আওয়ামী লীগের গণহত্যা বিলবোর্ড প্রচারণায় শেষ রক্ষা হবে কি?

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার
আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকেই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিরোধী শিবিরকে ঘায়েল করার আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে, চিরতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াসে মাঠে নামে। এতে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণœ হয় মারাত্মকভাবে। হিটলারি কায়দায় চলতে থাকে দেশের শাসনব্যবস্থা। বিরোধী মত দমন, খুন-গুম ও গ্রেফতারের পর নির্মম নির্যাতন, বিনা দোষে লাখ, লাখ মামলা মোকদ্দমা, সরকারি ছত্রছায়ায় সরকারি দলের সমর্থকদের বিরোধীদের ওপর হামলা, নির্যাতন যেকোনো যুগের নির্মমতাকে হার মানায়। বিচার বিভাগ, প্রশাসনসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নির্লজ্জ দলীয়করণে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বেশির ভাগ নাগরিক। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে সরকারের নানামুখী ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির সরব সমালোচনা করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এমন অবস্থা চলতে থাকলে দেশে ভয়ঙ্কর অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করেন। সরকার এর পরও সকল দল-মতকে উপেক্ষা করে এক অজানা শক্তির খুঁটির জোরে জনগণের ওপর দুর্বার গতিতে বাকশাল পদপিষ্ট করে চলছে। যেখানে মানবতা গুমরে মরে।
সামনে নির্বাচন। সরকারের শেষ মুহূর্তে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে চলছে নানা পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ঢাকার সকল বিলবোর্ডে এ সরকারের নানা উন্নয়নের কথা তুলে ধরা হয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা, কূটনৈতিক অর্জন, সামাজিক নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, যুগান্তকারী পরিবর্তন, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শিক্ষিত সমাজ, উন্নত জাতি, সবার জন্য শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থার অগ্রগতি, ডিজিটাল বাংলাদেশ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি শিরোনাম বিলবোর্ডগুলোতে। যদিও বা কোন বিলবোর্ডে কারা এ প্রচার করছে তার উল্লেখ নেই, কী আওয়ামী লীগ না সরকার? আর এ অর্থের (প্রায় ১০০ কোটি) টাকার জোগান কি আওয়ামী লীগ দিয়েছে? না সরকারি কোষাগার থেকে? এর কোন সদুত্তর দিতে পারেননি আওয়ামী কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব বিলবোর্ড দেখভাল করেন সিটি করপোরেশানের কর্মকর্তারা। তারাও কোনো জবাব দিতে পারলেন না কিভাবে এসব বিলবোর্ড অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ সম্পূর্ণ না করার আগেই হাসিনা সরকারের এসব সফল প্রচারণার সাইনগুলো উঠল? তাহলে কি জয়ের তত্ত্বাবধানে নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগের চিরাচরিত নিয়মানুসারে গায়ের জোরে অন্য বিজ্ঞাপনের ওপর শেখ হাসিনার বিজ্ঞাপন লাগাল? অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে তাদের সাথে কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই তাদের বিজ্ঞাপনের ওপর প্রধানমন্ত্রী ও তার পিতার ছবিসহ সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ঈদের আগে বাজারে তাদের নতুন পণ্যের প্রচারণা করতেই তারা বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করেন। বিএনপি নেতা ড. মঈন খান বলেন, বিলবোর্ডে সফলতার প্রচারণার সাথে উন্নয়ন বাস্তবতার কোনো মিল নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে সকল দলের সমান সুযোগ দেয়া দরকার। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের অপপ্রচারের কারণে তারা সিটি করপোরেশনগুলোতে হেরেছেন, তাই তারা সরকারের উন্নয়ন সফলতাগুলো তুলে ধরার অংশ হিসেবেই এসব করেছেন এবং আরো বহুমুখী প্রচারণার পরিকল্পনা আছে বলে তিনি জানান। তার কথায় শয়তানও মুচকি হাসে! মিথ্যুক, সরকারের পক্ষে নিউজ করার জন্য একদিকে সকল মিডিয়াকে বাধ্য করা হচ্ছে এবং বিরোধী দল-মতের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট নিউজ করার জন্য রীতিমতো তথ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চাপ অব্যাহত রেখেছে। আওয়ামী লীগের প্রকাশনা সম্পাদকের কাছে আমার প্রশ্নÑ এত কিছুর পরও বিরোধী দল আপনাদের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার চালায় কিভাবে? তাহলে বুঝে নিন জনগণের জন্য কত উন্নয়ন আপনারা করেছেন! বিটিভি এক তরফাভাবে মিথ্যাচার করে সরকারের গুণগানেই ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত। এসব কারণে এখন কোনো মিডিয়ার ওপরই জনগণের আস্থা নেই। তাই সত্য গোপন করে অসত্য প্রচারের কারণে এখন অনেক সচেতন নাগরিক নিউজ দেখা ও পড়া ছেড়ে দিয়েছেন। এসব করে কি শেষ রক্ষা হবে? বরং এতে আওয়ামী লীগের জন্য হিতে বিপরীত হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। অনেকে একে কাটা ঘাঁয়ে নুন ছিটানোর মতো বলে মন্তব্য করেছেন। যারা আওয়ামী গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার তারা কোমর বেঁেধ মাঠে নামবে যাতে আওয়ামী জোট কোনোভাবেই ক্ষমতায় আসতে না পারে। অপর দিকে আওয়ামী নাস্তিক্যবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার কারণে মাঠে নামবে ইসলামপ্রিয় তৌহিদি জনতা। যার কারণে কোনোভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের এসব প্রচারণা ধোপে টিকবে না বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে অভিজ্ঞ মহল।
পত্রিকা সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় তার মাকে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্য বিশেষ ডিজিটাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি আমেরিকান এক এক্সপার্ট প্রফেসরকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তার পরিকল্পনা প্রচারকেন্দ্রিক। এতে আওয়ামী লীগ ও সরকারের বহুমুখী সফলতা তুলে ধরবেন, ১৮ দলের কর্মসূচিকেন্দ্রিক নাশকতা, জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে চিত্রিত ও মৌলবাদী দল হিসেবে প্রচার করা। জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামকে নারীবিরোধী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং বিগত জোট সরকারের ব্যর্থতাগুলো তুলে ধরা। সম্প্রতি একের পর এক সকল সিটি করপোরেশনে আওয়ামী প্রার্থী গো-হারা হারার পর মূলত আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী যেভাবে তেলের সাগরে ভাসছিলেন সেখানে কিছুটা শ্লথ গতি এসেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তার সহযোদ্ধাদের সবিনয়ে বলতে চাইÑ আপনারা পরগাছা দলগুলো কর্তৃক নতুনভাবে তেল মর্দন হয়ে যে ডিজিটাল প্রচারণা শুরু করেছেন তা আপনাদের জন্য হিতে বিপরীত হবে। এসব প্রচারণা দিয়ে আপনাদের শেষ রক্ষা হবে বলে মনে হয় না। কারণ যেকোনো দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলে সরকারি দায়িত্ব হিসেবে অর্থবছরের পরিকল্পনা অনুয়ায়ী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকে। এসব উন্নয়নকাজ ছিল আপনাদের দায়িত্বের অংশ। তবে ব্যক্তিবর্গের খায়েশ মেটাতে গিয়ে এসব উন্নয়ন হয়েছে বারবার বাধাগ্রস্ত। উন্নয়ন পরিকল্পনার আসল বিষয়গুলো দুর্নীতির ¯্রােতের তোড়ে গেছে স্বপ্নের অতীতে। কোথায় গেল পদ্মা সেতু? কোথায় গেল শেয়ারবাজারের হাজার হাজার কোটি টাকা? কোথায় ঘরে ঘরে চাকরি, কেজি ১০ টাকায় চাল আর কোথায় বিনামূল্যে সার? কোথায় গেল কুইক রেন্টাল প্রকল্প?
জনরোষ ঠেকাতে হাত মিলালেন পরগাছাদের সাথে। যাদের অস্তিত্ব পুলিশি পাহারায় শাহবাগ আর মিডিয়াগুলোতে দেখা গেলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে মাইক্রোস্কোপ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়া এদের মুশকিল। যারা দেশের ৯০ শতাংশ মুসলমানের চিন্তাচেতনার সাথে সাংঘর্ষিক অপতৎপরতায় লিপ্ত। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মপালনকারীদের চেতনায় সাংঘাতিকভাবে আঘাত করে বারবার। আল্লøাহ ও রাসূল (সা)-এর পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ইসলামী রাজনীতি বন্ধ ও ইসলামী নেতৃত্ব খতম করে ইসলামের অপব্যাখ্যা দিতে এক দল মাজার পূজারী-ধর্ম ব্যবসায়ীদের আলেম রূপে মিডিয়া কভারেজ দিয়ে প্রকৃত দ্বীন ও আলেমদের ব্যাপারে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বশত রায়ে আলেম-ওলামাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও কারাদণ্ডের প্রতিবাদে ইসলামপ্রিয় জনগণ ফুঁসে ওঠে প্রতিবাদ করেন। সরকারের ন্যক্কারজনক নির্দেশে শত শত মানুষকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করল পুলিশ প্রশাসন! যা বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে কেউ দেখেনি। ৫ মে শাপলা চত্বরের গণহত্যা দেশে নতুন বীভৎস এক ইতিহাস রচিত হলো। এক রাতে ১ লাখ ৫০ হাজার গুলি খরচ করে লাইটপোস্ট বন্ধ করে, সরকারের যথার্থ সমালোচনাকারী লাইভ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেল বন্ধ করে, গণহত্যার লাশ গুম করে ও রক্ত ধুয়ে মুছে, এক রাতেই সব শেষ হয়ে যাবে? ক্লান্ত, ঘুমন্ত মুসাফির আলেম-ওলামার রক্ত, শাহাদাত, আহতদের আর্তচিৎকার সব কি নিমেষেই হাওয়ায় মিশে যাবে? আল্লাহ ও জনগণ কি তার কোন বিচার করবে না? আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট চরিত্র, হাসিনা সরকারের চোখ ঝাঁঝালো সাইনবোর্ড, মুচকি হাসি, সিন্ডিকেট মিডিয়া প্রচারণায় আলেমরা ক্ষমতায় এলে গার্মেন্টসে নারীরা চাকরি করতে পারবে না, ঘর থেকে বের হতে পারবে না এসব অপপ্রচারে জনগণ সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনার কাছে হার মানবে? অসম্ভব। এটি কেউ বিশ্বাস করবে না।
ইসলাম মানুষের সহজাত জীবনব্যবস্থার নাম। মানুষকে ইসলাম তার সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা বিধানের কথা বলেছে। নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখতে বলা হয়েছে নারী-পুরুষ উভয়কে। সুতরাং আজগুবি অপপ্রচার চালিয়ে, বেহায়াপনা-নোংরামি-অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিয়ে, ইসলামের স্বরূপকে বিকৃত করে যারা এদেশে ক্ষমতা চিরতরে কুক্ষিগত করতে চায় তাদের মুখরোচক বক্তব্য, রূপকল্পের বাংলাদেশের স্বপ্নের কথা বলে আর ইসলামপ্রিয় জনতাকে ধোঁকায় ফেলা যাবে না। তাই সম্মিলিত প্রয়াস এখুনি জরুরি। যেখানে থাকবে না রক্তপিপাসু কোনো দানব, যেখানে শোনা যাবে না সন্তানহারা মায়ের আহাজারি অথবা পিতাহারা সন্তানের বুকফাটা আর্তচিৎকার। যেখানে থাকবে না ভেদাভেদ, থাকবে সাম্য, শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ১৭ কোটি মানুষের ৩৪ কোটি হাতের এগিয়ে যাওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস। আমার সোনার বাংলাদেশ।
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
zabbarics@gmail.com

SHARE

Leave a Reply