আকাশপথে যত দুর্ঘটনা

planছাত্রসংবাদ ডেস্ক

৯ মার্চ স্থানীয় সময় ১২টা ৪১ মিনিটে ২২৭ জন যাত্রী ও ১২ জন ক্রু নিয়ে কুয়ালালামপুর ছেড়ে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা করে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৭৭ এর এমএইচ ৩৭০ বিমানটি। প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বিমানটির সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে কর্তৃপক্ষ। তার পর থেকে নিখোঁজ। কোথায় গেল ২৩৯ জন আরোহী নিয়ে বিমানটি? বিমানে যাত্রীর তালিকায় ২২৭ জনের নাম থাকলেও যাত্রী ছিল ২২৫ জন। অস্ট্রেলিয়া এবং ইতালির সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তাদের দু’জন নাগরিক এ বিমানে যাত্রা করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা বিমানে ওঠেনি।
এ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোয়িং ৭৭৭ বিমানের ১৯ বছরের ইতিহাসে এমন মারাত্মক দুর্ঘটনা আর ঘটেনি। মালয়েশিয়া বিমান বাহিনীর ১৫ বিমান, ছয়টি নৌজাহাজ ও কোস্টগার্ডের তিনটি টহল জাহাজের বিরামহীন অভিযানের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যার যার অবস্থানে থেকে এ অভিযানপ্রচেষ্টায় তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশও এ প্রক্রিয়ার সাথে একাত্ম হয়ে অনুসন্ধানকার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি নিখোঁজ বিমানটি নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা দেখেছে, ধ্বংসাবশেষের সন্ধান তারা পেয়েছে। আসলে নিশ্চিত করে কেউই বলতে পারছে না; বিমানটি তার আরোহীদের নিয়ে কোথায় আছে? কেউ এটাকে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে, কেউবা এর সাথে নারীঘটিত কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত। কেউ আবার বিমানটি রাডার ফাঁকি দেয়ার জন্য নিচ দিয়ে গিয়েছে, কেউ বা আবার বলছে, বিমান চালনায় দক্ষ কেউ বিমানটির গতিপথ বদলে দিয়েছে। অবশেষে স্যাটেলাইটের তথ্যের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিখোঁজ বিমানটি ভারত মহাসাগরেই আচড়ে পড়েছে এবং বিমানের কোনো আরোহীই বেঁচে নেই বলে জানান।
বিমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতের দিকে তাকালেও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে আমরা এ চিত্র দেখতে পাই। ২০০৯ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর হারিয়ে যায় ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭। জানা যায়,, বরফের খণ্ড বিমানের মুখ বন্ধ করে দেয় আর অটো পাইলট এর সাথেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যার দরুন বিমানটি গতিবিধি হারিয়ে সমুদ্রে পড়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে ৫০টি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে বিমানটির আরও কিছু অংশ পাওয়া যায়; যেখান থেকে আরও ১৪৭টি মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। বাদবাকি ৭৪ জন এখনও নিখোঁজ।accedent
২ আগস্ট, ২০০৮। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে একটি বিমান দুর্ঘটনায় শিশু-মহিলাসহ ১৫৩ জন যাত্রী প্রাণ হারায়। স্পেন এয়ারের এমডি ৮২ বিমানটিতে পাইলট ও ক্রুসহ মোট ১৭২ জন যাত্রী ছিল। আহত অবস্থায় মোট ১৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে ৩, ৬ ও ১১ বছরের শিশু রয়েছে। জে কে ৫০২২ ফ্লাইটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ার কারণে মৃতদেহগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। যাত্রার কিছুক্ষণ পর বিমানে যান্ত্রিক ত্রæটি দেখা দিলে বিমানচালক বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। বিমান পরিবর্তনের জন্য আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ সময় অপচয়ের কথা ভেবে মামুলি পরীক্ষা করে বিমানটিকে যাত্রার জন্য সবুজ সঙ্কেত দেয়।
২০০৩ সালের ফেব্রæয়ারি মাসের ৩ তারিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়বহুল দুর্ঘটনাটি ঘটে। ১৯৭৮ সালের হিসাব অনুযায়ী এতে ব্যয় হয়েছিল ২ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে ৬৩ বিলিয়ন ডলারের সমমান। এ ছাড়াও তদন্তের জন্য আরও প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল এবং গবেষণাতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। সব মিলিয়ে বর্তমানের ১৩ বিলিয়ন ডলারের সমান অর্থের ক্ষতি হয়েছিল।
এ ছাড়া ইতিহাসের জঘন্যতম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল ২০০১ সালের ১ সেপ্টেম্বরে। ২০০১ সালের এই দিনে কথিত আলকায়দা সদস্যরা নাটকীয়ভাবে যাত্রীবাহী চারটি বিমান ছিনতাই করে। ১৯ জন হাইজ্যাকার একযোগে যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৯৯ সালের ৩১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে মিসরের কায়রোর উদ্দেশে রওনা দেন এয়ার ফ্লাইট ৯৯০ বিমানে; কিন্তু আটলান্টিক মহাসাগরে তার সলিল সমাধি হয়।
১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। এ দুর্ঘটনার ফলে ২ লাখ মানুষকে সাথে সাথে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ১৭ লাখ মানুষ এই দুর্ঘটনার ফলে নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১২৫,০০০ মানুষ ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল। এই দুর্ঘটনার ফলে ২০০ বিলিয়ন ডলারের সমমান ক্ষতি হয়েছিল।
১৯৮৬ সালের ২৮ জানুয়ারি। সেদিন উড্ডয়নের ৭৩ সেকেন্ড পর যান্ত্রিক সমস্যার কারণে স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় এবং এর আরোহী সাতজন মহাকাশচারী মারা যান। এর ধ্বংসাবশেষ পতিত হয় আটলান্টিক মহাসাগরে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা উপক‚লের কাছে। এ ছাড়া ১৯৮৩ সালে কলম্বিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান দুর্ঘটনায় ১৮১ জন যাত্রী মারা যায়। ১৯৭৯ সালে ফ্লাইট ১৯১ বিধ্বস্তের ঘটনা আমেরিকার ইতিহাসে আরো একটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা। শিকাগোর ও’ হারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সবেমাত্র বিমানটি উড়েছে, কয়েক মিনিটের মাথায় বিমানবন্দরেই বিধ্বস্ত হলো বিমানটি। মৃত্যুবরণ করেন ২৫৮ জন যাত্রী ও ১৩ জন ক্রু’র সবাই।
প্লেন ছিনতাইয়ের জন্য সবচেয়ে জঘন্য বছর হলো ১৯৬৯। কারণ খোদ এ বছরেই ৮২টি বিমান ছিনতাই হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ১৭ জানুয়ারি হারিয়ে যায় স্টার এড়িয়াল নামে একটি বিমান। ঘটনাটি ঘটেছিল সেই রহস্যপুরী বার্মুডা ট্রায়াঙ্গেল। এক জায়গায় পরপর তিনটি বিমান বিধ্বংস। শুরু হলো তদন্ত; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তদন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। কারণ ‘দুর্ঘটনার কারণ’ অজানা। বার্মুডা ট্রায়াঙ্গল, যা ছড়িয়ে আছে স্টেট অব ফ্লোরিডা, বাহামা, মেক্সিকো হয়ে পূর্ব দিক দিয়ে আটলান্টিক অঞ্চলজুড়ে। কিন্তু বেশির ভাগ ভূ-তত্ত¡বিদের মতে, এর অবস্থান পুয়ের্তো রিকো থেকে বারমুডা এবং সেখান থেকে পশ্চিমে স্টেট অব ফ্লোরিডার পূর্ব উপক‚ল জুড়ে। যার আকৃতি দেখতে অনেকটা ত্রিভুজের মতো। এই ত্রিভুজ সম্পর্কে প্রথম বর্ণনা দেন, ক্রিস্টোফার কলোম্বাস ১৪৯২ সালে। তার বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি দিগন্তে অদ্ভুত আলোর নাচানাচি এবং আকাশে ধোঁয়া দেখতে পান। তা ছাড়া ঐ অঞ্চলের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তার কম্পাস উল্টাপাল্টা নির্দেশনা দিচ্ছিল। তারপর ‘ফ্লাইট নাইন্টিন’-এর নিখোঁজ হওয়া নিয়ে ইভিডবিøউ জোন্সের ১৯৫০ সালে লেখা একটি রিপোর্টের মাধ্যমে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কাহিনী সবার সামনে উঠে আসে। এ অঞ্চলের রহস্যময়তার একটি দিক হলো, কোনো জাহাজ এ ত্রিভুজ এলাকায় প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেতার তরঙ্গ প্রেরণে অক্ষম হয়ে পড়ে এবং এর ফলে জাহাজটি উপক‚লের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়। এক সময় তা দিক নির্ণয় করতে না পেরে রহস্যজনকভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। accedent-01
ব্রিটিশ সাউথ আমেরিকান এয়ারওয়েজের এই বিমানটি ১৯৪৭ সালের ২ আগস্ট আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স থেকে চিলির সান্টিয়াগো যাওয়ার পথে হারিয়ে যায় আন্দিজ পর্বতমালায়। অবশেষ ৫০ বছর পর দেখা মিলল এর ধ্বংসাবশেষের। ২ আর্জেন্টেনিয়ান পর্বতারোহী বিমানটির ইঞ্জিনের ধ্বংসাবশেষ এবং কাপড়ের ফালি উদ্ধার করেন।
১৯৪৭ সালে আর্জেন্টিনা থেকে সান্টিয়াগো যাওয়ার সময় ব্রিটিশ সাউথ এয়ারওয়েজের ‘স্টার ডাস্ট’ বিমানটি আন্দিজ পর্বতের ওপর আঘাত হানে এবং গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। কথিত আছে, ভিনগ্রহের কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে বিমানটিতে আঘাত ঘটানো হয়েছিল। এই ঘটনার ৫০ বছর পর আর্জেন্টিনার দুই ব্যক্তি বিমানটির কিছু ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান।
১৯৪৪ সালে জনপ্রিয় বিগ ব্যান্ড লিডার ‘গেøন মিলার’ আমেরিকার আর্ম ফোর্স-এ স্ট্রিং পারফরম্যান্সের জন্য যান। পরদিন প্যারিস যাওয়ার সময় ইংলিশ চ্যানেলের ওপর থেকে তার প্লেনটি উধাও হয়ে যায়। অনেকে বলেন, অগ্নিবিস্ফোরণের কারণে প্লেনটি ক্র্যাশ করে। তবে সবচেয়ে মজার তথ্যও পাওয়া যায় যে, মিলার নাকি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। আমেরিকান বৈমানিকদের পথিকৃৎ এমেলিয়া এয়ারহার্ট প্রথম নারী, যিনি একাই বিমান নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেন। ১৯৩৭ সালের ২ জুলাই হল্যান্ডের কাছাকাছি মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে লকহিড ইলেক্ট্রসহ নিখোঁজ হন তিনি।
১৯৩১ সালের ১ ফেব্রæয়ারি বায়রন রিকার্ডস নামে একজন পাইলটের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথম বিমান দুর্ঘটনা বলে মনে করা হয়।

SHARE

Leave a Reply