আমাদের শিশুরা বড় হচ্ছে টেলিভিশন আর ডিশ অ্যান্টিনায় অশ্লীল ছবি দেখে দেখে, যেখান থেকে শিখছে খুনখারাবি, সন্ত্রাস, রাহাজানি, অবৈধ প্রেম-ভালোবাসা, ইভটিজিংসহ ভয়াবহ সব অশ্লীল জঘন্য অপরাধ। আর তা শিখছে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সাথে বসে। তাহলে এবার ভাবুন! আমাদের এই শিশুরা সমাজের জন্য কী করতে পারবে, তার সব অপকর্মের জন্য দায়ী কারা?
বাস্তবতা হলো, আমরা আমাদের জীবনে বিধর্মীদের সব কালচার গ্রহণ করছি। দূরে ঠেলে দিয়েছি ইসলামী শিক্ষাকে, পশ্চিমাদের রঙিন বিজ্ঞাপনের কাছে আমরা বিক্রি করেছি আমাদের বিবেক ও সন্তানদের চেতনা ও মনুষ্যত্বকে।
তাই তো আমরা আজ ইসলামী শিক্ষাকে কোনো শিক্ষা মনে করি না, অথচ ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম আর এই শিক্ষার প্রথম স্তর হলো পরিবার। ইসলামে পরিবার হচ্ছে গোটা সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক। সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সঠিক ভূমিকা পালনের মৌলিক শিক্ষা লাভ করা হয় পারিবারিক পরিবেশে। তাই আমাদের সন্তানদের শিশুকাল থেকেই নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। কেননা রাসূল (সা) বলেন, “তোমরা নিজেদের সন্তানদের স্নেহ করো এবং তাদের আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ো।”

বাংলাদেশে শিশুদের বিনোদন
আমরা বুক ভরে গর্ব করে বলি যে আমরা বাংলাদেশী, আমরা বাঙ্গালী। কিন্তু আমাদের এই বাংলায় শুধু নয় কোনো বাংলার শিশুরা যেন বাংলা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারছে না। আমাদের দেশে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল আছে, কিন্তু কোনো একটা কি শুধুমাত্র শিশুদের জন্য হতে পারত না? আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্বিমবঙ্গেও তেমন চ্যানেল এখন পর্যন্ত হয়নি। ভাষার দাবিতে প্রাণ দেওয়া বীরের জাতি হিসাবে এটা আমাদের কাম্য ছিল না।
বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের দেশে আগে কার্টুন যা দেখানো হতো তা সবই ছিল ইংলিশ ভাষার কিন্তু বর্তমানে কিছু হিন্দি ভাষার চ্যানেল দেখানো হচ্ছে। যেহেতু হিন্দি কিছুটা বাংলার কাছাকাছি ভাষা সেকারণেই হোক আর আমরা অনেক বেশি হিন্দি চ্যানেল দেখে দেখে কিছুটা হলেও হিন্দি শিখে গেছি সে কারণেই হোক ইংলিশ থেকে এই হিন্দি চ্যানেলগুলো শিশুদের একটু বেশিই টানছে বলে মনে হচ্ছে। শিশুমনে কার্টুন ও কার্টুনের চরিত্র অনেক বেশি করে গেঁথে যায়, তাছাড়াও রঙের ছড়াছড়িও এইসব কার্টুনের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় যা শিশুদের ভালো লাগে। কিন্তু এই কার্টুনগুলোতেই বা কী শেখানো হচ্ছে? শেখানো হচ্ছে কিভাবে অন্যকে ঠকানো যায়, চুরি করা যায়Ñ এইসব।
রঙিন বা রঙের বাহার শিশুরা পছন্দ করে তা আমরা হয়ত অনেক আগেই বুঝতে পেরেছি যখন দেখতাম বিটিভিতে বিজ্ঞাপন দেখাতে দেখাতে শিশুকে খাওয়ানো হতো। শুধু তাই নয়, ওই সময় প্রাপ্ত বয়স্করা বিজ্ঞাপন শুরু হলে টিভির সামনে থেকে উঠে যেত কিন্তু শিশুরা অনেক আনন্দ করে সেই বিজ্ঞাপন দেখতো। অনেক মাকে দেখা গেছে অনুষ্ঠান চলাকালীন শিশুকে কোলে নিয়ে ঘুরতে হয়েছে কিন্তু যখন বিজ্ঞাপন শুরু হয় তখন তিনি শিশুটির সাথে টিভি দেখার সুযোগ পেতেন।
আমাদের চ্যানেলগুলোতে কিছুটা সময় অবশ্য শিশুতোষ অনুষ্ঠান দেখা যায়। তবে তার ব্যাপ্তি থাকে কিছু শিশু শিল্পীদের নাচ, গান ও কিছু বিনোদন নিয়ে। যা মোটেও কোনো শিশুর উপযোগী থাকে কি না সন্দেহ আছে। অনেক অনুষ্ঠানে দেখা যায় শিশুদের মুখে বড়দের গান বা প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য লেখা গান পরিবেশন করছে আমদের শিশুরা। যা শুধু যে শিশুটি গাচ্ছে তাই নয় অনেক শিশুকে ইচরেপক্ক করে দিচ্ছে। শিশুদেরকে দিয়ে এই সকল গান এখনই থামাতে হবে। আর তা না হলে উঠতি বয়সে এই সব শিশুগুলো অকালে নষ্ট হবার অসীম সম্ভাবনা আছে।

আমাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা
সুবিধা নানা রকম হতে পারে কিন্তু অধিকার নানা রকম হয় না। যেমন স্কুলবাস একটি সুবিধা। এটি সব স্কুলে নাও থাকতে পারে। জেনারেটর একটি সুবিধা। এটিও সব স্কুলে নাও থাকতে পারে। কিন্তু শিক্ষক, ব্ল্যাকবোর্ড, চক, ডাস্টার, টুল, টেবিল এসবসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ থাকতেই হবে। কারণ এই বিষয়গুলো অধিকার। তাই সুবিধাবঞ্চিত শিশু এই শব্দটির বদলে অধিকারবঞ্চিত শিশু বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত মনে হয়। আমাদের সমাজে আমরা নানাভাবে অধিকারবঞ্চিত। এই বঞ্চনা আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। ফলে আমরা এখন আর অধিকারহীনতা নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমাদের মস্তিষ্কে সেনসিটাইজেশন নামে একটি প্রক্রিয়া আছে, যার মাধ্যমে একটি ঘটনা বারবার দেখতে বা অনুভব করতে করতে সেই নির্দিষ্ট বিষয়টিতে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। যেমন রাস্তায় পঙ্গু মানুষ দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অথচ এমন মানুষ কোনো উন্নত দেশের রাস্তায় দেখা গেলে তাদের দেশের নাগরিকেরা কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে পড়বেন কারণ সেখানে এটা রোজ দেখা যায় না। আমরা আমাদের দেশে এসব দেখে দেখে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন রাস্তায় বিকলাঙ্গ ভিখারি না দেখলেই আমরা অবাক হয়ে যাই।
শিশুদের অধিকারগুলি কী? প্রতিটি শিশুর সঠিক পরিচর্যা ও নিরাপত্তা পাবার অধিকার আছে। তার জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং রাষ্ট্র তার জন্য বয়স ও সময়োপযোগী আইন করবে যাতে তার কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সে অনুপযুক্ত সাজা না পায়। তাকে কোনোভাবে শারীরিক, মানসিক বা অন্য কোনো রকম নিবর্তন বা নির্যাতনের শিকার হতে দেয়া যাবে না এবং তাকে স্বাধীন ও মুক্ত পরিবেশে বড় হতে দিতে হবে। তার জন্ম নিবন্ধন, মা-বাবার সাথে থাকবার সুব্যবস্থা, নিজ ধর্ম বেছে নেয়ার স্বাধীনতাসহ নানা রকম বিষয়াবলি আছে যা শিশুর অধিকারের অন্তর্গত। যে শিশু অধিকার পায় না, তার সুবিধা পাওয়া তো সেকেন্ডারি বা দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়।
এবার আমাদের দেশের দিকে তাকাই। প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ জন্মগ্রহণের ব্যবস্থা আমরা আজো করতে পারিনি। তাদের জন্য পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারিনি। বিশুদ্ধ আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করতে পারিনি। তাদের এখনো শ্রম দিতে হয় মাঠে ও কারখানায়। তাদের জন্য শিক্ষার সুব্যবস্থা করতে পারিনি যদিও গাল ভরে বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, নারীর জন্য বিনা বেতনে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার কথা আমরা বলি। প্রকৃত চিত্র হচ্ছে, দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নেই, স্কুলঘর নেই, বসার জায়গা নেই এবং এমনও স্কুল আছে যেখানে পালাক্রমে একেক ক্লাসের ছাত্ররা একেকদিন বেঞ্চ ব্যবহার করতে পারে কারণ তাদের জন্য বেঞ্চের সংখ্যা অপ্রতুল। অথচ এই দেশে এমন স্কুল আছে যার মাসিক বেতন লক্ষ টাকার কাছাকাছি, সব ক্লাসরুমে এয়ারকুলার আছে, তারা শিক্ষা সফরে সুইজারল্যান্ড যায় এবং প্লে গ্রুপে শিশুদের খেলার জন্য জীবাণুমুক্ত মাটি ইউরোপ থেকে আমদানি করে নিয়ে আসে। এমন স্কুলে আমাদের দেশের বড় বড় মানুষদের ছেলেমেয়েরা পড়ে, যাদের বাবা-মা দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসাসহ সব বড় বড় বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।
অধিকার নিশ্চিত করা একদিনে সম্ভব নয় এটা আমরা সবাই বুঝি। আমরা দরিদ্র, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়াতো অসম্ভব নয়। এই পদক্ষেপের মধ্যে প্রথমেই যেটা নেয়া সম্ভব সেটি হলো বৈষম্য দূরীকরণ। দেশের একজন শিশু টাকা আছে বলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করে বিদেশী মাটি ছানবে আর আরেকজন মাটিতে বসে পড়াশোনা করবে, এটা অপরাধ। কারণ আমাদের সংবিধানে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা আছে এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলা আছে। রাষ্ট্র একদিকে সমতার কথা বলে আবার একই দেশে নানা রকম শিক্ষাব্যবস্থা, নানা রকম শিক্ষা সুবিধা এবং বড়লোক ও গরিব এর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয়গুলিকে জিইয়ে রাখে।
আমরা অধিকার আর সুবিধাকে এক করে দেখতে গিয়ে কোনো বিশেষ সুবিধা তৈরি করলে তাতে অধিকার অর্জিত হয়েছে বলে মনে করি। একবেলা এতিমখানাতে বিশেষ খাবার দিয়ে ভাবি সারা বছরের দায়িত্ব শেষ। আমাদের দেশে এতিম শিশুর জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা কিন্তু আমরা দিতে পারিনি। কোনো অভিভাবকহীন শিশুর আশ্রয়স্থলকে এতিমখানা আর লিল্লাহ বোর্ডিং নাম দিয়ে বিশেষায়িত করেছি তাদের দুরবস্থাকে। পথশিশু, পথকলি নাকি টোকাই এই নামকরণ বিতর্কে ব্যস্ত থেকেছি কিন্তু তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন করিনি বা করতে উদ্যোগীও হইনি। হাসপাতালে দরিদ্রদের ফ্রি চিকিৎসার জন্য অস্থির হয়ে যাই আমরা। অথচ নামকরা স্কুলগুলিতে কেন প্রতি ক্লাসে এরকম হতদরিদ্র অন্তত দু’জনকে পড়ানোর চেষ্টা করি না! ঢাকা শহরে অনেক স্কুল আছে যেখানে হাজার হাজার টাকা বেতন নেয়া হয়। সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে তারা কি পারেন না অন্তত দু’টি করে দশটি শ্রেণীতে বিশজন শিশুকে পড়াতে?
স্বাভাবিক শিশুদের বেলাতেই আমরা এমন নির্দয়। যেসব শিশু প্রতিবন্ধি, অটিস্টিক, তাদের জন্য আমাদের চিন্তাতেই কোনো স্থান নেই। ঢাকা শহরে এতো সুপার মার্কেট, সেগুলোতে কোনো র‌্যাম্প নেই, নেই হুইল চেয়ার বা অন্ধদের জন্য সুব্যবস্থা। আমাদের কোনো পাবলিক প্লেসে এমন কোনো বাথরুম নেই যেখানে মায়েরা শিশুর ন্যাপি বা ডায়াপার বদলাতে পারেন। অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য ভালো স্কুল নেই। সরকারি কোনো ব্যয় বরাদ্দ নেই। ঢাকা শহরে শিশুদের খেলার জন্য কোনো মাঠ নেই। যেখানে রাজধানীর শিশুদের এই অবস্থা, সেখানে ঢাকার বাইরের শিশুদের কী অবস্থা সেটাতো বোঝাই যায়। জিপিএ ৫ পেলেই সকল সমস্যার সমাধান হবে ভেবে যারা গোঁফে তা দিচ্ছেন, তারা জানেন না, খেলাধুলাহীন এই বিদ্বানদের শরীর ভেঙ্গে পড়বে ৪০ বছরেই। এর নমুনা আমরা এখনই দেখতে পাচ্ছি। অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক এখন অতিপরিচিত ঘটনা।
এসবের সমাধান কী? আমরা ভাবি সমাধান কেবল টাকা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু না, এ জন্য প্রথমে যা চাই সেটি হলো সদিচ্ছা। তারপর চাই স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ। সারা দেশে যতগুলি অভিজাত স্কুল আছে তারা সবাই ২০ জন করে ছাত্র বিনা বেতনে পড়ালে সংখ্যাটি কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায়। যদি ঠিক করি প্রতিটি স্বচ্ছল পরিবার অন্তত একজন অধিকারবঞ্চিত শিশুর দায়িত্ব নেব, তাহলে অন্তত ১০ লক্ষ শিশুর সংস্থান হয়ে যায়। সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া কখনো অধিকার অর্জন করা যায় না। অধিকার কোনো চাপিয়ে দেয়া বা বইতে লেখা দুর্বোধ্য শব্দাবলি নয়। আচরণের মধ্য দিয়েই সমাজে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
প্রায় ষোলো কোটি মানুষের এই দেশটিকে উত্তরোত্তর উন্নয়নের রাজতোরণে চালিত করতে চাই শুধুমাত্র সংকল্প। শিশুদের অধিকার অর্জনের জন্য সভা সমিতি সেমিনার শুধু নয়, চাই উদ্যোগ। নিজের ভাই বোনকে অধিকার বঞ্চিত রেখে দারিদ্র্যকে যতই জাদুঘরে পাঠাই আর সুশাসন, গণতন্ত্র নিয়ে যতো বুলি কপচাই না কেন, সভ্য সমাজের সভ্য হয়ে ওঠার জন্য চাই সভ্য আচরণ। শেরাটন হোটেলের ভেতরে ইউনিসেফের অফিস কম্পাউন্ড, বাইরে ফুল বিক্রেতার কাজ করবে শিশুরা আর ভেতরে আমরা শিশুশ্রম নিয়ে কথা বলবো, কী বিকৃত এই বৈপরীত্য! ছোটবেলায় মা যখন চুল আচড়ে দেন, তখন থুতনিটা জোরে ধরে নেন যাতে আমরা মাথা না নাড়ি। সমাজের সেই থুতনি ধরার মানুষ যারা, তারা সমাজের মাথা, বুদ্ধিজীবী, নেতা, রাজনীতিবিদ। তারা এখন আর সে কাজটি করছেন না। ফলে সমাজের মাথা নড়ছে প্রবল অনাচারে। কাউকে না কাউকে সেই কাজটি করতেই হবে।
আমরা না পারলে কি হবে, আগামী দিনের মানুষেরা এ কাজটি করতে প্রস্তুত এখন। আমাদের চুপ করে থাকার কৈফিয়ত দিতে হবে তাদের কাছে। আমরা যদি কথা না বলি, তবে একদিন যখন আগামী প্রজন্ম প্রশ্ন করবে কেন চুপ করেছিলাম আমরা, তখন মাথা নিচু করে আবারো চুপ করে থাকতে হবে আমাদের।
আসুন আমরা কথা বলি। আমরা আমাদের অধিকারের কথা বলি। আমরা আগামী দিনের স্বপ্নের কথা বলি। আমরা আমাদের আশা আর ভালোবাসার কথা বলি। সত্যিই যদি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন আমাদের বুকের মাঝখানে লালন করে থাকি, তাহলে প্রথমেই এই নতুন প্রজন্ম তথা সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটিকে নিয়ে ভাবতে হবে। তাকে যথার্থ পরিবেশ দিতে হবে। জীবন গঠনের যাবতীয় উপায়-উপকরণ সরবরাহ করতে হবে, সম্পূর্ণ নিজের প্রয়োজনেই।

SHARE

Leave a Reply