‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স ম্যান’ এবং ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান’ -সাদমান সাদী

শিশুবেলার ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ ছড়াটি অনেকেরই জানা। যার কয়েকটি লাইন- “অল দ্য কিং’স হর্সেস অ্যান্ড অল দ্য কিং’স মেন/ কু’ডন্ট পুট হাম্পটি টুগেদার অ্যাগেইন” অর্থাৎ যে ডিম পড়ে একবার ভেঙে গেছে তা হাজার চেষ্টা করেও আর জোড়া লাগানো যায় না। নীতি-নৈতিকতা ডিমের মতোই। একবার তার স্খলন হলে আর জোড়া লাগানো যায় না।
বাংলাদেশের মানুষের আস্থা বহু আগেই এই ভোটারবিহীন সরকারের উপর থেকে উঠে গেছে। এখন আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই হোক আর গোপন নির্বাহী আদেশেই হোক খুনি দুই ভাইকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা কতটুকু সফল হবে তা সময়ই বলে দিবে কিন্তু মানুষ যে এই কথায় আস্থা রাখেনি, বিশ্বাস করেনি তা হলফ করে বলার প্রয়োজন নেই। আপনি আপনার আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞস করেন দেখুন কয়জন এই কথা বিশ্বাস করে।
‘গণমাধ্যম হিসেবে আজ আমরা মুক্ত হলে প্রতিবেদনটি নিয়ে আরও গভীর আলোচনা করতে পারতাম এবং এটি নিয়ে পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করে এর পেছনের সত্যটা বের করতে পারতাম।’- ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের এই কথার আলোকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনতা ভোগ করছে এর একটি ধারণা পাওয়া যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমরা এই নীতিতে ঐকমত্য হয়েছি যে দেখবো, শুনবো, কিন্তু কিছু বলবো না।

ওয়াশিংটন পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নৈতিক স্খলন নিয়ে ‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স ম্যান’ আর সম্প্রতি আল জাজিরার ডকুফিল্ম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মাফিয়াতন্ত্র নিয়ে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান’। দু’টির মধ্যে পার্থক্য অনেক। একটি ১৯৭৩ এবং অপরটি ২০২১ সাল। সময়ের ব্যবধান অনেক। সবচেয়ে পার্থক্য হলো ‘অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স ম্যান’ তার প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কার্যালয়ে আড়িপাতা যন্ত্র বসানোর মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার কূটকৌশল প্রকাশ এবং এর মাধ্যমে প্রমাণ করা গেছে নিক্সনের নৈতিক স্খলন কিন্তু ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স ম্যান’ এর মাধ্যমে গোটা একটি রাষ্ট্রের মাফিয়াতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে। যেখানে খোদ প্রধানমন্ত্রী, সেনাবাহনী প্রধান থেকে শুরু করে এ সময়ের পাড়ার মাস্তান পর্যন্ত সম্পৃক্ত।
একটি রাষ্ট্র কিভাবে মাফিয়া রাষ্ট্র হয়। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অ্যাকাডেমিক আলোচনা অনেক থাকতে পারে কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আপনি বলুনতো- এখানে কি কথা বলার স্বাধীনতা আছে? প্রশাসন বা রাষ্ট্রের দুর্নীতির কথা বলে আপনি কি নিরাপদে থাকতে পারবেন? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে শত শত সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষকে কি কারাগারে যেতে হচ্ছে না?

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নির্বিচারে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়নি? প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র কর্তৃক গুম-খুনের শিকার হচ্ছে না মানুষ? জনগণের টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট হচ্ছে না? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা গায়েব হয়নি? আগের রাতে ১৮ কোটি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ হয়নি? সমস্ত রাষ্ট্র যেন একটি পরিবারের কাছে জিম্মি। সুতরাং মাফিয়া রাষ্ট্র হওয়ার জন্য আর কী কী উপাদান লাগে আমার জানা নেই!
ওয়াটারগেট নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে নিক্সনের বিরুদ্ধে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে খুশি ছিল না নিক্সন প্রশাসন। নিক্সনের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত যুদ্ধ শুরু করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। এসব প্রতিবেদন মিথ্যা তথ্যে পরিপূর্ণ বলেও দাবি করা হয়েছিল। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনের সমালোচনায় মুখর ছিল হোয়াইট হাউজ। ঠিক যেমনটা এখন দেখা যাচ্ছে। সরকারের প্রতিটা স্তর থেকে এর প্রতিবাদ হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী আইএসপিআর, সেনাবাহিনী প্রধান কেউ বাদ যায়নি। হাইকোর্ট পর্যন্ত এই প্রতিবেদন সরাতে নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে যেকোনো কারণেই হোক আস্থা রাখতে পারছে না। সরকারের মত তারাও সমালোচনায় মুখর। ঠিক যেমনটা করেছিলো ওয়াশিংটন পোস্ট নিয়ে। তখনকার অন্যান্য গণমাধ্যমের সন্দেহ ছিলো প্রবল। ওয়াটারগেট নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে শুরুর দিকে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছিল তার গুরুত্ব অন্যান্য গণমাধ্যম বুঝতে পারেনি। শুধু তাই নয়, ‘লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস’ ও ‘ওয়াশিংটন স্টার-নিউজ’ ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনগুলো সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে প্রতিবেদন করেছিল। এছাড়া পোস্টের একটি প্রতিবেদনের তথ্য না ছাপিয়ে হোয়াইট হাউজের ঐ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের সংবাদ ছেপেছিল ‘শিকাগো ট্রিবিউন’ ও ‘ফিলাডেলফিয়া ইনক্যোয়ারার’। এখন বাংলাদেশের সরকার অনুগত গণমাধ্যমও তাই করছে-বিবৃতি দিয়ে এই প্রতিবেদনের বিরোধিতা করছে।

সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে যে ব্যাকডেট দিয়ে খুনের মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে জেনারেল আজিজের দুই ভাইকে। কারণ দুই বছর পূর্বের মামলা থেকে অব্যাহতির খবর খোদ আইনমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই জানেন না। সত্যিই সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!
ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, এফবিআই-এর তদন্ত ইত্যাদি কারণে নিক্সন প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছিল। এই ঘটনা তদন্তে সিনেটে একটি কমিটিও গঠন করা হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, নিক্সন ইম্পিচমেন্টের শিকার হলেন। ১৯৭৪ সালের ৯ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। এখানেই বাংলাদেশের ব্যতিক্রম। ভোটারবিহীন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান কি সেটা করবেন! স্বপ্ন দেখা যেতেই পারে! কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ঘটনা ব্যতিক্রম। এখানে গণ আন্দোলন ছাড়া একটা স্বৈরাচারী সরকার হটানো সম্ভব নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply