আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ – ড. মোবারক হোসাইন

বর্তমান পরিবর্তনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমান বিশ্বে রয়েছে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। এসকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। কারণ একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি হলো মানুষ। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক মজবুতি নির্ভর করে সে দেশের দক্ষ মানবসম্পদের ওপর। মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। প্রতিটি দেশেরই জনসংখ্যা রয়েছে। তবে সব দেশের জনসংখ্যা মানবসম্পদ নয়। মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সমাজের সকল মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য আনুষ্ঠানিক ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রয়োজন। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে মানবসম্পদ অন্যতম। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মানুষের জন্যই উন্নয়ন এবং মানুষই উন্নয়ন করে। তাই অর্থসম্পদ ও ভৌতসম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও যদি মানবসম্পদের অভাব থাকে তবে সেক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়ে।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস
মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে বা তারও পূর্বে গুহাযুগ থেকেই ব্যবস্থাপনা শব্দটির ব্যবহার হয়ে আসছে। নিজ পরিবার থেকে গোত্র, পশুপালন থেকে কৃষি, শিল্পযুগ থেকে বর্তমানের প্রযুক্তি যুগ যেটাই বলি না কেন সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা শব্দটি ঠিকই নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। আর বলা বাহুল্য উক্ত ব্যবস্থাপনার কারিগর ‘মানুষ’ তাদের সক্ষমতাকে যুগে যুগে সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করেছেন। ‘মানবসম্পদ’ ধারণাটি যথেষ্টই আধুনিক, গত শতাব্দীর প্রথম দিকেও কোন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখা হতো না। যে জাতি যত বেশি দক্ষতার সাথে মানবসম্পদকে ব্যবহার করছে সে জাতি তত বেশি উন্নত হচ্ছে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে যে পরিপূর্ণ রূপ আজকে আমরা দেখছি তা কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এটি মূলত বিংশ শতাব্দীর চিন্তাভাবনার ফসল। ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ ও বিবর্তনের ধারায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়টি আসলে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমের উন্নয়নের ধারায় সংযোজিত এক নতুন অধ্যায়। এ অধ্যায়ে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে কর্মী ব্যবস্থাপনার সমষ্টিগত আকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো প্রতিষ্ঠানের কর্মরত সকল স্তরের মানবীয় উপকরণের সাথে জড়িত সব কাজের সমন্বিত দিক। অতীতে প্রতিষ্ঠানের জনশক্তিকে অন্যান্য উপকরণের ন্যায় সাধারণ একটি উপকরণ মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এ ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমানে জনশক্তিকে সংগঠনের সবচেয়ে মূল্যবান ও অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্মী ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের যে সকল ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন Robert Owen তাদের মধ্যে অন্যতম। খ্যাতনামা বস্ত্র উৎপাদনকারী Robert Owen তার প্রতিষ্ঠানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করে শ্রমিক কর্মীদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেন। ১৮১৩ সালে তিনিই প্রথম A New View of Society নামক গ্রন্থে শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য কর্মসূচি গ্রহণের সুপারিশ করেন ফলে অনেকেই তাকে আধুনিক কর্মী ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠাতা রূপে গণ্য করেন। এরপর ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে F. W. Taylor- Scientific Management গ্রন্থে পরিকল্পনা বিভাগের আওতায় Employment Bureau নামে একটি শাখার কথা বলে কর্মী ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের পথকে সুগম করেছেন। ১৯১২ সালে শ্রমিক কর্মীদের কল্যাণের জন্য শিল্পপতিগণ Welfare Secretaries নিয়োগ করে পরবর্তীতে যারা কর্মীব্যবস্থাপক হিসেবে পরিচিত হন। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে শিল্প কারখানায় কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিকের কার্যসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার জন্য ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম কর্মী ব্যবস্থাপনার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৪৫ সালের পর থেকে কর্মী ব্যবস্থাপনার দ্রুত উন্নতি ঘটে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। ফলে পৃথক কর্মী বিভাগের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। সাধারণ অর্থে কর্মী বলতে সংগঠনের নিম্নস্তরের কর্মচারী ও শ্রমিকদের বুঝায়, অথচ কার্য সম্পাদনের জন্য প্রত্যক্ষভাবে সংগঠনের মধ্যমে ও উচ্চস্তরের নির্বাহীগণও জড়িত থাকে। সে অর্থে কর্মী ব্যবস্থাপনা কথাটির দ্বারা এর আওতা সীমিত হয়ে পড়ে ফলে সংগঠনের সকল স্তরের মানবীয় উপাদানকে বুঝানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালের পর থেকে কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগের নাম পরিবর্তন করে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা রেখেছে। সেই থেকে এ বিষয়টি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নাম পরিগ্রহ করে সর্বক্ষেত্রে ব্যবহৃত ও প্রচলিত হচ্ছে। তাই আধুনিক বিশ্বে মানবসম্পদ এর সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত করার উপর সকলে গুরুত্ব দিচ্ছেন। মানব-সম্পদ ব্যবস্থাপনার শুরুর দিকের পরিধি এখন সম্প্রসারিত হয়েছে। তাইতো মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, উৎপাদন কৌশল, তথ্য-প্রযুক্তিসহ বিবিধ বিষয়ের প্রয়োজনীয় তত্ত্বসমূহ ও তার ব্যবহার আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মানবসম্পদ কী এবং মানুষ কখন মানবসম্পদে  রূপান্তরিত হয়?
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে ‘মানবসম্পদ’ অন্যতম। মানবসম্পদ বলতে জ্ঞান সম্পদে সমৃদ্ধ এমন বুদ্ধিমান, দক্ষ, নৈতিকমানে উন্নত ও কর্মপটু মানুষকে বুঝায়, যে মানুষ দেশের সার্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যথাযথ অংশগ্রহণ করে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অন্যভাবে বলা যায়- মেধাবী, দক্ষ, সৎ, কর্মপটু, প্রযুক্তি, কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম ব্যক্তিই মানবসম্পদ।
মানবসম্পদকে প্রকৃত সম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য মানবের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, জ্ঞানগত এবং পেশাগত দক্ষতা, কর্মসংস্থান এ রকম নানা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উন্নতির প্রয়োজন। এসবের অভাব দেখা দিলে মানবসম্পদ আপদে পরিণত হতে পারে। মানবসম্পদ (Human Resource) সম্পূর্ণভাবে স্বাভাবিক বা জন্মগত নয়। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে মানবসম্পদে পরিণত হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পল জে মায়ার, মানবসম্পদকে একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে অভিহিত করেছেন। আধুনিক অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন যে অন্যান্য সম্পদের মতো মানুষও সম্পদ। তবে মানবশক্তি তখনই মানবসম্পদে পরিণত হবে, যখন তা সুপরিকল্পিত উপায়ে পরিচালিত হবে।

মানুষ কখন মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে?
সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করে তবেই মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে। মানবসম্পদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো সুস্বাস্থ্য। মানুষ যখন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে তখন সে সম্পদে পরিণত হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
♦ মানুষ যখন কোনো উৎপাদনমূলক কাজের সাথে যুক্ত থাকে বা যুক্ত থাকার যোগ্যতা রাখে তখন তাকে মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
♦ মানুষের মানসিক ক্ষমতা এবং সুস্থতা মানবসম্পদের অন্যতম উপাদান।
♦ প্রত্যেক মানুষের সাধারণ মানসিক ক্ষমতার সঙ্গে কিছু না কিছু বিশেষ মানসিক ক্ষমতা থাকে। এই বিশেষ মানসিক ক্ষমতা তাকে কোনো বিশেষ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করে। এই বিশেষ মানসিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিকে মানবসম্পদ বলা হয়।
♦ মানুষকে মানবসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সাক্ষরতা।
♦ সুশিক্ষিত ও মেধাবী করে গড়ে তোলা।
♦ মানুষকে মানবসম্পদে বিবেচনা করার অন্যতম উপাদান হচ্ছে প্রেষণা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, কর্মঠ ব্যক্তি।
♦ তিনিই সম্পদে পরিণত হবেন যিনি সৎ ও নৈতিকমানে উন্নত মানুষ।
♦ দশ রকমের ভাবনায় উদ্বুদ্ধ ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ।

মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং এর প্রয়োজনীয়তা
মানবসম্পদ উন্নয়ন সকল উন্নয়নের চাবিকাঠি। মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে এমন এক প্রক্রিয়াকে বুঝায় যার মাধ্যমে কোন সমাজের সকল মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মানসম্পদ উন্নয়ন হলো জনসম্পদের এমন এক গুণগত পরিবর্তন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তার উৎপাদনক্ষম ও দক্ষ জনশক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে বলিষ্ঠ অবদান রাখতে পারে এবং মানবীয় শক্তি সামর্থ্যরে সর্বোত্তম বিকাশে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের জনগোষ্ঠী একটি বিশাল সম্পদে পরিণত হতে পারে। মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে একটি মানবগোষ্ঠীর সুপ্ত প্রতিভা, প্রচ্ছন্ন শক্তি, লুক্কায়িত সামর্থ্য, যোগ্যতার প্রসার ঘটে। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের এক সম্মেলনে বলা হয় যে, আধুনিক অর্থে মানবসম্পদ উন্নয়ন হল মানুষের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্বিকরণ অর্থাৎ, উৎপাদন কর্মে প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে মানুষের কারিগরি দক্ষতা বা ব্যবহারের উপযোগিতা বৃদ্বিকরণ। সাধারণ কথায়, মানবসম্পদ উন্নয়নকে বলা হয়, People Centre Development অর্থাৎ উন্নয়নব্যবস্থা হবে সম্পূর্ণ মানবকেন্দ্রিক; মানুষ নিজেরা নিজেদের দৈহিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন ঘটাবে এবং নিজেরাই তার ফল ভোগ করবে। শিক্ষাবিদ-গবেষকগণের কেউ কেউ মানবসম্পদ উন্নয়নকে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট করে দেখেছেন যা কর্ম-কৃতিত্ব (Job Performance) বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা বলেছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো কর্ম-কৃতিত্ব উন্নয়ন বৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংগঠিত শিক্ষা অভিজ্ঞতা।
মানবসম্পদ হচ্ছে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রাণশক্তি। মানবসম্পদ বলতে মূলত কোনো দেশের জনশক্তিকে বুঝায়। কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন অতি জরুরি। ছোট্ট উদাহরণে বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। দক্ষ পরিচালনায় পরিবারের একাধিক সন্তানও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আবার অদক্ষ পরিচালনায় পরিবারের একটি সন্তানকেও প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব হতে পারে। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অবস্থাও এরকমই। জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে প্রবেশ ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান তৈরির চাবিকাঠি হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রধানত আটটি উপাদানের উপর নির্ভর করে- ১) খাদ্য ও পুষ্টি, ২) বস্ত্র, ৩) উন্নত বাসস্থান, ৪) শিক্ষা, ৫) স্বাস্থ্য সুবিধা, ৬) গণসংযোগ মাধ্যম, ৭) শক্তি ভোগ, ৮) পরিবহন। অপরদিকে স্বাক্ষরতা, সুস্বাস্থ্য, উৎপাদনে অংশগ্রহণ ও মানসিক ক্ষমতার প্রয়োগ করার দক্ষতা থাকলে মানুষ মানবসম্পদরূপে বিবেচিত হয়।
শিক্ষার প্রসার, কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা, খাদ্য সমস্যার সমাধান, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, চিকিৎসার সুব্যবস্থা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন, মুদ্রাস্ফীতি রোধ, উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি, শোষণ প্রতিরোধ, বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা গ্রহণ, দারিদ্র্য বিমোচন, উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ, পরিবেশ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, শিশুশ্রম বন্ধ, সুশাসন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের পথ সুগম করতে হয়। হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০০১ এ বলা হয়েছে, It is about creating an environment in which people can develop their full potential and lead productive, creative lives in accord their needs and interest.
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ৭০% দক্ষতা আসে কাজের অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে। ২০% মিথস্ক্রিয়া (ইন্টারঅ্যাকশন) ও ১০% আসে প্রশিক্ষণ থেকে। যেকোন প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল সাপোর্ট জোরদার করা প্রয়োজন। শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বয়স, শিক্ষা, জেন্ডার, সামাজিক শ্রেণী ইত্যাদি বিবেচনায় দক্ষতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৬৫ ভাগ তরুণ। মানবসম্পদের গুণগত উন্নয়নের মাধ্যমে এ তরুণদের শিক্ষিত করে, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে, দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কাজে লাগানো জরুরি। মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো জনসম্পদের এমন এক গুণগত পরিবর্তন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তারা উৎপাদনক্ষম ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে বলিষ্ঠ অবদান রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)) মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে ব্যক্তিকে কর্মে নিযুক্ত করার সম্ভাবনা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো, কোনো রাষ্ট্রের মানুষের সামগ্রিক বিকাশ প্রক্রিয়ার একটি অংশ, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সমগ্র জনসংখ্যার কর্মে নিযুক্তির সম্ভাবনা বাড়ানো যায় এবং তার মাধ্যমে সামাজিক অসাম্য দূর করা যায়। সামাজিক অসাম্য বিষয়টি অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে প্রধানত জড়িত হলেও এক্ষেত্রে বলার কথা এই যে, মানব সম্পদ উন্নত হলে সমাজে সকল মানুষের ন্যূনতম কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। ফ্রেডারিক হার্বিসন ও চার্লস এ মায়ার্স-এর মতে, “মানবসম্পদ উন্নয়ন বলতে এমন এক প্রক্রিয়াকে বুঝায় যার মাধ্যমে কোনো সমাজের সকল মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।”

মানবসম্পদ উন্নয়নের উপায়
হার্বিসন এবং মায়ার্স তাদের গবেষণায় মানবসম্পদ উন্নয়নের ৫টি উপায় উল্লেখ করেছেন। যথা- 
১. আনুষ্ঠানিক শিক্ষা: প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাঠামোর মাধ্যমিক শিক্ষা এবং কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চপর্যায়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে বোঝানো হয়েছে।
২. কর্মকালীন প্রশিক্ষণ: ধারাবাহিক বা উপানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করা।
৩. আত্মোন্নয়ন: যেমন- জ্ঞান, দক্ষতা ও সামর্থ্যরে উন্নয়ন যা ব্যক্তি তার নিজের চেষ্টায় আনুষ্ঠানিক উপায়ে অথবা দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে অনানুষ্ঠানিক উপায়ে পড়ে বা অন্যের কাছ থেকে শিখে নিজের আগ্রহ ও কৌতূহল অনুযায়ী ব্যাপক গুণমান, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করে।
৪. স্বাস্থ্য উন্নয়ন: উন্নততর চিকিৎসাব্যবস্থা এবং গণস্বাস্থ্য কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মরত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য উন্নয়ন।
৫. পুষ্টি উন্নয়ন: পুষ্টি মানুষের কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে দেয়। ফলে মানুষ অধিক সময় ধরে কাজ করতে পারে এবং তার কর্মজীবন দীর্ঘ হয়।

মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কী এবং এর গুরুত্ব
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আধুনিক বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে মানবসম্পদ অন্যতম। দক্ষতা ও ফলপ্রসূতার সাথে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে দক্ষকর্মী সংগ্রহ ও নিয়োগ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বলে। Gray Dessler-এর মতে, “মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণ এবং তাদের শ্রম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং ন্যায় নিষ্ঠার সাথে সম্পর্কিত।” Ricky W. Griffin-এর মতে, “মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা হলো পরস্পর সম্পূরক কতিপয় সাংগঠনিক কাজ যা কার্যকর কর্মীদল আকর্ষণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণের সাথে জড়িত। মানবসম্পদ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা মানুষের জন্যই উন্নয়ন এবং মানুষই উন্নয়ন করে। তাই অর্থ সম্পদ ও ভৌত সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও যদি মানবসম্পদের অভাব থাকে তবে সে ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন আবশ্যক। সার্বজনীন মৌলিক ব্যবস্থাপনার যে সকল অংশ রয়েছে তাদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যবহৃত অংশ হলো মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা। সাধারণ অর্থে শিল্প কারখানায় ও অফিসে কর্মরত শ্রমিক কর্মীদের ব্যবস্থাপনাকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বলে। অন্যভাবে বলা যায় ব্যবস্থাপনার যে অংশ দ্বারা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত মানবীয় উপাদান সংক্রান্ত ও প্রশাসন পরিচালনা করা হয় তাই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নামে পরিচিত।
পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য সাংগঠনিক উন্নয়ন সাধন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান বিজ্ঞানের যুগে নিত্য নতুন প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত হচ্ছে। এ সমস্ত নতুন প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে কাজেই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য সাংগঠনিক উন্নয়ন অপরিহার্য। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকার জন্য সাংগঠনিক উন্নয়ন খবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু গবেষণা বিশ্লেষণ, উন্নত প্রযুক্তি, উত্তম পদ্ধতি ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। কিন্তু এ সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন হয় উন্নত সাংগঠনিক কাঠামো। কাঠামোগত উন্নয়ন সাংগঠনিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলেরও কম এই ক্ষুদ্রায়তনের দেশটির প্রাক্কলিত (২০১৮) জনসংখ্যা ১৮ কোটির বেশি অর্থাৎ প্রতি বর্গমাইলে জনবসতি ২৮৮৯ জন (প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১১১৫ জন)। বর্তমানে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের আয়তন ও জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জনশক্তির সার্থক ব্যবহারের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছে। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা তার বিশেষায়িত জ্ঞান, কর্ম নৈপুণ্য ও বিভাগীয় রীতিনীতির সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে মানবীয় উপাদানের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেবার মানোন্নয়নের চেষ্টা চালায়। আর এ জন্যই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা সকল নির্বাহীদের প্রধান কাজ। প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। নিম্নে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পয়েন্ট তুলে ধরা হলো- ১) মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার, ২) সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, ৩) কর্মীদের কর্ম দক্ষতা উন্নয়ন, ৪) ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, ৫) উপযুক্ত কর্মী সংগ্রহ, ৬) সমন্বয় করা, ৭) কার্য সন্তুষ্টি, ৮) শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক উন্নয়ন, ৯) উচ্চ মনোবল সৃষ্টি, ১০) কল্যাণমূলক কার্যক্রম, ১১) প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, ১২) পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানো, ১৩) প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা, ১৪) প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়ন, ১৫) দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচি, ১৬) প্রযুক্তি ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন।

শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে পরিণত হতে করণীয়
আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ও মানবসভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একটি জাতি বা সভ্যতা কেমন উন্নত হবে, তা নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠার উপর। সুতরাং একটি দেশের আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও আদর্শিক শিক্ষাব্যবস্থা, সে দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারে। শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সে জ্ঞানকে বাস্তব জগতের সঙ্গে সংযোগ করাও একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। শিক্ষার্থীরা তথ্য জানবে এবং সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে দেশের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। এ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মধ্যে এমন কিছু জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন, শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীর শিখন দক্ষতা ও ক্ষমতা বিংশ শতাব্দীর চেয়ে ভিন্ন। এ ধরনের শিক্ষায় শিক্ষার্থীকে চিন্তা করা হয় একজন effective leader হিসেবে। এখানে শিক্ষার্থীরা এমন কিছু দক্ষতা অর্জন করবে, যা তাকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। এ শতকের শিক্ষার্থীর মধ্যে বিশ্লেষণী চিন্তন, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ, সহযোগিতা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য গুরুত্বারোপ করা হয়। আধুনিক শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষকে একটি ‘কার্যক্ষম পরিবেশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যে পরিবেশে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতাসমূহ অর্জন করবে এবং শিক্ষক এ শিখন কার্যক্রমে ফ্যাসিলিটেটর-এর ভূমিকা পালন করবে। এজন্য শিক্ষকদেরও নতুন পাঠদান পদ্ধতি ও কলাকৌশল সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা দরকার। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দান করবে। এ কারণে তাদের মধ্যে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা অর্জনের কোন বিকল্প নেই। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায় যে, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রধানত পাঁচ ধরনের প্রয়োজনীয় দক্ষতায় পারদর্শী করে তুলতে পারে। এগুলো হলো: শিখন দক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দক্ষতা এবং জীবনদক্ষতা। টনি ওয়াগনার (২০০৮) তার ‘দ্য গ্লোবাল অ্যাচিভমেন্ট গ্যাপ’ বইয়ে উল্লেখ করেন, শিক্ষার্থীদের আধুনিক জীবন, কর্ম ও নাগরিক জীবনে টিকে থাকতে হলে সাত ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন। এ দক্ষতাসমূহ হলো: (১) বিশ্লেষণী চিন্তন এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, (২) সহযোগিতা এবং নেতৃত্ব দানের দক্ষতা, (৩) ক্ষিপ্রতা ও অভিযোজনের দক্ষতা, (৪) উদ্যম এবং উদ্যোক্তা দক্ষতা, (৫) ফলপ্রসূ লিখিত ও মৌখিক যোগাযোগ দক্ষতা, (৬) তথ্য প্রাপ্তি এবং তথ্য বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং (৭) কৌতূহল ও কল্পনা দক্ষতা।
আধুনিক শিক্ষার্থীদের দক্ষতাসমূহ একমুখী নয়, বরং বহুমুখী। শিক্ষার্থীদের আধুনিক কাজ, নাগরিকতা এবং জীবনের জন্য প্রস্তুত করা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞান, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে গতানুগতিক শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক আনন্দময় শিক্ষাপদ্ধতি নিশ্চিত করা, শিক্ষাব্যবস্থায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো, শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের বাইরে প্রকৃতির সাহচর্যে নিয়ে আসা এবং শিক্ষার্থীর শিখন, চিন্তন, যোগাযোগসহ আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এভাবে শিক্ষার্থীর চাহিদাকে আমাদের সবসময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, শিক্ষাব্যবস্থার সকল আয়োজন শিক্ষার্থীর জন্য। সুতরাং শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীর জন্য প্রস্তুত করে তোলাই হল আধুনিক শিক্ষার মূল করণীয়। আর এটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে রূপান্তর করা যাবে না, তারা তখন জাতির জন্য সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজন যথাযথ জ্ঞানার্জন
আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানবসম্পদ উন্নয়নে জ্ঞানার্জন ও দক্ষতার বিকল্প নেই। রাসূল (সা) যখন রিসালাত লাভ করলেন তখন তাঁর উপর প্রথম যে ওহি নাযিল হলো তাও জ্ঞানার্জন বিষয়ক। প্রথম ওহি ছিলো- পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। মুমিন হওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জনকে ইসলাম প্রথম শর্ত হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ তাআলা প্রথম মানুষ আদম (আ)কে সৃষ্টির পর সবার আগে বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞান দান করেছেন এবং এ জ্ঞানের পরীক্ষাতেই আদম (আ)-এর মাধ্যমে ফেরেশতাদের উপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। কুরআন মজিদে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আল্লাহ আদমকে প্রতিটি বিষয়ের নাম শেখালেন। এরপর তা ফেরেশতাদের সামনে পেশ করলেন এবং বললেন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক, তাহলে আমাদের এগুলোর নামসমূহ জানাও।” ফেরেশতাগণ বললেন, “আপনি মহাপবিত্র। আপনি আমাদের যা শেখান, তা ছাড়া আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয় আপনি মহাজ্ঞানী, মহা প্রজ্ঞাময়।” আল্লাহ বললেন, “হে আদম! তুমি যাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দাও।” এরপর যখন আদম তাদেরকে বিষয়গুলোর নাম জানিয়ে দিলেন, আল্লাহ তাআলা বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় আমি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য সম্পর্কে জানি? আর আমি খুব ভালোভাবেই জানি যা তোমরা প্রকাশ কর এবং যা গোপন রাখ। যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, তোমরা আদমকে সিজদা কর, তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল। ইবলিস অবাধ্য হলো ও অহঙ্কার করল এবং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
জ্ঞানকে মর্যাদা ও কল্যাণের বাহন বর্ণনা করে আল কুরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন।” অন্যত্র বলা হয়েছে, “তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমাত দান করেন। আর যাকে হিকমাত দেয়া হয় তাকে বিপুল কল্যাণ দান করা হয়। আর জ্ঞানীরা ছাড়া কেউ তো উপদেশ গ্রহণ করে না।”
আল্লাহ তাআলা সাধারণভাবে জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণারও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অতএব হে চক্ষুষ্মান মানুষেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। জ্ঞানের প্রতি আল্লাহ তাআলার এমন গুরুত্বারোপের পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সা) জ্ঞান অর্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রতিজন মুসলিমের উপর ফরজ।” জ্ঞানীকে তিনি নবী-রাসূলগণের উত্তরসূরি আখ্যায়িত করে বলেছেন, “আলিমগণ নবীগণের উত্তরাধিকারী। আর নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে দিনার বা দিরহাম রেখে যাননি। তারা উত্তরাধিকার রেখে গেছেন শুধু জ্ঞান। তাই যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেছে সে অর্জন করেছে উত্তরাধিকারের পুরো অংশ।” জ্ঞানার্জনের কাজকে তিনি আল্লাহর পথে জিহাদের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণে বের হয়েছে, সে আল্লাহর পথে রয়েছে, যতক্ষণ না সে প্রত্যাবর্তন করে।” এভাবে ইসলাম জ্ঞানার্জন ও গবেষণার কাজকে বাধ্যতামূলক রেখে মানবসম্পদ উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এতে এমন বিধান রাখা হয় যে, একজন মানুষ মুসলিম হলে তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হয়। শিক্ষিত হওয়া ছাড়া মুসলিম হওয়ার বিষয়টি বিধিগতভাবে অসম্ভব বলে গণ্য হয়।
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব ইসলাম ধর্মে অপরিসীম। ইসলাম জ্ঞানবানদের দিয়েছে ভিন্ন সম্মান ও মর্যাদা। ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে, কুরআন-হাদিসের বাইরে ইসলামী পণ্ডিতরাও সর্বদা জ্ঞানার্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। এখানে জ্ঞানার্জন সম্পর্কে তেমনই কিছু বিদ্বানদের উক্তি উল্লেখ করা হলো-
হযরত আলী (রা) বলেন, “জ্ঞান অর্থ-সম্পদের চেয়ে উত্তম। কেননা জ্ঞান তোমাকে পাহারা দেয়, কিন্তু অর্থকে উল্টো পাহারা দিতে হয়। জ্ঞান হলো শাসক, আর অর্থ হলো শাসিত। অর্থ ব্যয় করলে নিঃশেষ হয়ে যায় কিন্তু জ্ঞান বিতরণ করলে আরো বৃদ্ধি পায়।” (ইমাম গাজ্জালি, এহইয়াউল উলুম : ১/১৭-১৮) হযরত মোয়াজ বিন জাবাল (রা) বলেন, “তোমরা জ্ঞানার্জন কর। কেননা আল্লাহর উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জনের অর্থ তাকে ভয় করা। জ্ঞানের আকাক্সক্ষা করা ইবাদত বিশেষ। জ্ঞান চর্চা করা হলো তাসবিহ পাঠতুল্য। জ্ঞানের অনুসন্ধান করা জেহাদের আওতাভুক্ত। অজ্ঞ ব্যক্তিকে জ্ঞান দেয়া সদকা। উপযুক্ত ক্ষেত্রে তা ব্যয় করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের কারণ। আর তা হালাল-হারাম জানার মানদণ্ড, একাকিত্বের বন্ধু, নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, সুখ-দুঃখের সাথী, চরিত্রের সৌন্দর্য, অপরিচিতের সাথে পরিচিত হওয়ার মাধ্যম। আল্লাহ জ্ঞানের দ্বারা মানুষকে এমন মর্যাদাবান করেন যা স্থায়ীভাবে তাকে অনুসরণীয় করে রাখে।” (আখলাকুল উলামা: ৩৪-৩৫) হযরত আবু দারদা (রা) বলেন, “জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে উপার্জিত হয় যেমন ধৈর্য ধৈর্যধারণের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যে ব্যক্তি কল্যাণের খোঁজে ব্যতিব্যস্ত হয় সে কল্যাণ লাভ করে। যে অকল্যাণ থেকে বাঁচার চেষ্টা করে সে অকল্যাণ থেকে রক্ষা পায়।” (কিতাবুল ইলম: ২৮) হযরত হাসান বসরি (রহ) বলেন, “অজ্ঞ আমলকারী পথহারা পথিকের ন্যায়। সে কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি করে। অতএব তুমি জ্ঞানার্জন কর এমনভাবে যাতে তা ইবাদতকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, আবার ইবাদত কর এমনভাবে যেন তা জ্ঞানার্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। একদল লোক এমনভাবে ইবাদতে ডুবে থাকে যে তারা জ্ঞানার্জনের সুযোগ পায় না, অথচ তারা উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর তরবারি চালিয়ে দেয়। যদি জ্ঞান থাকত তাহলে তারা এরূপ কর্মে লিপ্ত হতে পারত না।” (তারিখে ইসলাম : ১৫৩)
মোটকথা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতার মাধ্যমে আধুনিক এ বিশ্বে কোনো দেশই সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে না। তাই আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবসম্পদ উন্নয়ন হলো দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার। আমাদের দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে যুগোপযোগী ও কর্মদক্ষ করে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর মানবসম্পদের দক্ষ ব্যবহার, যোগ্য ব্যবহার এবং যথোপযুক্ত ব্যবহারের জন্য আধুনিক শিক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সময়োপযোগী শিক্ষার কোনোই বিকল্প নেই।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply