আব্বা-আম্মা যাদের বেঁচে নেই -অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ আসসালাতু আসসালামু আলা রাসুলিল্লাহ-ওয়া আলা আলিহি অ-আসহাবিহি আজমায়িন।

সূরা বনি ইসরাইল ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- ইবাদত হবে শুধু আল্লাহর এবং পিতা-মাতার আনুগত্যে যেন তিল পরিমাণও ত্রুটি না হয়। “তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর আমার এবং তোমার পিতা-মাতার।” বিশেষ করে তাদের বার্ধক্যের সময় তাদের সাথে ভদ্রতাপূর্ণ আচরণ করা, কোনো বড় কথা মুখ দিয়ে বের না করা, এমনকি তাদের সামনে কোনো বিরক্তিসূচক কথা উচ্চারণ না করা, না এমন কোনো কাজ করা যা তারা খারাপ মনে করে, বেআদবির সাথে নিজের হাত তাদের দিকে না বাড়ানো, বরং আদব ও সম্মানের সাথে কথাবার্তা বলা, ভদ্রতার সাথে কথোপকথন করা, তারা যে কাজে সন্তুষ্ট থাকে সেই কাজ করা, তাদেরকে দুঃখ না দেয়া, তাদের সামনে বিনয় প্রকাশ করা, তাদের বার্ধক্যের সময় এবং মৃত্যুর পর তাদের জন্য দোয়া করা অবশ্য কর্তব্য। বিশেষ করে নিম্নরূপ দোয়া করতে হবে: “রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা”- হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।

তবে কাফির পিতা-মাতার জন্য দোয়া করতে মুমিনদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. একদা মিম্বরের উপর উঠে তিনবার আমিন বলেন। জিবরাইল (আ) এসে বলেন: “হে নবী সা.! ঐ ব্যক্তির নাক ধুলামলিন হোক, যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হয়, অথচ সে আপনার ওপর দরূদ পাঠ করে না। ঐ ব্যক্তির নাসিকা ধুলায় ধূসরিত হোক যার জীবনে রমযান মাস এলো এবং চলেও গেল, অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না। ঐ ব্যক্তিকেও আল্লাহ ধ্বংস করুন, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে পেল অথবা কোন একজনকে পেল, অথচ তাদের খিদমত করে জান্নাতে যেতে পারলো না; আমিন বলুন। আমি তখন আমিন বললাম।” মুসনাদে আহমদের হাদীসে রয়েছে: “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বা তাদের কোন একজনকে পেলো অথচ তাদের সেবা না করে জাহান্নামে চলে গেল, আল্লাহ তায়ালা তাকে স্বীয় রহমত হতে দূর করবেন।” (তাফসির ইবনে কাসীর)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে পরীক্ষার উদ্দেশ্যে একটা নির্দিষ্ট সময় দিয়ে তার ইবাদত করার জন্য দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। কারো পিতা-মাতা জীবিত রেখে, কারো পিতা-মাতা জীবিত না রেখে পরীক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর বিধান মেনে চলছে কি না তা দেখার জন্যই এসব কিছু করেন। আল্লাহ তায়ালা এর মাধ্যমে কাউকে পরীক্ষায় পাস করিয়ে আখেরাতে জান্নাতে নিতে চান, যারা পরীক্ষায় ফেল করবে তাদের দিয়ে জাহান্নাম পূরণ করবেন।

যেদিন মা-বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন সেদিন থেকে মনে হয় কী যেন হারিয়ে গেল, তখন বুকটা হাহাকার করে উঠে, চোখ থেকে অঝোরে বৃষ্টির মত পানি ঝরে, আল্লাহর রহমতই একমাত্র সান্ত¡না।
আব্বা-আম্মা বেঁচে থাকতে বুঝি নাই আম্মা আব্বা কি নিয়ামত। আব্বা আম্মাকে হারিয়ে এখন বুঝি কি নিয়ামত হারালাম। আগে এ রকম অনুভূতি হলে আব্বা আম্মার খেদমতটা হয়তোবা এত দুর্বল হতো না। এখন দোয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করে সান্ত¡না পাওয়ার চেষ্টা করছি। আব্বা-আম্মা যাদের বেঁচে আছেন, তারা সৌভাগ্যবান আর যাদের আব্বা-আম্মা বেঁচে নাই তারা বঞ্চিত।

রাসূলুল্লাহ সা.-এর বাণী ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’ যাদের আব্বা-আম্মা বেঁচে আছেন এখনই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে ‘বড় হব, চাকরি পাব তখন মা-বাপের খেদমত করব’। এমনও তো হতে পারে চাকরির বা টাকার সুযোগ পাবার আগেই বাপ-মা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। তখন খেদমতের জন্য হাহুতাশ করলেও কোনো লাভ হবে না। আব্বা-আম্মা যাদের বেঁচে আছে, তারা একটু সিরিয়াসলি চিন্তা করেন। আর যাদের আব্বা-আম্মা বেঁচে নাই তারা বিশেষভাবে নামাজ শেষে ও শেষ রাতে কিয়ামুল্লাইল এর সময় চোখের পানি ফেলে যাতে তাদের জন্য দোয়া করেন।
আব্বা আম্মাকে হারিয়ে এখন তাদেরকে খুব অনুভব করি। যাদের আব্বা আম্মা বেঁচে আছেন তারা বিষয়টি বুঝলে লিখাটা সার্থক হতে পারে। কুরআন হাদীস পাঠ করার সময়, ইসলামী আলাপ আলোচনার সময় সেই সমস্ত নেতৃবৃন্দ অভিভাবক, একান্ত কাছের মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে তাদের অবিস্মরণীয় সুন্দর সুন্দর কথা ও কাজগুলো। চিন্তা করলাম তাদের জীবনের এক ঝলক কথা ও কাজের দৃশ্যগুলো এক জায়গায় করি যাতে নুতন পাঠক-পাঠিকাগণ কিছু উপকৃত হতে পারেন। তাদের জন্য দোয়া করতে পারি ফলে তারাও উপকৃত হতে পারেন।

পৃথিবীতে মা কথাটি এত বেশি আকর্ষণীয় একবার শুনলে বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়। দুই রকমের অনুভূতি-এক ধরনের যাদের মা জীবিত আছে। আর এক ধরনের যাদের মা জীবিত নেই। আজকে যাদের মা জীবিত আছে এবং যাদের মা জীবিত নেই তাদের সম্পর্কে কয়েকটি কথা লেখার চেষ্টা করেছি। আমার মায়ের মৃত্যুর আগে বহু মানুষের মায়ের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করা দোয়া করা আলোচনা রাখা ইত্যাদি সুযোগ হয়েছিল। বাস্তবে মা মারা গেলে কি অনুভূতি হয় তা তখন জানা ছিল না।
প্রথমে আব্বা আম্মার কাছে থাকতাম, পরে আব্বার না ফেরার দেশে চলে যাবার পরে মায়ের ঠিকানায় গিয়ে উঠতাম, থাকতাম। মা চলে যাওয়ার পর ঠিকানাটাও আর থাকল না। আগে মা যে ছেলে বা মেয়ের বাসায় থাকতেন সেটাই হতো ঠিকানা, সেখানে গিয়েই উঠতাম। এখন মনে হচ্ছে যে ঠিকানাটুকু ছিল সে ঠিকানাটাও হারিয়ে গেল। এখন নিজেকে একজন পুরাপুরি ঠিকানাবিহীন মানুষ মনে হয়। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আকর্ষণ হারিয়ে গেল। এসব চিন্তা করে চলার গতি যেন মন্থর হয়ে যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে আল্লাহর ডাক কখন চলে আসে সে জন্য দ্রুত প্রস্তুতি নিতে হবে।

অনুপ্রেরণার উৎস ছিল আম্মা আব্বা। আব্বা আল্লাহর ডাকে আগেই সাড়া দিয়ে চলে গেছেন আর আম্মা চলে গেলেন গত ১১.১২.২০২০ তারিখ জুমাবার। বিশেষ করে যারা ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের অগ্রগামী সাহসী পতাকাবাহী সিপাহসালার, যাদের কাছ থেকে ইসলামী আন্দোলনের অনেক কিছু শিখতে পেরেছি, যারা ছিলেন অভিভাবক ও একান্ত আপনজন আজ তাদের শূন্যতা বারবার মনে পড়ছে। আর ভাবছি আমাকে বিদায় নিতে হবে এ পৃথিবী থেকে, এ পৃথিবীর সকল কিছু থেকে। কী অবস্থায় কবরে থাকব, সেখানে আমার কী হবে, ভবিষ্যতের ভয় ও আশার মাঝখানে চিন্তার সাগরে অবস্থান করছি।
আল্লাহ তার ১০০ ভাগ রহমতের মধ্যে ৯৯ ভাগ রহমত কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য রেখেছেন এ আশায় বুক বেঁধে আছি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে তার রহমত দিয়ে ধন্য করবেন। হাদীসটি হলো-হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, নবী সা. বলেন, আল্লাহর এক শ’ ভাগ রহমত আছে। তন্মধ্যে একভাগ তিনি জিন, ইনসান, চতুষ্পদ জন্তু ও কীট-পতঙ্গের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এ এক ভাগ রহমতের কারণেই সৃষ্ট জীব পরস্পর একে অপরের প্রতি দয়া করে এবং এ এক ভাগ রহমতের মাধ্যমে বন্যপশু নিজ সন্তানের প্রতি দয়া ও অনুকম্পা প্রদর্শন করে। মহান আল্লাহ তাঁর এক শ’ ভাগ রহমতের নিরানব্বই ভাগ নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। এর দ্বারা তিনি কিয়ামাতের দিন স্বীয় বান্দাদের প্রতি দয়া করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৬৮৬৭)
ভুল-ত্রুটি নিয়েই মানুষ। মানুষ মরে গেলে তার ভালো আমলগুলোর উল্লেখ করেই দোয়া করতে বলা হয়েছে। আমরা আল্লাহর কাছে তাদের সকল গুনাহখাতা মাফ এবং গুনাহ (সাইয়েয়াত) গুলোকে নেকি (হাসানা)তে পরিণত করে দেয়ার জন্য দোয়া করছি।

মানুষ ভুলে যায়। অনেক ঘটনাই জীবনে ঘটে, সব কথা সব সময় মনে থাকে না। কখনও কখনও মনে পড়ে যায়। স্মরণে চোখে পানি চলে আসে, দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করি। কুরআন হাদীস অধ্যয়ন করা, কুরআন মাজিদের সূরা মুখস্থ করা, আর লেখালেখির কাজের মধ্যে সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। এখানে সেইসব স্মৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যা মাঝে মাঝে বারবার মনে পড়ে। বিশেষ করে আম্মার কথাগুলো যেন ভোলা যায় না।
মাকে এখন লাশ বলতে হলো মা দীর্ঘদিন শয্যাগত থেকে ইন্তেকাল করলেন ১১.১২.২০২০ জুমাবার সালাতুল আসরের সময়- ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন-আল্লাহুম্মাগফির লাহু অরহামহু ওয়া সাব্বিতহু।
সারাটা জীবন মাকে মা বলে ডাকলাম এখন মা বলে আর ডাকতে পারবো না। মা যখন ইন্তেকাল করলেন তখন এত সম্মান শ্রদ্ধার মাকে গোসল করানোর জন্য বললাম মাকে গোসল করিয়ে দেন। সকলে বলছেন লাশকে গোসল করিয়ে দেন। আমি বলছি মাকে গোসল করিয়ে দেন। আমি চিন্তা করছি মা কে কি আর মা বলা যাবে না। সকলের মত আমাকেও কি মাকে মা না বলে লাশ বলতে হবে। মন যেন পরিবর্তন হতে চাচ্ছিল না। নবী সা. এর ‘বায়তুল হামদ’ কথার স্মরণ করে ফিরে আসলাম সবর করার বাস্তব জগতে। মা তো আল্লাহর মেহমান হয়ে গেছেন, আল্লাহর কাছে আশা করি দোয়া করি তিনি জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান হয়ে গেছেন।
‘তোমরা জমিনে আল্লাহর সাক্ষী’

হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবায়ে কিরাম একবার এক জানাজায় গেলেন। সেখানে তারা মৃতের প্রশংসা করতে লাগলেন। নবী সা. তা শুনে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এভাবে তারা আরেক জানাজায় গেলেন। সেখানে তারা তার বদনাম করতে লাগলেন। নবী সা. শুনে বললেন, ওয়াজিব হয়ে গেছে। এ কথা শুনে ওমর রা. জানতে চাইলেন কী ওয়াজিব হয়ে গেছে? হে আল্লাহর রাসূল সা.। তিনি সা. বললেন, তোমরা যে ব্যক্তির প্রশংসা করেছ, তার জন্য জান্নাত প্রাপ্তি ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর যার বদনাম করেছ, তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে গেছে। তারপর তিনি সা. বললেন, তোমরা জমিনে আল্লাহর সাক্ষী। (বুখারী, মুসলিম; অন্য আরেক বর্ণনার ভাষা হলো তিনি বলেছেন, মুমিন আল্লাহ তায়ালার সাক্ষী, বুখারী ১৩৬৭)
এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ায় মুমিনগণ আল্লাহ তায়ালার সাক্ষী। একজন মুমিন মৃত মুমিন ব্যক্তির ভালো গুণের আলোচনা করতে পারে। যারা দুনিয়া থেকে চলে যায়, তাদের কল্যাণের জন্য তাদের ভালো আমলগুলোর উল্লেখ করলে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ায় তার সাক্ষী হিসেবে কবুল করেন। এ হাদীস সামনে রেখেই কিছু কথা বলার চেষ্টা করছি, ওমা তাওফিকি ইল্লা বিল্লাহি আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া ইলাইহি উনিব। তার জন্য দোয়া ও তার জীবনী থেকে কিছু শিক্ষা নেয়ার জন্যই এ লেখার আয়োজন।

চিন্তা করি সান্ত¡না পাই
১. যে ব্যক্তির জীবনের শেষ কথা হবে: ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।
২. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে কোনো মুসলমান জুমার দিনে কিংবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা তাকে কবরের ফিতনা হতে নিরাপদ রাখেন। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি, বাইহাকি, মিশকাত)

মায়ের ব্যাপারে দু’টি বিষয়ে সান্ত¡না পাই- ১. মার মৃত্যু হয়েছে জুমা বারে আসরের ওয়াক্তে ও ২. জীবনের শেষ কথা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে পেরেছেন, আলহামদু লিল্লাহ, আমি নিজে মায়ের পাশে থেকে মাকে পড়াতে পেরেছি- ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- এটাই ছিল তার জীবনের শেষ কথা এরপর আর কথা বলতে পারেন নাই।

আল কুরআনে পিতা-মাতার জন্য দোয়া
আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারিমের বিভিন্ন জায়গায় পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, উত্তম আচরণ এবং দোয়া করার পদ্ধতি ও নির্দেশ প্রদান করেছেন। রাতের গভীরে অথবা দিনে যখনই মনে পড়ে মার জন্য আল্লাহর শিখানো দোয়া বলার চেষ্টা করি-
* ‘রব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা।’ অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন; যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৪)
* রাব্বানাগ ফিরলি ওয়ালে ওয়ালেদাইয়্যা ওয়া লিল মু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়া কুমুল হিসাব। ‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন।’’ (সূরা ইবরাহিম : ৪১)
* ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি জালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না।’ (সূরা নুহ : ২৮)
* সুলাইমান তার কথায় মৃদু হাসলো এবং বললো- “হে আমার রব! আমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, আমি যেন তোমার এ অনুগ্রহের শোকর আদায় করতে থাকি যা তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি করেছো এবং এমন সৎকাজ করি যা তুমি পছন্দ করো এবং নিজ অনুগ্রহে আমাকে তোমার সৎকর্মশীল বান্দাদের দলভুক্ত করো।” (সূরা নামল-১৯)
আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে। তার গর্ভধারণ ও দুধপান ছাড়ানোর সময় লাগে ত্রিশ মাস। অবশেষে যখন সে তার শক্তির পূর্ণতায় পৌঁছে এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে,
* ‘হে আমার রব, আমাকে সামর্থ্য দাও, তুমি আমার উপর ও আমার মাতা-পিতার উপর যে নিআমত দান করেছ, তোমার সে নিআমতের যেন আমি শোকর আদায় করতে পারি এবং আমি যেন সৎকর্ম করতে পারি, যা তুমি পছন্দ কর। আর আমার জন্য তুমি আমার বংশধরদের মধ্যে সংশোধন করে দাও। নিশ্চয় আমি তোমার কাছে তাওবা করলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা আহকাফ-১৫)
* হে আমার রব! তুমি আমাকে যে শক্তি ও যোগ্যতা দান করেছো তা এমন যে, যদি আমি সামান্য গাফিল হয়ে যাই তাহলে না জানি বন্দেগির সীমানা থেকে বের হয়ে আমি নিজের অহংকারে মত্ত হয়ে কোথা থেকে কোথায় চলে যাই। তাই হে আমার পরওয়ারদিগার! তুমি আমাকে নিয়ন্ত্রণে রাখো, যাতে আমি তোমার অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীতে পরিণত হতে পারি।
* আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,
* যারা তাঁদের পরে এসেছে তারা বলে ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ও আমাদের যে সকল ভাই পূর্বে ঈমান গ্রহণ করেছে তাদের ক্ষমা কর।’ (সূরা হাশর : ১০)
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে তাদের জীবিত মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন। আর মৃত মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার তাওফিক দান করুন। আল্লাহ তায়ালা তাঁদের জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন।

পিতা-মাতার জন্য হাদীস
১. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩টি আমল বন্ধ হয় না-
ক. সদকায়ে জারিয়াহ (এমন দান যা থেকে মানুষ অব্যাহতভাবে উপকৃত হয়ে থাকে)
খ. মানুষের উপকারে আসে এমন ইলম (বিদ্যা)
গ. সৎ সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম: ৪৩১০)
২. হাদীসে বলা হয়েছে, একবার নবী সা. বলেন, “তোমাদের কারো নিছক আমল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না।” বলা হলো, “আপনার বেলায়ও কি এ কথা খাটে? জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, আমিও নিছক আমার আমলের জোরে জান্নাতে প্রবেশ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে আমাকে ঢেকে নেবেন।”
৩. আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘মুমিনের ইন্তেকালের পর তার যে সকল সৎকর্ম তার কাছে পৌঁছে তা হলো, সে এমন কোন দান করে যাওয়া যা দ্বারা মানুষেরা তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর উপকার পেতে থাকে।’ (ইবনে মাজা, সহিহ)
৪. আবু উসাইদ আস-সায়েদী রা. কর্তৃক বর্ণিত যে, বনু সালামা গোত্রের এক ব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল : হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর এমন কোন কল্যাণমূলক কাজ আছে যা করলে পিতা-মাতার উপকার হবে? আল্লাহর রাসূল সা. উত্তর দিলেন : হ্যাঁ, আছে।

৫. আবু হুরাইরা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘মুমিনের ইন্তেকালের পর তার যে সকল সৎকর্ম তার কাছে পৌঁছে তা হলো, সে জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে যাওয়া যার প্রচার অব্যাহত থাকে, সৎ সন্তান রেখে যাওয়া, কুরআন শরীফ দান করে যাওয়া, মসজিদ নির্মাণ করে যাওয়া, মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করে যাওয়া, কোন খাল খনন করে প্রবহমান করে দেওয়া অথবা এমন কোন দান করে যাওয়া যা দ্বারা মানুষেরা তার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর উপকার পেতে থাকে।’ (ইবনে মাজা, হাদীসটি সহিহ)
৬. আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নেই সে হলো গরিব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরিব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমলনামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুনানে তিরমিযি : ২৪২৮)
৭. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সা.-কে জিজ্ঞেস করল যে, আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছেন, কোন কিছু দান করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয় যদি তিনি কথা বলতে পারতেন তবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিতেন। আমি যদি তার পক্ষে সদকা করি তাহলে তিনি কি তা দিয়ে উপকৃত হবেন? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন : হ্যাঁ। (বুখারী : ১৬৩১ ও মুসলিম ৩৫৯১)
৮. সাহাবি সা’দ বিন উবাদাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। কী ধরনের দান-সদকা তার জন্য বেশি উপকারী হবে? আল্লাহর রাসূল সা. বললেন: ‘পানির ব্যবস্থা কর’। অতঃপর তিনি (সা’দ) একটা পানির কূপ খনন করে তার মায়ের নামে (জনসাধারণের জন্য) উৎসর্গ করলেন। (নাসায়ী ও মুসনাদ আহমদ)
৯. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মৃত্যু বরণ করেছে। যদি আমি তার পক্ষে সদকাহ (দান) করি তাহলে এতে তার কোন উপকার হবে? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, হ্যাঁ। এরপর লোকটি বলল, আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি আমার একটি ফসলের ক্ষেত তার পক্ষ থেকে সদকাহ করে দিলাম। (নাসায়ী, ৩৫৯৫)
১০. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘‘যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ রোজা রাখবে’।’ (সহিহ বুখারী : ১৯৫২)
১১. আব্দুল্লাহ ইবনে দিনার রা. আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আব্দুল্লাহ রা.-এর এক বেদুঈনের সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রা.-এর মা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে দিনার রাহিমাহুল্লাহ বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে আব্দুল্লাহ রা. বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রা. এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভালো ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ।’’ (সহিহ মুসলিম : ৬৬৭৭)
১২. আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালোবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সুসম্পর্ক রাখে।’ (সহিহ ইবনে হিববান : ৪৩২)
মনে রাখতে হবে আখেরাতে কারো জান্নাতে প্রবেশ করা তার সৎকর্মের ভিত্তিতে হবে তবে চূড়ান্ত ফায়সালা আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করে।

মায়ের আদর ও স্নেহ
মা-শব্দের সাথে যে আদর, স্নেহ, ভালোবাসা জড়িয়ে আছে তা পৃথিবীর কোন মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। মা-বাবা অনেক কষ্ট করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন, অনেক সময় নিজে ভালো পোশাকও পরিধান করতে পারেননি কিন্তু সন্তানকে ভালো পোশাক পরিয়েছেন, কত সময় বসে থাকতেন সন্তানের অপেক্ষায়। সেই মা-বাবা যাদের চলে গিয়েছেন, তারাই বুঝেন মা বাবা কত বড় সম্পদ। মা বাবা হারিয়ে আজকে সে কথায় বারবার মনে পড়ছে। সাগরের জলোচ্ছ্বাসে মাকে হারানো এক ভাই মায়ের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন ‘প্রোগ্রাম শেষ করে গভীর রাতে বারান্দা থেকে সালাম বললেই মা দরজা খুলে দিতেন, নক করা লাগতো না। এখন বুঝতে পারি মা কী নিয়ামত ছিল হৃদয়ের কত গভীর থেকে সন্তানকে ভালোবাসতেন।

জান্নাতের ঘর বায়তুল হামদ
আম্মা মৃত্যুর পরে অনুভব করলাম মা মারা গেলে সন্তানদের কী অবস্থা হয়। অঝোরে চোখের পানি ঝরে, কান্না থামানো কত কষ্ট হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যাদের কোন সন্তান মারা যায় তারা যদি সবর করতে পারে এবং আল্লাহর প্রশংসা করে তাহলে আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতে ঘর তৈরি করেন যার নাম রাখা হয় বায়তুল হামদ বা প্রশংসার ঘর।’ আমাদের সকলকে জান্নাতের প্রশংসার ঘর বায়তুল হামদ পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। এত কষ্ট করে আমাদেরকে যে মা-বাবা লালন পালন করেছেন তাদের জন্য আমাদের অবশ্যই অনেক কিছুই করার আছে।
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত মা-বাবার জন্য কী করণীয় তার অল্প কিছু এখানে উল্লেখ করা হলো:
১. ঋণ পরিশোধ করা
২. মা-বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করা
৩. কাফফারা আদায় করা
৪. মান্নত পূরণ করা
৫. মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া ও দোয়া প্রার্থনা করা।
৬. মা-বাবার কৃত ওয়াদা পূর্ণ করা।
৭. মা-বাবার পক্ষ থেকে অনাদায়ী সিয়াম পালন।
৮. মা-বাবার পক্ষ থেকে অনাদায়ী হজ্জ করা।
৯. মা-বাবার পক্ষ থেকে অনাদায়ী উমরাহ করা।
১০. মা-বাবার আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখা
১১. মা-বাবার বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা।
১২. মা-বাবার জন্য দান খয়রাত করা
১৩. মা-বাবার পক্ষ থেকে কোরবানি করা
১৪. জ্ঞান শিক্ষা প্রচার অব্যাহত রাখা
১৫. সৎ সন্তান রেখে যাওয়া
১৬. কুরআন দান করে যাওয়া,
১৭. মসজিদ নির্মাণ করে যাওয়া,
১৮. মুসাফিরদের জন্য সরাইখানা নির্মাণ করে যাওয়া,
১৯. খাল খনন করে প্রবহমান করে দেওয়া
২০. মা-বাবার ভালো কাজসমূহ জারি রাখা
২১. কোনো গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা
২২. কবর জিয়ারত করা
সময় থাকতেই আমাদের সকলকে সতর্ক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সুবহানাকা আল্লাহুম্মা অবিহামদিকা আসহাদু আন ল্ াইলাহা আনতা আসতাগফিরুকা অআতুবু ইলাইকা
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply