অমানিশার অন্ধকারে বাংলাদেশ

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

তৃতীয় বিশ্বের শাসকশ্রেণী সবসময়ই মনে করে যে, এই যে তারা ক্ষমতায় বসেছে এই মসনদ তাদের চিরস্থায়ী। অনন্তকাল ধরে, কিংবা যতদিন জীবিত আছেন ততদিন ধরেই তারা রাজনৈতিক শক্তি নয়, পেশিশক্তি দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে। এরা মৃত্যুর কথা কখনও চিন্তা করে না। এদের ধারণা তারা অমর। অনন্তকাল ধরে তারা ক্ষমতায় থাকবে এবং রাষ্ট্রের ভেতরে যা খুশি তাই করবে। রাজতন্ত্রে এসব ধারণা আরও প্রবল থাকে। সেখানকার রাজা-বাদশারা মনে করেন যে, ক্ষমতায় তো তারা থাকবেনই। রাষ্ট্রের মালিক মোক্তার তারাই। জনগণ কেন এর প্রতিবাদ করবে? কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত আরব-বসন্তের পর সেখানকার রাজা-বাদশারা একটু নড়েচড়ে বসেছেন। এমনকি সৌদি শাসকরাও বিনা দাবিতে জনগণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আগাম বিভিন্ন ধরনের সুবিধার ঘোষণা দিয়েছেন।
অর্থাৎ জনগণ যদি ক্ষেপে যায় কিংবা বিরূপ হয়ে যায়, তাহলে এমনকি রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখাও দুঃসাধ্য ব্যাপার হতে বাধ্য। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র কোনো বিবেচনাকেই এখন আর আমলে নিচ্ছে না। কয়েকজন ব্যক্তি মনে করছেন, এদেশের ষোল কোটি মানুষ খুবই অনুগত ক্রীতদাস। সরকার যা কিছু করবে জনগণ তা নীরবে মেনে নিতে বাধ্য। মেনে না নিলে খবর আছে। খবর আছে কথাটা আমি প্রথম ব্যবহার করলাম না। ‘খাইছি তোরে’, ‘দেইখ্যা নিবো’, ‘খবর আছে’ প্রভৃতি বাংলাদেশে নির্মিত অ্যাকশন সিনেমার নাম। ভদ্রলোকেরা সেসব সিনেমা দেখে না। প্রধানমন্ত্রী দেখেছেন কি না জানি না। কিন্তু বিরোধী দলকে তিনি ‘খবর আছে’ বলে খুব করে শাসিয়ে দিয়েছেন।
তারপর বাংলাদেশে যা খুশি তাই চলছে। সরকার একদিকে ভারতের পদলেহন নীতি হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় বিকিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এমন কোনো চিন্তা-চেতনা সরকারের ভেতরে আছে বলে মনে হয় না। যেন তারা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলেই দিয়েছে। বাংলাদেশের তিতাস নদী বন্ধ করে দিয়ে তার ওপর দিয়ে ভারত সড়ক নির্মাণ করে এদেশের বুক চিরে তাদের ভারী যানবাহন, যন্ত্রপাতি সরঞ্জাম, পার করে নিয়ে গেছে। এতে দীর্ঘ সময়ের জন্য সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা, রুটি-রুজি মারাত্মকভাবে বিঘিœত হয়েছে। নদীর দুই পাশের প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে। সরকার বলছে, তারা জানে না কে এটা নির্মাণ করেছে। এ এক আশ্চর্য কাহিনী।
দেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ঘর থেকে বের হতে আতঙ্ক। পথ চলতে আতঙ্ক। বাসে চলতে আতঙ্ক। গাড়ি চলতে আতঙ্ক। ঘরের ভেতরে আতঙ্ক। ঘরের বাইরে আতঙ্ক। সরকার তার সীমাহীন দুঃশাসনে বাংলাদেশকে এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে। এবং কী আশ্চর্য নিষ্পৃহ এই সরকার। কোনো হত্যাকাণ্ডের কিনারা তো তারা করতেই চাইছে না, বরং ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমায় মুক্তি দিয়ে সরকারের মন্ত্রীরা তাদের ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানাচ্ছে। নগর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ থেকে প্রতিদিন গুম হয়ে যাচ্ছে ডজন ডজন মানুষ। আগে সরকারি বাহিনী ক্রসফায়ারের নামে লাশের সারি তৈরি করেছিল। তা নিয়ে সারা বিশ্বে যখন প্রতিবাদের ঝড় উঠল, তখন চালু করা হলো গুমের ঘটনা। সাদা পোশাকধারী লোকেরা নিজেদের র‌্যাব-পুলিশের পরিচয় দিয়ে ডজন ডজন মানুষের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে জলজ্যান্ত তরুণ-যুবক-বৃদ্ধকে। তাদের আর কোনো হদিস মিলছে না। ওসব বাহিনী যদি তাদের খুনও করে থাকে তাহলে র‌্যাব-পুলিশ সেসব সরাসরি অস্বীকার করছে। বলছে, তারা এরকম কাউকে তুলেই নেয়নি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে নৈশ কোচ থেকে মধ্যরাতে গাড়ি থামিয়ে মাইক্রোবাসে করে নামিয়ে নিয়ে গেছে র‌্যাব পরিচয়ধারী ব্যক্তিরা। তাদের হদিস মেলেনি।
ফলে যেকোনো অস্ত্রধারী এখন র‌্যাব-পুলিশ পরিচয় দিয়ে যে কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে মুক্তিপণ দাবি করছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন সবচাইতে ভালো। তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে নিজগৃহে খুন হয়েছেন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। তিন-সাড়ে তিন মাস পরও সফল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দক্ষ পুলিশ বাহিনী তার সামান্যতম ক্লুরও সন্ধান পায়নি। রাজধানীর সবচেয়ে নিরাপত্তাবলয়বেষ্টিত গুলশান এলাকায় খুন হলেন সৌদি কূটনীতিক খালাফ আল আলী। পুলিশ তারও কোনো কিনারা করতে পারেনি। নিজ বাসভবনের কাছ থেকে গুম হলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী। পুলিশ সে গুমেরও কোনো কিনারা করতে পারেনি।
প্রতিদিন গ্রামে-গঞ্জেও একেকজন মানুষ উধাও হয়ে যাচ্ছেন। তার পরিবারের মধ্যে, স্বজনদের মধ্যে আহাজারি আর হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে। সেদিন তেমনি এক সন্তানহারা বৃদ্ধ পিতার আকুল আর্তনাদের ছবি পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছে। চোখে পানি এসে যায় সে দৃশ্য দেখে। সরকার নির্বিকার চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কোনো কিছুরই কিনারা তারা করতে পারছে না।
অপর দিকে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রদ করে দেয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে যা ঘটছে তাতে ন্যায়বিচার, আইনকানুনের বালাই থাকছে না। সাক্ষী হিসেবে প্রথমদিকে কিছু চোর বাটপারকে জেরার জন্য আদালতে হাজির করা হলেও হাস্যকর সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ রিপোর্টে যাদের মুক্তিযোদ্ধা বলে অভিহিত করা হয়েছে, আদালতে এসে তারা বলছেন, তিনি মোটেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তাকে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দিয়েছে। এবং তিনি অনেককাল ধরে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার ভাতা খেয়ে আসছেন। সেসব সাক্ষীর অধিকাংশই ছিল চুরির দায়ে জেলখাটা আসামি। কেউ জেলে গিয়েছিল ভাবীকে মেরে।
ফলে পরিস্থিতি এতটাই হাস্যকর হয়ে উঠছিল যে, এখন সরকার পক্ষ আর কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করছে না। বলছে তাদের যে জবানবন্দী আছে সেটাকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক। আদালত তা গ্রহণ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সাক্ষী নিয়ে এমন ঘটনার কোনো নজির নেই। ফলে ক্রমেই ন্যায়বিচারের আশা সুদূর পরাহত হয়ে পড়ছে।
এদিকে সম্মিলিত বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য জোরদার আন্দোলন শুরু করেছে। সে আন্দোলন দমাতে আঠারোদলীয় বিরোধী জোটের সভাপতি-মহাসচিবসহ ৪৪ জনের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর মামলা দিয়ে তাদের কারারুদ্ধ করেছে সরকার। ২৪ মে দৈনিক প্রথম আলো রিপোর্ট করেছে যে, এজাহারে যা বলা হয়েছে প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। সবই ভুয়া ও বানোয়াট। কিন্তু এসব বিষয়ে নিম্ন আদালত আমলে নেননি। তাদের জামিন আবেদন বারবার নাকচ হয়েছে। এখন উচ্চ আদালত ভরসা। সে ভরসা সত্যি আছে কি না, বলতে পারি না।
অর্থাৎ গোটা দেশে এক গুমোট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা পর্যন্ত আশঙ্কা করছেন যে, ফের ১/১১’র পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। তা যদি হয়, তাহলে সেটি হবে আরও ভয়াবহ। সরকার রাষ্ট্রকে যে অবস্থায় নিয়ে গেছে তাতে দেশ এক অনিবার্য গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। আত্মরক্ষার্থে মানুষ রুখে দাঁড়াবেই। কোনো স্বৈরাচারী জনবিচ্ছিন্ন সরকার জনতার সে প্রতিরোধের মুখে টিকতে পারেনি। বর্তমান সরকারও যে  পারবে না সেটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply