আইন পেশার বৈচিত্র্য এবং পরিসর -তারিক আদনান

[গত সংখ্যার পর]

১৩. প্রাথমিক পরীক্ষা (Preliminary Examination) ও পাস নম্বর
সঠিকভাবে আবেদনকারী সকল প্রার্থীকে ১০০ নম্বরের প্রাথমিক পরীক্ষায় (Preliminary Examination) অবতীর্ণ হতে হবে। উক্ত পরীক্ষা MCQ (Multiple Choice Question) পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হবে এবং উক্ত পরীক্ষায় মোট ১০০টি থাকবে ও প্রতিটি MCQ এর মান হবে ১ (এক) নম্বর। তবে প্রতিটি MCQ এর ভুল উত্তরের জন্য ০.২৫ নম্বর কর্তন করা হবে। কোটার সুবিধাভোগী প্রার্থীসহ সকল প্রার্থীকেই লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রাকযোগ্যতা হিসেবে প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রাথমিক পরীক্ষায় ন্যূনতম পাস নম্বর হবে ৫০। প্রাথমিক পরীক্ষায় সাধারণ বাংলা, সাধারণ ইংরেজি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ, সাধারণ গণিত, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা এবং আইন বিষয়সমূহের ওপর প্রশ্ন করা হবে। প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর কোন প্রার্থীর লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের সাথে যোগ করা হবে না।

১৪. লিখিত পরীক্ষা, এর মানবন্টন ও সিলেবাস
নিম্ন বর্ণিত বিষয় ও নম্বরের ভিত্তিতে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে :
প্রার্থী মোট ১০০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবেন। লিখিত পরীক্ষা পাস নম্বর গড়ে ৫০। কোন বিষয়ে ৩০ নম্বরের কম পেলে প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হিসেবে গণ্য হবেন।

১৫. পরীক্ষার স্থান ও তারিখ
কমিশন সকল পরীক্ষা ঢাকায় গ্রহণ করবে। তবে দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রার্থীর সংখ্যা এবং এতদসংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনাক্রমে কমিশন দেশের বাইরে কোনো স্থানেও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। প্রাথমিক, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার তারিখ কমিশনের ওয়েবসাইট এবং দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি মারফত জানানো হবে।
১৬. পরীক্ষার ভাষা
কমিশন ভিন্নরূপ নির্দেশনা প্রদান না করলে একজন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার কোন একটি বিষয়ে বাংলা বা ইংরেজি যে কোন একটি ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন, তবে একই বিষয়ে আংশিক বাংলা বা আংশিক ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন না।
১৭. লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ভিন্নরূপ উল্লেখ না থাকলে লিখিত পরীক্ষার বিষয়সমূহে গড়ে ৫০% নম্বর পেলে একজন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন মর্মে গণ্য হবেন। কোন পরীক্ষার্থী লিখিত পরীক্ষার কোন বিষয়ে ৩০% এর কম নম্বর পেলে তিনি লিখিত পরীক্ষায় অকৃতকার্য বলে গণ্য হবেন। প্রতিটি বিষয়ের পরীক্ষা দেয়ার জন্য নির্ধারিত সময় হবে তিন ঘণ্টা।
১৮. উত্তরপত্রের গোপনীয়তা
পরীক্ষার সকল উত্তরপত্র গোপন দলিল হিসেবে গণ্য হবে এবং তা কোন পরীক্ষার্থীকে বা তার প্রতিনিধিকে দেখানো হবে না। উত্তরপত্র নিরীক্ষার জন্য কোন দরখাস্ত বিবেচনা করা হবে না।
১৯. মৌখিক পরীক্ষা
(ক) মৌখিক পরীক্ষার জন্য মোট ১০০ নম্বর নির্ধারিত থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় কৃতকার্য পরীক্ষার্থীগণকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হবে। মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীর আইন সম্পর্কিত জ্ঞান, সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, হাতের লেখার স্পষ্টতা, মানসিক সতর্কতা, মানসিক শক্তি, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বাচনভঙ্গি, নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলি ও ব্যক্তিত্বের অন্যান্য দিক এবং পাঠ্যক্রমবহির্ভূত ক্রিয়াকলাপ যেমন- খেলাধুলা, বিতর্ক, শখ ইত্যাদি বিবেচনা করা হবে। কোন প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় ৫০%-এর কম নম্বর পেলে তিনি অকৃতকার্য হবেন।
(খ) সরকারি অফিস বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত বা আধা-সরকারি সংস্থায় চাকরিরত প্রার্থীদেরকে মৌখিক পরীক্ষার সময় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ/যথাযথ কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ মন্ত্রণালয়/উক্ত সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের নিকট হতে অনাপত্তিপত্র দাখিল করতে হবে।
(গ) কমিশন কর্তৃক মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের সময়- শিক্ষা বোর্ড, ইনস্টিটিউট ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত মূল অথবা সাময়িক সনদপত্র, মূল মার্কশিট এবং ৮ (ঙ) দফায় বর্ণিত অন্যান্য সনদপত্রের মূলকপি ও এক সেট ফটোকপি প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায় মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে না এবং প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।
২০. স্বাস্থ্য পরীক্ষা
(ক) লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কৃতকার্য প্রার্থীগণকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড অথবা ক্ষেত্রবিশেষে, তৎকর্তৃক মনোনীত কোন মেডিক্যাল অফিসারের নিকট উপস্থিত হতে হবে। মহাপরিচালক এরূপ স্বাস্থ্য পরীক্ষার স্থান, তারিখ, সময় এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ কমিশন সচিবালয়কে অবহিত করলে তা প্রার্থীগণকে যথাসময়ে কমিশনের ওয়েবসাইট এবং দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি মারফত অবহিত করানো হবে।
(খ) কোন পুরুষ প্রার্থীর উচ্চতা ও ওজন যথাক্রমে ১.৫২৪ মিটার ও ৪৫ কেজি এবং মহিলা প্রার্থীর উচ্চতা ও ওজন যথাক্রমে ১.৪৭৩ মিটার ও ৪০ কেজির কম হলে তিনি নিয়োগের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
(গ) প্রার্থীগণকে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের প্রবেশপদে নিয়োগবিষয়ক আদেশ, ২০০৭’ এর ৩য় তফসিল অনুযায়ী দৃষ্টিশক্তি এবং অন্যান্য শারীরিক সক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে।
(ঘ) প্রার্থী সংক্রামক ব্যাধি হতে মুক্ত এতদ্মর্মে কোন মেডিক্যাল অফিসার কর্তৃক স্বাক্ষরিত সনদপত্র উপস্থাপন করতে হবে।
(ঙ) কোন প্রার্থী নিয়োগযোগ্য হবেন না, যদি উক্ত মেডিক্যাল বোর্ড বা মেডিক্যাল অফিসার এই মর্মে প্রত্যয়ন না করেন যে, উক্ত ব্যক্তি স্বাস্থ্যগতভাবে অনুরূপ পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য এবং তিনি এরূপ কোন দৈহিক বৈকল্যে ভুগছেন না যা সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব পালনে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
(চ) মেডিক্যাল বোর্ড বা ক্ষেত্রমত মেডিক্যাল অফিসার কর্তৃক একজন প্রার্থীকে কোন খুঁত বা ত্রুটির কারণে অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হলে উক্ত খুঁত বা ত্রুটিসহ অযোগ্যতা ঘোষণার বিষয়টি প্রার্থীকে জানানো হবে। প্রার্থী উক্ত ঘোষণা সম্পর্কে অবগত হবার চৌদ্দ দিনের মধ্যে উক্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কমিশন বরাবর আপিল করতে পারবেন।
(ছ) আপিলকারীর স্বাস্থ্য পুনরায় পরীক্ষা সংক্রান্ত আপিল শুনানি হবে কিনা তদ্বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
(জ) কমিশন আপিলকারীর স্বাস্থ্য পুনরায় পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেডিক্যাল আপিল বোর্ড গঠন করবেন এবং উক্ত বিষয়ে মেডিক্যাল আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
(ঝ) স্বাস্থ্য পরীক্ষার সফল সমাপ্তি কোন প্রার্থীকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের প্রবেশপদে নিয়োগের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিবে না।
২১. মিথ্যা তথ্য দাখিল
যদি কোন প্রার্থী সজ্ঞানে কোন মিথ্যা তথ্য দাখিল করেন বা এমন কোন তথ্য দাখিল করেন যা তিনি মিথ্যা মর্মে বিশ্বাস করেন বা কোন তথ্য গোপন করেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন জাল সনদপত্র দাখিল করেন বা কোন দলিলে তার বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা বা প্রার্থিতা সম্পর্কিত কোন তথ্য ঘষামাজা বা পরিবর্তন করেন, অথবা পরীক্ষার হলে অসদাচরণ করেন, সেই ক্ষেত্রে তাকে উক্ত কার্য বা কার্যসমূহের জন্য যেই পরীক্ষার নিমিত্ত উক্তরূপ কার্য করেছেন তাসহ পরবর্তী এক বা একাধিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য অযোগ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করাসহ তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যেতে পারে।
২২. আবেদনপত্র খামে ভরার পূর্বের সতর্কতা
(ক) সব অনুচ্ছেদ যথাযথভাবে পূরণ করা হয়েছে কিনা?
(খ) আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করা হয়েছে কিনা?
(গ) চালানের মূলকপি আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে কিনা?
(ঘ) আবেদনপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায়, প্রবেশপত্রে ও পরিচিতি প্রতিপাদনপত্রে ছবি আঠা দিয়া লাগানো হয়েছে কিনা? অতিরিক্ত দুই কপি সত্যায়িত ছবি নির্ধারিত জায়গায় স্ট্যাপলার দিয়ে লাগানো হয়েছে কিনা?
(ঙ) সত্যায়িত সার্টিফিকেট ও মার্কশিটগুলো আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে কিনা?
(চ) প্রার্থী যে ঠিকানায় প্রবেশপত্র এবং অন্যান্য পত্র পাইতে ইচ্ছুক সেই সংক্রান্ত সব ঘর পূরণ করা হয়েছে কিনা?
পরীক্ষা প্রস্তুতি
লিখিত পরীক্ষায় আইন অংশে ভালো করতে হলে পড়তে হবে প্রার্থীর সম্মান শ্রেণির আইন-সম্পর্কিত বইগুলো। বাংলা অংশের জন্য নবম থেকে দশম শ্রেণির ব্যাকরণের অধ্যায়গুলো পড়লে প্রশ্ন পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন লেখকের নাম, উক্তি, জন্ম-মৃত্যু সালগুলো জানা থাকলে বাংলা অংশে ভালো করা যাবে। আর গণিতে ভালো করতে হলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণীর বইগুলো বারবার চর্চা করলে প্রশ্ন পাওয়া যাবে। ইংরেজির জন্য গ্রামারগুলো পড়তে হবে মনোযোগ সহকারে। এই গ্রামার অংশ থেকেই বেশি প্রশ্ন থাকে। বাংলাদেশ-আন্তর্জাতিক বিষয় ও দৈনন্দিন বিজ্ঞানের জন্য বাংলাদেশ অংশে বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, জলবায়ু, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, বিভিন্ন জেলার আয়তন, অর্থনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। আর আন্তর্জাতিক অংশের জন্য বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, দিবস, পুরস্কার ও সম্মাননা, সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে প্রশ্ন পাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও বাজারে সাধারণ জ্ঞানের বিভিন্ন প্রকাশনীর বই ও দৈনিক পত্রিকাগুলো পড়লেও কাজে দেবে। আর বারবার চর্চা করতে হবে বিগত বছরের সহকারী জজ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নগুলো।
সুযোগ-সুবিধা ও পদোন্নতি
চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত একজন সহকারী জজ জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৬ অনুযায়ী ৩০৯৩৫ টাকা স্কেলে বেতন পাবেন। জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে একজন সহকারী জজ পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র জজ, যুগ্ম জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজ হতে পারেন।

উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগপ্রক্রিয়া
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পর থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি ঘটে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইনের বিধান অনুযায়ী ভারতীয় উপমহাদেশ পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। ব্রিটিশ আমলের বাংলা প্রদেশের পূর্বাংশের জেলাগুলো পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। ওই আইনের ৯নং ধারার বিধান অনুযায়ী প্রণীত ১৯৪৭ সালের হাইকোর্ট (বেঙ্গল) অর্ডার দ্বারা ঢাকার পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হয় যা ঢাকা হাইকোর্ট নামে পরিচিত ছিল। নবপ্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট পূর্ববঙ্গ, পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানে, প্রদেশে কলকাতা হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি জনাব আক্রাম ও জনাব ওরমন্ড, অতিরিক্ত জনাব টি এইচ এলিস ও জনাব আমিরউদ্দীন আহমেদ ও অস্থায়ী বিচারপতি জনাব আমিন আহমেদকে নিয়ে তখন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট গঠিত হয়েছিল। সংবিধানের ১নং অনুচ্ছেদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি একক, স্বাধীন ও সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পাকিস্তান বা ভারতের মতো ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র না হওয়ায় ওই সকল দেশের মতো বাংলাদেশে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট রাখার প্রয়োজনীয়তা সংবিধান প্রণেতারা সমীচীন মনে করেনি। সেজন্য যুক্তরাজ্যের আদলে বাংলাদেশে আপিল বিভাগে ও হাইকোর্ট বিভাগ নিয়ে ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট’ নামে একটি সর্বোচ্চ আদালত গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি এবং উভয় বিভাগের বিচারপতিদের নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত। প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগে আসন গ্রহণ করেন। সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিগণ কেবল ওই বিভাগে এবং অন্যান্য বিচারপতিগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করেন। বাংলাদেশের রাজধানীতে অর্থাৎ ঢাকায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের স্থায়ী আসন থাকলেও রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে প্রধান বিচারপতি সময়ে সময়ে অন্য স্থানে বা স্থানসমূহে হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশনের ব্যবস্থা করতে পারেন।
