আত্মহত্যা ও আমাদের সমাজ -হাসান মেহেদী

আত্মহত্যা একটি ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি। মানুষের মৃত্যুর কয়েকটি সাধারণ কারণের মধ্যে আত্মহত্যা একটি অন্যতম কারণ। আত্মহত্যা হচ্ছে- স্বেচ্ছায় নিজেকে নিধন করা কিংবা নিজেকে নিজেই মেরে ফেলা। অনেক সময় মানুষ ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও অবসাদগ্রস্ত মস্তিষ্কের বশে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা একটি অপরাধমূলক পাপ বা নৈতিকভাবে ভুল কাজ। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে প্রতিটি লোকালয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি আত্মহত্যাকে মানসিক অসুস্থতাসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আত্মহত্যা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে আবার এই পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রই আত্মহত্যার জন্য দায়ী থাকে। সমাজব্যবস্থায় ধর্মীয় কিংবা নৈতিকতার চর্চা আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে।
আত্মহত্যা বা আত্মহননের ইংরেজি প্রতিশব্দ Suicide.. ল্যাটিন ভাষার সুই সেইডেয়ার থেকে Suicide.বা আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে; যার অর্থ- নিজেকে হত্যা করা। আত্মহত্যা হলো- ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ। চিকিৎসকগণ আত্মহত্যার চেষ্টা করাকে মানসিক অবসাদজনিত গুরুতর উপসর্গ হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
American Psychological Association আত্মহত্যাকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে- “Suicide is the act of killing yourself, most often as a result of depression or other mental illness.
অপর দিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা World Health Organisation (WHO) আত্মহত্যার পরিচয় দিয়েছে এভাবে-“The act of deliberately killing oneself.Ó
কার্যকারণ সূত্রে আত্মহত্যাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: পরার্থী, অহংবাদী ও নৈরাজ্যমূলক। পরার্থী আত্মহত্যাকারী নিজের জীবন বিসর্জনের জন্য কিছু সামাজিক উদ্দেশ্য দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়; তজ্জাত আবেগ আত্মদানকে করে স্বতঃস্ফূর্ত। অহংবাদী আত্মহত্যায় ব্যক্তি সমাজের ভেতরে পর্যাপ্ত সংহতি এবং আত্মহত্যা ঠেকাতে পারে এমন সংঘবদ্ধ শক্তির অভাবে কষ্ট পেয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ হয়। আর নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যার উদ্ভব ঘটে সমাজের আদর্শহীনতা থেকে যেখানে ব্যক্তির ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা পরিপূরণের উপায়গুলো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রাচীনকাল থেকে আত্মহত্যা কিংবা আত্মহননের প্রবণতা চলে আসছে। শুরু থেকেই আত্মহত্যাকে ঘৃণিত কাজ হিসাবে দেখা হতো। প্রাচীন এথেন্সে যদি কোন ব্যক্তি রাষ্ট্রের অনুমোদন ব্যতিরেকে আত্মহত্যা করত তাহলে তাকে সাধারণ কবরস্থানের সম্মান দেয়াকে অস্বীকার করা হতো। তাকে কবরস্থ করা হতো শহরের বাইরে অবস্থিত কোন জায়গায়। তার জন্য কোন স্মৃতিফলকও ব্যবহার করতো না। কেউ কেউ আবার ব্যক্তি স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে আত্মহত্যাকে বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। পাশ্চাত্যের ডেভিড হিউম নামে এক ভদ্রলোক তার ১৭৭৭ প্রবন্ধে, আত্মহত্যা এবং আত্মার অমরত্ব নিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- “কেন আমি একটি করুণ অস্তিত্বকে দীর্ঘায়িত করবো?” ১৭০০ সালের দিকে আত্মহত্যা শব্দটি প্রথম আত্মত্যাগের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল যা আত্মহত্যার একটি রূপ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে আত্মহত্যা বৈধ হয়ে উঠেছিল। এই বৈধতাই একসময় অভিশপ্ত হয়ে আবির্ভূত হয় পৃথিবীর দিকে দিকে। সাম্প্রতিক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে; প্রতি ১০০,০০০ জনের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ৮.৬, কানাডা ১১.১, চীন ১২.৭, ভারত ২৩.২, যুক্তরাজ্য ৭.৬, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১১.৪ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৮.৯ জন লোক আত্মহত্যা করে। এ ছাড়া লিথুনিয়া, জাপান ও হাঙ্গেরির মধ্যে সর্বোচ্চ হার লক্ষ্য করা যায়। উন্নয়নশীল বিশ্বে প্রায় ৭৫% আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আত্মহত্যায় শীর্ষে অবস্থান করছে চীন ও ভারত। চীনে আত্মহত্যা জনিত মৃত্যু হলো ৫ম প্রধান কারণ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর জরিপ অনুযায়ী প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে এক মিলিয়নের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। এক আমেরিকাতেই বছরে গড়ে ৪৪,১৯৩ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে দশম হলো আত্মহত্যা। আরও চিন্তায় ফেলার মতো ব্যাপার হলো, গত ৪৫ বছরে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার হার ৬০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘটনা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে; স্টিভ স্টিফেন্স নামক এক ব্যক্তি ৭৪ বছর বয়সী রবার্ট গডউইন নামক অন্য এক ব্যক্তিকে ফেসবুক লাইভে থাকা অবস্থায় খুন করে। পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের পুলিশের বরাত দিয়ে ডেইলি মেইল জানায়, খুনের পরে স্টিভ নিজেও আত্মহত্যা করে এবং খুনের সময় তাকে চিৎকার করতে দেখা যায়। মানসিক বিকারগ্রস্ত এ মানুষগুলোর কাছে যেমন নিজের জীবনের কোন মূল্য নেই; তেমনি অন্যেরও। রাশিয়ার নাগরিক ফিলিপ ‘ভিকোন্তাক্তে’ নামক সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেম’ নামে একটি সোশ্যাল গেমিং পেজের অ্যাডমিন। এই গেমে প্রতিযোগীদের মোট ৫০টি আত্মনির্যাতনমূলক টাস্ক কমপ্লিট করতে হতো। ভয়ঙ্কর ছিল সেসব টাস্ক। পুলিশের দাবি, গত কয়েক মাসে বিশ্বে অন্তত ১৩০ জনেরও বেশি মানুষের আত্মহননের জন্য এই গেমই দায়ী। পুলিশের কাছে নিজের কৃতকর্মের কথা স্বীকার করেছে ফিলিপ। তবে বিকারগ্রস্ত ফিলিপ তার কাজকে ‘অপরাধ’ বলে মানতে নারাজ। তার বক্তব্য, সে তার খেলার মাধ্যমে সমাজের ‘শুদ্ধিকরণ’ ঘটাচ্ছিল। যাদের সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই, তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়াই ছিল তার লক্ষ্য। সূত্র: ডেইলি মিরর।
ফিলিপ পুলিশের কাছে বন্দি হয়েছে কিন্তু তার মতো আরো শত ফিলিপ পশ্চিমা বিশ্বে গেম তৈরিতে ব্যস্ত। ব্লু হোয়েল সুইসাইড গেমের মতো শত গেম ঘুরে বেড়াচ্ছে অনলাইন জগতে। তৈরি করছে, খেয়ালের বশে ছুটে চলা তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার পথিক হিসেবে। যার প্রমাণ ফিলিপের গেমটি; একটি সূত্র বলেছে, ব্লু হোয়েল গেমটি ব্রিটেনের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
পৃথিবীর অপরাপর প্রান্তের মত বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রবণতা যথেষ্ট উদ্বেগের। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মতে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার এবং প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করছে যাদের একটি বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। ছাত্রী, গৃহবধূ ও কম শিক্ষিত নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। পরিসংখ্যান মতে, দেশে আত্মহত্যার দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ এলাকার মানুষ। একটি সূত্র মতে, এশিয়ার মধ্যে ঝিনাইদহ আত্মহত্যায় প্রথম। গত তিন মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঝিনাইদহে প্রতি মাসে গড়ে ৩৫ জন লোক আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার যেসব পরিসংখ্যান পত্রিকায় ছাপা হয়, সেগুলোর বিষয়ই শুধু আমরা জানতে পারি। সে জন্য বলা যায়Ñ আমাদের গোচরে না আসা আত্মহত্যাকারীর সংখ্যাও কম নয়।
আত্মহত্যার জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে; গলায় ফাঁস দিয়ে, বিষাক্ত কীটনাশক পান করে এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে আত্মহত্যা করা। বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার ৩০% কীটনাশক বিষক্রিয়া থেকে ঘটে থাকে, যার অধিকাংশই উন্নয়নশীল বিশ্বে ঘটতে দেখা যায়। চীনে কীটনাশক পান করা সবচেয়ে সাধারণ পদ্ধতি। জাপানে ‘হারাকিরি’ আরেক আনুষ্ঠানিক আত্মহত্যা যাতে ছুরি দিয়ে উদর চিরে ফেলা হয়। হংকং এবং সিঙ্গাপুরে জাম্পিং এর মাধ্যমে যথাক্রমে ৫০% এবং ৮০% আত্মহত্যা সম্পন্ন হয়। সুইজারল্যান্ডে অল্পবয়সী ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার জন্য, সর্বাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আত্মহত্যার ৫৭% আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সাথে জড়িত। এ ছাড়াও আত্মহত্যা করার আরো কিছু পদ্ধতি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে- পানিতে ডুবে, কারেন্ট শক, হাতের শিরা কেটে, উঁচু জায়গা হতে লাফ দেয়া, শ্বাসরোধ করা, গ্যাস ছেড়ে দেয়া, মাত্রাতিরক্ত ঔষুধ খাওয়া, গায়ে আগুন দেয়া ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়।
আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে ৮৭% থেকে ৯৮% আত্মহত্যাকর্ম সংঘটিত হয়। এ ছাড়াও, আত্মহত্যাজনিত ঝুঁকির মধ্যে অন্যান্য বিষয়াদিও আন্তঃসম্পৃক্ত। তন্মধ্যে- নেশায় আসক্তি, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে না পাওয়া, আত্মহত্যায় পারিবারিক ঐতিহ্য অথবা পূর্বেকার মাথায় আঘাত অন্যতম প্রধান উপাদান। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেকারত্ব, দরিদ্রতা, গৃহহীনতা এবং বৈষম্যতাজনিত উপাদানগুলো আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে থাকে। দরিদ্রতা সরাসরি আত্মহত্যার সাথে জড়িত নয়। কিন্তু এটি বৃদ্ধির ফলে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায় এবং উদ্বেগজনিত কারণে আত্মহত্যার উচ্চস্তরে ব্যক্তি অবস্থান করে। আপেক্ষিক দরিদ্রতা বৃদ্ধি একজন ব্যক্তির চারপাশে আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ভারতে ২০০,০০০-এরও বেশি কৃষক আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করে। চীনে নগরের চেয়ে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মহত্যার হার তিন গুণ বেশি; দেশটির এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সমস্যাকেই এর কারণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। শৈশবকালীন শারীরিক ইতিহাস কিংবা যৌন অত্যাচার অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সময় অতিবাহিতজনিত কারণও আত্মহত্যার ঝুঁকিগত উপাদান হিসেবে বিবেচিত। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে মিডিয়া। অনেক সময় মিডিয়া আত্মহত্যার প্রশংসা করে বা রোমান্টিকাইজ করে। বর্তমানে কথিত প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। বলিউডের নায়িকা জিয়া খান, হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা প্রত্যুষা ব্যানার্জি আত্মহত্যা করেছিলেন যে কারণে, সে কারণে সেদিন বাংলাদেশের মডেল সাবিরা হোসাইনও আত্মহত্যা করেছেন। পরিবার বা সমাজ স্বীকৃতি না দেয়ায় প্রেমিক যুগলের সম্মিলিত আত্মহত্যার ঘটনাও প্রায়ই ঘটছে। এগুলো অপসংস্কৃতি জর্জরিত মিডিয়ার মাধ্যমে সমাজে ছড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু আত্মহত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে তোলপাড় করে; বছরের শুরুতে ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর থানাধীন বাসায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে মডেল জ্যাকুলিন মিথিলা ওরফে জয়া, এর প্রায় সাথে সাথে আত্মহত্যা করে শিরোনাম হয়ে আসে মালদ্বীপের বংশোদ্ভূত ভারতের ‘ভোগ’ সাময়িকীর প্রচ্ছদকন্যা রাউধা আতিফ। মাত্র ২০ বছর বয়সে সেলিব্রেটি বনে যায় রাউধা। গত ১ জুলাই সিলেটে স্বামীর সাথে অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে ইয়াসমিন আক্তার। কিছুদিন আগে নওগাঁর মান্দায় একই রশিতে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে গোলাম রাব্বানী (২২) ও তসলিমা আক্তার (১৮) নামে দুই প্রেমিক-প্রেমিকা। গত বছর আগস্টে পত্রিকার শিরোনাম হয় মিরপুর সাইক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী আফসানা ফেরদৌস। এ বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি বিবিসি বাংলার শিরোনাম- “বাংলাদেশে ‘ইভ টিজিং-এর শিকার হয়ে’ আড়াই বছরে ৪০ মেয়ের আত্মহত্যা”। এই ঘটনাগুলোর প্রত্যেকটির জন্য মিডিয়ার সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে দায়ী।
গত ৫ মে প্রথম আলোর শিরোনাম “২৪ ঘণ্টায় আত্মহত্যা করেছে অকৃতকার্য ৮ এসএসসি শিক্ষার্থী”। প্রতিবেদনে বলা হয়; এসএসসির ফল প্রকাশের পর, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে অন্তত আটজন এসএসসি শিক্ষার্থী কৃতকার্য না হতে পেরে আত্মহত্যা করেছে। সমাজের কাছে ন্যায়বিচার না পেয়ে ক্ষোভে-অভিমানে-লজ্জায় ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে বাবা-মেয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে (নয়া দিগন্ত)। এর জন্য অসুস্থ সমাজব্যবস্থা আর স্বার্থান্বেষী সমাজপতিরা দায়ী কি না ভেবে দেখার সময় এসেছে।
এশিয়াতে আত্মহত্যার হার পশ্চিমা দেশের তুলনায় অনেক কম। মানসিক রোগ কিংবা রোগীর সংখ্যাও কম। কিন্তু কেন? পাশ্চাত্য তো বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় বিশ্ব শাসন করছে আর কথিত আধুনিকতায় পৃথিবীর মডেল। আসলে পশ্চিমা দেশের অসুস্থ সমাজব্যবস্থা আর সুস্থ সংস্কৃতির দৈন্যতার কারণে সেখানে মানসিক রোগের পরিধি বেড়ে চলেছে। সাথে সাথে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেড়েছে। অপর দিকে, এশিয়ার সভ্যতা-সংস্কৃতি কিংবা সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে। এখানে মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ দেখা যায় খুব কম। মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষ এখানে তৈরি হতো না। হ্যাঁ এখন হচ্ছে, যখনই আমরা পশ্চিমা সংস্কৃতি আমদানি করা শুরু করেছি; তখনই শুরু হয়েছে অসুস্থ মানুষ তৈরি। শুরু হয়েছে, পশ্চিমা দেশের মতো হঠাৎ করে কোন রেস্টুরেন্টে ঢুকে মানুষ হত্যা করা; ছেলে বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করার মত ঘটনা। সাথে সাথে নিজেও আত্মহত্যা করে। এগুলো কি সুস্থতার লক্ষণ হতে পারে? অসুস্থতার চর্চা করে সমাজে এমন অসুস্থ বিকারগ্রস্ত মানুষ তৈরি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখনই লাগাম টেনে না ধরলে, অসুস্থ সংস্কৃতির আমদানি বন্ধ না হলে, পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে; তখন আত্মহত্যার প্রবণতা কমবে না বরং বাড়বে; এটা বলাই যায়।
প্রযুক্তি মানুষকে ব্যস্ত করে তুলেছে। জীবনে ক্রমবর্ধমান ব্যস্ততা ক্রমে মানুষকে নিঃসঙ্গ করে ফেলছে। প্রতিটি মানুষ তার চারিদিকে এক অদৃশ্য দেয়াল নিয়ে ঘুরছে। যে পরিমাণে নিত্যনতুন মানসিক সমস্যায় মানুষ রোজ আপতিত হচ্ছে, সে পরিমাণে মানসিক সহায়তা তারা একে অপরের কাছ থেকে পাচ্ছে না। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানসিক রোগীর হার, বৃদ্ধি পাচ্ছে আত্মহত্যার হারও।
পৃথিবীর প্রায় বেশির ভাগ দেশেই আত্মহত্যা একটি দন্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। তারপরও সামাজিক নিয়ম-নীতির ঊর্ধ্বে উঠে, আইনের তোয়াক্কা না করে, প্রতিদিন আমাদের আশপাশে কেউ না কেউ স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। এর কারণ, আমাদের আইন কিংবা সামাজিক নিয়ম-নীতির সাথে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা নৈতিকতা কিংবা শুদ্ধতার সমন্বয় সাধন হয়নি। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মে আত্মহত্যা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইসলাম ধর্ম, হিন্দুধর্ম, খ্রিষ্টধর্মসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুলোর কোনোটিই আত্মহত্যার অনুমতি দেয় না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়ো না।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫) আরো বলা হয়েছে-‘তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু এবং যে সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করব; এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত : ২৯-৩০) খ্রিষ্টধর্মে বলা হয়েছে, “তুমি নিজেকে হত্যা করো না।” (ম্যাথু ১৯:১৮)
শেষ করব, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ঘটনা দিয়ে- “মুরগি বিক্রি করে সংসার চালান আনোয়ার হোসেন। রাজধানীর মগবাজারে ভাড়া থাকেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। সংসারে আগে সচ্ছলতা থাকলেও বর্তমানে নেই। একদিকে ব্যবসা মন্দা তার ওপর তিন ছেলেই ব্যবসার টাকা চুরি করে। দিন শেষে যা লাভ হয় তার বেশির ভাগই লুট হয়ে যায় তিন ছেলের হাতে। বড় ছেলে মাদকসেবী। অভাব-অনটন নিয়ে সংসারে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। মনের দুঃখে গত সপ্তাহে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। ফাঁসিতে ঝোলার কয়েক মিনিটের মধ্যে একজন এসে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করায় বেঁচে যান।” খুদে ব্যবসায়ী আনোয়ার ভাগ্যগুণে বেঁচে গেলেও আত্মহত্যায় অনেকের জীবনই অকালে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আত্মহত্যার এ প্রবণতা সমাজবিজ্ঞানী কিংবা ধর্মতাত্ত্বিকদের শুধু নয়; সমাজের আপামর জনসাধারণকেও চিন্তিত করে তুলেছে। যে পরিবারের সদস্যরা আত্মহত্যা করে তারাই জানে তাদের বেদনা কত বেশি। যার সন্তান আত্মহত্যা করেছে, যার ভাই, যার বাবা, যার মা, যার বোন মরেছে- সেই ভুক্তভোগীই মৃত্যুজনিত কষ্টের ব্যাপারটি গভীরভাবে অনুভব করে। এর প্রভাব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে পড়ে। আর এর জন্য সমাজ-পরিবার-রাষ্ট্র-অর্থনীতি ও আধুনিক জীবনব্যবস্থা সব কিছুই দায়ী। সেই সম্মিলিত দায়ের মধ্যে আমরা বড্ড অসহায়।
বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান সামাজিক অবক্ষয় ও ত্রুটিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা আত্মহত্যার হার বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কাজেই সামাজিক অবক্ষয় রোধে সামাজিক নিয়ম-নীতির সকল পর্যায়ে যদি শুদ্ধতার সমন্বয় হতো তবে মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষ তৈরি হতো না। কমে যেত আত্মহত্যার প্রবণতাসহ আরো অনেক অপরাধ।
লেখক : বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply