আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞান । আহমাদ হোসাইন নির্ঝর

আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞান

(গত সংখ্যার পর)

ছন্দসন্ধি
ছন্দ যেন পতন না হয় এ জন্য মাঝে মাঝে পাশাপাশি দুটো ভিন্ন শব্দকে এক শব্দের মতো করে পড়তে হয়। পাশাপাশি দুটো ভিন্ শব্দকে মিলিয়ে পড়াকে ছন্দসন্ধি বলে। যেমন:
এ কথা ওমর জানে / হাফেজ আর রুমি [এখানে হাফেজ + আর = হাফেজার না পড়লে মাত্রা ঠিক থাকে না]
এটা ৮+৬ মাত্রার পর্বের পঙক্তি।
ছন্দ রক্ষা ছাড়া আবৃত্তিতে শ্রুতি মাধুর্য বাড়ানোর জন্যও ছন্দসন্ধি করা যেতে পারে। যেমন:
আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটা জীব
[এখানে ‘আর একটা’ কে ‘আরেকটা’ পড়লে শুনতে ভালো লাগে। এবং আবৃত্তিতে দারুণ দ্যোতনা সৃষ্টি করা যায়]

ছন্দ সমাস
ছন্দের সুবিধার জন্য বা আবৃত্তির শ্রুতি মাধুর্যের জন্য কখনো কখনো দু’টি শব্দকে সমাসবদ্ধ করে উচ্চারণ করতে হয়। এই ধরনের শব্দের মিলনকে ছন্দ সমাস বলে। যেমন: গুরু গুরু গুরু / নাচের ডমরু / বাজিল ক্ষণে ক্ষণে
[এখানে ‘ক্ষণে ক্ষণে’ কে ‘ক্ষণেক্ক্ষণে’ পড়লে ছন্দও রক্ষা হয় আবার শুনতেও ভালো লাগে]
ছন্দ রক্ষা বাদ দিলেও আবৃত্তির সৌকর্য বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝে ছন্দ সমাস করে উচ্চারণ করা যেতে পারে। যেমন: ‘এ কথা জানিতে তুমি ভারত ঈশ্বর শা-জাহান’
[এখানে ‘ভারত ঈশ্বর’ কে ‘ভারতীশ্বর’ পড়লে কণ্ঠে একটা অনুরণন তৈরি করা যায় এবং শুনতেও ভালো লাগে]

ছন্দের প্রকারভেদ
ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার:
১. স্বরবৃত্ত ছন্দ
২. মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এবং
৩. অক্ষরবৃত্ত ছন্দ

স্বরবৃত্ত ছন্দ
যে ছন্দে মুক্তাক্ষর এবং বদ্ধাক্ষর উভয়ই একমাত্রা ধরা হয়, যে ছন্দের প্রত্যেক পর্বের প্রথমে শ্বাসাঘাত বা প্রস্বর পড়ে এবং যে ছন্দের লয় দ্রুত তাকে স্বরবৃত্ত বা স্বরাঘাত-প্রধান বা বল প্রধান ছন্দ বলা হয়। মানুষের ম নের স্বাভাবিক দোলা থেকেই এ ছন্দের জন্ম। এ ছন্দের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছড়ার। প্রাচীনকালে ছড়া কাগজে লেখা হতো না, মুখে মুখেই তৈরি করে আবৃত্তি করা হতো। আর মুখে-মুখে আবৃত্তি হতে হতে মুখরিত হয়ে উঠতো এবং ছড়িয়ে পড়তো আর জয় করে চলতো মানবের হৃদয়। যশোর খুলনার ছড়া, উত্তরবঙ্গের মেয়েলি গীত, ডাক ও খনার বচন যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এটা অনায়াসেই বলা যায়, আবৃত্তির মাধ্যমেই ছড়া ছড়িয়ে পড়তো মানুষের কাছে। ছড়ার জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ ছন্দের দোলা। ছন্দের তালে তাল মিলিয়ে আগের যুগের মানুষ সহজেই ছড়া মুখস্থ করে ফেলতো। আর আগের যুগের ছন্দ মানেই স্বরবৃত্ত ছন্দ।
স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য:
১. এই ছন্দের কবিতায় পঙক্তির দৈর্ঘ্য সাধারণত সমান থাকে এবং পঙক্তিতে পর্ব সংখ্যা থাকে চার। তবে তিন / দুই / একও থাকতে পারে।
২. প্রত্যেক পর্বে সাধারণত চার মাত্রা থাকে, তবে তিন / দুই / এক মাত্রাও থাকতে পারে। বড় কবিরা কম-বেশি যে কোনো মাত্রায় পর্ব বিভাজন করতে পারেন। সাতমাত্রার স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাও পাওয়া গেছে।
৩. বদ্ধাক্ষর ও মুক্তাক্ষর সব সময় এক মাত্রা গণনা করা হয়।
৪. এই ছন্দে যতি বা ছেদ পড়ে ঘন; ফলে বাগযন্ত্রের ক্ষিপ্রতা বাড়ে।
৫. প্রত্যেক পর্বের প্রমে শ্বাসাঘাত বা প্রস্বর পড়ে এবং পর্বগুলো থাকে সংক্ষিপ্ত।
৬. এ ছন্দের লয় দ্রুত
৭. লাফিয়ে লাফিয়ে চলে
৮. উচ্চারণভঙ্গি প্রবল
৯. সাধারণত কথ্যরীতির ক্রিয়াপদ এ ছন্দে ব্যবহার হয়ে থাকে।
১০. এ ছন্দ সাধারণত গভীর ভাব প্রকাশের অনুপযোগী
১১. তবে রবীন্দ্রনাথসহ আধুনিক কবিরা লঘু সুরে অনেক গুরু কথা বলে ফেলেছেন। আধুনিক অনেক কবি স্বরবৃত্তে গভীর ভাব প্রকাশে বেশ সিদ্ধহস্ত। যেমন: রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হেলাল হাফিজ, ময়ুখ চৌধুরী প্রমুখ।
১২. এটি বাংলা ভাষার ঘরোয়া ছন্দ বা বনেদি ছন্দ বা ছড়ার ছন্দ হিসেবে পরিচিত।
১৩. লঘু-চপল ভাব প্রকাশ, মৌখিক ভাষা ব্যবহার ও হলন্ত শব্দ গ্রহণের প্রবণতাই স্বরবৃত্ত ছন্দের সর্বপ্রধান বৈশিষ্ট্য।
১৪. মাঝে মাঝে এমনও হয় ধ্বনিব্যঞ্জনা বিষয়কে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে আবৃত্তিকারকে মনোযোগ একটু বাড়াতে হয় এবং কবিতার বিষয়কেই ফুটিয়ে তুলতে হয়। এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে ধ্বনিব্যঞ্জনার কারণেই এই ছন্দের এত মাহাত্ম্য।
স্বরবৃত্ত ছন্দের উদাহরণ:
১. আজকে তোমায়/ দেখতে এলাম/ জগৎ আলো/নূরজাহান
৪+৪+৪+৩
সন্ধ্যারাতের/ অন্ধকার আজ/ জোনাক পোকায়/ স্পন্দমান
৪+৪+৪+৩
বাংলা থেকে/ দেখতে এলাম/ মরুভূমির/ গোলাপ ফুল
৪+৪+৪+৩
ইরান দেশের/ শকুন্তলা/ কই সে তোমার/ রূপ অতুল
৪+৪+৪+৩
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
[এখানে একটি স্তবক, চারটি পঙক্তি, প্রত্যেক পঙক্তিতে চারটিত করে পর্ব। প্রথম তিনটি করে পর্ব চার মাত্রার এবং শেষ পর্বসমূহ তিন মাত্রার ও অপূর্ণ। লয় দ্রুত। সুতরাং এটি স্বরবৃত্ত ছন্দ]
২. বিষ্টি পড়ে/ টাপুর টুপুর/ নদেয় এল/ বান
৪+৪+৪+২
শিব ঠাকুরের/ বিয়ে হল/ তিন কন্যে/ দান
৪+৪+৪+২
প্রচলিত ছড়া
৩. এ শহর আমার শহর / ৭
এখানে বৃষ্টি মেঘে / কেটেছে হাজার বছর
৭+৭
তিমিরে তিমির পেটে / উর্মিলা স্বপ্ন ঘেঁটে
৭+৭
সহসা সাঁতার কেটে / জেগেছে আদিম লহর;
৭+৭
দেখেছে প্রথম প্রবাল / অলৌকিক নৌকা পাথর
৭+৭
-ময়ুখ চৌধুরী
[এটিকে অবশ্য ৩+৪ মাত্রায়ও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে]
৪. ঝিনেদার সুরের সাকি, তিন পাগল বাঁধে রাখি
৭+৭
নিশিথের পাখি তারা, ক্যাসেলে আপণ হারা
৭+৭
কবিতার হাঁকে ডাকে, রাতকে জাগিয়ে রাখে
৭+৭
ভোরেরই লাল আভাতে, ঝিনুকের নীল খোঁপাতে ৭+৭
এদেরই স্বপ্ন থাকে।

প্রতিদিন প্রতিরাতে, এদেরই গল্প থাকে
৭+৭
শহরের কৃষ্টি নিয়ে, এদেরই সৃষ্টি থাকে
৭+৭
হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়ে, শব্দেরই বৃষ্টি দিয়ে
৭+৭
শহরের ছবি আঁকে।

মাত্রাবৃত্ত ছন্দ
যে ছন্দে যুগ্মধ্বনি তথা বদ্ধাক্ষর বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয়ে সব সময় দুই মাত্রার মর্যাদা পায় তাকে বলে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। এ ছন্দের পর্বগুলিতে প্রত্যেকটি অক্ষরধ্বনিই বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। এর অন্য নাম ধ্বনি-প্রধান ছন্দ। স্পষ্টভাবে উচ্চারিত অক্ষরধ্বনিসমূহ থেকেই মাত্রার পরিমাণ নিরূপিত হয় বলে এটি ধ্বনিমাত্রিক ছন্দও বটে। স্থিতি অপেক্ষা গতির দিকেই এর লক্ষ্য। সুর নয়, ধ্বনির প্রাধান্যই মাত্রাবৃত্ত ছন্দের জৌলুস। তবে কিছুটা সুরেলা আবহ তৈরি হলে দোষের কিছু নেই। সুরকে কখনো অবহেলা করা যাবে না। গীতিধর্মিতাও আসতে পারে। কখনো কখনো গীতিধর্মিতা এ ছন্দে নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য:
১. এ ছন্দের কবিতায় পঙক্তির দৈর্ঘ্য সমান অথবা অসমান দুটোই হয় এবং পঙক্তিতে পর্বের সংখ্যা চার / তিন / দুই / এক এর যে কোনোটি হতে পারে।
২. প্রত্যেক পর্বে মাত্রা সংখ্যা থাকে আট থেকে এক (৮-১) এর মধ্যে। তবে চার, পাঁচ এবং ছয় মাত্রার পর্বের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
৩. এ ছন্দে মুক্তাক্ষরকে সব সময় একমাত্রার এবং বদ্ধাক্ষরকে সব সময় দুই মাত্রার ধরা হয়।
৪. মাত্রার সমতাও এই ছন্দের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
৫. এই ছন্দের প্রতিটি অক্ষরের (মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর) প্রতিটি ধ্বনিই স্পষ্টভাবে বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারিত হয়। এ ছন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে হয় কিছুটা টেনে টেনে। এক পর্বের সঙ্গে আরেক পর্ব এবং এক পঙক্তির সঙ্গে আরেক পঙক্তি যেন লেগেই থাকে।
৬. মাত্রাবৃত্ত ছন্দে স্বরাঘাত এমনভাবে পড়ে যে টেরই পাওয়া যায় না।
৭. এ ছন্দের তাল বা লয় বিলম্বিত তথা মধ্যম। এর ব্যতিক্রমও আছে, দ্রুত লয়েও মাত্রাবৃত্তে কবিতা লেখা যেতে পারে। যার প্রকৃষ্ট প্রমাণ নজরুলের ‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ এবং ‘বিদ্রোহী’ কবিতা।
৮. গতিবেগ স্বরবৃত্তের মতো দ্রুত নয় বলে এ ছন্দের রস স্বভাবতই শান্ত। তবে এ ছন্দে যে কোনো রসেই কবিতা লেখা সম্ভব। মাঝে মাঝে কবির চিন্তার চমৎকারিত্বে এ ছন্দের কিছু কবিতা বেশ গতিতে আবৃত্তি করতে হয়।
৯. এ ছন্দ গভীর ভাব প্রকাশের উপযোগী।
১০. বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গাম্ভীর্যপূর্ণ কথাগুলো এ ছন্দেই প্রকাশ করা হয় ।
১১. শেষ পর্ব ছাড়া অন্যান্য পর্বে মাত্রা সংখ্যার সমতাও এ ছন্দের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
১২. বিশেষক্ষেত্রে একমাত্রিক স্বর দীর্ঘায়িত করণের মাধ্যমে দ্বিমাত্রিক করা যেতে পারে। তবে এমন দৃষ্টান্ত বেশি পাওয়া যায় না।
১৩. শব্দের সুর নয় ধ্বনিসঙ্গীত ফুটিয়ে তোলার দিকে আবৃত্তিকারের বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের উদাহরণ:
১. এইখানে তোর/ দাদির কবর/ ডালিম গাছের/ তলে ৬+৬+৬+২
তিরিশ বছর/ ভিজায়ে রেখেছি/ দুই নয়নের/ জ্বলে ৬+৬+৬+২
এতটুকু তারে/ ঘরে এনেছিনু/ সোনার মতন/ মুখ ৬+৬+৬+২
পুতুলের বিয়ে/ভেঙে গেল বলে/ কেঁদে ভাসাইত/ বুক ৬+৬+৬+২
-জসীম উদ্দীন
[এখানে একটি স্তবক, চারটি পঙক্তি, প্রত্যেক পঙক্তিতে চারটি করে পর্ব। প্রথম তিনটি করে পর্ব ছয় মাত্রার এবং শেষ পর্ব সমূহ দু-মাত্রার ও অপূর্ণ। লয় বিলম্বিত বা মধ্যম। সুতরাং এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দ]
২.আর কতদূরে/ নিয়ে যাবে মোরে/ হে সুন্দরী? ৬+৬+৫
বলো কোন্ পার/ ভিড়িবে তোমার/ সোনার তরী? ৬+৬+৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩. দুর্গম গিরি/ কান্তার মরু/ দুস্তর পারা/বার ৬+৬+৬+২
লঙ্ঘিতে হবে/ রাত্রি নিশিথে/ যাত্রীরা হুঁশি/য়ার ৬+৬+৬+২
-কাজী নজরুল ইসলাম
৪. প্রিয়, ফুল/ খেলবার/ দিন নয়/ অদ্য ৪+৪+৪+৩
ধ্বংসের/ মুখোমুখি/ আমরা ৪+৪+৩
চোখে আর/ স্বপনের/ নেই নীল/ মদ্য ৪+৪+৪+৩
কাঠফাটা/ রোদে সেঁকে/ চামড়া ৪+৪+৩
-সুভাস মুখোপাধ্যায়
অক্ষরবৃত্ত ছন্দ
যে ছন্দে যুগ্মধ্বনি শেষে থাকলে দুই মাত্রা এবং প্রথমে ও মধ্যে থাকলে একমাত্রা ধরা হয় তাকে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ বলে। অক্ষরবৃত্তত ছন্দে অক্ষরধ্বনির অতিরিক্ত একটি টান বা সুর থাকে সে জন্য একে তান প্রধান ছন্দও বলে। সাধারণভাবে সাধারণ ভঙ্গিতে অসাধারণ গভীর বিষয় ফুটিয়ে তোলা হয় এই ছন্দে। এ জন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যে উচ্চার্য ছন্দ হিসেবে অক্ষরবৃত্তের নাম নেয়া হয়। সুরের প্রাধান্য আছে এবং সমদৈর্ঘ্যরে পর্বের পুনরাবৃত্তি স্পষ্ট না হওয়ায় বিরাম গ্রহণে কিছুটা স্বাধীনতা পাওয়া যায়। সুরের কারণ বিভিন্ন অক্ষরের মাঝখানের ফাঁকটুকু সহজে ভরে তোলা যায়; আর এজন্যই লঘু গুরু সকল প্রকার অক্ষরের সমাবেশ করা যায়।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্য:
১. এ ছন্দের কবিতায় পঙক্তির দৈর্ঘ্য সমান অথবা অসমান যে কোনোটি হতে পারে।
২. পঙক্তিতে পর্বসংখ্যা- ৩ / ২ / ১ হবে।
৩. পর্বে মাত্রা সংখ্যা- ৮ / ৬ তবে ১৪ / ১২ / ১০ / ৪ / ২ / ১ এর যে কোনটি হতে পারে।
৪. মুক্তাক্ষর সব সময় একমাত্রার।
৫. বদ্ধাক্ষর শব্দের শেষে থাকলে দুই মাত্রার ধরা হয়।
৬. বদ্ধাক্ষর এককভাবে থাকলেও দুই মাত্রার ধরা হয়।
৭. বদ্ধাক্ষর শব্দের প্রমে ও মাঝে থাকলে এক মাত্রার ধরা হয়।
৮. সমাসবদ্ধ শব্দের প্রম বদ্ধাক্ষর প্রয়োজনে এক বা দুই মাত্রার হতে পারে।
৯. বিজোড় মাত্রার পাশে বিজোড় মাত্রা এবং জোড় মাত্রার পাশে জোড় মাত্রা বসে।
১০. এ ছন্দে ধ্বনির অতিরিক্ত তান বা সুর থাকে।
১১. এ ছন্দের লয় ধীর বা মধ্যম।
১২. অক্ষর উচ্চারণে গদ্যের স্বাভাবিক ভঙ্গি অনুসরণ করা হয়।
১৩. কথ্য উচ্চারণ ভঙ্গিতে আবৃত্তি করতে হয়।
১৪. উচ্চারণের সময় প্রতিটা পর্বকে এমনভাবে উচ্চারণ করতে হয় যেন প্রত্যেকটা পর্ব আলাদাভাবে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে থাকে না অথচ এমন এক অনির্বচনীয় ভঙ্গি নির্মাণ করতে হয় যাতে বক্তব্য স্পষ্ট ও জোরালো হয়ে ওঠে। প্রত্যেক পর্বই যেন স্বাধীন সত্তা অথচ একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত। এমনভাবে সম্পর্কিত করে আবৃত্তি করতে হবে যাতে বক্তব্যের খণ্ডিত অংশও আলাদা মাধুর্য প্রকাশ করতে পারে। অর্থাৎ প্রত্যেকটা পর্বের পর নির্দিষ্ট পরিমাণ মাত্রা অপেক্ষা করে বা বাদ দিয়ে পরের পর্ব ধরতে হবে।
উদাহরণ:
১. হে দারিদ্র্য তুমি মোরে / করেছ মহান ৮+৬
তুমি মোরে দানিয়াছ / খ্রিস্টের সম্মান ৮+৬
কণ্টক মুকুট শোভা / দিয়াছ তাপস ৮+৬
অসঙ্কোচ প্রকাশের / দুরন্ত সাহস ৮+৬
-কাজী নজরুল ইসলাম
[এখানে একটি স্তবক, চারটি পঙক্তি, প্রত্যেক পঙক্তিতে দুটি করে পর্ব। প্রথম পর্ব সমূহ আট মাত্রার এবং শেষ পর্ব সমূহ ছয়ত মাত্রার। লয় ধীর বা মধ্যম। সুতরাং এটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দ]
২. হেসে খেলে কোথা দিয়ে/ কেটে যেত দিন ৮+৬
সেদিন কি দিন হায়/ এ দিন কি দিন ৮+৬
-বিহারীলাল চক্রবর্তী
৩. এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে/ হে মঙ্গলময় ৮+৬
দূর করে দাও তুমি/ সর্ব তুচ্ছ ভয় ৮+৬
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪. মৃত্যুর মিছিলে তুমি/ জীবনের দীপ্ত তরবারি ৮+১০
এ কথা নতুন করে/ তোমাকে জানাতে হবে নাকি? ৮+১০
এ-কথারি ঢেউ নিয়ে/ কখন ছেড়েছে নীড় পাখি ৮+১০
উন্মুক্ত আকাশ তলে/ তোমারি বন্দনা শুনি নারী ৮+১০
-দিলওয়ার

সনেট
ইতালীয় কবি ফ্রান্সিস্কো পেত্রাক (১৩০৪-১৩৭৪) চতুর্দশ শতকে সনেট ধারণার প্রবর্তন করেন। তিনি চৌদ্দ মাত্রার এবং চৌদ্দ পঙক্তিতে একটি মাত্র ভাবকে দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রকাশ করেন। সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দর ও গভীর অনুভূতি সঞ্চারী হওয়ায় সহজেই পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে এই নবধারা। জনপ্রিয় হতেও বেশি সময় নেয়নি। এটা অনেকটা গীতিধর্মি কবিতা। তাই সাঙ্গীতিক দোলা এখানে ভাব প্রকাশে বিশেষ সহায়ক। মুহূর্তে এই নবধারার দোলা লাগে ইংরেজি সাহিত্যে। ইংরেজ কবি স্যার থমাস ওয়াট (১৫০৩- ১৫৪২) ষোড়শ শতাব্দীতে ইংরেজি সাহিত্যে সনেটের ধারা প্রবর্তন করেন। বলাবাহুল্য, তিনি একান্তই পেত্রাকের অনুকরণে সনেট রচনা করেন। এমনকি তিনি পেত্রাকের অনেক সনেটের ইংরেজি অনুবাদও করেন। তবে পেত্রাকের সনেটের সঙ্গে তিনি একটা নবমাত্রা যোজনা করেন। সেটা হলো তিনি ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ পঙক্তিতে অন্তমিল প্রদান করেন। থমাস ওয়াটের সময়ের আরেক ইংরেজ কবিও প্রায় কাছাকাছি সময়ে সনেট রচনা করেন। এই ভদ্রলোকের নাম য়ার্ল অব সা’রে (১৫১৬-১৫৪২)। তাঁর মৃত্যুর পর সনেটগুলো প্রকাশিত হয়। তিনি সনেটে নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। তিনি অষ্টক এবং ষষ্টক ধারণার বাইরে এসে চতুষ্কো ধারণার জন্ম দেন। তিনি চার পঙক্তি করে তিনটি স্তবক এবং শেষে দুই পঙক্তিতে এক স্তবক করে মোট চার স্তবকে সনেট রচনা করেন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে সনেট রচনায় যুগান্তর নিয়ে আসেন উইলিয়াম শেকসপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬)। তিনি গঠনগত বড় ধরনের পরিবর্তন না আনলেও শব্দের ব্যবহার এবং বিষয় ও ভাবের গভীরতায় সনেটকে আকর্ষণীয় করে তুলেন। যার জন্য ইংরেজি সাহিত্যে সনেট বলতে শেকসপিয়ারের সনেটকেই বুঝানো হয়। যদিও শেকসপিয়ারের পরে জন মিল্টন (১৬০৮-১৬৭৪), উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ (১৭৭০-১৮৫০)সহ আরো অনেক কবি চমৎকার সনেট রচনা করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে প্রথম সনেট রচনা করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। তিনি পেত্রাকের গুণগান গাইলেও সনেট রচনায় পেত্রাককে পরিপূর্ণ অনুসরণ করেননি। তিনি পেত্রাক এবং শেকসপিয়ার দু’ধারার সমন্বয় করে বাংলা সনেটের প্রবর্তন করেন। প্রথম বাংলা সনেট হলো- ‘কবি মাতৃভাষা’ নামক কবিতাটি। পরবর্তিতে এর নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় ‘বঙ্গভাষা’। তিনি আসলে সনেটকে বাংলা পয়ার বা অক্ষরবৃত্তের চালের সঙ্গে মিলিয়ে এক নবধারা চালু করেন। যার জন্য বাংলা সনেট স্বতন্ত্র মহিমায়ত উজ্জ্বল। তার পরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) সনেট রচনা করেন। তিনি চরণের অন্তমিলে কিছুটা নতুনত্ব দেখাতে পারলেও সনেটের সব বৈশিষ্ট্য রক্ষা করতে পারেননি। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি সাহিত্যের একটিমাত্র শাখায় সফলতার শীর্ষে পৌঁছাতে পারেননি। বলা যায় চেষ্টা করেও সফল হননি; সেটা হলো সনেট। রবীন্দ্রনাথের পরে সনেট রচনা করেন প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)। তিনি ফরাসি রীতিতে সনেট রচনা করেন। এরপরে মোহিতলাল (১৮৮৮-১৯৫২), সুধীন্দ্রনাথ (১৯০১-১৯৬০) প্রমুখ সনেট রচনা করেন। এরই ফাঁকে জীবনানন্দ দাস (১৮৯৯- ১৯৫৪) এসে বাংলা সনেটে এক প্রলয়ঙ্করী পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তার ‘রূপসী বাংলা’ গ্রন্থের সনেটগুলো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং মানুষ মুখে মুখে আবৃত্তি করতে থাকে। মাইকেল বাংলা সাহিত্যে সনেটের সূচনাকারী আর জীবনানন্দ সনেটের জনপ্রিয়তাকারী। মাইকেলের কঠিন কঠিন শব্দের ভারে সনেট বুঝতে যেখানে অভিধান খুঁজতে হতো, সেখানে জীবনানন্দ সহজ ভাষায় সবার উপযোগী সনেট রচনা করে সনেটকে সবার কাছে বোধগম্য ও জননন্দিত করে তুলেন। জীবনানন্দের পরে বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮- ১৯৭৪), ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪)সহ আরো অসংখ্য কবি সনেট রচনা করেন। তবে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি যিনি যুগান্তর নিয়ে এসেছেন তার নাম আল মাহমুদ (১৯৩৬-বর্তমান)। তিনি ‘সোনালি কাবিন’ নামে একটি কবিতায় চৌদ্দটি সনেট রচনা করেন। এই সনেটগুলো বাংলা কাব্যের আকাশে ধ্রুব নক্ষত্রের চেয়েও ধ্রুব হয়ে উঠেছে। এগুলোর শক্তিমত্তা এত বেশি যে বাংলা কবিতা আলোচনা করতে হলে এই সনেটগুলো বাদ দিয়ে আলোচনা করা যাবে না। ব্যাপক প্রতাপান্বিত এই সনেটগুলোয় বাঙালি এবং বাংলাদেশি সংস্কৃতির সকল বিষয় উঠে এসেছে। মাত্র চৌদ্দটি সনেটে বাঙালির জীবনযাত্রার এমন কোনো দিক নেই যা উঠে আসেনি। বাঙালির চিরায়ত জীবনযাত্রার জীবন্ত প্রামাণ্য দলিল হয়ে উঠছে এই সনেটগুলো। অসাধারণ শব্দ বিন্যাসে অনন্য অনুভূতি জাগ্রত করে দিয়েছেন তিনি। বার বার পড়লেও বিরক্তি আসে না। যতবার পড়ি ততবারই নতুন কিছু আবিষ্কার করি। বাঙলা সাহিত্য বিশ্বের যে কোনো ভাষার সনেটের সঙ্গে প্রতিযোগিতা দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পারবে এই চৌদ্দটা সনেট নিয়ে। তার সমসাময়িক আরো অনেকে সনেট লিখেছেন এবং লিখছেন। কিন্তু তিনিই অবিনশ্বর হয়ে উঠেছেন বাংলা সনেটের ধারায়। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, জাতীয় অধ্যাপক এবং চল্লিশের দশকের প্রধানতম কবি সৈয়দ আলী আহসান বলতেন- ‘বাংলা কবিতার মন ও মেজাজ বুঝতে হলে আল মাহমুদের কবিতার দরজায় নক করতেই হবে’। ইংরেজি ‘সনেট’ শব্দটির উদ্ভব ইতালীয় ‘সনেটো’ থেকে। সনেটো শব্দের অর্থ সাঙ্গীতিক মোলায়েম আওয়াজ। এটা এমন ধরনের আওয়াজ যা মানুষের ভেতরে কোমল ভাবের জন্ম দেয়। সে আলোকে বাংলায় সনেট শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মৃদু ধ্বনি বা হালকা ধ্বনি। চতুর্দশপদী কবিতা নামেই বাংলা সাহিত্যে এর পরিচয়। সাধারণত চৌদ্দ মাত্রায়, চৌদ্দ পঙক্তিতে লিখিত কবিতাকে সনেট বলে। তবে আঠার মাত্রায়ও সনেট রচিত হতে পারে। একটি নির্দিষ্ট ভাবকে কেন্দ্র করে সনেট রচনা করা হয়। একটি সনেটে একাধিক ভাব প্রকাশ করা হয় না। সনেট অষ্টক এবং ষটকে বিভক্ত। চৌদ্দত পঙক্তির প্রথম আট পঙক্তিকে বলা হয় অষ্টক। অষ্টকে ভাবের সূচনা ও বিন্যাস থাকে। এবং শেষ ছয় পঙক্তিকে বলে ষটক। ষটকে থাকে ভাবের পরিণতি। তবে ভাবের দিক থেকে চতুর্দশপদী কবিতাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়। ৪ / ৪/ ৪ / ২ এইভাবে বিন্যস্ত হয়। প্রত্যেক চার পঙক্তির নাম চতুষ্কো। অষ্টকের প্রথম চার পঙক্তিতেত ভাবের সূচনা করা হয়। অষ্টকের দ্বিতীয় চার পঙক্তিতে ভূমিকার বিন্যাস করা হয় বা গভীরে যাওয়া হয় অর্থাৎ মূল বক্তব্য বিষয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া হয়। তৃতীয় চার পঙক্তি অর্থাৎ ষটকের প্রথম চার পঙক্তিতে মূল বক্তব্য বিষয় পরিপূর্ণ প্রকাশ করা হয়। এবং শেষ দুই পঙক্তিতে উপসংহার বা সমাপ্তি টানা হয়। সনেটে মিলের দিক থেকে বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনে চলতে হয়। বিভিন্নভাবে এ মিল বিন্যাস হতে পারে। প্রথম পঙক্তির সঙ্গে তৃতীয় পঙক্তির অন্তমিল এবং দ্বিতীয় পঙক্তির সঙ্গে চতুর্থ পঙক্তির অন্তমিলত কিংবা শেষ দুই পঙক্তিরও অন্তমিল হতে পারে। আবার প্রথম পঙক্তির সঙ্গে চতুর্থ পঙক্তির এবং দ্বিতীয় পঙক্তির সঙ্গে তৃতীয় পঙক্তির অন্তমিলও হতে পারে। মিলগুলো হচ্ছে এমন: কগখঘঙঙ অথবা কঘখগঙঙ। আবার ষটকের ক্ষেত্রে একটু ভিন্নতাও আসতে পারে। যেমন: কঘখঙগচ অথবা কঙখঘগচ।
সনেটের উদাহরণ:
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব / বিবিধ রতন ৮+৬
তা সবে, (অবোধ আমি!) / অবহেলা করি, ৮+৬
পর-ধন-লোভে মত্ত / করিনু ভ্রমণ ৮+৬
পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি / কুক্ষণে আচরি ৮+৬
কাটাইনু বহু দিন / সুখ পরিহরি। ৮+৬
অনিদ্রায়, অনাহারে / সঁপি কায়, মন ৮+৬
মজিনু বিফল তপে / অবরণ্যে বরি ৮+৬
কেলিনু শৈবালে; ভুলি / কমল কানন। ৮+৬
স্বপেড়ব তব কুললক্ষ্মী / কয়ে দিলা পরে ৮+৬
“ওরে বাছা মাতৃ কোষে / রতনের রাজি ৮+৬
এ ভিখারি-দশা তবে / কেন তোর আজি? ৮+৬
যা ফিরি অজ্ঞান তুই / যা রে ফিরি ঘরে! ৮+৬
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; / পাইলাম কালে ৮+৬
মাতৃ-ভাষা রূপ খনি / পূর্ণ মণিজালে। ৮+৬
-মাইকেল মধুসূদন দত্ত
অষ্টকে ‘রতন, ভ্রমণ, মন, কানন’ এগুলো হচ্ছে অন্তমিল -ক। যেহেতু প্রম পঙক্তির অন্তে রতন আছে তাই এই অন্তমিলকে ‘ক’ ধরা হয়েছে। ‘করি, আচরি, পরিহরি, বরি’ এগুলো হচ্ছে – খ। দ্বিতীয় পঙক্তির অন্তে করি অছে বিধায় এগুলোকে ‘খ’। ষটকে ‘পরে-ঘরে’, ‘রাজি-আজি’, এবং ‘কালে-জালে’ অন্তমিল আছে। যেহেতু ‘পরে’ শব্দটি আগে আছে তাই এই মিলকে ধরা হবে ‘গ’। তারপরে ‘রাজি’কে ধরা হবে ‘ঘ’ এবং ‘কালে’কে ধরা হবে ‘ঙ’। তাহলে এই কবিতার মিল বিন্যাস হয় – কখকখ, খকখক, গঘঘগঙঙ। এখানে একটিমাত্র ভাবের অবতারণা করা হয়েছে। অষ্টক ও ষটকে বিভক্ত করে ভাবের ক্রম পরিণতিতে যাওয়া হয়েছে। চৌদ্দটি চরণ ও প্রতি পঙক্তিতে চৌদ্দটি করে মাত্রা আছে এবং প্রতি পঙক্তি আট ও ছয় মাত্রায় বিভক্ত; তাই এটি সনেট। আলোচিত ছন্দ ছাড়াও আরো অনেক প্রকারের ছন্দ আছে। আমরা সংক্ষিপ্ত পরিসরে এ ছন্দগুলোর আলোচনা এখানে করবো না; তবে বর্তমানে সবচেয়ে প্রচলিত কিছু ছন্দ নিয়ে অল্প-স্বল্প আলোচনা করব।

অমিত্রাক্ষর ছন্দ
নামই বলে দেয় এ ছন্দে অক্ষরের মিল বা মিত্রতা থাকবে না।ছন্দের বাঁধন থেকে কবিতাকে মুক্তি দেয়ার প্রয়াস থেকে অমিত্রাক্ষর ছন্দের জন্ম। অক্ষরবৃত্তের চালে চললেও এতে অন্তমিল পাওয়া যাবে না। ভাবের প্রবহমানতা থাকবে। ভাব শেষ হওয়ার পর চরণ পড়বে। ইংরেজি ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ ছন্দের অনুকরণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় এ নতুন ছন্দের প্রচলন করেন। এই ছন্দ প্রচলন করার জন্য তিনি ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু এই রচনায় তিনি নিজেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই ‘মেঘনাদবধ’ নামে অপর একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং এই গ্রন্থে তিনি অমিত্রাক্ষর ছন্দের সফল প্রয়োগ করেন। অনেকটা অক্ষরবৃত্তের চালে চললেও চলার গতিতে এর ভিন্নতা স্পষ্ট। অক্ষরবৃত্তের চেয়ে এর গতি বেশি। আবেদন উচ্ছ্বাসে ভরা। সব কিছুই এখানে প্রবল। দুঃখ কিংবা উল্লাস অথবা দ্রোহ সবই এখানে গভীরভাবে এবং প্রচুরভাবে উদ্দীপ্ত। বাক্যকে গুরুগম্ভীর করতে হলে যুক্তাক্ষর ও সমাসবদ্ধ শব্দ বেশি ব্যবহার করতে হয়। অনেকে তৎসম শব্দেরও সমাহার করেন। তবে শক্তিমান কবিরা তৎসম শব্দের প্রাধান্য না দিয়েও এ ছন্দে কবিতা লিখতে পারেন। অক্ষরের বাঁধাধরা নিয়ম থেকে মুক্ত হলেও মাত্রা বিন্যাসে সমতা আছে। প্রত্যেক পঙক্তিতে পর্ব থাকে দুটি। এই পর্ব ৮ + ৬ মাত্রায় বিন্যস্ত। প্রত্যেক পঙক্তির পর ভাব শেষ না হয়ে অবিরাম চলতে থাকে। যখনই ভাবের শেষ হবে তখনি যতি পড়বে। অর্থের ওপর নির্ভর করে যতি ও ছেদ নির্ধারিত হয় এ ছন্দে। মনে রাখতে হবে অমিত্রাক্ষর ছন্দই বাংলা ছন্দের বেড়ি ভেঙে দিয়েছে। আর এই শৃঙ্খল ভাঙার কারিগর মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
অমিত্রাক্ষর ছন্দের বৈশিষ্ট্য :
১. প্রত্যেক পঙক্তিতে পর্ব থাকবে দুটি
২. পর্ব দুটি ৮+৬ মাত্রায় বিন্যস্ত হবে এবং বদ্ধাক্ষরের মাত্রা বিন্যাসেও স্বাধীনতা থাকবে
৩. অন্তমিল থাকবে না। এমনকি চরণের শেষে অনুপ্রাসের দোলাও থাকবে না
৪. ভাবের প্রবহমানতা থাকবে। ভাব শেষ হওয়ার পর যতি পড়বে
৫. স্বচ্ছন্দ গতি থাকবে। তবে গীতিধর্মিতা নয় কথ্যরীতির সুরে আবৃত্তি করতে হবে
৬. খুব বেশি জীবনঘনিষ্ঠতাও এ ছন্দের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
৭. বক্তব্যকে অনুসরণ করেই এ ছন্দ আবর্তিত হয়
৮. বেশ উচ্ছ্বাস নিয়ে এ ছন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে হয়। উল্লেখ্য, উচ্ছ্বাস মানে বীরত্ব নয়। প্রবল ভাবাবেগ মূর্ত হয়ে ওঠে এই ধরনের কবিতায়
৯. ছন্দের যান্ত্রিক যন্ত্রণা থেকে দর্শককে মুক্তি দিয়ে স্বাভাবিক জীবনের স্বচ্ছন্দ গতি নিয়ে আসতে হবে আবৃত্তির সময়
১০. এই ছন্দের কবিতা উদাত্ত কণ্ঠ দাবি করে
১১. পর্ব এবং মাত্রা নির্দিষ্ট বলে এই ছন্দে বৈচিত্র্য কম                                                          উদাহরণ-                                                                                                    রূষিলা দানব-বালা প্রমীলা রূপসী ! ৮+৬
“কি কহিলি, বাসন্তী? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি ৮+৬
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে, ৮+৬
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি? ৮+৬
দানবনন্দিনী আমি; রক্ষঃ-কুল-বধু; ৮+৬
রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী, ৮+৬
আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারি রাঘবে? ৮+৬
পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভুজ-বলে ৮+৬
দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নৃমণি” ৮+৬
-মাইকেল মধুসূদন দত্ত

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply