অন্যায় কাজের প্রতিষেধক রমজানের রোজা

মাওলানা  মো: হাবিবুর রহমান#

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ، وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও এহতেসাবের সাথে রমজানের রোজা পালন করবে আল্লাহ তার পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি ঈমান ও এহতেসাবের সাথে লায়লাতুল কদরের রাত্রে দণ্ডায়মান হয়ে ইবাদত করবে তারও আল্লাহ পূর্বের গুনাহ-খাতা মাফ করে দিবেন। (সহীহ আল বুখারী)
রাবী পরিচিতি:
নাম ও বংশ পরিচয়: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) এর পূর্বের নাম ছিল ‘আবদে শামস্। ইসলাম গ্রহনের পর রাসূল (সা.) তাঁর নাম রাখেন আবদুর রহমান। তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম হচ্ছে আবু হুরায়রা (বিড়াল শাবকওয়ালা)। ছোট্টকাল থেকে বিড়ালছানার প্রতি তাঁর আসক্তির কারণে রাসূল (সা.) তাঁকে আদর করে আবু হির বলে ডাকতেন। সেখান থেকে তাঁর নাম হয় আবু হুরায়রা। তাঁর পিতার নাম ছখর, মাতার নাম উমাইয়া। দাওস গোত্রের সন্তান বলে তাঁকে আবু হুরায়রা আদ-দাওসীও বলা হয়।
ইসলাম গ্রহণ: বিশুদ্ধ মতে, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত তুফায়িল ইবন আমর আদ-দাওসী (রা.) এর দাওয়াতে তিনি ৭ম হিজরীতে খাইবার বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। মদীনায় আসার পর তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাহচর্য লাভ করেন।
হাদীস শাস্ত্রে অবদান:  আবু হুরায়রা (রা.) হলেন সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৫৩৭৪টি। সহীহ বুখারীর একটি বর্ণনায় তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবীদের মধ্যে একমাত্র আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.) ব্যতীত আর কেউ আমার থেকে বেশী হাদীস বর্ণনাকারী নেই।
শাসন কার্য ও প্রাত্যহিক জীবন: দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.) আবু হুরায়রা কে বাহরাইনের শাসক নিযুক্ত করে পরে অপসারণ করেন। তারপর আবার নিযুক্ত করতে চাইলে তিনি প্রত্যাখান করেন এবং মদীনা ছেড়ে আকীক নামক স্থানে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর শাসনামলে আবু হুরায়রা (রা.) একাধিকবার মদীনার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে শাসন ক্ষমতা তাঁর স্বভাবগত মহত্ব, উদারতা ও অল্পেতুষ্টি ইত্যাদি গুণাবলীতে কোন পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারে নাই।
মৃত্যু: আবু হুরায়রা (রা.) ৭৮ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। ওয়াকেদীর মতে, তাঁর মৃত্যুসন ৫৯ হিজরী। ঈমাম বুখারীর মতে তাঁর মৃত্যুসন ৫৭ হিজরী।
হাদীসের ব্যাখ্যা:
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ،

এ হাদীসের প্রথম অংশে রমজানের রোজা পালনকারীকে ২টা শর্ত মেনে রোজা পালন করতে বলা হয়েছে। তা হলোঃ
১. ঈমান: ঈমান অর্থ: বিশ্বাস স্থাপন করা, যা কুফুরের বিপরীত। তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাতসহ ইসলাম নির্দেশিত বিষয়গুলির উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস স্থাপন করাকে ঈমান বলা হয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়া মৌখিক স্বীকৃতি, আন্তরিক বিশ্বাস ও সেটাকে কাজে পরিণত করার নামকে ঈমান বলেছেন। তার মতে, আন্তরিক ও মৌখিক স্বীকৃতি একজনকে মুসলমান করতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ঈমানদারে পরিণত করে না। ঈমানের দাবি অনুযায়ী কাজ না করলে কেউ সত্যিকার মু’মিন হতে পারে না।
আল্লাহ তা‘আলা ঈমান বা মু’মিনের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آَيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ  أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
অর্থ: প্রকৃত মু’মিন তারাই যখন তাদের নিকটে আল্লাহর নাম স্মরণীত হয় তখন তাদের অন্তর কেঁপে উঠে। আর যখন তাদের নিকট তাঁর আয়াত পঠিত হয় তখন তাদের ঈমান বর্ধিত হয়। তারা তাদের প্রভুর উপরেই ভরসা করে। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, এবং আমার প্রদত্ত রিযিক হতে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার। (সূরা আনফাল, আয়াত ২-৪)
এ আয়াত থেকে এটা পরিস্কার বুঝা যায়, রোজাদার ঈমানদারকে অবশ্যই নিজে নিজের ঈমানের পরীক্ষা করতে হবে। আল্লাহর কথা স্মরণ হলে অন্তর কাপে কি না, এবং আল্লাহর আয়াত শুনলে ঈমান বাড়ে কি না? যদি অন্তর কাপে এবং ঈমান বাড়ে তাহলে আপনি ঈমানদার, অন্যথায় আপনি ঈমানদারের কাতারে নেই। এরকম ঈমানদারের রোজা কোন কাজে আসবে না।
অন্য আয়াতে আল্লাহ আরো বলেন,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آَمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ
অর্থ: মু’মিন কেবল তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, অতঃপর সন্দেহ পোষণ করেনি। আর নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। এরাই সত্যনিষ্ঠ।  (সূরা হুজুরাত, আয়াত ১৫)
এ আয়াত থেকে অনুধাবন করা যায়, আমি ঈমান এনেছি আবার সাথে সাথে এ ব্যাপারে সন্দেহ-শংশয় পোষণ করছি। এবং আল্লাহর রাস্তায় মাল-সম্পদ ও জীবন দিয়ে জিহাদে অংশগ্রহণও করছি না। এ অবস্থায় আমি থাকলে আমি সত্যিকার ঈমানদার হতে পারব না।
আল্লাহ তা‘আলা রোজা ফরজ করেছেন শুধুমাত্র ঈমানদারদের উপরে। বেইমানদের জন্য রোজা ফরজ করা হয় নাই। কাজেই রোজাদারকে অবশ্যই ঈমানের অধিকারী হতে হবে। রোজার বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম বা রোজা ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (সূরা আল-বাকারা-১৮৩)
২. এহতেসাব: এহতেসাব শব্দের অর্থ হচ্ছে সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনা করা। তবে এখানে সংস্কারের উদ্দেশ্যে সমালোচনার বিষয়টা অন্যকে সংস্কারের জন্য নয়। বরং নিজের সংস্কারের জন্য। যাকে বলা হয় আত্মসমালোচনা। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে এ শব্দটি খুবই পরিচিত কারণ আন্দোলনের প্রাত্যহিক জীবনে এটার বাস্তব প্রয়োগ ঘটে থাকে।
এহতেসাব বা আত্মসমালোচনা রোজার শর্ত থাকার কারণে রোজাদার তার সকল কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধান এবং রাসূল (সা.) প্রদর্শিত নিয়ম মেনে রোজা পালন করতে বাধ্য। কাজেই রোজাদার রোজা অবস্থায় যে সকল কাজ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন তা মেনে চলছেন কি না সে ব্যাপারে আত্মসমালোচনা করা জরুরী। কারণ এহতেসাবের মাধ্যমে রোজা পালন করার মধ্যেই রোজাদার রোজার সার্থকতা উপলব্ধি করতে পারে।
একটি হাদীসের মধ্যে রাসূল (সা.) বলেছেন-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ.
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রাখলো অথচ অন্যায় কথা ও কাজ পরিত্যাগ করতে পারলো না ঐ ব্যক্তির রোজা রাখা, আর না রাখা আল্লাহর কাছে কোন গুরুত্ব বহন করবে না। (সহীহ আল-বুখারী)
এ হাদীস আমাদেরকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে রোজা রাখা অবস্থায় অশ্লীল আচরণ, অন্যয়-অপকর্ম করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজেই রোজাদার এ হাদীসের শিক্ষা তার জীবনে বাস্তব প্রয়োগের নিমিত্তে রাত্রে এশার নামাজ আদায় করে যখন ঘুমাতে যাবে তখন সে সংস্কারের উদ্দেশ্যে নিজেই নিজের সমালোচনা করবে।
সে আত্ম উপলব্ধিতে আনবে যে, আমি রোজা রেখেছিলাম এই রোজা অবস্থায় আমি কোন অপরাধ করেছি কি না, অন্যায়ভাবে অন্যের হক নষ্ট করেছি কি না। যদি এভাবে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজের কৃত অপরাধ ধরা পড়ে তাহলে তখনই তওবা করতে হবে, আমি এখন থেকে প্রতিজ্ঞা করলাম এই অপরাধ আর করব না। এভাবে  যদি প্রতিদিন বান্দাহ রোজা পালন করতে পারে এবং এই শিক্ষার আলোকে বছরের বাকি দিনগুলি পরিচালিত করতে পারে তাহলে এই রোজা আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যাবে এবং তার জীবনের পূর্বের সকল গুনাহ-খাতা আল্লাহ মাফ করে দিবেন।
এভাবে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রোজা পালনকারীর অপরাধই শুধু ক্ষমা করে দেওয়া হবে না বরং তাদের পুরস্কার আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে প্রদান করবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم  إِنَّ رَبَّكُمْ يَقُولُ كُلُّ حَسَنَةٍ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ وَالصَّوْمُ لِى وَأَنَا أَجْزِى بِهِ الصَّوْمُ جُنَّةٌ مِنَ النَّارِ
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের রব বলেছেন, বনি আদমের প্রত্যেক নেক আমল সাতশত গুণ বাড়িয়ে দিব। কিন্তু রোজা আমার জন্য আর এর প্রতিদান আমি নিজ হাতে প্রদান করব। আর রোজা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার জন্য ঢাল স্বরূপ। (সূনান আন-তিরমিযি)
রাসূল (সা.) রোজাদারের প্রতিদান সম্পর্কে আরো বলেছেন, কোন মুমিন যদি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রোজা পালন করে তাহলে তাকে ‘রাইয়ান’ নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। রোজাদার ছাড়া আর কেউ ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।
আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سَهْلٍ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ : إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
হযরত সাহাল (রা.) নবী (সা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি দরজা আছে কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদারগণ ঐ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহীহ আল-বুখারী)
পক্ষান্তরে যারা আত্মসমালোচনার মাধ্যমে বা রোজার প্রকৃত হক আদায় করে রোজা পালন করবে না, কিয়ামতের দিন তাদের রোজা কোন উপকারে আসবে না। আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِصلى الله عليه وسلمقَالَ « أَتَدْرُونَ مَا الْمُفْلِسُ قَالُوا الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ وَلاَ مَتَاعَ. قَالَ رَسُولُ اللَّهِصلى الله عليه وسلم– « الْمُفْلِسُ مِنْ أُمَّتِى مَنْ يَأْتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَتِهِ وَصِيَامِهِ وَزَكَاتِهِ وَيَأْتِى قَدْ شَتَمَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا فَيَقْعُدُ فَيَقْتَصُّ هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُقْتَصَّ مَا عَلَيْهِ مِنَ الْخَطَايَا أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِى النَّارِ

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি জান! হতদরিদ্র কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মাঝে ঐ ব্যক্তিই হতদরিদ্র যার দিরহাম নেই এবং দুনিয়ার সম্পদ নেই। রাসূল (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মাঝে হতদরিদ্র ঐ ব্যক্তি যে কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ নামাজ, রোজা ও যাকাত সহকারে উঠবে। ঠিক সেই সাথে অন্যকে কষ্ট দিবে, অপবাদ দিবে, অন্যের মাল আত্মসাত করবে, অন্যকে আঘাত দিয়ে রক্তপাত করবে, অন্যকে প্রহার করবে। কিয়ামতের দিন তাকে বলা হবে (তুমি অন্যের হক নষ্ট করেছ) এখন তুমি তাদের পাওনা পরিশোধ কর। তাদের পাওনা পরিশোধ করার পূর্বেই তার সকল আমল শেষ হয়ে যাবে, অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সূনান আত-তিরমিযি)
হাদীসের এ অংশ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম, রোজাদারকে অবশ্যই আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রোজা পালন করে সকল প্রকার অন্যায়-অপকর্ম থেকে বেঁচে থাকতে হবে। তাহলেই কিয়ামতের দিন আমাদের হিসাব সহজ হবে।
হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে-
وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.
যে ব্যক্তি ঈমান ও এহতেসাবের সাথে লায়লাতুল কদরের রাত্রে দণ্ডায়মান হয়ে ইবাদত করবে তারও আল্লাহ পূর্বের গুনাহ-খাতা মাফ করে দিবেন
এখানে যে রাত্রের কথা বলা হয়েছে আল-কুরআনের বর্ণনা মতে, এ রাত্রের মর্যাদা এতই বেশী যা  হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ  وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ  لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ  تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ  سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
অর্থ: নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে।’ তোমাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল কদর’ কী? ‘লাইলাতুল কদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত। (সূরা কদর)
এ থেকে আমরা স্পষ্ট জানতে পারি লায়লাতুল কদরের রাত্রে অর্থাৎ রমজানের শেষ দশ দিনের রিজোড় রাত্রে যদি কোন রোজাদার মুমিন দাড়িয়ে বসে আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়ে দেয় এবং এই মানুসিকতা আলোকে বছরের বাকি দিনগুলি চলতে পারে তাহলে আল্লাহ তার পূর্বের সকল অপরাধ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন।
উপরোক্ত দারস থেকে আমাদের জীবনের শিক্ষা হচ্ছে, আত্মসমালোচনার মাধ্যমে রোজা পালন করে সকল প্রকার গুনাহ থেকে নিজেকে পবিত্র করে খাঁটি ঈমানদার হওয়ার চেষ্টা করা এবং লায়লাতুল কদরের রাতকে হেলায় হারিয়ে না ফেলে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল  থেকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। তাহলেই রোজাদারের জন্য নির্ধারিত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদান পাওয়াবে আল্লাহর কাছে। ইনশাআল্লাহ।
লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply