আন্দোলনের পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের প্রত্যয়

মনির আহমেদ

cs…আগুনসম উত্তাপ বালু। তার ওপর তাঁকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি ছিলেন মৃতপ্রায়। কিন্তু মুখে ছিল সাহসের উচ্চারণ- আহাদ, আহাদ। তাঁর এই উচ্চারণে আবু জেহেল প্রচন্ড রেগে যায়। বর্শা নিক্ষেপ করে তাঁর লজ্জাস্থানে। শহীদ হন তিনি। হযরত সুমাইয়া (রা), তাঁকে আমরা চিনি ইসলামের প্রথম শহীদ হিসেবে।

হযরত সুমাইয়ার (রা) জীবনের শেষ সময়ের কথা চিন্তা করলে যে কারো হৃদয় কেঁপে ওঠে। কী ধরনের নির্যাতন সহ্য করেছিলেন তিনি! তবুও তিনি ইসলামের পথ থেকে এতটুকু সরে যাননি। ইসলামের পথে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে শহীদি মৃত্যুকে আপন করে নেয়ার এই ধারাবাহিকতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে। এখনো চলছে, হয়তো ভবিষ্যতেও চলবে। এই ধারাবাহিকতায়ই আমরা পেয়েছি ১১ মার্চ। আজ যখন আমরা শহীদ সাব্বির, হামিদদের ওপার যাত্রার এ দিনকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করি, তখন হৃদয়ে ভেসে ওঠে দূরের বা কাছের অতীতের আরো অসংখ্য শাহাদাতের ঘটনা। আমরা অনুপ্রাণিত হই, আবার প্রিয় ভাইয়ের পবিত্র মুখ, জীবনস্মৃতি আমাদের চোখে পানি আনে।
প্রিয় নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার কথা আমাদের মনে পড়ে। অকুতোভয় এই মানুষ নিজেই ফাঁসির রশি গলায় জড়িয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘকায় ছিলেন না। কিন্তু রাব্বুল আলামিন যে তাঁকে কতটা উচ্চতায় স্থান দিয়েছেন, তা আমরা ঠিকই বুঝতে পারি।
মাওলানা মওদূদীকে (রহ) যখন ফাঁসি দেয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন তিনি যে কথা বলেছিলেন, আজ তা ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মুখে মুখে ফেরে। ‘মৃত্যুর ফয়সালা আসমান থেকে হয়, জমিন থেকে নয়।’ এই বিশ্বাস শতভাগ আছে বলেই আজো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা কোনো দ্বিধা ছাড়া মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।
মুতার যুদ্ধে যেখানে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার, সেখানে শত্রু পক্ষের ছিল লাখো সেনা সমাবেশ। রাসূল (সা) সে সময় যায়িদ বিন হারিসা (রা)কে সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন। রাসূল (সা) বলেন, যায়িদ শহীদ হলে জাফর বিন আবু তালেব (রা) সেনাপতি হবেন। আরো বলেন, জাফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা) সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা শহীদ হলে নিজেদেরকে সেনাপতি ঠিক করে নেয়ার নির্দেশ দেন।
রাসূল (সা) এর তিনজনের নাম উল্লেখ করা অনেকের কাছে তাঁদের শাহাদাতের বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছিল। কিন্তু এই তিন সাহাবীসহ কেউই একটুও পিছু হটেননি। তিন সাহাবীই যুদ্ধের ময়দানে একে একে শহীদি পেয়ালা পান করেছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, যারা মহান রবের বাণী বুঝেছে, তাঁরা শহীদি মৃত্যুকে বড় পুরস্কার হিসেবেই মনে করেন।
স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে মেধাবী ছাত্রনেতা আবদুল মালেকের শাহাদাত প্রমাণ করে, আজ ছাত্রশিবিরের সাথে বিরুদ্ধশক্তির যে শত্রুতা তা এই সংগঠনের বর্তমান কোন অবস্থানের জন্য নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব জায়গায়ই ইসলামী আন্দোলনের পথে বাধা দেয়া হয়েছে। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা বারবার পবিত্র সব শরীরে বন্দুকের গুলি চালিয়েছে, ধারালো ছুরি চালিয়েছে।
শহীদ আবদুল মালেক তাঁর চিঠিতে, লেখায় শাহাদাতের আকাক্সক্ষার কথা বারবার জানান দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের সূর্যোদয় হবার আগেই শহীদি ধারাবাহিকতায় যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশেও ইসলামী আন্দোলনকে মজুবত একটি ভিত্তি দিয়েছে। মালেক ভাইয়ের খুনের কলুষযুক্ত তোফায়েল আহমেদরা আজো যেমন ক্ষমতায় থেকে বন্দুকের নল তাক করছে, আজো প্রিয় শহীদের উত্তরসূরিরা প্রতিরোধের প্রাচীরকে নিñিদ্র রাখতে নিজের বুকে গুলিকে ধারণ করছে।
উপমহাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা শহীদি পেয়ালা পানের উজ্জ্বল সব নমুনা দেখতে পাই। শহীদ তিতুমীর বাঁশের কেল্লা গড়ে যেভাবে দখলদার অপশাসকবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে শহীদ হয়েছেন, তা আজো ছাত্র-জনতাকে আন্দোলনের পথ ধরে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। ছাত্র-জনতা আজ ভার্চুয়াল বাঁশেরকেল্লার মতো বিকল্প গণমাধ্যম তৈরি করে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিরামহীন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
মিসরের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস পৃথিবীর যেকোনো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীর কাছে অবশ্য পাঠ্য হিসেবে বিবেচিত। ইমাম হাসান আল বান্না, সাইয়েদ কুতুবদের অসাধারণ জীবন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত করে। সাইয়েদ কুতুবের প্রথম কারাদন্ড হয়ে এক বছর জেলে থাকার পর কর্নেল নাসের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হল তিনি যদি পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান তাহলে তাকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। মর্দে মুমিন এ প্রস্তাবের যে জবাব দিয়েছিলেন তা ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। আল্লাহর কসম! যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবুও আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তার প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট। আজ যখন প্রিয় বোন আসমা বেলতাগি রাজপথে আন্দোলনে থেকে শহীদ হন, তখন ইসলামী আন্দোলনের পথচলায় শাহাদাতের প্রয়োজনীয়তা আরো সুস্পষ্ট হয়।
পৃথিবীর নানা প্রান্তেই মানুষ মহান রবের বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে শাহাদাতের পথ ধরে এগিয়েছে। নানা প্রান্তের মানুষ দখলদার জালিম শাসকদের মোকাবেলায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী আন্দোলন হামাসের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকভাবে শাহাদাতের উদাহরণ তৈরি করে চলছেন। শেখ আহমদ ইয়াসিন, আবদুল আজিজ রানতিসির পথ ধরে মুক্ত আল আকসার আশায় আজো নিজেদের জীবনকে বাজি রাখছেন।
আমরা ভুলতে পারি না মুক্তির আশায় সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া কাশ্মিরের মুসলমানদের কথা। তেমনিভাবেই জানি চেচনিয়ার বিপ্লবীদের কথা। চীনের প্রাচীরের আড়ালে কত উইঘুর মুসলিম যে শহীদ হচ্ছেন, তা প্রচারের আলোয় তেমনভাবে আসেই না। কিন্তু কোন জায়গায়ই মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন একেবারে থেমে যায়নি। ইসলামের পতাকাবাহী যুবকেরা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ আরো সুসংহত।
ফিরে আসি ১১ মার্চের কথায়। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চে মতিহারের সবুজ চত্বরে আমরা হিং¯্র হায়েনাদের নিরীহ শিবির নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি। শাহাদাতের পেয়ালা পানের মাধ্যমে এই পবিত্র সংগঠনের শহীদি খাতায় প্রথম নাম লেখান মোহাম্মদ সাব্বির হোসাইন। লোহার রড, পাইপগান, দা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। জাসদ, ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রীর সন্ত্রাসীরা একটা ইটের ওপর আবদুল হামিদের মাথা রেখে আরেক ইট দিয়ে থেঁতলে দেয়। শহীদ হন আবদুল জব্বার ও আইয়ুবও। পরবর্তী সময় থেকে ছাত্রশিবির ১১ মার্চকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। শহীদ সাব্বির, হামিদের পথ ধরে আরো শতাধিক ভাই নিজেদের আল্লাহর পথে সঁপে দিয়েছেন। আমরা পল্টনের রাজপথে ২৮ অক্টোবরে মুজাহিদ, শিপনদের শাহাদাত দেখেছি। ইসলামী আন্দোলনকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তাঁরা কিভাবে বাতিলের মোকাবেলা করে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন, তা আজো রাজধানীর ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের স্মৃতিতে ভাস্বর।
এই সময়ে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যার সরকারি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্ররা জীবন দিয়েই চলছে। তবুও কুরআনের খাদেমদের কারামুক্ত করার আকাক্সক্ষা ছাত্র-জনতার হৃদয় থেকে মুছে যায়নি। রাসূল (সা) এর আগমনের পূর্বেও মানুষকে সত্যের দাওয়াত দিতে গিয়ে নবী-রাসূল ও তাদের অনুসারীরা অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেক নবীর অনুসারীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। হযরত মূসা (আ), ঈসা (আ)সহ অনেক নবীকে দীর্ঘদিন নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তারপরও সে সময় আল্লাহর পছন্দনীয় এই মানুষেরা ধৈর্যধারণ করেছেন এবং মানুষকে সত্যের পথে ডেকেই গেছেন।
আজ মুসলিমবিশ্বকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করে পশ্চিমাশক্তি মুসলমানদের হত্যা করছে। যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায়। এসব দেশে ইসলামপ্রিয় মানুষেরা কুরআনের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালিত হোক তা চাইলেও তাদের সে আশাকে চক্রান্তের জালে আটকে রাখা হচ্ছে। উল্টো যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে এসব দেশের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলা হচ্ছে। তদুপরি এসব দেশেও ইসলামপ্রিয় মানুষেরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে একদিন এসব দেশে কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠিত হোক সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা শাহাদাতের আগে বলে গেছেন যে তাঁর রক্ত যেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজে লাগায়। কোন ধরনের প্রতিশোধপ্রবণ মানসিকতা থেকে দূরে থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর এই আহ্বান শহীদ ভাইদের স্বচ্ছ হৃদয়কেই আমাদের সামনে তুলে ধরে।
ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে শহীদ ভাইদের প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলা হিসেবে আমরা অন্য কারোর রক্ত নিতে চাই না। কারোর চুল পরিমাণ ক্ষতি হোক তা চাই না। কিন্তু দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকেও একচুল পরিমাণ সরে যেতে চাই না। আমাদের প্রতিশোধ হবে বাংলাদেশের সবুজ জমিনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা।
শহীদ সাব্বির ছাত্রশিবিরের হয়ে যে মিছিল শুরু করেছেন, সে মিছিলে আজ শত শত পবিত্র মুখের সমাহার। তাঁরা আমাদের ডাকছেন। অটল থাকতে বলছেন। অবিচল পথ চলতে বলছেন। শহীদ দিবসে শাহাদাতের চিন্তাকে হৃদয়ে যতেœর সাথে লালন করে সচেতনভাবে ইসলামী আন্দোলনের এই পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের প্রত্যয়।
লেখক : কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply