অপরাধ ও আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতা । তৌহিদুল ইসলাম

অপরাধ ও আর্থসামাজিক দায়বদ্ধতামানবসভ্যতা বিকাশের ধারাবাহিক-তায় সমাজের সৃষ্টি হয়। সুষ্ঠুভাবে সমাজ পরিচালিত হওয়ার জন্য মানুষ সমাজের জন্য কিছু আইন তৈরি করে নেয়। এসব আইন মানুষ নিজের প্রয়োজনেই সৃষ্টি করে; যাতে করে মানবসভ্যতার অস্তিত্ব টিকে থাকে। আইনের বেশিরভাগ বিষয়ই না-বোধক; অর্থাৎ এটা করা যাবে না, ওটা নেয়া যাবে না ইত্যাদি। কিন্তু মানুষের কৌতূহলী মন ‘না’ শুনতে অভ্যস্ত নয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ হয়তো কৌতুহলবশত কিংবা প্রয়োজনে নতুবা অসচেতনতাবশত আইন অমান্য করতে শুরু করে। সে থেকেই অপরাধের জন্ম। যার চলন আজো বহমান এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
মানবসমাজ সৃষ্টির পর থেকে, এমন কোনো সমাজ ছিলো না কিংবা বর্তমানেও নেই যেখানে অপরাধ নেই। সমাজ, সংস্কৃতি, জাতি, ভূখণ্ড ইত্যাদির আলোকে অপরাধের ভিন্নতা ছিলো। অপরাধমুক্ত কোনো সমাজ ছিলো না। প্রত্যেকটি সমাজ অপরাধকে তাদের নিজের মত করে চিহ্নিত করে নেয়। দেখা যায় একটি কাজ কোনো সমাজে অপরাধ নয় কিন্তু সে কাজটিই অন্য আরেকটি সমাজে অপরাধ।
সাধারণত অপরাধ বলতে বুঝায়, আইনের অবমাননাকে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কাজ করে যার ফলে সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন হয় এবং ঐ কাজের জন্য রাষ্ট্র কিংবা সমাজ ঐ ব্যক্তির শাস্তির বিধান রাখে, তখন কাজটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজকে সুন্দরভাবে গড়তে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন হলো সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা। অপরাধীরা আমাদের সমাজেরই বাসিন্দা। সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে একজন মানুষ সহজেই অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে আবার সমাজের কারণেই একজন অপরাধী অপরাধ থেকে নিজকে মুক্ত করে বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ ব্যক্তি বা সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখার জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। এ দেশের বৃহৎ জনসংখ্যার বড় একটি অংশ যাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। অপরাধের সাথে এ অংশেরই সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, খুন, মাদক পাচার/সেবন ইত্যাদি অপরাধগুলো এ বয়সী মানুষের হস্তক্ষেপেই পরিপূর্ণতা লাভ করে। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এসকল অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। অপরাধ সংঘটনের সাথে সমাজ ও পরিবেশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কোনো সমাজে যদি অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায় সে সমাজের নতুন প্রজন্মের মানুষগুলোরও অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। কারণ তারা তাদের চারপাশের অনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখে। ফলশ্রুতিতে তারা নিজেদেরকে অপরাধের সাথে যুক্ত করে নেয়। সমাজের সকল মানুষই অপরাধী নয়। ন্যূনতম সংখ্যায় হলেও কিছু সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষ থাকে। যারা সমাজের কল্যাণকামী। এ কল্যাণকামী মানুষদের সামান্য প্রচেষ্টার ফলে সমাজ থেকে অপরাধের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি ইয়াবার কথাই বলি, ইয়াবার খদ্দের এবং ব্যবসায়ী যে সমাজে বাস করে, সে সমাজের মানুষগুলো তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাম্যক জ্ঞাত। অর্থাৎ মাদক ব্যবসায়ী এবং সেবনকারী উভয়েই সমাজে চিহ্নিত। কিন্তু আমরা এদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার পরও নিশ্চুপ থাকি। আর অপরাধী মানুষগুলোকে আমরা সাহায্য করি কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার। আমরা যদি জানার পরও নিশ্চুপ থাকি তবে অপরাধীরা অপরাধ সংঘটনে খুবই উৎসাহ বোধ করে। ক্রমে পুরো সমাজকেই অপরাধের কলুষতায় কলুষিত করে তোলে। যদি সুস্থ বোধসম্পন্ন মানুষগুলো একটু সচেতন হয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে সহানুভূতির দৃষ্টিতে অপরাধপ্রবণ কিংবা অপরাধী মানুষগুলোর প্রতি হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষগুলোকে আলোর পথে ফিরিয়ে এনে আলোকিত সমাজ গড়া সম্ভব।
সামাজিক প্রেক্ষাপট যেমন অপরাধ নির্মূল এবং অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করে, তেমনিভাবে অপরাধ সংঘটনে বা নির্মূলে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কথায় আছে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। বাংলাদেশের অপরাধীদের ক্ষেত্রে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেশির ভাগ অপরাধীই অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য জীবনের যে কোনো পর্যায়ে এসে নিজেকে অপরাধের সাথে যুক্ত করে নেয়। এ ক্ষেত্রে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৪.২৭ জন মানুষ বেকারত্ব সমস্যায় জর্জরিত। এদের বড় একটি অংশ যুবসমাজ। এ যুবসমাজ নিজেদেরকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে বিভিন্ন রকম অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। মাদক ব্যবসা এর মধ্যে অন্যতম এবং লাভজনক ব্যবসা হিসেবে প্রাধান্য পায়। বেকারত্বের হার যদি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় কমিয়ে আনা যায় তবে অপরাধের হার অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। জাতি হিসেবে আমরা যদি আমাদের মধ্যে একটি মহান ধ্যান-ধারণা লালন করতে পারি : কোন কাজই ছোট না; তাহলে অপরাধের সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা বহুলাংশে কমে যাবে এবং বেকারত্ব গুছিয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবো।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply