অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতেই আমলাদের বেতন বৃদ্ধি -মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ

আমলাদের খুশি ও তাদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে মাত্র ২১ লাখ (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করেছে সরকার। কিছুদিন আগে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করে হঠাৎ করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর কারণে এক দিকে যেমন দ্রব্যমূল্য বেড়েছে অন্য দিকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
বেতনবৃদ্ধির কথা শুনার সাথে সাথে দেশে বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, সেবাসার্ভিস সবকিছুর দাম হু হু করে বেড়ে গেছে। বর্ধিত বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে গেছে। আর এর পুরো দায়ভার গিয়ে পড়ছে সাধারণ ও স্বল্প আয়ের লোকজনের ওপর। যেহেতু সরকারি চাকরিজীবীরা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ, মূল্যস্ফীতির চাপে তাদের সমস্যা না হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবনযাপন ও দৈনন্দিন জীবনজীবিকা নির্বাহে দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করেছে।
দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় শিল্প কলকারখানায় বিনিয়োগ সেভাবে বাড়েনি। ফলে প্রতিদিন শিল্প কলকারখানায় শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাই নিত্যদিনকার খবরে পরিণত হচ্ছে। দেশে-বিদেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকোচিত হচ্ছে। যার কারণে, মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াসহ অনেক উন্নত দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
বেতন বৃদ্ধির এই ঘোষণায় সরকারি ২১ লাখ চাকরিজীবী লাভবান হলেও শিল্প, কলকারখানা, ব্যবসা, বাণিজ্য, গার্মেন্টস সেক্টরসহ অন্যান্য বেসরকারি খাতে কর্মরত বিপুল পরিমাণ চাকরিজীবীর জন্য কোনো সুবিধা আনবে না। অথচ এই বেতন বৃদ্ধির মূল্যস্ফীতির চাপ সকলকে ভোগতে হবে। অন্য দিকে সরকারি সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জন্য ন্যায়পাল নিয়োগ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারি দফতরে উপরি (ঘুষ) দেয়া ছাড়া ফাইল নড়ে না, সরকারি প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়নে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়গুলোর কোন সুরাহা না করে শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাড়িভাড়া, খুচরা ব্যবসা-বাণিজ্য, ওয়ার্কশপ, চায়ের স্টল, রিকশা-ভ্যান চালানো ইত্যাদিসহ নানা ধরনের পেশার মানুষ পড়েছে বিপাকে। অস্থিরতা এখনই দেখা দিয়েছে সব সেক্টরে। যদিও সরকারি চাকরিজীবীরা বেতন পেতে আরও দুই মাস সময় লাগতে পারে। এরই মধ্যে বেতন বৃদ্ধির চাপ আসছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। এরই মধ্যে সাংবাদিকদের জন্য নবম ওয়েজবোর্ডের দাবি জানানো হয়েছে। দাবি আসছে গার্মেন্টস সেক্টর থেকেও।
ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতেও বেতন বাড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হবে। বিশেষ করে বাংলা নববর্ষে ভাতা দেয়ার সিদ্ধান্তটির চাপ বেসরকারি খাতে সরাসরি পড়বে। আগামী এপ্রিলেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাতার দাবি উঠবে। তবে বেতন বাড়ানোর মতো পরিস্থিতি এখন সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসহ খাদ্যপণ্যের মূল্য অনেক কম রয়েছে। তাই সরকারের বাজেটে ভর্তুকির চাপ কমেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করার এখনই উপযুক্ত সময়। আয় বাড়লে ব্যয় বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। সেইসাথে সঞ্চয়ও বৃদ্ধি পাবে। আর ধাপে ধাপে অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করায় এর প্রভাব সহনীয় থাকবে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধির কারণে সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। তারা মনে করেন, পে-স্কেল কার্যকরের পর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবেন। বিশেষ করে কোনো কোনো বাড়িওয়ালা অতীতে পে-স্কেল হওয়ার পর বাড়িভাড়া বাড়িয়েছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর প্রবণতাও দেখা গেছে। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থাকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। এ ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেয়ার প্রবণতা বন্ধ করা গেলে পে-স্কেলের সুফল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেমন পাবেন, তেমনি স্বস্তি পাবেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, পে-স্কেল হওয়ার পর কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করবে। বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়াও বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। যদিও মোট জনগোষ্ঠীর তুলনায় সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা নগণ্য, তারপরও নিত্যপণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়া নন-ফুড (খাদ্যবহির্ভূত) খাতেও মূল্যস্ফীতি বাড়ানো হতে পারে। তিনি বলেন, বিভিন্ন কারণে চাল ছাড়া সবজি, মাছ, মাংস, ডিম ও নিত্যপণ্যের দাম চড়া। পে-স্কেল ঘোষণায় এটিকে আরও একটু উসকে দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর আগে সর্বশেষ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়েছিল ২০০৯ সালে। পরের অর্থবছর জীবনযাত্রার ব্যয় ১০ দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে যায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সূত্র জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে জাতীয় পর্যায়ে ভোক্তা মূল্যসূচক ছিল ১৪১ দশমিক ১৮ পয়েন্ট। সর্বশেষ আগস্ট মাস শেষে মূল্যসূচক দাঁড়ায় ২১৫ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। এ হিসাবে ৫ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, দেশের ২১ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়িয়েছে সরকার। গ্রেড ভেদে ৯১ থেকে ১০১ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী বিগত অর্থবছরে বেতন-ভাতা খাতে সরকারের খরচ হয়েছে ৪৪ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বেতন বৃদ্ধির ফলে চলতি (২০১৫-১৬) অর্থবছরে সরকারের অতিরিক্ত লাগবে ১৫ হাজার ৯০৪ টাকা এবং বেতন-ভাতা খাতে মোট খরচ হবে ৬০ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ২০ দশমিক ১ শতাংশ। সরকারের এই অর্থ সংস্থানের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে। এটা জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের বোঝা বাড়বে। কারণ, অতীতেও বেতন বৃদ্ধি করে সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করা যায়নি।
এ দিকে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়ানো মূল্য। একদিকে হু হু করে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য, অন্য দিকে বাড়ছে গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি চাপ। এখন প্রশ্ন হলো সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়? সংবাদমাধ্যমের প্রচারিত সংবাদে বোঝা যায়, গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দামে নাভিশ্বাস উঠেছে সব শ্রেণী- পেশার মানুষের মধ্যে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা চাকরি করছেন তাদের অবস্থা তো আরও বেগতিক। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোতে দিন দিন বাড়ে কাজের পরিধি, কিন্তু বাড়ানো হয় না পারিশ্রমিক। উল্টো থাকে অযাচিত খবরদারি, চাকরি হারানোর ভয়ও দেখানো হয় মাঝে মাঝে। সে ব্যাপারে সরকারের নেই কোনো উদ্যোগ বা নিয়ম-নীতি। শুধু ধারাবাহিকভাবে মূল্যই বাড়ানো হচ্ছে, আজ এটা তো কাল সেটা। মাঝপথে অল্প পারিশ্রমিকওয়ালারা পিষ্ট হচ্ছেন মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে। সরকার একদিকে বলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড ছোঁয়ার কথা অন্য দিকে প্রতিযোগিতা করে বাড়ানো হচ্ছে তার দাম। তাহলে অর্থটা হলো কী? সব কথার শেষ কথা দাঁড়ায়- দেশও ভালো চলছে, সরকারও ভালো চলছে। শুধু ভালো নেই সাধারণ মানুষ। তাদের মাঝে ভর করেছে বোবাকান্না।

SHARE

Leave a Reply