আমাদের ঈদও এখন বেদনাবিধুর -আলী আহমাদ মাবরুর

প্রতিটি পরিবারের কাঠামো ও প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন। তাদের আয়োজন এবং উদযাপনের মধ্যেও ভিন্নতা থাকে। ছোটবেলা থেকে আমাদের বাসায় যেই ধরনের ঈদ দেখে আসছি, তা অনেকটাই আব্বাকেন্দ্রিক। তিনি যেখানে ঈদ করতেন আমরা পরিবারের সদস্যরাও সেখানেই ঈদ করতাম। আমি বড় হওয়ার পর আব্বাকে ঢাকা ও আমাদের দাদাবাড়ি ফরিদপুর- এই দুই জায়গাতেই ঈদ করতে দেখেছি। যখন আমরা খুব ছোট, তখন মগবাজারের আমতলায় কাজী অফিস লেনস্থ মসজিদে, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে ঈদের নামাজ আদায় করেছি। আরেকটু বড় হওয়ার পর দেখতাম, আব্বা আমাদের নিয়ে জাতীয় ঈদগাহে যেতেন। আমার শহীদ পিতা সব সময় মসজিদের তুলনায় খোলা ময়দানে বা ঈদগাহতে নামাজ পড়াটা পছন্দ করতেন। নামাজ পড়ে সরাসরি এসে আমরা মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযমের বাসায় এসে তার সাথে সাক্ষাৎ করতাম। ঈদের দিন যে মুরব্বিদের সাথে আলাদা করে সাক্ষাৎ করতে হয় বা তার কাছ থেকে দোয়া নিতে হয় এই শিক্ষাটি আমরা সেখান থেকেই পেয়েছি।
আমার শহীদ পিতা যখন মন্ত্রী হলেন, তখনও ঈদগাহতে নামাজ পড়তেন। নামাজের পর আমি নিজে আব্বার সাথে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকবার বঙ্গভবনে এবং পরে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছি। তারপর জামায়াত অফিসে কূটনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাতের আয়োজন হতো। ঐ আয়োজনে অংশ নিয়ে অবশেষে আমরা বাসায় ফিরতাম।
তবে রোজার ঈদে আমার যতটুকু মনে পড়ে আব্বা বেশির ভাগ সময় আমাদের দাদাবাড়ি অর্থাৎ ফরিদপুরে ঈদ করতেন। এর কারণ ছিল আব্বা শেষ ১০ দিন ফরিদপুরে আমাদের এলাকায় যে মসজিদ রয়েছে (আদর্শ একাডেমি মসজিদ হিসেবেই মসজিদটি বেশি পরিচিত) সেখানে ইতিকাফ করতেন। ফরিদপুরে হয়তো আমরা ১৭ বা ১৮ রমজান যেতাম। আব্বা একদিন বাসায় ইফতার করতেন, আরেকদিন ইয়াতিমখানায় আর একদিন সংগঠনের আয়োজনে ইফতার মাহফিলে অংশ নিতেন। এরপরই তিনি ইতিকাফে বসে যেতেন। আব্বাকে বাসা থেকে আমরা ভাইয়েরা, বা আমাদের ফুফাতো ভাই, আব্বার কোন নাতি কিংবা আমার মরহুম শোয়েব চাচা ইফতারি বা সাহরির খাবার পৌঁছে দিতেন।
২৯ বা ৩০ রোজায় যখন ঈদের চাঁদ উঠতো, আমরা দৌড়ে মসজিদে যেতাম, আব্বাকে নিয়ে আসার জন্য। কেউ কাঁধে তোশক তুলে নিতাম, কেউ বা বালিশ বা যে যা পায়। আব্বাকে বাসায় নিয়ে আসা আমাদের জন্য একটা উৎসব ছিল। ঈদের উৎসব মূলত শুরু হতো সেখান থেকেই। আব্বা বাসায় ফিরে এসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে মিটিংয়ে বসতেন। ঈদের দিন কী আয়োজন হবে, কী কী আইটেম, কে কী রান্না করবে, কারা পরিবেশন করবে সবগুলো নিয়েই তিনি বৈঠক করতেন। সেই মিটিং ছিল আনন্দের আরেক উৎস। হাসাহাসি, মিষ্টি খুনসুটি চাচা-ভাতিজা, কিংবা মামা-ভাগিনাদের দুষ্টুমির মধ্য দিয়ে মিটিংটি চলতো।
পারিবারিক এই বৈঠক শেষে আব্বা, আমার অন্য চাচা ও তার ভাগিনা-ভাতিজাদের নিয়ে নিজে বাজারে যেতেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইটেমগুলো কেনাকাটা করতেন। আমার শহীদ পিতা ছিলেন খুবই দায়িত্ববান ও সাংসারিক জ্ঞানবোধসম্পন্ন মানুষ। যে আইটেমগুলো আগে পৌঁছালে কাটাকুটিতে সুবিধা হয় তিনি বাজার করা অবস্থাতেই সেগুলো কাউকে দিয়ে আগেভাগে পাঠিয়ে দিতেন। আর বাকিগুলো কিছু সময় পরে নিজেই নিয়ে আসতেন। ঈদের আগের রাতে সম্ভব হলে তিনি সাবেক দায়িত্বশীল ও মুরব্বি আত্মীয়স্বজনের সাথেও দেখা করতে যেতেন।
ঈদের দিন সকালে আমরা গোসল করে নামাজের জন্য রেডি হতাম। যতদিন আব্বা ঈদ করেছেন, শুধু আমাদের বাড়ির নয়, আশপাশ আমাদের যত চাচা, চাচাতো ভাই, ফুফাতো ভাই এবং সংগঠনের দায়িত্বশীলগণ সবাই নামাজের আগেই আমাদের বাসায় চলে আসতেন। আব্বা সবাইকে নিয়ে ফরিদপুর জেলা ঈদগাহ ময়দানে নামাজ পড়তে যেতেন। নামাজে যাওয়ার আগে মিষ্টি খেয়ে যেতেন। সুন্নাত অনুযায়ী আব্বা একপথে ঈদগাতে যেতেন তো অন্য পথে ফিরতেন। আমার মনে পড়ে, গোটা পথ তিনি তাকবির পাঠ করতে করতে যেতেন। গাড়িতে সবাইকে হাতে আতর লাগিয়ে দিতেন। ঈদগাহতে নামাজ আদায়ের পর আমরা সবাই সবাইর সাথে কোলাকুলি করতাম। আব্বার সাথে বিরাট সেই জমায়েতের সবাই কোলাকুলি করতেন বলে আমরা পরিবারের সদস্যরা বরং একটু পরেই তার সাথে কোলাকুলি করার সুযোগ পেতাম। নামাজ শেষে আব্বা বাড়িতে থাকা বাচ্চাদের জন্য বেলুন কিনতেন বলে মনে পড়ে আমার। নামাজ শেষে আমরা সবাই সরাসরি চলে যেতাম ফরিদপুর শহরের প্রধান গোরস্তান, আলীপুর গোরস্তানে। ওখানে শুয়ে আছেন আমার দাদী, আমার দুই চাচাসহ অনেক আত্মীয়স্বজন। আব্বা ঈদের নামাজ শেষে দাদীর কবর জিয়ারত না করে বাসায় ফিরতেন না।
বাসায় ফিরে আম্মা-চাচীদের হাতে রান্না করা খাবার দিয়ে তিনি সকালের নাশতা করতেন। তারপর পুরোদস্তুর রেডি হয়ে অতিথিদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। সারাদিন সেভাবেই যেত। সন্ধ্যার পর আব্বা বের হতেন আত্মীয়স্বজন ও সংগঠনের দায়িত্বশীলসহ সকলের সাথে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। যতটুকু সম্ভব কভার করতেন তিনি। সব মিলিয়ে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সংগঠনের মধ্যে ভারসাম্য করে তিনি অসম্ভব সুন্দর উপায়ে ঈদ উদযাপন করতেন।
২০১০ সালের ২৯ জুন আব্বা আটক হওয়ার পর আমাদের এই চিরায়ত ঈদ উদযাপনে ছন্দপতন ঘটে। একটুও ভালো লাগতো না। উত্তরার বাড়ির পাশের মসজিদে নামাজ পড়তাম। যেখানে জুমা পড়ি সব সময়, সেখানেই ঈদের নামাজ। বেশি দূরে যেতে পারতাম না, কারণ বাসায় আম্মাসহ মহিলা সদস্যরা অপেক্ষা করতেন কারাগারে যাওয়ার জন্য। তাই আমরা নামাজটা কাছেই পড়তাম যাতে দ্রুত জেলখানায় আব্বার কাছে যাওয়া যায়।
প্রথম কয় বছরের ঈদে আমরা সাক্ষাৎ করেছি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। পরে আব্বাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। আমরা তারপর থেকে সেখানেই তার সাথে সাক্ষাৎ করতাম। গিয়ে দেখতাম, আব্বা ইতঃপূর্বের কোন সাক্ষাতে আমাদের দেয়া পাঞ্জাবিটা পরে আছেন। আমাদের দেখেই হাসি। কেমন কী নামাজ পড়লাম খোঁজ নিতেন। আমরাও জানতে চাইতাম, আপনি কোথায় পড়েছেন? যেই ঈদে তিনি বড় জামায়াতে অন্য সব বন্দীর সাথে নামাজের সুযোগ পেতেন, অনেকের সাথে তার দেখা হতো, সেদিন তার চেহারা দিয়ে যেন সেই উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশটা আমরা দেখতে পেতাম।
তবে ২০১৩ সালে আব্বার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের রায়টি ঘোষণা হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়। আমার মনে আছে, মৃত্যুদন্ড রায় ঘোষণা হওয়ার আগে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আনা হয় এবং রায় ঘোষণা হওয়ার পরও ওনাকে প্রায় পাঁচ মাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই রাখা হয়। সেই সময়ে যে রোজার ঈদ হলো তা আমাদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের ছিল। কেননা ঢাকার সব কিছুই বেশ কড়াকড়ি বিশেষ করে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের জন্য। আমরা কিভাবে খাবার দেবো, কিভাবে তিনি ইফতার সাহরি করবেন, এগুলো নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠায় ছিলাম।
আব্বার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হত্যা মামলা চালু হয় ২০১১ সালে। এই মামলায় তাকে নিয়মিত আনা-নেয়া করা হতো, হাজিরার জন্য। এমনকি ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যুদন্ড ঘোষিত হওয়ার পরও তাকে নিয়মিত এই মামলায় হাজির করা হয়। আমার মনে আছে, ২০১৩ সালে যে রোজার ঈদ হয়, তার কয়েকদিন আগে কোর্টে তার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল আমার। তখন ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ করার জন্য আমাকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঈদের দিন মাত্র ৫ জন সাক্ষাতের অনুমতি পাওয়ায় আমি জেলগেটের বাইরে থাকলাম। আমার আম্মা, ভাই-ভাবী ও নিজের স্ত্রীকে যাওয়ার সুযোগ দেয়ার জন্যই আমি বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তবে আমি না যাওয়ায় আব্বা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন কেননা রিভিউ প্রস্তুতি কতদূর হলো এটা তিনি আমার কাছ থেকে জানার জন্য মুখিয়ে ছিলেন।
সেই ঈদের পর তাকে কাশিমপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে আবারও নারায়ণগঞ্জ। ২০১৫ সালের আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার ঠিক দুই দিন আগে জুন মাসের ১৪ তারিখ তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আমার আব্বার সাথে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। অথচ চৌধুরী সাহেবকে ফাঁসি কার্যকরের মাত্র দুই দিন আগে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।
অর্থাৎ জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস তাকে ঢাকায় কেন্দ্রীয় কারাগারে কনডেম সেলে রাখা হয়। আব্বা এই সেলে থাকতে চাইতেন না। প্রথমত কারণটি হলো, তাকে যেই রুমে রাখা হয়েছিল সেই রুমে এর আগে শহীদ কামারুজ্জামান ও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাখা হয়েছিল। আব্বা কোর্টে দেখা হলেই আমায় বলতেন, ঐ ঘরে আমার ঘুম আসে না। তা ছাড়া এই সেলগুলো ছিল সমগ্র জেল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অন্যান্য আসামিরা এক সেল থেকে অন্য সেলে যাওয়ার সুযোগ পেলেও ৮ নং রজনীগন্ধা সেলে কেউ এলে যাওয়ার সুযোগ পেত না। আর ওনাদের ফাঁসি কার্যকর হবে যে কোন সময়- এমন আশঙ্কা থাকায় জেল কর্তৃপক্ষও অস্বাভাবিক কড়াকড়ি করতো। আব্বার পাশের রুমে থাকা লোককে যা দেওয়া যেত, আব্বাকে তাও দেয়া যেত না। এরপরও আমরা সেই দিনগুলো পার করে এসেছি আল্লাহর রহমতে, কেননা আমার আব্বা অস্বাভাবিক ধৈর্যশীল ছিলেন। আমার সাথে তার এতবার দেখা হয়েছে, কোন দিন বলতে শুনিনি যে, তিনি কষ্টে আছেন।
এই ৬ মাসেও একটি রোজার ঈদ ও একটি কোরবানির ঈদ পড়েছিল। ঢাকায় এই ৬ মাস থাকা অবস্থায় আব্বা প্রতিনিয়ত ২১ আগস্টের কোর্টে আমাকে বলতেন, “আমাকে নারায়ণগঞ্জে পারলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করিস।” আমি সেই মোতাবেক, কারা প্রশাসনকে নিয়মিত অনুরোধ করতাম যাতে তাকে আবার নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের অনুরোধেই ওনাকে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয় ঠিক রোজার ঈদের আগের দিন। আমরা তো খবরটা শুনে খুবই খুশি হলাম। ভাবলাম আববা হয়তো এবার শান্তিমতো ঈদটা করতে পারবেন, ঈদের নামাজটা পড়তে পারবেন।
আসলেই ঈদের দিন সাক্ষাৎ করতে গিয়ে তার হাসিমুখ দেখলাম। তবে ফেরার সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কথায় বুঝলাম বেশি দিন এই স্বস্তি আমাদের কপালে নেই। যে কোন সময় তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হতে পারে। যাক আমরা ভাবলাম, ঈদের ৩ বন্ধের দিন অন্তত তাকে আর অন্য কোথাও নিবে না। আমরা ঈদের ৩ দিন নারায়ণগঞ্জে গিয়ে খাবারগুলো দিতে পারবো। কিন্তু ঈদের পরদিন সকালে শুনলাম তাকে আবার ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। ভাবা যায়, একজন মানুষকে কিভাবে ঈদের সময় বার বার কারাগার পরিবর্তনের মাধ্যমে হেনস্তা করা হয়েছে। ভাবটা এমন, তিনি খুব চাইছিলেন তাই তার অনুরোধ রাখা হয়েছে। দয়া করে ঈদের দিনটায় নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে ঘুমানোর সুযোগ দিয়ে আমাদের ওপর অনেক এহ্সান করা হয়েছে। একরাতের ঐ মহানুভবতা দেখিয়েই পরের দিনই তাকে আবার ঢাকা কারাগারের সেই অন্ধকার কনডেম সেলে নিয়ে আসা হয়।
পরে যে কোরবানির ঈদটি আমরা পেয়েছিলাম, সে সময় আব্বা ঢাকাতেই ছিলেন। আমরা শত চেষ্টা করেও তাকে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে নিতে পারিনি। ঐ ঈদটি আমার কাছে চিরস্মরণীয়, কেননা সেবারই প্রথম আমি আমার এক মাস ২৫ দিন বয়সী শিশু ছেলে সন্তানকে নিয়ে আব্বাকে দেখতে গিয়েছিলাম। আব্বার সাথে এই একটা ঈদের স্মৃতি থাকবে আমার ছেলের। জেলখানায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাথে সাক্ষাতের সিস্টেম এতটাই অমানবিক যে, আব্বা একটু কোলে নিয়েও এই শিশুটিকে দেখার সুযোগ পাননি। ঈদের দিনের সাক্ষাতের দু’টি বিষয় খুব পীড়াদায়ক ছিল। প্রথমত সাক্ষাৎ করতে সুযোগ পেত পরিবারের মাত্র পাঁচজন সদস্য। এখন আমাদের মূল পরিবারে আম্মা, ৩ ছেলে, ৩ পুত্রবধূ, এক মেয়ে ও মেয়ে জামাইসহ ৯ জন। প্রতি ঈদে কোন ৫ জন দেখা করতে যাবে এই নিয়ে ঈদপূর্বরাতে আলোচনা হতো। যারা যাওয়ার সুযোগ পেত না, তাদের মনটা গোটা ঈদের দিন ধরেই খারাপ থাকতো। সর্বশেষ কোরবানির ঈদে আমার মেজো ভাই ভাবী ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এর আগে আমি নিজেও বঞ্চিত হয়েছি। এতে খারাপ লাগতো। সাক্ষাৎ করতে না পারলেও আমরা কারাগারে যেতাম। কারা ফটকের বাইরে অপেক্ষা করতাম। অন্যরা ভেতরে গেলে তারা ফিরে আসা পর্যন্ত বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। কোথাও না কোথাও তাও যেন মনে হতো, আব্বা তো দেয়ালের ওপারেই আছেন। এই পর্যন্ত তো আসতে পারলাম।
নির্ধারিত ৫ জন সাক্ষাতের বিষয়টি ছাড়া আরেকটি মর্মান্তিক বিষয় ছিল যা ঈদের সাক্ষাতের এই স্মৃতি লিখতে গিয়ে মনে পড়ছে। ২০১৩ সালে মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষিত হওয়ার আগ পর্যন্ত যে ঈদগুলো ছিল, আমরা তখন ঈদের সাক্ষাতে আব্বার সাথে কোলাকুলি করতে পারতাম। কিন্তু ২০১৩ এর পর শেষ দুই বছরে যে ৫টি ঈদ আমরা পেয়েছি, তখন আব্বা দাঁড়াতেন গ্রিলের ওপারে, না হয় জানালার ওপারে আর না হয় কোন দরজার ওপারে। আমরা যারা সাক্ষাতে যেতাম, যাওয়ার পর থেকেই প্রশাসনকে অনুরোধ করা শুরু করতাম, প্লিজ একবারের জন্য হলেও কোলাকুলি করতে দিন, আজতো ঈদ। কিন্তু তারা তাদের অপারগতা প্রকাশ করতো। প্রতি ঈদে আব্বার সাথে সাক্ষাৎ হতো ঠিকই, কিন্তু তার বুকের সাথে বুক না মিলিয়ে আসার আফসোস নিয়েই বাসায় ফিরে আসতাম। আমি এখনও বুঝি না, ঈদের দিনে পিতার সাথে সন্তানদের কোলাকুলি করতে দেয়াটাকে নিয়েও কেন এত ভয় পায় কারা প্রশাসন?
এভাবেই আসলে বিগত ৬টি বছর আমাদের ঈদগুলো কেটেছে। কষ্টের আরও অনেক স্মৃতি আছে। তবে কয়টাই বলতে পারবো এই স্বল্প পরিসরে। বিগত ৫টি বছরের ১০টি ঈদে আমরা বাড়ি যাইনি। আমাদের ঈদের একমাত্র উৎসব ছিলো আব্বার সাথে জেলে গিয়ে সাক্ষাৎ করা। আব্বা আমাকে কোর্টে হাজিরার দিনে যে খাবারগুলোর নাম বলতেন ওগুলো রান্না করতেই আমার আম্মা ও তার পুত্রবধূরা তৎপর থাকতেন। তাদেরও ঈদের উৎসব বা ব্যস্ততা বলতে এটুকুই। আব্বার সাথে সাক্ষাৎ শেষে আর কিছুই করার থাকতো না, কিছু করতে মনও চাইতো না। ঈদের শুরু, সমস্ত আয়োজন, প্রস্তুতি ছিল সেই সাক্ষাৎটি ঘিরেই। সাক্ষাৎ শেষ ঈদও শেষ।
কিন্তু এখন ভাবি, তাও তো তখন আব্বা আমাদের মাঝে ছিলেন। জেলে গিয়ে দেখা পেতাম। এখনতো তাও নেই। এখন তো তিনি শাহাদাতের নজরানা পেশ করে তার প্রিয় রবের সান্নিধ্যে। কি করে কাটাবো এবারের ঈদ! আমার স্ত্রী আমার এই লেখার সময় বার বার আফসোস করে বলছিল, বাবা নেই, এবার সময় কাটবে কী করে, কেমন হবে এবারের ঈদ।…
আমি জানি এই অনুভূতি আমাদের সবার। এটা ঠিক যে আমার বাবাকে আল্লাহ অনেক সম্মানিত করেছেন, তাকে শাহাদাতের সম্মান দিয়েছেন। তারপরও মনকে বোঝানো খুব কঠিন। আমাদের সবার জন্য এটা আব্বা ছাড়া প্রথম ঈদ, আমার মায়ের জন্য এটা স্বামী ছাড়া প্রথম ঈদ। আব্বার নাতিরা এবার আর নতুন পাঞ্জাবি পরে তাদের দাদাকে দেখতে যাবে না। বাড়ির পুত্রবধূরা আর শ্বশুরের জন্য নানা আইটেম রান্না করবে না। তারপরও এবারের ঈদের দিন এই বেদনার নীল অনুভূতিগুলো নিয়েই হয়তো কেটে যাবে।
লেখাটির শেষ দিকে এসে আপনাদের দোয়া কামনা করে এটুকুই বলতে চাই, বিগত সাড়ে ৫ বছরে আমার বাবা কারাগারের নির্জন সেলে খুব কষ্ট করে ঈদ করেছেন। তিনি যেন এখন শান্তিতে থাকেন। পরম করুণাময় আল্লাহ যেন তার শাহাদাতকে কবুল করে তাকে জান্নাতের সম্মানিত মেহমানদের সারিতে রাখেন। আমাদের পরিবারের জন্য আল্লাহ যেন উত্তম অভিভাবক হয়ে যান, আমাদের সবার যেন তিনি ধৈর্য বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ এই শাহাদাতের বিনিময়ে বাংলাদেশে কুরআনের রাজ কায়েম করে দিন। আমিন।
বি.দ্র. লেখাটি আমরা পেয়েছি গত রোজার ঈদের আগে। ঈদুল ফিতর সংখ্যায় ছাপানো যায়নি বিধায় ঈদুল আজহা সংখ্যায় ছাপানো হলো। -সম্পাদক

SHARE