আগামী দিনের বিমানজ্বালানি

গোলাপ মুনীর

ধরে নেয়া হয়েছিল, আগামী দিনের বিমান হবে হাইড্রোজেনচালিত বিমান। তবে তখনও কেরোসিন থাকবে বিশ্বের জেট বিমানগুলোর জ্বালানি। অতএব আমরা কিভাবে বিমান উড়াব, যখন এই জ্বালানি আর অবশেষ থাকবে না?
‘বিমান ও বিমানের ইঞ্জিন নির্মাতারা এখন আর হাইড্রোজেনর ওপর ততটা গুরুত্ব দেন না। মনে হয় না, নিরাপদ বিমান পরিচালনার জন্য আদর্শ জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটাতে পারবে বলে’- এ মন্তব্য ক্রিস্টোফার সার্জেনারের। তিনি ‘গ্রিন এয়ার’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক। গ্রিন এয়ার হচ্ছে বিমান চলাচল ও পরিবেশবিষয়ক একটি অনলাইন প্রকাশনা। তিনি আরো বলেন,  ‘সাধারণভাবে জেট ফুয়েল- ফ্রিজপয়েন্টস, ফ্লাশপয়েন্টস ইত্যাদি- সংশ্লিষ্ট এমনসব বিষয়-আশয় রয়েছে, যেখানে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের কোনো উপায় নেই। এর পর আছে অবকাঠামোর প্রশ্ন : কিভাবে হ্ইাড্রোজেন জ্বালানি মজুদ ও পরিবহন করা হবে? এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রতিটি বিমানবন্দরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকারের একটি কারখানা।’
আর যখন একটি সম্ভাবনাময় ‘গ্রিনার ফুয়েল’ তথা অধিকতর পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন কম দামে বিক্রির জন্য বিশ্বব্যাপী পাঠানো হচ্ছে, তখন এয়ার লাইনগুলো ও বিমান নির্মাতারা এখন তাদের এক সময়ের জোরালো হাইড্রোজেন-বার্নিং ‘ক্রাইয়প্লেন’ তৈরির ধারণা থেকে সরে আসছেন। এতে কি আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন আছে? তবে স্পষ্টতই অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিগুলো এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ আগামী দিনের বিমানে ডিফেক্টো পাওয়ার তথা প্রকৃতপ্রস্তাবে কার্যকর জ্বালানি হিসেবে যাই আসুক, যাত্রীবাহী বিমান হিসেবে জেট বিমান পরিত্যাজ্য। জেট বিমানকে যদি আগামী শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে এর কেরোসিন পোড়ানোর বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, পৃথিবীর সর্বোচ্চ মাত্রায় মজুদ নিশ্চিত হলেও এক সময় এর ফাইনাল ব্যারেলটি ফুরিয়ে যাবে। আশা করা হয়েছিল, হাইড্রোজেন হবে আগামী প্রজন্মের যাত্রীবাহী জেট বিমানের অর্থাৎ ক্রাইয়প্লেনের জ্বালানি। এখন সে আশা শেষ হয়ে গেছে।
হাইড্রোজেন তেলের চেয়ে তিন গুণ কার্যকর। এমনকি তরল অবস্থায় হাইড্রোজেন তেলের তুলনায় জায়গা দখল করে চার গুণ। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় হ্ইাড্রোজেন জ্বালানি দিয়ে চলছে বেশ কিছু প্রটোটাইপ ক্রাইয়প্লেন। কিন্তু গবেষণায় লাখ লাখ ডলার খরচ করার পরও গবেষকদের প্রতিশ্রুত বাণিজ্যিকায়নের কিছুই হয়নিÑ কারণ অন্যসব জ্বালানি উৎসের তুলনায় হাইড্রোজেন অধিকতর পরিবেশবান্ধব প্রমাণিত হয়নি। ‘হাইড্রোজেন তৈরির খরচ প্রচুর’- বললেন প্রফেসর আয়ান পোল। তিনি যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত অ্যাভিয়েশন ওমেগার প্রযুক্তি বিভাগের প্রধান। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি। আমাদের দরকার এমন একটি বিদ্যুতের উৎস, যা থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উদগীরণ ঘটবে না। যখন বিশ্বে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭০-৮৫ ডলার, তখন বিকল্প জ্বালানি খোঁজার কাজ চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে টেকসই ও প্রতিযোগিতা করার মতো কোনো বিকল্প জ্বালানি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিন্তু ঠিক বারো বছর আগে বিশেষজ্ঞ ও বিমান শিল্পখাতের বেশির ভাগ লোককেই মনে হয়েছে নতুন সুপার-ফুয়েল হিসেবে হাইড্রোজেন সম্ভাবনা সম্পর্কে খুবই ফুরফুরে মেজাজের। এরা মনে করেন, পানিবিদ্যুৎ থেকে সৃষ্ট তরল হাইড্রোজেনই শেষ পর্যন্ত হবে দূষণমুক্ত জ্বালানি। আজকের দিনের বিমানগুলোর সামান্য উন্নয়ন সাধন করে এই হাইড্রোজেন জ্বালানি ব্যবহার করতে পারবে। বিশ্বের বিমানবহরগুলোকে তরলায়িত হাইড্রোজেন গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়। এর ফল দাঁড়ায় নতুন ধরনের ক্রাইয়জেট, যা স্মরণ করিয়ে দেয় ‘থান্ডারবার্ড ২’-এর কথা। এর রয়েছে খাটো দু’টি পাখা। করদাতাদের লাখ লাখ ডলার খরচ করা হয়েছে এই প্রকল্পে। কিন্তু এই ক্রাইয়জেটের উড্ডয়ন হয়নি। কারণ, হাইড্রোজেন জ্বালানির ব্যয়বহুল হওয়ায় এবং দূষণমুক্ত না হওয়ায়।
২০০০ সাল থেকে এয়াবাসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২৬ মাসব্যাপী ইসির অর্থায়নে পরিচালিত ক্রাইয়প্লেন প্রকল্পে। লক্ষ্য হাইড্রোজেন জ্বালানির সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য, যাতে করে জিরো-কার্বন-ইমিশনের বিমান তৈরি করা যায়। গবেষকেরা দেখেছেন, এ জন্য আজকের তুলনায় চার গুণ বড় আকারের ফুয়েল ট্যাঙ্ক দরকার হবে। মডেলে দেখা গেছে, অধিকতর বড় আকারের বহির্তল জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দেবে এক-দশমাংশের সমান। আর পরিচালনা ব্যয় বাড়বে ৫ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে, বিমানের এয়ারোডিনামিক গুণাবলি বজায় রেখে হাইড্রোজেন মজুদ করা। একটি ছোট আকারের প্রদর্শনী জেটের প্রস্তুতকারক ডেইমলার-বেনজ এয়ারোস্পেসের প্রকৌশলীদের মতে এর সমাধান হচ্ছে, প্যাসেঞ্জার কম্পার্টমেন্টের ওপর একটি ফুয়েল ট্যাঙ্ক স্থাপন করা। তবে গভীর-হিমায়িত কয়েক টন খুবই দাহ্য হাইড্রোজেনের নিচে থাকা যাত্রীরা কিছুটা ভীত-শঙ্কিত থাকতে পারেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ কথা যাত্রীদের জানানোর দরকার নেই।
ট্যাঙ্ক বসানোর ব্যবস্থা এমনভাবে করা যাবে, যাতে করে ক্যাবিন ও কার্গো কম্পার্টমেন্টে কোনো ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি না করেই আর দুর্ঘটনা ও ট্যাঙ্ক ছিদ্র হওয়ার ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন উৎক্ষিপ্ত হতে পারে ওপরের দিকে। কয়েক বছর আগে নাসার এক পরীক্ষায় দেখানো হয়েছে, হাইড্রোজেন যাত্রীদের খুব কমই বিপজ্জনক, এমনকি বিমান বিধ্বংস হলেও।’- বললেন ডেইমলার এয়ারোস্পেসের মুখপাত্র রলফ ব্রান্দত।
মনে হবে, আগুনে পুড়ে মরা ভয়াবহ কোনো নিয়তি নয়। হাইড্রোজেন নিচু তাপমাত্রায় দাহ্য। অতএব বিমানের অ্যালুমিনিয়াম ফিউজলেজ তা ভেতরে যাওয়া ঠেকাতে পারবে। ঠাণ্ডায় জমে গিয়ে মারা যাওয়া আরেক সমস্যা হতে পারে। ক্রাইয়প্লেনে ব্যবহারের হাইড্রোজেন সুপার-কোল্ড। অর্থাৎ অতিমাত্রায় ঠাণ্ডাকর। এর ঠাণ্ডার মাত্রা -২৫৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
এসব অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও, বিমান শিল্পের লোকজনের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। এয়ারবাস ও ডেইমলার-বেনজ এয়ারোস্পেস দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কেরোসিনের বদলে হাইড্রোজেন ব্যবহার করবে। কিন্তু এয়ারোস্পেস জায়ান্টগুলোর জন্য হাইড্রোজেনের আবেদন শেষ হয়ে গেছে। ফসিল জ্বালানির ওপর জোর দেয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
কেরোসিন একটি ভালো জ্বালানি। এর সাথে প্রতিযোগিতা করা কঠিন- এমনটি মনে করেন এয়ারবাসের গবেষণা ও প্রযুক্তি বিভাগের রেইনার ভন রিড। তার অভিমত- নীতিগতভাবে হাইড্রোজেন জ্বালানি দিয়ে বিমান চালানো সম্ভব এবং আমাদের কাছে এ ধারণার প্রমাণও আছে। কিন্তু এখন পরিবেশবান্ধব উপায়ে আমরা প্রচুর হাইড্রোজেন উৎপাদন করতে পারি না।
এয়ারবাস ও অ্যাভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি নিরলস গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনার জন্য। এরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ গ্রিনার সিনথেটিক কেরোসিন ও লিনিয়ার প্লেন ও ইঞ্জিন উদ্ভাবনের ব্যাপারে। হাইড্রোজেন ও পারমাণবিক জ্বালানিচালিত বিমান এবং বিদ্যুৎচালিত বাণিজ্যিক বিমান তৈরির পরিকল্পনা এখন স্বল্প মেয়াদ থেকে দীর্ঘ মেয়াদ পর্যন্ত স্থগিত।
‘বড় কাজ হচ্ছে বিকল্প জেট জ্বালানি। প্রধানত টেকসই উৎস থেকে আসা জৈবজ্বালানি বা বায়োফুয়েল খাবার ও পানির সাথে প্রতিযোগিতা করে না।’- বললেন ক্রিস্টোফার সার্জেনার। তিনি আরো বলেন, ‘বায়োফুয়েলকে সামনে নিয়ে আসতে হবে, যদি বিমানের ইঞ্জিন ও জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন যদি না আনা হয়। বিকল্প জ্বালানির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কোল-টু-লিকুইড (সিটিএল) এবং গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) জেট ফুয়েল, যেগুলো ৫০-৫০ ব্ল্যান্ডে সার্টিফাইড নয়, যদিও অনেক বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকান এয়ারপোর্টগুলোতে সিটিএল জেট ফুয়েল ব্যবহার হয়ে আসছে।’
অ্যাভিয়েশনে রয়েছে সুদীর্ঘ পণ্যচক্র। এয়ারলাইনগুলো যদি আগামী সহস্রাব্দের মধ্যে ব্যবহারে আসতে না দেখে, তখন তাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে আজ হোক কাল হোক বিকল্প অনুসন্ধান করা। অ্যাভিয়েশন শিল্প বছরে বাড়ছে ৯ শতাংশ হারে। ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর দেয়া তথ্য মতে, উন্নত দেশগুলোর বিমানগুলো সাড়ে ৩ শতাংশ গ্রিনহাউজ গ্যাস উদগীরণ করে। এর সাথে আছে নাইট্রোজেন অক্সাইড উদগীরণ কন্ট্রা ট্রেইলের প্রভাব, যার পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইডের প্রভাবের তুলনায় ২-৪ গুণ বেশি। ফলে আকাশকে নির্মল ও পরিবেশবান্ধব রাখা জটিল হয়ে দাঁড়াবে।
বিমানের আরো জ্বালানি
১. বায়োফুয়েল : বায়োমাস-টু-লিকুইড (বিটিএল)- যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গবেষণাকেন্দ্র পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরিবহনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা তেলের ১৭ শতাংশের বদলে ব্যবহার করা যাবে শৈবাল থেকে তৈরি জৈবজ্বালানি দিয়ে। জ্বালানি তৈরির চলমান পরীক্ষায় ব্যবহার হচ্ছে, শৈবাল থেকে শুরু করে বর্জ্য-আবর্জনা পর্যন্ত সবই। এই পাঁচ বছর আগে পর্যন্ত জৈবজ্বালানিকে কেরোসিনের বিকল্প হিসেবে কারিগরি দিক থেকে উপযুক্ত মনে করা হতো না। এখন অ্যাভিয়েশন শিল্পে সবচেয়ে টেকসই পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার জন্য জৈবজ্বালানিকে বিবেচনা করা হয়। আশা করা হচ্ছে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক এয়ারলাইনের জন্য ৫০-৫০ ব্ল্যান্ড সার্টিফাইড করা হবে। এর খারাপ দিক হলো ক্রমবর্ধমান হারে জ্বালানি উৎপাদন কারখানা কেরোসিন পোড়ার চেয়ে বেশি পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করবে। অ্যাকশন এইড ও আরএসপিবি’র এক রিপোর্টে দেখা গেছে, জ্যাট্রোপা অয়েল প্ল্যান্টেশনে ফসিল জ্বালানির তুলনায় আড়াই থেকে ৬ গুণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড উদগীরণ করবে।
২. গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল): একটি পরিশোধন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস কিংবা গ্যাসীয় হাইড্রোকার্বনকে রূপান্তর করে গ্যাসোলিন বা ডিজেল জ্বালানিতে। মিথেনসমৃদ্ধ গ্যাসগুলো রূপান্তর করা হয় তরল সিনথেটিক ফুয়েলে। এই রূপান্তর চলে হয় সরাসরি রূপান্তরের মাধ্যমে নতুবা Fischer Tropsch প্রক্রিয়ায় সিনথেটিক ফুয়েল ব্যবহারের মাধ্যমে।
প্রচলিত জেট ফুয়েলের মতো জিটিএলেরও রয়েছে একই জীবনচক্র, যদিও বায়ুর মান বিবেচনায় এর অবস্থান অনেক ওপরে। কারণ এতে সালফার নেই এবং এতে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের উদগীরণ কম। আর এটি অয়েল ড্রিলিং প্ল্যাটফর্ম থেকে পুড়ে যাওয়া মিথেন ব্যবহার করতে পারে। এর খারাপ দিক হলো এ থেকে গ্রিনহাউজ গ্যাসের উদগীরণ ঘটে। আর এর পরিশোধনে প্রচুর জ্বালানি খরচ হয়।

SHARE

Leave a Reply