অমুসলিমদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা.-এর মহানুভবতা । ড. মো: শফিকুল ইসলাম

অমুসলিমদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা.-এর মহানুভবতা । ড. মো: শফিকুল ইসলামবর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, যখন কোন দল ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হয় তখন সে দলের নেতৃবৃন্দ তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য বৈধ-অবৈধের তোয়াক্কা না করে বিরোধী দলকে ধ্বংস করার জন্য নানা প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। বাহ্যিকভাবে খুব সুন্দর-সুন্দর কথা বললেও বাস্তবে তারা বিরোধীদের দলীয় কাজে বাধা দেয়, তাদের অফিস বন্ধ করে দেয়, বিরোধী নেতৃত্বশূন্য করার জন্য মিথ্যা মামলা দায়ের করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে গণ-গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে গুলি করে পঙ্গু করে, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে বিভিন্নভাবে অমানবিক নির্যাতন করে। এ ছাড়া অপহরণ, খুন ও গুম করে, দলীয় ক্যাডার দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে জনসাধারণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে দেশ ছাড়া করে, নিজেরা অন্যায় করে বিরোধীদের উপর তা চাপানো চেষ্টা করে, ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে জনহিতকর বহু প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় বসে সে দিকে আর তোয়াক্কা করে না। অনেক নেতাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল খোঁজে পাওয়া যায় না। এসব নেতাদের চরিত্র জাহেলি যুগের নেতাদের চরিত্রের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। আমাদের বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা. এসব জাহেলি নেতৃত্বের পরিবর্তন করে ন্যায়নিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. ভিন্ন আদর্শের বিশ্বাসী তথা অমুসলিমদের প্রতি কিরূপ আচরণ করেছেন তা অত্র প্রবন্ধে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করা হয়েছে।
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা. ছিলেন মানবতার একান্ত বন্ধু। তিনি মুসলিম-অমুসলিম সবার প্রতি সমান আচরণ করতেন। সকল মানুষের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা.-এর ক্ষমা, উদারতা ও মহানুভবতা ছিল জীবনের অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য। অন্যধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতা হচ্ছে তাঁর জীবনের অন্যতম দিক। শ্রেণী ও বর্ণ বৈষম্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর জীবনের কামনা ও বাসনা। তিনি একই রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি জোরপূর্বক কোনো অমুসলিমের প্রতি তাঁর প্রচারিত ধর্ম চাপিয়ে দেননি। তিনি ব্যক্তিগত কারণে কোনো দিনও কোনো অমুসলিমের অপরাধের প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। তিনি আপন প্রাণের শত্রুকেও ক্ষমা করে দিতেন। তাঁর ক্ষমা মার্জনা ও মহানুভবতার চারিত্রিক গুণটিই ইসলাম প্রচারে সর্বাধিক অবদান রেখেছে।
বস্তুত রাসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকরা যে সকল অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা লাভ করে থাকে পৃথিবীর অন্য কোনো নির্দিষ্ট আদর্শিক রাষ্ট্রে এর তুলনা বিরল। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র বিরোধী মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় কি? সেখানে সুযোগ-সুবিধা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা তো দূরের কথা, সমাজতন্ত্র বিরোধী কোনো আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। অথচ ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকরা শুধু বেঁচেই থাকে না, বেঁচে থাকার সর্ববিধ অধিকারও লাভ করে থাকে। অমুসলিম নাগরিকদের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা.-ই নিরাপত্তার জিম্মাদার। যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিককে কষ্ট দিবে রাসূলুল্লাহ সা. কিয়ামত দিবসে তার বিপক্ষে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে বিরোধী পক্ষের কোনো অসহায় নারী, শিশু, বৃদ্ধ ধৃত হলে তাদের প্রতি সহনশীল হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অথবা আচার অনুষ্ঠানাদি পালনে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা যাবে না। কিংবা তাদের অধিকার বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধার কোনরূপ পরিবর্তনও আনা হবে না।
রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করে প্রথমেই নবজাত ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য ‘মদিনার সনদ’ তৈরি করেন। এ মৈত্রী চুক্তিটি ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্ব ইতিহাসে এটিই প্রথম লিখিত সংবিধান।
রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর মৃত্যুশয্যায় অমুসলিম নাগরিকদের ব্যাপারে বলেন, “অমুসলিম প্রজাদেরকে আমার দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে অব্যাহত রাখো।”