প্রধান বিচারপতি : (যিনি ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ নামে অভিহিত হবেন) এবং প্রত্যেক বিভাগে আসন গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি যেরূপ সংখ্যক বিচারক নিয়োগের প্রয়োজন বোধ করবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য বিচারক নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হবে। প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগে নিযুক্ত বিচারকগণ কেবল উক্ত বিভাগে এবং অন্যান্য বিচারক কেবল হাইকোর্ট বিভাগে আসন গ্রহণ করবেন। এই সংবিধানের বিধানাবলি-সাপেক্ষে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন।
বিচারক নিয়োগ
প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন এবং প্রধান বিচারপতির সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগদান করবেন।
বিচারকপদে নিয়োগ লাভের যোগ্যতা
কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক না হলে, এবং
(ক) সুপ্রিম কোর্টে অন্যূন দশ বছরকাল অ্যাডভোকেট না থেকে থাকলে; অথবা
(খ) বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে অন্যূন দশ বছর কোন বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠান না করে থাকলে; অথবা
(গ) সুপ্রিম কোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা না থেকে থাকলে;
তিনি বিচারকপদে নিয়োগ লাভের যোগ্য হবেন না।

বিচারকের পদের মেয়াদ
এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানাবলি সাপেক্ষে কোন বিচারক সাতষট্টি বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের পর্যায়ক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাবে না। (৩) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। (৪) কোন বিচারক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন।
অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ
প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে প্রধান বিচারপতি তাঁর দায়িত্বপালনে অসমর্থ বলে রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে ক্ষেত্রমত অন্য কোন ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণ, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করবেন।
সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত বিচারকগণ
সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির নিকট সুপ্রিম কোর্টের কোন বিভাগের বিচারক-সংখ্যা সাময়িকভাবে বৃদ্ধি করা উচিত বলে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে তিনি যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন এক বা একাধিক ব্যক্তিকে অনধিক দুই বছরের জন্য অতিরিক্ত বিচারক নিযুক্ত করতে পারবেন, কিংবা তিনি উপযুক্ত বিবেচনা করলে হাইকোর্ট বিভাগের কোন বিচারককে ৬৩ [যে কোন অস্থায়ী মেয়াদের জন্য আপিল বিভাগের আসন গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারবেন]: তবে শর্ত থাকে যে, অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত (কোন ব্যক্তিকে এই সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের অধীন বিচারকরূপে নিযুক্ত) হতে কিংবা বর্তমান অনুচ্ছেদের অধীন আরও এক মেয়াদের জন্য অতিরিক্ত বিচারকরূপে নিযুক্ত হতে বর্তমান অনুচ্ছেদের কোন কিছুই নিবৃত্ত করবে না।
আইনজীবী হতে যা যা করণীয়
কেউ শখের বশে, কেউ স্বাধীন পেশা হিসেবে, কেউ বা সেবামূলক পেশার কারণে বেছে নিচ্ছেন আইন পেশাকে। একসময় আইন বিষয়ে পাস করার পর খুব সহজে বার কাউন্সিলের মেম্বার হয়ে ওকিল হওয়া যেত। কিন্তু আজকাল এ পেশা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে বেশি। বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার আদলে তিন ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আইনজীবীর সনদ দেয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়টি ভালো করে না জানার কারণে অনেকেরই সমস্যায় পড়তে হয়। তাই আইনজীবী হওয়ার জন্য কী করণীয়, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল
১৯৭২ সালের বাংলাদেশ আইনজীবী ও বার কাউন্সিল আদেশে বিধান মতে প্রাদেশিক বার কাউন্সিলের স্থলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বর্তমানে আইনের স্নাতকদের অভিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের সাথে ছয় মাস শিক্ষানবিসি করার পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করলে নিম্ন আদালতে ওকালতি করার জন্য অ্যাডভোকেটের সনদ প্রদান করেন। বার কাউন্সিলের তিনজন সদস্যকে নিয়ে গঠিত এনরোলমেন্ট কমিটি সনদ দেয়ার উপযুক্ততা যাচাই করার জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রণয়ন করতেন এবং উত্তীর্ণ প্রার্থীদের বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেটের সনদ প্রদান করতেন। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের কতিপয় বিচারপতিকে এনরোলমেন্ট কমিটির সদস্য করার বিধান করার হয়েছে। বার কাউন্সিলের কতিপয় সদস্য তদ্রুপ বিচারপতিসহ সনদ প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
আইনজীবী হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে দুই প্রকার শর্ত পূরণ করতে হবে :
প্রথম শর্ত
১. তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে;
২. ২১ বছর বয়স পূর্ণ করতে হবে;
৩. নিচের যেকোনো একটি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে :
(ক) বাংলাদেশ সীমার মধ্যে অবস্থিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকতে হবে; বা
(খ) বার কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত বাংলাদেশের বাইরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে ডিগ্রি থাকতে হবে; অথবা
(গ) তিনি যদি একজন ব্যারিস্টার অ্যাট ল হয়ে থাকেন।
দ্বিতীয় শর্ত
(১) উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলে যে কেউ বার কাউন্সিলের একটি ফরম পূরণ করে জমা দিতে পারবেন। সঙ্গে আরো যা দিতে হবে তা হলো :
(ক) আবেদনকারীর জন্মের সনদের সন্তোষজনক সাক্ষ্যপ্রমাণ;
(খ) অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী যোগ্যতার সন্তোষজনক সাক্ষ্যপ্রমাণ;
(গ) আবেদনকারীর চরিত্র ও আচরণ সম্পর্কে ভালো অবস্থানরত দু’জন ব্যক্তির প্রশংসাপত্র;
(ঘ) ফরমে উল্লিখিত তথ্য সত্য ও নির্ভুল মর্মে একটি অ্যাফিডেভিট প্রদান করতে হবে;
(ঙ) এক হাজার ২০০ টাকা প্রদানের রসিদ দিতে হবে।
(২) অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে তাঁকে একজন ১০ বছরের অভিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের চেম্বারে ধারাবাহিক ছয় মাস শিক্ষানবিস কাল অতিক্রম করতে হবে।
পরীক্ষার ধাপসমূহ
প্রথমে ছয় মাস শিক্ষানবিস হিসেবে কাজ করবেন এ মর্মে এমন একজন সিনিয়রের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে হবে। তবে সিনিয়রের কমপক্ষে ১০ বছর নিয়মিত ওকালতি করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁর সঙ্গে থাকবে একটি হলফনামা বা অ্যাফিডেভিট। আর থাকবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুকূলে নির্ধারিত ফির ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার প্রেরণের রসিদ। আইনে স্নাতক পরীক্ষা বা অন্য কোনো ডিগ্রিপ্রাপ্তির পরীক্ষা প্রদানের পরপরই অনতিবিলম্বে উল্লিখিত চুক্তিপত্র, অ্যাফিডেভিট ও ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার প্রেরণের রসিদ বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সেক্রেটারি বরাবর পাঠিয়ে দিতে হবে।
আপনার পাঠানো কাগজপত্র বার কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে বার কাউন্সিল আপনার বরাবর একটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ইস্যু করবে। সেখানে আপনাকে একটা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেয়া হবে। ছয় মাস অতিক্রান্ত হলে অ্যাডভোকেট তালিকাভুক্তির পরবর্তী লিখিত পরীক্ষার তারিখ জানিয়ে আপনাকে ওই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য কিছু কাগজ সংযুক্তি সাপেক্ষে আবেদনপত্র প্রেরণের আহ্বান জানানো হবে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুকূলে পরীক্ষার নির্ধারিত ফি বাবদ নির্ধারিত টাকা ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার বা ব্যাংকে বার কাউন্সিলের অ্যাকাউন্টে নগদ জমা দেয়ার রসিদ। সিনিয়রের কাছ থেকে শিক্ষানবিস সমাপন-সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র। পূর্ণ বিবরণসহ পরীক্ষার্থী ও তার সিনিয়রের স্বাক্ষর, সিলমোহর ও তারিখযুক্ত কমপক্ষে পাঁচটি দেওয়ানি ও পাঁচটি ফৌজদারি মামলার তালিকা, যার শুনানিকালে পরীক্ষার্থী নিজে তাঁর সিনিয়রের সঙ্গে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এগুলোর সঙ্গে থাকতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ, চারিত্রিক সনদ ও ছবি।
পরীক্ষা পদ্ধতি
আবেদন করা প্রার্থীদের প্রথমেই কুইজ বা এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হবে। এরপর ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হবে। এতে পাস নম্বর ৫০। তৃতীয় পর্যায়ে ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হবে। বিচারপতিরা এই মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন করে থাকেন। মৌখিক পরীক্ষায় জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অধীনে প্রার্থী যে বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তা থেকেই প্রশ্ন করা হয়।
পরীক্ষার বিষয়গুলো
ছয়টি বিষয়ের ওপর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এগুলো হলো ফৌজদারি দন্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, দেওয়ানি কার্যবিধি, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, তামাদি ও সাক্ষ্য আইন। প্রতিটি বিষয় থেকে তিনটি প্রশ্ন থাকে এবং একটি উত্তর দিতে হয়।
নিম্ন আদালতে প্র্যাকটিস
মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে আপনি আইনজীবী (নিম্ন আদালতের) হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেন। অর্থাৎ আপনি হয়ে গেলেন অ্যাডভোকেট। এ ক্ষেত্রে আপনি পেয়ে যাবেন বার কাউন্সিলের সদস্যপদ। তবে শুধু সনদ পেলেই হবে না, আপনি যে বারে প্র্যাকটিস করতে চান, সেই বারের সদস্যপদও নিতে হবে।
হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিস
নিম্ন আদালতে দুই বছর আইনজীবী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা থাকলে হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে সনদ নেয়ার যোগ্যতা হয়। তবে হাইকোর্টে ১০ বছরের বেশি প্র্যাকটিস করছেন এমন এক সিনিয়রের সঙ্গে শিক্ষানবিস চুক্তি করতে হয়। আর যদি বার অ্যাট ল ডিগ্রি বা এলএলএম পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর থাকে, তখন বার কাউন্সিল থেকে সনদ পাওয়ার পর এক বছর অতিক্রান্ত হলে আপনি পরীক্ষা দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত হলো, সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র অ্যাডভোকেটের অধীনে আপনাকে এক বছর প্র্যাকটিস করতে হবে এবং এ মর্মে আপনার সিনিয়রের একটা প্রত্যয়নপত্র আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিল করতে হবে।
আপিল বিভাগে প্র্যাকটিস
একজন আইনজীবীর হাইকোর্ট বিভাগে প্র্যাকটিসের বয়স পাঁচ বছর হলে এবং হাইকোর্টের বিচারপতিরা যদি তাকে এই মর্মে স্বীকৃতি দেন যে তিনি আপিল বিভাগে ওকালতি করার জন্য সঠিক ও উপযুক্ত ব্যক্তি, তবে কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন সাপেক্ষে এনরোলমেন্ট কমিটি তাকে আপিল বিভাগে মামলা পরিচালনার সুযোগ দিয়ে থাকে। তবে কাউকে বিশেষভাবে উপযুক্ত মনে করলে এ আনুষ্ঠানিকতা পালন ছাড়াও প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকরা তাকে আপিল বিভাগে প্র্যাকটিসের অনুমতি দিতে পারেন।
ইনকাম ট্যাক্স আইনজীবী
আইনজীবী অন্তর্ভুক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর ট্যাক্স বারের সদস্য হতে হবে। আবেদন করতে হবে নির্ধারিত ফরমে। যারা আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু অ্যাডভোকেট না, তারাও চাইলে আয়কর আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিসের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ট্যাক্স বারের সদস্য পদের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাণিজ্য বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরাও আয়কর আইনজীবী হওয়ার জন্য এনবিআরে আবেদন করতে পারেন। একই সঙ্গে তাদের ট্যাক্স বারের সদস্য হতে হয়। আয়কর আইনজীবীরা আয়কর, সম্পদ, আমদানি শুল্ক, আবগারি শুল্ক ইত্যাদি বিষয়ে মামলা পরিচালনা করেন। তাদের আয়কর অধ্যাদেশ, ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী-এসব বিষয়ে ভালো জ্ঞান রাখতে হয়।
করপোরেট ল প্র্যাকটিস অ্যান্ড লিটিগেশন
যিনি করপোরেশন আইনে বিশেষ জ্ঞান রাখেন, তিনি করপোরেট আইনজীবী। করপোরেট খাতে আইনজীবীদের কাজের ক্ষেত্র দিন দিন বাড়ছে। করপোরেট আইনজীবী হতে হলে কন্ট্রাক্ট ল, কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স ল, অ্যাকাউন্টিং, সিকিউরিটি ল, দেউলিয়া আইন, মেধাস্বত্ব আইন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন জানান, করপোরেট প্র্যাকটিস হলো যেকোনো বিষয়ে আইনগত মতামত, দলিলপত্র ভেটিং, কোম্পানি, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠা বিভিন্ন প্রকার ডকুমেন্টেশন প্রস্তুত, করপোরেট অফিসের ব্যবসায়িক লেনদেনের বৈধতা নিশ্চিতকরণ, করপোরেশনগুলোকে তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে লিগ্যাল অ্যাডভাইজ দেয়া। লিটিগেশন হলো আদালতে মামলা লড়া। আইন বিষয়ে পড়েও বা অ্যাডভোকেট হয়েও কোর্টে প্র্যাকটিস করতে না চাইলে বিভিন্ন ল ফার্মে কাজের সুযোগ পেতে পারেন। ল ফার্মগুলোতে বিভিন্ন কোম্পানির ডকুমেন্টেশন প্রস্তুত, লিগ্যাল অ্যাডভাইস দেয়া, ফাইল তৈরি, মামলার ড্রাফট তৈরির কাজ করতে পারেন।
অন্যান্য
বাংলাদেশে তেমন প্রচলন না থাকলে সাইবার ক্রাইম, ইমিগ্রেশন, স্পোর্টস ও মিডিয়া আইনজীবী হলে দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও পেতে পারেন কাজের সুযোগ। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে সাইবার বিষয়ে নানা ধরনের আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। আর মিডিয়া, মিডিয়াকর্মী বা সেলিব্রিটিদের বিভিন্ন আইনি জটিলতার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের কদর বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে।
আইন শিক্ষা
দেশের প্রচলিত আইন ভালোভাবে না জানলে দক্ষ ও সফল কর্মকর্তা, আইনজীবী ও বিচারক হওয়া যায় না। আর ভালোভাবে আইন জানতে হলে আইন অধ্যয়ন করতে হয়। বর্তমানে প্রত্যেক দেশেই আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ ব্যবস্থা আছে বা স্বতন্ত্র আইন মহাবিদ্যালয় আছে। বাংলাদেশেও কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধীনে আইন বিভাগ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন মহাবিদ্যালয় বা কলেজ আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সুযোগ আছে। ভর্তি পরীক্ষায় থাকতে হবে মেধাতালিকার প্রথম সারিতে, বাংলা ও ইংরেজিতে ন্যূনতম নম্বরের শর্তও জুড়ে দেয় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু আছে আইন বিভাগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যায় নামমাত্র খরচে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুনতে হবে দুই থেকে আট লাখ টাকা। যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্য বিষয়ে অনার্স বা ডিগ্রি পাস করেও আইন পেশায় আসা যায়। এ জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যেকোনো ল কলেজে দুই বছরমেয়াদি এলএলবি (পাস) কোর্স করতে হবে। খরচ হবে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও করা যায় কোর্সটি। এ ক্ষেত্রে গুনতে হবে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।
ব্যারিস্টারি পড়া
যারা ভিন্নধর্মী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের জন্য ব্যারিস্টারি কোর্সটি দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ স্মার্ট ও সম্মানজনক যে কয়েকটি পেশা রয়েছে তার মধ্যে ব্যারিস্টারি অন্যতম। ব্যারিস্টার অ্যাট ল-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে বার অ্যাট ল। একজন ব্যারিস্টার হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার জন্য ৯ মাসের একটি বার প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্স (বিপিটিসি) করতে হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আইনজীবীদের বলা হয় অ্যাডভোকেট। আমেরিকাতে আইনজীবীকে বলা হয় অ্যাটর্নি। তেমনি করে অস্ট্রেলিয়ার আইনজীবীকে বলা হয় ব্যারিস্টার। এভাবে বিভিন্ন দেশে আইনজীবীকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। ঔপনিবেশক দেশ যুক্তরাজ্য হওয়ার কারণে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সত্ত্বেও ঔপনিবেশক মন স্বাধীন না হওয়ার কারণে বাংলাদেশে ব্যারিস্টারকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়।
যোগ্যতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ওপর অনার্স ও মাস্টার্স করেও কেউ সরাসরি ইংল্যান্ডে প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন না। অর্থাৎ ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের অধিভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেউ যদি অনার্স পাস করে তবে তাকে বার প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সে ভর্তি হতে হলে আবার নতুন করে কোনো ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে এলএলবি বা এলএলএম পাস করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা একটা বিশেষ সুবিধা পান, তা হলো তাদের অনার্সের মোট ১২টি বিষয়ের মধ্যে তিনটি বিষয় কম পড়লেই চলে।
এ কোর্সে প্রতি বছরই পাঁচ হাজারের মতো আবেদন জমা পড়ে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত দক্ষতা, ভাষার দখল, সাংগঠনিক দক্ষতা এসব বিষয় বিবেচনায় এনে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করা হয়। সম্প্রতি আইইএলটিএস স্কোরও দেখা হচ্ছে। আবেদনের ক্ষেত্রে স্কোর ৭.৫ বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া হয়।
দেশে বসেই ইংল্যান্ডের ডিগ্রি
আমাদের দেশে ব্রিটিশ স্কুল অব ল, লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ, ভূঁইয়া একাডেমী, নিউ ক্যাসেল ল একাডেমী এই চারটি টিউশন সার্ভিস প্রোভাইডার বার অ্যাট ল পড়ালেখার বিষয়ে সহযোগিতা করে থাকে।
এইচএসসি বা সমমানের ডিগ্রিধারী যে কেউ ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃত তিন-চার বছর মেয়াদি এলএলবি অনার্স কোর্সে ভর্তি হতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি মিলে জিপিও ৫ থাকতে হবে। ভর্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো বয়সসীমা নেই। শিক্ষার্থীরা ইংল্যান্ডের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ও একই সময়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকেন। পরীক্ষা নেয়া হয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে। ইংল্যান্ডেই এসব উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। এভাবে দেশে বসেই ইংল্যান্ডের ডিগ্রি পেতে পারেন। এলএলবি করার পর ইংল্যান্ডে সরাসরি বার ভোকেশনাল কোর্সে ভর্তি হওয়া যাবে। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন আর ইউনিভার্সিটি অব নর্দামব্রিয়া দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে ব্রিটিশ ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ দেয়। তবে ঘরে বসে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে আইন বিষয়ে অনার্স করা গেলেও নয় মাসের বার প্রফেশনাল ট্রেনিং কোর্সের জন্য ইংল্যান্ডে যেতেই হবে।
কোথায় পড়বেন?
বার অ্যাট ল কোর্সটি ইংল্যান্ডের চারটি ইন’স-এর যেকোনো একটি থেকে করতে হয়। অর্থাৎ লিন্কনস্ ইন, গ্রেইস ইন, ইনার টেম্পল ও মিডল টেম্পল এই চারটি ইন’স এর মধ্যে যেকোনো একটি আপনাকে বেছে নিতে হবে।
সনদ ইন থেকে দেয়া হলেও কোনো একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করতে হয়। ইন’স অব কোর্ট, স্কুল অব ল, কলেজ অব ল, বিপিপি ল স্কুল, নটিংহ্যাম, নর্দামব্রিয়া, ব্রিস্টল, কার্ডিফ, ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন এই ৯টি প্রতিষ্ঠানে বার অ্যাট ল করা যায়। এর যেকোনো একটিতে পড়তে পারেন। সাধারণত আগস্ট- সেপ্টেম্বরে বার অ্যাট ল কোর্সে ভর্তি করা হয়।
খরচাপাতি
ব্যারিস্টারি পড়া বেশ ব্যয়বহুল। প্রতি বছরই এ খরচ বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে টিউশন ফি কিছুটা কম-বেশি হয়ে থাকে। ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি (অনার্স) ডিগ্রিটা যদি ঘরে বসে নিতে চান, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের টিউশন ফি বাবদ কমপক্ষে ১৯ থেকে ২০ লাখ টাকা লাগবে। ইংল্যান্ডে গিয়ে নিতে চাইলে শুধু টিউশন ফি বাবদ লাগবে ২৬ থেকে ৫৬ লাখ। বার ভোকেশনাল কোর্সের বর্তমান টিউশন ফি ৯ থেকে ১৫ হাজার পাউন্ড। বাংলাদেশি টাকায় এ ফি ১০ থেকে ১৬ লাখ টাকা। বার অ্যাট ল কোর্সটির মেয়াদ ৯ মাস হলেও এটি শেষ করতে এক বছর লেগে যায়। তাই এর টিউশন ফির সঙ্গে এক বছরের থাকা-খাওয়ার খরচ হিসাব করতে হবে। এ খরচ নির্ভর করে জীবনযাত্রার ওপর। এই এক বছরে থাকা-খাওয়া বাবদ পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা গুনতে হবে। ইধৎ ধঃ খধি সম্পন্ন করতে সম্ভাব্য ব্যয় হতে পারে ৬৩ লাখ থেকে এক কোটি টাকার মতো।

খন্ডকালীন কাজের সুযোগ
ইংল্যান্ডে যারা ব্যারিস্টারি পড়তে যান, পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীরা নতুন নিয়মে সপ্তাহে ১০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। যদিও এ সময় পড়ার চাপে খণ্ডকালীন কাজ করা যায় না। বার অ্যাট ল করার সময় প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। তাই সুযোগ থাকলেও খণ্ডকালীন কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কেউ যদি ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করে বাংলাদেশে আইন পেশায় নিয়োজিত হতে চায় সেক্ষেত্রে তাকে বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় পাস করে সনদ নিতে হবে। এর আগে যদি কেউ ব্যারিস্টারি ডিগ্রি অর্জন করত, সে সরাসরি বাংলাদেশে আইন পেশায় নিয়োজিত হতে পারত। কিন্তু এখন সেই নিয়মের পরিবর্তন করা হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচারকের এবং আইনজীবীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক যার আইন বিষয়ে প্রয়োজনীয় ডিগ্রি আছে তিনি এ পেশায় আসতে পারেন। বিচারক এবং আইনজীবীরা সমাজে অতি উঁচু মর্যাদায় সমাসীন। এ পেশায় আসতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠা।
[সমাপ্ত]

SHARE