আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞান । আহমাদ হোসাইন নির্ঝর

আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞান[গত সংখ্যার পর]

গৈরিশ ছন্দ
অমিত্রাক্ষর ছন্দের চরণের বৈশিষ্ট্য ভেঙে গিরিশচন্দ্র ঘোষ ভাব অনুযায়ী ছেদ দিয়ে চরণ রচনা করেন। অমিত্রাক্ষরকে ভেঙে ভাব ও অর্থকে সহজবোধ্য করেছেন গিরিশচন্দ্র। সহজেই এই ছন্দের ভাব অনুধাবন করা যায়। এতে ছন্দের স্বাধীনতা যেমন আছে তেমনি মিষ্টতার মাত্রাও অধিক। অমিত্রাক্ষরের চৌদ্দ মাত্রার বাঁধন চিহ্ন করে ভাব ও যতি অনুযায়ী পঙক্তি সাজানো হয়েছে। অমিত্রাক্ষরকে ভেঙে এই ছন্দ নির্মাণ করেছেন বলে একে ভাঙা অমিত্রাক্ষরও বলা হয়। এখানে বলা আবশ্যক, ভাঙা অমিত্রাক্ষরের ব্যবহার মধুসূদনও করেছিলেন। কিন্তু এটাকে গিরিশচন্দ্র বেশি জনপ্রিয় করে তোলায় তার নামে এ ছন্দের নামকরণ করা হয়। অলঙ্কারের ভিড়ে আক্রান্ত না হয়ে এ ছন্দের কবিতায় হৃদয়ের ভাষাই বেশি প্রাধান্য পায়। ছন্দ চাতুর্য বা শব্দের খেল দেখানোর চেয়ে জীবনের রঙ ফুটিয়ে তোলাতেই এ ছন্দের স্বাভাবিক প্রবণতা। এই ছন্দ সম্পূর্ণ ছেদনির্ভর। অর্থ অনুযায়ী পঙক্তির বিভাজন করতে হয় এবং পর্ব ভাগও অর্থানুযায়ীই হয়। কাব্যনাটকে বা নাট্যকাব্যে এই ছন্দ প্রয়োগ হতো বলে এই ছন্দের গঠন অনেকটা কাটা কাটা। নাট্যরস ঘনীভূত করার প্রয়োজনেই এই ছন্দের এমন স্পষ্ট কাট কাট ভাঙ্গিমা।

গৈরিশ ছন্দের বৈশিষ্ট্য
১. ভাব ও যতি অনুযায়ী পঙক্তি সাজানো হয়
২. মাত্রাবিন্যাসে স্বাধীনতা আছে
৩. শুধু মাত্রাবিন্যাস নয়, যতি এবং ছেদ ব্যবহারেও পূর্ণ স্বাধীনতা আছে
৪. বাঁধনমুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ানোতেই এ ছন্দের আনন্দ
৫. সহজকথা সহজ করে বলার প্রবণতা এই ছন্দের প্রধানতম গুণ
৬. অলঙ্কারের আধিক্যের চেয়ে স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে তোলাতেই এ ছন্দ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে
৭. আবৃত্তির সময় কথোপকথনের ঢংয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে হয়
৮. নাটকীয়তা থাকলে সেখানে নাট্যভাব বজায় রেখে কবিতার আবেদনকেই প্রকট করে তুলতে হয়

উদাহরণ:
শুন দেবী, সন্ধি নাহি হইবে স্থাপন
দুর্যোধন করিয়াছে পণ,
সূচাগ্র মেদিনি নহি করিবে প্রদান।
রাখ মতি গোবিন্দের পদে,
একমাত্র পাণ্ডব-ভরসা জানার্দন;
প্রতিজ্ঞাপূরণ তব অবশ্য হইবে,
সমরে কৌরবকুল হইবে নির্মূল!
দুঃশাসন-হৃদয় বিদারী
লো সুন্দরি, -বেণী তব করিব বন্ধন!
-গিরিশচন্দ্র ঘোষ

গদ্যছন্দ
ভাষার স্বাভাবিক বাগভঙ্গিই গদ্যছন্দ। কবিতাকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্ত করে প্রকৃত জীবনধর্মী করে তোলে যে ছন্দ তাই গদ্যছন্দ। কবির ব্যক্তিগত ভাবোচ্ছ্বাসের পরিস্ফুটন ঘটে এ ছন্দে। এ ছন্দ যেমন বাঁধনমুক্ত তেমনি আবার বাঁধনকে অতিক্রমও খুব একটা করে না। কারণ অন্তরের বাঁধন কবিকে আটকে ফেলে। একজন কবি চাইলেই যাচ্ছেতাইভাবে এ ছন্দে কবিতা লিখতে পারেন না। এ ছন্দে কবিতা লিখতে হলে কবিকে অনেক বেশি জ্ঞানী, বাস্তব জীবনমুখী ও প্রাজ্ঞ হতে হবে। কবিকে জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোর অণুরণন সৃষ্টি করার মতো শক্তি অর্জন করতে হবে। দেখার চোখ প্রবলভাবে অন্তর্মুখী হতে হবে। জীবনকে অনুবাদ করতে শিখতে হবে। ঝরা পালক এবং ছেঁড়া কাগজের ঝুড়ির মতো বিষয়ও দেখার চোখ তৈরি করতে হবে। সাধারণ জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলোর সাধারণ বর্ণনা দিতে হবে অথচ সেই বর্ণনা অসাধারণ হয়ে উঠবে। এ বড্ড জটিল কাজ। প্রথমে স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্তে কবিতা লেখা শিখতে হবে। কারণ ছন্দে কবিতা না লিখতে পারলে ছন্দ ভাঙার কৌশল আয়ত্ত করা যায় না। হঠাৎ করে গদ্যছন্দে কবিতা লিখতে গেলে কবিতা মানহীন হয়ে পড়বে। কবিতার সুর সেখানে প্রাধান্য না পেয়ে গদ্যই প্রাধান্য পেয়ে যাবে। এ জন্য গদ্যছন্দে কবিতা লিখতে গেলে কবিকে অধিকতর সচেতন হতে হয়। সাধারণ ছন্দবদ্ধ কবিতা নেচে নেচে চলে। কখনো ধাধরা, কখনো কাহারবা, কখনো মালঝাপ, কখনো ঝুমুর এক একবার এক এক ঢংয়ে চলে কিন্তু গদ্য ছন্দের কবিতা নাচে না। এ কবিতা চলে। সহজেই চলে। জোর করে ছন্দের শাসনে তাকে শাসাতে হয় না। সহজে চলে বলেই সব দিকেই তার স্বাভাবিক বিচরণ। আপাতদৃষ্টিতে গদ্যছন্দ সহজ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে গদ্যছন্দই সবচেয়ে কঠিন।

গদ্যছন্দের বৈশিষ্ট্য
১. গদ্যছন্দের কবিতা হবে পরস্পর ছেদ বিচ্ছিন্ন চরণের দ্বারা গঠিত
২. চরণ হবে যথাসম্ভব পর্ববহুত্ববর্জিত
৩. চরণের দৈর্ঘ্য অর্থানুযায়ী স্বাধীন হবে
৪. এ ছন্দ যথাসম্ভব স্বাভাবিক এবং কৃত্রিমতাশূন্য
৫. এ ছন্দে বাক্ সংযত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন
৬. পদ্যে ব্যবহৃত কৃত্রিম শব্দ বর্জন করে মৌখিক শব্দ ব্যবহার করতে হবে
৭. বর্ণনা হবে সংযত ও সরল
৮. পদ্য ছন্দের বিন্যাস হয় নিয়মিত আর গদ্য ছন্দের বিন্যাস হয় পরিমিত
৯. গদ্য ছন্দে কবিতার প্রতি অক্ষরকে একমাত্রা ধরে আবৃত্তি করলে শুনতে ভালো লাগবে
১০. চলিত ভাষার ব্যবহার-ই এই ছন্দের জন্য বেশি স্বাচ্ছ্যন্দ
১১. বাস্তবজীবনের ছোটখাটো বিষয়গুলো বর্ণনার চমৎকারিত্বে মহৎ হয়ে ওঠে
১২. এই ছন্দের কবিতায় আকস্মিকতা নেই তবে জীবনকে দেখার ভিন্নতা আছে
১৩. শব্দের কারুকার্য বা শব্দ দ্যোতনার চেয়ে অর্থের স্বাভাবিক গভীরতাই এখানে প্রাধান্য পায়
১৪. এ ছন্দের কবিতা ভাবের অনুগামী। ভাব অনুসারে কথা সাজাতে হয়। গদ্যে লেখা হলেও এখানে পদ্যের আভাস সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে
১৫. একান্ত আবশ্যক না হলে এই ছন্দের কবিতায় বিশেষণ ব্যবহার না করাই ভালো
১৬. কিছুটা নাটকীয়তা দিয়ে কবিতা শুরু হলেও আবৃত্তির সময় অভিনয়ের ভাব নিয়ে আসা যাবে না। স্বাভাবিক কথোপকথনের ভঙ্গিতে সেই নাটকীয়তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। বিশেষ প্রয়োজনে অভিনয় এলেও খেয়াল রাখতে হবে অভিনয় যেন প্রাধান্য পেয়ে না যায়
১৭. এ ছন্দের কবিতা আবৃত্তি কালে পদ্যের মত সুর না করে মুখের ভাষার কাছাকাছি উপস্থাপন করাই ভালো। তবে কোথাও সুরেলা বক্তব্য থাকলে সেখানে কিছুটা সুর দিয়ে পড়া যেতে পারে। সুর প্রবল হয়ে ওঠার সুযোগ দেয়া যাবে না
১৮. প্রচলিত ছন্দ না থাকলেও এতে কোথাও কোথাও ছন্দের দোলা অন্তমিল বা অনুপ্রাস থাকতে পারে
১৯. গদ্যছন্দে যেহেতু নির্দিষ্ট যতি-বিভাজন নেই, সুতরাং আবৃত্তিকারকে সুচিন্তিতভাবে কবিতায় ভাব অনুযায়ী যতি-বিভাজন করতে হবে এবং কবিতার বক্তব্য যাতে অর্থবহ হয় সেদিকে তাকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে
২০. এ ছন্দের লয় নিজেকে ঠিক করে নিতে হয়

উদাহরণ:
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে।
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা এসে চলে গেল কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

