অনূদিত-নজরুল প্রসঙ্গে

মোশাররফ হোসেন খান

যে অর্থে
রবীন্দ্র-অনুবাদ কিছুটা সহজ, সেই অর্থেই নজরুল-অনুবাদ অনেক বেশি কঠিন। এই কাঠিন্য যতটা, তার চেয়েও আমাদের অনুবাদকের অযোগ্যতা ও চিন্তার দীনতা
প্রকট-প্রখর

প্রকৃত অর্থে কবিতার কোনো অনুবাদ হয় না।-
এই মৌল বিষয়টি প্রথমত স্বীকার করে নেয়া ভালো। কবিতার অনুবাদ অর্থ যেটা হয়Ñসেটাকে বড়জোর বলা যেতে পারে কবিতার মূল বা কেন্দ্রীয় ভাবগত অর্থের সাথে অনুবাদকের বোধের সম্পৃক্তির কিছুটা খণ্ডাংশ চিত্র। কবিতার আক্ষরিক অনুবাদের ক্ষেত্রে জটিলতার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেখানে মূল কবিতার ভাবার্থ, যৌক্তিক পরম্পরা, উপমাশোভিত পঙক্তির অনুজ্জ্বলতা এবং সর্বোপরি ঐ কবিতাটির মর্মার্থ, উদ্দেশ্য এবং কেন্দ্রীয় সঞ্চালনÑকোনোটাই আর প্রাণজ থাকতে পারে না। সম্ভবও নয়। এজন্যই আবারও উচ্চারণযোগ্য যে, কবিতার কোনো অনুবাদ হয় না।
তারপরও এত অনুবাদ! কত কবির কবিতাই না অনূদিত হচ্ছে অহর্নিশ। তাহলে সেগুলি কী? এর একটা নাম অন্তত দেয়া যায়, আর সেটা হলোÑকবিতার অনুবাদ কবিতা। তবে এই কষ্টসাধ্য কাজটির জন্যও সমান প্রয়োজন অনুবাদকের চতুর্মুখি দক্ষতার।
নব্বই দশকের প্রথম দিকে ‘পাথরে পারদ জ্বলে’ নামক একটি দীর্ঘ কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করলেন স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এক সাহিত্যরসিক ছাত্র। তার অনুবাদটি আমি মূল কবিতার সাথে সংযুক্ত করে ইংরেজি সাহিত্যের তিনজন পণ্ডিতকে দেখালাম পৃথক ভাবে। তাঁরা নিজেরাও অনুবাদে দক্ষ। কিন্তু অবশেষে আমার হাতে এলো তাদের যে অনুবাদ, সেগুলো দেখে পঞ্চম এক পণ্ডিত বললেন, ইস! আপনার এত সুন্দর কবিতাটিই তো এরা মাটি করে দিয়েছেন! আমি এর সঠিক অনুবাদ করে দেই?
আমি বিস্ময়করভাবে হতবাক। তখন নীরব-নিস্তব্ধতার তড়পানিই কেবল আমার অবলম্বন। আমি সবিনয়ে বললাম, থাক! অনেকদূর হয়েছে, আর দরকার নেই।Ñ
গল্প কথা নয়, সত্যিই তো কবিতার কোনো অনুবাদ চলে না!
নজরুলের একটি উর্দু গজল ও ইংরেজি কবিতার হস্তলিপি অনুবাদ করাতে গিয়ে আমার অভিজ্ঞতা ও এ সংক্রান্ত ধারণা আরও একবার ধাক্কা খেল। থাক সে কথা।
তারপরও থেমে নেই কিন্তু অনুবাদ কর্মটি। বাংলা থেকে ইংরেজিসহ অন্যভাষায় অনুবাদ, ইংরেজিসহ অন্য ভাষার কবিতা বাংলায় অনুবাদ হরহামেশাই করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূল কবিতার কতটুকু লাভ-ক্ষতি হচ্ছে, সেই বিবেচনা পেছনে রেখে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে এক ভাষার কবিকে অন্য ভাষায় পড়া এবং কিঞ্চিৎ জানার সুযোগ। শেষটুকুকে প্রাধান্য দিয়েই মূলত অনুবাদের ক্ষেত্রটি ক্রমঅগ্রসরমান। স্বীকার্য যে, একমাত্র অনুবাদের মাধ্যম ছাড়া আর অন্য কোনো পথই খোলা নেই অন্য ভাষায় প্রবেশের। এজন্য অনুবাদও আমাদের সাহিত্যে শুধু নয়, বিশ্ব সাহিত্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু কয়টি সফল অনুবাদের কথা আমরা মনে করতে পারি? প্রশ্নটি জাগতেই পারে।
বাংলা কবিতা অন্য ভাষায় অনুবাদ প্রক্রিয়াটি আরও বেশি জটিল। জটিল এজন্য যে, বাংলা ভাষা যে পরিমাণ অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ, অলংকার, মিথ, প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক-প্রাকৃতিক ও দেশজ বিচিত্র উপমায় এতটাই শোভিত যে তার অনুবাদ হতে পারেÑএকথা অন্তত আমার বিশ্বাস ও বোধের বাইরে। এজন্য কবিতা নয়, কোনো কোনো কবিকে কিছুটা অনুবাদ করা গেলেও অনেককেই অনুবাদ করা সম্ভব হয় না, অন্তত বাংলাদেশে। কারণ সেই পরিধির যোগ্য ব্যক্তির এখানে অনেক অভাব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে যতোটা সহজে অনুবাদ করা যায়, ততোটা সহজ নন মাইকেলের বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদ। আর নজরুলের ক্ষেত্রে তো বিষয়টি আরও দুরূহ।
এজন্যই বোধকরি নজরুল, ফররুখসহ অনেকেই সেভাবে অনূদিত হতে পারেননি। এখানে অনুবাদকের সীমাবদ্ধতাই অনেক বেশি চোখে পড়ে বৈকি।

দুই.
কবি কাজী নজরুলের কবিতার অনুবাদ বিষয়ে আসি। তাঁর কবিতা অনুবাদে সচ্ছন্দ পান না কেন অনুবাদকগণ? কারণ কি শুধু এটাই যে, তাঁর কোনো কোনো কবিতার আদৌ কোনো অনুবাদ চলে না। সম্ভবত এর সাথে যুক্ত হতে পারে নজরুলের কবিতাই পুরাণ, বেদ, বাইবেল, কুরআনসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের সমাহার এবং এমন উপমা-উৎপ্রেক্ষাÑযারও কোনো অনুবাদ করা সম্ভব নয়। এখানে অনূদিত নজরুলকে কিছুটা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
প্রথমে আসি এক নজরুল অনুবাদক উইনস্টন ই, ল্যাংলির কথায়।
উইনস্টন ই. ল্যাংলি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থিত ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যে বিশ্বরাজনীতি নিরীক্ষণ তাঁর প্রিয় বিষয়। ল্যাংলি ১৯৯৬ সালে নজরুল বিষয়ে আগ্রহী হন এবং গবেষণায় নিবিষ্ট হন। ২০০২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত অষ্টম উত্তর আমেরিকা নজরুল সম্মেলন এবং ২০০৬ সালে কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত নজরুল সিম্পোজিয়ামে তিনি ছিলেন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী। নজরুলকে নিয়ে লেখা তাঁর বই কাজী নজরুল ইসলামÑদ্য অয়েস অব পোয়িট্রি অ্যান্ড দ্য স্ট্রাগল ফর হিউম্যান হোলনেস ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে। এই বইয়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ “নজরুল’স ব্রডার ভিউ অব পোয়েট্রি’স ভয়েস” অধ্যায়ে বলা হয়েছে :
কেউ যদি কবিতার কণ্ঠস্বর বিষয়ে নজরুলের অনুধাবনকে সংজ্ঞায়িত করতে কিংবা বিশদ করে বুঝতে যান, তাহলে তাঁকে নজরুলের নিজস্ব তত্ত্বীয়করণের ওপর নির্ভর না করে ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কোনো বিষয়ে একজনের সচেতন এবং সুস্পষ্ট সংজ্ঞায়ন ছাড়াই কেউ যদি সেই বিষয়ে [এ ক্ষেত্রে কবিতার কণ্ঠস্বর] তার অনুধাবনের সূত্রাবলি হাতে পেতে চায়, সে ক্ষেত্রে একটি কার্য খুঁজে বের করার অবরোহী পদ্ধতি কিংবা অনুমান।
নজরুল ইসলাম থেকে অনুমান কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সৌভাগ্যবশত, দুষ্কর নয়; কারণ তাঁর বৈচিত্র্যময়, সমৃদ্ধ-বিশেষ করে আমাদের আলোচনার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটিতেÑধারাবাহিক উচ্চারণ। শেলির মতো তিনিও বিশ্বাস করেন, কবিতার কণ্ঠস্বরের সাংস্কৃতিক সুরটির উৎস সমাজ-রাজনৈতিক নির্মাণের নিজস্ব নিয়ম, যা সেই সমাজটিকে সংজ্ঞায়িত করে, যে সমাজে কবি জন্মেছেন এবং প্রাথমিক অভিজ্ঞতাসমূহ লাভ করেছেন। শেলির মতো তিনি এটাও বিশ্বাস করেন, কবিতার কণ্ঠস্বরের একটি দৃষ্টিভঙ্গি হলো সৌন্দর্যের বিচিত্র প্রচ্ছায়াকে প্রকাশভঙ্গি দেওয়া যে, বীজ কিংবা শেকড় থেকে সমাজ বিবর্তিত হয়, এবং যার গোপনে সম্পর্কের বিভিন্ন রূপÑপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কওÑজালের মতো ছড়িয়ে পড়ে, এবং যার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় মনুষ্য সংস্কৃতি। মাইকেল ওকেশটের মতো তিনিও মেনে নেন, কবিতার কণ্ঠস্বর ‘আরেকজনকে জাগিয়ে তোলে এবং তার সঙ্গে জড়িত হয়ে একই ধরনের জটিলতার চিত্রকল্পের জন্ম দেয়’Ñযুক্তি উপস্থাপনায় যে কথাটা শেলিও বলেন: কবিতা এমন এক সম্বন্ধের জন্ম দেয় যা ‘কল্পনার পরিধিকে বিস্তৃত করে’; এমন একটা কিছু দিয়ে কল্পনাকে পরিপূর্ণভাবে ভরিয়ে তোলার মাধ্যমে যা সর্বদাই নতুন।
কবিতার কণ্ঠস্বরের যে বৈশিষ্ট্যসহ চিহ্নিত করা গেল, নজরুল নিজেও যদিও তাদের বেশ কিছু ধারণ করেছেন, তার পরও তিনি হয়তো বলবেন যে বৈশিষ্ট্যগুলো কণ্ঠস্বরের ক্রিয়াকর্মকে ঘিরেই বেশি আবর্তিত হয় [যদিও পাঠক আবিষ্কার করবেন, তিনি আরও কিছু ক্রিয়াকর্ম যোগ করেছেন]। তাঁর দৃষ্টিতে, কণ্ঠস্বরটির উৎস, অবয়ব, মর্মবাণী এবং এর নাগাল কিংবা সম্ভাবনার প্রতিই আরও বেশি জোর দেওয়া উচিত। আমরা এই সব কটি বিষয়কেই স্পর্শ করব, তাদের উল্লেখক্রম অনুসারে।
কবির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিপার্শ্বকে তাঁর স্বরগত প্রেরণার একটি উপাদান হিসাবে যদিও গণ্য করা হয়, খুব বেশি করে ভারতীয় গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজান, সেই সঙ্গে পুশকিন ও ইকবালের মতোই নজরুল হয়তো বলবেন তাঁর কবিতার স্বরের উৎসঅতিপ্রাকৃত। তিনি এই উৎস হিসাবে উল্লেখ করেছেন ঈশ্বরকে এবং বারবার নিজেকে একটি বাদ্যযন্ত্র হিসাবে উল্লেখ করেছেন যার মধ্য দিয়ে সুর বেজে চলে, অথবা একটি নদী আমি যার ঢেউ। এই উৎস থেকে কবিতার কণ্ঠস্বর নির্গত হয় এবং বস্তুতে বস্তুতে ও বস্তুসমূহের মধ্যে সত্যিকার সম্পর্ক চিহ্নিত করে আকারহীনকে আকৃতি দেয়, অপ্রকাশ্যকে প্রকাশিত করে।
সত্যের দ্বারা সম্পর্কের মূল্যায়ন নজরুলের চিন্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তলস্তরের মতো তিনি ভাবেন না যে সম্পর্কের এক জটাজালে বস্তুসমূহ এই বোনে সেগুলোকে ভাগ করা চলে না। কবিতার কণ্ঠস্বরের একটি কাজ হলো সবার কাছে সেই সম্পর্কগুলোর প্রকৃত স্বভাবকে স্বচ্ছ করে তোলা এবং প্রচার করা যে সত্য নিজেও এই সম্পর্কসমূহের একটি উৎপাদ। কবিতার কণ্ঠস্বর, অতএব, একটি স্বর, যা সত্যান্বেষী।
নজরুলের মতে, কেবল ইন্দ্রিয়গত নয় যা ইন্দ্রিয় আকর্ষক; ইন্দ্রিয় যদিও প্রচলিত অর্থে অনুধাবনীয়, তথাপি তিনি তাঁর সংজ্ঞায় এই অনুধাবনকে জুড়ে দিয়েছেন। তাই ইন্দ্রিয়ের [স্পর্শ, দর্শন, স্বাদ, শ্রবণ এবং ঘ্রাণ] প্রতি আহ্বানে কবিতার কণ্ঠস্বরের লক্ষ্যবিন্দুর সংজ্ঞা প্রয়োজন। কিন্তু জন কিটস এবং অন্যদের মতো নজরুলও অনুভব করতেন আধ্যাত্মিক ইন্দ্রিয় [যেমন নৈতিক, সৌন্দর্যগত, ধর্মীয়] বলে একটা ব্যাপার আছে, যার আকর্ষণ কবিতার আত্মিক অবয়বের প্রতি। সেই অবয়বটি পাওয়ার সেরা উপায় হলো কিছু অনুভূতির [লুকায়িত গুলোসহ] ভেতর কবিতার কণ্ঠস্বরের আংশিক সংগঠন, যে অনুভূতিগুলোর প্রতি এটি আবেদন জানায় এবং সংগঠন অবশ্যই জীবনের স্পন্দনের ভেতর; সকল জীবনের; জীবন যেমন, অথবা জীবনের যে অভিজ্ঞতা আমরা পেয়ে থাকি। এখন আমরা আলোচনা করব মর্মবাণী নিয়ে।
মর্মবাণী বলতে আমি বুঝি অর্থের সাধারণ প্রবণতা, অভিমুখ, অথবা গতিশীলতা, যা বস্তু থেকে প্রবাহিত হয় অথবা বস্তুতে সহজাত হিসাবে বিদ্যমান থাকে। এবং এ ক্ষেত্রে নজরুলের অবস্থানকে সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্দি করা যাবে সত্তার অবিচ্ছিন্নতার কনফুসিয়াসীয় মতবাদ থেকে। সেই মতবাদ বলে যে অবিচ্চিন্নতা, সমগ্রতা এবং গতিময়তা সকল বস্তুকে চরিত্রায়িত করে। সর্বপ্রকার সত্তা, একটি পাথর থেকে শুরু করে ঈশ্বর পর্যন্ত, অবিচ্ছেদ্যতার অখণ্ড অংশ…। সুতরাং আপাত দৈব সম্বন্ধযুক্ত প্রতিটি বস্তুযুগল এবং যুগলসমূহের মধ্যে যোগসাজশ আছে। তাওবাদীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্যক্তিবিশেষের দেহকে একটি শক্তির অন্তর্জালিকার অংশ বলে থাকে, যে অন্তর্জালটি বৃহত্তর মহাপৃথিবীর সঙ্গে আন্তক্রিয়ায় লিপ্ত।
এভাবে চিহ্নিত,  বিবৃত ও প্রকাশিত করতে গিয়ে কবিতার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে প্রাজ্ঞ আইনপ্রণেতার দপ্তর এবং অবতারের ওহি, শেলি এবং শিলার উভয়ই যে অর্থে এই কণ্ঠস্বরকে বুঝেছিলেন। কবিতার কণ্ঠস্বরের একটি বৈশিষ্ট্য হিসাবে যে অবিচ্ছেদ্যতার কথা এখানে বলা হলো, তাকে কবিতার কণ্ঠস্বরের মর্মবাণীর সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি গুণকে বাতিল করতে দেওয়া উচিত নয়: পুশকিন এবং অস্তিত্ববাদীরা যাকে বলেছেন ধাঁধাগ্রস্ততা।
কবিতার কণ্ঠস্বরের ক্ষেত্রে নজরুল একক প্রবাহ [কনফুসিয়াসীয় ধারণায়] অথবা একক সুরের কথা বলেছেন, নিজের দেহ, মন এবং আত্মার মধ্যে যে ঐকতান তিনি অনুভব করতেন কেবল তাকেই প্রকাশ করার জন্য নয়, বরং দেহ, মন এবং আত্মার সঙ্গে বৃহত্তর মহাবিশ্বের যে সম্পর্কÑতাকেও প্রকাশ করতে। সেই অবিচ্ছেদ্যতা স্ব-প্রমাণিত নয়; এমনকী গভীরতম অনুমান, গবেষণা অথবা
অন্যান্য অনুসন্ধানের পর বারবার যা পাওয়া যায় তা কেবল অস্পষ্টতা, দ্ব্যর্থকতা এবং দূরত্ববোধের অনুভত নয়, বরং অনন্যতা এবং হতভম্ব হওয়ার অকৃত্রিম অনুভূতি। প্রায়ই, প্রকৃত বিজ্ঞানের মানুষদের ক্ষেত্রে, আরও সাধারণভাবে পণ্ডিত এবং অন্য বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও, এটা এই দ্ব্যর্থকতা কিংবা ধাঁধাগ্রস্তকে বিচার কিংবা ব্যাখ্যা করার একটি প্রয়াস, যে দ্ব্যর্থকতা এবং ধাঁধাগ্রস্ততা অবিচ্ছেদ্যতা এবং এমনকি অভিন্ন অস্তিত্বময়তাকে উন্মোচিত করে অথবা তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করিয়ে দেয়। নজরুলের ক্ষেত্রেও, কবিতার কণ্ঠস্বর দূরত্ববোধের এবং অসংগতির অনুভূতিকে প্রকাশ করে, তাঁর ফরিয়াদ নামের কবিতায় যেমনটা দেখা যায়।

তিন.
বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি-অনুবাদক-ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক মুহম্মাদ নূরুল হুদা মনে করেন, কবিতা যে সাধারণত ভিন্ন ভাষায় অনুবাদযোগ্য নয়, কিংবা অনুবাদে যে কবিতার শ্রেষ্ঠাংশ হারিয়ে যায়, সম্প্রতি নজরুলের কবিতার ইংরেজি পাঠ ভিত্তিক মূল্যায়ন পড়ে তা প্রায় ভ্রান্তর প্রতিভাত হতে বসেছে। আমাদের জানা মতে, নজরুলের রচনার আটপৌরে অনুবাদ হয়ে আসছে সেই শুরু থেকেই। বিশ শতকের বিশের দশকের সূচনালগ্নে যখন প্রথাবিরোধী বিষয়, আঙ্গিক ও শৈলীতে তিনি তাঁর কবিতাবলী উপস্থাপন করতে শুরু করলেন, তখন থেকেই তা যুগপৎ পরাধীন স্বদেশীবাসী ও ক্ষমতাসীন বেনিয়া প্রভুর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মুক্তিকামী মানুষের জন্য এ যেন এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা, অপরপক্ষে দু’শ বছর ধরে ক্ষমতাসুখী ব্রিটিশরাজের জন্য এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। নজরুলের প্রতিটি নতুন কবিতা ওদের বুকে শেল হয়ে বিদ্ধ হতে থাকে। একসময়ে নজরুলকে প্রবেশ করতে হয় কারান্তরালেও। আদর্শবাদী রাজনৈতিক নেতা বা আত্মদানেচ্ছু স্বদেশী যুবার মতো নজরুলও তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে এসে পড়েন। এর ফল হলো এই যে, গদ্য হোক পদ্য হোক নজরুলের প্রতিটি রচনার পাঠ তারা পরীক্ষা করতে শুরু করে। আর এর জন্য গোয়েন্দা বিভাগে পেশাদার অনুবাদক নিয়োগ করা হয় দাপ্তরিকভাবে। এরা সবাই মূলত এদেশীয় গোয়েন্দা যাদের মাতৃভাষা বাংলা, কিন্তু যারা ইংরেজিতে দক্ষ। সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব বিচার নয়, বরং সংশ্লিষ্ট রচনার রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ও তার ব্রিটিশ বিরোধিতার স্বরূপ ও পরিমাণ নির্ণয়ই ছিল এই অনুবাদের লক্ষ্য। অনুবাদকরা সহজবোধ্য গদ্যে নজরুলের গদ্যপদ্যের অনুবাদ করতেন প্রায় হুবহু। সাহিত্যের পরিভাষায় এই অনুবাদকে লিটারেল বা আক্ষরিক অনুবাদ বলা যেতে পারে। তবে যে সব অংশে বক্তব্য প্রতীক, রূপক, মিথ বা চিত্রকল্প ইত্যাদিতে আবৃত, সে সব অংশের ব্যাখ্যামূলক অনুবাদও তারা করেছেন বলে জানা যায়। প্রখ্যাত নজরুল গবেষক শিশির করের ‘নিষিদ্ধ নজরুল’ গ্রন্থে এই ধরনের অনুবাদের নমুনা আছে।
প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরুলের রচনার প্রতি ক্ষমতাসীনদের এই যে মনোযোগ ও অনুসন্ধিৎসা, তা বিশ্বের অন্য কোনো কবি লাভ করেছেন কিনা সন্দেহ। দেখা গেছে, গুণাগুণ নয়, বক্তব্যের একরৈখিকতার জন্যেই তার কবিতা প্রভুর কাছে বিশেষ কদর পেয়েছে। নজরুলকে তারা অপছন্দ করেছে, কিন্তু অগ্রাহ্য করতে পারেনি। আরো সহজ করে বললে বলতে হয়, নজরুলের কবিতার এমন একটি প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়াজ্ঞাপক শক্তি আছে, যা সাদাসিধে গদ্যানুবাদেও বিদেশী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। এই শক্তি মূলত বিষয় নির্বাচন ও তার উপস্থাপনায়। নান্দনিক সাহিত্যমূল্যের বাইরেও নজরুলের কবিতার এই অন্তর্নিহিত অর্থময়তাই তাঁর কবিতার অনুবাদযোগ্যতার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি প্রায় শতবর্ষের ব্যবধানেও। তবে এই প্রমাণের পেছনে নেই কোনো বেনিয়াপ্রভুর সিংহাসন রক্ষার কূটকৌশল, বরং আছে খাঁটি নান্দনিক ও সাহিত্যিক অনুসন্ধিৎসা, যা তার কবিতার আধুনিকোত্তর পাঠ-বিবেচনা ও মূল্যায়নে সহায়ক। কাজটি শুরু হয়েছে দেশ ও কালের দূরত্বে দাঁড়ানো একদল মানবতাবাদী ও নিরপেক্ষ শিল্পমনস্ক বিদেশী পণ্ডিতের হাতে। এই মুহূর্তে আমার হাতে আছে তেমনি এক মার্কিনি পণ্ডিতের একখানি পূর্ণগ্রন্থ, যেখানে নজরুলের কবিতার কণ্ঠস্বর ও মানবিক সমগ্রতার প্রতি তার সংগ্রামের বিষয়টি তাত্ত্বিক ও আধুনিকোত্তর সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাসুস্টেসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতিবিদ্যার প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. উইন্সটন ই. ল্যাংলি রচিত এই গ্রন্থের নাম ‘কাজী নজরুল ইসলাম : দি ভয়েস অব পয়েট্রি অ্যাণ্ড দি স্ট্রাগল ফর হিউমেন হোলনেস’। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, অধ্যাপক ল্যাংলি নজরুলের কবিতার মূল বাংলা ভাষ্য পাঠ করেননি; বরং তাঁর রচনার মূল প্রণোদনা প্রথমত নজরুলের গানের সুর ও বাণী, আর পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর রচনার ইংরেজি অনুবাদ যার প্রায় সবটাই বাঙালি অনুবাদকদেরই করা। ড. ল্যাংলি তাঁর রচনার জন্যে সহায়ক ও উৎস গ্রন্থ হিসেবে নির্দেশ করেছেন মূলত দুটি গ্রন্থ : সাজেদ কামাল অনূদিত ও সম্পাদিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম : সিলেক্টেড পয়েমস’ আর মুহম্মদ নূরুল হুদা সম্পাদিত ‘পয়েট্রি অব কাজী নজরুল ইসলাম ইন ইংলিশ ট্রানশ্লেশন’। প্রথম গ্রন্থটি মার্কিন অভিবাসী বাঙালি কবি সাজেদ কামালের একার অনুবাদ। এতে নজরুলের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ভাষণ ইত্যাদির নির্বাচিত অংশের অনুবাদ আছে। আর দ্বিতীয় গ্রন্থটিতে নজরুলের দুই শতাধিক প্রতিনিধিত্বমূলক কবিতার অনুবাদ আছে, যার অনুবাদ করেছেন নজরুলের সমসাময়িক ও তাঁর উত্তরসূরী বাঙালি পণ্ডিত ও অনুবাদকবৃন্দ। এতে একেকটি কবিতার একাধিক অনুবাদও সংযোজিত হয়েছে। নজরুল জন্মশতবর্ষে প্রকাশিত এই সঙ্কলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল নজরুল চর্চায় আন্তর্জাতিক গবেষকদের আকৃষ্ট করা। তাই পাঠবিচেনার স্বার্থে প্রাপ্ত সকল অনুবাদ সঙ্কলন করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, কবি সাজেদ কামাল কিংবা অন্যান্য অনুবাদকবৃন্দ [প্রবীণ অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, আবু রুশদ, মিজানুর রহমান থেকে তরুণতর সুব্রত দাশ পর্যন্ত] বেনিয়াপ্রভুর স্বার্থে নয়, বরং নজরুল প্রতিভার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লক্ষ্যেই তাদের অনুবাদকর্ম সম্পাদন করেছেন। আর এ অনুবাদকে সাধ্যমত নজরুলের মূল রচনার পাঠানুগ করার চেষ্টা আছে। এসব অনুবাদের অধিকাংশই লিটারেল নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যাখ্যামূলক ও মুক্তানুবাদ। কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ব্যতীত কোনো অনুবাদেই মূলের ছন্দ ও আবৃত্তিযোগ্য বাচনিক ভাষ্য অটুট রাখা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। যদি ইংরেজি ভাষার কোনো ক্ষমতাবান কবি এই অনুবাদকর্মের সঙ্গে যুক্ত হতেন এবং একজন বাঙালি অনুবাদকের সঙ্গে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় অনুবাদটি সম্পন্ন করতেন, তাহলে হয়তো এ ধরনের কিছু কাঠামোগত রূপান্তরের নমুনা পাওয়া যেত। আমাদের দুর্ভাগ্য, এখনো তেমন কোনো নমুনা আমাদের সামনে নেই। আর এ কথাও স্বীকার্য যে, কাজটি আসলেই জটিল। ভাবাই প্রায় অসম্ভব যে, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার বাণীভাষ্যের বাইরে কোনো হুবহু সাঙ্গীতিক ভাষ্য অন্য কোনো ভাষায় পুনর্সৃষ্টি সম্ভব। একথা বলা যায় তার যে কোনো কবিতার ভাষা সম্পর্কে, যেখানে তৎসম তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি ধ্বনিদ্যোতনাময় সমপ্রকৃতির আরবি ফারসি শব্দের সহবিন্যাস আছে। আমাদের মতে, নজরুলের ধ্বনিময়তা ও শব্দসঙ্গতি ভিন্নভাষায় হুবহু পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা এক কঠিনতম কর্ম। তাই এ পথে না এগোনোই নিরাপদ। আর এ পথে না এগুলে যে খুব ক্ষতি নেই, তার প্রমাণ একালের ভিন্নভাষী পণ্ডিতদের নজরুল বিচারের নমুনা, যা ইতোপূর্বে আভাসিত হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, নজরুলের কবিতার অনুবাদময়তার দুই প্রধান উপকরণ তার বিষয় ও অলঙ্কারিক ঐশ্বর্য, বিশেষত তাঁর চিত্রকল্প, মিথ, লোকজ্ঞান ইত্যাদির কুশলী ব্যবহার। আরেকটি কারণ, তাঁর কোনো কবিতাই কোনো ব্যাখ্যায় বিষয়বিবর্জিত নয়, কিংবা তা কেবল কলাকৈবল্যবাদী বিমূর্ত শিল্পচর্চায় পর্যবসিত হয়নি। তাঁর কবিতা আবশ্যকীয়ভাবেই তাঁর শ্রুতিকল্পনা ও দৃশ্যকল্পনার যৌগিক ফসল। অনুবাদে শ্রুতিকল্পনার পুনরুদ্ধার দুরূহ হলেও দৃশ্যকল্পনার পুনর্নির্মাণ অপেক্ষাকৃত সুসাধ্য। কেননা তার শ্রুতিকল্পনানির্ভর প্রতিটি উত্তীর্ণ কবিতার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দৃশ্যরূপময় চিত্রশোভিত রূপক-কাঠামো, যার ভাষান্তর সম্ভব। অর্থাৎ নজরুলের কবিতা মূর্ত ও বিমূর্তের সমন্বিত বিন্যাস। আমাদের কলাকৈবল্যবাদী উন্নাসিক কাব্যবোদ্ধারা এটি অনুধাবনে প্রায়শ অক্ষম। তবে সৌভাগ্যবশত অনুবাদকরা তা বুঝেছেন এবং তাদের অধিকাংশ এগিয়েছেনও এই পথে।
জন্মশতবর্ষে গৃহীত উদ্যোগের ফলে নজরুলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কবিতা ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি, স্পেনীশ, চীনা, তুর্কী, রুশ, জাপানিজ, জার্মান, উর্দু, হিন্দিসহ আরো অনেক আন্তর্জাতিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চীনা গবেষক পাই খাই ওয়ান একক চেষ্টায় নজরুলকে অনুবাদ করেছেন। তাঁর মতো প্রতিটি ভাষার মাতৃভাষী অনুবাদক পাওয়া গেলে নজরুলের কবিতার কদর বিদেশে আরো সমাদৃত হবে। এ যাবৎ নজরুলের অনুবাদে যেমন প্রক্রিয়াগত পূর্ণতা আসেনি, তেমনি নজরুলের রচনাসমগ্র অনুবাদের পরিকল্পিত উদ্যোগও গৃহীত হয়নি। তেমন কার্যক্রম গৃহীত হলে তাতে অবশ্যই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ সমন্বিত হতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশে বসবাসরত উদ্যমী নজরুল গবেষক ও ভক্তকুলেরও বিশেষ ভূমিকা আছে। নজরুলের অনুবাদে ও আন্তর্জাতিকায়নে এ পর্যন্ত যে সীমিত সাফল্য, তা-ও অর্জিত হয়েছে অনেকটা এ পথেই। জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হয় দীর্ঘ দু’বছর ধরে। এসময়ে দেশে বিদেশে বাঙালিদের মধ্যে নজরুল চর্চা প্রশংসনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। উত্তর আমেরিকার বাঙালি অভিবাসীরা এক্ষেত্রে বেশ বড় ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০২ সালে লস এঞ্জেলসে অষ্টম নজরুল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বপ্রথম প্রফেসর ল্যাংলি তাঁর নজরুল বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করেন। এখানেই তিনি নজরুলকে আমাদের সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তুলে ধরেন। এই সম্মেলন নিয়মিত বিরতিতে অনুষ্ঠিত হয়েই চলেছে। এর প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বে। ২০০৬ সালে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসময়ে নজরুল চর্চার জন্য হয় নজরুল এনডাওমেন্ট ফান্ড। ক্যলিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গুলশান আরা, এবং নজরুল সম্মেলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কাজী এম. বেলালসহ অনেকেই এই ধরনের তহবিল গঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ২০০৬ সালের সম্মেলনে প্রফেসর ল্যাংলির পাশাপাশি আরো নতুন কিছু আমেরিকান গবেষক নজরুল চর্চায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। এদের মধ্যে ড. জুন ম্যাকডিনেল [কলেজ অব চার্লসটনের সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন ও ধর্মবিজ্ঞান বিভাগ], ড. ফিলিস কে. হারমান [সহযোগী অধ্যাপক, ধর্মবিজ্ঞান বিভাগ, ক্যালিপোর্ণিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়] প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। কী পেয়েছেন তারা নজরুলের অনূদিত রচনায়? এক কথায় স্রষ্টা হিসেবে তাঁর অমলিন নান্দনিক রূপ এবং বৈশ্বিক ঐক্য অর্জনে তার প্রেমময় সত্তা, যেখানে কবি সব মত পথ ধর্ম ও কর্ম সাধনা বৈপরীত্যের মধ্যেও ‘অভেসসুন্দর’ তথা মানবিক অভিন্নতার সন্ধান করেন। সভ্যতার সংঘাত নয়, মানবঐক্যই তাঁর অন্বিষ্ট। ল্যাংলির মতে একবিংশ শতাব্দীতে যে সব ক্ষেত্রে নজরুল উত্তরোত্তর প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হতে থাকবেন সেগুলো হচ্ছে, উন্নয়ন, বহুসংস্কৃতিবাদ, জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা, বৈশ্বিকতা, উত্তরাধুনিকতা, পরিবেশচিন্তা, নারীবাদ, মানবপ্রকৃতি, মানব শক্তিমত্তা ইত্যাদি। নজরুলের এই বিষয়গুলোর উপর বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা তখনই সম্ভব, যখন আমরা বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করতে পারবো পূর্ণাঙ্গ অনূদিত নজরুলকে। বিষযটি সরকারী বেসরকারী পর্যায়ে আমাদের সকলের সুবিবেচনার দাবি রাখে। কেননা বাঙালির জাতীয় কবি নজরুল কেবল সরকারি কবি নন, জনগণেরও কবি। তাঁর সর্বজনীন বৈশ্বিক স্বীকৃতির দায়িত্ব ও গর্ব আমাদের সকলের।

চার.
আবারও স্মরণে আনতে চাই, যে অর্থে রবীন্দ্র-অনুবাদ কিছুটা সহজ, সেই অর্থেই নজরুল-অনুবাদ অনেক বেশি কঠিন। এই কাঠিন্য যতটা, তার চেয়েও আমাদের অনুবাদকের অযোগ্যতা ও চিন্তার দীনতা প্রকট-প্রখর।
আমরা অনূদিত-নজরুল চাইÑতাও সামগ্রিক নজরুল। আশা রাখি, আজ কিংবা আগামীতে আমাদের স্বপ্ন সফলের জন্য হয়তো বা আবির্ভূত হবেন কোনো যোগ্য ও দক্ষ নজরুল-অনুবাদক।
সেটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা ।

লেখক : কবি ও সম্পাদক, মাসিক নতুন কলম ও নতুন কিশোরকণ্ঠ

 

SHARE

Leave a Reply