আমাদের জাতিসত্তা ও তার মূল্যায়ন

মু. নাঈম সিদ্দিকী

মানুষের মন নিস্পন্দ বা অনুভূতিহীন দর্পণ নয়। দর্পণে প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তনশীল অবস্থা, অনুভূতি ও প্রকৃতির রঙবেরঙের বহিঃপ্রকাশ যথাযথভাবে প্রতিবিম্ব হয়। কিন্তু মানুষের মন সেরূপ নয়। মানবমন কখনোই নিষ্ক্রিয় থাকে না। তা প্রতি মুহূর্ত সচেতন ও সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন ভাবধারা ও উপাদান মিশ্রিত অবস্থা ও ঘটনাবলির একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে। আমাদের এই চেতনার অবস্থাসমূহের প্রকৃতির চিত্র নিজ থেকেই যেমন ইচ্ছা তেমন রঙ লাগাতে পারে না। এর জন্য বাইরের জগতের বিভিন্ন ঘটনাবলি ও পর্যবেক্ষণ থেকে আহরিত ফল বিশাল ভূমিকা পালন করে। কোন জীবন্ত সত্তা মহাশূন্যে শ্বাস গ্রহণ করতে পারে না, এ যেমন সত্য, অনুরূপভাবে এও সত্য যে, মানুষের মন আদর্শিক শূন্যতার মধ্যে কাজ করতে পারে না। এক্ষেত্রে বিশ্বাস ও প্রত্যয় হচ্ছে তার একমাত্র অবলম্বন। এর সত্যতা স্বীকার করতে গিয়ে ঔড়যহ এৎরৎফ লিখিত অহ ওহঃৎড়ফঁপঃরড়হ ঃড় ঢ়যরষড়ংড়ঢ়যু ড়ভ জবষরমরড়হ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন,

চিন্তা গবেষণার প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের মনের নিভৃত গহনে প্রচ্ছন্ন ধারণাসমূহ থেকেই পথ-নির্দেশ লাভ করতে হয়। কেননা আমরা যা কিছুর সন্ধান করি, তার মূল্য ও গুরুত্ব সে সব ধারণা বিশ্বাসের নিক্তিতে ওজন করেই অনুমান করা যায়। আর সে সব ধারণার ভিত্তিতে রচিত মানদণ্ডেই সে সবের সত্যতা ও যথার্থতা পরীক্ষা ও যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। কোন চিন্তা গবেষণাই নিজস্ব ধারণা বিশ্বাস ও লক্ষ্য উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসম্পর্ক ও নিরপেক্ষ হয়ে পরিচালিত করা কারোর পক্ষেই সম্ভবপর নয়। নিজের ছায়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া যেমন কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি চিন্তা গবেষণার ফল গ্রহণ না করাও কারোর সাধ্য নেই।

প্রখ্যাত গ্রন্থকার ইবাধহ তার ঝুসনড়ষরংস ড়ভ নবষরবভ গ্রন্থে এ ধরনের মনোভাব প্রকাশ করে লিখেছেন, আমরা শুধুমাত্র বাস্তবতার মধ্যে জড়িয়ে থাকতে পারি না। আমরা যখন কোন বাস্তব জীবনের দিকে পদক্ষেপ গ্রহণ করি, তখন আমরা আমাদের কর্মক্ষমতা ও তৎপরতা যাচাই করার জন্য আমাদের নিজস্ব মৌল ধারণা বিশ্বাসসমূহের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হই। বস্তুত এ এমন একটা সত্য, যার সপক্ষে বহু প্রখ্যাত চিন্তাবিদের সমর্থন উদ্ধৃত করা যেতে পারে। এ থেকে এ সত্য অতি সহজেই উপলব্ধি করা যেতে পারে যে, মূলত অবস্থা ও ঘটনাবলির সুসংবদ্ধ অধ্যয়নই হচ্ছে শিক্ষা এবং তাকে কোন ব্যক্তি ও জাতির মৌল চিন্তা-ভাবনা ও মতাদর্শ থেকে কোন অবস্থায়ই বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে না। এ কারণেই মৌল বিশ্বাসের দিক দিয়ে মানুষে মানুষে যে পার্থক্য ধর্ম বিশ্বাসের পার্থক্যের দরুন, তাকে স্বীকার করেই বিভিন্ন বিশ্বাস অনুসারীদের শিক্ষাও বিভিন্ন হতে বাধ্য। এ সত্যকে অস্বীকার করা হলে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে এবং তার জন্য বিভিন্ন মৌল বিশ্বাস সম্পন্ন মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।

বিশ্বাস ও প্রত্যয়কে এড়িয়ে কেউ কোন মতবাদের উদ্ভাবন করতে পারেনি। তার প্রমাণ দিতে গিয়ে অৎহড়ষফ খঁহহ তার জবাড়ষঃ ধমধরহংঃ জবধংড়হ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন

ডারউইন বিজ্ঞান নয়, তা একটি পুরোপুরি ধর্মমত, তাতে যুক্তিসঙ্গত সুসংবদ্ধতার দাবি যতই করা হোক না কেন, আর মানুষের নিজেদের রচিত এই ধর্মমতে যুক্তি প্রমাণের তুলনায় অন্ধ বিশ্বাস ও ভাবাবেগ অধিক প্রবল হয়ে রয়েছে। এ মতবাদ তার বিশ্বাস ও প্রত্যয়েরই একটি প্রতিচ্ছবি।

সুতরাং বলা যায় মানুষ পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ, যাচাই-বাছাই করার মাধ্যমে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের মাধ্যমে যা কিছু নিজের হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় তাই শিক্ষার মৌল, আমাদের জীবসত্তার মূল্যায়ন।

আমাদের জাতিসত্তা কোন অন্ধ বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। নৈতিকতা বিবর্জিত কোন মূল্যবোধও আমাদের জাতিসত্তাকে কলঙ্কিত করতে পারেনি। যদিও আমাদের সত্তাকে আমার একক জাতি গোষ্ঠী হিসেবে মূল্যায়িত করতে পারি না কিন্তু জীবন দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে আমাদেরকে পৃথক করার কোন অবকাশ নেই। নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় কাউকে এখন আর স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। আব্দুল মান্নান তার রচিত গ্রন্থ আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা প্রবন্ধে লিখেছেন,

এ অঞ্চলের মানুষের বংশধারায় বহু বিচিত্র রক্ত প্রবাহের মিশেল ঘটেছে। সেমিটিক দ্রাবিড় রক্তের সাথে এসে মিশেছে অস্ট্রালয়েড, মঙ্গোলীয়, এমনকি আর্য রক্তের ধারা। এ প্রবাহ এমনভাবে মিশে গেছে যে, নৃতাত্ত্বিক বিবেচনায় কাউকে এখন আর স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। চেহারার বৈচিত্র্য সত্ত্বেও এলাকার গরিষ্ঠ মানুষের মিল রয়েছে তাদের জীবনদৃষ্টিতে। জীবনদৃষ্টির অভিন্নতাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে তাদের জীবনের অভিন্ন লক্ষ্য এবং একত্রে বসবাসের ও জীবনধারার স্বতঃস্ফূর্ত বাসনা ও প্রতিজ্ঞা। অভিন্ন ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছে তাদের একটি জীবনচেতনা ও আচরণরীতি। তাদের আকাক্সক্ষায় ও তাদের সংগ্রামে এই জীবনচেতনারই স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। তাদের সংগ্রামের লক্ষ্যকে এই জীবনচেতনাই নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং নির্মাণ করেছে তাদের ইতিহাস।

বৌদ্ধ ধর্মের উন্নত মানবিক আদর্শই প্রথমে আমাদের জাতিসত্তাকে বিকশিত করে। কিন্তু অচিরেই বৌদ্ধ ধর্ম তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে তার আসন থেকে ছিটকে পড়ে। মানুষ যে বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হতে থাকে এবং নতুন একটি জাতিসত্তার আগমন ও নেতৃত্ব আবশ্যক হয়ে পড়ে।

এ সময় ইসলাম তাদের নতুন একটি জাতিসত্তা নিয়ে আমাদের সাথে হাজির হয়েছিল, উন্নত নৈতিকতা, আদর্শ, বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের পরশে বাংলার মানুষ একে একে ইসলামী আদর্শকেই তার জীবনের জাতিসত্তা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। বৌদ্ধ ধর্মের জাতিসত্তা যে ইসলামী আদর্শে পরাজিত হয়েছে তা কে এম পানিক্কর তার লেখা এ সার্ভে অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রিতে সুন্দরভাবেই উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন,

ইসলামের আগে আর্য-আগ্রাসনের মোকাবেলার যে দুটো সংস্কৃতি জনগণের সংগ্রামকে শক্তি জুগিয়েছে, প্রকৃতিগতভাবে সেগুলো কতটা আনুভূমিক ব্যাপার। ফলে আর্য-সংস্কৃতির সাথে নিজেদের পার্থক্যটাকে জৈন ও বৌদ্ধরা বেশি দিন ধরে রাখতে পারনি। এই দুটো সংস্কৃতি ক্রমশ আর্য সংস্কৃতির গ্রাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ইসলাম আর্থ-সংস্কৃতির মোকাবেলায় শুধু আত্মরক্ষা করতেই সমর্থ হলো না, ভারতীয় সংস্কৃতিকে আপাদমস্তক দু’ভাগে বিভক্ত করে স্পষ্ট দু’টি জাতিতত্ত্ব¡ সৃষ্টি করলো।

বর্তমানে আমরা বাংলাদেশে যে জাতিসত্তাকে দেখেতে পাচ্ছি তা ইসলাম ধর্মের জাতিসত্তার আলোকেই গঠিত। কিন্তু ব্রিটিশ ও ইউরোপীয়দের উপনিবেশের মাধ্যমে আমাদের জাতিসত্তায় পচনশীল কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সংযোজন হয়েছে। আমাদের জাতিসত্তা কখনোই তা গ্রহণ করতে চায়নি। কিন্তু উপনিবেশদের কৌশলগত অবস্থান ও কার্যকরণের মাধ্যমে বহু শতাব্দী, বছর পর হলেও মনে হচ্ছে আমাদের জাতিসত্তাকে তারা নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। আমি বর্তমান প্রজন্মকে তার অতীত অবস্থান ও বর্তমান অবস্থাকে বিশ্লেষণ করার জন্য অনুরোধ জানাই। যে দিকে আমরা ধাবিত হচ্ছি তা যে কত বিপজ্জনক তা থেকে আমাদের যে মূল জাতিসত্তায় আবার ফিরে আসতে হবে তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। আমাদের যুবসমাজকে তার জাতিসত্তা সম্পর্কে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। ব্রিটিশ উপনিবেশদের চাপিয়ে দেয়া জাতিসত্তা, দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পরিহার করতে হবে। (যা আমাদের জাতিরা কখনোই গ্রহণ করেনি, সংগ্রাম করেছে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে, তবুও নিজেদের স্বীয় জাতিসত্তাকে বিলিয়ে দেয়নি।)

অনেকে বাংলাদেশীর সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদের গোলপাক খাইয়ে ফেলেন। সেই মতের আলোকেই পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বাঙালিরা নিজেদেরকে বাঙালি মানেন এবং এপার আর ওপার নিয়ে বাঙালি এক অবিভায্য অখণ্ড সত্তা বলে তারা প্রচারও করেন। কিন্তু সেখানেও তারা স্বাধীন বাংলাদেশী জাতিসত্তায় আস্থাবান নন। তাদের আস্থা অখণ্ড ভারতীয় জাতীয়তায়।

সুতরাং আমাদেরকে আজ এই অবস্থান সঙ্গত কারণেই নিতে হবে যে, বাঙালি তথা বাংলাদেশীদের জাতিসত্তা কোন নৈতিকতা বিবর্জিত, অনুন্নত, মর্যাদাহীন, বৈশিষ্ট্যমণ্ডিতহীন, রুচিহীন কোন জাতিসত্তা নয়। এই জাতিসত্তা উন্নত নৈতিক চরিত্র, উন্নত মূল্যবোধ, বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও আস্থাশীলতায় মণ্ডিত।

আমাদেরকে সেই জাতিসত্তাকেই বিকশিত করতে হবে। ধরে রাখতে হবে আমাদের অর্জিত নৈতিক জাতিসত্তাকে। আমাদের যুবসমাজকে নৈতিকতা বর্জিত শিক্ষা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আদর্শ, বিশ্বাস ও প্রত্যয় গ্রহণের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। সচেতন হতে হবে আজ আমরা আমাদেরকে নিয়েই। তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বে মাথা উঠাতে পারবো, পরিচিতি লাভ করতে পারবো উন্নত জাতিসত্তা নিয়ে।

SHARE

Leave a Reply