আমাদের সংগঠনের কাক্সিক্ষত মান ও পরিবেশ মো. আবুল কালাম আজাদ

মানব জাতিকে মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করার জন্য তিনি আল কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। কুরআনের রাজ কায়েমের দায়িত্ব মুসলিম জাতির ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এই কাজের আঞ্জাম দিতে যুগে যুগে নবী, রাসূলের আগমন ঘটেছে। আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য নবী-রাসূলগণ ত্যাগ-কুরবানি ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ নজির স্থাপন করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত আছে। রাসূলের দেখানো পথে কুরআন ও হাদিসের বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুষম সমাজ গঠন করাই জাতির মৌল কাজ। ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে দরকার একদল মানসম্পন্ন দক্ষ-যোগ্য সময়ের চাহিদানুসারে লড়াকু কর্মীবাহিনী। তার আগে গড়ে তোলা দরকার কাক্সিক্ষত সাংগঠনিক পরিবেশ। যেখান থেকে সবসময় উপযোগী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তাহলেই সমৃদ্ধ হবে রাসূল সা.-এর রেখে যাওয়া দাওয়াতি জিন্দেগির মহান দায়িত্ব।

ইসলামী শরীয়তের এমন অনেকগুলো আইন বিধান রয়েছে যা কার্যকরী হলে আদর্শ সংগঠন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। সংগঠন মজবুত না হলে সেগুলোর বাস্তবায়ন আদৌ সম্ভবপর নয়। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মানুষের পরস্পরের বিচার ফায়সালা করার আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার নির্দেশ রয়েছে কুরআন হাদিসে। রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত এ কাজ না করবে ততক্ষণ কোন সমাজের সাধারণ মানুষের পক্ষে তা করা কিছুতেই সম্ভবপর হতে পারে না। এ জন্যই জনগণের ওপর কোন কিছু কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন সংগঠন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা একান্ত জরুরি। এ পর্যায়ের যাবতীয় হুকুম-বিধানের প্রকৃতিই এমনি। এই কথাটি উপস্থাপনার জন্য ইমাম তাইমিয়া বলেছেন- জনগণের যাবতীয় ব্যাপার সুসম্পন্ন করা, রাষ্ট্র কায়েম করা দ্বীনের সর্বপ্রধান দায়িত্ব। বরং রাষ্ট্র ছাড়া দ্বীন প্রতিষ্ঠা হতেই পারে না। আরো কথা এই যে, আল্লাহ তায়ালা ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং নিপীড়িতদের সাহায্য করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। এভাবে তিনি জিহাদ ইনসাফ ও আইন শাসন প্রভৃতি যে সব কাজ ওয়াজিব করে দিয়েছেন তা রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্র কর্তৃত্ব ব্যতীত কিছুতেই সম্পন্ন হতে পারে না। (আস সিয়াসাতুস সারইয়াহ : পৃষ্ঠা. ১৭২-১৭৩)

আল্লাহর ইবাদতের দায়িত্ব পালনের জন্যও ইসলামী সংগঠন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে তারই ইবাদাত করার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, “আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি এজন্য যে তারা আমারই ইবাদাত করবে।” (সূরা যারিয়াত : ৫৬)

কুরআনের এ ইবাদাত শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক পরিভাষা। আল্লাহ তায়ালা যে সব কথা কাজ প্রকাশ্য বা গোপনীয় ভালোবাসেন ও পছন্দ করেন, তা সবই এর অন্তর্ভুক্ত। ইবাদাত শব্দের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে মানুষের যাবতীয় কথা কাজ ব্যবহার এক কথায় মানুষের সমগ্র জীবন ইসলামী শরীয়াত নির্ধারিত পথ ও পন্থা এবং নিয়ম ও পদ্ধতি অনুযায়ী সুসম্পন্ন কর্তব্য হয়। তা যদি করা হয় তাহলেই আল্লাহর মানব সৃষ্টি সংক্রান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সার্থক হতে পারে। অন্যথায় মানুষের জীবনে আল্লাহর উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু মানুষের জীবনকে এদিক দিয়ে সার্থক করতে হলে গোটা সমাজ ও পরিবেশকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে করে এ দৃষ্টিতে জীবন যাপন করা তাদের পথেই সহজ সাধ্য হয়ে ওঠে। যেমন মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের মধ্যেই যাপিত হয় মানুষের জীবন আর মানুষ যে সমাজ পরিবেশে বসবাস করে তার দ্বারা প্রভাবিত হওয়াই হচ্ছে মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি। এ প্রভাব প্রকৃতির ফলেই মানুষ যেমন ভালো হয়, তেমন মন্দ হয় যেমন হেদায়াতের পথের পথিক, তেমনি হয় গোমরাহির আঁধার পথের যাত্রী।

নবী করিম সা. ইরশাদ করেছেন: প্রত্যেকটি সন্তানই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাধীন জন্মগত প্রকৃতিতে ভূমিষ্ঠ হয়। অতঃপর তার পিতা-মাতা হয় তাকে ইয়াহুদি বানিয়ে দেয়, নয় খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজারি। ঠিক যেমন করে পশু প্রসব করে তার পূর্ণাঙ্গ শাবক। তাতে তোমরা কোন খুঁত দেখতে পাও কি, যতক্ষণ না তোমরা নিজেরা তাতে খুঁত সৃষ্টি করে দাও? (আল মুনতাখাব মিনাস সুন্নাহ পৃ. ৩৯১)

এ হাদিস অনুযায়ী ছোট্ট শিশুর পিতা-মাতা সমন্বিত সমাজেই হচ্ছে তার জন্য ছোট্ট সমাজ। এ সমাজ পরিবেশেই হয় তার জন্ম লালন পালন এবং সমৃদ্ধি।

অতএব পিতা-মাতা যেমন হবে, তাদের সন্তানও ঠিক তেমনি হবে। তারা যদি পথভ্রষ্ট হয়, তাহলে তাদের সন্তানকে পৌঁছে দিবে গোমরাহির অতল গহ্বরে। আল্লাহ যে সুস্থ প্রশান্ত প্রকৃতির ওপর শিশুকে পয়দা করেছেন, তা থেকে তারা তাকে বহিষ্কৃত করে দেয়। পক্ষান্তরে তারা যদি সত্যদর্শী ও নেক্কার হয় তাহলে তারা তাদের সন্তানকে আল্লাহর সৃষ্টি প্রকৃতির ওপর বহাল রাখতে এবং একে কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে সাংগঠনিক পরিবেশের বাইরে গেলে স্বীয় অস্থির আদর্শ থেকে মানুষের বিচ্যুতি ঘটে। এটাই বাস্তবতা।

আমাদের সংগঠন

–    এটি একটি পরিপূর্ণ দ্বীনি সংগঠন।

–    আদর্শ আল্লাহর রাসূল সা.।

–    একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের লক্ষ্য।

–    এই সংগঠনের সমস্ত কাজ আল্লাহর ইবাদাত।

–    এই সংগঠন একটি আদর্শিক বিপ্লব সাধন করতে চায়।

–    আমাদের সংগঠন দুনিয়াকেন্দ্রিক নয়, আখেরাতকেন্দ্রিক।

–    এটি সর্বাত্মক পরিবর্তনের একটি আন্দোলন অর্থাৎ ব্যক্তি হতে রাষ্ট্র পর্যন্ত ইসলামীকরণ।

–    আমাদের সংগঠনের পরিচালক একমাত্র আল্লাহ ও তার প্রেরিত রাসূল সা.।

মহান আল্লাহ বলেছেন, “হে নবী লোকদের বলে দাও তোমরা যদি প্রকৃতই আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা পোষণ কর, তবে আমার অনুসরণ করে। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসেন এবং তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন। তিনিই বড় ক্ষমাশীল ও দয়াবান। (সূরা আলে ইমরান : ৩১)

সংগঠন

–    সংগঠন শব্দের অর্থ সংঘবদ্ধতা দলবদ্ধকরণ।

–    বিশেষ অর্থে সংঘবদ্ধ বা দলবদ্ধ জীবন।

–    ইংরেজি প্রতিশব্দ ঙজএঅঘওতঅঞওঙঘ.

