আজও মেলেনি হাফেজ জাকিরের সন্ধান

রফিকুল ইসলাম ফরাজী#

Shahidআওয়ামী সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য নানারকম অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এর মধ্যে জঘন্যতম হচ্ছে বিরোধী নেতাকর্মীদের গুম করে ফেলা। বিগত বছরগুলোতে বিরোধীদলীয় অসংখ্য নেতাকর্মীকে তারা গুম করেছে। হাফেজ জাকির হোসেন তাদের মধ্যে অন্যতম। আজ থেকে দুই বছর আগে জাকির ভাইকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ধরে নিয়ে যায়। সেই থেকে আজ অবধি তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
হাফেজ জাকির হোসেন সুদর্শন  এবং  অসাধারণ মেধাবী একটি মুখ। মাত্র দুই বছরে কুরআনে হাফেজ এবং দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়ে পাস করেছেন। ২০০৯ সালে গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়া  থেকে ঢাকা এসে ঢাকা কলেজ অব মেডিক্যাল টেকনোলজিতে ডেন্টাল বিষয়ে ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের একজন সাথী হিসেবে কাজ করতে থাকেন। ঢাকায় এসে তিনি আদাবর থানার জনশক্তি হিসেবে কাজ শুরু করেন । দায়িত্ব পালনের সুবাদে তার সাথে আমার যোগাযোগ হয় এবং পরবর্তীতে বেশ কিছুদিন আমরা দু’জনে একই রুমে ছিলাম। রুমমেট হিসেবে তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার।  অত্যন্ত ন¤্র, ভদ্র এবং অমায়িক ছিলেন হাফেজ জাকির হোসেন। দেখতে সুদর্শন এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। ইসলামী আন্দোলনের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। নিজের ব্যক্তিগত অনেক বাস্তবতা ও সমস্যা থাকলেও সংগঠনের কোনো কাজে কখনো দুর্বলতা প্রদর্শন করেননি তিনি। দায়িত্বশীলদের আনুগত্য করার ব্যাপারেও তার আন্তরিকতার কোন ঘাটতি ছিল না। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংগঠনের সর্বোচ্চ শপথ গ্রহণ করেন। পড়াশুনা শেষ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নি শুরু করেছিলেন হাফেজ জাকির ভাই।  তার ব্যক্তিগত বাস্তবতা পারিবারিক প্রয়োজন এমন ছিল যে খুব দ্রুত কর্মজীবন শুরু করা প্রয়োজন ছিল। দায়িত্বশীলদের সাথে কন্টাক্ট করে ছুটির কথা বলতেন। কিন্তু সংগঠনের প্রয়োজনে তাকে ছুটি দেয়া হয়নি। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর স্টিং অপারেশনের মাধ্যমে মহানগরী পশ্চিমের সভাপতি সেক্রেটারিসহ অধিকাংশ থানা দায়িত্বশীল ভাইকে গ্রেফতার করা হয়। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই ময়দান সাময়িকভাবে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। সেই সঙ্কটকালীন সময় মোকাবেলার জন্য হাফেজ জাকির ভাইয়ের ওপর আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। নিজের হাজারো সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সংগঠনের দায়িত্ব পালনে তিনি পিছপা হননি। সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচি আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও পেরেশানির সাথেই পালন করেছেন। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনে এই সক্রিয় ভূমিকাই কাল হয়ে দাঁড়ায় জাকির ভাইয়ের জন্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে পড়ে যান তিনি। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে তারা। ২০১৩ সালের ৩  এপ্রিল রাতে তাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় র‌্যাব-২-এর পরিচয় দানকারী একদল লোক। সেই থেকে আজ অবধি তার কোনো সন্ধান মেলেনি। দেশের কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার কোন খোঁজ দিতে পারেনি। কিংবা কী অপরাধে তাকে গুম করা হলো তাও কেউ জানে না ।
হাফেজ জাকির হোসেন। ২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষা ও একটি ভালো কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় পারিবারিক প্রয়োজনে সুদূর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল রাতে র‌্যাবের পোশাকধারী একদল লোক তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আর কোন সন্ধান মেলেনি তার। পরিবার, সহপাঠী, সংগঠন সবাই মিলে শত চেষ্টা করেও কোনো লাভ হয়নি। থানায় জিডি, একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন, মানবাধিকার কমিশন, র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবি কার্যালয়ে ধরনা দেয়া ইত্যাদি সবই হয়েছে কিন্তু তার সন্ধান মেলেনি। এ বছরের এপ্রিলে তার নিখোঁজের প্রায় দুই বছর পূর্ণ হলো। বাবা-মা আজো তার পথ চেয়ে চোখের পানি ফেলছেন। তাদের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষই হয় না।
হাফেজ জাকির ভাইকে হারিয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্য আজ দিশেহারা। মা, বাবা, ভাই, বোন সকলে তার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। কিন্তু কে জানে তাদের এই অপেক্ষার প্রহর কবে শেষ হবে?

একনজরে হাফেজ জাকির হোসেন
পুরো নাম : হাফেজ মোহাম্মদ জাকির হোসাইন
পিতার নাম : তাজ মোহাম্মদ
মাতার নাম : আলেয়া খাতুন
সাংগঠনিক মান : সদস্য
সর্বশেষ দায়িত্ব : ঢাকা মহানগরী পশ্চিমের আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি
স্থায়ী ঠিকানা  :  গ্রাম : কুরিপোল ২ নং ওয়ার্ড, পোস্ট ও থানা : মিরপুর, জেলা: কুষ্টিয়া।
ভাইবোন : মোট সাতজন। পাঁচ ভাই দুই বোন
ভাইবোনের মধ্যে অবস্থান : ষষ্ঠ।
নিখোঁজ হওয়ার স্থান ও তারিখ : শ্যামলী রিং রোডের ১৯/৬ টিক্কাপাড়া, মোহাম্মদপুর, ঢাকার বাসা থেকে গত ৩ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৪ ঘটিকার সময় সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর সদস্য ও র‌্যাব-২ এর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।
সংগঠনে যোগদান : সমর্থক  ২০০০ সালে,  ২০০২ সালে কর্মী, ২০০৮ সালে সাথী এবং ২০১২ সালে সদস্য।
বিশেষ গুণাবলি : মাত্র দুই বছরে কুরআনে হাফেজ এবং দাখিল পরীক্ষার গোল্ডেন অ+
সর্বশেষ পড়াশোনা :  ঢাকা কলেজ অব মেডিক্যাল টেকনোলজিতে ডেন্টাল শেষ পর্ব এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ইন্টার্নিরত।

নিখোঁজ সংবাদ শোনার পর পিতা মাতার প্রতিক্রিয়া :
পিতা : ইসলামের কাজ করতে গিয়ে আমার ছেলে বাতিলের শত্রুতে পরিণত হয়ে আল্লাহর বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। আজ মনে হচ্ছে পিতা হিসেবে আমি সত্যিই ভাগ্যবান।
মাতা : ইসলামের কাজ করতে গিয়ে আল্লাহ যদি শহীদ হিসেবে তাকে কবুল করে থাকেন, তাহলে অন্তত নিজ হাতে তার লাশ নেড়ে-চেড়ে কবরে শোয়াতে চাই। এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক : সাবেক অফিস সম্পাদক, ঢাকা মহানগরী পশ্চিম, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply