আফগানিস্তান ও তালেবান অতীত থেকে বর্তমান -কে. এম. শফিকুল ইসলাম

আবারও বিশ্বব্যাপী পত্রিকার শিরোনাম হয়ে উঠছে তালেবান। তালেবান কারা এবং তাদের নিয়ে বিশ্বজুড়ে এতো আলোচনা কেন? তারা কোথা থেকে এসেছে এবং তারা কী চায়? এরকম কয়েকটি প্রশ্ন সামনে রেখে ইতিহাসে ফিরে যাওয়া যাক। তালেবান মানে ছাত্র। বর্তমানে তালেবান শব্দটি একটি ইসলামী সংগঠনকে বোঝায় যারা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে। এই শব্দটি দ্বারা মূলত পশতুনদের বোঝায়। ইউনেস্কোর মতে, আফগানিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশের প্রধান ভাষা পশতু। আফগানিস্তানের সীমান্তে পাকিস্তান এবং ইরানের অংশেও পশতু ভাষা বলা হয়। আফগানিস্তানকে ঐতিহাসিকভাবে ‘সা¤্রাজ্যের কবরস্থান’ বলা হয়। ইতিহাস আমাদের বলে খ্রিষ্টপূর্ব ১১তম শতাব্দী থেকে বিভিন্ন সা¤্রাজ্য এবং শক্তি আফগানিস্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের চেষ্টা করেছে। স্থলবেষ্টিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও, আফগানিস্তান ভূ-কৌশলগত পাওয়ার প্লে-এর বৃহত্তর খেলায় একটি লোভনীয় স্থান হিসেবে অব্যাহত রয়েছে। ইতিহাসে ফিরে গেলে দেখা যায়, পারস্যের সা¤্রাজ্য (আজকের ইরান) আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। আলেকজান্ডার যিনি যুদ্ধের পর যুদ্ধ জিতেছিলেন এবং আধুনিক ভারতের সীমানার কাছাকাছি এসেছিলেন। তিনিও আফগানিস্তানের দিকে নজর দিয়েছিলেন। কিন্তু তার ভাগ্যে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। প্রবল পরাক্রমশালী মৌর্যগণও এই অঞ্চলে দৃষ্টি দিয়েও ব্যর্থ হন। এটি ইতিহাসের একটি অংশ যা আজ পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হয়। মুঘল, ব্রিটিশ, সোভিয়েত এবং এখন আমেরিকানরা সবাই আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তালেবানরাও প্রথম প্রচেষ্টায় আফগানিস্তানের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়।

তালেবানের নেতৃত্বে যারা
একটি দল হিসাবে তালেবান তাদের গঠন সম্পর্কে স্বচ্ছ নয়। তারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছে কিন্তু পর্যবেক্ষকরা মনে করেন তালেবান নেতৃত্ব আসলে আফগানিস্তানের বাইরে থাকতে পারে। কঠোর আচরণবিধি এবং দলত্যাগ বা দেশত্যাগের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে তালেবান নেতৃত্ব তাদের বন্দুক বাহকদের ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তালেবানের নেতৃত্ব শ্রেণিবিন্যাসে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ‘রাহবারি শূরা’ নামে পরিচিত। এটি পরে পাকিস্তান শহরে ‘কোয়েটা শূরা’ নামে বেশি পরিচিত, যেখানে তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ মোল্লা ওমর তার শীর্ষ সহযোগীদের সাথে ২০০১ সালে আমেরিকা আফগানিস্তান আক্রমণ করার পর আত্মগোপন করেছিলেন বলে মনে করা হয়। মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পর তালেবানের নেতৃত্ব মোল্লা আখতার মোহাম্মদ মনসুরের হাতে চলে যায়। যিনি পরে পাকিস্তানে ২০১৬ সালে একটি আমেরিকান বিমান হামলায় নিহত হন। ওমর পাকিস্তানের করাচির একটি হাসপাতালে মারা গিয়েছিলেন। বর্তমানে, রাহবারি শূরার প্রধান হিসেবে তালেবানদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৌলভী হাইবাতুল্লাহ আখুন্দাজাদা। যে পরিষদটি আফগানিস্তান ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে সমস্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নেন। তালেবানদের মধ্যে হাইবাতুল্লাহ আখুন্দাজাদার পদবি হলো আমির আল-মুমিনিন, যার অর্থ বিশ্বস্ত কমান্ডার। এটি তালেবানদের সর্বোচ্চ পদ। মোল্লা ওমর যখন তালেবান প্রধান হয়েছিলেন তখন এটি ছিল তার পদবি। হাইবাতুল্লাহ আখুন্দাজাদা তিনজন পরিচিত ডেপুটিদের সহায়তায় রাহবারি শূরা পরিচালনা করেন। তারা হলেন, মোল্লা মুহাম্মদ ইয়াকুব (মোল্লা ওমরের পুত্র), মোল্লা আবদুল গনি বারাদার (তালেবানের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা), এবং সিরাজউদ্দিন হাক্কানি (হাক্কানি নেটওয়ার্কের বর্তমান নেতা), যা অনেক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা বিশ্বাস করে যে এটি তালেবান, আল-কায়েদা এবং পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা। মোল্লা ওমরের পুত্র মুহাম্মদ ইয়াকুব তালেবানদের আদর্শিক ও ধর্মীয় বিষয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। সিরাজউদ্দিন হাক্কানি তালেবান শাসনের বিরোধী যে কোন বিদ্রোহ দমন করার দায়িত্বে রয়েছেন। রাহবারি শূরার নিচে একটি নিয়মিত সরকারের মন্ত্রণালয়ের অনুরূপ বিভিন্ন কমিশন রয়েছে। এই কমিশনের মাধ্যমে তালেবানরা তাদের ছায়া সরকার পরিচালনা করে। এই কমিশনগুলো সামরিক, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নীতিমালা বাস্তবায়ন করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক কমিশন, যা তালেবান শাসনের অধীনে আসার সাথে সাথে আফগানিস্তান প্রদেশগুলোতে গভর্নর এবং কমান্ডার নিয়োগ করে। গভর্নর এবং কমান্ডাররা তালেবান শ্রেণিবিন্যাসের তৃতীয় স্তর গঠন করে। আবদুল গনি বারাদারের নেতৃত্বে তালেবানের রাজনৈতিক কমিশন পরিচালনা হয়। মার্কিন আলোচকদের সঙ্গে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কাতারে স্বাক্ষরিত একটি শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। এই শান্তি চুক্তি হলো আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনাদের বর্তমান প্রত্যাহারের ভিত্তি। দেশে ২০ বছর থাকার পরে আমেরিকান সেনাদের প্রত্যাহার শুরু হয়।

কান্দাহারের গল্প
তালেবানের কাছে কান্দাহারের পতন ছিল গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ইতিহাস সবসময়ই আফগানিস্তানের সাথে জড়িত ছিল। কান্দাহারের তালেবানের নিয়ন্ত্রণ ইঙ্গিত দেয় যে এটি কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল যে তারা পুরো বা বেশির ভাগ আফগানিস্তান শাসন করবে। আঠারো শতকে কান্দাহার ছিল একীভূত আফগানিস্তানের রাজধানী। ১২-১৩ শতকে আফগানিস্তানে আক্রমণ করার সময় মোঙ্গল আক্রমণকারী চেঙ্গিস খান শহরটি ধ্বংস করেছিলেন কিন্তু কান্দাহার পুনরুত্থিত হয়েছিল এবং হাত বদল হয়েছিল, অবশেষে ফার্সি থেকে মুঘল এবং ১৮ শতকের আগ পর্যন্ত। উনিশ শতকে ব্রিটিশরা কান্দাহার এবং আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে এসেছিল কারণ তারা তাদের ভারতীয় সা¤্রাজ্যের জন্য রাশিয়াকে হুমকি হিসেবে দেখেছিল। ৯০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, ইংরেজ সা¤্রাজ্য পিছু হটার আগে ব্রিটিশ এবং আফগানরা তিনটি যুদ্ধ করেছিল। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত রাশিয়া এবং আশপাশের দেশগুলোতে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠার পর সোভিয়েতরা বিংশ শতাব্দীতে আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৮০ সালে আফগানিস্তানে তালেবানদের উত্থানের কারণ হলো সোভিতের ভুল অভিযান।

তালেবানপূর্ব আফগানিস্তান
তালেবানের উৎপত্তির শিকড় আফগানিস্তানের শেষ রাজপরিবারের শাসক মোহাম্মদ জহির শাহের শাসনে (১৯৩৩-৭৭)। জহির শাহ ছিলেন আফগানিস্তানের তৃতীয় শাসক যিনি কমিউনিস্ট সোভিয়েত রাশিয়ার প্রগতিশীল ধারণা অনুকরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রথম শাসক ছিলেন আমানউল্লাহ, যিনি ১৯২৩ সালে আফগানিস্তানের একটি সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন, ঘটনাক্রমে একই বছর তুরস্কে বিপ্লবী নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের হাতে ইসলামী খেলাফতের অবসান ঘটেছিল। আমানউল্লাহর সংবিধানে সমগ্র ধর্মের মধ্যে লিঙ্গ এবং সুযোগের সমতা আহ্বান করা হয়েছিল। এটি শক্তিশালী ধর্মীয় নেতাদের মনে আঘাত করেছিল, যারা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল এবং একটি তাজিক জাতিগত নেতার নেতৃত্বে একটি দল কাবুল দখল করেছিল। আমানউল্লাহ, যিনি এর আগে ‘আমির’ থেকে ‘বাদশাহ’ (রাজা) পদবি পরিবর্তন করেছিলেন, তিনি কাবুলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে নেওয়ার চেষ্টা করার পরিবর্তে সিংহাসন ত্যাগ করেছিলেন। উত্তরাধিকারের জন্য সংক্ষিপ্ত সংগ্রামের পর, আমানউল্লাহর দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ নাদের শাহ ১৯২৯ সালে আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেন। কিন্তু চার বছর পর তাকে হত্যা করা হয়। তার পুত্র জহির শাহ আফগানিস্তানকে দেখেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং শীতল যুদ্ধের প্রথম দশকে। আফগানিস্তানের শাসক হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তার শাসনামলে বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী দেখা যায় কিন্তু দুইজন প্রতিক্রিয়াশীল ইসলামী শক্তি হিসেবে তালেবানদের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হয়। তারা ছিলেন শাহ মাহমুদ এবং দাউদ খান। শাহ মাহমুদ তার অবাধ নির্বাচন, মুক্ত সংবাদপত্র এবং একটি ‘উদার’ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে রক্ষণশীলদের চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। রক্ষণশীল ইসলামপন্থীদের সমর্থিত মোহাম্মদ দাউদ খান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। দাউদ খান অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনীর সোভিয়েত মডেল নকল করেছিলেন। তার আমলেই সোভিয়েত রাশিয়া কার্যত সমস্ত নীতিগত সিদ্ধান্তে আফগানিস্তানকে শাসন করতে এসেছিল। তিনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল নারীদের স্বেচ্ছায় বোরকা বা অন্যান্য পর্দা পরার অনুমতি দেয়া এবং পর্দা বিলুপ্ত করা। এতে জনসম্মুখে মহিলাদের অংশগ্রহণ বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পায়। যা ধর্মীয় নেতারা ভালোভাবে নেয়নি।

গণতান্ত্রিক আফগানিস্তান
জহির শাহের অধীনে আরেকটি পদক্ষেপ ছিল সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের প্রবর্তন। একটি নতুন সংবিধান আনা হয়েছিল এবং এটি আফগান গ্র্যান্ড কাউন্সিল লোয়া জিরার দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন করার কথা ছিল। একটি ছিল ‘হাউজ অব পিপল’। দ্বিতীয়টি ‘হাউস অব এল্ডার্স’ এবং এটা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, রাজা কর্তৃক নিযুক্ত এবং প্রাদেশিক পরিষদ দ্বারা নির্বাচিত সদস্য থাকার কথা ছিল। এটা ছিল গণতান্ত্রিক আফগানিস্তানের ধারণা। ১৯৬৬ এবং ১৯৬৯ সালে আফগানিস্তানের আইনসভার উভয় কক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি আফগানিস্তানের মার্কসবাদী গোষ্ঠী থেকে শুরু করে রক্ষণশীল ইসলামী গোষ্ঠীসহ সব ধরনের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষীদের সুযোগ করে দিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী মার্কসবাদী গোষ্ঠী আফগানিস্তানের পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপিএ) এবং ইসলামিক সোসাইটি নামে একটি রক্ষণশীল ইসলামী গোষ্ঠী। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস ১৯৭০ এর দশকের প্রথম থেকে ১৯৯০ এর দশকের প্রথম দিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক মতাদর্শের দুটি ধারার মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের ইতিহাস। নব্বইয়ের দশকে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে থেকে তালেবানের উত্থান ঘটে।

পশতুনিস্তান ও তালেবান
তালেবানের উত্থান আরেকটি কারণের সাথে যুক্ত। সেটি হলো পশতুনিস্তান। পশতুনিস্তান এমন একটি অঞ্চল যেখানে আফগানিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে বৈধ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে কিন্তু তার একটি অংশ পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি অ্যাংলো-আফগান চুক্তির সাথে যুক্ত যা ডুরান্ড লাইনকে সীমানা হিসাবে নির্ধারণ করে। আফগান রাজারা ডুরান্ড লাইনকে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের পশতু অধ্যুষিত অঞ্চলের মধ্যে সীমানা হিসেবে গ্রহণ করেনি। আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে, দাউদ খান সোভিয়েতদের দিকে ফিরে আসেন এবং পাকিস্তান থেকে এই অঞ্চল দখলে নেন যা ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এটি একটি স্থলবেষ্টিত দেশের জন্য একটি বড় আঘাত ছিল। ফলে দাউদ খান ক্ষমতা হারান। দাউদ খান ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তানে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি জহির শাহকে বাদশাহ হিসেবে পদচ্যুত করেন। দাউদ খানের আফগান সেনাবাহিনীর বামপন্থী সামরিক কর্মকর্তাদের সমর্থন ছিল। জহির শাহের সংবিধান বাতিল করা হয়, আফগানিস্তানকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং নতুন রাষ্ট্রপ্রধান দাউদ খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে পশতুনিস্তান সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করেন। চার বছর পর, আরেকটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয় এবং লোয়া জিরার দ্বারা অনুমোদিত হয়। কিন্তু এই উন্নয়নের ফলে আফগানিস্তানে ক্ষমতার জন্য বহুমুখী সংগ্রাম শুরু হয়। এটা ছিল সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা। আফগানিস্তানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। দাউদ খান এবং তার পরিবারের অধিকাংশকে ১৯৭৮ সালে হত্যা করা হয়েছিল। আফগানিস্তানে সোভিয়েতরা প্রধান ভূমিকা পালন শুরু করে। একটি নতুন সরকার আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে কিন্তু প্রকৃত কর্তৃত্ব মস্কোতে রয়ে গেছে। একটি নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল যার মধ্যে ছিল মহিলাদের সমান অধিকার এবং সুদ নিষিদ্ধ করা। কমিউনিস্ট রাশিয়ার আদর্শের প্রতিফলন ঘটাতে ভূমি ও প্রশাসনিক সংস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। এটি আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারকারী উপজাতীয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। তারা ইসলামী গোষ্ঠীর সমর্থন পেতে শুরু করে। প্রথমে কাবুলে এবং তারপর গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু হয় এবং এর পরে প্রায় পুরো দেশ। সোভিয়েত রাশিয়া ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে আক্রমণ করে এবং আবারও তাদের অনুকূলে শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ একটি রক্ষণশীল ইসলামী গোষ্ঠীর উত্থানের জন্য বলয় তৈরি করে। আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এবং চীন ইসলামিক শক্তির সহযোগী হয়ে ওঠে।

জিহাদের শুরু
সোভিয়েত আক্রমণে আফগানের বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং কৌশলগত অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী বিশ্বশক্তিকে কঠিনভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই আক্রমণের ফলেই মুজাহিদিনদের উত্থান ঘটে। মুজাহিদিন একটি আরবি শব্দ। যারা জিহাদ, ধর্মীয় যুদ্ধে অংশ নেয় তাদের বোঝায়। জাহিদিন ছিল সোভিয়েতদের বিরোধিতায় আফগানিস্তানের বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠীকে একত্রিত করার প্রতিরোধী শক্তি। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে তারা সোভিয়েত ও তাদের সমর্থিত সরকারের ওপর বেশ কয়েকটি সহিংস আক্রমণ চালায়। যখন মুজাহিদিরা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে শক্তি সঞ্চয় শুরু তরে তখন ইসলামিক এসব যোদ্ধাদের সামরিক সাহায্যের জন্য পাকিস্তানের সহায়তায় আমেরিকা একটি নেটওয়ার্ক গঠন করে। চীনও অস্ত্র সরবরাহ করে জিহাদিদের সাথে হাত মেলায়। ইসলামী আফগানিস্তানে একটি নিয়ন্ত্রক অবস্থানে বসে কমিউনিস্ট সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রচেষ্টা তৈরি করে সৌদি আরব থেকে আসা অর্থ ও রক্ষণশীল ইসলামী আদর্শ। যারা অর্থ এবং মতাদর্শ উভয়ই নিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন ওসামা বিন লাদেন। আমেরিকা, পাকিস্তান এবং সৌদি আরবের সোভিয়েত-বিরোধী পরিকল্পনার এই পর্যায়ে আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) আবির্ভূত হয়েছিল।

সোভিয়েত প্রস্থান ও তালেবানের সুসময়
পাকিস্তানি ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এর কাজ ছিল প্রায় ৪০০টি মুজাহিদিন গ্রুপ এবং অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের সাথে সমন্বয় সাধনের কাজ করা। যাতে জিহাদি যোদ্ধারা সোভিয়েত এবং আফগান সরকারি বাহিনীর সাথে লড়াই করার জন্য অনুপ্রাণিত যুবকরা ঝরে না পড়ে। আইএসআই অবশেষে তাদের দুটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর অধীনে নিয়ে আসে যা ইসলামী রক্ষণশীল এবং ইসলামী মৌলবাদীদের দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে বিবেচনা থেকে বাদ দেয়। ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়বে এবং সোভিয়েতরা আফগানিস্তান থেকে সরে যাবে এটা কেবল সময়ের ব্যাপার। ১৯৮৯ সালে, সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরের বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আফগান সরকার বাহিনীর প্রতি সমর্থন শেষ হয়ে যায়। ধর্মনিরপেক্ষ আফগানিস্তানের খেলা শেষ হয়েছিল। আফগানিস্তানের আসল শক্তি রাশিয়ানদের কাছ থেকে পাকিস্তানি ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এর কাছে চলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব পর্দার আড়ালে থেকে যায়, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। সোভিয়েতদের সেনা প্রত্যাহার আফগানিস্তানে আরেকটি গৃহযুদ্ধের জন্ম দেয়। তৎকালীন নজিবুল্লাহ সরকারের পতন ঘটে। আইএসআই এর সাথে সম্পর্কযুক্ত অর্ধ ডজনেরও বেশি মুজাহিদীন দলের একটি জোট একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে। কিন্তু এটি আফগানিস্তানে একটি ভিন্ন ধরনের গৃহযুদ্ধকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলি বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের জন্য নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু করে। সোভিয়েত প্রস্থান থেকে স্বস্তি শিগগিরই হতাশায় পরিণত হয়েছিল। সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। অপহরণ, লুণ্ঠন, ডাকাতি, হত্যা, এবং দুর্নীতি বিরাজ করে। এই পটভূমিতে, ‘ছাত্র’ বা তালেবান ১৯৯৪ সালে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তারা আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মাদ্রাসা থেকে আসে। তাদের নেতা ছিলেন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর, যিনি সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ওসামা বিন লাদেনের সমর্থন ছিল তার।

তালেবান শাসন
তালেবান ১৯৯৪ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোনাম হয়। যখন তারা কান্দাহার দখল করে, তার গভর্নরকে ক্ষমতাচ্যুত করে, শহরের চারপাশের বাণিজ্যিক পথ ডাকাতদের থেকে নিরাপদ করে এবং ইসলামী আইন অনুযায়ী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। তারা সামরিক পরিকল্পনায় পাকিস্তান এবং সৌদি আরব থেকে অর্থায়নে প্রচুর সমর্থন পেয়েছিল। তালেবানদের উত্থান ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি জয়-জয় পরিস্থিতি কারণ তারা পশতুনিস্তান সমস্যা সমাধানের জন্য আফগানদের পুরনো দাবিতে ফিরে যায়নি। এটি আফগানিস্তানে তালেবানের মসৃণ বিস্তার নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৪ সালের আফগানিস্তান ছিল একটি বিশৃঙ্খল স্থান এবং রাজনৈতিকভাবে শৃঙ্খলার বাইরে। আফগান শহরকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনসমর্থনের মধ্যে তালেবান কান্দাহারে প্রবেশ করে। নব বলে বলীয়ান ইসলামী বিশ্বাস এতটাই প্রভাবশালী ছিল যে এটি খুব দ্রুতগতিতে অঞ্চলগুলিকে আচ্ছাদিত করেছিল। দুই বছরের মধ্যে, তালেবানরা প্রেসিডেন্ট বুরহানউদ্দিন রাব্বানীর বাহিনীর কাছ থেকে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে নেয়। তালেবানরা কাবুল এবং পরে আফগানিস্তানের প্রায় ৯০ ভাগ দখল করার পর, বুরহানউদ্দিন রাব্বানী নির্বাসন থেকে নামমাত্র সরকার পরিচালনা করেন। ১৯৯৬ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার গঠন হয়ে যায়। যদিও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। আফগানিস্তানে তাদের শাসন ছিল বিশ্বের অধিকাংশের দ্বারা অস্বীকৃত। তাদের সামাজিক নীতি বিশ্বকে আলোড়িত করেছে, বিশেষ করে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানসহ জনজীবন থেকে নারীদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া, সুষ্ঠু বিচার বিভাগীয় বিচার ছাড়াই জনসাধারণের মৃত্যুদণ্ড এবং অনৈসলামিক প্রতীকসমূহের ধ্বংস যেমন বামিয়ানে বুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূর্তিতে বোমা হামলা। তারা সঙ্গীত নিষিদ্ধ করে এবং যারা ছোট দাড়ি রাখে তাদের জেলে বন্দী করে। তারা এগুলোকে অনৈসলামিক ঘোষণা করে। তালেবানরা পশতুনদের প্রাক-ইসলামী উপজাতীয় কোড এবং সৌদি আরবের নিজস্ব ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আইনশাস্ত্র অনুসরণ করে যা সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মাদ্রাসায় প্রভাবশালী ওহাবি মতবাদ। তালেবান ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদা এবং পাকিস্তান থেকে পরিচালিত ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠনসহ ইসলামী গোষ্ঠীগুলিকে লালন করে। তাদের মধ্যে একজন ভারতীয় কারাগারে বন্দী এক তালেবানের মুক্তির দাবিতে ১৯৯৯ সালে একটি ভারতীয় যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে কান্দাহারে নিয়ে যায়। এটা আশ্চর্যজনক নয় যে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়া অন্য কোনো দেশ তালেবানকে আফগানিস্তানের সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলা চালানোর আগে তালেবানরা আফগানিস্তানের নয়-দশমাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। টুইন টাওয়ারে হামলার জন্য ওসামা বিন লাদেনের আল কায়েদাকে অভিযুক্ত করা হয়। (যদিও এখন পর্যন্ত এই অভিযোগ প্রমানিত হয়নি)। এবং দাবি করা হয় ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে আত্মগোপনে আছেন। এই সন্ত্রাসী হামলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার ন্যাটো মিত্রদের একটি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল যার রেশ ধরে আফগানিস্তানে আল কায়েদার বিরুদ্ধে তারা অভিযান পরিচালনা করে। যদিও তালেবানরা তাদের দেশে বিদেশী শক্তির আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টাকে ভালোভাবে নেয়নি। ফলে ন্যাটো ও তার মিত্ররা তালেবানদের কোনো সহযোগিতা না পেয়ে ২০ বছর ধরে আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে।

তালেবানের পতন
যে তিনটি দেশ তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে তারা জাতিসংঘে তাদের জন্য একটি আসন চেয়েছিল কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। বিপরীতভাবে, সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় ও প্রচারের জন্য তালেবান শাসনামল জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তর করার মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল তালেবান। সন্ত্রাসীদের আশ্রয় ও প্রশিক্ষণের জন্য জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালেবানের ওপর ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে বৃদ্ধি পায়। এমনকি ইরানের মতো ইসলামী দেশগুলোও তালেবানদের শিয়া মুসলমানদের প্রতি আচরণের বিরোধিতা করেছিল। তালেবান মাদক, চোরাচালান এবং সন্ত্রাসের অর্থায়ন থেকে তার অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু ৯/১১ হামলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীকে আফগানিস্তানের বাগ্রাম বিমানঘাঁটিতে নিয়ে আসে যখন তালেবান আবার ওসামা বিন লাদেনকে প্রত্যর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে। যুক্তরাষ্ট্র অক্টোবরে আফগানিস্তানে আসে। ২০০১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে, তালেবান কান্দাহার সহ তাদের দুর্গ থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল এবং জার্মানিতে তালেবানবিরোধী গোষ্ঠী দ্বারা গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করেছিল। ২০০৪ সালের প্রথম দিকে, একটি লোয়া জিরা আহ্বান করা হয়েছিল এবং একটি নতুন সংবিধান অনুমোদিত হয়েছিল। হামিদ কারজাই এর আগে ২০০১ সালেই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন, যেখানে নারীরা ভোটাধিকার পান। হামিদ কারজাইয়ের বাবা এবং দাদা জহির শাহ সরকারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা আফগানিস্তানে একটি বড় রূপান্তর দেখেছিল। যুদ্ধের সময় তার পরিবার পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল। ভারতে শিক্ষাজীবন শেষ করে কারজাই নিজে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে মুজাহিদিন যোদ্ধাদের সাথে কাজ করেছিলেন। ১৯৯২ সালে সোভিয়েত প্রত্যাহারের পর গঠিত হওয়া মুজাহিদিন সরকারে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তালেবান উত্থানের সময় কারজাই পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যেখানে ১৯৯৯ সালে তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি তালেবানদের বিরুদ্ধে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছেছিলেন বলে তিনি আফগান প্রেসিডেন্টের পছন্দের লোক হয়েছিলেন। তার মতিগতি আমেরিকান কর্তৃপক্ষের জানা ছিল। তার নির্বাচন আফগানিস্তানে তালেবানদের অবসান ঘটাবে বলে মনে করা হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আফগানিস্তানে থাকার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল এবং তাদের ভূ-কৌশলগত খেলার উপযোগী আফগান ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা পর্যন্ত। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে আসার দশ বছর পর ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করে বিশেষ কমান্ডোদের রাতের অভিযানে হত্যা করা হয়। ধারণা ছিল ওসামা আফগানিস্তানে ছিল না। তিনি ২০১১ সালে পাকিস্তানের গ্যারিসন শহর অ্যাবোটাবাদে ছিলেন।

তালেবানের দ্বিতীয় উত্থান
২০১৮ সালের শেষের দিকে, যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের চাপে রাখতে আফগান সরকারকে পুনরুত্থানকারী প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানিকে ক্ষমতায় বসাতে নির্বাচন সম্পন্ন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে আফগান সরকার জানায় আশরাফ গানির শাসনামলে এবং তালেবানদের পুনরুত্থানের সময়কালে এর আগের পাঁচ বছরে ৪৫ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী হারিয়েছে। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে তার সৈন্যদের ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর ছিল। কাতারে কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোকে সময়সীমার মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ছিল। মার্কিন-তালেবান যুদ্ধ আফগানিস্তানকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে, তালেবানরা তাদের কার্যক্রমের জন্য আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়নি। আফগানিস্তানে আমেরিকান উপস্থিতির বিরুদ্ধে তালেবানরা শত্রুর থেকেও সাহায্য পেয়েছে। যদিও পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কাতারের সরকার তালেবানদের অর্থায়ন অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘের একটি রিপোর্ট অনুসারে, তালেবানরা ২০১৮ সালে মাদক বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছে। অন্য উপার্জন বার্ষিক প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। সুতরাং, যখন আমেরিকা আফগানিস্তান ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন তালেবান অফিসিয়াল সরকারকে ধ্বংস করতে প্রস্তুত ছিল যা ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধ করতে অভ্যস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পারেনি।

তালেবানদের তৃতীয় পুনরুত্থান
তালেবান কখনোই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই ছেড়ে দেয়নি। আমেরিকান বাহিনীর হাতে পরাজয়ের পর তালেবান গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে। এটি কৌশলগতভাবে ২০০১ সাল থেকে স্থাপনা, পাবলিক প্লেস, কর্মকর্তা, সামরিক ঘাঁটি এবং সরকারি কনভয়কে টার্গেট করে। এ কৌশলে সফলও হয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী দ্বারা ২০ বছরের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় জঙ্গিবিরোধী অভিযান থেকে তারা বেঁচে আছে। তালেবানরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তা সত্ত্বেও, ন্যাটো ও আমেরিকান বাহিনীর ক্লান্তি দেখার জন্য বাহিনীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক মুজাহিদ পুনরায় নিয়োগ দেয় এবং বাহিনী পুনর্গঠন করে। এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যখন তার বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তালেবান তার সমন্বিত পূর্ণনিয়ন্ত্রিত সামরিক কর্মসূচি শুরু করেছিল। যখন আমেরিকা এবং তালেবান একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তখন আফগানিস্তানের ৪০০টিরও বেশি জেলার প্রায় ২০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। বিপরীতে, সরকারি বাহিনী জেলার প্রায় ৩৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। আফগানিস্তানের বাকি অঞ্চলে সরকার এবং তালেবানদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা ছিল। সম্প্রতি, তালেবান দাবি করেছে যে আফগান অঞ্চলের প্রায় ৮৫ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান আক্রমণ করার আগে যেমন ছিল। এখন প্রায় ৫৫ হাজার যোদ্ধাদের সাথে নিয়ে আফগানিস্তানকে দখল করেছে, যা ১৯৯৬ সালে যখন দেশটি প্রথম দখল করেছিল তার চেয়ে বেশি।

আফগানদের কাছে তালেবান কি জনপ্রিয়?
আপনি কাকে জিজ্ঞাসা করছেন তার উপর নির্ভর করে। আফগান জনগণ আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছে। সরকারি বাহিনী তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের জীবনের জন্য পালিয়ে গেছে, অনেকে প্রতিবেশী দেশে চলে গেছে। একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে ২০ জনেরও বেশি আফগান সরকারি সৈন্যের একটি দল তালেবানদের কাছে আত্মসমর্পণের পর গুলি করছে। এই ‘শাস্তি’র লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি জাগিয়ে তোলা এবং ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে তারা কিভাবে শাসন করেছিল তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আফগান জনগণের মধ্যে তালেবানদের আসল সহায়তার ভিত্তি জানতে কিছু আমেরিকান এবং ইউরোপীয় অলাভজনক সংস্থা জরিপ পরিচালনা করেছে। ২০০৯ সালে মার্কিনভিত্তিক এশিয়া ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক জরিপে আফগানদের প্রায় ৫০ শতাংশ সমর্থন করেছে তালেবানদের। জনগণ সরকার ও সরকারি অফিসের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দশ বছর পরে ২০১৯ সালে জরিপে দেখা গেছে যে ১৫ শতাংশেরও কম আফগান তালেবানদের সহানুভূতিশীল। কিন্তু ২০২০ সালে যখন আমেরিকা তালেবানদের সাথে শান্তি চুক্তিতে আলোচনায় প্রবেশ করে তখন এটি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। তখন জরিপ করা আফগানদের প্রায় ৫৫ শতাংশ বলেছিল যে তারা বিশ্বাস করে যে তালেবানরা আফগানিস্তানে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। এটি প্রতিফলিত করে যে আফগানিস্তানের জনগণ দেশের পরিবর্তিত শক্তির গতিশীলতা বোঝে এবং ক্ষমতার ভুল দিকে থাকতে চায় না। এটাও দেখায় যে, আফগানিস্তানের মানুষ বিশ্বাস করত যে তালেবানদের প্রত্যাবর্তন কেবল সময়ের ব্যাপার, এবং এটাও যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্থিতিশীলতা ও শান্তি অর্জনের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশ ত্যাগ করার তাড়াহুড়ো করেছিল। আমেরিকা এবং ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের জন্য যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল তালেবানকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং নারী এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করা। তালেবানরা শরিয়ার অধীনে নারীর অধিকার বজায় রাখতে সম্মত হয়। তালেবানরা আফগানিস্তানকে একটি ধর্মীয় নেতার নেতৃত্বে একটি ইসলামী আমিরাতে পরিণত করতে চায়। যেহেতু আমেরিকা আফগানিস্তান ত্যাগ করছে এবং তালেবানরা এখন দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন রয়ে যায়: ২০ বছর আগে আমেরিকা আফগানিস্তানে যে লক্ষ্য নিয়ে এসেছিল তা কি অর্জন করেছে? ৯/১১ হামলার জন্য দায়ী ওসামা বিন লাদেন মারা গেছেন। মোল্লা ওমরও নাই। আল-কায়েদা সক্রিয়। এর নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির বারবার তার মৃত্যুর খবর সত্ত্বেও জীবিত বলে বিশ্বাস করা হয় এবং আফগানিস্তানে বসবাস করছেন। তালেবান এখন আরো শক্তিশালী। তালেবান পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল-কায়েদা সমর্থকদের আশ্রয় দিচ্ছে। এটা বিশ্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তালেবান স্বমহিমায় ফিরে এসেছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply