আমরা শহীদি দরজা চাই -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

আমাদের জীবনটা ক্ষুদ্র। ক্ষুদ্র এই জীবনে আমাদের অনেক চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষতে হয়। অনেক স্বপ্ন পূরণের আকাক্সক্ষা আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে। আমাদের ছোট্ট এই জীবনসংসারকে মনের মত সাজানোর জন্য, চাহিদা অনুযায়ী উপভোগ করার জন্য প্রতিনিয়ত আমরা কাজ করছি, পরিশ্রম করছি, ঘাম ঝরাচ্ছি এমনকি লড়াই সংগ্রামেও অবতীর্র্ণ হচ্ছি। সেই লড়াই সংগ্রামে দেহ থেকে রক্ত ঝরাতেও আমরা পিছপা হচ্ছি না। কখনো জীবনকেও তুচ্ছ মনে করছি। আমাদের চাহিদা, প্রত্যাশা পূরণের আকাক্সক্ষা অসীম। এটি পূরণ হচ্ছে খুবই কম। চাহিদার তুলনায় আকাক্সিক্ষত বিষয়ের ব্যাপক অপ্রতুলতায় আমরাই প্রতিনিয়ত আমাদেরকে লড়াই-সংগ্রামে ঠেলে দিচ্ছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনের পরোয়া না করেই আকাক্সিক্ষত বিষয় অর্জনে সংগ্রাম করে যাচ্ছি নিরন্তর। এই যে আমাদের লড়াই-সংগ্রাম, কিংবা রক্ত-ঘাম ঝরানো, তা শুধুমাত্র এজন্যই যে আমি আমার জীবনটাকে সুন্দর করে সাজাবো বলে। জীবনসংসার নামক বিষয়টিকে উপভোগ করবো বলে। কিন্তু আমি যদি আমার এই জীবনের দিকে তাকাই তাহলে আমি দেখবো আমার এ জীবনটি ক্ষণিকের, ক্ষুদ্র একটি সময়ের জন্য। আমাকে যেকোনো সময় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। এটি আমার ইচ্ছার অধীন নয়। কারণ মহাগ্রন্থ আল কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- “প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেতে হবে।” (সূরা আম্বিয়া : ৩৫)
মৃত্যুর স্বাদ যখন সবারই জন্য বরাদ্দ তখন অনেকে সেটিকে হিসেবে না নিয়ে অনেকভাবে স্বপ্ন বুনতে থাকেন। সেই স্বপ্নকে লালন করতে থাকেন। মানুষের একটি চাহিদা পূরণ হতে না হতেই তার মাঝে আরো অনেক চাহিদা স্বপ্ন আকারে ভিড় করে। কিন্তু মৃত্যু যখন মানুষকে আলিঙ্গন করে তখন সেই স্বপ্নের আর হিসাবে থাকে না। অথচ মানুষ নতুন চাহিদার বিষয়ে স্বপ্ন বুনার আগে মৃত্যুর কথাটি একবারও ভেবে দেখে না। আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি একদিন ক্লাসের ফাঁকে আমাদের সবাইকে জানালা দিয়ে বাইরের একটি নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাতে বললেন। আমরা সবাই তাকালাম। তবে বিল্ডিংটিকে পুরোপুরি নির্মাণাধীন বললে ভুল হবে। চতুর্থ তলা পর্যন্ত কাজ করে উপরে অর্ধেক করে আরো অনেকগুলো পিলার তুলে রাখা। আমরা স্যারকে বললাম, স্যার আপনি এই সাড়ে চারতলা বিল্ডিংটি দেখিয়ে আমাদের কী বুঝাতে চাইছেন। স্যার জবাবে বললেন, মানুষের চাহিদা, স্বপ্ন আর মৃত্যু এই তিনটি বিষয়। স্যার বললেন, সামর্থ্য অনুযায়ী বিল্ডিংটির মালিক চারতলা পর্যন্ত তার বিল্ডিংটি তুলে চাহিদার প্রাথমিকটা পূরণ করেছেন। কিন্তু তার স্বপ্ন আরো বেশি তাই তিনি চারতলার উপরেও পিলার অর্ধেক করে তুলে রেখেছেন সুযোগ পেলে এটিকে আরো উপরের দিকে তুলবেন। কিন্তু তিনি এই স্বপ্ন পূরণ পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন কি থাকবেন না তা হিসেবে নিয়েছেন কিনা জানি না। ‘আসলে মানুষের জীবন এমনই’ কথাটি যোগ করে স্যার আরো বললেন, মৃত্যুর সময় কখন যে এসে যায় মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না। সত্যিই মৃত্যু মানুষের জন্য অবধারিত।
এই যে আমাদের বিশাল চাওয়া-পাওয়া, চাহিদা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, এমনকি আমাদের লড়াই সংগ্রাম এই সব কিছুকে যে মৃত্যু স্তব্ধ করে দেয় সেই মৃত্যু নিয়ে কি আমরা কখনো ভেবেছি? আমরা বাড়ি করছি, গাড়ি করছি, আমাদের জীবন সংসার সাজাচ্ছি। দুনিয়াকে রঙিনভাবে উপভোগ করার আয়োজন করছি। অথচ যে মৃত্যু মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের এতোসব আয়োজনকে চুরমার করে দেবে, ধ্বংস করে দেবে সেই মৃত্যুকে নিয়ে অবশ্যই আমাদের ভাবা প্রয়োজন। মৃত্যু নিয়ে ভাবে না শুধু তারাই যারা গাফেল। তারাই শুধু মৃত্যুর পরের জীবনকে বিশ্বাস করেন না। তারা মনে করেন মৃত্যুর মাধ্যমেই সব শেষ। বিশ্বকবি আল্লামা ইকবাল (রহ) বলেছেন, গাফেল মনে করছে মৃত্যুর মাধ্যমেই বুঝি জীবনের অবসান ঘটে, অথচ এ মৃত্যু অনন্ত জীবনের সূচনা। ক্ষুদ্র সময়ে নগণ্য একটি জীবনের জন্য যদি আমরা বিভিন্ন স্বপ্ন বুনতে পারি। ছোট্ট এই জীবনসংসার সাজানোর জন্য যদি আমরা লড়াই করতে পারি তাহলে একটি অনন্ত জীবনের জন্য সে রকম আয়োজন কেন আমরা করেতে পারি না?
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে অসংখ্য স্থানে মৃত্যু অবধারিত বলা হয়েছে। মৃত্যু এমন এক পরিণতি যা থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ কারোই নেই। কেউ যদি সীসাঢালা প্রাচীরে আশ্রয় গ্রহণ করে মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে তবুও মৃত্যু তাকে আলিঙ্গন করবেই। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “আর মৃত্যু, সে তোমরা যেখানেই থাকো না কেন সেখানে তোমাদের নাগাল পাবেই, তোমরা কোনো সীসাঢালা প্রাচীরের ভেতর অবস্থান করলেও।” (সূরা নিসা : ৭৮) সীসাঢালা প্রাচীরের ভেতর আশ্রয় নিয়ে যেমন মৃত্যু থেকে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই তেমনি সুযোগ নেই অন্য কোথাও পালিয়ে যাওয়ার। আল কুরআনের অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তাদের বলো, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাচ্ছো তা তোমাদের আলিঙ্গন করবেই, তারপর তোমাদেরকে সেই সত্তার সামনে পেশ করা হবে যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন। তখন তিনি তোমাদের জানিয়ে দেবেন যা তোমরা করেছিলে।” (সূরা জুমআ : ৮) কেউ যদি ভাবতে থাকে এত লড়াই সংগ্রাম করছি যা পাওয়ার জন্য তা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করি কিভাবে? তিনি যদি তার স্বপ্ন পূরণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করে মৃত্যু থেকে বেঁচে থাকতে চান কিংবা কেউ যদি তাড়াতাড়ি মৃত্যু কামনা করে থাকেন তবে উভয়েই বোকার স্বর্গ বাস করছেন। কারণ মহান রাজাধিরাজ আল্লাহর সিদ্ধান্ত ছাড়া কখনও মৃত্যু আসবে না। মৃত্যু আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নির্ধারিত সময়ের একটু আগেও যেমন মৃত্যু আসবে না; ঠিক তেমনি মৃত্যুর সময় যখন হয়ে যাবে তখন এক মুহূর্তকালও বিলম্ব করা হবে না। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, “প্রত্যেক জাতির জন্যই (তার উত্থান-পতনের) একটি নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। তারপর যখন সময় পূর্ণ হয়ে যাবে তখন এক মুহূর্তকালের জন্যও তাকে বিলম্বিত করা হবে না।” (সূরা আরাফ : ৩৪)
প্রতিনিয়ত চলতে ফিরতে আমরা কতই না মৃত্যুর সংবাদ পাই। কতভাবেই না মানুষ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। আমাদের মাঝে অনেকেই আছেন যারা চাক্ষুষ মৃত্যুর ঘটনা দেখেছেন। আমাদের কত আপনজনের দুনিয়া থেকে বিদায় আমরা দেখেছি। কেউ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ দুর্ঘটনায়, কেউ অসুখ-বিসুখে, কিংবা কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন ঘুমন্ত অবস্থায়। আমাদের মাঝ থেকে যারা মৃত্যুর স্বাদ নিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন সেই মৃত্যুর স্বাদ আমাকেও গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু যখন আমাদের জন্য অবধারিত তখন আমাদের এই মৃত্যু কিভাবে আসবে আমরা জানি না। কিন্তু একটি ভালো মৃত্যুর প্রত্যাশা আমাদের সবারই করা উচিত। কারণ মৃত্যুর পরের জীবন হলো অনন্ত জীবন যার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। মৃত্যুর পরের আবাসস্থলই আমাদের জন্য চিরস্থায়ী।
রোড অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যু, হাসপাতালে মৃত্যু, সামান্য দুর্ঘটনায় মৃত্যু কিংবা জিল্লতির মৃত্যুসহ অনেকভাবেই মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। কিন্তু এই সকল মৃত্যুর চেয়ে হাজার হাজার গুণে শ্রেষ্ঠ মৃত্যু হলো শহীদি মৃত্যু। যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে গিয়ে শহীদ হন তাদের শাহাদাতের মর্যাদা এতো বেশি যে মহান আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে অকল্পনীয় উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান দান করেন। শাহাদাতের এই দরজা নবুয়তের দরজার চেয়ে বড় না হলেও শহীদ হওয়ার জন্য স্বয়ং রাসূল (সা)ও তীব্র আকাক্সক্ষা পোষণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেছেন, আমি নবী (সা)-কে বলতে শুনেছি, সেই পবিত্র সত্তার শপথ করে বলছি, যার মুঠির মধ্যে আমার প্রাণ! যদি কিছু সংখ্যক মুসলমান এমন না হতো যারা আমার সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ না করাকে আদৌ পছন্দ করবে না এবং যাদের সবাইকে আমি সাওয়ারি জন্তুও সরবরাহ করতে পারবো না (অর্থাৎ যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করতে চাইবে, তাদের সবাইকে) বলে আশঙ্কাও হতো, তাহলে আল্লাহর পথে যুদ্ধরত কোন ক্ষুদ্র সেনাদল থেকেও আমি দূরে থাকতাম না। যার হাতে আমার প্রাণ! সেই মহান সত্তার শপথ করে বলছি, আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় হচ্ছে, আমি আল্লাহর পথে নিহত হয়ে যাই অতঃপর জীবন লাভ করি এবং আবার নিহত হই, তারপর আবার জীবন লাভ করি এবং আবার নিহত হই, তারপরও পুনরায় জীবন লাভ করি এবং পুনরায় নিহত হই। (বুখারি)
মৃত্যুর মাধ্যমে দুনিয়ার জীবন থেকে শহীদরা বিদায় নিলেও তারা জীবিত থাকেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের মৃত বলো না, প্রকৃত পক্ষে তারা জীবিত। কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমরা অনুভব করতে পারো না।” (সূরা আল বাকারা : ১৫৪) এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, “তাদের প্রাণ সবুজ পাখির মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে তাদের আবাস। ভ্রমণ করে বেড়ায় তারা গোটা জান্নাত, অতঃপর ফিরে আসে আবার নিজ নিজ আবাসে।” (মুসলিম, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ) মহান আল্লাহ শহীদদের জন্য অসংখ্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। শহীদদের জন্য নির্ধারিত ক্ষমা, মর্যাদা ও বিরাট পুরস্কারের কথা শুনে কার না ঈর্ষা হবে? রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহর নিকট শহীদদের জন্য ছয়টি পুরস্কার রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে : ১) প্রথম রক্তবিন্দু ঝরতেই শহীদদেরকে মাফ করে দেয়া হয় এবং জান্নাত তাদের যে আবাসস্থল তা চাক্ষুষ দেখানো হয়। ২) তাদের কবরের আজাব থেকে রেহাই দেয়া হয়। ৩) শহীদরা ভয়ানক আতঙ্ক থেকে নিরাপদ থাকে। ৪) তাদের সম্মানের টুপি পরিয়ে দেয়া হবে, যার এক একটি ‘ইয়াকুত’ পৃথিবী এবং পৃথিবীর মধ্যে যা কিছু আছে তা থেকেও উত্তম। ৫) তাদের উপঢৌকন স্বরূপ আয়ত নয়না হুর প্রদান করা হবে এবং ৬) তাদের সত্তর জন আত্মীয়স্বজনের জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করা হবে। (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মেকদাম ইবনে মা’দিকরব)
আল্লাহর পথে যারা শহীদ হয় তাদের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হচ্ছে মহান আল্লাহর দিদার তথা সাক্ষাৎ লাভ করা। কুরআন মজিদে বলা হয়েছে কোনো দৃষ্টিই আল্লাহর দর্শন লাভ করতে সক্ষম নয়। কোনো নবীও আল্লাহকে দেখতে পাননি কিন্তু শহীদরা মৃত্যুর পর পরই আল্লাহর দিদার লাভ করেন। ওহুদ যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম শাহাদাত লাভ করেন। যুদ্ধের পর রাসূলে করীম (সা) শহীদের পুত্র প্রখ্যাত সাহাবী হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন, “হে জাবির, আমি কি তোমাকে তোমার পিতার সঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সাক্ষাতের সুসংবাদ দেব না?” জাবির বললেন, অবশ্যই দিন হে আল্লাহর রাসূল। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ্ কখনো আড়ালবিহীন মুখোমুখি কথা বলেননি। তিনি বলেন, “হে আমার গোলাম তোমার যা খুশি আমার নিকট চাও। আমি তোমায় দান করবো।” তিনি জবাবে বলেছেন, “হে আমার মনিব! আমাকে জীবিত করে আবার পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিন আবার আপনার পথে শহীদ হয়ে আসি।” তখন আল্লাহ তাকে বলেন, “আমার এ ফয়সালা তো পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছি যে মৃত লোকেরা ফিরে যাবে না।” তখন তোমার পিতা আরজ করেন, “আমার মনিব! তবে অন্তত আমাকে যে সম্মান ও মর্যাদা আপনি দান করেছেন তার সুসংবাদ পৃথিবীবাসীদের জানিয়ে দিন।” তখন আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াতটি নাজিল করেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত।” (জামে আত্-তিরমিজি ও সুনানে নাসায়ী) মৃত্যুতো মানুষের কতভাবেই আসে। কিন্তু শহীদি মৃত্যুর ক্ষেত্রে যে সম্মান এবং মর্যাদার কথা উপরোক্ত লিখনিতে তুলে ধরেছি তা খুবই সামান্য। শহীদি মৃত্যুর যখন এতো মর্যাদা তখন আমাদের সবারই উচিত শহীদি মৃত্যুর প্রত্যাশা করা। বিড়ালের মত হাজার বছর বেঁচে থাকার চেয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে শহীদি মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করাই অনেক সম্মানের, অনেক গৌরবের। একজন ব্যক্তির জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ পাওনা হলো শহীদি মৃত্যু।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন মোড়সহ সারাদেশব্যাপী আওয়ামী এবং বাম শক্তিদের যেই নারকীয় তাণ্ডব চলেছিলো এটি দেশবাসীসহ সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিলো। সেই দিনও শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এবং আন্দোলনকে রক্ষা করেছিলো। শাহাদাতের তামান্না ছিলো বলেই অল্প সংখ্যক আন্দোলনের কর্মী বিশাল বাহিনীকে সেদিন পরাভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেদিন জীবনের মায়ার চাইতে শাহাদাতের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে শাহাদাতকে আলিঙ্গন করার অনুপ্রেরণাই তাদেরকে এই বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজেদেরকে দেয়ালসম অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। সেই দিনে তাদের সে শাহাদাতের নজরানা পেশ আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার এবং আমাদের জন্য অনুপম শিক্ষার।
২৮ অক্টোবরের ঘটনা আমাদেরকে ইসলামী সঙ্গীতের সেই লাইনটি স্মরণ করিয়ে দেয় “যেই জীবন শাহাদাতে উজ্জীবিত, সেই জীবন বাধা মানে না”। ২৮ অক্টোবরে মেধাবী ছাত্রদের শাহাদাতের এই ঘটনা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শিক্ষা দিবে। অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগাবে।
শাহাদাতের মিছিল চলছে অবিরত। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে এই মিছিলে শামিল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্তে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মতিউর রহমান আকন্দ ভাই সাক্ষাৎ করতে গেলে বলেন, ‘আমি ফাঁসি নিয়ে ভীত নই। আমার অনেক বন্ধুরা ১০-১২ বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। আর আমি যে ১০ থেকে ১২ বছর বেশি বেঁচে আছি এটা আমার জন্য বোনাস লাইফ। এই মুহূর্তে যদি শাহাদাতের মৃত্যু আমি অর্জন করি তাহলে এটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্য এবং আমি এই শাহাদাতের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি’। অধ্যাপক গোলাম আযমকে কারাগারে বন্দি রেখে বৃদ্ধ অবস্থায় তিলে তিলে হত্যা করা হয়েছে। এটিও একটি শাহাদাত। তিনি শাহাদাতের নজরানা পেশ করার পূর্বে জীবদ্দশায় বহুবার প্রকাশ্যেই বিভিন্ন সমাবেশে শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করেছেন। পল্টন ময়দানে জামায়াতের সর্বশেষ রুকন সম্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আযম দোয়া করার সময় আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে শাহাদাতের তামান্না পেশ করেছেন। তিনি জীবদ্দশায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত নই। আর আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করা তো জায়েজই নাই।’ শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফাঁসির দণ্ডে ভীত নয় জানিয়ে বলেছিলেন, ফাঁসিকে ভয় পেলেতো ইসলামী আন্দোলনেই সম্পৃক্ত হতাম না। শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে প্রাণদণ্ড দিয়ে বলা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে। তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, শহীদ হওয়ার বাসনা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। আজ আমার চির আকাক্সিক্ষত সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাকে যখন মিথ্যা অজুহাতে শুধুমাত্র আল্লাহর পথের সৈনিক হওয়ার অপরাধে (!) ফাঁসির দন্ড দেয়া হলো তখন তিনি বলেছিলেন, আমি যদি মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হই, সেটাই হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাওনা। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শহীদ করার আগে পরিবারের সাথে শেষ সাক্ষাতের পুরো সময়টাতে শহীদ মীর কাসেম আলী ভাই ছিলেন প্রাঞ্জল, হাসিখুশি ও স্বাভাবিক। হাসিমুখে হাত নেড়ে পরিবারের সদস্যদের বিদায় জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় তিনি বিচলিতও নন। এই মৃত্যু শহীদি মৃত্যু। এটি সবার ভাগ্যে জোটে না। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, শহীদ মীর কাসেম আলীরা যেভাবে প্রাণভিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে শহীদি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন এবং ২৮ অক্টোবরে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন নিশ্চয় তারা জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন। আর প্রতিদানস্বরূপ নিশ্চয় তারা মহান আল্লাহর দিদার লাভ করবেন সেই দোয়াই করি মহান রবের কাছে। তারা দাসের জিন্দেগিকে পছন্দ করেননি, কিংবা কখনো মৃত্যু ভয়েও ভীত হননি। বরং তাদের স্বপ্নজুড়ে ছিল শহীদি দরজা লাভের তীব্র আকাক্সক্ষা, তাদের সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে বিনীত নিবেদন, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরও শহীদি দরজা লাভের সৌভাগ্য দাও। আমরা তাদের মতো হতে চাই না যারা মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের “এক আল্লাহ জিন্দাবাদ” কবিতার দু’টি লাইন স্মরণ হয়-
“উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই,
নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই।”
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply