আজকের তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন

হাফিজুর রহমান #

Islami-Andolonবিশ্ব মানচিত্রে তুরস্কের অবস্থান নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপ দুই মহাদেশের মাঝখানে হওয়ায় রাজনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে রাষ্ট্রটির মর্যাদা বেশ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর পাশাপাশি তুরস্কের বসফরাস প্রণালী দিয়েই ইউরোপসহ বিশ্ববাণিজ্যের অধিকাংশ পণ্য সরবরাহ হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে রাষ্ট্রটি। এ জন্যই সম্ভবত উসমানী খলিফারা তুরস্কের ইস্তাম্বুলকে রাজধানী করে বিশাল সা¤্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন।
উসমানী খলিফারা অনেকটা ইসলামী আইন-কানুনের আদলেই প্রায় আটশত বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন। যদিও তাদের কিছু কিছু খলিফার ব্যক্তিগত আচার-আচরণও চরিত্রের ব্যাপারে কিছু সমালোচনা আছে তারপরও তারা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৭১টি দেশে বেশ দাপটের সাথেই পরিচালনা করেন। কিন্তু ইহুদিদের ষড়যন্ত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণে তছনছ হয়ে যায় তাদের সাম্রাজ্য। যার ফলে উসমানী খলিফাদের বিশ্বস্ত সেনাকর্মকর্তা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বিশ্বাসঘাতকতা করে আজকের তুরস্কের সীমানায় সেক্যুলার তার্কিশ প্রজাতন্ত্র কায়েম করেন ১৯২৩ সালের ২৯ অক্টোবর। তিনি ও তার পরবর্তীরা প্রথমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত একদলীয় সরকার ও পরবর্তীতে বহুদলীয় সরকার পরিচালনা করেন, যা ছিল সেক্যুলারিজমের নামে ইসলামবিরোধী শক্তির শাসন। ইসলামের ওপর নেমে আসে সীমাহীন নির্যাতন। নিষিদ্ধ হয় আরবিতে আজান, আরবি হরফসহ অনেক মৌলিক বিষয়গুলো। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ইসলামকে উঠিয়ে দেওয়া হয় এবং বন্ধ করে দেওয়া হয় মাদরাসাগুলোকে। নিষিদ্ধ হয় বোরকা, দাড়িসহ ইসলামের নিদর্শনগুলো। অনেক বড় বড় আলেম, ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও দায়ীদেরকে করা হয় সীমাহীন নির্যাতন। এমন সময় মরহুম বদিউজ্জামান সাইদ নুরসী (রহ) নামক ব্যক্তি ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। উনার লেখা বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘রিসালায়েনুও’ এর মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে ছিলেন ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোকে। কিন্তু উনার ওপরও নেমে আসে চরম নির্যাতন, জেল এবং নির্বাসন। উনার পাশাপাশি আরো কতিপয় বড় বড় আলেমও দায়ী হিসেবে তখন কাজ করেছিলেন যাদের পরিণতিও এক হয়েছিল। অনেক আলেমকে ফাঁসি ও সরাসরি হত্যাও করা হয় শুধু দ্বীন প্রচারের কারণে।
কিন্তু উসমানী খেলাফতের পতনের পর থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোন সংগঠন গড়ে ওঠেনি। গড়ে উঠতে দেয় নি যারা ইসলামী আন্দোলনের জন্য কাজ করবে। এমন সময় ষাটের দশকে একজন মহামানবের আগমন ঘটে যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেই মহান ব্যক্তিটি হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। নাজিমুদ্দিন আরবাকান। তিনি তৎকালীন বড় বড় আলেমের পরামর্শে ১৯৬৯ সালে মিল্লিগুরুশ নামে একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। যার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের প্রাথমিক কাজগুলো শুরু হয়ে যায়।
১৯৭০ সালের ২৪ জুন মিল্লিনিজাম পার্টি নামে মিল্লিগুরুশের রাজনৈতিক শাখা চালু করা হয়। কিছুদিনের মধ্যেই দলটি ব্যাপক মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং দলে দলে লোকজন নতুন এ ইসলামী সংগঠনের ছায়াতলে একত্রিত হওয়া শুরু করে। তখন তুরস্কে সেনাশাসন চলছিল। সেক্যুলার সেনাবাহিনী খুব দ্রুতই প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে অর্ডিন্যান্স জারি করে নবগঠিত মিল্লিনিজাম পার্টিকে নিষিদ্ধ করে। নিষিদ্ধ করার কিছুকাল পরই আরবাকান মিল্লিসালামাত পার্টি নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। খুব দ্রুত সময়েই পুরো তুরস্কে এর নাম ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় এবং ১৯৭৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক ভোট পেয়ে কোয়ালিশনে ক্ষমতায় চলে আসে। ড. নাজিমুদ্দিন আরবাকান উপ-প্রধানমন্ত্রী হন। ক্ষমতায় এসেই সালামাত পার্টি জনকল্যাণে ব্যাপক কাজ শুরু করে এবং দেশের উন্নয়নে গবেষণা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মুসলিম বিশ্বকে শক্তিশালী করার জন্য উনি ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। উনার কাজ দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে বিরোধীশক্তি। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালে এসে আবারও অগণতান্ত্রিকভাবে আরবাকানকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পরবর্তীতে মিল্লিসালামাত পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এখানেই শেষ নয়, সে বছরের ১২ সেপ্টেম্বর আরবাকানকে রাজনীতি থেকেও নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৮৩ সালে আবারও নতুন করে ওয়েলফেয়ার (রেফাহ) পার্টি নামে কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে এক রেফারেন্ডামের মাধ্যমে ১৯৮৭ সালে আরবাকানের ওপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। তিনি রেফাহ পার্টির প্রেসিডেন্ট হন। উনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাথে সাথে দলটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং ১৯৯৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনে এই পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠ সিটি কর্পোরেশনগুলোতে জয় লাভ করে। ১৯৯৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে ব্যাপক ভোটে রেফাহ পার্টি জয় লাভ করে। ১৯৯৬ সালের ২৮ জুন নাজিমুদ্দিন আরবাকানের নেতৃত্বে রেফাহ পার্টি সরকার গঠন করে, তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। আবারো দেশের জন্য ব্যাপক কাজ করেন। তুরস্কে শিল্প ও প্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হয়। আরবাকান মুসলিমবিশ্বকে একত্রিত করার জন্য ব্যাপক ভিত্তিতে কাজ শুরু করেন, গঠন করেন উ-৮। কিন্তু ১১ মাসের মাথায় আবারো সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে উনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। পার্টি নিষিদ্ধ হয়। উনাকে আজীবনের জন্য রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়।
পরবর্তীতে ফজিলত পার্টি নামে কাজ শুরু হয়। ২০০১ সালে এসে ফজিলত পার্টিও আবার নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু এখানে এসে পার্টিতে কোন্দল দেখা দেয়। আবদুল্লাহ গুল ওরিসেপতায়িপ এর দোগানরালিবারেলিজম এর আদলে নতুন পার্টি গঠন করেন, যার নাম একে পার্টি। যারা ২০০২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। ধারণা করা হয় এই কোন্দল সৃষ্টিতে ইহুদিদের বিশাল এক চক্রান্ত রয়েছে। আর মূল ইসলামী আন্দোলনের কাজ শুরু সাদাত পার্টি নামে। জনপ্রিয়তার দিক থেকে তুরস্কে এখনো সাদাত পার্টির অবস্থান চতুর্থ। কিন্তু এখনো সরকার পরিচালনায় যোগ্যতাসম্পন্ন অধিকাংশ লোকই নেওয়া হয় সাদাত পার্টি থেকে। সাদাত পার্টি বর্তমানে শুধু তুরস্কে নয় বরং সারা বিশ্বের ইসলামী আন্দোলনের কাজকে বেগবান করতে সর্বাত্মক সহায়তা করে যাচ্ছে।
তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের ওপর চালানো হয়েছে সীমাহীন নির্যাতন। জেল-জুলুম, অত্যাচার এগুলো ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। বারবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইসলামী সংগঠনকে। শাহাদাতবরণ করেছেন অনেক মর্দে মুজাহিদ। কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের কাজ থেমে থাকেনি। পাহাড়সম বাধাকে অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়েছে লক্ষ্যপানে। তাইতো যত বেশি নির্যাতন এসেছে, নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ততবেশি তার কাজ বেড়েছে। নিষিদ্ধ হওয়ার পর আবার নতুন করে যে নামেই এসেছে সাধারণ মানুষ তাদেরকে আগের চেয়ে আন্তরিকভাবেই গ্রহণ করেছে।
লেখক : পিএইচডি গবেষক
গাজি ইউনির্ভাসিটি, তুরস্ক

SHARE

Leave a Reply