আদর্শ পরিবার গঠনে রাসূল (সা)-এর আদর্শ

শামসুন্নাহার নিজামী

সমাজকে ভালো রাখার জন্য মানুষের প্রচেষ্টার অন্ত নেই। সমাজকে অন্যায়মুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করার জন্যও চলছে চেষ্টা প্রচেষ্টা। এর জন্য প্রণীত হচ্ছে আইন। আইনের প্রয়োগের ফলে দুর্নীতি অন্যায় অনাচার একেবারে কমছে না এটা যেমন বলা যায় না তেমনই দুর্নীতি নির্মূল হচ্ছে না এটাও মানুষ বুঝতে পারছে। একটা দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর সুখী সমৃদ্ধ সমাজ সবারই কাম্য। আর পরিবারই হচ্ছে সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট। অনেক পরিবারের সমষ্টিই হচ্ছে একটা সমাজ। একটা ঘরের ইটগুলো যদি নষ্ট হয় তাহলে গোটা ঘরই যেমন দুর্বল হয়- তেমনি একটা সমাজের পরিবারগুলো নষ্ট হয়ে গেলে সেই সমাজও সুস্থ সুন্দর হতে পারে না।
একটি পরিবারের সূচনা হয় বিবাহের মাধ্যমে। একজন নারী এবং একজন পুরুষের বিবাহ নামক বন্ধনের মাধ্যমে যে পরিবারের যাত্রা শুরু হল তা ক্রমান্বয়ে সন্তান-সন্ততি আত্মীয়-স্বজন নিয়ে পরিপূর্ণতা রূপ লাভ করে। যে আয়াতটি বিবাহের সময় পড়া হয় যা বিয়ের খুৎবা হিসেবে পরিচিত তা নিম্নরূপ :
‘‘হে জনগণ! তোমাদের রবকে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে একটি ‘প্রাণ’ থেকে সৃষ্টি করেছেন। তা থেকে তার জুড়ি তৈরি করেছেন এবং তাদের থেকে বহু সংখ্যক পুরুষ ও স্ত্রীলোক দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর যার দোহাই দিয়ে তোমরা পরস্পরের নিকট থেকে নিজের হক দাবি কর এবং আত্মীয় সূত্র ও নিকটত্বের সম্পর্ক বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাক। নিশ্চিত জেনো যে আল্লাহ তোমাদের উপর কড়া দৃষ্টি রাখছেন।’’ (সূরা আন নিসা : ১)
বিবাহের এ খুৎবার মাধ্যমে যে পরিবারটির সূচনা করা হলো সেই পরিবারের সদস্যদের তার দায়িত্ব কর্তব্যের কথা এর মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হলো।
১. গোটা বিশ্বের মানুষ ভাই ভাই। একটি প্রাণ থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশ-কাল-পাত্র ভেদে মানুষ সাদা কালো, ধনী-গরিব, শিক্ষিত, অশিক্ষিত হতে পারে। কিন্তু মূলত তারা এক পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া থেকে এসেছে। এখানে আরব, অনারব, উঁচু-নিচু, আশরাফ-আতরাফের কোন ভেদাভেদ নেই। বরং যে সৎ কর্মশীল, যোগ্য, তাকওয়াদার সেই শ্রেষ্ঠ। কুরআনে কালামে পাকে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘‘তোমাদের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠ যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু।’’
২. আল্লাহকে ভয় করতে হবে। এটা একটা ব্যাপক অর্থবোধক কথা। আল্লাহকে ভয় করতে হলে আল্লাহর সঠিক পরিচয় জানতে হবে। জানতে হবে আল্লাহর জাত, সিফাত। ধারণা থাকতে হবে আল্লাহর ক্ষমতা এখতিয়ারের। বুঝতে হবে আল্লাহর হুকুম মানলে কী লাভ না মানলে কী ক্ষতি। আর এগুলো জানা বোঝার জন্য কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানার্জন প্রয়োজন।
৩. একটা সমাজ সুন্দর হওয়া সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, পরস্পরের সম্পর্কের হক আদায় করা এগুলো নির্ভর করে আল্লাহভীতির ওপর। স্বার্থপরতা, নির্লজ্জতা, সম্পর্ক বিনষ্ট করা এগুলো আল্লাহর ভীতির বিপরীত। সব কিছু আল্লাহ দেখছেন, তাঁর কাছে সব কিছুর ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে এই অনুভূতিই মানুষকে ভাল থাকতে, সৎ এবং দায়িত্ববান হতে সাহায্য করে। আখেরাতের প্রতি ঈমান মানুষকে সৎ হওয়ার ব্যাপারে পূর্ণতা দান করে।
আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা) আমাদের জন্য সর্বযুগেই একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি ছিলেন কুরআনের মূর্তপ্রতীক। তিনি তার পারিবারিক জীবন শুরু করেছিলেন বিবি খাদিজার সঙ্গে। একদিকে তরুণ যুবক মুহাম্মদ (সা) যেমন ছিলেন সে যুগের সবচেয়ে আমানতদার, চরিত্রবান, সত্যবাদী আদর্শ যুবক-যার পরিচয় ছিল আল আমিন-আল সাদিক তেমনি বিবি খাদিজা ছিলেন সৎচরিত্রা আদর্শ মহিলা। তারও পরিচয় ছিল তাহেরা বা পবিত্র। এই পরিবারটি ছিল একটি আদর্শ পরিবার। খাদিজা তাহেরা ছিলেন অঢেল সম্পদের অধিকারী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার স্বামী মুহাম্মদ (সা)-এর মিশন কী? সেই মিশন বাস্তবায়নের জন্য সমস্ত সম্পদ তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিলেন। এ মহান ব্যক্তির জন্য শারীরিক কষ্ট স্বীকার করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। প্রৌঢ় বয়সে তিনি হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানমগ্ন স্বামীর খাবার পৌঁছে দিতেন। তাঁর এ কার্যকলাপে খুশি হয়ে জিবরাইল (আ) তাঁকে সালাম পৌঁছেছেন। পারিবারিক জীবনে এ দম্পতি ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও শান্তিময়। খাদিজার (রা) মৃত্যুর পরও রাসূল (সা) তাকে স্মরণ করতেন। কোন বকরি জবাই হলে খাদিজার বান্ধবীদের হাদিয়া পাঠাতেন। রাসূল (সা)-এ কার্যকলাপের ফলে অনেক সময় আয়েশা (রা) মন্তব্য করতেন যে আল্লাহ আপনাকে তাঁর চেয়েও সুন্দরী বিদুষী স্ত্রী দান করেছেন অথচ আপনি এখনও খাদিজার কথা মনে করেন। আয়েশার (রা) এ কথা রাসূল (সা) অপছন্দ করেছেন। এ মহান দম্পতির সন্তানেরাও সমাজের আদর্শ। বিশেষ করে শেষ কন্যা হজরত ফাতেমাÑ যিনি বেহেশতে নারীদের নেত্রী হবেন।
বর্তমান সমাজে নতুন প্রজন্ম যে অনৈতিকতা ও চরিত্রহীনতার দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে তা আমাদের জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এত নিচু স্তরে নেমে গিয়েছে যা ভাবতে গেলে শরীর শিউরে ওঠে। বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি এগুলোতে আরও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগ্নতা, অশ্লীলতা এখন আর কোন লজ্জার বিষয় নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে এ সমাজ পশুর সামজের চাইতেও নিচু স্তরে নেমে যাবে। মানুষ চলে যাবে আবার আইয়্যামে জাহেলিয়াতের সেই অন্ধকার যুগে। এ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে আল্লাহপ্রদত্ত ও রাসূল (সা) প্রদর্শিত পথের কোন বিকল্প নেই। আর এর কার্যক্রম শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। পরিবারে সন্তান সন্ততিকে কী শিক্ষা দিতে হবে তার মূলনীতি পবিত্র কুরআনে সূরা লোকমানে আল্লাহ রাববুল আলামিন বলে দিয়েছেন : “হে আমার সন্তানেরা। তোমরা শিরক করো না। শিরক সবচেয়ে বড় জুলুম। অর্থাৎ সন্তানকে আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে। আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবেই মানুষ শিরক করে। বাবা মায়ের অধিকার আদায় করে না। বর্তমানে আমাদের দেশে নতুন আইন প্রবর্তিত হয়েছে। পিতা-মাতার ভরণ পোষণ না দিলে সন্তানকে জরিমানা দিতে হবে। জরিমানা করে কি হক আদায় করা যায়? এটা মনের ব্যাপার। মনও তৈরি হয় ঈমান থেকে। আল্লাহ আমার রব ইলাহ। সমস্ত কিছুই তিনি দেখছেন। সব ব্যাপারে তাঁকেই জবাবদিহি করতে হবে। এ অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া ছাড়া অধিকার আদায় সম্ভব নয়। পাশ্চাত্য দেশে অমুসলিমদের সমাজে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মেলে। সেখানে রাস্তাঘাটে দেখা যায় বৃদ্ধরা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেরাই কিনছে। বাসায় একা একা বসে আছে। কেউ হ্যালো বললেও তারা খুশি হয়ে যায়। পক্ষান্তরে মুসলিম সমাজে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যায়। মক্কা-মদিনায় গেলে দেখা যায় বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সন্তানেরা প্রতি ওয়াক্তের নামাজে হুইল চেয়ারে করে নামাজ পড়তে আনছে। তাদের খেদমতের জন্য তারা সদা তৎপর। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এটাতো এ জন্য যে তাদের আল্লাহর প্রতি ঈমান আছে। আল্লাহর নির্দেশ তারা জানে। “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরিক করো না। আর পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।’” (সূরা নিসা : ৩৬)। “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩) “আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।” (সূরা লোকমান : ১৪) পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার গুরুত্ব তৌহিদের পরেই। এজন্য পিতা-মাতার অবাধ্যতা শিরকের পরেই স্থান পেয়েছে এবং নবী করীম (সা) একে মহাপাপ বলে গণ্য করেছেন। ইসলাম পিতা-মাতার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করার জন্য কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে বৃদ্ধকালে যখন তারা দুর্বল হয়ে পড়েন আর অপরের খেদমতের বেশি মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েন। তখন তারা শিশু বা তার চেয়েও অবুঝ হয়ে যান। সামান্য অবহেলাও তারা সহ্য করতে পারেন না। এ ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশ : “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া আর কারও এবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে ভাল ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমাদের কাছে বৃদ্ধ বয়সে থাকেন তবে তাদেরকে উহ্ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। তাদের সাথে বিনয় অবনত হয়ে আচরণ কর। আর দোয়া করতে থাক, “হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছে।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-২৪) সন্তানের জন্য মায়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ বিশেষভাবে দেয়া হয়েছে : “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে। আর তার দুধ ছাড়তে আরও দুই বছর লেগে যায়। সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর।” (সূরা লোকমান : ১৪) “আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস।” (সূরা আহকাফ : ১৫)
আল্লাহ পাক পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে মায়ের গর্ভকালীন, প্রসবকালীন, দুধপান সময়ের কষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন। এ জন্যই রাসূল (সা) মায়ের ব্যাপারে তিনবার নির্দেশ দিয়েছেন আর পিতার ব্যাপারে একবার। যখন তাকে কতিপয় মুসলমান জিজ্ঞাসা করেন, কে আমার কাছে ভাল ব্যবহার পাওয়ার বেশি হকদার? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞাসা করল তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞাসা করল এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে জিজ্ঞাসা করল এরপর কে? তিনি বললেন, তোমার পিতা।
তিনি আরও বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদের মায়েদের সাথে সদয় ব্যবহার করার জন্য। অতঃপর নির্দেশ দিয়েছেন মায়েদের সাথে ভাল ব্যবহার করার জন্য। অতঃপর নির্দেশ দিয়েছেন মায়েদের সাথে ভাল ব্যবহার করার জন্য। এরপর নির্দেশ দিয়েছেন পিতার সাথে সদাচরণ করার জন্য। অতঃপর নির্দেশ দিয়েছেন নিকটাত্মীয়দের সাথে সদয় ব্যবহার করার জন্য।
যে সন্তান পরিবার থেকে এ শিক্ষা পায় সে সমাজে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করতে পারে না। পক্ষান্তরে পরিবারের টহপধৎবফ অবহেলিত সন্তানেরা হয় উচ্ছৃঙ্খল। দুনিয়াতে যত বড় জ্ঞানী-গুণী প-িত তথা ভাল মানুষ আছে খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের মায়েরা ছিলেন আদর্শ মা।
আজকের সমাজে সৎ নেতৃত্বের কথা খুব বেশি বেশি শোনা যায়। সৎ নেতৃত্বের অভাবেই সমাজের এ দুরবস্থা এ কথার চর্চাও খুব বেশি হয়। এই সৎ নেতৃত্ব আকাশ থেকেও নাজিল হবে না আবার জমিন থেকেও পয়দা হবে না। সৎ নেতৃত্ব তথা সৎ মানুষ আসবে আদর্শ পরিবার থেকেই। আর সেই আদর্শ ইসলাম ছাড়া কিছুই নয়। দেশকে ভালোবাসলে দেশের কল্যাণ চাইলে পরিবারগুলোকে আদর্শ ইসলামী পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ

SHARE

Leave a Reply