এক. শত্রুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা.-এর ক্ষমা প্রদর্শন
শত্রুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা.-এর ক্ষমা ও মহানুভবতার বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। আমরা যদি অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব, মাত্র আট বছর পূর্বে যে মক্কা শহর থেকে নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে মুসলমানেরা বহিষ্কৃত হয়েছিল, সেই শহরে আজ তাঁরা বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করছে; যে শত্রুরা তাদেরকে শুধু বহিষ্কার করেই সন্তুষ্ট হয়নি বরং যেখানে যেখানে মুসলমানেরা হিজরত করে আশ্রয় নিয়েছিল সেখান থেকেও তাদেরকে তাড়ানোর জন্য কয়েকবার আক্রমণ করেছে, সেই শত্রুদের উপর আজ মুসলমানেরা জয়লাভ করেছে। এ শহর এবং এর শত্রুরা হাতের মুঠোয় এলো, অথচ না হলো কোন গণহত্যা, না হলো কোন লুটপাট, না হলো কারো জানমাল ও ইজ্জত সম্ভ্রমের উপর হস্তক্ষেপ। পুরানো কট্টর দুশমনদেরও কারো বিরুদ্ধে গৃহীত হলো না প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কায় প্রবেশ করার পূর্বেই তাঁর সাথীদের উদ্দেশে ঘোষণা দেন যে, তোমাদের উপর কেউ আক্রমণ না করা পর্যন্ত তোমরাও কারও উপর আক্রমণ করবে না। তারপর বিনা বাধায় মক্কা শহরে প্রবেশ করেই ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি ঘরের দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি অস্ত্র সমর্পণ করবে সে নিরাপদ, যে ব্যক্তি বিরোধী নেতা আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ। তারপর বিজয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবার পর বিজয়ী সেনাপতি রাসূলুল্লাহর সা. সামনে আনা হলো পুরনো বাঘা বাঘা শত্রুদেরকে। যে শত্রুরা মুসলমানদেরকে ১৩ বছর ধরে অমানুষিকভাবে উৎপীড়ন করে দেশত্যাগী করতে বাধ্য করেছিল। যারা তাঁদেরকে দেশান্তরিত করার জন্য তাঁদেরকে ও তাঁদের আদর্শকে নির্মূল করার জন্য বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধে বিপুল সাজ-সজ্জা করে গিয়েছিল, সেই শত্রুরা আজ তাঁর সামনে অবনত মস্তকে একান্ত অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে। বিজয়ী সেনাপতি রাসূলুল্লাহ সা. তাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘‘তোমরা আজ আমার কাছ থেকে কি রকম ব্যবহার পাবার আশা কর?’’ বিজিতরা পরম অনুতাপের সাথে জবাব দিল, ‘‘আপনি আমাদের একজন মহানুভব ভাই এবং একজন মহানুভব ভাই এর ছেলে।’’ পরাক্রান্ত সেনাপতি রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘‘যাও তোমরা স্বাধীন। আজ তোমাদের কাছে আমি কোনোই কৈফিয়ত চাইব না।’’ শুধু প্রাণ ভিক্ষাই দেয়া হলো তা নয়, বরং আট বছর আগে বিজয়ীদের যে পরিত্যক্ত সম্পত্তি শত্রুরা এতদিন ভোগ দখল করে যাচ্ছিল তাও ছিনিয়ে নেওয়া হলো না, দাবি ছেড়ে দিয়ে ক্ষমা করে দেয়া হলো। রাসূলের সা. কন্যা জয়নব (রা)-এর খুনি হিবার ইবন আসওয়াদ বিনয়ের সাথে ইসলাম গ্রহণ করলে তাকেও ক্ষমা করা হয়। ওয়াহসী ইবন হারব রাসূলের অতি প্রিয় চাচা আমির হামজাকে হত্যা করেছিল। সে ইসলাম গ্রহণ করায় তাকেও ক্ষমা করা হয়। হিন্দা বিনতে উতবা আমির হামজার (রা.) কলিজা টেনে বের করে চিবিয়ে খেয়েছিল। এমন চরম হিং¯্রতা প্রকাশ করা সত্ত্বেও এই মহিলা বিজেতাদের রোষ থেকে অব্যাহতি পেল এবং ক্ষমা পেল। ইসলামের সবচেয়ে বড় শত্রু আবু জিহেলের ছেলে ইকরামা নিজেও ছিল ইসলামের বিরাট শত্রু। সে মুসলমান হয়ে বিশিষ্ট সাহাবীতে পরিণত হলো।
আজকের এই সুসভ্য যুগে দুনিয়ার সুসভ্য জাতিগুলো যখন কোনো শত্রুর শহরে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করে তখন বিজিতদের উপর কি রকম মারাত্মক যুলুম নির্যাতন চালায়, তা সকলেরই জানা আছে। সুতরাং কোন বিবেকবান মানুষ যদি মক্কা বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন তবে তিনি এ কথা বলতে বাধ্য হবেন যে, মুসলমান কোনো সন্ত্রাসী জাতি নয়, জিহাদ ও সন্ত্রাস কখনও এক নয়। ইসলাম কাউকে মুসলমান হওয়ার জন্য বাধ্য করে না। মহান আল্লাহ সূরাতুল বাকারার ২৫৬তম আয়াতে বলেন, ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করে লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়েছে। অনুরূপ সুপারপাওয়ার হওয়ার সুবাদে কমিউনিউজম বা নাস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাশিয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষকেও হত্যা করা হয়। অথচ রাসূলুল্লাহ সা. দশ লক্ষ বর্গমাইল ভূখণ্ডে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আশিটিরও বেশি যুদ্ধ করেছেন। এ সমস্ত যুদ্ধে মাত্র ২৫৫ জন মুসলমান শহীদ হন। বাকি ৭৫৯ জন কাফির নিহত হয়। আর বন্দী হয় ৬৫৪৬ জন। এর মধ্যে মাত্র ২ জনকে মারাত্মক অপরাধের জন্য বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তিনি কোথাও যুদ্ধের জন্য সৈন্যবাহিনী পাঠালে সেনাপতিকে নির্দেশ দিতেন, নারী ও শিশুদের ওপর যেন কোন রকমের নির্যাতন না হয়। গাছ-পালা ও প্রাকৃতিক সম্পদ যাতে নষ্ট না হয়। এখানেই খ্রিষ্টান-ইয়াহুদি তথা অমুসলিম ও মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য। এরপরও মুসলমানদেরকে নির্লজ্জভাবে সন্ত্রাসী বলে পশ্চিমাবিশ্ব মানুষকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চায়।

দুই. অমুসলিমদের অধিকার আদায়ের নির্দেশ
রাসূলুল্লাহ সা. মুসলিমদেরকে অমুসলিমদের অধিকারসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের প্রতি অবিচার করল কিংবা তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করল বা তাকে তার সাধ্যের বাইরে কষ্ট দিল অথবা তার সন্তুষ্টি ছাড়াই কোনো কিছু তার কাছ থেকে কেড়ে নিল। এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে আমি নিজেই ফরিয়াদ জানাবো।” (আস সুনানু আবু দাউদ)
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ রক্তের পবিত্রতা নষ্টকারীদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোন চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যা করবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ চল্লিশ বৎসরের পথের দূরত্ব থেকে অনুভব করা যায়।” ( সহীহুল বুখারী)

তিন. অমুসলিমদের সাথে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ
রাসূলুল্লাহ সা. মুসলিমদেরকে অমুসলিমদের সাথে সদ্ভাব প্রতিষ্ঠার ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশী অমুসলিম হলেও তাদের সাথে সামাজিক সদ্ভাব রক্ষা করে চলতে হবে। আসমা বিনতে আবী বকর (রা)-কে রাসূলুল্লাহ সা. নির্দেশ প্রদান করেন, “তুমি তোমার অমুসলিম মায়ের সাথে সদয় আচরণ করবে।” মুজাহিদ (র) বলেন, আমি একদিন আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা)-এর নিকট বসা ছিলাম। পাশে তাঁর এক গোলাম বকরি জবেহ করে চামড়া খসিয়ে চলছিল। ইবন উমার (রা) গোলামকে উদ্দেশ করে বললেন, চামড়া খসানো শেষ হবার পর সর্বপ্রথম আমার ইয়াহুদি প্রতিবেশীকে দিয়ে গোশত বণ্টন শুরু করো। তখন উপস্থিতদের মধ্য হতে একজন আশ্চর্য হয়ে বলে উঠল, ইয়াহুদি! আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করুন! তখন ইবন উমার (রা) বললেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এভাবেই অসিয়ত করতে শুনেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল যে, তিনি প্রতিবেশীকে আমাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।”

চার. আতিথেয়তা
রাসূলুল্লাহ সা. অমুসলিমদের মেহমানদারি করতে কখনো অনীহা বোধ করতেন না। তাঁর নিকট প্রায়ই অমুসলিম মেহমানদের আগমন ঘটত। তারা অনেক সময় প্রচুর পরিমাণ আহার গ্রহণ করত। একবার এক অমুসলিম সাতটি বকরির দুধ পান করেছিল। রাসূলুল্লাহ সা. নিজ হাতে অমুসলিমদের খাবার পরিবেশন করতেন। তাঁর মেহমানদারি ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কোন কোন সময় অমুসলিম মেহমানরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর মজলিসের শিষ্টাচার ভঙ্গ করত; কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. তাদেরকে ক্ষমা করতেন।

পাঁচ. হাদিয়া আদান-প্রদান
মানবিক ও সামাজিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা. মুসলিম ও অমুসলিমের প্রতি তারতম্য করতেন না। তিনি অমুসলিমদের উপহার উপঢৌকন গ্রহণ করতেন এবং নিজেও তাদের উপহার দিতেন। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. মক্কায় আবু সুফইয়ান (রা)-এর নিকট মদিনা মুনাওয়ারার উৎকৃষ্ট জাতের খেজুর ‘আযওয়া হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন। তখনও তিনি (আবু সুফইয়ান) ইসলাম গ্রহণ করেননি।

ছয়. কুশলাদি জানা ও দেখা সাক্ষাৎ করা
রাসূলুল্লাহ সা. অমুসলিমদের খোঁজ খবর নিতেন, অসুস্থ হলে রোগ শয্যায় গিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করতেন এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানাতেন। কোন অমুসলিম যদি তাঁর সেবা করতে আগ্রহ পোষণ করতেন, তিনি তাকে বাধা দিতেন না। এ সুযোগে কোন কোন ইয়াহুদি তাঁর সাথে অশোভন আচরণ করত; কিন্তু তিনি সর্বদাই তাদের ক্ষমা করতেন।

সাত. অমুসলিমদের আর্থিক সহযোগিতা দান
রাসূলুল্লাহ সা. অমুসলিমদের বিপদাপদে ও অভাব অনটনের সময় তাদেরকে আর্থিক সহযোগিতাও করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা শরীফে দুর্ভিক্ষের সময় সেখানকার দরিদ্র ও অভাবীদের নিকট বিতরণের জন্য পাঁচশত দিনার পাঠিয়ে ছিলেন।

উপসংহার
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা. সমস্ত সৃষ্টির জন্য অপার রহমত। তিনি পথভ্রষ্ট মানুষকে দিয়েছেন সঠিক পথের ঠিকানা। যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত, নিপীড়িত মানুষের সামনে পেশ করেছেন অধিকার ও মর্যাদার সোনালি সওগাত। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিশৃঙ্খল, অধঃপতিত সমাজকে সুশৃঙ্খলতা, নৈতিকতা, শান্তি ও সৌভ্রাতৃত্বের পতাকাতলে সমবেত করেন। বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেন চিরন্তন কল্যাণকর সমাজের রূপরেখা। আজকের এই পথভ্রান্ত ও অশান্ত বিশ্বে মহানবী সা.-এর শান্তি, সম্প্রীতি, মানবমর্যাদা ও মানবাধিকারের আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।

লেখক : প্রফেসর, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply