আমাদের পথচলা থামবে না কোনো দিন -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

পুরাতন বছর পেরিয়ে ইতোমধ্যেই আমরা  নতুন বছরে পদার্পণ করেছি। শুরু হয়েছে নতুন করে আমাদের পথচলা। এটিই শাশ্বত নিয়ম। এ নিয়মের ব্যত্যয় কোনো দিন কোনো কালে হয়নি। দিন মাস বছর পেরিয়ে সবাইকেই নতুন বছরে পদার্পণ করতে হয়। ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত সকলকেই নতুনভাবে নতুন উদ্যমে নতুন দীপ্ত শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে নতুন বছরের পথচলা শুরু করতে হয়। কারণ এ পথচলা কখনো মসৃণ হয় না। অনেক বাধা-বিপত্তি, জেল জুলুম নির্যাতন আর প্রতিবন্ধকতার হাজারো পাহাড় মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলতে হয় এ আন্দোলনের নেতাকর্মীদের। বছরের মাঝামাঝি এসে কিংবা বছরান্তে কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর চাইতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে পথচলতে পারার মাঝেই নতুন বছরের সার্থকতা নিহিত।
২০১৭ সালটি কেমন যাবে তা হলফ করে বলার সুযোগ নেই। তবে এটা মানতে হবে দ্বীন বিজয়ের প্রত্যয়ে কাজ করা কর্মীদের কাছে প্রতিটি বছরই সমান গুরুত্বের হোক সেটা আজ কিংবা আগামীর। বরং দিন যত যায় চ্যালেঞ্জ তত বাড়ে। ধর্মনিরপেক্ষ এবং ইসলামবিদ্বেষী শক্তিগুলো একজোট হয়ে বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন কৌশলে বরাবরের মতো ইসলামী আন্দোলনের ওপর আঘাত হানতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ এ কথা সর্বজনবিদিত সত্য যে হক এবং বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সত্য এবং মিথ্যার পারস্পরিক লড়াই যুগ থেকে যুগান্তরে ছিল, আজো আছে, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। জাহেলিয়াতের সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার কর্মী হিসেবে গড়ে ওঠার কার্যকর পন্থা গ্রহণ করতে পারলেই উবে যাবে বাতিলের সকল ষড়যন্ত্র। সেজন্য অন্যান্য কাজের পাশাপাশি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে অবশ্যই সামনের সারিতে রাখতে হবে এবং অত্যধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

দাওয়াতকে জীবনের মিশন
হিসেবে গ্রহণ করা
পৃথিবীতে যতজন নবী এবং রাসূল আগমন করেছেন তাঁদের সকলেরই মিশন ছিল দাওয়াত। দাওয়াত দানের মাধ্যমেই তাঁরা অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে আলোর ফল্গুধারা প্রবাহিত করেছেন। এদেশের প্রতিটি ছাত্র-যুবকের কাছে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছানোর দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। ইসলামের সুমহান আদর্শ সমাজের প্রতিটি অলিতে-গলিতে, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক তো অবশ্যই থাকা উচিত, যারা নেকি ও কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভালো কাজের হুকুম দেবে এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে। যারা এ কাজ করবে তারাই সফল হবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১০৪) এ জন্য জনে জনে দাওয়াত তথা ব্যক্তিগত দাওয়াতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সকল পর্যায়ের আন্দোলনের কর্মীদেরকে ব্যক্তিগত দাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা থাকবে। শত প্রতিকূলতার মাঝেও আল্লাহর রাসূল (সা) যেভাবে দাওয়াত বন্ধ না করে  হিম্মত নিয়ে সামনের  দিকে এগিয়ে গেছেন তেমনি আমাদেরকেও  এগিয়ে  যেতে হবে। প্রয়োজনে কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী কৌশল অবলম্বন করে উত্তম নসিহত সহকারে সকলের নিকট দাওয়াত পৌঁছাতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “(হে নবী) আপনি মানুষকে আপনার রবের দিকে ডাকুন হিকমত ও উত্তম নসিহত সহকারে। তর্ক-বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়।” (সূরা নাহল : ১২৫)

কেউ না করুক আমি করবো কাজ
কে কাজ করলো কে করলো না, কে কতটুকু কম কিংবা বেশি করলো সেটি আমার বিবেচ্য বিষয় হবে না। বরং আমি কতটুকু কাজ করতে পারলাম সেটিই হবে বিবেচ্য বিষয়। মনে রাখতে হবে ইসলামী আন্দোলনে শরিক হয়েছি আমরা নিজেদের স্বার্থেই। কারণ এ আন্দোলনে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আমরা আমাদের পরকালীন মুক্তি তথা জান্নাত অর্জন করতে চাই। জান্নাত অর্জন করতে এসে যদি দায়িত্বে অবহেলা কিংবা আনুগত্যহীনতার কারণে আমাদের জন্য জান্নাতের পরিবর্তে জাহান্নামই বরাদ্দ হয় তাহলে দ্বীনি এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার সার্থকতা কোথায়। তাই কে কতটুকু কাজ করল তার দিকে না তাকিয়ে বরং কেউ না করলেও আমি কাজ করবো, আমি আমার পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত তথা জান্নাতের উপযোগী মানুষ হবো- এটিই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যয়। মরহুম কবি মতিউর রহমান মল্লিকের সুর আমাদের সবার ধ্বনিতে প্রতিধ্বনি হওয়া উচিত- “কেউ না করুন আমি করবো কাজ, আল কুরআনের আহবানে দ্বীন কায়েমের প্রয়োজনে নতুন করে আবার আমি শপথ নিলাম আজ।”

জবাবদিহির অনুভূতি নিয়ে
দায়িত্ব পালন করা
জবাবদিহির অনুভূতি নিয়েই প্রত্যেককে দায়িত্ব পালন করতে হবে। কারণ প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর দায়িত্বের ব্যাপারে প্রত্যেককেই জিজ্ঞাসা করা হবে। যার যে কাজ, সর্বোচ্চ পেরেশানি নিয়ে সে কাজ করা এবং সর্বপর্যায়ে গতিশীলতা নিয়ে আসার চেষ্টা করা প্রয়োজন। আমাদের ওপর অর্পিত দ্বীনি আন্দোলনের এই বিশাল আমানতের খেয়ানত যেন না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে, সব সময় মনে রাখতে হবে, আমাদের সকলকেই এ দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে কাল কিয়ামতে যেন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয় সে জন্য সবসময় মহান আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে হবে। যিনি কর্মী তিনিও দায়িত্বশীল। তারও জবাবদিহিতা আছে। দায়িত্বের ব্যাপারে রাসূল (সা)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে- হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (সা) বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। যেমন- জনগণের শাসক তাদের দায়িত্বশীল, কাজেই তিনি তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন। একজন পুরুষ তার পরিবার পরিজনদের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। স্ত্রী স্বামীর ঘরের এবং তার সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর গোলাম আপন মনিবের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণকারী। কাজেই সে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। শোন! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। কাজেই প্রত্যেকেই আপন অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। (সহীহ আল বোখারী)

পাঠভ্যাস বৃদ্ধি এবং
পরিকল্পিত ক্যারিয়ার গঠন
নিজের ও জনশক্তির পাঠভ্যাস বৃদ্ধি এবং পরিকল্পিত ক্যারিয়ার গঠনের দিকে নজর দিতে হবে। মেধা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে সে অনুযায়ী গভীর জ্ঞানার্জনের প্রতি মোটিভেশন চালাতে হবে। শুধুমাত্র সাংগঠনিক কাজেরই খোঁজখবর নয় বরং অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার খোঁজখবর এবং তত্ত্বাবধান আরো বাড়াতে হবে। নিজে মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি মেধাবীদেরকে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য আউটপুট-ভিত্তিক কাজের দিকে বেশি নজর দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে অ্যাকাডেমিক এবং সাংগঠনিক দু’টি বিষয়কেই যেন একটার ওপর আরেকটাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া না হয়। ক্যারিয়ার গঠন ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের যেমন পূর্বশর্ত তেমনি দ্বীন বিজয়ের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী না হতে পারলে এই ক্যারিয়ার দিয়ে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে কোনো ভূমিকাই পালন করা সম্ভব হবে না।

মানোন্নয়ন এবং মান সংরক্ষণে
নজর দেয়া
সর্বপর্যায়ের জনশক্তিকে মানোন্নয়ন এবং মান সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। মানোন্নয়ন এবং মান সংরক্ষণ এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন জনশক্তি ইসলামী আন্দোলনের সাথে পূর্ণ সক্রিয়তার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। তবে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে  শুধু কোটা পূর্ণ  নয় বরং মান নিশ্চিত করেই কেবলমাত্র মানোন্নয়ন করা প্রয়োজন। নামাজ কাজা বন্ধ এবং কুরআন তেলাওয়াত শতভাগ সহীহ করতে সর্বোচ্চ মোটিভেশন চালানো প্রয়োজন। সংগঠনের সম্পদ যেরূপ আমাদের কাছে আমানত তেমনি প্রতিটি জনশক্তিও আমাদের কাছে আমানত। আমানতকৃত জনশক্তি যাতে হারিয়ে না যায়, বিপথে না যায়, মান অবনতি না হয় সে বিষয়ে সার্বিক মোটিভেশন এবং নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। ওয়ার্ড ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রতি মাসেই কমপক্ষে একটি টিএস বাস্তবায়ন করা দরকার। ৩:২:১ হারে মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে সকল জনশক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে মানোন্নয়নের জন্য টার্গেট-ভিত্তিক কাজে শামিল রাখা। প্রত্যেকেই কমপক্ষে ৩ জন করে অধীনস্থ জনশক্তিকে টার্গেট নেয়া। টার্গেটে অবশ্যই একজন মেধাবী ছাত্র রাখা। ২০:১৫:১০ হারে বন্ধু বৃদ্ধি এবং ১২:১০:৫ হারে সমর্থক বৃদ্ধির চেষ্টা করা।

ইসলাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন
ইসলাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন জরুরি। খণ্ডিত বা সংক্ষিপ্ত জ্ঞানই ইসলামকে জানার এবং মানার জন্য যথেষ্ট নয় বরং কমবেশি বিস্তারিত জ্ঞানের প্রয়োজন। এ জন্য আন্দোলনের প্রত্যেকটি কর্মীকে অবশ্যই ইসলামের আকিদা বিশ্বাসকে জাহেলি চিন্তা-কল্পনা ও ইসলামী কর্মপদ্ধতিকে জাহেলিয়াতের নীতিপদ্ধতি থেকে আলাদা করে জানতে হবে এবং জীবনের বিভিন্ন বিভাগে ইসলাম মানুষকে কী পথ দেখিয়েছে সে সম্পর্কে অবগত হতে হবে। এ জ্ঞান ও অবগতি ছাড়া মানুষ নিজে সঠিক পথে চলতে পারে না, অন্যকেও পথ দেখাতে পারে না এবং সমাজ পরিগঠনের জন্য যথার্থ পথে কোন কাজ করতেও সক্ষম হয় না। তাছাড়া বিরুদ্ধবাদীদের প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ ও সন্তোষজনক জবাব দিতে হলেও ইসলাম সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞানার্জন করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন কুরআন হাদিসের অগাধ জ্ঞানার্জন। বিচ্ছিন্নভাবে নয় বরং ধারাবাহিকভাবে বিষয় ঠিক করে কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন করা দরকার। নিয়মিত ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন বিশেষ করে প্রতি মাসের পাঠ্যসূচিতে সাংগঠনিক মৌলিক একটি বই রাখা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সমকালীন বিষয়েও জ্ঞানার্জন প্রয়োজন। তাছাড়া সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে যেসব বিষয়ে জনশক্তির মনে প্রশ্ন জাগে সেসব বিষয়েও জানা প্রয়োজন। যারা জানে আর যারা জানে না তারা কখনোই সমান হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? বুদ্ধিমান লোকেরাই  তো নসিহত  গ্রহণ করে থাকে।
(সূরা জুমার : ৯)
আত্মশুদ্ধি অর্জন
যারা ইসলামী আন্দোলন থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়, কিংবা খারাপ পথে পা বাড়ায় তাদের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারেন নাই। সে জন্য পর্দা, নৈতিকতা এবং তাকওয়া চর্চার মধ্য দিয়ে নিজেদের আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো আবশ্যক। আত্মশুদ্ধি এমন একটি বিষয় যা অর্জন মানুষকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। আত্মশুদ্ধির ওপরই নির্ভর করে মানুষের যাবতীয় কার্যক্রম ও তার ফলাফল। এ জন্য আল্লাহ রাববুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বার বার অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করার জন্য যেমন তাকিদ দিয়েছেন তেমনি এটা অর্জনের ওপরই মানুষের সফলতা, ব্যর্থতাকে নির্ভরশীল করে দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করল সে-ই সফল হলো, আর ব্যর্থ সে-ই যে নিজের অন্তঃকরণকে কলুষিত করল।” (সূরা শামস্ : ৯-১০) আত্মশুদ্ধি প্রসঙ্গে রাসূল (সা) বলেছেন, “সাবধান! মানুষের দেহের অভ্যন্তরে একটি পিণ্ড রয়েছে, যদি তা পরিশুদ্ধ হয় তবে সমস্ত দেহই পরিশুদ্ধ হয়; আর যদি তা বিকৃত হয়ে যায় তবে সমস্ত দেহই বিকৃত হয়ে যায়। সেটা হলো কলব বা আত্মা।” (মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত)

পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করা
পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিকে এমনভাবে সুদৃঢ় করা প্রয়োজন যাতে গোটা সংগঠন একটি জান্নাতের বাগানে পরিণত হয়। সে জন্য জনশক্তির নিবিড় তত্ত্বাবধান, অকৃত্রিম সাহচর্য, ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। প্রত্যেক মুসলমান ভাই ভাইÑ এর ভিত্তিতে রচিত হবে পারস্পরিক সম্পর্ক। তাতে থাকবে না কোনো ধরনের গিবত বা পরনিন্দার চর্চা, থাকবে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ। আল্লাহ বলেন, “মুমিনেরাতো পরস্পরের ভাই।” (সূরা হুজুরাত : ১০) ইসলামী আন্দোলনের একেকজন কর্মীর সাথে অপর কর্মীর সম্পর্ক হবে পরস্পর ভাই ভাইয়ের মতো। তারা আল্লাহর জন্যই একে অপরকে ভালোবাসবে। যারা এরূপ সম্পর্ক স্থাপন করবেন কিয়ামতের দিন তারা আরশের নিচে স্থান লাভ করবেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, “আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পরস্পরকে ভালোবাসতো, তারা আজ কোথায়! আজকে তাদেরকে আমি নিজের ছায়াতলে আশ্রয় দান করবো। আজকে আমার ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া নেই।” (মুসলিম)

দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করা

একজন সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং দেশের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করা। যে কোন পরিস্থিতিতে দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা। একনিষ্ঠভাবে নিবেদিত হয়ে দেশের জন্য এমনভাবে কাজ করা যাতে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা যায়। সমৃদ্ধ দেশ বলতে আমরা তেমনি একটি বাংলাদেশ চাই- যেখানে প্রত্যেক নাগরিক সার্বিকভাবে নিরাপদ বোধ করবে, নিশ্চিত হবে তাদের মৌলিক অধিকার। যেখানে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না হত্যা-খুন রাহাজানি। থাকবে ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সুশাসন, ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নত অবকাঠামো, নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা, সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। মূলত ইসলামী সমাজই হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

ধৈর্যের মূর্তপ্রতীক হওয়া
পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে সেটাকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করা। ত্যাগ-কোরবানির নজরানা পেশ করা। জনশক্তির মধ্যে যেন হতাশা কাজ না করে, সেজন্য ‘আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের মূল লক্ষ্য’- এ বিষয়ে মোটিভেশন চালানো এবং সর্বাবস্থায় ইমানী দৃঢ়তার পরিচয় দেয়া। এ প্রসঙ্গে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরা নিরাশ বা মন ভাঙা হয়ো না, দুঃখিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা সত্যিকার মুমিন হও।” (সূরা আলে ইমরানের : ১৩৯) মনে রাখতে হবে দৃঢ়তা তথা ধৈর্য সাফল্যের চাবিকাঠি। ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলি বইয়ে ধৈর্যের কয়েকটি অর্থ তুলে ধরা হয়েছে। ধৈর্যের একটি অর্থ হচ্ছে তাড়াহুড়ো না করা, নিজের প্রচেষ্টার ত্বরিত ফল লাভের জন্য অস্থির না হওয়া এবং বিলম্ব দেখে হিম্মত হারিয়ে না বসা। ধৈর্যের আর একটি অর্থ হচ্ছে বাধা-বিপত্তির বীরোচিত মোকাবেলা করা এবং শান্তচিত্তে লক্ষ্য অর্জনের পথে যাবতীয় দুঃখ কষ্ট বরদাশত করা। ধৈর্যশীল ব্যক্তি যে কোন ঝড়-ঝঞ্ঝার পর্বতপ্রমাণ তরঙ্গাঘাতে হিম্মতহারা হয়ে পড়ে না। দুঃখ-বেদনা, ভারাক্রান্ত ও ক্রোধান্বিত না হওয়া এবং সহিষ্ণু হওয়াও ধৈর্যের একটি অর্থ। সকল প্রকার ভয়ভীতি ও লোভ-লালসার মোকাবেলা করে দ্বীনের পথে অবিচল অটল থাকতে পারাই ধৈর্য। ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আল্লাহ আছেন এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে, “হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।” (সূরা বাকারা : ১৫৩)

আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং
তারই ওপর ভরসা করা
ইসলামী আন্দোলনের কঠিন জিম্মাদারি যারা পালন করেন তাদের নিয়মিত আত্মপর্যালোচনার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা জারি রাখা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নফল নামাজ, নফল রোজা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণ এবং আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়কে সহযোগী উপকরণ হিসেবে কাজে লাগানো দরকার। এ ছাড়াও প্রয়োজন সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তারই নিকট বেশি বেশি সাহায্য কামনা করা। আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, “তোমরা যদি সত্যিকারার্থে মুমিন হও তাহলে এক আল্লাহর ওপরই ভরসা করো।” (সূরা মাইয়িদাহ : ২৩) আল্লাহ আরো বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।” (সূরা ত্বলাক : ৩) “যখন তুমি দৃঢ়ভাবে ইচ্ছা করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯) রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, “যদি তোমরা আল্লাহ তাআলার ওপর যথার্থ তাওয়াক্কুল কর তাহলে এমনভাবে রিজিক প্রদান করা হবে যেমন পাখিদেরকে রিজিক প্রদান করা হয়। পাখি সকালে খালি পেটে বের হয়। বিকেলে ভরাপেটে ফিরে আসে।” (তিরমিযী)

আখিরাতের সাফল্যকে চূড়ান্ত
সাফল্য মনে করা
দুনিয়ার সাফল্যের চাইতে আখিরাতের সাফল্যকে চূড়ান্ত সাফল্য মনে করা। কারণ দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী আর পরকালীন জীবন চিরস্থায়ী। সে জন্য দীর্ঘস্থায়ী আবাসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ দু’টি হাদিস তুলে ধরছি। হযরত ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন আদম সন্তানকে ৫টি প্রশ্নের জবাব না দেয়া পর্যন্ত এক কদমও নড়তে দেয়া হবে না- ১. জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে, ২. যৌবনকাল কোন পথে ব্যয় করেছে, ৩. কোন পথে সম্পদ আয় করেছে, ৪. কোন পথে সম্পদ ব্যয় করেছে, ৫. ইলম (জ্ঞান) অনুযায়ী আমল করেছে কিনা? (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে এসেছে, হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা) বলেছেন, সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা (কিয়ামত দিবসে) তার (আরশের) ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, সেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোন ছায়া থাকবে না। ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. ঐ যুবক যে তার যৌবন কাল আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে, ৩. ঐ ব্যক্তি যার অন্তঃকরণ মসজিদের সাথে ঝুলন্ত থাকে (জামায়াতে নামাজ আদায়ে উন্মুখ থাকে), ৪. ঐ দু’ ব্যক্তি যারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একে অন্যকে ভালোবেসেছে কিংবা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে (তাও আল্লাহর উদ্দেশ্যে), ৫. ঐ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর ভয়ে অশ্রুপাত করেছে। ৬. ঐ ব্যক্তি যাকে কোন সম্ভ্রান্ত বংশের সুন্দরী মহিলা (ব্যভিচারের দিকে) আহবান জানায় আর (তদুত্তরে) সে শুধুমাত্র আমি আল্লাহর ভয়েই তা থেকে বিরত থাকে, ৭. ঐ ব্যক্তি যে এত গোপনে আল্লাহর রাস্তায় দান করল যে, তার বাম হাত জানতে পারল না তার ডান হাত কী দান করেছে। (বুখারী)

আমাদের পথচলা থামবে না
কোনো দিন
যতো কঠিন পরিবেশই হোক না কেন দ্বীন বিজয়ের কাজ কখনো বন্ধ হবে না। ইসলামের সুমহান আদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার যে লড়াইয়ে আমরা শামিল হয়েছি তা থেকে আমরা একচুল পরিমাণ পিছপা হবো না ইনশাআল্লাহ। আমরা নীরব হবো না, নিথর হবো না, নিস্তব্ধ হবো না, যতদিন না আল কুরআনকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত আদর্শ হিসেবে দেখতে পাবো। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের সেরা মেধাবী ছাত্র, ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের বাতিঘর শহীদ আবদুল মালেক ভাইয়ের একটি বক্তব্য তুলে ধরছি, “আমরাতো জেনে বুঝেই এ পথে এসেছি। এই পথ থেকে ফিরে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছি, কিন্তু সামনের দিকে তাকালে মনে হবে আমাদের আরও অনেক পথ চলতে হবে। এই পথে চলতে গিয়ে যদি আমরা দ্রুতগামী কোনো বাহন পাই তাহলে সেটাতে সওয়ার হয়েই মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছবো, যদি তেমনটা না পাই তাহলে শ্লথ কোন বাহনে করে হলেও আমরা সেই মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো। এই পথ চলতে গিয়ে বাতিল শক্তি যদি আমাদের পা দুটো কেটে ফেলে তাহলে আমরা হাতের ওপর ভর করে মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো। বাতিল শক্তি যদি আমাদের হাত দুটোকেও কেটে ফেলে তাহলে আমরা আমাদের শরীরের ওপর ভর করে মঞ্জিলের দিকে এগিয়ে যাবো, এই পর্যায়ে বাতিলেরা যদি ধড় থেকে আমাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তাহলে আমরা আমাদের চোখ দিয়ে সেই মঞ্জিলের দিকে চেয়ে থাকবো, বাতিল শক্তি যদি আমাদের চোখ দুটোও তুলে নেয় তাহলে আমরা আমাদের মন দিয়ে ধ্যান করবো যে কখন আমরা আমাদের মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছবো, এরপরও আমরা বাতিলের সামনে কখনো মাথা নত করবো না।” পরিশেষে এ কথাটি বলেই শেষ করতে চাই- “আমাদের পথচলা থামবে না কোনদিন, বাধার পাহাড় ভেঙে এগিয়ে যাবো প্রতিদিন।”
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE