অনুপ্রেরণার উৎস । সালাহউদ্দিন আইউবী

যারা আমাদের জীবনে উন্নতির পরশ এনে দেয় তাদের মধ্যে মা-বাবা শিক্ষক ও সমাজের নেতৃত্বই প্রধানতম। জীবনের পদে পদে অনুপ্রেরণার সন্ধানে আমরা খুঁজে বেড়াই অনেক মনীষীকে। আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পিতা-মাতা এবং শিক্ষকরা শুনিয়েছেন অনেক মহা মনীষীর বাণী।


অনুপ্রেরণার উৎসপ্রেরণা বা প্রেষণা হলো একটি মানসিক চালিকাশক্তি যার কারণে মানুষ একটি উদ্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে মানুষ ধাপে ধাপে উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতার পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের উন্নতির মাধ্যমে। সে কাজ নিজের কল্যাণের তা অন্যেরও কল্যাণের। সে জন্য অতীত থেকে শিখছে বর্তমানেরা। শিশুকাল থেকেই মানুষ এক সময় মায়ের কোল ছেড়ে হামাগুড়ি দেয় ধীরে ধীরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটতে শিখে তারপর আস্তে আস্তে কথাও বলতে শেখে, সবকিছুই প্রিয়জনদের উৎসাহ-উদ্দীপনায়। সে রকম মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে উন্নতির পেছনে কারো না কারো অনুপ্রেরণা জীবন তাকে আলোকিত করে। যারা অন্যের কাজের অনুপ্রেরণা জোগায় আবার তাদের জীবনে কেউ না কেউ অনুপ্রেরক হয়ে কাজ করে এটাই জীবনের ফর্মুলা। জীবন চলার পথে অনুপ্রেরণা এক অদ্বিতীয় সম্পদ। বিশ্বায়ন ও শহরায়নের কঠিন জীবনে কেউ হচ্ছে জয়ী আর কাউকে হতে হচ্ছে পরাজিত। জয়ীরা এই জীবনে মানিয়ে নিলেও পরাজিতরা ভেঙে পড়েন চরম হতাশায়। অকারণে নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করেন। ফলে এক সময় চরম হীনম্মন্যতায় ভোগে, আত্মবিশ্বাস এসে দাঁড়ায় শূন্যের কোটায়। আধুনিক জীবনে সুস্থ বিনোদনের অভাব, পারিবারিক ভাঙন, অর্থনৈতিক দৈন্যতা, বেকারত্ব, মহান প্রভুর প্রতি অগাধ বিশ্বাসের অভাব মানুষের মাঝে তৈরি করে দিচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক একাকিত্ব। ফলে দিন দিন জীবনের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারানো এই মানুষগুলো হয়ে পড়েছেন মানসিক রোগগ্রস্ত। এই রোগ ধীরে ধীরে দখল করে নিতে থাকে মানুষের পুরো শরীর। রোগগ্রস্ত এ জাতিকে অনিবার্য এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে প্রয়োজন যথাযথ উৎসের অনুপ্রেরণা। একটু অনুপ্রেরণা মানুষের জীবনে পথচলার শক্তি জোগায়, বার্ধক্য রোধ করে জীবনের উন্নতি ঘটায়।
যারা আমাদের জীবনে উন্নতির পরশ এনে দেয় তাদের মধ্যে মা-বাবা শিক্ষক ও সমাজের নেতৃত্বই প্রধানতম। জীবনের পদে পদে অনুপ্রেরণার সন্ধানে আমরা খুঁজে বেড়াই অনেক মনীষীকে। আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পিতা-মাতা এবং শিক্ষকরা শুনিয়েছেন অনেক মহা মনীষীর বাণী। কালীপ্রসন্ন ঘোষের ‘পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার; পাঁচজনে পারে যাহা তুমিও পারিবে তাহা, পারো কি না পারো কর যতন আবার, একবার না পারিলে দেখ শতবার’ এক সুপরিচিত উক্তি। জীবনের প্রয়োজনে কতবার যে উক্তির চর্চা করেছি তার কোনো অন্ত নেই। অনুপ্রেরণার খুঁজে আমরা আল্লামা ইকবাল, মেরিলিন মনরো, আব্রাহাম লিংকন, মাদার তেরেসা, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, উইনস্টন চার্চিল, বিল গেটস, মোহাম্মদ আলী, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীসহ অনেকের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করি।
সময়ের প্রয়োজনে হাজারো ব্যক্তি উপনীত হয়েছেন প্রেরণা বিতরণকারী হিসেবে। একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ববিখ্যাত স্টিভ জবস থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার আইকন আয়মান সাদিকসহ অনেকেই আজ অনুপ্রেরণা বিতরণের ফেরিওয়ালা। নতুন প্রজন্ম উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায়, স্বপ্নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আশায় শত ব্যস্ততার মাঝেও অনুসরণ অনুকরণ করার চেষ্টা করছে এই ফেরিওয়ালাদের। কখনোবা তাদের একটি বক্তব্য, বাস্তব জীবনের উদাহরণ হাজারো তরুণকে অনুপ্রাণিত করছে। অভিভাবক বা শিক্ষকসমাজও নিজের পরিবর্তে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফল ব্যক্তিদেরকেই তরুণ সমাজের কাছে উপস্থাপন করছে অনুপ্রেরণার মডেল হিসেবে। হতাশাগ্রস্ত, জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান এ তরুণ সমাজ জীবনের গ্লানি মুছে দিতে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছে কল্পনার রাজ্যে। কল্পনা এ সাম্রাজ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে কখনো বা পড়ছে শিব খেরার ‘ইউ ক্যান উইন’, নেপোলিয়ন হিলের ‘রোড টু সাকসেস’, দীপক চোপরার ‘দি সেভেন স্পিরিচুয়াল লস অফ সাকসেস’ সহ নানা বই। কোন কিছুই যেন মনের তৃষ্ণা মেটাতে পারছে না। হন্যে হয়ে ঘুরেও আবার ব্যর্থ মনে ফিরতে হচ্ছে দুনিয়ার এই চাকচিক্যময় অনুপ্রেরণার উৎসগুলো থেকে। সাময়িকভাবে অনেকেই এসব উৎস থেকে কিছুটা রসদ পেলেও দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উৎস হিসেবে কিছুই যেন পর্যাপ্ত নয়। এসকল উৎসকে ছাড়িয়ে আমাদেরকে আহরণ করতে হবে মূল উৎস থেকে। পেতে হবে খাঁটি প্রকৃত নির্ঝঞ্ঝাট এক অদ্বিতীয় অনুপ্রেরণাস্থল। যিনি এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন পৃথিবীর মানুষকে পথ দেখানোর জন্য যুগে যুগে তিনিই অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে পাঠিয়েছেন কিছু মহামানব। যারা সূর্যের মতই মানুষ ও পৃথিবীকে জ্যোতি প্রদান করে এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলো দ্বারা বিশ্বকে আলোকিত করেছিলেন। চন্দ্রের মত যারা আলোর উৎস হতে অনুপ্রেরণা ও ঐশীবাণী আহরণ করে অন্ধকারাচ্ছন্নদের মধ্যে তা বিতরণ করেছেন। দিনের মতো উজ্জ্বল হয়ে তাঁরা অপরকে সত্য ও ন্যায়ের পথ প্রদর্শন করেছিলেন। রাত্রির মতো যারা অন্যের দোষ ঢেকে রেখে অন্যের বোঝা লাঘব করতেন এবং ক্লান্ত শ্রান্তদের শান্তি নিবেদন করেছেন। আকাশের মত দুঃখক্লিষ্ট মানুষকে আশ্রয় দিতেন এবং শান্তির বারিধারা বর্ষণ করে প্রাণহীন পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে তুলেছিলেন। মাটির পৃথিবীর মতো বিনয় ও নম্রতার সহিত তাঁরা মানবহিতৈষী খাতিরে নিজে সকলের পদতলে পিষ্ট হতেও কুণ্ঠিত হতেন না। তাহাদের পবিত্র, সত্য ও জ্ঞানের ধারা হতে বহুবিধ ও বৃক্ষ জন্মায়, যাহার ছায়া ও ফল-ফলাদি বিশ্বকে আপ্যায়িত করেছিল। সেই মহামানবদের সম্রাট, সেরাদের সেরা, অদ্বিতীয় অনুপ্রেরণার উৎস হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নির্ভুল পরিপূর্ণ প্রশ্নমুক্ত এবং পরিতৃপ্ত হওয়ার মতো কোনো অনুপ্রেরণার পেতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই সেই মহামানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। জীবন চলার প্রতিটি কাজ, কথা ও শিক্ষায় অনুপ্রেরণার প্রধানতম উৎস হবে প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অনুপ্রেরণার উৎসআমরা যদি ধরে নেই বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম সেরা সফল ব্যক্তি স্টিভ জবসের কথা, যিনি অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা। নিজের ঘুণেধরা সত্তাকে জাগিয়ে তুলতে একটুখানি অনুপ্রেরণা পেতে অনেকেই ঢু মারি স্টিভ জবসের অনেক কথা এবং কাজে। সেই স্টিভ জবসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- আমরা আপনার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই, কিন্তু আপনার অনুপ্রেরণার উৎস কী? কিসে আপনাকে জীবনে এত সফল করে তুলেছে?
আমেরিকার স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে দেয়া এক ভাষণে জবস বলেন, ‘আমি যে খুব দ্রুত মারা যাবো এমন একটি বোধ আমাকে তাড়া করত। এটাই সবচেয়ে গুরুতপূর্ণ শক্তি, যার মাধ্যমে জীবনের বড় বড় অর্জনগুলো করায়ত্ত করতে পেরেছি। মৃত্যু ভয়ের সামনে বাকি সব কিছু যেমন কাছের মানুষদের প্রত্যাশা অপমান এবং ব্যর্থতার ভয় সবকিছুই তুচ্ছ হয়ে পড়ে।’
তিনি আরো বলেন, গত তেত্রিশ বছর ধরে প্রতিটা সকালে আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি এবং নিজেকে প্রশ্ন করেছি আজকের দিনটাই যদি আমার জীবনের শেষ দিন হয় তাহলে আজ আমার যা যা করার কথা সেটা কি আমি করব? যদি উত্তরটা হতো ‘না’ বোধক তাহলে আমি বুঝতে পারতাম, আজকের দিনের কাজে তালিকায় পরিবর্তন আনা দরকার।
স্টিভ জবস একবিংশ শতাব্দীতে এসে জীবনের যে বোধ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সফল হয়েছেন জীবনের সেই উপলব্ধির কথা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত চমৎকারভাবে বলে গিয়েছেন।
‘আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় শুভাগমন করলে আবু বকর (রা) ও বিলাল (রা) জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আবু বকর (রা) জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়লে তিনি এ কবিতাংশটি আবৃত্তি করতেন, “প্রত্যেকেই স্বীয় পরিবারের মাঝে দিনাতিপাত করছে, অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতা অপেক্ষা সন্নিকটবর্তী।” সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৮৯
অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চেয়েছেন তোমরা মৃত্যুর ব্যাপারে সচেতন হও মৃত্যু তোমার খুবই নিকটবর্তী। তুলনা করতে গিয়ে তিনি জুতার ফিতার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি অন্য হাদিসে বলেন- আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করার সময় ক্রন্দন করলেন, তাঁর আশপাশের সবাইও ক্রন্দন করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন যে, আমি স্বীয় প্রভুর কাছে আমার মায়ের মাগফিরাতের অনুমতি চাইলাম কিন্তু আমাকে তার অনুমতি দেয়া হয়নি। অতঃপর আমি তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চাইলে তার অনুমতি দেয়া হয়। তাই তোমরা কবর জিয়ারত কর। কেননা, তা তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। সুনানে আন-নাসায়ী, হাদিস নং ২০৩৪
কবর জিয়ারত মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই তিনি বেশি বেশি কবর জিয়ারতের কথা বলেছেন। এই একটি উপলব্ধি স্টিভ জবসের জীবনকে বদলে দিয়েছে, অথচ আমরা প্রিয় নবীর জীবনী থেকে বারবার এই উপলব্ধির কথা শুনেছি, এ কথাগুলো শুনে চোখের অশ্রু ঝরিয়েছি কিন্তু জীবনকে পরিবর্তন করতে পারিনি। অনুপ্রেরণা হিসেবে তার কথাগুলোকে গ্রহণ করতে পারিনি।


আমরা যাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই, যাদেরকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি তাদের বসবাস সাফল্যের একদম চূড়ায়। অর্থ-বিত্তের অভাব তো নেই অভাব নেই যশেরও। পূর্ব থেকে পশ্চিমে গোটা দুনিয়ার সব প্রান্তের সব মানুষই এক নামে চেনে তাদের। প্রতিদিনই লাখো মানুষ নিজেদের জীবনে অনুপ্রেরণা হিসেবে, আইডল হিসেবে অনুসরণ করছে এই মানুষদের। কিন্তু প্রকৃত অর্থে অনুপ্রেরণার মূল উৎস হলো মহামানবদের নেতা, সার্বজনীন আদর্শের প্রতীক, নির্মল চরিত্রের অধিকারী এক সফল ব্যক্তিত্ব প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।


নারী অধিকার আদায়ের পথিকৃৎ হিসেবে আমাদের কাছে অতি পরিচিত মুখ বেগম রোকেয়া। বেগম রোকিয়া নারী অধিকার আদায়ে আমাদের অনুপ্রেরণা। কিন্তু সকল দৃষ্টান্তকে ছাড়িয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা তাঁর একটি যুগান্তকারী বিষয়। যেখানে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে নারীজাতি ছিল শুধু অবহেলা ভোগের সামগ্রী। যেখানে নারীকে কেবল ভোগের সামগ্রীই মনে করা হতো। সেখানে তিনি নারীকে দিয়েছেন এক অভূতপূর্ব সম্মান, সুউচ্চ মর্যাদা। তিনি মায়ের জাত নারীকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।
নারীদের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের নারীর ওপর যেমন অধিকার রয়েছে, নারীরও তোমাদের ওপর সে রকম অধিকার রয়েছে। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৮)। অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘হে মানব সম্প্রদায় আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। (সূরা আল হুজুরাত : ১৩)। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নারীগণ তোমাদের ভূষণ আর তোমরা তাদের ভূষণ। (সূরা আল বাকারা)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের প্রতিটি কাজ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। তাঁর মহানুভবতা আমাদের জন্য এক বড় সম্পদ। তিনি মানুষদের শুধুমাত্র প্রতিদান হিসেবে মহানুভবতা প্রদর্শন করতেন এতটুকুই নয়, বরং তাঁর উদারতা ও মহানুভবতা রূঢ় আচরণকারী, কর্কশ এবং কটু স্বভাবের সকলের প্রতি অবারিত ছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, তায়েফবাসী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে এবং প্রস্তরাঘাতে যখন তাঁর ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছিল তখনকার দৃষ্টান্ত সমধিক প্রণিধানযোগ্য। আহত অবস্থায় তায়েফের পথে ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম আগমন করলেন এবং বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ, আপনার প্রতি লোকদের প্রতিক্রিয়া আপনার প্রতিপালক দেখেছেন, তারা আপনাকে যা বলেছে তাও তিনি সম্যক অবগত, সুতরাং তিনি আমাকে পাহাড় রক্ষাকারী ফেরেশতাদের নিয়ে পাঠিয়েছেন আপনার মতামত জানার জন্য। হে মুহাম্মাদ, আপনি যদি চান, আমাকে আদেশ করুন, আমি তায়েফের দুই পাহাড়কে একত্রিত করে তাদের ধ্বংস করে দেবো।’ প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষতস্থান থেকে তখনও রক্ত ঝরছে এবং তখনও তাঁর জুতা রক্তে রঞ্জিত। তিনি বললেন, ‘না! বরং, আমি আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি হয়তো তাদের সন্তান-সন্ততিদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে তাদের মুসলিম হওয়ার তাওফিক দিবেন এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করার সুযোগ দিবেন। এমনকি তারা যদি ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে, তবু আমি আল্লাহর নিকট তাদের বংশধরদের মুসলিম হওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি।’ তিনি দোয়া করতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, আমার জাতিকে ক্ষমা করে দিন, কারণ তারা জানে না।’
আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দ শত বছর আগের কথা। যখন পরিবেশ দূষিত ছিল না। বায়ু বিষাক্ত ছিল না। গাছগাছালির অভাব ছিল না। বনজঙ্গল কেটে বসতি বানানোর ঝামেলা ছিল না। ৭০০ কোটি মানুষ ছিল না তাই ফার্নিচার বানানোর জন্য খুব বেশি গাছ কাটার প্রয়োজনও ছিল না। মোটকথা, গাছ নিয়ে কোন সমস্যাই ছিল না। কিন্তু একজন ব্যক্তি সেই সময় গাছ লাগানোর জন্য অনেক অনেক তাগিদ করে গেছেন। তিনি বলেছেন গাছ লাগানো সদকায়ে জারিয়া! সেই গাছ থেকে পশু পাখি কিছু খেলে সদকায়ে জারিয়া!, কেউ ফুল ফল চুরি করলেও সদকায়ে জারিয়া!, এমনকি কেউ সেই গাছের ছায়ায় আরাম করলে বা যেকোনভাবে উপকৃত হলে গাছ লাগানো ব্যক্তির পক্ষ থেকে তা সদকায়ে জারিয়া। শুধু তা-ই না, তিনি বলেছেন পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার মুহূর্তেও যদি তোমাদের কারও হাতে চারা গাছ থাকে আর সে যদি তা লাগাতে সক্ষম হয় তবে যেন তা লাগিয়ে দেয়। তিনি আরো বলেছেন যে খামাখা গাছ কেটে ফেলে তার মাথাকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর জাহান্নামের আগুনে ঢুকিয়ে দেবেন।
আপনি কি জানেন সেই মানুষটা কে? তিনি হলেন পৃথিবীবাসীর জন্য রহমত, তিনি বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এই মানুষটি সম্পর্কে যদি কারও জানতে আগ্রহ না হয় তবে তার জন্য আফসোস। এই মানুষটির কর্ম ও কথা থেকে আমরা যদি অনুপ্রেরণা না পাই তাহলে আমরা দুর্ভাগা। বৃক্ষরোপণের জন্য তার কথার চেয়ে আর উত্তম প্রেরণাদায়ক বক্তব্য কি আদৌ কোথাও পাওয়া যাবে? অনুপ্রেরণার উৎসপ্রিয়নবীর হেরাগুহায় একাকী সময় কাটানো আধুনিক সময়ের তরুণদের জন্য এক চমৎকার অনুপ্রেরণার উৎস। মোবাইল ফোন আমাদের মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতাকে গিলে ফেলেছে। গোটা পরিবার এক ছাদের নিচে কিন্তু সবাই যে যার মত মুঠোফোন নিয়ে মশগুল। হেরাগুহার দৃষ্টান্ত থেকে আমরা জানতে পারি রাসূলের যৌবনকালের নির্জন সময় কাটানোর উদাহরণ। কিভাবে তিনি একাকী বা একঘেয়ে না হয়েও নির্জনতা উপভোগ করেছিলেন।
সৃজনশীলতায় অনন্য ছিলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সমাজের সমস্যা নিরসনে তিনি সৃজনশীল সমাধান নিয়ে এসেছিলেন। মক্কার গোত্রপতিরা মিলে ঠিক করলো কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করবে। কিন্তু কাল পাথরটা জায়গা মতো রাখা নিয়ে সবার মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেল। কারণ সবাই এই দুর্লভ সম্মান অর্জন করতে চাচ্ছিলেন। পাথরটি জান্নাত থেকে এসেছে। সেই সময়ের আরবের অনেকেই এটা কেউ পূজা করত। এখান থেকে তাদের তাওয়াফ শুরু করত। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা রাজি হল যে, আগামীকাল প্রথম যে লোক পবিত্র হারামে প্রবেশ করবেন, সে-ই বিচারক হবেন এবং সমস্যা নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করলেন প্রথমে। সে সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিলো ৩৫ বছর। সমস্যা সমাধানের জন্য আরবদের কাছে এই বয়স যথেষ্ট নয়। এর একচেটিয়া দায়িত্বশীল ও গোত্রনেতাদের। তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই সমস্যার দ্রুত সমাধান করলেন। কাল পাথরটাকে একটা কাপড়ের ওপর রাখলেন। এরপর প্রত্যেক গোত্রের একজন প্রতিনিধি কাপড়ের একটা অংশ ধরলেন; মাটি থেকে এক মিটার উঁচুতে। সবাই মিলে কালো পাথরটিকে জায়গায় বসালেন। কনস্টানটিন গোর্গুইয়ের এর মতে- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে চিন্তা করেছেন সেটা তার সৃজনী ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সৃজনশীল ও তাৎক্ষণিক সমাধানের অধিকারী। যে কারণে সৃষ্টিশীল চিন্তার মাধ্যমে জায়গায় দাঁড়িয়েই তিনি সেই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিলেন। এখানেই তাঁর প্রতিভার পরিচয়। যে সৃজনশীলতা ও প্রতিভা সমগ্র বিশ্বের জন্য অদ্বিতীয় অনুপ্রেরণা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমাজজীবন, বন্ধু বাছাই আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হননি, আবার তাতে ডুবেও যাননি বরং তিনি তার আদর্শ বজায় রেখেছেন চলাফেরার জন্য তার মত মানুষ খুঁজে নিয়েছেন। খুব সতর্কতার সাথে তিনি তার বন্ধুদের বাছাই করেছেন। সুশিক্ষিত, শ্রদ্ধাবান লোকদের বন্ধু হয়েছেন। তিনি কখনো মদ পান করেননি। মূর্তিপূজা করেননি। তারপরও তিনি সামাজিক ছিলেন। সমাজে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। আধুনিক বিশ্বের বদলে যাওয়া এই সময়ে ফেসবুক টুইটার আর লিংকডইনের মতো সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোর মাধ্যমে বন্ধু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কতা বন্ধু বাছাই পদ্ধতি আমাদের জন্য হতে পারে এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।
আমরা যাদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই, যাদেরকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি তাদের বসবাস সাফল্যের একদম চূড়ায়। অর্থ-বিত্তের অভাব তো নেই অভাব নেই যশেরও। পূর্ব থেকে পশ্চিমে গোটা দুনিয়ার সব প্রান্তের সব মানুষই এক নামে চেনে তাদের। প্রতিদিনই লাখো মানুষ নিজেদের জীবনে অনুপ্রেরণা হিসেবে, আইডল হিসেবে অনুসরণ করছে এই মানুষদের। কিন্তু প্রকৃত অর্থে অনুপ্রেরণার মূল উৎস হলো মহামানবদের নেতা, সার্বজনীন আদর্শের প্রতীক, নির্মল চরিত্রের অধিকারী এক সফল ব্যক্তিত্ব প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সিরাতের এই মাসে আমাদের জাগতিক অনুপ্রেরণার উৎস থেকে চিন্তার রাজ্যকে পরিবর্তন করে নিবেদিত করা উচিত প্রকৃত অনুপ্রেরণার উৎসের দিকে। প্রতিটি দিন প্রতিটি কাজে মহান এই ব্যক্তির কথা ও কর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পথচলার দৃপ্তশপথ নেয়া সময়ের দাবি। আকুলতা নিয়ে বলতে চাই-
হে মানব সকল, এসো ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মের অনুপ্রেরণা নিয়ে জীবনের উন্নতি ঘটাই, সফলতার পথে এগিয়ে যাই।’
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply