আরব বসন্ত-উত্তর মুসলিম বিশ্ব ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গি -ইউনুছ আব্দুদ্দাইয়ান

আরব বসন্ত (অৎধন ঝঢ়ৎরহম) এর সূচনা হয় ২০১০ সালের শেষ দিকে; তিউনিশিয়ায় তদানীন্তন স্বৈরশাসক জয়নাল আবদিন বেন আলির বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। আরব বসন্ত শুধুমাত্র স্বৈরশাসনের অবসানের আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি এবং এক স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়দীপ্ত আন্দোলন। আর এই আন্দোলনে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হয়েছে দেশের সর্বস্তরের মানুষ; এটা কোনো দল বা আদর্শের আন্দোলন ছিল না, এটা ছিল সত্যিকারের গণ-অভ্যুত্থান। যেসকল দেশে আরব বসন্তের মাধ্যমে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তিউনিশিয়া, মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়া। আরব বসন্ত সম্পর্কে Bessma Momani Zuvi The Arab Spring is Genuine Revolution, But a Bumpy and Arduous Road Ahead শীর্ষক গবেষণায় যথার্থ মন্তব্য করেন যে, The Arab Spring started because of a great feeling of disenfranchisement, growinginequality, relative deprivation, and most importantly because of corrupt and autocratic regimes that had a heavy policy and security sector to stamp out all dissent and free thought. The feelings of discontent among the population had been festering throughout the past decade; yet, it was not until late 2010 that political uprisings and social protests became more pronounced in the region.
আরব বসন্তের পর মিসরে ইখওয়ান ক্ষমতায় এলেও নানামুখী চক্রান্তে সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয়। শুধুমাত্র রাবেয়া স্কয়ারে হাজারো নেতাকর্মী শহীদ হন। বর্তমানে লক্ষাধিক নেতাকর্মী জেলে রয়েছেন। ১৮৪৫ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ রয়েছে। আরব বসন্তের পর লিবিয়ায় সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি বরং এক সময়ের বিশ্বের ধনী রাষ্ট্র বর্তমানে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সিরিয়ায় লাখো বনি আদম নিহত হয়েছে এবং বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হয়েছে। আফ্রিকার ছোট একটি দেশ তিউনিশিয়াতে এই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হউক আন-নাহদা চায়নি। সাংবাদিক Neil Clark যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, Tunisia: Where the Arab Spring has not yet turned to winter|। ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ড. রাশিদ ঘানুসির ভাষায় ‘‘আরব বসন্তের পর তিউনিশিয়া একমাত্র দেশ যা এখনো বিপ্লবের আলোক শিখা জ্বালিয়ে রেখেছে।”
Daniel L Byman তাঁর After the Hope of the Arab Spring, the Chill of an Arab Winter প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে আরব বসন্তের স্বপ্ন পূরণ হয়নি; বর্তমানে Arab Winter চলছে। Housam Darweseh তাঁর ঞTrajectories and outcomes of the Arab spring: ComparingTunisia, Egypt, Libya and Syria শীর্ষক গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, আরব বসন্ত-উত্তর রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও বেশি অস্থিতিশীল (political conditions remain unsettled or violent)। আরব বসন্তের পর তিউনিশিয়া, মিসর ও লিবিয়ার স্বৈরশাসকের পতন হলেও গণতন্ত্র কি ফিরে এসেছে? Georgetown University এর গবেষক Ali Sarýhan তাঁর Is the Arab Spring in the Third Wave of Democratization? The Case of Syria and Egypt গবেষণায় উল্লেখ করেন যে, আরব বসন্তের পর কিছু দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও গণতন্ত্র আসেনি। তাঁর মতে এর কারণ হচ্ছে:
When we look at the situation in Syria, we see that Assad received support from the same type of groups that supported Mubarak: wealthy, powerful, and authoritative politicians, rich businessmen, and military leaders. However, Syria differed from Egypt in that most of the army still supports Assad. Since, Assad still has the ability to give power and privilege to military leaders to motivate them to continue to support him despite the insurgency in Syria.
তিউনিশিয়াতে আরব বসন্তের সূচনা

তিউনিশিয়াতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দীর্ঘদিন থেকে চলছিলো। তবে মিডিয়া কভারেজ সেইভাবে পায়নি। কিন্তু সরকারের দমন পীড়নের প্রতিবাদে ২৬ বছর বয়সী মুহাম্মদ বুয়াজিজি অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং দাবানলের মতো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। শুরুতে মূলধারার মিডিয়া চুপচাপ থাকে। অনলাইনে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। স্পেনের Universitat Pompeu Fabra পিএইচডি গবেষক খLaura Pérez Altable তাঁর The Arab Spring before the Arab Spring: A case study of digital activism in Tunisia M‡elYvq D‡jøL K‡ib †h, the Arab Spring was not the result of a sudden event. The Arab Spring Revolutions have generated a growing dialogue about the role of social media as a tool for political mobilizations মূলত ফেসবুকের মাধ্যমে আরব বসন্তের সূচনা হয় এবং আন্দোলন পরিচালিত হয়। এরপর আলজাজিরা, ফ্রান্স২৪, আল আরাবিয়্যা, নিসমা টিভি কভারেজ দেয়ার পর তিউনিশিয়ার মূলধারার মিডিয়াতেও বিক্ষোভের খবর প্রচারিত হয়। ব্লগে সরকারের দমননীতি নিয়ে লেখনী এবং ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে দেয়ার ফলে জনমত দ্রুত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। পুলিশ বাহিনী কারো হাতে মোবাইল দেখলে তা কেড়ে নিতো এবং সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। ব্লগে লেখা ও আন্দোলনের সমর্থনে গান ইউটিউবে প্রকাশের কারণে গ্রেফতার করা হয় অনেককে। তারপরও বিক্ষোভকারীরা এক হাতে ইট আর আরেক হাতে ফোন নিয়ে মিছিল করতো। ২৬ জানুয়ারি ২০১১ সালে আলজাজিরার রিপোর্টে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে বলা হয়, ‘‘a rock in one hand, a cell phone in the other. আন্দোলনের শুরুতে কিছু আইনজীবী মুহাম্মদ বুয়াজিজির পরিবারের সাথে দেখা করে সমঝোতা করার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে বলে। কিন্তু তারা তা আমলে নেয়নি বরং ঔদ্ধত্য দেখায়। তারপর আন্দোলন শুরু হয় অরাজনৈতিক নেতৃত্বে। সিদি বুয়াজিদ ইউনিয়ন এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো শুরুতে সরাসরি প্রত্যক্ষভাবে আন্দোলনে লিয়াজোঁ করেনি বা নৈতিক সমর্থনও প্রদান করেনি। তবে তারা ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে ভূমিকা পালন করে। সাধারণ ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী এবং বেকার যুবকরাই আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বেকারত্ব এত বেশি ছিল যে, ত্রিশ বছর বয়সী যুবকরা এক দিনারের জন্য তাদের পিতার কাছে শরণাপন্ন হতে হতো। FRANCIS GHILÈS ২১ শে ডিসেম্বর ২০১৪ সালে Tunisia: the Arab exception’s test শিরোনামে লিখিত প্রবন্ধে উল্লেখ করেন:
The protesters were not supported by a foreign country gave their movement credibility and independence. They came from the poorer classes. Many were young people with little hope of regular employment, even when they had university degrees and especially if they lived in the underdeveloped hinterland. They felt crushed, deeply resented their humiliation, and had nothing to lose.
ইসলামপন্থীরা ব্যক্তিগতভাবে উক্ত আন্দোলনে শরিক হলেও তারা দলীয় বা কোন ইসলামী শ্লোগান দেয় নাই। সকলের মূল দাবি ছিল একটাইÑ ‘‘স্বৈরশাসন ও দুর্নীতির অবসান।” আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ১৪ই জানুয়ারি সরকার সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ছয় মাসের ভেতর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় এবং স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট বেন আলি দেশত্যাগ করে সৌদি আরবে পালিয়ে যায়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মূলত সেনাবাহিনীর জেনারেলরা বেন আলিকে সমর্থন না করার কারণেই তাকে পালিয়ে যেতে হয়। এছাড়াও সেনাবাহিনী নিজেরা ক্ষমতা দখলের পরিবর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
আরব বসন্তের পর ২৩ শে অক্টোবর ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আন-নাহদা ৩৭.৪৭% ভোট পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং জাতীয় সংসদের ২১৭ আসনের মধ্যে ৮৯ আসন পায়। নির্বাচনে এককভাবে বিজয়ী হলেও তারা সেক্যুলার Congress for the Republic পার্টির মুন্সেফ মারযুকিকে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এবং Ettakatols পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল মুস্তফা বেন জাফরিকে সংসদের স্পিকার হিসেবে সমর্থন দেয় এবং আননাহদার সেক্রেটারি জেনারেল হামাদ জাবালিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনয়ন দান করে। সরকার পরিচালনায় আননাহদা উদারনীতি গ্রহণ করলেও ইসলামপন্থীদের সরকারগঠনকে ধর্মনিরপেক্ষ, বামপন্থী, উদারপন্থী, শ্রমিক ইউনিয়নসহ কেউ সহজভাবে গ্রহণ করেনি। এমনকি সালাফি কট্টরপন্থীরাও স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। revolutionary vs counter-revolutionary এই ধরনের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে বিরোধী দলের একজন নেতা মুহাম্মদ ব্রাহিমি আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় দেশটির শক্তিশালী শ্রমিক ইউনিয়ন ইউজিটিটি সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগ নেয়। তাদের মধ্যস্থতায় সরকার ও বিরোধী দল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীন সংসদ ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্মত হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে আননাহদা সরকার পদত্যাগ করে এবং তারপর মেহেদি জুমআর নেতৃত্বে টেকনোক্র্যাট সরকার গঠিত হয়। আননাহদা সরকার পরিচালনায় অনেক ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে তাদের উদার মনোভাব পোষণ এবং সকল রাজনৈতিক দলের সাথে ডায়ালগের উদ্যোগ দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। এককভাবে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরিবর্তে সকল রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান রচনা করে।
সংবিধান রচনায় আননাহদার দূরদর্শী পলিসির কারণে বিরোধী দল এই ইস্যুতে কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার সুযোগ পায়নি। ফলে সামরিক হস্তক্ষেপ বা বৈদেশিক হস্তক্ষেপের কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। আননাহদা শান্তিপূর্ণভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে প্রেসিডেন্ট এবং সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আননাহদা ২৭.৭৯% ভোট পেয়ে ৬৯ আসন পায়। ধর্মনিরপেক্ষ নিদা তিউনিস দল ২১৭ আসনের মধ্যে ৮৬ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। আননাহদা পরাজয়কে স্বীকার করে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানায়। ANOUAR JAMAOUI তাঁর The decline of political Islam in Tunisia শীর্ষক প্রবন্ধে আননাহদার পরাজয়ের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেন। আননাহদা নেতৃবৃন্দের সরকার পরিচালনার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তিউনিশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারই ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাসীন হয়। ট্রানজিশনাল পিরিয়ডে দেশ পরিচালনা কত কঠিন সে অভিজ্ঞতা তাদের ছিল না। তাই তারা ট্রেড ইউনিয়ন, টেরোরিস্ট হামলা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক নানামুখী সমস্যা সমাধানে হিমশিম খায়। দল পরিচালনা ও সরকার পরিচালনা এক কথা নয়। আদর্শিক বক্তব্য দেয়া আর ক্ষমতায় গিয়ে জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এক কথা নয়। বেকারত্ব দূর, কালোবাজার ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় জনগণের মধ্যে হতাশা জাগে। মিডিয়ায় অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালায় এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থা নিয়ে নানা ধরনের কল্প-কাহিনী প্রচার করে। এই ক্ষেত্রে আননাহদার সমর্থনে উল্লেখযোগ্য কোনো মিডিয়া ছিল না; তারাও বিকল্প মিডিয়া করতে ব্যর্থ হয়। আননাহদার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সফলতার সাথে প্রচারণা চালায় যে, ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাসীন হলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবে। তাই আননাহদার পরাজয়ের জন্য সকলে ঐক্যবদ্ধ ছিল। দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি কর্মকর্তারা আননাহদার প্রতি সন্তুষ্ট ছিল না এবং তারা নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে। বেকার যুবকরা আননাহদার মাঝে তাদের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আশা দেখতে পায়নি। আননাহদা নেতৃত্ব আশাবাদী ছিল যে জনগণ সাবেক স্বৈরাচারী সরকারের আমলের রাজনৈতিক নেতাদেরকে নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু এটা ছিল তাদের অলীক বাসনা। শরিয়াহ আইন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না করায় ইসলামপন্থী একটি অংশ আননাহদার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। বিশেষভাবে সালাফি ইসলামপন্থীদের কট্টর ভূমিকাও আননাহদার পরাজয়ের অন্যতম কারণ। আননাহদা স্বৈরাচারী বেন আলি সরকারে সংশ্লিষ্টদের বিচারের পরিবর্তে রাজনৈতিক ঐক্যকে গুরুত্ব দেয়। এর ফলে বিপ্লবের চেতনার সাথে তারা আপস করেছে বলে অনেকই অভিযোগ করে।
তিউনিশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মন্ত্রিপরিষদ নিয়োগ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে বিরোধ দেখা দেয় এবং তাদের কতিপয় সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করে নতুন দল গঠন করে। সরকারি দলের সংসদ সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৫৮। আর আননাহদার সংসদ সদস্যসংখ্যা ৬৯ এবং সর্ববৃহৎ দল হিসাবে দেশের সংবিধান অনুযায়ী তারা ইচ্ছা করলে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটিয়ে নিজেরা সরকার গঠন করতে পারে। কিন্তু আননাহদা দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের সাথে সমঝোতায় যায় এবং কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিয়ে কোয়ালিশন সরকারে যোগ দেয়। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আননাহদা সর্বাপেক্ষা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল হলেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তারা কোন প্রার্থী দেয়নি। যার কারণে নিদা তিউনিস কর্তৃক মনোনীতি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে মনোনীত ৮৭ বছর বয়সী Beji Caid Essebisi বিজয়ী হন।

আরব বসন্ত-উত্তর নির্বাচনে মিসরে ইখওয়ানের বিজয় এবং ইউরোপ-আমেরিকার পলিসি

মিসরে ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি মাসে ব্লগাররা টুইটার ও ফেসবুকের মাধ্যমে হোসনি মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের ডাক দেয়। উক্ত আন্দোলনের অন্যতম নেতা ৩০ বছর বয়সী ওয়ায়েল গানেমকে কারারুদ্ধ করার পর আন্দোলনের দাবানল চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। যুবকরাই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথম পর্যায়ে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ মিসরের রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি সম্পৃক্ত না হলেও পরবর্তীতে মিছিল সমাবেশে সম্পৃক্ত হয়। মূলত মুসলিম ব্রাদারহুডের যুবশক্তিই সর্বস্তরের যুবসমাজের সাথে মিলে আন্দোলন সূচনা করার পরই ব্রাদারহুড সাংগঠনিকভাবে সম্পৃক্ত হয়। ব্রাদারহুডের জনসমর্থন এবং সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক তৃণমূল পর্যায়ে ছিল। বামপন্থী বা সেক্যুলার অন্য কোন রাজনৈতিক দলের এই ধরনের গণভিত্তি ছিল না। তাই মুসলিম ব্রাদারহুড তার পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামার পর আন্দোলন তীব্রতর হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন দমন করার জন্য নির্মমভাবে প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলেও উক্ত আন্দোলনে কোন ধরনের সহিংসতা ছিল না। তাই বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে হোসনি মোবারককে পদত্যাগ করতে হয়।
হোসনি মোবারকের পদত্যাগের পর থেকেই মিসরের রাজনীতিতে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এমনি এক প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাফিয়ার্স ওয়েবসাইটে Eric Trager কর্তৃক The Unbreakable Muslim Brotherhood: Grim Prospects for a Lberal Egyptশীর্ষক এক পলিসি ডুকুমেন্ট প্রকাশিত হয়। উক্ত পলিসি ডুকুমেন্টের সার কথা ছিল, মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারে এবং উক্ত নির্বাচনী ফলাফলকে ওয়াশিংটন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু নির্বাচনের পর ওয়াশিংটনের উচিত ব্রাদারহুডের জনসমর্থন এবং প্রভাব ক্ষুণœ করার জন্য বিভিন্ন লিবারেল গ্রুপকে সাহায্য করা। এই প্রসঙ্গে তাদের ফরেন পলিসিতে উল্লেখ করা হয়:
Washington should continue to aid liberal groups through various non-government organisations, focusing in particular on training leaders outside Cairo. A great deal of the Muslim Brotherhood’s strength lies in its near monopoly of influence in many countryside areas. The United State and Progressive Egyptian groups can only combat this influence by introducing liberal ideas and teaching people how to organise politically.
২০১২ সালের ২৪ জুন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী হিসেবে ড. মুরসি বিজয় লাভ করার পরপরই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ড. মুহাম্মদ মুরসিকে টেলিফোন করে অভিনন্দন জানান। যদিও ইতঃপূর্বে আমেরিকার তদানীন্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছিলেন যে,the united states would only initiate the limited contact with the group.
ক্লিনটন এবং বুশ ক্ষমতাসীন থাকার সময় ইসলামী আন্দোলনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। তার প্রমাণ হচ্ছে আলজেরিয়ায় আব্বাস মাদানির নেতৃত্বে ইসলামী স্যালভেশন ফ্রন্ট গণতান্ত্রিকভাবে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করলেও মূলত পাশ্চাত্যের সমর্থনে আলজেরিয়ার সেনাবাহিনী উক্ত নির্বাচন বাতিল করে এবং ইসলামী স্যালভেশন ফ্রন্টকে নিষিদ্ধ করে। আব্বাস মাদানিসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে কারাগারে বন্দী করা হয় এবং অত্যাচারের স্টিম রোলারে হাজারো মানুষ শহীদ হয় কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করে। ফিলিস্তিনেও গণতান্ত্রিকভাবে হামাসের বিজয়কে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে দিয়ে হামাস নেতা ও নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়্যাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। সেই অবধি হামাস গাজা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। মিসরেও নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা নিয়ে সময় ক্ষেপণ শুরু হলে আশঙ্কা করা হয়েছিল সামরিক হস্তক্ষেপের। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ হতে দেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটার পেছনে তাদের গঁষঃরঢ়ষব এধসব চষধহ কাজ করেছে। তাদের কোন কোন কংগ্রেসম্যান বা মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতিতে ইসলামপন্থীরা মাঝে মধ্যে খুশি হলেও মূলত তাতে তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তন হয় না। ইউরোপ-আমেরিকা মূলত নিজস্ব স্বার্থেই সব সময় পলিসি গ্রহণ করে; যে কোন দেশ তাদের স্বার্থ দেখবে তাই স্বাভাবিক। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই মধ্যপ্রাচ্যে রাজতান্ত্রিকভাবে মনোনীত আমির বা বাদশাহদের গদি রক্ষার চেষ্টা করে। আবার আলজেরিয়ায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতাসীন করে।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

SHARE

Leave a Reply