–    যার শাব্দিক অর্থ বিভিন্ন  ঙৎমধহ যে একত্রীকরণ গ্রন্থায়ন একীভূতকরণ।

–    মানবদেহের সাথে তুলনা বা আত্তীকরণ।

মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকেও এক একটি ঙজএঅঘ বলা হয়। মানবদেহের এই ভিন্ন ভিন্ন ঙজএঅঘ গুলোর গ্রন্থায়ন ও একীভূতকরণের রূপটাই সংগঠন বা ঙজএঅঘঅওএঅঞওঙঘ এর একটা জীবন্ত রূপ। মানবদেহের প্রতিটি সেল, প্রতিটি অণু পরমাণু একটা নিয়মের অধীনে সুশৃংখলভাবে যার যার কাজ সম্পাদন করে যায়। মানুষের দৈহিক অবয়বগুলোর বিভিন্নমুখী কার্যক্রমের প্রতি লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই এখানে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ আছে। আবার কাজের সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা আছে, পরস্পরের সাথে অদ্ভুত বয়সের সহযোগিতা আছে। মনমগজের চিন্তা-ভাবনা কল্পনা ও সিদ্ধান্তের প্রতি দেহের বিভিন্ন ঙৎমধহ দ্রুত সমর্থন সহযোগিতা প্রদর্শন করে। তেমনি দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অভাব অভিযোগ অসুবিধা ইত্যাদির ব্যাপারে দেহরূপ এই সংগঠনের কেন্দ্র অর্থাৎ মন ও মগজ দ্রুত অবহিত হয়।

সংজ্ঞা : কিছু সংখ্যক মানুষের নির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য একদেহ এক প্রাণ রূপে কাজ করার সামষ্টিক কাঠামোকে বলা হয় সংগঠন।

সংগঠনের উপাদান

হ     নেতৃত্ব

হ     কর্মীবাহিনী

হ     পরিচালনা বিধি

হ     কর্মসূচি

কাক্সিক্ষত মান

–    যে মান আকাক্সক্ষা বা কামনা করা হয়।

–    মান অর্থ ঝঃধহফধৎফ।

–    মান অর্থ আদর্শিক চূড়ান্ত গুণ অর্জন।

–    মান অর্থ যোগ্যতার যথার্থ প্রকাশ।

সংগঠনের কাক্সিক্ষত মান নির্ভর করে ৪টি বিষয়ের ওপর-

হ     নেতার কাক্সিক্ষত মান।

হ     কর্মীবাহিনীর কাক্সিক্ষত মান।

হ     নেতা ও কর্মীর সমবায়ে কাক্সিক্ষত পরিবেশ।

হ     সংগঠনের বাহ্যিক কাক্সিক্ষত মান।

নেতার কাক্সিক্ষত মান

–    জ্ঞানগত যোগ্যতা অর্জন

–    যথাযথ শৃঙ্খলা বিধানের যোগ্যতা

–    জনশক্তি পরিচালনার যোগ্যতা- কর্মীদের সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা বিনম্র ভাষায় নির্দেশ।

–    সর্বস্তরের জনশক্তির কাছে আদর্শস্থানীয় হওয়া।- কোমলতা উদারতা, আনুষ্ঠানিক আলাপ কর্মীবাহিনীর প্রেরণার উৎস।

–    সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা।  রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রজ্ঞা।

–    ঊর্ধ্বতন সংগঠনের আনুগত্য করা।

–    সার্বিক দিক থেকে সংগঠনের গতিশীল করার যোগ্যতা।

–    আল্লাহর সন্তুষ্টি।

–    সামগ্রিক কাজে ভারসাম্য রক্ষা করা।

–    কঠোর পরিশ্রমী।

–    ধৈর্যশীল।

–    সময়কে যথাযথ কাজে লাগানো।

–    কম কথা বেশি কাজ।

মর্যাদার অনুভূতি ও নিবিড় সম্পর্ক

ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনের নেতার মর্যাদার অনুভূতি ভিন্ন রকম। মহান আল্লাহকে সন্তুষ্টি হলো মূল লক্ষ্য। আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য দ্বীনি ভাইদের বিনয়ী ব্যবহার এবং আস্থার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভালোবাসা অর্জন করা সকলের মাঝে অবলীলায় মিশে যাবে। একে অন্যের পরম বন্ধু হয়ে এবং দুঃখ সুখে একে অপরের নিবিড় বন্ধু হবে। দ্বীনি ভাই সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়। আর সংগঠনের মর্যাদাবান দায়িত্বশীল আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। মহান আল্লাহ যেমন দ্বীনের দায়িত্বশীল অতি প্রিয় মর্যাদাবান হিসেবে সমাধান দেন, তেমনিভাবে অধস্তন কর্মীর সাথে নিবিড় সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন-

“তোমার দিলকে সেই লোকদের সংস্পর্শে স্থিতিশীল রাখ, যারা নিজেদের রবের সন্তোষ লাভের সন্ধানী হয়ে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁকে ডাকে। আর কখনো তাদের থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফিরাবে না। তুমি কি দুনিয়াদারি চাকচিক্য জাঁকজমক পছন্দ কর। (সূরা কাহাফ : ২১)

মহান আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেন। তিনিই নিজের সাহায্য দ্বারা মুমিনদের দিয়ে তোমার সাহায্য করেছেন এবং মুমিনদের দিলকে পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। তুমি ভূপৃষ্ঠের সমস্ত ধন দৌলতও যদি ব্যয় করে ফেলতে, তবুও এই লোকদের দিল পরস্পরের সাথে জুড়ে দিতে পারতো না। কিন্তু আল্লাহ তাদের মন পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। (সূরা আনফাল : ৬২-৬৪)

একজন দায়িত্বশীল বা নেতা কর্মীবাহিনীর জন্য দয়াদানকারী বড় বটগাছের ন্যায়। একজন নেতা জীবনের মাইলস্টোন ও আদর্শ বাতিঘর। এবং ঢাল হিসেবেও সামনে থাকেন। সবচেয়ে যে উদাহরণটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য তাহলে পাখি যেমন নিজ বাচ্চাদের স্বীয় ডানার নিচে রাখে, একজন নেতার দায়িত্বও তদ্রƒপ। যাতে যেকোনো বিপদ আপদের ঝড় ঝাপটায় বিপদ থেকে মুক্ত রাখতে পারে।

কুরআনে আরো বলা হয়েছে “এবং ঈমানদার লোকদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করে তাদের প্রতি তোমরা ডানা মেলে দাও।” (আল কুরআন)

কর্মীবাহিনীর কাক্সিক্ষত মান

–    যথার্থ আনুগত্য

–    অর্পিত দায়িত্ব পালন যথার্থভাবে।

–    জ্ঞান অর্জন।

–    সময়কে পরিকল্পিত ব্যবহার।

–    দাওয়াতি কাজ/ সংগঠন সম্প্রসারণে পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণ।

–    নিজের মানোন্নয়ন।

–    শিক্ষা ও প্রযুক্তিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করা।

সাধারণ সংজ্ঞা

সাংগঠনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিবেশ, লক্ষ্য উদ্দেশ্য কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির আলোকে মানুষ যে কর্মতৎপরতা চালায় তাতে একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকেই পরিবেশ বলে।

ইসলামী সংগঠনের পরিবেশ

তাওহিদ রিসালাত আখেরাত বা ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসাবে লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও কর্মসূচির আলোকে আমরা যে তৎপরতা চালাই তাতে যে পরিবেশের সৃষ্টি হয়, তাকেই ইসলামী সংগঠনের পরিবেশ বলে।

পরিবেশ

নেতা ও কর্মীদের সাথে কাক্সিক্ষত গুণাবলী লালন ও অনাকাক্সিক্ষত গুণাবলী বা বৈশিষ্ট্য হতে নিজেদেরকে মুক্ত করার মাধ্যমে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকে পরিবেশ বলে।

আমাদের মধ্যে কোন ধরনের পরিবেশ কাম্য?

হ     আমাদের সবার আখেরাতের চিন্তায় মশগুল থাকতে হবে।

হ     দুনিয়াবি স্বার্থ ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

হ     সমস্ত কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করতে হবে।

হ     অপরকে অগ্রাধিকার তথা ভোগ নয় ত্যাগের মানসিকতা পোষণ করতে হবে।

রাসূল সা. ইরশাদ করেন- “তোমাদের উত্তম নেতা তো তারা যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো, তারা তোমাদেরকে ভালোবাসে। তোমরা তাদের জন্য দোয়া করো। তারা তোমাদের জন্য দোয়া করে।”

মুমিন হচ্ছে প্রেম ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক, যে ব্যক্তি না ভালোবাসেন, আর না তাকে ভালোবাসা হয় তার ভিতর কোনো কল্যাণ নেই। (আল হাদিস)

কাক্সিক্ষত গুণাবলী

যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ রক্ষা করবে

হ     পারস্পরিক সম্পর্ক-

–    ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়

–    আদর্শিক সম্পর্ক

–    ঠুনকো নয়

–    শুধুমাত্র ভাইয়ের সাথেই তুলনা করা চলে।

হাদিসে বলা হয়েছে- যারা আমার শ্রেষ্ঠত্বের খাতিরে পরস্পরকে ভালোবাসে তাদের জন্য আখেরাতে নুরের মিম্বর তৈরি হবে এবং নবী ও শহীদগণ তাদের প্রতি ঈর্ষা করবেন। (তিরমিজী)

–    কল্যাণ কামনা।

–    অপরকে অগ্রাধিকার দেয়া।

–    পরস্পরের জন্য দোয়া করা।

–    সবাই এক দেহ একমন হওয়া

–    তামাম রং, তামাম আনুগত্য তামাম বাতিল থেকে বিচ্ছিন্ন এবং আল্লাহরই জন্য একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়, তারাই।

–    আদেশ ও আনুগত্যের ভারসাম্য:

–    সৎ কর্মের ক্ষেত্রে আনুগত্য।

–    ব্যক্তির পরিবর্তনে আনুগত্যের পরিবর্তন না করা।

–    আদেশ দিতে হবে মন-মানসিকতা ও অবস্থা বুঝে।

–    আদেশ হবে মিষ্টি ভাষায়।

–    আনুগত্য করতে হবে হৃদয় মন দিয়ে আন্তরিকতা সহকারে।

পরামর্শভিত্তিক কাজ:

–    বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব পালন ও মনকে খালি করা।

–    পরামর্শ দেয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করা

–    নিজের স্বার্থে নয় সামষ্টিক স্বার্থে পরামর্শ

–    নিজের পরামর্শ গ্রহণ করানোর জন্য জিদ করা যাবে না।

পরামর্শ নেয়ার ক্ষেত্রে-

–    অধিকাংশ মতের রায়

–    সিদ্ধান্ত যাইহোক, তার উপর অটল থাকা

–    নিজের মতের বিরুদ্ধে হলে তা বাস্তবায়ন করা

–    ওয়াশ্শা-বিরহুম ফিল আমর

বদরযুদ্ধ (২য় হিজরি)

–    একদিকে কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা অপর দিকে সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনী।

–    পরিস্থিতির দাবি ছিল সশস্ত্র বাহিনীর সাথে লড়াই করে তাদের শক্তি খর্ব করা।

–    আল্লাহর ইচ্ছাও এটাই ছিল।

–    পরামর্শের জন্য মুহাজির ও আনসারদের একত্রে বসিয়ে পরামর্শ নিলেন

ওহুদ যুদ্ধ (৩য় হিজরি)

–    শহরে অবরুদ্ধ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হবে নাকি শহর থেকে বাইরে গিয়ে মুকাবেলা হবে।

–    পরামর্শ করে অধিকাংশের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ

আহযাবের যুদ্ধ (৫ম হিজরি)

–    পরামর্শের ভিত্তিতেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

–    হযরত সালমান ফারসির পরামর্শ অনুযায়ী খন্দক খনন।

–    পিছনে থাকা ইহুদিদের কেল্লা থেকে গাদ্দারির আশঙ্কা ছিল।

–    অভ্যন্তর নাজুকতা উপলব্ধি করে তিনি বনি গাতফানের সাথে সন্ধির কথাবার্তা আরম্ভ করেন।

–    তিনি চাইছিলেন তারা মদিনার উৎপাদিত এক-তৃতীয়াংশ ফল ফসল গ্রহণ করায় কোরাইশদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করে মুসলমানদের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হউক।

–    কিন্তু এ ব্যাপার নিয়েও তিনি সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন।

–    আমাদের মধ্য থেকে সাদ ইবনে উবাদা ও সায়াদ ইবনে মুয়াজ জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি আপনার নিজের ইচ্ছা না আল্লাহর নির্দেশ। তিনি বললেন, না এটা আমারই ইচ্ছা। আমি তোমাদের রক্ষা করতে ও শত্রুদের শক্তি ভেঙে দিতে চাচ্ছি।

–    উভয় সরদার জবাব দিলেন : আমরা যখন মুসলমান ছিলাম না তখনো এসব করিনি; আমাদের থেকে কর আদায় করতে পারেনি। তারা কি এখন আমাদের থেকে কর উসুল করবে।

–    ফলে স্বাক্ষর করা বাকি ছিল এমন অবস্থায় সন্ধি হলো না।

এহতেসাব বা গঠনমূলক সমালোচনা চালু রাখা:

–    একমাত্র কল্যাণ সাধনার জন্যই এহতেসাব

–    উদারতার সাথে এহতেসাব গ্রহণ

একবার এক ব্যক্তি মসজিদে নববীতে এসে দাঁড়িয়ে পেশাব শুরু করল, উপস্থিত ব্যক্তিরা মারমুখো হয়ে বাধা দিতে এগিয়ে যায়। নবী সা. তাদের বাধা দিয়ে বললেন: এখন প্রথমে তাকে পেশাব করা শেষ করতে দাও। অতঃপর তাকে কাছে ডেকে এনে বুঝালেন- এ হচ্ছে আল্লাহর ঘর; এটাকে নোংরা করা নিষেধ অতঃপর সাহবায়ে কেরামকে পানি ঢেলে পরিষ্কার করতে নির্দেশ দিলেন।

উত্তম ব্যবহার বা কোমল আচরণ:

–    একজন মানুষের আচরণই হলো মানবীয় অস্ত্র।

–    কোমল আচরণ জীবনের সবচেয়ে শানিত তলোয়ার।

–    মানুষের মন ও হৃদয়কে জয় করার উত্তম পন্থা আচরণ।

–    কোমল আচরণ দাওয়াতি জিন্দেগির সবচেয়ে বড় মিশাইল।

হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বহু বছর তার সান্নিধ্যে থেকে তার খেদমত  করেছেন। তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাকে না কখনও ধমক দিয়েছেন। আর না তিরস্কার করেছেন। এমনকি এরূপ কেন করলে এবং এরূপ কেন করলে না, এমনটিও বলেননি কখনও।

অন্য আর এক হাদিসে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত।

সামগ্রিকভাবে শৃঙ্খলা গধরহঃধরহ করা বৈঠকি শৃঙ্খলা

–    যথাসময়ে বৈঠকে উপস্থিত হওয়া।

–    বৈঠকের কথা বাইরে প্রকাশ না করা।

–    বৈঠক পরিচালনার ক্ষেত্রে সময়ের ভারসাম্যতা রক্ষা রাখা।

–    বিষয়বস্তু আলোকপাতের ক্ষেত্রে পরিবেশের প্রতি খেয়াল রাখা।

–    সামগ্রিকভাবে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

কথা ও কাজের মিল রক্ষা করা

–    কাজ বেশি ও কথা কম বলার অভ্যাস তৈরি।

–    সকল বিষয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা।

ছুটি সংক্রান্ত

“মুমিন মূলতই তারা যারা আল্লাহ ও তার রাসূল সা.কে অন্তর থেকে মেনে নেয়। আর কোন সামষ্টিক কাজে যখন তারা রাসূলের সঙ্গে একত্রিত হয়, তখন তারা তার অনুমতি না নিয়ে চলে যায় না। হে নবী যেসব লোক তোমার নিকট অনুমতি চায় তারাই আল্লাহ ও রাসূল সা.কে মানে। অতএব তারা যখন নিজেদের কোন কাজের কারণে অনুমতি চাইবে, তখন তুমি যাকে ইচ্ছা অনুমতি দান কর। আর এ ধরনের লোকদের জন্য আল্লাহর নিকট মাগফেরাতের দোয়া কর।” (সূরা নূর : ৬২)

ক্ষমামার্জনা ও দয়াশীলতা

তাঁবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে আল্লাহ কঠোরভাবে জানিয়ে দেন যে, “হে নবী তুমি লোকদের জন্য ক্ষমা চাও বা না চাও এমনকি সত্তর বারও যদি এদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, তবুও আল্লাহ কিছুতেই ওদের ক্ষমা করবেন না।” (সূরা তওবা : ৮০)

আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর মৃত্যুর পর তিনি তার শত নিকৃষ্টতম শত্রুর জন্যও দোয়া করতে দ্বিধা করেননি। যখন তাকে সূরা তওবা-৮০ নং আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: আমি জানতাম ৭০ বারের বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করলে মাফ করা হবে। তবে আমি তাই করতাম।

সবার সাথে সমান আচরণ

–    যার যতটুকু প্রাপ্য তাতে ততটুকু দেয়া।

–    ছোট বড় সাদা কালো, বংশ উঁচু-নীচু সবাইকে একরকম দেখা।

–    ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার সাথে সম আচরণ করা।

সংগঠনের আমানত রক্ষা

–    সংগঠনের দেয়া দায়িত্ব একটা বিরাট আমানত, যথাযথ ব্যবহার করা।

–    সংগঠনের অর্থ-সম্পদ ও আমানত।

–    সংগঠনের কথা-কাজ সিদ্ধান্তও আমানত।

–    অধস্তন কর্মীবাহিনীর ভাল-মন্দ, ব্যক্তি গঠন ও আমানত, যা যথাযথভাবে তত্ত্বাবধান করা।

আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করার অনুভূতি জাগ্রত করা

“তারা যদি এ পন্থা অবলম্বন করতো যে, যখনই তারা নিজেদের উপর জুলুম করে বসতো তখনই তোমার নিকট আসতো এবং আল্লাহর নিকট চাইত, তবে তারা অবশ্যই আল্লাহকে ক্ষমাশীল অনুগ্রহকারী রূপে পেত।” (সূরা নিসা : ৬৪)

“তোমাদের প্রত্যেকেই তত্ত্বাবধায়ক” (বুখারী ও মুসলিম)

যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী আচরণ

এক ব্যক্তি রাসূল সা.-এর নিকট এসে জানতে চাইল, ইসলামের দাবি কী? তিনি বললেন শাহাদত (তাওহিদ ও রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, ত্রিশ দিনের রোজা, বার্ষিক যাকাত পরিশোধ করা এবং একবার হজ করা। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন এছাড়া আর কিছু আছে কি? তিনি বললেন না আর কিছু নেই। লোকটি একথা বলতে বলতে চলে গেল: আমি এর চাইতে কমতি ও করব না এবং বৃদ্ধি ও করব না। নবী পাক সা. সাথীদের লক্ষ্য করে বললেন: বেহেস্ত মানুষ দেখতে চাইলে এই লোকটিকে দেখে নাও। কিন্তু প্রত্যেকের সাথে তিনি এমনটি করেননি। (আল হাদিস)

কারো কাছে এ কথার অর্থ বায়াত নেয়া হয়েছে যে, তার বাড়িঘর ত্যাগ করতে।

কারো কাছে জান-মাল বাজি রাখার ওয়াদা নেয়া হয়েছে।

কারো কাছে রাগ-গোস্বা নিবারণের।

কারো সম্পর্কে বলা হয় যদি ও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এমনকি নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করে। কতিপয় অপরাধের কারণে আমাদের দলভুক্ত নয়।

অনাকাক্সিক্ষত গুণাবলী বর্জন

যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে কুরে কুরে বিনষ্ট করে দেয়।

হ     যে কোন বিষয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ-

–    দ্রুত সিদ্ধান্ত শয়তানের কাজ।

–    অতি আবেগী হওয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত।

–    অতি তাড়াতাড়ি কাজে বরকত হয় না।

হ     গিবত

হ     সম্পর্কের তারতম্য

হ     সবার সাথে সমান আচরণ

হ     ঠাট্টা বিদ্রƒপ

হ     কুধারণা পোষণ

হ     রুক্ষ আচরণ বা বদমেজাজ

হ     হিংসা বিদ্বেষ

হ     আত্মপূজা আত্মপ্রীতি

হ     একদেশদর্শিতা

হ     সঙ্কীর্ণ মনতা

হ     চোগলখুরি

হ     একগুঁয়েমি

হ     গোয়েন্দাগিরি

হ     সন্দেহ সংশয়

হ     দায়িত্বের প্রতি লোভ

হ     আঞ্চলিক জাহেলিয়াত

আল্লামা মওদুদী হুকুমতে ইলাহিয়াতে বলেন, “বংশ, জন্মভূমি ভাষা ও বর্ণ এসবের ভিত্তিতে তৈরি জাতীয়তা মানবজাতির জন্য এক বিরাট বিপদ।’’ কুফর ও শিরকের অজ্ঞতার পর ইসলামের দাওয়াতে হকের যদি কোন বড় দুশমন থাকে সে হচ্ছে এই ও জন্মভূমি শয়তান।

সংগঠনের বাহ্যিক কাক্সিক্ষত মান

–    পরিবার বা সমাজের সদস্য হিসেবে আমাদের অনেক ভূমিকা আমাদের সংগঠন সম্পর্কে জনমনে কাক্সিক্ষত ধারণা তুলে ধরতে পারে বা বিপরীত ধরনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

–    এজন্য বাহ্যিক দিকটি থেকে সংগঠনের কাক্সিক্ষত মান সংরক্ষণের প্রয়োজন আছে।

–    বড়দের সম্মান ও ছোটদের ¯েœহ করা।

–    পিতা-মাতার সাথে উত্তম ব্যবহার করা।

–    প্রতিবেশীর হক যথাযথভাবে আদায় করা

–    সালাম দিলে জবাব দেয়া

–    অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া

–    মৃত ব্যক্তির জানাযায় শরিক হওয়া

–    অভাব ও দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো।

–    আত্মীয়দের সাথে সৎ ব্যবহার করা

–    অন্য সংগঠনের দায়িত্বশীলদের সাথে সম্পর্ক ও মর্যাদা দেয়া।

–    নিম্ন পেশার লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করা

–    গর্ব অহঙ্কার পরিত্যাগ করা।

–    দাওয়াতি চরিত্র অর্জন করা।

–    সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে শরিক হওয়া।

–    বন্ধুবাৎসল্য আচরণ ও সকল ধর্মের মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করা।

লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply