আরব বসন্ত বনাম সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের তাঁবেদারী

তানভীর আহমেদ

আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য। নাইন-ইলেভেন থেকে আরব বসন্ত। মাঝখানে ভূ-মধ্যসাগরের অনেক পানি গড়িয়েছে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ এখন ইসলামী দেশগুলোকে পিষে মারছে, যার সর্বশেষ শিকার হয়তো হতে যাচ্ছে সিরিয়া। এর আগে পশ্চিমা খপ্পরে পড়েছে মিসর, লিবিয়া, তিউনেশিয়া। উৎখাত হয়েছেন সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি। আমেরিকার সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ থেকে আরব বসন্ত’র বৈচিত্র্যময় বিশ্লেষণ করেছেন উফুক উলুতাস ও সাব্রিয়েন আমরভ। উফুক উলুতাস তুরস্কের আঙ্কারায় অবস্থিত এসইটিএ ফাউন্ডেশনের পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের পরিচালক। আর সাব্রিয়েন আমরভ সেখানকার একজন গবেষণা সহকারী। তাদের যৌথ একটি নিবন্ধ ‘মিডল ইস্ট মনিটর’ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। ছাত্র সংবাদের পাঠকদের জন্য প্রবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো।
জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণার প্রায় ১০ বছর পর আরব বসন্তের আগমন। আলোচিত নাইন-ইলেভেন বা ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বুশ প্রশাসনকে দেশে এবং দেশের বাইরে দুনিয়াজুড়ে একটি ‘ক্রুসেড’ শুরু করার উৎসাহ জোগায়। এই ক্রুসেডের উদ্দেশ্য ‘সন্ত্রাসবাদকে’ ধ্বংস করা, তা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন! এই ক্রুসেডের অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের তাবৎ রাষ্ট্রগুলোর ওপর তার সেই কুখ্যাত নীতি– ‘হয় তুমি আমাদের সঙ্গে, নয়তো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’, নীতি চাপিয়ে দেয়।
আরব বসন্তের সূচনাকাল, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে। আরবের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীগুলোও রাষ্ট্র ক্ষমতার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার জন্য সন্ত্রাসবাদের ট্রাম্প কার্ড ব্যবহার করতে শুরু করে। যখন এই অঞ্চলে ক্ষমতার চালিকা শক্তিতে উলট-পালট ঘটছে তখন পরবির্তনের জন্য লড়াই-সংগ্রামও স্বভাবগতভাবেই বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অন্যদিকে কায়েমি ক্ষমতাবানরাও পাল্টা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
আরব বসন্ত ঘিরে বেশিরভাগ বিতর্কই এটি সফল না ব্যর্থ; সাধারণত তার মধ্যেই আটকে রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে কোন ফ্যাক্টরগুলো আরব রাজপথের লড়াই-সংগ্রামকে গৌণ বা হেয় করে তুলতে পারে তা নিয়ে ভাবতে খুব কম সময়ই ব্যয় করা হচ্ছে।
এসব ফ্যাক্টরের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানটি হলো- স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বুশের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের তাঁবেদারিকে আত্মস্থ করছে। অথচ এ যুদ্ধ একান্তই পশ্চিমের নিজের প্রয়োজনে পরিচালিত। আরব বসন্তের প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যে আরব নেতারা নিজেদের কায়েমি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ব্যবহার করার ফলে আরব বিশ্বের এক মীমাংসাসূচক এবং ঐতিহাসিক মুহূর্ত হাইজ্যাক হয়ে যায়। ফলে আরব বসন্ত থেকে উদ্ভুত সত্যিকার ক্ষমতার পালাবদলের পথও রুদ্ধ হয়ে যায়।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের তাঁবেদারি বা আত্মস্থকরণ ফ্রানজঁৎ ফানোর ‘মিস রিকগনিশন’ বা ‘ভ্রান্ত স্বীকৃতি’র ধারণার সঙ্গে মিলে যায়। এর মাধ্যমে ফানো, ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো স্থানীয়দেরকে যেভাবে চিত্রায়ন করে এবং সে ধারণা আবার তাদের উপর চাপিয়েও দেয়। স্থানীয়রাও নিজেদের সম্পর্কে সেসবকেই সত্য বলে মেনে নেয়, এ বিষয়টা বুঝাতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে পশ্চিম একজন আরবকে, পশ্চিমের দৃষ্টিতে, তার বর্বর ও অসভ্য ইসলামি ঐতিহ্যের কারণে তাকে এক সন্ত্রাসী, রাগান্বিত এবং সহিংসতাকারী হিসেবে চিত্রায়িত করে।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হলো- আরব শাসকগোষ্ঠীও তাদের নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা এই ভ্রান্ত ধারণার ফটোকপি করেছেন। গাদ্দাফির লিবিয়া, সিসি এবং মোবারক উভয়েরই অধীনস্ত মিসর, বাথ পার্টির সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন এবং এমনকি ফিলিস্তিনি শাসকগোষ্ঠীও এ থেকে ফায়দা লুটতে চেষ্টা করেছেন। এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই নিজেদের ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’র ত্রাণকর্তা বা এই নকল যুদ্ধে নিজদের পশ্চিমের অংশীদার হিসেবে ঘোষণা করেন।
লিবিয়ায় গাদ্দাফি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে বিপ্লবীদের আশ্রয়দানকারী শহরগুলোকে টার্গেট করে এক কুখ্যাত এবং সহিংস অভিযান শুরু করেন। গাদ্দাফি গোষ্ঠী দাবি করে, স্বাধীনতাকামীরা লিবিয়ার বিপ্লবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন না বরং ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্নধারী আল-কায়েদা জঙ্গী গোষ্ঠীই এ বিপ্লবের নেতৃত্বে রয়েছে। এমনকি গাদ্দাফি তার শেষদিকের এক বক্তব্যে মারাত্মক ফ্যাসিবাদী বয়ানও হাজির করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি মরুভূমির সব লোকদের আমার সঙ্গে যোগ দেয়ার আহবান জানাই। আমরা লিবিয়া থেকে সন্ত্রাসবাদীদের ধুয়ে মুছে সাফ করব। এ লক্ষ্যে আমরা লিবিয়ার প্রতি ইঞ্চি মাটিতে, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি গলিতে সাঁড়াশি অভিযান চালাব।’
২০১১ সালের শুরুতে আরব বসন্তের সূচনাকালে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহের পতন চেয়ে রাজপথে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়। মার্চে প্রেসিডেন্ট আলী আব্দুল্লাহ সালেহও ‘আল কায়েদা ট্রাম্প কার্ড’টিই ব্যবহার করেন। তিনি প্রচারণা শুরু করেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সন্ত্রাসবাদীরা ইয়েমেনের সরকার ও দেশটিতে অবস্থিত পশ্চিমা স্বার্থের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করছে।
একইভাবে মিসরের জেনারেল সিসিও নিজেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধবাদী একজন গুরু হিসেবে হাজির করার চেষ্টা করেছেন। সিসির মতে, মিসরের সন্ত্রাসবাদ মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তাদের সমর্থকদের উৎপাদিত পণ্য। গত ৩০ জুন সিসি দেশব্যাপী বিশাল গণসমাবেশের ডাক দেন যেন জনগণ সেনাবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ করার একটি ম্যান্ডেট দিতে পারে। কিন্তু সত্য হলো- ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’র ধুয়া তুলে তিনি বরং তার সেনা অভ্যুত্থানের বৈধতা হাসিলের চেষ্টা চালান। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ধুয়া তুলেই আল সিসির সামরিক প্রশাসন সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী মিসরীয়দের হাজারে হাজারে হত্যা করার ম্যান্ডেট পেয়ে যান।
মিসরে এ ধরনের ভ্রান্ত প্রচারণা খোদ আরব বসন্তের মর্মের সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করে। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি বিপ্লবে মিশরীয়দের একটা প্রধান লক্ষ্য ছিল মিশর রাষ্ট্রের ওপর মোবারক গোষ্ঠীর আরোপিত প্রায় তিন দশকের স্থায়ী জরুরি অবস্থার ধ্বংস সাধন করা। এমনকি এর চেয়েও মর্মান্তিক বিষয় হলোÑ ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ এই মিথ্যা অজুহাতে সৌদি রাজা আব্দুল্লাহও মিসরীয় সামরিক জান্তাকে প্রকাশ্যেই সমর্থন দেন।
সৌদি বাদশাহ নিজের দেশে বা উপসাগরীয় অঞ্চলেও যে কোনো ধরনের গণআন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদের ছকের মধ্যে ফেলে দিয়ে দমন করার ন্যায্যতা উৎপাদনের জন্যই এ ধরনের অবস্থান নেন।
সিরিয়াতেও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই রেটরিক অত্যন্ত বেমানানভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা দেখা গেছে। আসাদ দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে সিরিয়া এবং ওই অঞ্চলের সন্ত্রাসবাদীরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তার যুক্তিতে, তার সরকার যে সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে তা ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থেই। এমনকি বিরোধীদের বিরুদ্ধে ক্র্যাকডাউনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত আসাদ তার এ দাবি অক্ষুণœ রেখেছেন। তিনি প্রতিটি প্রেস রিলিজ, সাক্ষাৎকার অথবা টেলিভিশন বক্তব্যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই বুলি আউড়ে চলেছেন।
২০০১ সালের ৯/১১’র পর আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসন পরিচালনাকারী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বুশের মতোই আসাদ তার বিরোধীদের ওপর ক্র্যাকডাউনের ন্যায্যতা প্রতিপাদনে বলেন, ‘আমি আমার জাতিকে সন্ত্রাসবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে চাই। সন্ত্রাসবাদীরা গোলমাল করছে। তবে ভয় নেই, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।’ ফলাফল প্রায় ২০ লাখ সিরীয় নাগরিক আজ উদ্বাস্তু এবং অন্তত এক লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের এই পশ্চিমা প্রকল্পের রেটরিকের অসদ্ব্যবহার করেছেন সেসব আরব রাজনীতিবিদরাও যারা আরব বসন্তকে পাশ থেকে দাঁড়িয়ে দেখেছেন। যেমন, কিছু ফিলিস্তিনি দলিল পত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এক সভায় ফিলিস্তিনি জ্যেষ্ঠ আলোচক সায়েব এরিকাত হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি ফিলিস্তিনি সেনাবাহিনী (পিএলএ) ভেঙে দেয়া হয় তাহলে ‘ওই অঞ্চলে মারাত্মক গোলযোগ শুরু হবে এবং ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ বিন লাদেনের অনুসারিদের হাতে চলে যাবে।’
অন্যভাবে বললে, ফিলিস্তিনি সেনাবাহিনী ওই অঞ্চলকে ‘সন্ত্রাসবাদের’ হাত থেকে রক্ষা করছে। সুতরাং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদেরই সহযোগিতা করা। মধ্যপ্রাচ্যের এসব রাজনীতিবিদরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে পশ্চিমাদের মতো নিজেদের যুদ্ধ হিসেবেই আত্মস্থ করে নিয়েছে। এর মধ্যদিয়ে তারা মূলত তাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে ট্যাগ করার সুবিধাটিই পেতে চায়। এক্ষেত্রে যারাই তাদের আর্থ-সামাজিক স্বার্থ ও ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে তাদেরই তারা সন্ত্রাসবাদের ট্যাগ লাগিয়ে দমন করতে উদ্যত হয়।
কিন্তু ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে’র এই নীতির তাঁবেদারি বা আত্মস্থকরণের বিড়ম্বনাটা হলো এই যে, এটি মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটা বিশেষ র্নিমাণ। যার মাধ্যমে হোয়াইট হাউস মূলত নিরাপত্তাভিত্তিক পদক্ষেপের আড়ালে পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে সহজেই নাক গলাতে পারছে।
অথচ ঔপনিবেশিক যুগের পর থেকে শুরু করে পশ্চিম থেকে উদ্ভুত সবচেয়ে বিপর্যয়কর এই পররাষ্ট্রনীতির তাঁবেদারি বা আত্মস্থকরণ ও এর সদ্ব্যবহার করেই মুসলিম বিশ্বের অনেকে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন বা এখনও আছেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো- যখন পুরোপুরি বৈষম্যমূলক একটি পররাষ্ট্রনীতি এমন একটি অঞ্চলের শাসকগোষ্ঠী বা রাজনীতিবিদরা আত্মসাৎ করে নেয় যে অঞ্চলকে পশ্চিমারা তাদের জাতীয় স্বার্থ এবং বিশ্বের জন্য সব হুমকির উৎস হিসেবে চিহ্নিত এবং সরাসরি টার্গেট করেছিল, তখন এটা কীসের লক্ষণ বা ইঙ্গিত বহন করে?
এই আত্মসাৎকরণ প্রক্রিয়া নিছকই অবচেতনে ঘটেনি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের পশ্চিমা প্রকল্পের এই তাঁবেদারি একটি সচেতন কৌশলও বটে। এর মধ্যদিয়ে আরব শাসক গোষ্ঠী নিজেদের পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে একাকার করে নিয়ে তাদের ক্ষমতার আসন পাকাপোক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছে। আর পশ্চিমা শাসকরাও তাদের সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখার জন্য এদের দশকের পর দশক ক্ষমতায় টিকে থাকতে সর্বাত্মক সহায়তা করে চলেছে।
আর ঠিক এই জায়গাটিতেই ফানো হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা বাকি দুনিয়াকে যেভাবে চিত্রায়িত করে অপশ্চিমারা যদি সেটাকেই সত্য মনে করে আত্মস্থ করে নেয় তাহলে বিপদ আছে। কারণ অবশেষে স্থানীয় শাসকগোষ্ঠী সর্বহারা হয়ে পড়তে বাধ্য।’
তিনি মনে করেন, ‘পরিস্থিতি এমনও দাঁড়াতে পারে যে, আখেরে কিছুই অর্জিত হয়নি, অথবা যা অর্জিত হয়েছিল বলে মনে হয়েছিল তাও ছিল ক্ষণিকের মায়া বা অলিক ছল মাত্র।’
এমনকি প্রকৃতপক্ষে, এসব শাসকগোষ্ঠী যে উপায়ে শাসন করছিল তা ছিল মূলত গণতন্ত্র ও ন্যায্য শাসনের এক প্রতারণামূলক ভিত্তিমূলের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকন্তু, ‘বুশ ডকট্রিন’কে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে আত্মস্থ করে নিয়ে আরব রাজপথের গণজাগরণকে দমন করার কৌশল ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো দুর্দশাগ্রস্ত করে তুলবে।
পরিবর্তনশীল আরব জগতের ওপর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নীতির আধিপত্য চাপিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ আরব জনগণ তাদের সকল ভিন্নতা সত্ত্বেও মতের ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং একটি সাধারণ প্লাটফর্ম তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এর উদ্দেশ্য হলো- তাদের সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এমন একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে সমষ্টিগতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
আরব বসন্ত আরব জনগণের যে আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে বিকশিত হয়, ফানোর ভাষায় তা হলো- ‘এক নতুন যাত্রা শুরু করা, চিন্তার এক নতুন ধারার উদ্বোধন ঘটানো এবং এক নতুন মানব গড়ে তোলা।’
অন্য কথায়, তাদের আত্মপরিচয়ের সংজ্ঞায়নে সক্রিয় কর্ম-তৎপরতা শুরু করা। এক্ষেত্রে পশ্চিমারা তাদের যেভাবে দেখতে চায় সে অধিপতি দৃষ্টিভঙ্গির নিছকই বিরোধিতা না করে অথবা সহগামী না হয়ে বরং নিজস্ব গতিপথ ও নিয়ত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের সামষ্টিক এবং ব্যক্তিগত আত্মপরিচয় নির্মাণ করার চেষ্টা চালানো। এজন্য কিছু মীমাংসামূলক চর্চারও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে প্রথমেই, আমাদের একটা বিষয় অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, আরব বসন্ত যেসব বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে নিয়ে আসে তার প্রধান একটি হলোÑ এই লড়াইকে ভ্রান্তিমূলকভাবে চিহ্নিত করা। যার ফলে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ স্লোগানটি দেশে এবং বিদেশে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার একটি সস্তা হাতিয়ারে পরিণত হয়।

SHARE

Leave a Reply