অর্থনীতি আসলেই কোন পথে? -মাসুমুর রহমান খলিলী

বাংলাদেশের অর্থনীতির খবর প্রায়ই চাঞ্চল্য তৈরি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। কয়েক সপ্তাহ আগে আইএমএফের এক রিপোর্ট নিয়ে হইচই পড়ে যায়, যেখানে বলা হয়েছিল বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই রিপোর্টকে ভারতের বিরোধী দল সরকারের অর্থনৈতিক নীতির দেউলিয়াত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির প্রশংসা করছেন ভারতের অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরাও।
বাইরে থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যারা পর্যবেক্ষণ করেন, এমনকি বিশ্বব্যাংক আইএমএফ অথবা এডিবিও সরকার যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে তার ওপর ভিত্তি করে প্রণীত। ব্যাষ্টিক পর্যায়ে জনমানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা যাচাই করে, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক মিলিয়ে দেখার সুযোগ ততটা হয়ে ওঠে না এসব সংস্থার পক্ষে; যদিও মাঝে মধ্যে সরকারের তুলে ধরা নানা সূচকের অসঙ্গতি নিয়ে দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদদের কথা বলতে দেখা যায়। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানই শেষ পর্যন্ত রেফারেন্স হিসেবে থেকে যায়।
সামষ্টিক অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের উজ্জ্বল চিত্র
বৃহত্তর অর্থনৈতিক সূচকগুলোর সর্বশেষ যে চিত্র বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করেছে, তাতে বৈদেশিক খাতে পুনরুদ্ধারের কিছু প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষত রেমিট্যান্স খাতে অর্থবছরের প্রায় পুরো প্রথমার্ধ জুড়ে উচ্চ হারে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রেমিট্যান্স ২০২০ সালের জুলাই-অক্টোবর সময়ে ৪৩.২৫ শতাংশ বেড়ে আট হাজার ৮২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আগের বছর একই সময়ে ২০.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল রেমিট্যান্স।
সাধারণভাবে বলা হচ্ছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান সীমিত হয়ে আসার কারণে প্রবাসীরা তাদের শেষ সম্পদ বিক্রি করে দেশে চলে আসার ফলে রেমিট্যান্স বাড়ছে। একই প্রবণতা পাকিস্তানসহ আরো কয়েকটি দেশে দেখা যাচ্ছে।
তবে এর পাশাপাশি কোভিড উত্তর সময়ে নতুন কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজের সুযোগও বাড়ছে। বিশেষত ইউরোপে শ্রম সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আবার দক্ষ অদক্ষ শ্রমিক নিতে শুরু করেছে। রেমিট্যান্সের পেছনে বাংলাদেশ থেকে পাচার করে নেয়া অর্থ সাদা করা অথবা দুই শতাংশ নগদ সহায়তার ‘লোভে’ আবার দেশে টাকা ফেরত আনার একটি প্রবণতার যে কথা বলা হচ্ছে সেটি কিছুটা সত্য হতে পারে। এর পরও অর্থের এই অন্তঃপ্রবাহের ইতিবাচক দিকটি হলো, রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নতুন পুঁজির প্রবেশ ঘটছে।
রফতানি খাতেও কিছুটা পুনরুদ্ধারের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০২০ সালের জুলাই-অক্টোবর সময়ে রফতানি আয় প্রায় ১ শতাংশ বেড়ে ১২ হাজার ৮৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ৬.৮২ শতাংশ কমে গিয়েছিল। দুই বছর আগের স্বাভাবিক সময়ের সাথে তুলনা করা হলে এই সময়ে যদিও রফতানি আয় ৬ শতাংশের কাছাকাছি কম রয়েছে, তবুও পোশাকের নতুন ক্রয়াদেশের যে প্রবণতার কথা বিজিএমইএ সূত্রগুলো থেকে জানা যাচ্ছে, তাতে রফতানি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশ্য এটি ঠিক যে, বিশ্ব বাজারের চাহিদা যতটা বাড়ছে ততটা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাহিদা চাঙ্গা হচ্ছে না। আমদানি চিত্রে সেটিই স্পষ্টভাবে দেখা দিচ্ছে। ২০২০ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সাড়ে ১১ শতাংশের কাছাকাছি, আমদানি কমে গেছে। দেশের ভেতরে চাহিদার মধ্যে এক ধরনের মন্দা বিরাজ করার কারণে এটি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে রফতানি কিছুটা বৃদ্ধি এবং উচ্চ হারের রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির সাথে আমদানি কম থাকার প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ভারসাম্য ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে পড়ছে।
২০২০ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে তিন হাজার ৫৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে। গত বছর একই সময়ে এতে ৭১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি ছিল। এই সময়ে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত হয়েছে বিপুল রেমিট্যান্স অন্তঃপ্রবাহ এবং পণ্য এবং পরিষেবা খাতে বাণিজ্যঘাটতি কমে যাওয়ায়। এর প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও দৃশ্যমান হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৮.৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর ৪০.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ তথ্য মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৪ নভেম্বর ২০২০ এ আরো বেড়ে ৪১.১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ১৫ নভেম্বর ২০১৯ এর ৩১.৮৫ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের সাথে তুলনা করা হলে এটি ইতিবাচক চিত্র।

আলোচিত সাফল্যের পেছনে কি বৈদেশিক খাত?
আইএমএফের সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি চার শতাংশ বেড়ে হতে পারে এক হাজার ৮৮৮ ডলার। আর এ সময়ে ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি ১০ দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে, হতে পারে এক হাজার ৮৭৭ ডলার। অর্থাৎ, এই প্রথম মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ ১১ ডলার এগিয়ে যেতে পারে।
স্বাভাবিকভাবেই আইএমএফের এই রিপোর্ট নিয়ে ভারতজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করে বলেন, পাঁচ বছর আগেও যেখানে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি ছিল, সেখানে আইএমএফের রিপোর্ট অনুযায়ী ভারত বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে যেতে পারে। মোদি সরকারের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার এটাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি সমিতির প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসুও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে ভারতের সার্বিক অর্থনীতি নিয়ে তিনি তার আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছেন।
ভারতের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক দীপঙ্কর দাশগুপ্ত অবশ্য বলেন, মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে যে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে খুব মাথা ঘামাচ্ছি না। কারণ, ভারত এবং বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে কোনো তুলনাই চলে না। ভারতের জনসংখ্যা অনেক বেশি। জিডিপির সামান্য হেরফেরে মাথাপিছু জিডিপির অনেকটা তফাত হয়ে যায়। আইএমএফের রিপোর্টই বলছে, ২০২১-২২ আর্থিক বছরে ভারতের সম্ভাব্য মাথাপিছু জিডিপি আট দশমিক দুই শতাংশ বেড়ে দুই হাজার ৩০ ডলার হবে। সেখানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি পাঁচ দশমিক চার শতাংশ বেড়ে এক হাজার ৯৯০ ডলার হবে।
দীপঙ্করের মতে, ভারতের অর্থনীতির অবস্থা মোটেই খুব আশাপ্রদ নয়। চলতি আর্থিক বছরের প্রথম অধ্যায়ে ২৩ শতাংশের বেশি জিডিপির পতন হয়েছে। করোনাকালে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জিডিপির পতন হয়েছে। কিন্তু ভারতের যে হারে পতন হয়েছে তা বিস্ময়কর। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ালেও চলতি অর্থবছরে ভারতের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ পতন হবে। এখন পরিষ্কার, মোদি সরকারের আমলে ভারতের অর্থনীতি ক্রয় খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ অবশ্য রিপোর্টে বলেছে, ২০২০ সালে ভারতের মাথাপিছু পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) ছয় হাজার ২৮৪ ডলার; বাংলাদেশের পাঁচ হাজার ১৩৯ ডলার।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের একটি সাফল্য হলো, বৈদেশিক বিনিময় হারকে তারা স্থির রাখতে পেরেছেন। এক সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা আইএমএফ টাকার প্রকৃত বিনিময় হার বা রিয়ার বের করে যে মান নির্দেশ করত সেভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ করতেন। বর্তমান সরকার এসে সেই ধারা বন্ধ করে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের টুলস ব্যবহার করেই বৈদেশিক মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে। যখনই রফতানি কমেছে তখনই আমদানি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, রেমিট্যান্সের টেকসই প্রবৃদ্ধি ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে রাখার সুবিধা দিয়েছে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের। ফলে দেখা গেছে, এই সরকারের ১২ বছরে যেখানে ৮০ শতাংশের উপরে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেখানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ছিল ৬ শতাংশের নিচে। এর আগে কোনো সময় বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এবং অবমূল্যায়নের এই রকম ব্যবধান লক্ষ করা যায়নি। পাকিস্তানে হয়েছে বাংলাদেশের উল্টো। একসময় বাংলাদেশী টাকার মান পাকিস্তানি রুপির কাছাকাছি থাকলেও এখন টাকার মান পাকিস্তানি রুপির প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের রুপির অবমূল্যায়ন সেই তুলনায় কিছুটা কম হলেও বাংলাদেশের এক টাকায় যেখানে ভারতীয় ৫৫ পয়সা পাওয়া যেত এখন সেখানে পাওয়া যাচ্ছে ৮৭ পয়সা। এ কারণে ডলারের হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের আয় গত ১০ বছরে অনেক বেশি বেড়েছে। এলডিসি দেশ থেকে মাঝারি আয়ের দেশের তালিকায় বাংলাদেশ উন্নীত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
স্থানীয় মুদ্রার মান ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রার অন্তঃপ্রবাহ উচ্চ পর্যায়ে রাখার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র কৌশল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সময় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাথে টানাপড়েন তৈরি হলেও প্রতিবেশী ভারতের সাথে কৌশলগত অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে। ফলে ভারতের মিত্র পশ্চিমা এবং একই সাথে ইসরাইল লবি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে বড় রকমের বৈরী ভূমিকা রাখেনি। একই সাথে পদ্মা সেতুসহ বড় প্রকল্পগুলোতে বেহিসাবি চীনা বিনিয়োগের সুযোগ পাবার ফলে বাংলাদেশের মাত্র কয়েক বছরে বিদেশী দায়দেনা দ্বিগুণ হলেও বৈদেশিক মুদ্রার অন্তঃপ্রবাহে এক ধরনের প্রাযুর্য সৃষ্টি হয়েছে। এর সাথে বড় এক আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অব্যাহত মূল্য হ্রাস। এর সুবিধা ভোক্তাদের না দিয়ে সরকার তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কাজে লাগিয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের অমানিশা কাটবে কি?
কোভিড-১৯ এর মতো মহামারীজনিত অর্থনৈতিক সঙ্কটের পাশাপাশি বাংলাদেশে অর্থনীতির গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে রাজস্ব আদায়ে ভয়াবহ দুর্বলতা। বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেনি। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে মে ২০২০ সাল পর্যন্ত যে হিসাব পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায়, জুলাই থেকে মে পর্যন্ত অর্থবছরের ১১ মাসে মাত্র ১.৭৩ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ৫০ শতাংশের বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল। সংশোধিত বাজেটের বাস্তবতার বাইরে গিয়ে প্রক্ষেপণের কারণে, এবারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও ৫০ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। গত অথচ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ৩ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মাত্র ৪.১১ শতাংশ রাজস্ব বাড়াতে পেরেছে। অর্থবছরের শেষ ৩ মাসে দেশে যদি করোনা পরিস্থিতির বড় অবনতি না ঘটে তাহলে আগের বছরের ভিত্তি সময়ের দূরাবস্থার কারণে বড় হারে প্রবৃদ্ধি হতে পারে, কিন্তু এর পরও রাজস্ব আদায়ের বর্তমান প্রবণতা অনুসারে অর্থবছরের শেষ নাগাদ ৩০ শতাংশের বেশি রাজস্ব ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
পরিসংখ্যান নিয়ে নানা বিতর্কের পরও সরকার অব্যাহতভাবে জিডিপির উল্লম্ফন প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে যাচ্ছে। করোনা আক্রান্ত বিগত অর্থবছরে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো ১/২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করেছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধি হিসাব করেছেন ৫.২২ শতাংশ। চূড়ান্ত হিসাবে সেটিই অর্জিত হয়েছে বলে দেখানো হতে পারে। এখন যে অর্থবছর চলছে তাতে ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হতে পারে বলে অর্থমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। অথচ একই সময়ে ভারতে ৯/১০ শতাংশ ‘ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি’র আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জিডিপির প্রভাব কতটা মাঠে ময়দানে?
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা প্রচার করতে সব সময় প্রবৃদ্ধির হিসাব তুলে ধরা হয়। বাড়তি জাতীয় আয়ের অংশ কারা পাচ্ছে, সেটি খুব একটা বাছ বিচার করা হয় না। করোনার মধ্যেও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলে জানানো হচ্ছে; অথচ বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান নতুন সৃষ্টি হওয়া তো দূরের কথা বরং হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেতন কমানোর যে রেকর্ড বাংলাদেশে আগে কোনো দিন শোনা যায়নি, সেটি এখন দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি খাতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেতনভাতা কমিয়ে দেবার খবর আসছে। দেশের বিভিন্ন ক্রেডিবল সংস্থার জরিপেও দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের বিপুল অংশ দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র, মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র এবং ধনী থেকে মধ্যবিত্তে অবনমিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্মসংস্থান বেকারত্ব আধাবেকারত্ব এসবের ক্রেডিবল ও হালনাগাদ উপাত্ত প্রকাশ করে না। ফলে অর্থনীতির বিকাশের যে চিত্র তার প্রভাব ব্যক্তিজীবনে মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে প্রতিনিয়ত জনজীবনে হাট-বাজারে যা দেখা বা অনুভব করা যায় তাতো আর পাল্টানো যায় না। সেই বাস্তব দৃশ্যপটের সাথে সরকারের দেখানো চিত্রের মিল খুব কমই পাওয়া যায়।
তবে সরকারের অনাহার ঠেকানো অথবা দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠেকাতে বাজারে হস্তক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর দেখা যায়, যেটি আগে কদাচিৎ লক্ষ করা যেত। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কেউ থুড়থুড়ে বৃদ্ধের সৌন্দর্যের প্রশংসা করলে তার মধ্যেও এক ধরনের পুলক অনুভবে আসে। আমাদের অর্থনীতি ভালোর মধ্যে ডুবে আছে বলে যে আবহ তৈরির চেষ্টা রাষ্ট্রীয়ভাবে হচ্ছে তাতে মানুষের মধ্যে এই ধরনের সুখানুভূতি কিছুটা সৃষ্টি হলে তা তার মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। সেটি এই করোনা সময়ে অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়া মানুষের জন্য অনেক বড় সান্ত¡না।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply