আকাশের কালোমেঘ টুটবেই সূর্যের আলো দেখো ফুটবেই -আহসান হাবীব ইমরোজ

এক.

পরাশক্তির পচন : গ্রেট অলস ও অগ্রপথিক ন্যক্কারজনক বললে ন্যাকামো, লোমহর্ষক বললে ললিপপ বলা হবে। সোজাসাপ্টা বললে, চক্ষুবিস্ফোরক বরং হৃদয়বিদারক সে দৃশ্য।
৬ জানুয়ারি, ২০২১। নববর্ষের সপ্তাহের ভিতরই আমেরিকার ক্যাপিটাল হিলের বিষয়টি নিয়ে পৃথিবীর তাবৎ মিডিয়া হামলে পড়েছিল।
সেখানে চারজন মানুষ মারা গেছে, এর চাইতেও ভয়াবহ হচ্ছে আমেরিকার গণতন্ত্র আজ মুমূর্ষু। নাকি তার সভ্যতাও?
আজ থেকে প্রায় ১৫৫ বছর আগে আমেরিকার সবচেয়ে সফল প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনকে হত্যা করা হয়। তখন বিখ্যাত কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান রচনা করেছিলেন ‘হোয়েন লাইলাকস লাস্ট ইন দ্য ডোরইয়ার্ড ব্লুমড’ (When Lilacs Last in the Dooryard Bloomed) শিরোনামের ২০৬টি লাইনের সুবিশাল কবিতা।
মূলত লিঙ্কনের নেতৃত্বেই আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রস্ফুটনের এক সম্ভাবনা সূচিত হয়েছিল। অতঃপর এটি স্তিমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে গত শতাব্দীর শেষপ্রান্তে জুনিয়র বুশের নেতৃত্বে ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নামে সারা বিশ্বে নগর, সভ্যতা ধ্বংস ও নিরীহ মানুষ হত্যার যে সয়লাব শুরু হয় তা কেবল হালাকু খাঁর বাগদাদ ম্যাসাকারের সাথেই তুলনীয়।
সভ্যতার প্রথম ধাপ পরিবার। সে সভ্যতার প্রাসাদ তৈরির জন্য প্রথম যে ইটটি দরকার সেটি হচ্ছে পরিবার। গুটিকয়েক মানুষের অথৈ ভালোবাসায় গঠিত সে পরিবারের বুনিয়াদ। কিন্তু সেখানকার পরিবারপ্রথা আজ ক্ষয়িষ্ণুতার চরমে। তাই ব্যক্তি মানুষ মারাত্মক হুমকিতে নিমজ্জিত। হতাশা, ডিভোর্স, আত্মহত্যা এখন সেখানে পান্তাভাত।
হার্ভার্ড, ইয়েল, ব্রুকলেসহ বনেদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল চালু করেছে বিশেষ কোর্স সায়েন্স অব হ্যাপিনেস, সায়েন্স অব ওয়েলবিং। এ যেন প্রদীপ নিভার আগে শেষ উল্লম্ফন। তবে শেষ রক্ষা হবে কি?
আর আমাদের কী অবস্থা? সাধারণত পাশ্চাত্যের ফ্যাশন, সিনেমা, সংস্কৃতি আমাদের দেশে আসে রকেটের গতিতে। কিন্তু পাশ্চাত্যের কোনো সমস্যা যা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা আগেভাগেই সতর্ক হতে পারি, সেটি আসে গরুগাড়িতে।
যেমন আমরা গত ২৫ বছর যাবৎ এদেশে ক্যারিয়ার নিয়ে কাজ করছি। আর ৮ বছর যাবৎ প্যারেন্টিং নিয়ে। কিন্তু সাড়া কই?
শেষতক সেই তিন অলসের মতো হবে নাতো?
গল্পটা মনে হয় সবাই জানেন। ঘরের বাহিরে চতুর্দিকে আগুন লেগেছে, লেলিহান শিখা।
তিন অলস সে ঘরেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আগুনের আঁচে ঘুম ভাঙে, কিন্তু তবু তারা চোখ খুলতে চায় না।
প্রথম অলস বলছে, – কত রবি জ্বলে রে !
দ্বিতীয় অলসের উত্তর – কেবা আঁখি মেলে রে?
সবচেয়ে গ্রেট অলস- পা ফি শু (অলসতার কারণে সংক্ষেপে বলেছে। মানে, পাশ ফিরে শু)
ব্যতিক্রম তো আছেই। আর সেই ব্যতিক্রম অগ্রপথিকদের সামনে এক রিল্যেরেসলারের গল্প বলবো।

দুই.

এক রিল্যেরেসলারের গল্প
শহীদ আবদুল মালেকের জানাজা শেষ। শুভ্র কফিনে শয়ান সেই জ্যোতির্ময় নেতা। ক্ষোভ, শোক আর নীল বেদনার বঙ্গোপসাগর যেন আছড়ে পড়ছে সে সবুজ চত্বরে। কফিনের পাশে হিমালয়ের মতোই স্থির কয়েক যুবক। মুষ্টিবদ্ধ হাত, অস্ফুট কম্পিত ঠোঁট। তারা শহীদের স্বপ্নকে যেকোনো মূল্যে প্রস্ফুটিত করার শপথ নিচ্ছে।
৪৫ বছর পরের ঘটনা। ঢাকার এক সুদৃশ্য লাইব্রেরিতে এক প্রৌঢ় সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। অবলীলায় বর্ণনা করছেন, সেই ভয়াল ’৬৯ এর স্মৃতিচারণ। চোখে, ঠোঁটে যেন উনিশ-কুড়ি পেরোনো তারুণ্যের লেলিহান আভা।
– আমার ওপর দায়িত্ব এসেছিল ফজলুল হক হলের শহীদ মালেকের রুমে তার সংগৃহীত বইয়ের তালিকা করতে। জিজ্ঞেস করলাম,- কী পেলেন, স্যার? তিনি বললেন, প্রায় ৪ হাজারের ওপরে বই ও ম্যাগাজিন পেয়েছি। শহীদ মালেক জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত আন্তর্জাতিক কলাম লিখতেন। তাই রিডার্স ডাইজেস্টসহ আন্তর্জাতিক মানের অনেক ম্যাগাজিন রাখতেন।
তারা ক’জনা শহীদ মালেকের স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন,
শাহজালালের কবুতরের ডানায় ভর করে সুনীল আসমানে।
শাহ মাখদুমের জায়নামাজের মতোই বিস্তৃত মখমল সবুজ জমিনে আর, খানজাহান আলীর দীঘির মতোই টলমল জলরাশি, নদী ও নোনা দরিয়ায়।
দীর্র্ঘ চার যুগে তিনি ও তার সঙ্গীরা প্রায় চল্লিশের অধিক জেলা ঘুরেছেন। হাজারো, লাখো তরুণের হৃদয়ে ঝঙ্কার তুলেছেন। তাদেরকে জীবন্ত মালেক হওয়ার প্রণোদনা দিয়েছেন।
সৃষ্টিশীলতার সে প্লাবনে লাখো তরুণের জীবনে এসেছে জাগরণের জোয়ার। কবির ভাষায় বলতে গেলে;
প্রাণে প্রাণে সাহসের সম্ভার;
পিষে চলে বাধাভয় ঝঞ্ঝার-
আলোকিত পৃথিবীর জন্য;
আঁধারের বুনিয়াদ ভাঙছে।
কিন্তু ২০১৭ তে এসে সেই নিশানবরদার, রিল্যেরেসের অন্যতম দৌড়বিদ থেমে গেলেন।
রওনা হলেন পরম প্রভুর অসীম দরবারে। ’৬৯ এ শহীদ মালেকের কফিনের পাশে মুষ্টিবদ্ধ হাতে তিনিও ছিলেন। প্রফেসর ড. মীর আকরামুজ্জামান রেখে গেলেন তার রিল্যেরেসের ব্যাটনটি।
কারা আছেন, প্রফেসর আকরামের রেখে যাওয়া সেই ব্যাটনটি তুলে নেবেন?
কারা শহীদ মালেকের চেতনার বাতিঘর পানে দৌড়াবেন?
নিজ জেলার জরাগ্রস্ত হাজারো যুবকের জীবনের প্রদীপ জ্বালবেন?
কারা শহরের হাজারো তরুণের তপ্ত প্রাণে আবেহায়াতের তরঙ্গ তুলবেন?
কারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধির খরায় প্রজ্ঞার প্লাবন আনবেন?

তিন.

আকাশের কালোমেঘ টুটবেই
শহীদি কাফেলার কেন্দ্রীয় নির্বাচন সম্পন্ন হলো। বছর শেষ হতে হাতে তখনও দু’দিন।
কিন্তু অবাক কাণ্ড! নির্বাচনী রঙিন পোস্টারে নীল আকাশ গুমোট হয়নি। কিংবা রঙতুলি আর চিৎকার অত্যাচারে শুভ্র দেয়াল শ্লীলতা হারায়নি। কোন চেয়ারও ভাঙেনি কারো মাথাও ফাটেনি।
এটা কী! স্বপ্ন? নাকি সত্যি? যিনি বিদায় নিচ্ছেন হেসেই অস্থির। আর নবনির্বাচিতরা কেঁদেই আকুল। আর লাখো মানুষের দোয়ায় পৃথিবী ভরপুর।
কিন্তু তবু বিরোধীরা স্লোগান তোলে,
এদের চামড়া তোল-
জবাই করো-
সকাল বিকাল নাস্তা করো …
কিন্তু কী মুশকিল!!!
প্রমাণ করা যায় না
এরা টেন্ডারবাজ- কিংবা বাঁশের ঢালাইকারী
এসিড নিক্ষেপক কিংবা ধর্ষক
মাদক ডিলার কিংবা সিরিয়াল কিলার॥
ভয় নেই। তোমাদের ক্ষয় নেই। সত্যের সংগ্রামীদের ধরন এই।
একদিন আকাশের কালোমেঘ টুটবেই। সূর্যের আলো সব ফুটবেই। শত শত মালেক ঐ আসবেই। জনতা তব সাথে জুটবেই। দেশ থেকে পরগাছা হটবেই।
কালেমার পতাকা বিশ্বব্যাপী উড়বেই। ইনশাআল্লাহ।

লেখক : গবেষক, মোটিভেশনাল স্পিকার,
ক্যারিয়ার স্পেশালিস্ট

SHARE

Leave a Reply