আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস -ড. মাহফুুজুর রহমান আখন্দ

[দ্বিতীয় কিস্তি]

আরাকানে রাজনৈতিকভাবে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটে মূলত ¤্রাউক উ শাসনামলে। লংগিয়েত রাজবংশের শেষ রাজা রাজাথুর পুত্র মিনসুয়ামুন ওরফে নরমিখলা ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে স্বীয় চাচা থিংগাথুকে উচ্ছেদ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। বর্মিরাজ মেঙ শো ওয়াই ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আক্রমণ করে নরমিখলাকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। বিতাড়িত নরমিখলা বাংলায় নির্বাসিত হন। তখন বাংলার শাসক ছিলেন ইলিয়াছ শাহি বংশের তৃতীয় সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ (১৩৮৯-১৪১৪ খ্রি.)। তিনি অত্যন্ত নরম ও বিশাল হৃদয়ের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শাসক ছিলেন। তিনি আশ্রয়প্রার্থী রাজা নরমিখলাকে রাজকীয় মর্যাদায় আশ্রয় প্রদান করেন। পরবর্তীতে বাংলার সুলতান জালালুদ্দীন মুহাম্মদ শাহের সহায়তায় ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশভূমি উদ্ধারের জন্য নরমিখলার সাহায্যে প্রেরণ করেন। নরমিখলা সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করে আরাকানের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে লঙ্গিয়েত থেকে ম্রোহং এ রাজধানী স্থানান্তর করেন এবং ম্রাউক-উ রাজবংশের শাসনামল থেকেই আরাকানে মুসলমানদের শক্তির প্রমাণ মেলে।
নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ দীর্ঘ ২৪ বছর বাংলার সুলতানদের আশ্রয়ে থেকে ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ শাহের সহযোগিতায় পিতৃরাজ্য আরাকান পুনরুদ্ধার করেন। বাংলার সুলতান দুই পর্বে তাকে যে পঞ্চাশ হাজার সৈনিক দিয়ে রাজ্য পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা করেছিলেন তার অধিকাংশ সৈনিকই ছিল মুসলমান। নরমিখলা আরাকানের রাজধানী লংগিয়েত পুনরুদ্ধার করে তাড়াতাড়ি সৈনিকদেরকে বাংলায় ফেরত দেবার পক্ষপাতী ছিলেন না; কেননা বার্মা রাজা পুনঃআক্রমণ করলে তা মোকাবেলা করার মত সুলতান প্রেরিত সৈনিক ছাড়া কোন বিকল্প শক্তি তাঁর হাতে ছিল না। নরমিখলা প্রায় তিন বছর লংগিয়েতকে রাজধানী রেখে আরাকান শাসন করলেও বর্মিদের হাতে নিজকে নিরাপদ মনে করতে পারেননি। তাই তিনি ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে লংগিয়েত থেকে স্থানান্তর করে আকিয়াব জেলার লেম্রু নদীর তীরবর্তী বর্তমান পাথুরে কেল্লা বলে পরিচিত প্রাচীন ম্রাইক-উ নগরীতে ম্রোহং নাম দিয়ে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। এ সময় থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বর্মিরাজা বোধাপায়া কর্তৃক আরাকান দখলের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৩৫২ বছরকাল ম্রোহংই আরাকানের রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। নরমিখলা ম্রোহংয়ে নতুন রাজধানী স্থাপন করার পর যে নতুন রাজবংশের সূচনা হয় তা প্রাচীন ম্রাউক-উ নগরের নামানুসারে ম্রাউক-উ রাজবংশ হিসেবে খ্যাত হয়।
নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ স্বীয় রাজ্য পুনরুদ্ধার করেই শাসন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করেন। মুদ্রা প্রচলনে তৎকালীন বাংলার খুব সুনাম ছিল। সোলায়মান শাহ বাংলার সুলতানদের অনুকরণে মুদ্রার প্রচলন করেন; যার এক পিঠে ফারসি অক্ষরে কালেমা ও শাসকের মুসলমানী নাম লেখা ছিল। রাজদরবারে মদপান মুক্ত রেখে রাজদরবারকে পবিত্র অঙ্গন মনে করে সেখানে অনৈতিক কর্মকান্ড নিষিদ্ধ করেন। সেই সাথে ইসলামের উদারনীতি গ্রহণ করে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতা অনুসারে সকলকে রাজ্যের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। এভাবে তিনি দরবারের আদব কায়দা ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালাতে বাংলার অনুকরণে ইসলামি ভাবধারা চালু করেন। বাংলায় আশ্রিত ২৪ বছরে সোলায়মান শাহ কুরআন, হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রে যে পান্ডিত্য অর্জন করেছিলেন তার প্রভাব শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিস্ফুটিত হয়েছিল। এর ফলেই অনেক লেখক সোলায়মান শাহকে একজন বিশ্বাসী মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সোলায়মান শাহ নতুন রাজধানী ম্রোহংকে সুরক্ষার নিমিত্তে বাংলার সেনাবাহিনীকে আরাকানের রাজধানীতেই স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য উৎসাহিত করেন। এ নিমিত্তে তিনি রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বাংলার সেনাসদস্যদের বসবাসের জন্য সেনাছাউনি নির্মাণ করেন। সেইসাথে মুসলমানদের মৌলিক ইবাদত ‘নামাজ’ আদায়ের জন্য গৌড়ীয় স্থাপত্যরীতিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন; পরবর্তীকালে এটি সন্ধিখান মসজিদ নামে খ্যাতি লাভ করে। মুসলিম সৈনিকগণ রাজধানী ম্রোহং কেন্দ্রিক বসবাস শুরু করে। সোলায়মান শাহের আরাকান পুনরুদ্ধার ও বাংলার মুসলমান সৈনিকদেরকে রাজধানী শহরসহ আরাকানের বিভিন্ন স্থানে বসবাসের ব্যবস্থাকরণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মুসলমানদের তৎপরতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি আরাকানের নদীনির্ভর ব্যবসা বাণিজ্যও সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের আওতায় চলে আসে। ফলে অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চলসহ নদীগুলোর দু’ধারে মুসলিম বসতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এগুলোর মধ্যে লেম্রু নদীর দু’তীরবর্তী সরা আও বন্দর, কোয়ালং, রাজার বিল, বল্দি পাড়া (পারিঁ), পংডু, কমবাওঁ, শিশারেক, মেলাতুডাইং, বটং, শান্ড, পিপারাং, দাসপাড়া, মেয়ংবুয়ে, বুতলুহুঁলিখং, হালিমপাড়া, পুরানপাড়া, ছিত্তাপাড়া, কত্তিপাড়া, পাইকপাড়া, চম্বলি, ক্কাইম ও বারবচ্চা প্রভৃতি অঞ্চল; মিংগান নদীর দুইধারে- জিচা, পাডং, জোলাপাড়া বাবুডাং অঞ্চল; কালাদান নদীর তীরবর্তী- চন্দমা, মিউরকুল, কাইনিরপরাং, ক্বাইমরপরাং, শোলি পেরাং, টংফরু, আকিয়াব, ডবে, আফকন চানকেরিঁ, কাজীপাড়া, কেয়দা, রমজুপাড়া, আমবাড়ি, টংটং নিরং, পল্লান পাড়া ও মেওকটং প্রভৃতি অঞ্চল; মায়ু নদীর দুই তীরে মচ্চায়ি, আংপেরাং, বাজার বিল, রৌশন পেরাং, জোপেরাং, ছমিলা, রোয়াঙ্গাডং, আলীখং, মিনজং, ছুয়েফ্রংডং, মরুছং, খোয়াচং, গওলাঙ্গ, লোয়াডং এবং নাফ নদীর তীরবর্তী- মংডু, ওলিডং, কাজীপাড়া, বলিবাজার, নাগপুরা, বুড়া, শিকদার পাড়া, কানরিপাড়া, হাবসি পাড়া, রাজার বিল, নূরুল্লাপাড়া, আলিছাঞ্জু প্রভৃতি অঞ্চল মুসলিম অধ্যুষিত হয়ে পড়ে। এ সময় এ সমস্ত অঞ্চলে মুসলিম প্রভাব তো প্রাধান্য বিস্তার করেই পাশাপাশি বাংলা ভাষাভাষীরও প্রভাব পরিলক্ষিত হয়; পাড়াকেন্দ্রিক আঞ্চলিক নামগুলো যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
পর্তুগিজ জলদস্যুদের সফলতায় মগেরাও জল দস্যুতায় নেমে পড়ে। মগ ও ফিরিঙ্গিদের সমন্বয়ে গঠিত জলদস্যু বাহিনী জলপথে এসে বারবার বাংলায় লুণ্ঠনকার্য পরিচালনা করত। তারা হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ধরে নিয়ে যেত। বন্দিদের হাতের তালু ছেদন করে পাতলা বেত চালিয়ে জাহাজের ডেকের নিচে পশুর মত বেঁধে রাখত এবং খাঁচাবদ্ধ মুরগির মত যৎকিঞ্চিৎ কাঁচা চাল ওপর হতে বন্দীদের উদ্দেশ্য ছুড়ে দিত তা খুঁটে খুঁটে খেয়ে জীবন বাঁচাতে হতো। এত কষ্ট ও অত্যাচারে যে ক’টা শক্ত প্রাণ বেঁচে থাকতো তাদের মধ্যে কাউকে ভূমি কর্ষণ ও অন্যান্য হীন কার্যে নিযুক্ত করত আর কাউকে দাক্ষিণাত্যের বন্দরসমূহে ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসি বণিকদের নিকট বিক্রি করত। কখনো কখনো তাদেরকে উড়িষ্যায় নিয়ে যাওয়া হতো। অনেক সময় সমুদ্রোপকূল হতে কিছু দূরে নোঙর ফেলে তারা লোক মারফত সরকারি কর্মচারীদের নিকট সংবাদ প্রেরণ করে মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দীদের ছেড়ে দিত। সম্ভ্রান্ত সৈয়দ বংশের অসংখ্য লোক থেকে শুরু করে সতী-সাধ্বী সৈয়দজাদীও তাদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ হয়ে যৌন উন্মাদনার বস্তু হিসেবে পরিগণিত হতো। দেশে যেখানে সেখানে তারা অগ্নিসংযোগ, গৃহদাহ, জাতিবিধ্বংসী কাজ করে বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে ছিল। মগদের অবাধ অত্যাচারে যেমন ‘মগের মুলুক’ তেমনি ফিরিঙ্গিদের কৃতকৃর্মের সাক্ষী হিসেবে ‘ফিরিঙ্গি খালি’ ‘ফিরিঙ্গির দেয়ানিয়া’ ‘ফিরিঙ্গি ফাঁড়ি’ ‘ফিরিঙ্গি বাজার’ প্রভৃতি জায়গায় তাদের অত্যাচারের করুণ কাহিনী জড়িয়ে আছে।
শাহাজাদা মুহাম্মদ সুজার আরাকান আশ্রয়কে কেন্দ্র করে ইতিহাসের আরেক অধ্যায়ের সূচনা হয়। মোগল সম্রাট শাহজাহানের (১৬২৭-১৬৫৮ খ্রি.) পুত্রদের ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে স¤্রাট আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলার কাছে পরাজিত হয়ে পরিবার পরিজন ও দেহরক্ষী ছাড়া পাঁচ শতাধিক অতি বিশ্বস্ত সেনাপতি ও সেনানায়কদের নিয়ে ৬ মে ঢাকা থেকে ভুলুয়ায় যান এবং ৬ দিন পরে ১২ মে আরাকানের রাজার পাঠানো জাহাজে তিনি ৩ জুন কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে দেয়াং পৌঁছেন এবং সেখান থেকে সড়ক পথে যাত্রা করে ২৬ আগস্ট আরাকানের রাজধানী ম্রোহং পৌঁছেন। আরাকানরাজ বিশ্বাস ভঙ্গ করে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ফেব্রুয়ারি শাহ সুজা ও পরবর্তীতে তাঁর পরিবার পরিজনকে হত্যা করে। আওরঙ্গজেব ভ্রাতৃহত্যার খবর শুনে প্রতিশোধ গ্রহণ কল্পে বাংলার সুবেদার শায়েস্তাখাঁকে আদেশ করেন। তিনি ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি আরাকানি বাহিনী ও জলদস্যুদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রাম দখল করেন। এভাবে ম্রাউক-উ-বংশের শাসনকালের সূচনা থেকে শাহ সুজার হত্যাকান্ডের সময় পর্যন্ত বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও বর্ণের লোক আরাকানে পাড়ি জমায়। রাজা বোধপায়া ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান জয় করে। থামাডা পরাজিত হয়ে সপরিবারে নৌকাযোগে চট্টগ্রামে পালিয়ে যাবার সময় বর্মি সেনাদের হাতে ধরা পড়ে এবং তাকে শিরñেদ করা হয়।

আরাকানে মুসলিম ঐতিহ্য ও
বাংলা সাহিত্যচর্চা
আরাকানি শাসকগণ মুসলমানি নাম গ্রহণপূর্বক রাষ্ট্রীয় বিচারকার্যে কাজি নিয়োগ ও দরবারি আদব কায়দায় ইসলামি অনুশাসনের বাস্তবায়নকে সামনে রেখে নরমিখলা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আরাকানের ম্রাউক-উ-রাজবংশকে অনেক গবেষকই আরাকানে মুসলিম শাসনের যুগ বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের কারো মতে, বিভিন্ন সময়ে মুসলমানরা বিভিন্নভাবে ইসলাম প্রচারের কাজকে ত্বরান্বিত করে এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যেই তারা সালতানাত গঠনের মত শক্তি সামর্থ্য অর্জন করে ইসলামের যুগস্রষ্টা ও শক্তিশালী মূল্যবোধকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তারা মনে করেন ম্রাউক-উ বংশের শাসনাকালের মধ্যে ১৪৩০-১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দের এ দু’শো আট বছরকে আরাকানের ‘মুসলিম শাসনের স্বর্ণযুগ’ বলা যায়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও পর্তুগিজ নির্বিশেষে সবাই প্রত্যক্ষ করেছিল যে, আরাকান একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। মুসলিম শাসনামলের দুশো বছরে আরাকানে শুধু মুসলমানদেরই নয় বরং সকলের ভাগ্যোন্নয়ন ঘটেছিল। বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক বেড়েছিল, ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি হয়েছিল; ফলে বিভিন্ন দেশের লোকজন ভাগ্যোন্নয়নের জন্য আরাকানে এসে ভিড় করেছিল। বস্তুত পক্ষে বাংলা-বার্মার রাজা ও সাধারণ জনগণের দৃষ্টি আরাকানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। ইসলামি জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা এতদূর এগিয়েছিল যে, কোন মুসলিম রাজার সিংহাসনে আরোহণের পূর্বে অভিজ্ঞ আলেমের নিকট দশ বছরকাল কুরআন হাদিস শিক্ষা নিয়ে ইসলামি জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ হতে হতো। তখন আরাকানের জাতীয় পতাকা, মুদ্রা ও পদকে ঈমানের চিহ্নস্বরূপ কালেমা এবং পৃথিবীর ওপর আল্লাহর শাসন কায়েমের অর্থবহনকারী ‘আকিমুদ্দিন’ এর ছাপ থাকতো, রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে ফারসি গ্রহণ করা হয়েছিল; যা ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অর্থাৎ আরাকান ব্রিটিশ শাসনাধীনে আসার পরও ২২ (বাইশ) বছর পর্যন্ত চালু ছিল। আরাকানের মোট ১৮ জন রাজার মুসলমানি নাম পাওয়া গেছে। তার মধ্যে নরমিখলা বা সোলায়মান শাহ থেকে শুরু করে রাজা থিরি থু ধম্মা বা দ্বিতীয় সেলিম শাহ পর্যন্ত মোট ১৬ জন রাজা মুসলমানি নাম গ্রহণ করেছিলেন।
আরাকান রাজসভায় বাঙালা সাহিত্য কিংবা ‘রোসাঙ্গে বাঙলা সাহিত্য’ কথাগুলো অনেক সময় বাংলা সাহিত্যের পরিচিত মহলকে অবাক করে দেয়। কেননা আরাকান বাংলার কোন অংশ নয় বরং এটি বার্মা বা মিয়ানমারের পার্শ্ববর্তী এককালের স্বাধীন সার্বভৌম রাজ্য হলেও বর্তমানে ‘রাখাইন স্টেট’ নামে পরিচিত তাদেরই একটি রাজ্য। সেখানে বাংলা সাহিত্যের চর্চা শুধু নয়, মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের রাজত্ব ছিল আরাকানে অবস্থানরত কবিদের হাতে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি চমকপ্রদ ঘটনা বৈকি। বিভিন্ন কারণে আরাকানে বাংলাসাহিত্যে বিকাশ ঘটে।
আরাকানের রাজসভার প্রধানমন্ত্রী, অমাত্য, সমর সচীব, মন্ত্রী, কাজি বা দেওয়ানি ফৌজদারি বিচারক হিসেবে মুসলমানদের নিয়োগ শুধু ছিল না, রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের সততা-আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের অনেক সুখ্যাতিও ছিল। তাঁরাই ছিলেন রাজার প্রধান উপদেষ্টা। অভিষেক অনুষ্ঠানসহ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানসমূহ তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। যেহেতু তাদের অধিকাংশেরই আদি নিবাস ছিলো চট্টগ্রাম কিংবা সিলেট অঞ্চল। সুতরাং রাজসভায় তাদের প্রতিষ্ঠা-সূত্রে আরাকানে নিজেদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রচার-প্রসারে তারা ব্যাপক সুযোগ পান। গৌড়ীয় মুসলিম সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সভ্যতা আরাকানিদের চেয়ে উন্নত হওয়ার কারণে শাসকদের পক্ষ থেকে কোন বাধা না এসে বরং সহযোগিতার পরিবেশ পাওয়া গেছে। ড. আহমদ শরীফের ভাষায়- পাড়া আছে, সমাজ আছে, নিজেদের আলাদা ভাষা আছে, স্বতন্ত্র বিশ্বাস-সংস্কার আছে, বিশিষ্ট নিয়মনীতি আছে, আছে রীতি-রেওয়াজও। কাজেই তাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রয়োজন পূর্তির জন্য, মানসচাহিদা পূরণের জন্য, মনের রসতৃষ্ণা মিটানোর জন্য সেখানে গুণীজন দিয়ে গান-গাথা-রূপকথা-প্রেম কথা জানানোর, রসকথা শুনানোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে, সৃজনশীল কেউ কেউ নতুন সৃষ্টি দিয়ে তাদের রসতৃষ্ণা নিবৃত্ত করেছে।” তাদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে দৌলতকাজী, আলাওল, মাগন ঠাকুর, নসরুল্লাহ খোন্দকার, আবদুল করিম খোন্দকার, কবি আবুল ফজল, কাজী আবদুল করিম, কাজী মোহাম্মদ হোসেন, ইসমাইল সাকেব, প্রমুখ প্রতিভাবান কবি প্রণয়োপাখ্যান ও রূপকথার কাব্য রচনা করে মধ্যযুগে বাংলাসাহিত্যের একটি স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করেছিলেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে যেমন বাংলার শাসকদের উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিল তেমনি আরাকানের অমাত্যসভার মুসলিম সদস্যগণেরও উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার ফলে আরাকানে বাংলাসাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ কর্তৃক আরাকান পুনরুদ্ধার করার পর আরাকানে মুসলিম রীতিতে বিচারব্যবস্থার প্রবর্তন হয় এবং মুসলমান বিচারক (কাজি) নিয়োগের মাধ্যমে আরাকানের বিচারকার্যক্রম পরিচালনা শুরু হয়। কবি দৌলতকাজী আরাকানের প্রখ্যাত বিচারকদের অধস্তন পুরুষ। শুধু তাই নয় তিনি নিজে একজন কবি এবং আরাকানের বিচারকও বটে। অনুরূপভাবে কাজী সৈয়দ সউদ শাহও আরাকানের কাজি ছিলেন। কাজীগণ শুধু বিচারকই ছিলেন না বরং ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রচারক অলিয়ে কামেলও ছিলেন। এছাড়াও পরবর্তীকালে শুজা কাজী, গাওয়া কাজী, নালা কাজী, কাজী আবদুল করিম, কাজী মুহাম্মদ হোসেন, কাজী ওসমান, কাজী আবদুল জব্বার, কাজী আবদুল গফুর, কাজী মোহাম্মদ ইউসুফ, কাজী নুর মোহাম্মদ, কাজী রওশন আলী প্রমুখের নাম পাওয়া যায়। উল্লেখিত কাজীদের মধ্যে সুজা কাজী সম্পর্কে জানা যায় যে, তিনি আরাকানের ম্রাউক-উ-শাসনের শেষ পর্বে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের বিচারক ছিলেন। এ সময় বোদাপায়া কর্তৃক আরাকান আক্রান্ত হলে তিনি তার পক্ষ অবলম্বন করেন এবং তাঁর সৈনিকদের পথ প্রদর্শনে সহায়তা করেন। এতে আরাকান বিজিত হলেও তাঁকে দক্ষিণ আরাকানের আচিরাং (বিচারক বা কাজী) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। কিছু দিন তিনি রাম্রীতে বসবাস করলেও পরে ক্বাইমে তার সদর দফতর প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকানের সাদা পাড়ায় শুজা কাজীর পাকা মসজিদ ও পাকা ঘাট সংবলিত দিঘীর ধ্বংসাবশেষ অদ্যাবধি বর্তমান আছে। মসজিদের নিকটে তার কবরও রয়েছে।

আরাকানে মুসলিম সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশ
আরাকানে হিন্দু সংস্কৃতি ও শিল্পকলার ধ্বংসস্তূপের ওপর বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটেছিল। অতঃপর ইসলামের প্রচার ও প্রসার শুরু হলে বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও শিল্পকলার পাশাপাশি সহাবস্থান হিসেবে মুসলিম সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশ সাধিত হয়। সপ্তম শতাব্দীর শেষ দিকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির উৎকর্ষের যুগে আরাকানে আরব মুসলিম বণিকদের মাধ্যমে ইসলামি সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয়। বাণিজ্যিক লেনদেন ও ইসলাম প্রচারের মিশনে মুসলমান বণিকগণ অষ্টম শতাব্দীর মধ্যেই কিছুটা সফলতা খুঁজে পায় এবং নবম শতাব্দীতে ক্ষুদ্র আকারে মুসলিম সমাজও গড়ে ওঠার ইঙ্গিত মেলে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাথে আরাকানের সীমান্তগত সম্পর্ক এবং কখনো আরাকানের শাসনাধীনে থাকার সুবাদে এ অঞ্চলে আগত মুসলিম বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, অলি ও সুফিদের মাধ্যমে আরাকানে ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ সহজতর হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও মোগলদের শাসনামলে গৌড় থেকে আগত মুসলমানদের সঙ্গে চট্টগ্রাম-আরাকান অঞ্চলের হিন্দু-বৌদ্ধদের কাছে ইসলামি আদর্শ আভিজাত্য হিসেবে দেখা দেয় এবং বিশেষত নিম্নবর্ণের নির্যাতিত হিন্দু-বৌদ্ধদের একটি অংশ ইসলামে দীক্ষা নেয়। ফলে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যেই আরাকানে ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। অতঃপর সোলায়মান শাহ কর্তৃক আরাকানি প্রশাসনে মুসলিম অমাত্যদের দায়িত্ব পালন ও প্রাধান্য শুরু হলে এ সংস্কৃতি রাজকীয় দরবারের মর্যাদা পেয়ে প্রতিষ্ঠা পাবার সুযোগ পায়।
আরাকানের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন হলেও রুচিশীলতার দিক দিয়ে ভারত ও বাংলার সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের ছিল। ইসলাম মানুষকে ঈমানিয়াতের বিশুদ্ধতার মাধ্যমে ভেতরের দিক থেকে পরিচ্ছন্ন করে। বিশেষত তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাতের ওপর ভিত্তি করেই মুসলিম সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মিত হয় বলে মুসলমানগণ মনস্তাত্ত্বিক ও বিশ্বাসগত দিক দিয়ে যেমন পরিশীলিত হয় তেমনি শারীরিকভাবেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে। সেই ভিত্তিতে মুসলমানরাই চুল ও নখের যতœ নেয়ার উন্নত পদ্ধতি চালু করেন। সেইসাথে পেশাব-পায়খানাসহ বিভিন্ন নাপাকি থেকে মুক্ত হবার জন্য সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন; গোসল-অজুর নিয়মিত প্রচলন, মহিলাদের ঋতুকালীন নাপাকি সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন ও নির্দিষ্ট দিনের শেষে ফরজ গোসল করে পবিত্রতা অর্জন, শিশু প্রসবের পর সাতদিন ও চল্লিশ দিনে পবিত্রতা অর্জন; ঈদ-জুময়া এবং মৃত্যুকালীন গোসল দেয়া প্রভৃতি নিয়মপদ্ধতি মুসলমানদেরকে রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান হিসেবে গড়ে তোলে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মত পোশাক পরিচ্ছদ বেশভূষাতেও মুসলমানগণ মননশীলতার পরিচয় দিয়েছে। আরাকানি মুসলমান পুরুষগণ ঢিলেঢালা জামা পরত, মাথায় টুপি-পাগড়ি প্রভৃতি ব্যবহার করত। মহিলারা ‘চুলি’ ও কোর্তা ব্যবহার করত। এ পোশাকগুলো গলা থেকে কোমর পর্যন্ত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে জুব্বার মত পায়ের পাতা পর্যন্ত ঝুলে থাকত। তবে অনেক ক্ষেত্রে গৌড়ীয় প্রভাবে মহিলারা শাড়িও ব্যবহার করত। এ ছাড়াও মেয়েরা কাঁচলি ও পাট্টা নামক বক্ষবন্ধনীও ব্যবহার করত। মহিলারা বাইরে যাবার সময় নিজেদেরকে আপাদমস্তক ঢেকে চলত যেন স্বামী ছাড়া অন্যকোন পুরুষ মুখও না দেখতে পায়। সেইসাথে কণ্ঠস্বরকে তারা নিম্নগামী করে রাখত।
খাদ্যাভ্যাস ও রান্নাপদ্ধতির ব্যাপারে মুসলমানদের বিশেষত সুলতানি ও মোগল শাসকদের সুখ্যাতি সর্বজন বিদিত। গৌড় ও দিল্লির প্রভাবে আরাকানের মুসলমানগণও এ রন্ধন পদ্ধতিকে অবলম্বন করে রুচিশীল খাদ্য গ্রহণ করত। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মত সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি মাছ ও আতপ চালের ভাত তাদের প্রিয় খাবার। মুসলমানগণ অতিথি আপ্যায়নে গরু ও খাশির মাংস ব্যবহার করত। শূকরসহ শরিয়ত নিষিদ্ধ প্রাণীর মাংস তারা ভক্ষণ করত না। খাদ্য গ্রহণ ও পানি পান পদ্ধতির ক্ষেত্রে মুসলিম সংস্কৃতিতে একটি ভিন্নমাত্রা ছিল। খাদ্য গ্রহণের পূর্বে ভালভাবে হাত-মুখ পরিষ্কার করে পরিচ্ছন্ন পাত্রে খাদ্য উঠিয়ে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে খাওয়া শুরু করত। পানি পান করার সময়ও বিস্মিল্লাহ বলে বসে থেকে অল্প অল্প করে তিন পর্বে পান করার তথ্যও পাওয়া যায়। অজুর শেষের অবশিষ্ট পানি, জমজম কূপের পানি প্রভৃতি দাঁড়িয়ে পান করতে কোন আপত্তি ছিল না।
সুরের চর্চা মুসলিম সমাজের স্বীকৃত বিষয়। পবিত্র কুরআন মজিদ সুর করে নিয়মানুবর্তিতার সাথে পাঠ করার আদেশ রয়েছে। আরাকানি মুসলিম সমাজে কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি সঙ্গীতেরও চর্চা করা হতো। আল্লাহর প্রশংসা, রাসূলের শানে দরূদ পাঠ, মানুষের বিভিন্ন সমস্যাকেন্দ্রিক সঙ্গীত ও সুরের চর্চা মুসলিম সমাজে চালু ছিল। এ সকল গানে কোন অশ্লীলতা ছিল না। মূলত এ সকল গানের মধ্যে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রেম, দেশ এবং জাতির সমস্যা ও কল্যাণের বিষয় ফুটে উঠত। গানের সাথে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার থাকলেও তা হারাম বলে মনে করতেন আরাকানের রক্ষণশীল মুসলমানগণ। এমনকি মহিলাদের সঙ্গীত চর্চাকে মুসলমানগণ অবৈধ বলে মনে করতেন। তবে বিবাহ অনুষ্ঠানকে আনন্দঘন করার জন্য তবলা, ডম্বুরু, ঢোল প্রভৃতি ব্যবহার করে গান গাওয়া হতো। এ সকল গানে অশ্লীল ভাষার প্রয়োগ ছিল না। তবে সঙ্গীত বিদ্যার চর্চা মুসলিম অমাত্য ও অভিজাতদের মধ্যে বেশ প্রচলিত ছিল।
আরাকানে মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশের সাথে সাথে ধর্মীয় প্রয়োজনেই স্থাপত্য ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটে। আরাকান অঞ্চলে ইসলামি সংস্কৃতি বিকাশের পূর্বেই পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ায় স্থাপত্য শিল্পকলার উৎকর্ষ সাধিত হয়। আরাকান-চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুসলমানদের মসজিদ, সমাধিসৌধ, দালানকোঠা প্রভৃতি নির্মাণের সময় মুসলমানদেরকে স্থানীয় ও সহজলভ্য মালমসলা, রাজমিস্ত্রি এবং পরিবেশের ওপর নজর রাখতে হয়েছে। বিশেষত আরাকান অঞ্চল বাংলার মতই নদ-নদী ও ঝড় বৃষ্টি প্রধান হওয়ার কারণে আরাকানের স্থাপত্য শিল্পসমূহ অনেকটা বাংলার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত কোন মসজিদের সন্ধান পাওয়া না গেলেও ‘বদর মোকাম’ নামে এক ধরনের মসজিদের প্রমাণ পাওয়া যায়। আকিয়াবের বদর মোকাম ছাড়া আরও অনেক ‘বদর মোকাম’ এর অস্তিত্বের কথা জানা গেলেও একমাত্র আকিয়াবের বদর মোকামটিই অক্ষত আছে এবং আরাকানের মুসলমানরা এখনও পর্যন্ত আকিয়াবের ‘বদর মোকামের’ যতœ করে আসছে।
আকিয়াবে অবস্থিত বদর মোকামে দু’টি দালান আছে। একটি টিলার উপরে। এটির উত্তর ও দক্ষিণ পার্শ্বে দুদিকে দুটি দরজা আছে। পশ্চিমের দেয়ালে বদর মোকামের মূল পরিচালকের নিযুক্তিপত্র ফারসি ভাষায় উৎকীর্ণ করা হয়েছে। এ মসজিদটি বৌদ্ধ প্যাগোডা ও ভারতীয় মসজিদের মিশ্র নির্মাণ শৈলীতে নির্মিত। আরাকানি জনগণসহ সমুদ্রপথে চলাচলকারী বণিক ও নাবিকগণ তাঁকে ব্যাপকভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা করে থাকে। পির বদর সমুদ্রপথে যাতায়াত করতেন বলে নাবিকরা তাকে ‘দরিয়াপির’ বলে বিশেষভাবে স্মরণ করে; এমনকি তাঁর আস্তানা, চিল্লাখানা বা দরগাহও সমুদ্রের উপকূলে। তাই তিনি হয়তো আরব দেশ থেকেই এসে থাকবেন। এক্ষেত্রে ড. আবদুল করিম মাহি আছোয়ার, হাজী খলিল প্রমুখ পিরদের মত এ পিরদেরকেও আরব থেকে এ অঞ্চলে আসার কথা বলেন। মূলত বদর মোকাম মসজিদ এবং আরাকানের মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতির বাহন ও প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পকলা।
আরাকানের আলেঝাইওয়া গামী রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে শান বাঁধানো পাড়সহ অবস্থিত দু’টি জলাশয়ের মাঝ পথে পাথরের দেয়ালে ঘেরা সুরক্ষিত স্থানে নির্মিত ‘সন্ধিখান মসজিদ’ চত্বরটি উত্তর দক্ষিণে ৬৫ ফুট এবং পূর্ব পশ্চিমে ৮২ ফুট। মসজিদের আয়তাকৃতি ৪৭ ´ ৩৩ ফুট। সামনে একটি বারান্দা ছিল। মসজিদ চত্বরের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব দিক থেকে মসজিদের বারান্দার সাথে সংযোগকারী চলাচলের রাস্তা ছিল। বারান্দা থেকে মূল মসজিদে প্রবেশ করার জন্য দুটি দরজা ছিল যা ধনুকাকৃতি ছাদযুক্ত। মূল মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে সরু জানালা আলো প্রবেশের জন্য নির্মিত ছিল। মসজিদের সামনের বারান্দাতে ধনুকাকৃতি ছাদ ছিল তবে ছাদের বাইরের দিকটা ছিল পূর্ব দিকে হেলানো; এটি মাত্র ৯ ফুট উঁচু ছিল। মূল মসজিদের ছাদ অর্ধ বৃত্তাকার বর্গাকৃতির গম্বুজ বিশিষ্ট। গম্বুজটি সিত্তা ওয়াং ও ডাক্কাথয়েন প্যাগোডার গম্বুজের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সম্পূর্ণ মসজিদটি সুন্দরভাবে সুখ- প্রস্তর দ্বারা নির্মিত ছিল। তবে তাতে কোন প্রকার অলঙ্করণ কিংবা কারুকাজ ছিল না। ব্রিটিশ শাসনামলে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ম্রোহংয়ের মুসলমান ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে মসজিদের মেরামত করেছিলেন। মসজিদটি তাদের তত্ত্বাবধানে চলত এবং মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন মুয়াজ্জিন ও খাদেম নিযুক্ত ছিল। স্থানীয় মুসলমানগণ নির্দিষ্ট ইমামের পেছনে এই মসজিদে নামাজ আদায় করত। কিন্তু মিয়ানমারের স্বাধীনতার পরে মসজিদটি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে।
আরাকানে ইসলাম সম্প্রসারণের সাথে সাথে শিক্ষারও ভীষণ গুরুত্ব দেয়া শুরু হয়। বিশেষ করে ইসলাম তথা পবিত্র কুরআন হাদিস শিক্ষাকে আরাকানের মুসলমানগণ বাধ্যতামূলক মনে করত। মুসলমানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে মূলত মসজিদকে ব্যবহার করা হতো। মসজিদের ইমাম বা মুয়াজ্জিনের ওপর গ্রামের ছেলেমেয়েদের প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। মুয়াজ্জিনকে মিয়াজী ‘মিজ্জি’ বলা হতো এবং তার পাঠদানকে বলা হতো ‘মিজ্জির দরস’। মসজিদভিত্তিক শিক্ষার যে পদ্ধতি ইসলামের সূচনালগ্নে সুদূর আরব দেশ থেকে আরম্ভ হয়েছিল আরাকানেও এ পদ্ধতি বাস্তবায়িত হয়েছে। এ পদ্ধতিতে শিক্ষা সম্প্রসারণ নিশ্চিত করার জন্য মসজিদের বারান্দা অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে রাখা হতো। সিন্ধি খান মসজিদেও ছাদযুক্ত বারান্দার কথা ইতোপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইমাম কিংবা মোয়াজ্জিন শিশুদেরকে পবিত্র কুরআন হাদীস ও বিভিন্ন মাসয়ালা মাসাইল শিক্ষা দিতেন।
মুসলমান সন্তান-সন্ততির জন্য মসজিদকেন্দ্রিক এ শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক মনে করা হতো। সন্তানের বয়স পাঁচ বছর হলেই তাকে ‘মসজিদের দরসে’ পাঠানো হত। শিশুর এ শিক্ষাকার্যক্রম বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হতো। ওস্তাদসহ অন্যান্য আলেম-উলামা ও বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বিদের উপস্থিতিতে এ অনুষ্ঠান সম্পাদন হতো। এ অনুষ্ঠানকে বলা হতো ‘বিসমিল্লাহ খানি’। এ অনুষ্ঠানকে যেমন গুরুত্ব দেয়া হতো তেমনি সন্তানের পিতা মাতাও নিজেকে ধন্য মনে করতেন। মুসলিম পরিবারে মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণকেও গুরুত্ব দেয়া হতো। মেয়েদেরও পাঁচ বছর বয়স হলে শিক্ষা আরম্ভ করতে হতো। কিন্তু মসজিদকেন্দ্রিক প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ ছাড়া উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ মেয়েদের কম ছিল। তবে ধনবান মুসলমানগণ বাড়িতে গৃহ শিক্ষক রেখে মেয়েদের শিক্ষা দিতেন। ‘বিসমিল্লাহ খানি’ অনুষ্ঠান হবার পরে প্রথম দিনই ঐ ছাত্র-ছাত্রীর হাতে খই, মুড়ি ও চালভাজা দেয়া হতো। ছাত্র-ছাত্রীরা ‘চাচ’ নামক এক প্রকার পাটিতে বসত আর শিক্ষক বসতেন জলচৌকি কিংবা পিঁড়ির ওপর। ছুটির পর নতুন পড়–য়ার সঙ্গে আনা খই মুড়ি ও চালভাজা সব ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো। মুদ্রণ প্রক্রিয়া, কাগজ কলম ও বইপত্র সহজলভ্য না হবার কারণে তৎকালীন সময়ে আরাকানে পাঠদান কার্যক্রম অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। বিত্তশালী মুসলমানগণ হাতের লেখা কোরআন সংগ্রহ করতে পারলেও সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানরা লিখিত কুরআন শরীফ সংগ্রহ করতে পারতো না। ফলে সাধারণত মুখে মুখে পবিত্র কুরআনকে শিক্ষা দেয়া হতো। শিক্ষা বাস্তবায়নে যেমন মসজিদের বারান্দাকে ব্যবহার করা হতো ঠিক সেভাবেই তৎকালীন আরাকানে বিভিন্ন সামাজিক বিচার আচার, ওয়াজ মাহফিল ও অন্যান্য সামাজিক প্রয়োজন পূরণের জন্য মসজিদের আঙিনাকে ব্যবহার করা হতো। কাজিগণ রাষ্ট্রীয় বিচারকার্য পরিচালনা করলেও স্থানীয় উলামা ও মুরুব্বিগণ বিভিন্ন সামাজিক বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনেও উলামাদের খুব মর্যাদা ও গুরুত্ব ছিল।
উপর্যুক্ত বিবরণে এ কথা সুস্পষ্ট যে, আরাকানে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে সেখানকার মানুষের লেনদেন, জীবন ও জীবিকার পদ্ধতি, চলাফেলার আদব কায়দা, খাওয়া দাওয়া, শিক্ষাদীক্ষা বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয় তেমনি বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা স্থাপত্য নিদর্শনেও স্ব স্ব বিশ্বাসের শিল্পরূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে হিন্দু বৌদ্ধ ও মুসলমান প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণে সফল ভূমিকা পালন করেছে। তবে এ কথাও সত্য যে, হিন্দু ও বৌদ্ধ একে অপরের দ্বারা নির্যাতিত হওয়া এমনকি এক হিন্দু অন্য হিন্দুর কাছে জাত ও বর্ণগত বৈষম্যের কারণে কিংবা বৌদ্ধদের মহাযান ও হীনযান ধর্মতন্ত্রের মতবিরোধে তারা নিজ ধর্মীয় লোকদের হাতে যেভাবে নির্যাতিত হয়েছিল ইসলাম আগমনের পর তার পুরো উল্টো চিত্র দেখা গেছে। শুধু মুসলমান-মুসলমানেই নয় বরং মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ সর্বোপরি জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আলাদা শিল্প ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের লালনকারী হলেও সকলে রাজ্যের উন্নয়নে ঐক্যের পরিবেশ বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। উভয় সম্প্রদায় হাজার বছর ধরে একই রাজ্যে পাশাপাশি বসবাস করার মিতালি ইতিহাস ও মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন সম্পর্কে না জানার কারণেই বর্তমানে আরাকানের মুসলমানগণ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অথচ আরাকানে উন্নতমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিনির্মাণে মুসলমানগণই প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। (চলবে)

লেখক : রোহিঙ্গা গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সৎধশযধহফধ@মসধরষ.পড়স

SHARE

Leave a Reply