আধুনিক যুগে ইসলামী রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশক মাওলানা মওদূদী (রহ)

রিয়াদ হোসাইন রায়হান |

সাইয়েদ আবু আ’লা মওদূদী রহ:

হযরত মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক নবুওয়তের দরজাকে বন্ধ করে দিয়েছেন এ কথা সত্য কিন্তু এ কথা অসত্য নয় যে, প্রত্যেক যুগেই পথহারা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য এক বা একাধিক মনীষীর আবির্ভাব ঘটবে এ ধরাতে। তারা নবী কিংবা রাসূল হিসেবে আবির্ভূত হবেন না কিংবা নতুন কোনো মত বা মতাদর্শও প্রচার করবেন না। বরং তাঁরা বিশ্বনবী (সা)-এর নির্দেশিত পথে এবং তাঁরই আদর্শের দিকে আহ্বান করবেন মানবজাতিকে। সাইয়েদ আবু আ’লা মওদূদী রহ: ছিলেন তাঁদেরই একজন।
মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেখানে অন্ধকার সেখানে আলোর মশাল নিয়ে উপস্থিত হন ¯্রষ্টার দূত। সাইয়্যেদ আবুল আ’লা মওদূদী (১৯০৩-১৯৭৯) আমাদের কালের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, বিস্ময়কর এক প্রতিভার নাম। তাঁর কলমে আল্লাহ পাক দিয়েছিলেন অসাধারণ ধার। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের আন্দোলন জারি করেন মাওলানা মওদূদী। দ্বীনকে একটি বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পথনির্দেশক। বর্তমান বিশ্বের যেখানে দ্বীনি আদর্শ ও ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের কাজ চলছে সেখানেই মাওলানা মওদূদীর চিন্তা ও কর্মের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। দার্শনিকের এই উক্তিটি যেন কেবলমাত্র মওদূদীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। The strongest man in the world is the man who stands most alone. সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতন, শোষণ-বঞ্চনা, অনৈতিকতা-অশ্লীলতার অবসান ও মানুষের ওপর থেকে মানুষের প্রভুত্বকে উৎখাত করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আলোকে সাম্য, ভ্রাতৃত্য, তাকওয়া ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র বিনির্মাণের বিপ্লবী আহবান নিয়েই মাওলানা মওদূূদীর কর্মজীবনের শুরু। আধুনিক যুগে ইসলামী রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশক হিসেবে মাওলানা মওদূদীর ভূমিকা ছিল অদ্বিতীয়।
মানবিক সম্পর্ক দিন দিন জটিল থেকে আরো জটিল হচ্ছে। মানবজীবনের খ-িত রূপকে দেখছে গ্লানি ও নৈরাশ্যের গোলকধাঁধায়, দেখছে দুর্বোধ্য বিমূর্ত আয়নায় চতুর প্রতিফলন হিসেবে। যতেœ গড়া চাকচিক্য দিয়ে উদ্ভট উপাদানের অস্তিত্বকে ভুলে থাকতে পারছে না আধুনিক মানুষ। গোটা জীবনই অ্যাবসোর্ড হয়ে পড়েছে। নিজের অস্তিত্ব আজ সংশয়ে বিক্ষত। কোন বিশ্বাসের ভিত্তিতেই যেন প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।
পাশ্চাত্য সা¤্রাজ্যবাদ আজকের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে করে ফেলছে বিষাক্ত। বিশ্বব্যবস্থা আজ পরিবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছে। মহাশক্তিধর জড়বাদী সভ্যতা ও সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি সমূহের বিপর্যয় সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর মনীষীগণ তাঁদের মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ অনেক আগেই করে দিয়েছেন। আজ থেকে অনেক দিন আগেই বিশ্বনন্দিত ইসলামী চিন্তানায়ক মাওলানা মওদূদী বলে গেছেন, ‘সমস্ত আলামত এ কথা ঘোষণা করছে যে, মানুষের ইতিহাস দ্রুত যে দিকে অগ্রসর হচ্ছে, মানুষের গড়া সমস্ত মতবাদের পরীক্ষাও হয়ে গেছে এবং তা ভীষণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত মানুষের ইসলামের দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।’
ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শিক চিন্তামূলক রাষ্ট্র। তা প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী আকিদা ও বিশ্বাসের ওপর, ইসলামী আইন কানুন ও বিধি বিধানের ওপর। এ জন্য ইসলামী রাষ্ট্র কোন ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে সীমিত রাষ্ট্রব্যবস্থা নয়। নয় কোনো বিশেষ জাতি, শ্রেণী, সম্প্রদায় যা গোত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। প্রকৃত পক্ষে তা হলো একটি মতাদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র এবং তার সীমা আওতা ও প্রভাব বিস্তীর্ণ ততখানি, যতখানি সম্প্রসারিত এ আদর্শের প্রভাব।
ইসলামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাই, যা প্রমাণিত ও স্বতঃপ্রকাশিত হয় তার প্রকৃতি থেকে। তা যতদিন একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন তা থাকবে ইসলামী আদর্শ ও বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই অতি স্বাভাবিকভাবেই সে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে তাই যা ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ কারণে নাগরিকদের জন্য শুধু শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের জীবন সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধ পর্যন্তই তার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও দায়িত্ব সীমিত হয়ে যেতে পারে না। বরং রাষ্ট্রের সর্বদিকে সর্বব্যাপারে ও সর্বক্ষেত্রেই ইসলামী আইন বিধান পূর্ণমাত্রায় কার্যকরী করা, জারি করা এবং মানবসমাজের সর্বস্তরে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দেয়ায় তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। সূরা আল হজের ৪১ নাম্বার আয়াতে ইসলামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রকৃত রূপে ফুটে ওঠে।
‘তারা সেই সব লোক, যাদের আমি যদি দুনিয়ার কোন অংশে ক্ষমতাসীন করে দিই তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থা প্রচলন করবে, লোকদেরকে যাবতীয় মারুফ কাজে বাধ্য করবে ও শরীয়তবিরোধী কাজ থেকে বিরত রাখবে। বস্তুত সব বিষয়ে চূড়ান্ত ক্ষমতা আল্লাহরই জন্য।’
তাই মাওলানা মওদূদীর মতে ইসলামী রাষ্ট্র হতে পারে অন্যান্য সর্বপ্রকার রাষ্ট্রের তুলনায় অধিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র।
আধুনিক যুগ নৈতিক অবক্ষয়ের যুগ। বীভৎস যৌনাচার, উচ্ছৃঙ্খল ভোগবাদ, সীমাহীন মারণাস্ত্র তৈরি, মিথ্যা প্রচারণা, কুরুচিপূর্ণ সাংস্কৃতিক চর্চা, মারাত্মক সংশয়বাদ এ সভ্যতার গায়ে এক একটি মারণব্যাধি টিউমার, সিফিলস গনোরিয়া ও এইডস আক্রান্ত এ পাশ্চাত্য সভ্যতার মৃত্যুর যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। সভ্যতা বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এর জীবনীশক্তি আর নেই।
তবে একটি নতুন সভ্যতার আগমন না হলে এ জীর্ণ সভ্যতায় মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হবে খুবই কষ্টকর। আধুনিক সভ্যতার রাষ্ট্রের স্বরূপ হবে অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র। বর্ণনা করতে গিয়ে মাওলানা মওদূদী বলেন, ইসলামী রাষ্ট্র হবে সম্পূর্ণ আদর্শভিত্তিক একটি রাষ্ট্র। সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব হতে এ রাষ্ট্র হবে সম্পূর্ণ মুক্ত। একটি রাষ্ট্রের বাস্তবায়নের জন্য কিছুটা প্রাথমিক আয়োজন প্রস্তুতি, সামাজিক উদ্দীপনা এবং কিছুটা প্রাথমিক ঝোঁক প্রবণতা এমনভাবে প্রভাব থাকা চাই যার নিবিড় সমন্বয়ে ও ঘটনা প্রবাহের অনিবার্য চাপে স্বাভাবিক পন্থায় একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্রের জন্ম ও গঠনের গোড়ায় যেসব অবস্থা বর্তমান থাকে, তার প্রকৃতি অনুসারেই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও স্বরূপ। রাষ্ট্রের স্বরূপ নির্ধারণে ব্যক্তি ও সমাজের ইচ্ছা ও কর্মশক্তির গুরুত্ব অত্যধিক। যে ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা করতে হবে প্রথম থেকেই তার স্বভাব ও প্রকৃতির অনুরূপ উপাদান ও কার্যকারণ সংগ্রহ করা এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার মতো কর্মপন্থা অবলম্বন করা অপরিহার্য। সে জন্য যে ধরনের আন্দোলন, যেরকম ব্যক্তিগত ও সামাজিক চরিত্র এবং সে ধরনের নেতৃত্ব ও সামাজিক কার্যকলাপ অপরিহার্য।
এই সমস্ত কার্যকারণ ও উপাদানগুলো সংগ্রহীত ও পরস্পর মিলিত হয়ে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অবিশ্রান্তভাবে চেষ্টা সাধনা করার পর তার শক্তি যখন অত্যন্ত মজবুত হয় এবং বিপরীতধর্মী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিরোধ করার মতো শক্তি অর্জিত হয় তারপরই অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মে সেই ইপ্সিত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ন্যায়শাস্ত্রের সূত্রগুলো পর্যায়ক্রমে সাজালে যেমন তার সিদ্ধান্ত ভিন্নরূপ হতে পারে না, বিশেষ গুণসংবলিত রাসায়নিক উপাদানের সংমিশ্রণে যেমন সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী মিশ্র পদার্থ সৃষ্টি হতে পারে না, লেবুর বীজ হতে উদ্ভূত বৃক্ষ যেমন আম ফলাতে পারে না, অনুরূপভাবে বিশেষ ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার অনুকূল শর্তসমূহ বর্তমান থাকলে এবং তার পারস্পরিক মিলিত কার্যক্রম রাষ্ট্র গঠনের অনুকূল হলে তা ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী রাষ্ট্র জন্ম দিতে পারে না। আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামই একমাত্র পন্থা যা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে ওঠে খাঁটি আদর্শবাদের ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। তাই মাওলানা মওদূদী ইসলামের নিজস্ব আদর্শ অনুসারে সমগ্র বিশ্বমানবকে একটি উদার অজাতীয়তাবাদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।
মাওলানা মওদূদীর উপরোক্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের শরিক হয়েছিল, একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় উপায় উপাদান, কার্যকারণ এবং সংগঠন, আন্দোলন ও নেতৃত্বের সমন্বয় না ঘটায় পাকিস্তান নামক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও ইসলামের নামে অর্জিত ঐ রাষ্ট্রটি ইসলামী বিপ্লবের সিঁড়ি অতিক্রম করে ইসলামী রাষ্ট্রে পরিগণিত হতে পারেনি।
মাওলানা মওদূদীর মতে ইসলামী রাষ্ট্র কোনো অলৌকিক ঘটনায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে জন্য গোড়া থেকেই ইসলামের বিশিষ্ট জীবনদর্শন ও জীবনপদ্ধতি এবং ইসলামী চরিত্র ও স্বভাব প্রকৃতির বিশেষ মাপকাঠি অনুযায়ী একটি বিরাট ও ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টি অপরিহার্য। কুরআনে আছে, হে ঈমানদারগণ তোমরা পরিপূর্ণ রূপেই ইসলামের মধ্যে দাখিল হও। (সূরা আল বাকারা : ২০৮)
ইসলামী আন্দোলনের নেতা, পুরোধা ও কর্মী হবেন এমন লোক যারা মানবতার এই বিশিষ্ট আদর্শে আত্ম গঠন করতে প্রস্তুত থাকবেন। ইসলামী আদর্শ নাগরিকদের জীবন গঠন করবে এবং মুসলিম বৈজ্ঞানিক, মুসলিম ঐতিহাসিক, মুসলিম অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, মুসলিম রাষ্ট্রনায়ক- এক কথায় জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় খাঁটি ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে চিন্তা ও কাজ করতে লোক গড়ে তুলবে। মাওলানা মওদূদীর মতে, ইসলামী রাষ্ট্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে যখন কুরআনের আদর্শ ও মতবাদ এবং নবী (সা)-এর চরিত্র ও কার্যকলাপের বুনিয়াদে গণ-আন্দোলন জেগে উঠবে আর সমাজজীবনের সমগ্র মানসিক, নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বুনিয়াদকে একটি প্রবলতর সংগ্রামের সাহায্যে একেবারে আমূল পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব হবে। বর্তমান মুসলিম সমাজের মর্মান্তিক অধঃগতির কারণে মাওলানা মওদূদী বলেন, চরিত্রের দিক দিয়ে যত প্রকারের মানুষ দুনিয়ার অমুসলিম জাতিগুলোর মধ্যে পাওয়া যায় ঠিক তত প্রকারের মানুষ এই মুসলিম নামধারী জাতির মধ্যেও বিদ্যমান। আমাদের বর্তমান জাতীয় চরিত্রের এই চিত্র সামনে রেখে অনায়াসে বলা যায় যে, এ ধরনের লক্ষ লোকের ভিড় অপেক্ষা ১০ জন মাত্র বিপ্লবী কর্মী ইসলামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, অধিকতর কৃতিত্ব ও সাফল্যের সাথে পরিচালিত করতে পারে। তিনি অত্যন্ত চমৎকার যুক্তিসহ প্রমাণ করেছেন যে, সুবিধাবাদী এবং স্বার্থ শিকারি নেতৃত্ব দ্বারা ইসলামী বিপ্লব সৃষ্টি করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা একেবারেই অসম্ভব।
মাওলানা মওদূদী ছিলেন একজন সংস্কারক, রিফর্মার। তিনি উপমহাদেশের ইসলামী বিপ্লবের পুরোধা ছিলেন। ইসলামী বিপ্লবই কেবলমাত্র একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যম-িত রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দেয়। যাকে ইসলামী রাষ্ট্র বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর মাওলানা মওদূদীই ছিলেন আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্রের রূপকার। ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের জন্য জামায়াতে ইসলামী মাওলানা মওদূদীর অনবদ্য সৃষ্টি। তিনি আধুনিক দুনিয়ার সামনে এক অভিনব ও অনন্য পদ্ধতি পেশ করেছেন। ফলে এমন এক আন্দোলন গড়ে উঠেছে যা বিংশ শতাব্দীর ভ্রান্ত মতবাদের ঢালস্বরূপ।
মোট কথা আধুনিক যুগে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশক হিসেবে মাওলানা মওদূদীর চিন্তাধারা এমন এক উজ্জ্বল ও শক্তিশালী চিন্তাধারা যা ইসলামী শিক্ষারই প্রতিবিম্ব এবং ইসলামী দুশমনদের গতিরোধ করার যোগ্যতাসম্পন্ন।
পুঁজিবাদতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কিংবা সম্পদের সমবণ্টনের পরিবর্তে ইনসাফপূর্ণ বণ্টনই হলো ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি। ইনসাফপূর্ণ ও ন্যায়ানুগ সহযোগিতা সৃষ্টি করা, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল, পরস্পরের সাহায্যকারী ও সহযোগী বানানো এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করাই হচ্ছে ইসলামী অর্থব্যবস্থা।
বিকাশমান ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনেই ইসলামী অর্থব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় ইসলামী রাষ্ট্র বিলুপ্তির সাথে সাথে ইসলামী অর্থব্যবস্থার চর্চাও লোপ পায়। ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো : ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণ, নৈতিক বিকাশ ও অগ্রগতির মৌলিক গুরুত্ব দান করা, মানবিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা, নৈরাজ্য, দলাদলি ও সংঘর্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা, সামাজিক সংস্কার সাধন করা যেমন, রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে জাকাত, উশর, ফিতর ইত্যাদি আদায় করে গরিব দুস্থদের সাহায্য প্রদান।
মানুষের শারীরিক (বস্তুগত) অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য যেসব জিনিসের প্রয়োজন তার উৎপাদন, বিনিময়, ব্যয় ও উদ্বৃত্তের ব্যবহার সম্পর্কে সমাজে সুষ্ঠু নিয়মনীতি না থাকলে মানবজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। তাই আল কুরআনে অর্থনৈতিক মূল্যবোধকে নৈতিক মূল্যবোধ থেকে পৃথক রাখা হয়নি। বরং উভয় নীতিকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত করে দেয়া হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতি সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় ধ্যানধারণা অর্জন করার জন্য, ইসলামী অর্থনীতি সম্পর্কে সার্বিক জ্ঞান জনসাধারণের লাভের জন্য মাওলানা মওদূদী বিরাট ভূমিকা পালন করেন। কুরআন-হাদীসের আলোকে তিনি লিখেন- ইসলাম ও আধুনিক অর্থনৈতিক মতবাদ, আল-কুরআনের অর্থনৈতিক নীতিমালা, সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং, ইসলামী অর্থনীতি, জাকাতের হাকিকত ও অর্থনৈতিক সমস্যার ইসলামী সমাধান।
এই বইগুলোতে অর্থনৈতিক সমস্যাকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাধান করা হয়নি। বরং সেই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার ইমারত কাঠামোর মধ্যে রেখে সমাধান করা হয়েছে। ইসলাম যার ভিত স্থাপন করেছে পরিপূর্ণরূপে খোদার দাসত্বভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা, নৈতিক দর্শন ও বিশ্বাসের ওপর। এই বইগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করলেই কুরআনের আলোকে ইসলামী অর্থব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায়। ইসলামে কোথাও যে, পুঁজিবাদতন্ত্র, সমাজতন্ত্র কিংবা সম্পদের সমবণ্টনের স্থান নেই বরং রয়েছে ইনসাফপূর্ণ বণ্টন তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কুরআন এমন এক অপরিহার্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা পেশ করে, যা সার্বিক পর্যায় ব্যক্তির মালিকাধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তা বল্গাহীনভাবে নয়। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির অর্থসম্পদ সমাজের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, অভাবী, হতভাগা মানুষ এবং সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজের অধিকারও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারাই যারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করে না। বরং তারা উভয়ই চরম পন্থার মধ্যবর্তীতে অবস্থান করে। (আল ফুরকান : ৬৭)
বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে মহানবী (সা) এর নির্দেশিত পথে জাকাত, উশর আদায় ও বণ্টনের মাধ্যমে ইসলামী অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশক হিসেবে মাওলানা মওদূদীর ভূমিকা অদ্বিতীয়। গভীর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার মধ্যেই রয়েছে সাফল্যের দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা। বস্তুত গবেষণা ও উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় ইসলামী অর্থনীতিকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাইলে মুসলিম জনশক্তিকে ব্যাপক অধ্যয়ন ও কঠোর অনুশীলনের কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে অব্যাহতভাবে। আর এই জন্য প্রয়োজন ইসলামী অর্থনীতির নানাবিধ দিক নিয়ে আলোচনা করা। আর তা আলোচিত হয়েছে মাওলানা মওদূদীর লেখনী বইগুলোতে। মাওলানা মওদূদীর এই অবদানকে চিরদিন মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।
ইসলামী জীবনব্যবস্থার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং তা প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম ও সমসাময়িক ইসলাম বিরোধী ফেতনার মোকাবেলার কাজেই মাওলানা মওদূদী তার সকল শক্তি নিয়োজিত করেন। প্রায় অর্ধ-শতাব্দী কাল পর্যন্ত তিনি তার জীবনের প্রতিটি রাত ও দিন এবং প্রতিটি মুহূর্ত এ মিশন সম্পন্ন করার কাজে ব্যয় করেন, তা ছাড়া তিনি এক অমূল্য সাহিত্যভা-ার সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে এলম ও আমলের সম্পদে ভূষিত করেছেন। এর বদৌলতে তিনি শুধুমাত্র তাঁর নিজের পথকেই সুগম করেননি বরং লক্ষ লক্ষ মানুষকে কল্যাণের দিকে ডেকেছেন এবং এ পথে চালাতে কৃতকার্য হয়েছেন। অসংখ্য মানুষের মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসা, এতো বিরাট কাজ এবং আল্লাহর কাছে এর প্রতিদানও বিরাট। হাদীসে কুদসীর এ কথাগুলো মওদূদীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ‘নেকির দাওয়াত যে দেয় তার জন্য ততো প্রতিদান যা নেক কাজকারীদের জন্য রয়েছে।’
মাওলানা মওদূদীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। ব্যক্তির মৃত্যু হলেও উদ্দেশ্যের মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর পর এ দুনিয়ায় তাঁর এক অর্থবহুল জীবন শুরু হয়েছে। এমন এক জীবন যেখানে দুনিয়াবাসী তাকে উপলব্ধি করবে। আধুনিক যুগে ইসলামী রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশক হিসেবে মাওলানা মওদূদী যে ভূমিকা পালন করেছেন তা স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে আধুনিক যুগের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের গভীরে। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন তথা ইসলামী রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের দিকনির্দেশক হিসেবে মাওলানা মওদূদীর নাম চিরভাস্বর মহিমায় প্রজ্বলিত থাকবে অনাগত দিনগুলোতে।

SHARE

Leave a Reply