অনলাইন এবং প্রাইভেসি সালেহ মো. ফয়সাল

একটা পরিস্থিতি কল্পনা করুন। হঠাৎ কারো সঙ্গে আপনার আলাপ-পরিচয় হলো। তাকে কি আপনি বাসায় নিয়ে আসবেন? তার সঙ্গে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তাকে আপনার জীবনের ব্যক্তিগত গল্প শোনাবেন, যা একান্তই আপনজনকে বলা যায়? অথবা তাকে সারা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখাবেন, কিচেন, ডাইনিং, বেডরুম? নিজের ব্যক্তিগত তথ্য, চাবি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট? কিংবা তাকে আলমারি থেকে ফ্যামিলি ফটো অ্যালবামটা নামিয়ে ছবি দেখাবেন বিভিন্ন বিষয়ের ছবি, মা-বাবা-ভাই-বোনের ছবি? কখনই…!
বাস্তবে কিন্তু ব্যাপারটা এমনটিই ঘটছে অনেকের ক্ষেত্রে। শুধু অনলাইনে ঘটছে বলে ব্যাপারটির গুরুত্ব ও ক্ষতির মাত্রাটা ঠিক তুলনা করা যাচ্ছে না এখনই। এর মাত্রাটা বুঝতে হলে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। ধরা যাক সোস্যাল মিডিয়ার কথাই। আপনার ফ্রেন্ডলিস্টে এমন কেউ কি আছেন যাকে আপনি আসলেই চেনেন না? কিংবা নিজের চোখে যাকে কখনো দেখেননি? কিংবা কোনো সোস্যাল এসব সাইটে আপনি কি কোনো ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করছেন, যা শেয়ার করার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই, যেমন ই-মেইল (ব্যক্তিগত), টেলিফোন নম্বর, ঠিকানা, পেশা ইত্যাদি? প্রশ্নের উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে আপনি সহজেই বুঝতে পারছেন ওপরের পরিস্থিতির উত্তরও আপনার ক্ষেত্রে হ্যাঁ হওয়া উচিত। যা স্বভাবতই আপনার কাম্য নয়। এরপরেও তার কারণ কী হতে পারে, কেনই বা আমরা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার নামে অনলাইনে নিজেদের প্রাইভেসি ধ্বংস করে চলেছি? খুব সম্ভবত এর কারণ হলো, বাস্তবজীবনে আপনি যতটা সচেতন, অনলাইনে আপনি ততটা সচেতন থাকেন না। ইন্টারনেট আপনার কাছে কল্পনার ফানুসের মতো। এই আছে এই নেই। রাস্তায় চলার পথে অপরিচিত কাউকে বন্ধু না বানালেও অনলাইনে বোতাম টিপে বন্ধু বানাতে আপনার আপত্তি নেই। আবার কেউ যদি আপনার নাম-পরিচয় জিজ্ঞাসা করে আপনি একটু বিরক্ত হলেও সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেই এসব অকাতরে শেয়ার করে থাকেন। অপরিচিত কাউকে ঘরে এনে মা-বাবা-ভাই-বোন-স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আপনার আপত্তি থাকলেও মিডিয়ায় ফ্যামিলি ছবি পাবলিকলি আপলোড করতে আপনার আপত্তি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো নিজের ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, অন্যের ইচ্ছায় হোক সবাই দিন দিন তাই করে যাচ্ছি।
এর অন্যতম কারণ হলো, আপনি এখনো সাইবার ক্রাইমের শিকার হননি। সাইবার ক্রাইম আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো তেমন ব্যাপকতা বা পরিচিতি পায়নি। তবে সামাজিক অবক্ষয় বা অন্য যেকোনো কারণে ব্যক্তিগত লেভেলে সাইবার ক্রাইমের কিছু ঘটনা ঘটছে অহরহ। যেমন কারো ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য নোংরাভাবে উপস্থাপন করে হেয় করা, ব্ল্যাকমেইল করা বা আত্মহত্যার মতো ঘটনাও। এসব তথ্য বা ছবি সাধারণত সোস্যাল মিডিয়া থেকে নেয়া, যা অপরাধীদের জন্য অনেক সহজ। কারণ ভিকটিম নিজেই অপরাধীদের কাজ সহজ করে দেয়। এসব অপরাধের পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কিছু বিষয় মূলত কাজ করে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, প্রেমে ব্যর্থতা, প্রতিশোধ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তবে একবার ভাবুন, এসব কারণ ছাড়াও অপরাধী হয়তো ততটা অ্যাগ্রেসিভ হতো না, যদি না পর্যাপ্ত তথ্য/ছবি সরবরাহ করে তাকে প্রলুব্ধ করা না হতো। ভিকটিম নিজে সরাসরি না হলেও অন্য কেউ হয়তো তাকে এ ক্ষেত্রে প্রলুব্ধ করতে পারে। এটাকে বলা হয় ‘ইনসাইটমেন্ট’ বা উদ্দীপনা বা প্ররোচনা, যা ইংল্যান্ড অ্যান্ড ক্রিমিনাল কমন ল অনুযায়ী একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
দুঃখজনক ব্যাপার হলো অনলাইন সুবিধা ব্যবহারকারীরা শিক্ষিত হয়ে ও প্রাইভেসির ব্যাপারটাকে বেশ হালকাভাবেই দেখেন। আবার অনেকে ব্যাপারটা তেমন ভালো জানেন না বা গুরুত্ব দেন না। তারা হয়তো জানেনই না মোবাইল দিয়ে তোলা একটা ফটো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, গুগল ইত্যাদির মতো কত কত জায়গায় না চলে যাচ্ছে? বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রত্যেকের নিজস্ব ক্লাউড সার্ভার রয়েছে যা আপনার ছবিটা আলাদাভাবে জমা করছে। যাকে বলা হয় ডেটা ফ্রেগমেন্টেশন। সম্প্রতি ইউটিউবে একটা ভিডিও বেশ আলোড়ন তোলে। যেখানে দেখা যায় শুধু নাম জানা থাকলেই কারো ব্যক্তিগত সব তথ্য জেনে নেয়া যাচ্ছে। আর এটা করা হচ্ছে টার্গেটকৃত ব্যক্তির নামে সব সোস্যাল মিডিয়া চেক করে। আর এভাবে বিভিন্ন সময় তোলা ছবি, ভিডিও, স্ট্যাটাস, কমেন্ট ইত্যাদি পড়ে খুব সহজেই তার নামধাম-পেশা, পছন্দ-অপছন্দ, শখ, পারিবারিক সম্পর্ক ইত্যাদি জেনে নেয়া যায়। আপনি নিজেই এটা পরীক্ষা করতে পারেন আপনার নিজের ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদি চেক করে। এসব নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডারের প্রাইভেসি পলিসিও আলাদা, যা না পড়েই বা বুঝেই আমরা সাধারণত এগ্রি করি। এসব মিডিয়ার অনেকের সাথে রয়েছে থার্ড পার্টি অ্যাগ্রিমেন্ট। যার কারণে আপনার তথ্য ব্যবসায়িক কারণে অন্য কোনো কোম্পানি কর্তৃক ব্যবহৃত হতে পারবে আপনার অজান্তে। এর আইনি বৈধতাও আপনি দিয়েছেন ‘আই এগ্রি’ লেখা কোনার ছোট্ট বক্সটাতে ক্লিক করে।
অন্য দিকে ব্যাপারগুলো এতই সূক্ষ্ম যে সাধারণত কেউ এর দিকে খেয়াল করেন না নিতান্ত দক্ষ লোক ছাড়া।
আজকের আয়োজনে এ নিয়ে থাকছে কিভাবে আপনি নিজেকে এই ঝুঁকির মধ্যে নিরাপদ রাখতে পারেন সে বিষয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা। ধৈর্য নিয়ে পড়লে তা আপনার নিজের ও পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। কথায় আছে ‘সাবধানের মার নেই।’

গুগল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বহুজাতিক ইন্টারনেট এবং সফটওয়্যার কোম্পানি এবং বিশেষভাবে তাদের গুগল সার্চ ইঞ্জিন, অনলাইন বিজ্ঞাপন সেবা এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের জন্য বিশ্বখ্যাত। শুধুমাত্র সার্চ ইঞ্জিনই নয়। কোম্পানিটি অনলাইন সেবা যেমন জিমেইল-ইমেইল সেবা, গুগল ডকস-অফিস সুইট ইত্যাদি-সামাজিক নেটওয়ার্কিং সেবা প্রভৃতি প্রদান করে থাকে। গুগলের পণ্য ইন্টারনেট ছাড়াও ডেস্কটপেও ব্যবহার হয় যেমন গুগল ক্রোম ওয়েব ব্রাউজার, পিকাসা-ছবি সংগঠিত এবং সম্পাদনা করার সফটওয়্যার এবং গুগল টক-ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন প্রভৃতি। গুগল সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন ডেটা সেন্টারে প্রায় এক মিলিয়ন সার্ভার চালায় ও এক বিলিয়নের ওপর সার্চের অনুরোধ এবং প্রায় ২৪ পেটাবাইট ব্যবহারকারী কর্তৃক তৈরি ড্যাটা প্রক্রিয়াকরণ করে প্রতিদিন। গুগল এত বেশি সেবা এবং গুণগত মান দিন দিন বাড়াচ্ছে যে তা নিয়ে সহজে দু-চারটা পিএইচডি করাই যায়! বর্তমানে গুগল যেহেতু সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং এর জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়েই চলেছে তাই এর ব্যবহারিক নিরাপত্তাজনিত কিছু বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা।

পাসওয়ার্ড নিরাপদ করুন
পাসওয়ার্ড হলো সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার প্রথম ধাপ। আপনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের জন্য ভিন্ন শক্তিশালী পাসওয়ার্ড বাছাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিয়মিত আপনার পাসওয়ার্ড আপডেট করা ভালো। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি এবং নিরাপদ করতে এই টিপস অনুসরণ করুন।
আপনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে যেমন ইমেল এবং অনলাইন ব্যাঙ্কিংয়ের জন্য একটি অনন্য পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
আপনার প্রতিটি অনলাইন অ্যাকাউন্টের জন্য একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হলো, আপনার বাড়ি, গাড়ি এবং অফিসের জন্য একই লক ব্যবহার করার মতো-যদি একজন অপরাধী একটিতে অ্যাক্সেস করতে পারে, তাহলে সবগুলোতে করতে পারবে। তাই আপনার ইমেল অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জন্য আপনি যে পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন, তা একটি অনলাইন নিউজলেটারের জন্য ব্যবহার করবেন না। এটি কম সুবিধাজনক হলেও, একাধিক পাসওয়ার্ডের ব্যবহার আপনাকে নিরাপদ রাখে। আপনার পাসওয়ার্ড একটি গোপন স্থানে রাখুন যাতে সহজে দৃশ্যমান না হয়।
নম্বর অক্ষর এবং প্রতীক দিয়ে গঠিত একটি লম্বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন আপনার লম্বা পাসওয়ার্ড যা অনুমান করা কঠিন। তাই আপনার তথ্য নিরাপদ করার সাহায্য করতে আপনার পাসওয়ার্ড লম্বা করুন। যেমন আগে পরে #@%$ ইত্যাদি। ‘১২৩৪৫৬’ অথবা ‘পাসওয়ার্ড’ ব্যবহার করবেন না এবং সার্বজনীনভাবে উপলব্ধি করা তথ্য যেমন, আপনার ফোন নম্বর, আপনার পাসওয়ার্ডে ব্যবহার করবেন না।
আপনার পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার বিকল্প স্থাপন করুন এবং সেগুলি আপ-টু-ডেট রাখুন।
যদি আপনি আপনার পাসওয়ার্ড ভুলে যান অথবা আটকে যান, তাহলে আপনার অ্যাকাউন্টে ফিরে যেতে আপনার একটি উপায় প্রয়োজন। যদি আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার প্রয়োজন হয়, তাহলে অনেক সার্ভিস আপনাকে একটি পুনরুদ্ধার ই-মেইল ঠিকানায় একটি মেইল পাঠাবে। সুতরাং আপনার পুনরুদ্ধার ই-মেইল ঠিকানা আপ-টু-ডেট রয়েছে এবং অ্যাকাউন্টটি এখনও অ্যাক্সেস করতে পারেন কি না তা নিশ্চিত করুন।
এ ছাড়াও কখনো কখনো পাঠ্য মেসেজ মারফত আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার জন্য একটি কোড পেতে, আপনার প্রোফাইলে একটি ফোন নম্বর দিতে পারেন, যা অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখতে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

২. পরিচয় হরণ ঠেকান
সাধারণ চোরদের মতো সাইবার অপরাধীদেরও ব্যক্তিগত তথ্য এবং অর্থ চুরি করার বিভিন্ন উপায় আছে। যেমন আপনি একজন অপরাধীকে আপনার বাড়ির চাবি দেন না, সেই রকমই অনলাইন পরিচয় হরণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করুন। অপরাধীদের প্রয়োগ করা প্রচলিত কৌশলগুলো জানুন যা অনলাইন পরিচয় হরণ থেকে আপনাকে সুরক্ষিত করার জন্য সাহায্য করে। এখানে কিছু সহজ টিপস দেয়া হলো।
যদি আপনি একটি সন্দেহজনক ই-মেইল, মেসেজ অথবা আপনার ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য জানতে চায় এমন ওয়েব পৃষ্ঠা দেখেন তাহলে সাড়া দেবেন না।
আপনার যে ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চায় তারা সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয় জানতে চায় :
# ব্যবহারকারী নাম
# পাসওয়ার্ড
# ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর
# চওঘ (ব্যক্তিগত সনাক্তকারী নাম্বার)
# সম্পূর্ণ ক্রেডিট কার্ডের নম্বর
# জন্ম তারিখ। ইত্যাদি।
ঐ মেসেজ থেকে লিঙ্ক করা থাকতে পারে এমন কোন ফর্ম অথবা সাইন-ইন স্ক্রিন পূরণ করবেন না। যদি সন্দেহজনক কেউ আপনাকে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে একটি ফর্ম পূরণ করতে বলে তাহলে প্রলুব্ধ হয়ে ফর্ম পূরণ করতে শুরু করবেন না। এমনকি ‘সাবমিট’ বাটনটিও ক্লিক না করেও, যদি আপনি তাদের ফর্মগুলিতে আপনার তথ্য দেয়া শুরু করে দেন, তাহলে হতেও পারে আপনি এখনও অপরাধীদের কাছে আপনার তথ্য পাঠাচ্ছেন।
যদি আপনি আপনার পরিচিত কারো কাছ থেকে একটি মেসেজ পেয়ে থাকেন, কিন্তু সেটি তাদের মত লাগছে না। হয়ত আপনার অর্থ এবং তথ্য পেতে চেষ্টা করছে এমন একজন সাইবার অপরাধী দ্বারা তাদের অ্যাকাউন্ট আপস করা হয়েছে-কিভাবে আপনি সাড়া দেবেন তা নিয়ে সতর্ক থাকুন। তাদেরকে এক্ষুনি অর্থ পাঠাতে বলা, অন্য দেশে আটকে পড়েছে বলে দাবি করা অথবা তাদের ফোন হারিয়ে গেছে বলে কল করতে পারছে না, যা প্রচলিত কৌশলগুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও বার্তাটি আপনাকে ছবি, প্রবন্ধ অথবা ভিডিও দেখতে একটি লিঙ্কে ক্লিক করতে বলতে পারে যা আসলে একটি ওয়েবসাইট যা আপনার তথ্য চুরি করতে পারে-তাই ক্লিক করার আগে এসব একটু ভাবুন!
যদি একটি ই-মেইল অথবা চ্যাট যা আপনি বিশ্বাস করেন না সেখান থেকে একটি লিঙ্কের মাধ্যমে একটি সাইটে পৌঁছেছেন তাহলে কখনই আপনার পাসওয়ার্ড লিখবেন না।
বৈধ সাইট এবং সার্ভিস ই- মেলের মাধ্যমে তাদেরকে আপনার পাসওয়ার্ডগুলো পাঠাতে বলে না। তাই যদি অনলাইনে কোন সাইট আপনাকে আপনার পাসওয়ার্ডগুলোর জন্য অনুরোধ করে তাহলে সাড়া দেবেন না।

৩. স্প্যাম এড়িয়ে চলুন
প্রায়ই দেখা যায় আপনা ই-মেইলে, ফেসবুকে বা ফোনে আপনি লটারি বা কোনো লোভনীয় বিষয়ে নির্বাচিত হয়েছেন বলে মেসেজ আসে। বাস্তবে আপনি এ ধরনের কোন বিষয় জানেনই না বা এ ধরনের কোন কাজই করেননি। যা আজ কাল প্রায়ই হচ্ছে। এ ধরনের বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে যাবেন। এদের এড়াতে এবং ওয়েবে নিরাপদ থাকতে কিছু সহজ উপায় :
অচেনাদের থেকে উপহার নেয়া বিষয়ে সতর্ক থাকা : যদি একটি মেসেজ আপনাকে একটি ওয়েবসাইটে দশ লক্ষতম পরিদর্শক হিসেবে অভিনন্দন করছে, একটি ট্যাবলেট অফার করে বা একটি সমীক্ষা সম্পূর্ণ করার পরিবর্তে অন্য পুরস্কার বা তাড়াতাড়ি এবং সহজ উপায়ে অর্থ বা একটি চাকরি পাওয়ার প্রচার (‘আপনার বাড়ি থেকে দিনে মাত্র দুই ঘণ্টা করে কাজ করে ধনী হোন!’) করে তাহলে এর উদ্দেশ্য খারাপ। যদি আপনাকে কেউ বলে যে আপনি জয়ী এবং আপনার ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে একটি ফর্ম পূরণ করতে বলে তাহলে প্রলুব্ধ হয়ে কখনই তা পূরণ করতে শুরু করবেন না।
ধরুন আপনি স্থানীয় স্টোরে কম মূল্যের কেনাকেটা করেন, সেইরকম যখন অনলাইনে শপিং করেন, তখন বিক্রেতাদের সম্পর্কে যাচাই করুন এবং সন্দেহজনক কমমূল্য থেকে সতর্ক থাকুন স্বাভাবিকটা যেমন করেন। অনলাইন ডিলগুলো খুঁটিয়ে দেখুন যেগুলি ভালো হতেও পারে। সাধারণত ছাড় দেয়া হয় না এমন দামি পণ্য বা সার্ভিস বিনামূল্যে বা ৯০% ছাড়ে কেউ দিতে প্রতিশ্রুতি দিলে ভাববেন নিশ্চয় তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য আছে।

৪. ডিভাইস সাফ রাখুন
আপনার ডিভাইস কি স্বাভাবিকের থেকে ধীরগতিতে চলছে? স্ক্রিনগুলো বারবার আসতে পারে কি? আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কি এটিতে অজানা মূল্য চার্জ করে? যদি আপনার ডিভাইসটি ম্যালওয়ার অথবা নেটওয়ার্কের ক্ষতি করতে ডিজাইন করা ক্ষতিকারক সফ্টওয়্যার দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে এগুলি হলো তার কিছু লক্ষণ।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখার উপায় : আপনার ব্রাউজার এবং অপারেটিং সিস্টেম আপ টু-ডেট রাখুন। সঙ্গীত, চলচ্চিত্রগুলি, ফাইলগুলি, ব্রাউজার প্লাগ-ইনস অথবা অ্যাডসহ আপনি কি ক্লিক এবং ডাউনলোড করছেন তার ওপর নজর রাখুন।
পপ-আপ উইন্ডোগুলি থেকে সতর্ক থাকুন যা আপনাকে সফ্টওয়্যার ডাউনলোড বা আপনার কম্পিউটার ঠিক করতে অফার করে। প্রায়ই এই পপ আপগুলি দাবি করে যে, আপনার কম্পিউটার আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের ডাউনলোড এগুলিকে ঠিক করে দিতে পারে এগুলো বিশ্বাস করবেন না। উইন্ডোটি বন্ধ করুন এবং আপনি পপ-আপ উইন্ডোর মধ্যে ক্লিক করেন না তা নিশ্চিত করুন। অজানা ফাইল বা যদি একটি ফাইল খুলতে আপনি অপরিচিত ব্রাউজার নির্দেশ বা সতর্কবার্তাগুলো দেখতে পান তাহলে তা খুলবেন না। কখনো কখনো আপনি যে পৃষ্ঠাটিতে রয়েছেন সেখান থেকে বেরোতে ম্যালওয়ার আপনাকে বাধা দেয়, উদাহরণস্বরূপ বারবার একটি ডাউনলোড নির্দেশ খোলা। যদি এইরকম হয় তাহলে আপনার ব্রাউজার বন্ধ করতে আপনার কম্পিউটারের মেইন বাটন ব্যবহার করুন।
যখন আপনি একটি সফটওয়্যার ইনস্টল করতে চান, তখন নিশ্চিত হন যে সফটওয়্যারটি একটি নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে পেয়েছেন।

৫. সাইন ইন এবং সাইন আউট হচ্ছেন?
এড়ড়মষব অ্যাকাউন্টে সাইন-ইন করা সহজ-এসধরষ পরীক্ষা করতে, ণড়ঁঞঁনব এ একটি ভিডিও আপলোড করতে অথবা আরো অনেক প্রাসঙ্গিক অনুসন্ধান ফলাফলগুলি পেতে যেকোন এড়ড়মষব এর সার্ভিস ওপরের ডান দিকের কোনায় অবস্থিত সাইন-ইন বোতামটিতে ক্লিক করুন।
কিন্তু যখন একটি সাইবার ক্যাফ অথবা লাইব্রেরির সর্বজনীন কম্পিউটার ব্যবহার করছেন, তখন মনে রাখবেন যে আপনার ব্যবহার করা যেকোনো সার্ভিসগুলোতে আপনি তখনও সাইন-ইন হয়ে থাকতে পারেন এমনকি ব্রাউজার বন্ধ করার পরও। তাই যখন কমন কম্পিউটার ব্যবহার করছেন, তখন উপরের ডান কোণটিতে অবস্থিত আপনার অ্যাকাউন্ট ফোটো অথবা ইমেল ঠিকানায় ক্লিক এবং সাইন আউট টিপে সাইন আউট নিশ্চিত হন।

৬. স্ক্রিন অথবা ডিভাইস লক করুন
মনে করুন আপনি আপনার বাড়ির বাইরে বের হলেন কিন্তু আপনার বাড়ির দরজা খোলা রাখলেন। ব্যাপারটা কেমন দেখায়? ঠিক তেমনিভাবে আপনি যে ডিভাইসগুলো ব্যবহার করেন সেটাতে ব্যবহার শেষে বন্ধ না করলে একই কাজ হলো। এই কম্পিউটার, ল্যাপটপ অথবা ফোন ব্যবহার করা শেষ হলে আপনার সর্বদা স্ক্রিন লক করা উচিত। এ ছাড়াও নিরাপত্তাযুক্ত করার জন্য ডিভাইসটি স্লিপে চলে যায় তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হওয়া অপশন সর্বদা সেট করা উচিত। ফোন এবং ট্যাবলেটগুলোর জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেগুলি অনেক সময় সাধারণের নাগালে রাখা হয়।

৭. Gmail সেটিংস পরীক্ষা করুন
যদি Gmail ব্যবহার করেন তাহলে আপনার অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখা নিশ্চিত করতে আপনি এই পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন। আপনার না চাওয়া পর্যন্ত ইমেল ফরোয়ার্ড অথবা শেয়ার করা হয় না তা নিশ্চিত করুন। ফরোয়ার্ড করার জন্য ‘মেইল সেটিংস’ ট্যাবটি পরীক্ষা করুন এবং ডেলিগেশন সেটিংস যা আপনার ই-মেইল সঠিকভাবে নির্দেশিত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
যদি আপনি আপনার পাসওয়ার্ড ভুলে যান, তাহলে অ্যাকাউন্টে ফিরে যেতে একটি উপায় দরকার। যদি আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার প্রয়োজন হয়, তাহলে Google পুনরুদ্ধারের ই-মেইল ঠিকানাটিতে একটি ই-মেইল পাঠাতে পারে। সুতরাং আপনার পুনরুদ্ধার ই-মেইল ঠিকানাটি আপ-টু-ডেট এবং আপনি অ্যাক্সেস করতে পারেন তা নিশ্চিত করুন। এ ছাড়াও পাঠ্য মেসেজ মারফত আপনার পাসওয়ার্ড পুনরায় সেট করার জন্য একটি কোড পেতে Gmail প্রোফাইলে একটি ফোন নম্বর অ্যাড করতে পারেন।

৮. নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করুন
যখন আপনার অজানা বা নিভর্রযোগ্য নয় এমন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে অনলাইনে যান-যেমন আপনার স্থানীয় ক্যাফেতে বিনামূল্যের ডর-ঋর ব্যবহার করছেন তখন অতিরিক্ত সাবধান হওয়া ভালো। সার্ভিস প্রদানকারী তাদের নেটওয়ার্কে নজর রাখতে পারে যা আপনার ব্যক্তিগত তথ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

৯. একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা
এখন অনেক ডিভাইস একাধিক অনলাইন অ্যাকাউন্ট সমর্থন করে। এর মানে হলো কোন অ্যাকাউন্ট এবং কখন ব্যবহার করবেন তা আপনার নিয়ন্ত্রণে। এবং যদি আপনি একই ডিভাইসে একাধিক Google অ্যাকাউন্টে সাইন-ইন থাকেন, তাহলে যতক্ষণ আপনি অ্যাকাউন্টগুলোকে একসঙ্গে লিংক করার সিদ্ধান্ত না নেন ততক্ষণ ব্যক্তিগত তথ্য আপনার একটি Google অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য যেকোন Google অ্যাকাউন্টের সাথে লিংক আপ হয় না।
১০. Google এর সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা সেবা সম্বন্ধে জানুন
Google এ আপনার কাছে বিভিন্ন রকমের সেবা থাকে যা আপনাকে এবং আপনার তথ্য গোপন এবং নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে। Google জনপ্রিয় অনেক সেবা রয়েছে।
সুরক্ষিত এবং ব্যক্তিগত থাকুন : পদক্ষেপ যাচাইকরণের মাধ্যমে যখন আপনি সাইন ইন করেন তখন আপনার ব্যবহারকারীর নাম এবং পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি আপনার ফোনের অ্যাক্সেসের প্রয়োজন হয়। এর মানে হলো যদি কেউ আপনার পাসওয়ার্ড চুরি বা অনুমান করে সম্ভাব্য আক্রমণকারী আপনার অ্যাকাউন্টে সাইন ইন করতে পারবে না কারণ তার কাছে আপনার ফোন/সিম নেই।
Google অ্যাকাউন্ট সেটিংস : আপনার অ্যাকাউন্ট সেটিংসের পৃষ্ঠায় আপনি আপনার Google অ্যাকাউন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট সার্ভিসেরও তথ্য দেখতে পাবেন এবং আপনার সুরক্ষা ও গোপনীয়তার সেটিংস পরিবর্তন ও আপডেট করতে পারেন।
Google ড্যাশবোর্ড : Google ড্যাশবোর্ড আপনাকে আপনার Google অ্যাকাউন্টে কি সঞ্চিত আছে তা দেখায়। একটি কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে আপনি সহজেই সার্ভিসগুলো যেমন ব্লগার, ক্যালেন্ডার, Gmail, Google+ এবং আরো অনেক কিছুর জন্য আপনার সেটিংস দেখতে এবং আপডেট করতে পারেন।
বিশেষ করে আমাদের দেশের অধিকাংশ ইউজারের ধারণাই নেই যে তাদের ফোনের সবকিছু কিভাবে অন্য কোথায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোড হয়। কেবল আইফোন না, এন্ড্রয়েডের ছবি গুগলের ওয়েব অ্যালবামে চলে যায়। (ডিজেবল না করা হলে)।
খেয়াল রাখবেন, আজকের এই ক্লাউডের যুগে আপনার তথ্য আর এক জায়গায় থাকে না। কাজেই ফোনে তোলা ছবি, তথ্য, ভিডিও আপনার অজান্তেই অন্যত্র ব্যাকআপ হতে পারে। সতর্ক থাকতে হলে এবং একান্ত ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি এসব কিছু এমন জায়গাতে রাখুন, যেটার সাথে ইন্টারনেটের সংযোগ নাই। যেমন ক্যামেরা ব্যবহার করার পরে তা ক্যাবল দিয়ে হার্ড ড্রাইভে রাখুন যেখানে ইন্টারনেট অ্যাক্সেস নেই।
সিকিউরিটি বা কম্পিউটার নিরাপত্তা একটা মানবীয় সমস্যা। মানে এটা সাম্প্রতিক কালের কারিগরি সমস্যা না। সিকিউরিটির নানা সমস্যা মানব সভ্যতার মতোই সুপ্রাচীন। তাই সতর্ক হন। ব্যক্তিগত তথ্য কোথায় রাখছেন খেয়াল রাখুন। আপনি ভিআইপি নাও হতে পারেন, কিন্তু প্রাইভেসি রক্ষার অধিকার সবারই আছে।

তথ্যসূত্র :
1. Jefferson, Michael. Criminal Law. Eighth Edition. Pearson Education.2007.
2. Google.com
3. Techtuens.com
4. bn.earningfair.com
5. learn.banglahero.com

SHARE

Leave a Reply