মুক্তক ছন্দ
যে ছন্দে যতিকে পরিপূর্ণভাবে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করে ছেদ অনুযায়ী পর্ব গঠন করা হয়। যে ছন্দে বক্তব্যের প্রবহমানতা অটুট থাকে এবং প্রতি চরণের শেষে অন্তমিল থাকে সেই ছন্দকে মুক্তক ছন্দ বলে। অর্থ বিভাগভিত্তিক পঙক্তি সৃষ্টি করা হয়। মুক্তকে পর্বের দৈর্ঘ্য সমান থাকে না। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত তিন ছন্দেই মুক্তক রয়েছে। মুক্তকে অন্তমিলের পাশাপাশি অমিলও থাকতে পারে। যদি অন্তমিল থাকে তাহলে তাকে সমিল মুক্তক বলে আর অন্তমিল না থাকলে তাকে অমিল মুক্তক বলে। যেমন-
তুচ্ছ করি রাজ্য-ভাঙাগড়া, ১০
তুচ্ছ করি জীবন মৃত্যুর ওঠাপড়া, ১০+৪
যুগে যুগান্তরে ৬
কহিতেছে একস্বরে ৮
চিরবিরহীর বাণী নিয়া- ১০
‘ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া’ ৮+ ৬
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পয়ার
পয়ারে দুইটি চরণ এবং দুইটি চরণে দুইটি করে পর্ব থাকে। প্রথম পর্বে থাকে ৮ মাত্রা আর পরের পর্বে ৬ মাত্রা। মোট ১৪ মাত্রা মিলে চরণ গঠিত হয়। প্রতিটি চরণ শেষে ভাবের সামগ্রিক বা অংশিক পরিসমাপ্তি ঘটে। চরণ দুটোর শেষে পরস্পর মিল থাকার দরুন একে মিত্রাক্ষরও বলা হয়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পয়ারের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন :
আট-ছয় আট-ছয়
পয়ারের ছাঁদ কয়
প্রথম আট মাত্রার পরে অর্ধযতি এবং বাকি ছয় মাত্রার পরে পূর্ণ যতি পড়ে। যেমন:
আমাদের ছোট গাঁয়ে / ছোট ছোট ঘর ৮ + ৬
থাকি সেথা সবে মিলে / নাহি কেহ পর ৮ + ৬
– বন্দে আলী মিয়া
আসলে অক্ষরবৃত্তই আগে পয়ার নামে পরিচিত ছিল।

মহাপয়ার
পয়ারের সঙ্গে মাত্রাসংখ্যার তারতম্য ছাড়া আর কোনো তফাৎ নেই মহাপয়ারের। পয়ার যেখানে ৮+৬ মাত্রার পঙক্তি সেখানে মহাপয়ারের ৮+১০ মাত্রার পঙক্তি। অর্থাৎ পয়ারের দীর্ঘ মাত্রাবিন্যাসই মহাপয়ার। যেমন :
একথা জানিতে তুমি / ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান ৮+ ১০
কালস্রোতে ভেসে যায় / জীবন যৌবন ধন মান ৮+ ১০
– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সমিল প্রবহমান পয়ার
অমিত্রাক্ষর ছন্দে অন্তমিল যোগ করে দিলে একটা নতুন ধারা তৈরি হয়। এই নতুন ধারার ছন্দকে বলে সমিল প্রবহমান পয়ার। খুব সহজেই অনুমেয় অমিল প্রবহমান হলে অন্তমিল থাকবে না আর সমিল প্রবহমান হলে অন্তমিল থাকবে। এটাকে সমিল অমিত্রাক্ষর বলেও অভিহিত করা যায়। যেমন- 
আমারে করিয়া লহো তোমার বুকের, ৮+৬
তোমার বিপুল প্রাণ বিচিত্র সুখের ৮+৬
উৎস উঠিতেছে যেথা সে গোপন পুরে ৮+৬
আমারে লইয়া যাও-রাখিয়ো না দূরে ৮+৬
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ত্রিপদী ছন্দ
ত্রিপদীর প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব থাকে। সাধারণত প্রতি চরণের প্রথম দুই পর্বের মধ্যে অন্তমিল থাকে। এমনকি চরণ দু’টির শেষেও মিল থাকে। প্রাচীনকালে পর্বকে পদ বলা হতো এজন্যই এর নাম হয়েছে ত্রিপদী। যেমন:
শুধু বিঘে দুই / ছিল মোর ভুঁই
আর সবই গেছে ঋণে ৬+৬+৮
বাবু বলিলেন / বুঝেছো উপেন
এ জমি লইব কিনে ৬+৬+৮
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
[এখানে প্রথম চরণে ‘দুই’ আর ‘ভুঁইতে’ অন্তমিল এবং দ্বিতীয় চরণে ‘বলিলেন’ আর ‘উপেন’ এ অন্তমিল আবার দুই চরণের শেষে ‘ঋণে’ এবং ‘কিনে’ এর সঙ্গে অন্তমিল। সুতরাং সহজেই অনুমেয় এটা ত্রিপদী ছন্দ]

চৌপদী ছন্দ
এ ছন্দের প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব থাকে বলে একে চৌপদী বলা হয়। প্রত্যেক চরণের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে অন্তমিল থাকে। আবার দুই চরণের শেষেও অন্তমিল থাকে। দুই চরণে স্তবক গঠিত হয়। যেমন:
নীলাম্বরে কীবা কাজ, / তীরে ফেলে এসো আজ/
ঢেকে দিবে সব লাজ / সুনীল জলে/ ৮+৮+৮+৫
সোহাগ তরঙ্গরাশি / অঙ্গখানি দিবে গ্রাসী /
উচ্ছ্বসি পড়িবে আসি / উরসে গলে ৮+৮+৮+৫
[এখানে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব। প্রথম চরণে ‘কাজ’, ‘আজ’ এবং ‘লাজ’ এ অন্তমিল। একইভাবে দ্বিতীয় চরণে ‘তরঙ্গরাশি’, ‘গ্রাসী’, এবং ‘আসি’ এ অন্তমিল পরিলক্ষিত। আবার দুই চরণের শেষে ‘জলে’ এবং ‘গলে’ এর মধ্যেও অন্তমিল দেখা যাচ্ছে। সুতরাং এটা চৌপদী ছন্দের কবিতা]

একাবলী ছন্দ
প্রতি পঙক্তিতে এগারো মাত্রা থাকে। এবং প্রত্যেক পঙক্তিতে মাত্র দুটি পর্ব থাকে। পঙক্তিতে একটি পূর্ণ পর্ব এবং একটি অপূর্ণ পর্ব থাকে। একটি পূর্ণ পর্বে গঠিত হয় বলে এই ছন্দকে একাবলী নামকরণ করা হয়। কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম এই ছন্দের নাম দেন ‘একপদী ছন্দ’। ঐ একপদীই পরে একাবলী নাম ধারণ করে। পর্ব দু’টি ৬+৫ মাত্রায় বিন্যস্ত হয়। তবে এখন ৬+৬ মাত্রাবিন্যাসেও একাবলী রচিত হয়। একাবলীর মূল বৈশিষ্ট্যকে ধারণ না করলেও এগুলো একাবলীর ছাঁদে বিন্যস্ত। অপূর্ণপর্বকে এক সময় পূর্ণ পর্বের অন্তর্গত বলে মনে করা হতো। তবে ৬+৬ মাত্রার একাবলী তৈরি হওয়ায় সে ধারণা এখন ভুল হয়ে গেছে। যেমন-
১. দুগ্ধে গুড়ে তিলে মিশাইয়া লাউ ৬+৫
দধির সহিত খুদের জাউ ৬+৫
শুন প্রভু কিছু কহি অপর ৬+৫
চিঁড়া চাপাকলা দুধের সর ৬+৫
– মুকুন্দরাম

২. গতিচিহ্ন খানি ধরা অঙ্গে লেখা ৬+৬
কালের প্রবাহ তাই যায় দেখা ৬+৬
কত ভাঙে গড়ে স্রোতধারা তার ৬+৬
ভূমণ্ডলময় সংখ্যা করা ভার ৬+৬
-হেমচন্দ্র

মিশ্রছন্দ
যেসব কবিতায় একাধিক ছন্দ থাকে সেসব কবিতাকে মিশ্রছন্দের কবিতা বলা হয়। মাঝে মাঝে দেখা যায় একই ছন্দে কবিতার ভাব পরিসমাপ্তি করা যায় না তখন কবিরা ভিন্ন ছন্দের অবতারণা করেন। আবার অনেক সময় কবিরা কবিতার গতিবৈচিত্র্য বা বিষয়ের চমৎকারিত্বের জন্যও একই কবিতায় একাধিক ছন্দের ব্যবহার করেন। একই কবিতায় দুই বা তার বেশি ছন্দ ব্যবহার করলে তাকে মিশ্রছন্দ বলে।
যেমন:
পান বিনে ঠোঁট রাঙা
চোখ কালো ভোমরা
রূপশালি- ধান ভানা
রূপ দ্যাখো তোমরা।
পান সুপারি পান সুপারি
এইখানেতে শঙ্কা ভারি
পাঁচ পীরেরই শিন্নি মেনে
চলরে টেনে বৈঠা হেনে।
[এই স্তবক দুটি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘দূরের পাল্লা’ কবিতার। এখানে প্রথম চার পঙক্তির স্তবকটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এবং শেষ চার পঙক্তির স্তবকটি স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত]

কবিতায় ছন্দের বিশেষ রূপকল্প থাকলেও সেটা চক্ষুগ্রাহ্য নয় বরং শ্রুতিগ্রাহ্য। ছন্দ কানের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রবেশ করে পাঠক বা শ্রোতার অন্তরে ঝংকার সৃষ্টি করে তাকে বিমুগ্ধ করে তোলে। ছন্দ হচ্ছে বোধের এবং বিশেষত কানের বিষয় তাই একজন আবৃত্তিকারকে অবশ্যই সচেতন কান তৈরি করতে হবে। ছন্দ নিয়ে একদম ভীত হয়ে যাওয়ার দরকার নেই। তবে ছন্দ আপনাকে জানতেই হবে; এক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। আমাদের দেশে কিছু অতি আবেগী আবৃত্তিকার তৈরি হচ্ছে যারা ছন্দকে একেবারে অস্বীকার করতে চান। বিনয়ের সঙ্গে তাদের বলছি, যেখানে পুরো বিশ্বই ছন্দময় সেখানে আপনি ছন্দকে অস্বীকার করা মানে সত্য ও সুন্দরকে অস্বীকার করা।
সত্য ও সুন্দরকে বাদ দিয়ে আর যাই হোক শিল্প চর্চা হয় না। শিল্প হলো বিশুদ্ধ আঙিনা। এইসব অতি উৎসাহী আবৃত্তিকাররা প্রকাশ করে বেড়ায়- তারা শিল্পের শুদ্ধতা মানেন না। আমরা বলব যারা শিল্পের শুদ্ধতা মানেন না, তাদেরকে শিল্পী হিসেবে মানা যায় না। কারণ আপনাকে প্রথমে শিল্পের শুদ্ধতায় আসতে হবে তারপর আপনি শিল্পকে নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করবেন। ছন্দের ক্ষেত্রেও যদি বলি, আপনি যদি ছন্দই না জানেন তাহলে আপনি ছন্দকে ভাঙবেন কিভাবে?
ছন্দকে ভেঙে নিজের মতো করে গড়ার জন্য হলেও আপনাকে ছন্দ জানতে হবে। আপনি ছন্দের কবিতা আবৃত্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই গদ্য কবিতা আবৃত্তিতে সার্থকতা পাবেন। মাঝে-মধ্যে নিজের জীবনের সাথে মিল রাখা কিছু গদ্য কবিতা আপনার কণ্ঠে ভালো শোনালেও তা দীর্ঘদিন শ্রোতার মনে জায়গা করে নিতে পারবে না। তাই আমরা বলব একজন বিশুদ্ধ আবৃত্তিকারের জন্য ছন্দ শেখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ছন্দের ক্ষেত্রে সর্বশেষ যে কথাটি বলব তা হলো- কান আর কণ্ঠের মিলন না ঘটিয়ে ছন্দ শিখতে যাওয়া আর বর্ণনার মাধ্যমে সমুদ্রের স্বাদ উপভোগ করার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। তাই একজন আবৃত্তিকারকে সচেতন কান তৈরি করতে হবে।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply