আমরা কাগজ-কলমেই শুধু মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ করে রেখেছি

মেজর জেনারেল অব: সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বীরপ্রতীক

ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ৪০তম বর্ষপূর্তিতে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার অনুভুতি ব্যক্ত করুন?
মে. জে. ইব্রাহীম :  ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদের মতো আমিও এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারতাম। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাকে যে হায়াত দিয়ে রেখেছেন এবং চল্লিশ বছর বাংলাদেশকে দেখালেন তার জন্য শুকরিয়া। প্রথম অনুভূতি হলো মুক্তিযোদ্ধাগণ বিগত চল্লিশটি বছরে সামগ্রিকভাবে অতি উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হননি, এটা দুঃখের অনুভূতি। দ্বিতীয় অনুভূতি হলো যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন তাদের থেকেও বেশি দাম হয়ে গেছে, ক্ষমতাবান হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে নিজেদের দাবি করে। আমরা যারা যুদ্ধ করেছিলাম আমরাই ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদেরকে ঘিরেই মূল শক্তিটি আবর্তিত হবার কথা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই শক্তিটি অর্জিত হয়েছে এবং রাজনৈতিক নেতৃবর্গের কাছে  বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তারা ঘটনাক্রমে যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্ব প্রদানকারী দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল অথবা তাদের বংশধর।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কী কী অর্জন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন ?
মে. জে. ইব্রাহীম : একটি দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর চল্লিশটি বছর যদি এগিয়ে যায় তাহলে কিছু কিছু অর্জন হতে বাধ্য। যেমন গতানুগতিকভাবে হয় সেগুলো হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’টি বছর বাদ দিলে গত বিশটি বছর আমরা যে চধৎষরধসবহঃধৎু ফবসড়পৎধপু বা সংসদীয় গণতন্ত্র ঢ়ৎধপঃরপব করতে পারছি এটা একটি অর্জন। দ্বিতীয় অর্জন হলো আমরা কয়েকটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হতে পেরেছি বিশেষ করে জাতিসংঘ, ঙৎমধহরুধঃরড়হ ড়ভ ওংষধসরপ ঈড়হভবৎবহপব (ঙওঈ), ব্রিটিশ কমনওয়েলথ। তৃতীয় অর্জন হলো বাংলাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে। চতুর্থ অর্জন হলো পূর্ব পাকিস্তানে থাকার সময় আমাদের যে মৃত্যুর হার ছিল বিশেষ করে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার সেটা কমেছে। আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। পঞ্চম অর্জন হল শিক্ষা দীক্ষা সব কিছুতেই বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে এই মর্মে যে, যদি আমরা পাকিস্তানে থাকতাম তাহলে হয়ত এত দূর অগ্রগতি সম্ভব হতো না।
ছাত্র সংবাদ  স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের মৌলিক অধিকারসহ আমরা স্বাধীনতার সুফল কতটুকু পাচ্ছি ?
মে. জে. ইব্রাহীম : স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের মৌলিক অধিকারসহ স্বাধীনতার সুফল পাচ্ছি না। এর মূল কারণ হলো যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে তারা স্বাধীনতার সুফল প্রাপ্তির অর্জনের পথে একটি বাধা। মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি বৃদ্ধি করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কমাতে হবে। প্রত্যেক ধর্মের মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। মানবতাবোধ লালন করতে হবে। যেটা আমরা পারছি না। আমরা কাগজ কলমেই শুধু মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ করে রেখেছি।
ছাত্র সংবাদ  “স্বাধীনতার চেতনা ঐক্যের বিভক্তির নয় ” এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
মে. জে. ইব্রাহীম : স্বাধীনতার চেতনা ঐক্যের, বিভক্তির নয় এটি একটি নির্ঘাত সত্যি কথা। যদি আমাদের মধ্যে ঐক্য না থাকত তাহলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমরা দেশকে স্বাধীন করতে পারতাম না।
একটি মাত্র রাজনৈতিক দল স্বাধীনতার বিরোধতা করেছিল, আমাদের যে ঐক্যের চেতনা ঐক্যের শক্তি সেটা এখন আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে নেই। সবচেয়ে বেশি অনৈক্য সৃষ্টি করছে তারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং বর্তমানে দেশ শাসন করছে।
ছাত্র সংবাদ : দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোন বিষয়গুলোকে আপনি প্রতিবন্ধক মনে করছেন?
মে. জে. ইব্রাহীম : একটি হচ্ছে রাজনৈতিক নেতৃবর্গের কাছে আমাদের প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কিত মৌলিক কতগুলো শিল্প আমরা জন্ম দিতে পারিনি এবং আমাদের যে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছিল সেগুলোর আমরা সঠিকভাবে লালন করতে পারিনি। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর প্রয়োজন হয়। আমাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী ভালোয় ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের  ফেব্রুয়ারি মাসের ২৫-২৬ তারিখে এমন একটি আঘাত পেয়েছে যে আঘাতটি সেরে উঠতে এবং নতুনভাবে দাঁড়াতে অনেক সময় লাগবে। দেশ রক্ষা করার জন্য যে ঐক্য, দেশপ্রেম  ও ঈমানি চেতনার প্রয়োজন সেই চেতনা সকল নাগরিকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয়, সেই রকম কোনো উদ্যোগ আমাদের দেশে লক্ষ্য করছি না।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের রাজনীতিবিদদের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?
মে. জে. ইব্রাহীম :  আমরা সকল রাজনীতিবিদগণকে সবার আগে দেশকে ভালোবাসতে হবে, তারপর নিজের দল এবং অন্য কিছুকে ভালোবাসতে হবে। দেশকে ভালোবাসতে গিয়ে যদি কোনো কারণে নিজের এবং দলের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় দিতে হয় তা দিতে হবে। জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম এগুলো চিন্তার বিষয় কাজ করে দেখাতে হয়, এগুলো মুখে মুখে বললে হবে না। হয়ত আমার যে চিন্তা চেতনা এটা সকলের মধ্যে নাও থাকতে পারে।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা ও দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তরুন ছাত্র ও যুব সমাজের কাছ থেকে আপনি কেমন ভূমিকা প্রত্যাশা করেন ?
মে. জে. ইব্রাহীম : আমি নিজেকে মনে করি একজন তরুণবান্ধব প্রবীণ। আমি নিজেকে সবসময় তরুণদের দিকে নিয়োজিত রাখি।
আমি মনে করি, আমার তারুণ্যের সময় আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন যারা তরুণ তাদের দায়িত্ব বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য পরিশ্রম করা, পরিবেশ গড়া এবং নিজের লেখাপড়া সঠিকভাবে করা। তারুণ্যের কাছে আমার তিনটি আশাÑ (ক) সমগ্র বাংলাদেশকে কোনো একপেশে ও একদলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন না।
(খ) বাংলাদেশের গত চল্লিশ বছরের ঘটনাবলিকে ’৭২ থেকে আজ পর্যন্ত সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করবেন।
(গ) আপনারা নিজেরা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চেষ্টা করবেন এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতি মনোযোগী হবেন। তারুণ্যের আশাআকাক্সক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, এমন ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্ক রাখতে ও তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে সচেষ্ট থাকবেন।
ছাত্র সংবাদ : একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের সমৃদ্ধি আনয়নে আপনার পরামর্শ কী?
মে. জে. ইব্রাহীম : পরামর্শ হলো আমাদের বড় বড় উচ্চাভিলাষী পরিকল্পানা বাদ দিতে হবে। মানুষের যে কষ্ট, বিশেষ করে অর্থনৈতিক যে কষ্ট সেটা কমানোর চেষ্টা করতে হবে এবং সর্বোপরি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য দেশকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমাদের প্রতিবেশী দেশের তুলনায় আমরা বেশি দুর্বল সে জন্য আমাদের আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে।

SHARE

Leave a Reply