অবৈধ সম্পদ উপার্জন ইসলামের দিকনির্দেশনা

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

প্রত্যেক ব্যক্তির জীবিকার জন্য প্রয়োজন কর্মের। প্রতিটি মানুষই তার যোগ্যতানুযায়ী কাজ করে। সকল মানুষেরই জন্মগতভাবে কমবেশি কর্মদক্ষতা ও প্রতিভা আছে। আল্লাহ প্রদত্ত এ যোগ্যতা ও কর্মক্ষমতাকে অকর্মণ্য, নিষ্ক্রিয় ও অকেজো করে রাখার অধিকার কারো নেই। নবী-রাসূলগণকেও জীবিকা নির্বাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ অর্থ ছাড়া অর্জন করা যায় না। অর্থসম্পদ উপার্জনে ইসলাম সকল মানুষকে উৎসাহিত করে। উপার্জনকারী ব্যক্তি আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। জীবন এবং সম্পদ একটি অপরটির পরিপূরক। সম্পদ ছাড়া যেমন জীবনধারণ সম্ভব নয়, তেমনি প্রাণহীন ব্যক্তির জন্য অর্থেরও কোন মূল্য নেই। অর্থসম্পদ মানুষের কল্যাণের জন্য কিন্তু এ সম্পদই আবার কখনো কখানো অকল্যাণের কারণ হয়ে থাকে। বিত্ত-বৈভব যেমন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে অনুরূপভাবে তা আবার মানুষের ক্ষতিকর কাজেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ইসলাম ছাড়া সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে যে সকল রীতিনীতি অনুসৃত হচ্ছে, তার সবগুলোই সম্পদ সঠিক ব্যবহার ও সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সকল মানুষের সার্বিক কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে এমনটি জোর দিয়ে বলা যায় না।
সম্পদের পরিচয় : জাস্টিনিয়ান তার ইনস্টিটিউটস্ েরেসকে (Res) দ্বিতীয় শ্রেণীর আইন হিসেবে অভিহিত করেছেন। রেস শব্দটির প্রতিশব্দ হলো বস্তু। এর দু’টি অর্থ রয়েছে। সাধারণ অর্থে যে সকল বস্তু দৃষ্টিগোচর হয় সেগুলোই রেস; যেমন: টেবিল, চেয়ার, বাড়ি, একখণ্ড জমি ইত্যাদি। ‘‘R.W.; The Elements of Roman Law, London: Sweet & Maxwell Limited, 1956, P. 134; ড. এবিএম মফিজুল ইসলাম পাটোয়ারী, রোমান আইনের মূলনীতি, ঢাকা: মল্লিকা পাবলিশিং হাউস, ২০০৫, পৃ. ১২৭-১২৯।
Muirhead James, Historical Introduction to the Private Law of Rome, (London: Adam & Charles Black, 1899), P. 245; Leage, R.W., Prichard, A.M., Leage’s Roman Private Law, (London: Macmillan & Co. Ltd., 1961), P. 256; Nicholas, Berry, An Introduction to Roman Law, (London: Oxford University Press, 1962), P ৪২১.’’
তবে আইনবিদদের মতে রাস্তায় চলার অধিকার ও দেনা ইত্যাদিও বস্তুর মধ্যে গণ্য। এ প্রসঙ্গে রোমান আইনে ‘‘রোমান আইন : প্রাচীন রোমে যেসব নিয়ম-কানুন বা আইন প্রচলিত ছিল তাই রোমান আইন। এটি কোনো প্রণীত আইন নয় বা এটি একক কোনো আইনও নয়। রোমানদের সামাজিক জীবন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচলিত প্রথাসমূহ এবং সভ্য জাতি হিসেবে তারা যেসব নিয়ম-নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং তাদের ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, সামাজিক এবং বৈষয়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে তারা যেসব নিয়ম কানুনের প্রবর্তন করেছিল প্রকৃতপক্ষে তাকেই রোমান আইন বলা হয়ে থাকে। Buckland এ দিকেই লক্ষ করে বলেছেন : আইন দ্বারা সংরক্ষিত যে কোনো বস্তু, যার অর্থনৈতিক মূল্য ছিল, তাকেই রেস বলা হতো।
সম্পদ শব্দের অর্থ (Meanings of the term ‘Property’) সকল আইনগত অধিকার, মালিকী অধিকার, সর্বজন স্বীকৃত মালিকী অধিকার ইত্যাদি। ‘‘আজিজুর রহমান চৌধুরী, ব্যবহার-তত্ত্ব (আইন বিজ্ঞান), ঢাকা : বাংলাদেশ ‘ল’ বুক সেন্টার, ২০০৪, পৃ. ২২৭; Leage, R.W., Prichard, A.M., Leage’s Roman Private Law, London: Macmillan & Co. Ltd., 1961, P. 125; Nicholas, Berry, An Introduction to Roman Law, London: Oxford University Press, 1962, P. 214.’’
সম্পদ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা
সাধারণভাবে উপার্জনের অনেক প্রকার থাকতে পারে, তবে মৌলিক দিক থেকে মানুষের উপার্জনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ক. বৈধ পন্থায় উপার্জন এবং খ. অবৈধ পন্থায় উপার্জন। নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো-
বৈধ পস্থায় উপার্জন : বৈধ পন্থায় উপার্জনের জন্য আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম শর্ত হলো, বান্দার হালাল উপার্জন। কেননা রিজিক যদি হালাল পন্থায় উপার্জিত না হয় তাহলে তার কোনো দোয়া কিংবা ইবাদত কোনটাই কবুল হয় না। আল্লাহ আমাদেরকে হালাল রিজিক দিয়ে জীবনধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘আমি তোমাদের জন্য যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু তোমরা ভক্ষণ কর।’’ (আল কুরআন, ২:৫৭) আর বৈধ পেশায় নিয়োজিত থেকে সম্পদ উপার্জনের জন্য পবিত্রতম ও হালাল বস্তুর খোঁজ করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘হে মুমিনগণ! জুমার দিন যখন সালাতের জন্য আহবান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর। সালাত শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে যাতে তোমরা সফলকাম হও। যখন তারা দেখল ব্যবসায় ও কৌতুক, তখন তারা তোমাকে দাঁড়ান অবস্থায় রেখে তার দিকে ছুটে গেল। বল, আল্লাহর নিকট যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।’’ (আল-কুরআন, ৬২ : ৯-১১)
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: ‘‘পৃথিবী মিষ্ট ও শ্যামল। এখানে যে ব্যক্তি হালাল সম্পদ উপার্জন করবে এবং ন্যায়সঙ্গত পথে তা ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাকে জান্নাত দান করবেন। আর যে ব্যক্তি হারাম পন্থায় সম্পদ উপার্জন করবে এবং অন্যায় পথে ব্যয় করবে, আল্লাহ তাকে অপমানজনক স্থানে নির্বাসিত করবেন। আর যারা হারাম সম্পদ হস্তগতকারী, কিয়ামতের দিন তারা আগুনে জ্বলবে।’’ (খাওলাহ বিনতে কায়িস রা. হতে বর্ণিত।-ইবনে হিব্বান, আস-সহীহ, দারুল ফিক্র, তা.বি., খ. ১০, পৃ. ৩৭০, হাদিস নং-৪৫১২) এভাবে আরো অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে এবং হালাল পন্থায় উপার্জনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিম্নে বৈধ পন্থায় উপার্জনের কতিপয় মাধ্যম উপস্থাপন করা হলো-
চাকরি : সম্পদ উপার্জনের জন্য মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করে তা আহরণ করতে হয়। আল্লাহ্ বনি ইসরাঈলের জন্য যেমন ‘মান্না’  (এক ধরনের সুস্বাদু খাবার, যা শিশিরের মত গাছের পাতায় ও ঘাসের ওপর জমে থাকত। আল্লাহ্ বিশেষভাবে তা বনি ইসরাইলের জন্য প্রেরণ করেছিলেন) ও ‘সালওয়া’ (সালওয়া’ পাখির গোশ্ত জাতীয় এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ বনি ইসরাইলের জন্য বিশেষভাবে প্রেরণ করেছিলেন।) নাজিল করতেন তেমনটি এ যুগে আর হবার সম্ভাবনা নেই। “বনি ইসরাইলদের ওপর আল্লাহ এমন এক খাবার নাজিল করতেন যাকে কুরআনের ভাষায় মান্না ও সালওয়া বলা হতো এবং তারা তা লাভ করতো বিনা পরিশ্রমে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন : ‘আর আমি তোমাদের ওপর মেঘের ছায়া দিলাম এবং তোমাদের প্রতি নাজিল করলাম ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। তোমরা সে পবিত্র বস্তু থেকে আহার কর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি। আর তারা আমার প্রতি জুলুম করেনি, বরং তারা নিজদেরকেই জুলুম করতো।” (আল কুরআন, ২ : ৫৭) মুসলিম উম্মাহকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদ উপার্জনের শিক্ষা রাসূলুল্লাহ (সা) দিয়েছেন। এ জন্য মানুষকে পরিশ্রমের জন্য নিত্যনতুন উপায় বের করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। তন্মধ্যে একটি হলো চাকরি করা এবং নিজের পরিশ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করে তা দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা। চাকরির ক্ষেত্র হালাল হতে হবে। হারাম কোনো কাজে চাকরি নিয়ে তার দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করলে তা কখনই হালাল হবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন : ‘‘আর মানুষ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারে না।’’ আর এই যে মানুষ যারা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। আর এই যে, তার প্রচেষ্টার ফল শিগগিরই তাকে দেখানো হবে। তারপর তাকে পূর্ণ প্রতিফল প্রদান করা হবে।’’ (আল-কুরআন, ৫৩ : ৩৯-৪১) এ আয়াতের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: ‘‘নিজ হাতের উপার্জন মানুষের উত্তম খাদ্য। আর সন্তান মানুষের নিজ হাতের উপার্জনের অন্তর্ভুক্ত।’’ (আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত : -মুসনাদে আহমাদ, তা.বি., খ.৬, পৃ. ৩১, হাদিস নং-২৪০৭৮; আত-তাবারানী, প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ. ৩৮০, হাদিস নং-৪৪৮৬)
কৃষিকাজ : সাওয়াব লাভের জন্য যেমন সৎ কাজ ও সাধনা জরুরি, তেমনি সম্পদ লাভের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ জরুরি। এ জন্য নিজের ভাগ্যকে নিজে গড়ার লক্ষ্যে মানুষকে কষ্ট করে রিজিকের ব্যবস্থা করতে হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন : নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’’ (আল-কুরআন, ১৩ : ১১)
উপার্জনের অন্য আরেকটি মাধ্যম হলো কৃষিকাজ। আদম (আ) এ কৃষি কাজ করেছেন। এটি একটি উন্নত পেশা। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন: ‘‘হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমি আমার কিছু বংশধরদেরকে নিয়ে ফসলহীন উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের নিকট বসতি স্থাপন করলাম, হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম করে। সুতরাং কিছু মানুষের হৃদয় আপনি তাদের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন এবং তাদেরকে রিজিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, আশা করা যায় তারা শুকরিয়া আদায় করবে।’’ (আল-কুরআন, ১৪ : ৩৭)
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘‘তিনি সেই সত্তা, যিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, যাতে রয়েছে তোমাদের জন্য পানীয় এবং তা থেকে হয় উদ্ভিদ, যাতে তোমরা জন্তু চরাও। তার মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য উৎপন্ন করেন ফসল, যায়তুন, খেজুর গাছ, আঙ্গুর এবং সকল ফল-ফলাদি। নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’’ (আল-কুরআন, ১৬:১০-১৪)
এ প্রসঙ্গে হাদিসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস ইবনে মালিক (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন : ‘‘কোন মুসলমান যখন কোন কিছু রোপণ করে অতঃপর তা থেকে কোন মানুষ অথবা কোন চতুষ্পদ জন্তু কোন কিছু ভক্ষণ করে তা রোপণকারীর জন্য সদকার সমতুল্য সাওয়াব হয়।’’ (সহীহ বুখারী)
আবু আইউব আল-আনসারী (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন : ‘‘যে ব্যক্তি কোন বৃক্ষ রোপণ করলো আল্লাহ তার জন্য একটি প্রতিদান নির্ধারণ করে রেখেছেন সে গাছ থেকে ফল বের হোক বা না হোক।’’
হাদিসের অপর এক বর্ণনায় কৃষিকাজকে সদকায়ে জারিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিসের এক বর্ণনায় এসেছে, আনাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : সাতটি বিষয়ে আমলের প্রতিদান মৃত ব্যক্তির কবরেও প্রদান করা হবে। তা হলো, জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, নদী ও কূপ খনন করা, খেজুর গাছ লাগানো, মসজিদ নির্মাণ করা, বইপুস্তক রেখে যাওয়া এবং এমন সন্তান দুনিয়ায় রেখে যাওয়া যে সন্তান ঐ ব্যক্তির ইন্তিকালের পর তার জন্য দোয়া করবে।’’ (বাইহাকী) এভাবে কুরআন ও হাদিসে কৃষিকাজকে একটি উন্নত পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
শ্রম : সম্পদ উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হচ্ছে শ্রম। কুরআন মাজিদেও এ মাধ্যমটির উল্লেখ করা হয়েছে। এটাকে অবলম্বন করে মানুষ কোন রকম পুঁজি ছাড়াই নিজের জীবিকা অর্জন করতে পারে। কুরআনে দু’জন নবীকে শ্রমিক-মালিক হিসেবে পেশ করা হয়েছে। হযরত মূসা (আ) মহরের বিনিময়ে তাঁর স্ত্রীর বকরী চরিয়েছিলেন বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা শুআইব (আ)-এর বক্তব্যের উদ্বৃতি দিয়ে বলেন : ‘‘আমার একান্ত ইচ্ছা, আমার এই কন্যা দু’টির একটিকে বিবাহ দেব তোমার সাথে এ শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করে দেবে, আর যদি দশ বছর পুরো করে দাও, তবে সেটা হবে তোমার অনুগ্রহ।’’ (আল কুরআন, ২৮ : ২৭)
এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় ইব্নে কাছীর (রহ) বলেন, মূসা (আ) বললেন : আমার ও আপনার মাঝে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, আট বছর ও দশ বছর এ দু’টির যে কোন একটি সময় আমি পূরণ করব। আর এটা আমার ইচ্ছাধীন। আট বছর পূরণ করার পর আমার ওপর আপনি অতিরিক্ত পরিশ্রম চাপিয়ে দিতে পারবেন না।’ আর আমাদের এ পারস্পরিক আলোচনায় আল্লাহকে আমরা সাক্ষী হিসেবে স্বীকার করছি। তিনিই আমাদের কার্যনির্বাহী। আমার পক্ষে আট বছরের স্থানে দশ বছর মজুরি করা যদিও মুবাহ, তা পূর্ণ করা জরুরি নয়।
বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম : বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম বলতে ঐ সমস্ত পুঁজিহীন পেশাকে বোঝায়, যেগুলোর মধ্যে দেহের চেয়ে মস্তিষ্ক বেশি খাটানো হয়। পবিত্র কুরআনেও সেগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসুফ (আ)-এর জীবনীতে বলা হয়েছে যে, মিসরের বাদশাহ তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করার পর তাঁকে চাকরিতে নিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করে যা বলল তা আল্লাহ্ তাআলা আল কুরআনে ঘোষণা করেছেন এভাবে, ‘‘আজ তুমি আমাদের দৃষ্টিতে বিশেষ মর্যাদাশীল ও বিশ্বাসভাজন ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত হলে।’’ (আল-কুরআন, ১২:৫৪)
তখন ইউসুফ (আ) তাঁর প্রস্তাবিত চাকরিকে গ্রহণ করে নিজের সম্পর্কে যে কথা উপস্থাপন করেছিলেন তাহলো : ‘‘আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের কর্তা পদে নিযুক্ত করুন। আমি ঐগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করব এবং সে সম্বন্ধে আমার জ্ঞানও আছে।’’ (আল কুরআন, ১২: ৫৫)
এ আয়াত থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, মানুষ তার যোগ্যতা অনুযায়ী যে কোন চাকরির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারে। আর সে আবেদনের মধ্যে নিজের যোগ্যতার উল্লেখ করা বৈধ। কেননা ইউসুফ (আ) এ সুযোগে নিজেকে রক্ষণাবেক্ষণকারী ও জ্ঞানী বলে দাবি করেছিলেন। শ্রম, চাকরি ও অন্যান্য পেশার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে নবী (সা) বলেন : ‘‘আল্লাহর প্রত্যেক নবীই বকরী চরিয়েছিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: আপনিও? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আমিও কয়েক কিরাত মজুরিতে মক্কাবাসীদের বকরী চরাতাম।’’ (সহীহ বুখারী)
ব্যবসায় : উপার্জনের জন্য ব্যবসায় একটি উত্তম পন্থা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা বলেন: ‘‘… এবং আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সুদকে হারাম করেছেন আর ব্যবসাকে করেছেন হালাল।…’’ (সূরা বাকারা : ২৭৫) উল্লেখ্য যে, ব্যবসাকে দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। ১. হালাল জিনিসের ব্যবসা ২. হারাম জিনিসের ব্যবসা।
হালাল বস্তুর ব্যবসা : এ সম্পর্কে উপরে উল্লিখিত আয়াতই যথেষ্ট। এছাড়া হাদিসের এক বর্ণনায় এসেছে, আবু সাঈদ আল-খুদুরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : ‘‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীকীন ও শহীদদের সাথে থাকবেন।’’
হারাম বস্তুর ব্যবসা: হারাম বস্তুর ব্যবসা করা হারাম। যেমন : মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের উৎপাদন ও ব্যবসা।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: ‘‘তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে আর অপবিত্র বস্তুসমূহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’’ (আল-কুরআন, ৭ : ১৫৭)
মদ এবং যে সকল নেশাজাতীয় দ্রব্য যা পান বা সেবন করা হারাম তার উৎপাদন ও ব্যবসায় ইসলাম সম্পূর্ণরূপে হারাম ঘোষণা করেছে। এ জাতীয় দ্রব্য উৎপাদন ও তার ব্যবসালব্ধ আয় অবৈধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-দেবী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো অপবিত্র শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি বিরত হবে না?’’ (আল কুরআন, ৫ : ৯০-৯১)
অবৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন : পৃথিবীতে দুই ধরনের উপার্জন পরিলক্ষিত হয়। একটি হলো বৈধ পন্থায় উপার্জন। আর অপরটি হলো অবৈধ পন্থায় উপার্জন। মানবজীবনে এ অবৈধ পন্থায় উপার্জনকে কুরআন ও হাদিসে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন: ‘‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।’’ (আল কুরআন, ৪ : ২৯) রাসূল (সা) বলেছেন ‘‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধূলিধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘‘হে প্রভু! বলে মুনাজাত করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে। তার মুনাজাত কিভাবে কবুল হবে?’’ (পূর্ণাঙ্গ হাদিসটি আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত : ইমাম মুসলিম, আস-সহীহ, বৈরুত : দারুর যাইল, তা.বি., খ.৩, পৃ. ৮৫, হাদিস নং-২৩৯৩) সাদ (রা) বলেন, আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন আমার দুআ কবুল হয়। রাসূল (সা) বললেন: হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখ, তোমার দুআ কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের এক গ্রাসও মুখে নেয়, তাহলে চল্লিশ দিন যাবৎ তার দুআ কবুল হবে না।’’
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply