আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা সমস্যা ও সম্ভাবনা -প্রফেসর ড. সাইয়েদ মুহাম্মদ আবু নোমান

মুসলমানদের ৮০০ বছরের ইতিহাসে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সোনালি ইতিহাসে শিরোনাম প্রবন্ধের প্রারম্ভে শিক্ষা কী? ইসলামী শিক্ষা কী? কেন? তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ আসা প্রয়োজন মনে করি।

শিক্ষা কী?
শিক্ষা একটি ব্যাপক বিষয়। একথায় এর সংজ্ঞা নির্ণয় করা কঠিন। শিক্ষা এত ব্যাপক যে, সমগ্র মানব জীবনে তা জড়িয়ে রয়েছে। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড ও মানুষ গড়ার সর্বোৎকৃষ্ট হাতিয়ার। শিক্ষা শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Educare হতে নির্গত। যার অর্থ হলো শিক্ষার্থীকে আপন বলে গ্রহণ করা, তার পরিচর্যা করা এবং উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করা। শিক্ষা শব্দটির ইংরেজি অনুবাদ হলো Education. Education শব্দের অর্থ হলো প্রতিপালন, শিক্ষাদান, শিখা, জানা, বুঝা ও অনুশীলন, Teaching, etc. Educate এর অর্থ হলো প্রতিপালন করা, শিক্ষিত করে তোলা, শিক্ষা দেয়া ও অভ্যাস করানো,to bring up and instruct to teach, to train.
Illustrated Oxford Dictionary Education শব্দটির তিনটি অর্থ বলা হয়েছে, (1) The process of teaching or learning, (2) The theory of practice of teaching, (3) Information about or training in a particular subject.
ইমাম রাগেব ইস্পাহানী বলেন- কোন বস্তুর মূল প্রকৃতি বা অবস্থার উপলব্ধিই হচ্ছে জ্ঞান বা শিক্ষা। মহাকবি মিলটনের মতে- Education is the harmonious development of body, mind and soul. অর্থাৎ দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধনই শিক্ষা। ড. আল্লামা ইকবাল বলেন- শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো খুদী বা আত্মার উন্নতি সাধন। খুদীর উন্নতি হলেই মানুষের সকল কর্মকাণ্ড সুন্দর ও সুষমামণ্ডিত হতে সক্ষম।
A.M. Chouwdhury বলেন, Education denotes the realization of innate human potentialities of individuals through the accumulation of knowledge.
তিনি বুঝাতে চেয়েছেন- শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞানের মাধ্যমে সুপ্ত সম্ভাবনার উপলব্ধি।
Oxford Dictionary তে Aim of Education হিসাবে লিখেছেন, Education is the acquisition of the art of utilization of knowledge.
শিক্ষা হলো জ্ঞানের প্রায়োগিক কৌশল আয়ত্ত করা, আর জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্য হলো বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্তাকে যথাযথ অনুধাবন করা।
Oxford Dictionary-তে বলা আছে Education is a process of teaching, training and learning to improve knowledge and develop skill.
শিক্ষা প্রকৃতপক্ষে এমন এক প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে জ্ঞানের বিকাশ, প্রশিক্ষণ ও উৎকর্ষ সাধন হয় এবং দক্ষতায় নিপুণতা অর্জিত হয়। কবি রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলির উন্নতি ও বিকাশ সাধনই শিক্ষা’। কবির সবচেয়ে সার্থক উপন্যাস “শেষের কবিতায়” মাসী মায়ের মুখ দিয়ে শিক্ষা সম্পর্কিত যে উক্তিটি উচ্চারিত হয়েছে, তাহলো পরশপাথর, আর তার থেকে ছিটকে পড়া আলোটাই হলো কালচার।
স্বামী বিবেকানন্দ ও মহাত্মা গান্ধী বলেছেন- মানুষ যে সকল গুণ নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করে, তার যথাযথ বিকাশ সাধনই প্রকৃত শিক্ষা।
অধ্যাপক Herman H Hore বলেন, শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বিকশিত মুক্ত সচেতন মানব সত্তাকে আল্লাহ্র সাথে উন্নতভাবে সমন্বিত করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া।
সক্রেটিস বলেন, নিজেকে জানার নামই শিক্ষা। তিনি বলতেন- Know thyself (নিজেকে জানো) সুতরাং মানুষের যাবতীয় জ্ঞানের জন্যই শিক্ষার প্রয়োজন। এদিক থেকে বিবেচনা করলে শিক্ষার সংজ্ঞা হবে আপন প্রয়োজনের তাগিদে জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থার নামই শিক্ষা। আর শিক্ষা হবে মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে এক চলমান প্রক্রিয়া, যা মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

ইসলামী শিক্ষা কী?
ইসলাম নিছক কোন অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়। ইসলাম এক মহা সত্য। একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। এর আদর্শ চিরন্তন শাশ্বত, চির আধুনিক, বাস্তবসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সর্বক্ষেত্রে এর আদর্শ ও বিধান পরিব্যাপ্ত। ইসলামই মানবতার একমাত্র গ্যারান্টি। ইসলামই মানবজাতিকে ইহজগৎ ও পরকালে শান্তি ও মুক্তি দিতে সক্ষম। এ ধারাবাহিকতায় শিক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও সুষ্ঠু দিকনির্দেশনা।
সুতরাং যে শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ ও জীবন বিধান হিসেবে শিক্ষা দেয়ার সুব্যবস্থা আছে, তাকেই বলা হয় ইসলামী শিক্ষা। এ শিক্ষা লাভ করার ফলে শিক্ষার্থীদের মন-মগজ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও চরিত্র এমনভাবে গড়ে উঠে বা বিকশিত হয়, যাতে ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জিত হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে শিক্ষার সঠিক ও যথাযথ সংজ্ঞাই নিরূপণ করা হয়েছে। যেমন সূরা বাকারার ১৫১ নং আয়াতে, সূরা আলে ইমরানের ১৬৪ নং আয়াতে এবং সূরা আল জুমআর ৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ তার রাসূলের দায়িত্ব ও কর্তব্যের তিনটি মৌলিক বিষয় উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, তিনি আল্লাহ্র আয়াত তিলাওয়াত করে শুনাবেন। দ্বিতীয়ত, তিনি কিতাবের জ্ঞান ও হিকমত শিক্ষা দেবেন এবং তৃতীয়ত, তিনি মানুষের আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটাবেন। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মহাকবি মিলটনের প্রদত্ত সংজ্ঞাটি আল কুরআনের দেয়া সংজ্ঞাটির অনেকটাই কাছাকাছি।
যে শিক্ষার মাধ্যমে ইসলামী আদর্শে লালিত একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা সৃষ্টি হয়, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কুরআন-সুন্নাহ্র যে দৃষ্টিভঙ্গি তা লাভ করা যায়, তার নাম হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা। এক কথায় যে শিক্ষা একদিকে যেমন বিজ্ঞ ফকিহ, মুজতাহিদ, ইমাম, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির, ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষক জন্ম দেবে, অপরদিকে তেমনি চিন্তা চেতনায় একজন খাঁটি মুসলিম বিজ্ঞানী, মুসলিম দার্শনিক, মুসলিম অর্থনীতিবিদ, মুসলিম রাজনীতিবিদ, মুসলিম বিচারক, মুসলিম রাষ্ট্রদূত ও মুসলিম সেনাপতি সৃষ্টি করবে। তারই নাম হচ্ছে ইসলামী শিক্ষা।
ইসলামী শিক্ষা মূলত তাওহিদ ও রিসালাতভিত্তিক শিক্ষাকে বোঝায়। এ শিক্ষার মূল উৎস হলো দু’টি: আল-কুরআন ও আল-হাদীস। এ দুটো নীতির অনুকরণের মাধ্যমে যে ব্যবস্থা প্রণীত হয়, তাকেই ইসলামী শিক্ষা বলে।

ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য
ইসলামী শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাপক। মূলত এর উদ্দেশ্য হলো আদর্শবান, চরিত্রবান, নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মঠ ও দক্ষ নাগরিক তৈরি করা। যাদের মধ্যে থাকবে আল্লাহভীতি, পরকালের জবাবদিহিতা, মানবীয় মূল্যবোধ ও উন্নত গুণাবলির সমাহার। ১৯৮৮ সালে মফিজ উদ্দীন আহমদ কর্তৃক প্রণীত শিক্ষা কমিশনের সুপারিশে বলা আছে যে, “শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হবে সুন্দর ও সুখী জনজীবন ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলা, নৈতিক, ধর্মীয় ও আত্মিক মূল্যবোধ সৃষ্টি করা, মানবিক গুণাবলি সাধন করা এবং চরিত্রবান মানুষ তৈরি করা। সেই সাথে সৃজনশীল, উৎপাদনক্ষম ও কর্তব্যপরায়ণ জনশক্তি তৈরি করার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে, যাতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
মিসরীয় শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক চৎড়ভবংংড়ৎ গড়যধসসধফ ছঁঃঁন তাঁর ঞযব ঈড়হপবঢ়ঃ ড়ভ ওংষধসরপ ঊফঁপধঃরড়হ প্রবন্ধে লিখেছেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামের কাজ হলো পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে লালন করা, গড়ে তোলা এমন একটি লালন কর্মসূচি, যা মানুষের দেহ, তার বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা, তার বস্তুগত, আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের একটিকেও পরিত্যাগ করে না। আর কোনো একটির প্রতি অবহেলাও প্রদর্শন করে না।
সক্রেটিস বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সত্যের আবিষ্কার ও মিথ্যা অপনোদন। প্লেটো বলেছেন, দেহ ও মনের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য। অ্যারিস্টটলের ভাষায় শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত কার‌্যাবলির মাধ্যমে সুখ আহরণ। হাবার্ড বলেছেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে শিশুর সম্ভাবনা ও অনুরাগের পূর্ণ বিকাশ এবং তার নৈতিক চরিত্রের আকাক্সিক্ষত আত্মপ্রকাশ। ফ্রোয়েবল এর ভাষায়, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে একটি সুন্দর, বিশ্বাসযোগ্য ও পবিত্র জীবনের উপলব্ধি।
সর্বোপরি ইসলামী শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে মানুষের মধ্যে পরকালের জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি করা। ইসলামী শিক্ষায় উত্তম চরিত্র গঠন ও নৈতিকতার বিষয়টি মুখ্য, কেননা শিক্ষা যতক্ষণ উত্তম চরিত্র গঠনে ব্রতী হবে না, ততক্ষণ তা তার আসল উদ্দেশ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে না। Professor Lester Smith বলেন, সমাজ সদৃশ ধারণার সাথে চরিত্র গঠনের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইমাম গাজ্জালী বলেন, শিক্ষাপদ্ধতি তরুণ মনকে শুধু জ্ঞানে পূর্ণ করতেই চাইবে না। একে অবশ্যই শিশুর নৈতিক চরিত্র সৃষ্টি এবং তার মনে সামাজিক জীবনের নৈতিক মূল্যবোধের ধারণা দিতে হবে।
Stanly Hall ও বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, if you give three ‘R’ ‘s i,e reading, writing and Arithmetic and do not give Fourth ‘R’ i,e Religion they are sure to become the fifth ‘R’ i,e Rascal. অর্থাৎ আপনি শিক্ষার্থীকে পঠন, পাঠন, লিখন ও অঙ্ক কষা শেখালেন কিন্তু ধর্ম শেখানো না হলে তারা দুষ্ট হতে বাধ্য।
যে শিক্ষায় আত্মার দৃঢ় ও আদর্শিক প্রয়োজনের দিকটা বিবেচিত হয় না, তা জাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আল্লামা ইকবালের ভাষায়-
জ্ঞান যদি নিয়োজিত হয় তোমার দেহের সমৃদ্ধির জন্য
তবে এ জ্ঞান হচ্ছে এক বিষধর সর্প
জ্ঞান যদি হয় তোমার আত্মার মুক্তির জন্য
তবে জ্ঞান হবে তোমার পরম বন্ধু, তোমার গর্ব।

রাসূলে কারীম সা. ছিলেন মানবতার মহান আদর্শ শিক্ষক। তিনি আদর্শ ও চরিত্রবান লোক তৈরির জন্য ইসলামী শিক্ষা প্রবর্তন করেন। মসজিদে নববীর আবাসিক-অনাবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আবু বকর রা., উমর রা., উসমান রা. ও আলী রা.-এর মত শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, খালিদ বিন ওয়ালিদ রা., সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা., হামযা রা. ও জাফর বিন আবি তালিব রা.-এর মত বীর সেনাপতি, ইবনে আব্বাস রা., ইবনে মাসউদ রা.-এর মত খ্যাতিমান মুফাস্সির, আবু হুরায়রা রা., আনাস রা., ইবনে ওমর রা., আয়েশা রা. ও উম্মে সালমা রা.-এর মত হাদীস বিশারদ ও ফকিহ, আমর ইবনুল আস রা., উবাদা বিন সামিত রা., আব্দুল্লাহ বিন হুযাফা রা. ও সালিত বিন উমরের মত কূটনীতিবিদ, মুয়াজ বিন জাবাল রা. ও আবু মূসা আশয়ারী রা.-এর মত অধ্যয়নশীল এবং আসেম বিন সাবেত রা., মুহাম্মদ বিন সালমা রা. ও কায়েস ইবনে সায়াদ রা.-এর মত পুলিশ অফিসারের জন্ম নেন। সুতরাং বলা যায় যে, মহানবী সা.-এর প্রবর্তিত ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সর্বকালের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য এক অনুকরণীয় মডেল স্বরূপ।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. আবু বক্কর রফিক আহমদ বলেন, ইসলামী শিক্ষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জ্ঞানের ইসলামীকরণ (Islamisation of Knowledge) তথা মানব সৃষ্ট ও অভিজ্ঞাতালব্ধ জ্ঞানকে ওহিলব্ধ জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত করা। এভাবে শিক্ষা হতে হবে বৃহত্তর কল্যাণে নিয়োজিত ও আল্লাহ্র আনুগত্যে পরিচালিত।

পাক-ভারত উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী ১২০১ (মতান্তরে ১২০৩) খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গদেশ জয় করেন। তিনি বঙ্গদেশে ইসলামী শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে অসামান্য অবদান রাখেন। বখতিয়ার খলজী একজন অত্যন্ত সচেতন ও দক্ষ শাসক ছিলেন বিধায় তিনি এ কথা গভীর দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলামী শিক্ষা সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন জনগোষ্ঠী তৈরি না হওয়া পর্যন্ত মুসলিম শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় ও মজবুত হতে পারে না। ফলে তিনি শিক্ষার জগতে বিপ্লব সাধনে সচেষ্ট হন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ বলেন, বখতিয়ার খলজী লখনৌতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করার পর তিনি তাঁর রাজ্যের প্রত্যেকটি এলাকায় প্রচুর সংখ্যক মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। এসব মাদরাসাগুলোতে কুরআন, হাদীস চর্চা হতো এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়েও শিক্ষাদান করা হতো। তাঁর পরবর্তী মুসলিম শাসকগণও এ ধারা অব্যাহত রাখেন। এ ছাড়াও আমির ওমরাহ, রাজকর্মচারী ও বিত্তবান লোকেরা শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী ছিলেন। তাদের মাধ্যমে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ইতিহাস সূত্রে জানা যায় যে, সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের (১৩২৫-৫১ খ্রি:) শাসনামলে দিল্লিতে এক হাজার মাদরাসা ছিলো। শিক্ষকদের সরকারি কোষাগার থেকে ভাতা প্রদান করা হতো। মাদরাসাগুলোতে দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি অঙ্ক ও দর্শনশাস্ত্র পড়ানো হতো। এ দেশ পৌনে দু’শত বছর ইংরেজদের দখলে থাকলেও ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদীরা হাজারো অপচেষ্টা চালানোর পরও মুসলমানদের ঈমানী জযবা, চিন্তা-চেতনা, তাহজিব-তমদ্দুন ও শিক্ষা-সংস্কৃতি একেবারে ধ্বংস করে দিতে পারেনি। বরঞ্চ এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল আদর্শবান ও দক্ষ মানুষ গড়ার অন্যতম কারখানা। মুহাদ্দিস শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা তিনি এখানে শিক্ষা ও হাদীস চর্চার ব্যবস্থা করেন এবং উচ্চ মানের মাদরাসা, খানকাহ ও মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন। শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার সুযোগ্য ছাত্র ও জামাতা শায়খ শরফুদ্দীন আল-মুনিরীও ব্যাপকভাবে হাদীস চর্চা ও ইসলামী শিক্ষার প্রসার ঘটান।
এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় বহু প্রতিষ্ঠান সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়। ম্যাক্স মুলারের এক শিক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ইংরেজ শাসনের পূর্বে শুধু বাংলাদেশেই ৮০ হাজার মক্তব ছিল। এসব মক্তবসমূহ স্থানীয় ধর্মপ্রাণ জনসাধারণের সহায়তায় পরিচালিত হতো এবং প্রতি চারশত লোকের জন্য একটি মাদরাসা স্থাপিত হয় বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাকতায় নিয়োজিত সাদাত, উলামা, মাশায়েখগণকে সরকারি তহবিল হতে বেতন-ভাতা দেয়া হতো। সুলতানি আমলে এগুলোকে ইনআম মিলক ও মদদ-ই মা’আশ বলা হতো। সুলতানি আমলে সদর উস-সুদুর এবং শায়খুল ইসলাম নামক উচ্চপদস্থ অফিসারগণ এগুলো তত্ত্বাবধান করতেন।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম লিখেছেন যে, বস্তুত মুসলিম শাসক শ্রেণি, পণ্ডিতবর্গ ও সুফিগণ এই তিন শক্তির বদৌলতে এদেশে মুসলিম সমাজের বিকাশ ও সমৃদ্ধি লাভ করে। মুসলিম সমাজের উন্নতি ও ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশ সাধনে উল্লিখিত সকল শ্রেণির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বিজিত শাসক শ্রেণির অবদান অনস্বীকার্য। কেননা তাদের মাধ্যমেই এদেশ বিজিত হয়ে মুসলিম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যথায় এতদঞ্চলে যেমনি মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতো না, তেমনি ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশও ঘটতো না।
ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর অবিভক্ত বাংলায় ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কারণে বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে মাদরাসা শিক্ষা অবহেলিত ও উপেক্ষিত হয়। ইংরেজ সরকার প্রথম দিকে শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ না করলেও কিছু মানবতাবাদী ইংরেজ প্রশাসক ব্যক্তিগতভাবে এদেশীয় শিক্ষার উন্নয়নে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখেন। তাঁদের মধ্যে স্যার ওয়ারেন হেস্টিংসয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মোল্লা মাজদুদ্দীন হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ও মোল্লা নিজামুদ্দীনের সুযোগ্য শিষ্য ছিলেন। ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে ২১ সেপ্টেম্বর কলকাতার বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃবর্গ বাংলার শাসনকর্তা লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁকে এ মর্মে অনুরোধ করেন, তিনি যেন মোল্লা মাজদুদ্দীনকে কাজে লাগিয়ে কলকাতায় মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দের দাবির প্রেক্ষিতে ওয়ারেন হেস্টিংস নিজ খরচে ১৭৮০ সালে ৩ অক্টোবর কলকাতা আলিয়া মাদরাসা স্থাপন করেন এবং আরবি ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী, বিশিষ্ট পণ্ডিত ও খ্যাতিমান ইসলামি ব্যক্তিত্ব মোল্লা মাজদুদ্দীনকে মাসিক ৩০০ টাকা বেতনের বিনিময়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করেন। অতঃপর ১৭৮২ সালে হেস্টিংসের প্রচেষ্টায় এ মাদরাসা সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়। এ মাদরাসা দারসে নিজামিয়ার পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালিত হয়। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ পাঠ্যসূচি বহাল থাকে। পরবর্তীতে এ পাঠসূচি পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। ১৯০৭ সালে এ মাদ্রাসয় কামিল (হাদীস) বিভাগ খোলা হয়। ১৭৮০-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় দেড় শতাব্দীর অধিককাল (১৬৭ বছর) ধরে অত্র প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার মুহাদ্দিস, মুফাস্িসর, মুবাল্লিগ, পীর মাশায়েখ, ইসলামি স্কলার, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ এবং রাজনীতিবিদের জন্ম হয়েছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভের বছরই কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মাদরাসার আলিম, ফাজিল ও কামিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে ঢাকার ইস্ট পাকিস্তান মাদরাসা এডুকেশন বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকারি ও সরকার অনুমোদিত সকল মাদরাসা এ বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হতো। ১৯৫০ সালে মাদরাসায় ‘দাখিল’ স্তর ও পাঠ্যসূচি প্রবর্তন করা হয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশের নাম ধারণ করে স্বাধীন হওয়ার পর মাদরাসার সিলেবাসের পরিবর্তন এনে ১৯৮৫ সালে দাখিলকে এস.এস.সি এর সমমান এবং ১৯৮৭ সালে আলিমকে এইচ.এস.সি এর সমমান মর্যাদা প্রদান করা হয়।
খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে সর্বপ্রথম চট্টগ্রামে ইসলামের আগমন ঘটে। এ কারণেই চট্টগ্রাম বাবুল ইসলাম তথা ইসলামের প্রবেশদ্বার নামে খ্যাত। বহু আরব বণিক, মুবাল্লিগ, পীর-আউলিয়া ও সুফি সাধক সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম ও আরাকান রাজ্যে প্রবেশ করে তারা চট্টগ্রামসহ বাংলার বিভিন্ন এলাকায় ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং আরব ব্যবসায়ীগণ মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী (মৃ. ১২০৬ খ্রি:) বঙ্গদেশ জয় করেন। তিনিই সর্বপ্রথম বাংলাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজ্যের প্রতিটি এলাকায় প্রচুর পরিমাণ মসজিদ, মাদরাসা, মক্তব ও খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে কুরআন-হাদীস চর্চা হতো এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয় ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে শিক্ষাদান করা হতো।
এ দেশে মুসলিম সমাজের উন্নতি ও ইসলামী শিক্ষা সংস্কৃতির বিকাশে সা’দাত ও ওলামা মাশায়েখদের অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁরা প্রত্যেকেই এদেশে ইসলামী ঐতিহ্যের আলোকে মুসলিম সমাজ বিনির্মাণে অবদান রাখেন। সা’দাত ও ওলামা মাশায়েখ দ্বারা গঠিত আহল-ই-কলম শ্রেণি দেশের বিভিন্ন স্থানে মক্তব, মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে শিক্ষাদানে নিয়োজিত ছিলেন। এর পাশাপাশি তাঁরা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর মূল্যবান গ্রন্থ রচনায়ও নিজেদেরকে ব্যাপৃত রাখেন।
এ মর্মে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম বলেন- The Saadat, Ulama and Mashaiekh played their due role in the strengthening of Muslim society and culture and in propagating Islam. These people, well versed in Islamic learning, must have taught the people in observing the Islamic principles and the institutions i-e, Mosque, Madrasah and Khanaqah afforded facilities to observe them.
১৯৯৩ সালে শিক্ষা বিভাগ প্রধান স্যার রবার্ট নাথন এর সভাপতিত্বে ঢাকায় এক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রস্তাবিত নিউ স্কিম পাঠ্যসূচি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই স্কিমের অধীনে মাদরাসার শ্রেণি কর্মগুলো দুইভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথমত, জুনিয়র ক্লাস। জুনিয়র ক্লাসসমূহের জন্য উর্দু, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস, ইংরেজি, আরবি সাহিত্য, ড্রইং, হস্তশিল্প, জ্যোতির্বিদ্যা এবং ড্রিল (শারীরিক কসরত) ইত্যাদি বিষয় রাখা হয়। দ্বিতীয়ত, সিনিয়র ক্লাসসমূহের জন্য আরবী সাহিত্য, ইংরেজি ও অঙ্কের উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। উল্লেখ্য যে, এই নিউ স্কিমে ফারসি ভাষাকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হয়। অথচ ইতঃপূর্বে পঞ্চাশ বছর আগেও কোর্ট কাচারি ও অফিস আদালতে ফারসি ভাষার প্রচলন ছিল ব্যাপক হারে। সুলতান মাহমুদ গযনভীর শাসনকাল থেকে নিয়ে কোম্পানির শাসনকাল (১০৩০-১৮৩৫ খ্রি.) পর্যন্ত ফারসি ছিল এ দেশের রাষ্ট্র ভাষা। সে জন্য এদেশে ব্যাপক হারে ফার্সি মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসা শিক্ষা সম্পর্কে এই স্কিম সরকারে বিশেষভাবে মনঃপূত হয়। সরকার এই স্কিম মঞ্জুর করেন। (নং-টি.জি. ৪৫০, তারিখ-৩ রা জুলাই, ১৯১৪) ১৯১৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে এই নিউ স্কিম কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ছাড়া বাকি তিনটি মাদরাসা যথাক্রমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতেও চালু করা হয়।
উল্লেখ্য যে, নিউ স্কিম তথা হাই মাদরাসা থেকেও বেশ কিছু জ্ঞানী-গুণী, বুদ্ধিজীবী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের জন্ম হয়েছে। যেমন তৎকালীন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরহুম আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম শাহ আজিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ হোসেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর ড. এম. এ বারী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুঈন উদ্দীন আহমদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সিরাজুল হক, পাকিস্তান জাতীয় সংসদের স্পিকার বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান, বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নুরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. মফিজুল্লাহ কবির, কিং আবদুল আজীজ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. মোহর আলী, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. কাজী দীন মুহাম্মদ, মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা এর প্রিন্সিপাল ড. এ. কে. এম আইয়ুব আলী, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ড. বাকী বিল্লাহ খান প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

পাক-ভারত উপমহাদেশ শিক্ষাব্যবস্থায় দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসার অবদান
মুসলিম উম্মাহ্র ইসলামী শিক্ষা, তাহজিব-তমদ্দুন, ঐক্য-সংহতি, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমুন্নত ও জাগরূক করে রাখা, সা¤্রাজ্যবাদ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ইসলামবিরোধী মানবরচিত যাবতীয় কুফরি মতাদর্শের মোকাবেলায় মুসলিম শক্তিকে সুসংহত করা কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে মুসলমানদের জীবন-যাপন ও আদর্শ সমাজ গঠনের মহান লক্ষ্যে খ্যাতিমান হাদীসবিশারদ, প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ আল্লামা কাসেম নানুতুবী (রহ.) (ওফাত: ১২৯৭হি:/১৮৮০খ্রি:) এর উদ্যোগে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলা দেওবন্দ শহরে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ নামক বিখ্যাত মাদরাসা, যা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত। অবিভক্ত বাংলার অসংখ্য মুহাদ্দিস, মুফাস্সির, মুবাল্লিগ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পীর মাশায়েখ, লেখক ও গবেষক এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন। অত্র প্রতিষ্ঠানের কীর্তিমান ছাত্রগণ পাক-ভারত উপমহাদেশে অসংখ্য মাদরাসা, মসজিদ, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং খানকাহ গড়ে তোলেন। এর ধারাবাহিকতায় দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় আদর্শ ও শিক্ষাপদ্ধতির আদলে বাংলাদেশের চট্টগ্রামস্থ হাটহাজারী উপজেলায় ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের প্রাচীন ও বৃহত্তম মাদরাসা আল জামেয়া আহ্লিয়া দারুল উলমু মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী। এতে দাওরায়ে হাদীস চালু করা হয় ১৯০৮ সালে। পরবর্তীতে দারুল উলুম দেওবন্দ ও দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসার সিলেবাস অনুসারে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব মাদরাসাকে কওমি মাদরাসা নামে অভিহিত করা হয়।
ইসলামি আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা ও বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ঢাকা, এর অধীনে পরিচালিত কামিল, ফাযিল, আলিম ও দাখিলসহ যে সব মাদরাসার বিজ্ঞান বিভাগ চালু আছে, এ বিভাগে অধিকাংশ ছাত্ররা মেধাবী, তারা ভালো ফলাফল করে দেশ জাতির সুনাম বয়ে আনে। দেখা যায় বিজ্ঞান পড়–য়া অনেক ছাত্র হাফিজ-এ কুরআন। পিতা-মাতা অনেক আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে আদরের সন্তানদের হক্কানী-রাব্বানী আলিম বানাবে এই সুন্দর মনোবৃত্তি নিয়ে তাদের মাদরাসায় ভর্তি করায় আর সেই ছাত্ররা যখন দাখিলে বিজ্ঞান নিয়ে ভালো রেজাল্ট করলো তখন ছাত্রসহ অভিভাবকের মনোভাব পাল্টিয়ে ফেলে পার্থিব জগতের প্রাপ্তির দিকে। দক্ষ আলিম বানানোর চিন্তাটি তখন গৌণ হয়ে যায়। পার্থিব বিষয়টি মুখ্য হয়ে যায়। College Going হিসাবে তার দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। বিজ্ঞান পড়–য়া এই মেধাবী ছাত্রটি মাদরাসায় আলিম অনার্স ও মাস্টার্স পর্যন্ত অধ্যয়ন করতো কিংবা আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মিসর, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, উম্মুলকোরা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে একজন ইসলামিক স্কলার হতে পারতো। সে বাংলাদেশ ও জাতির জন্য অনন্য অবদান রাখার সুযোগ হতো। আমরা মাদরাসার দাখিল ও আলিম পর্যন্ত মেধাবী ছাত্রদের ধরে রাখতে পারছি না। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। এর পেছনে অনেক যুক্তিসঙ্গত কারণও রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদেরও অনেক কমতি ঘাটতি এবং দৈন্যতা রয়েছে ভালোমানের শিক্ষকদের অভাব, শিক্ষক স্বল্পতা, মনিটরিং ও নিবিড় পরিচর্যার অভাব, উন্নত ক্লাসের অভাব। কিছু শিক্ষকের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা এবং মানসম্মত পাঠদান ও প্রাতিষ্ঠানিক আইন শৃঙ্খলার প্রতি দারুণ অবহেলা ইত্যাদিও অন্যতম কারণ।
স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয়ের শিক্ষক তিনি সেই বিষয়েই শ্রেণিতে পাঠদান করেন। কিন্তু মাদরাসা এর ব্যতিক্রমধর্মী। যেমন একজন আরবী প্রভাষক তিনি আরবী সাহিত্য ও কুরআন মাজিদ, হাদীস, ফিক্হ, উসুলে ফিক্হ, বালাগাত ও মানতিক ইত্যাদি বিষয়ে ক্লাস নিতে হয়। ফলে পাঠদানের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত মান সংরক্ষিত হয় না। আমার প্রস্তাব হলো, যিনি তাফসির বিভাগ থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি আলিমের কুরআন মাজিদ, ফাযিলের তাফসির উসুলে তাফসির প্রয়োজনে অনার্স-মাস্টাসের তাফসিরের সিলেবাস পড়াবেন। যিনি হাদীস বিভাগ থেকে পাস করেছেন দাখিল, আলিম, ও ফাযিলের হাদীস ও উসুলে হাদীস পাঠদান করাবেন বাকি বিষয়গুলা অনুরূপভাবে প্রায় সময় দেখা যায় দাখিল স্তরের একজন বাংলা শিক্ষক বাংলার পাশাপাশি সমাজ বিজ্ঞান ও ইংরেজি বিষয়ের ক্লাস নেন। স্কুল-কলেজে পাঠদানের এমন হ-য-ব-র-ল পদ্ধতি চালু আছে বলে আমার মনে হয় না। কলেজে প্রত্যেক বিষয়ে একাধিক প্রভাষক রয়েছে। সিনিয়র একজন বিভাগীয় প্রধান হিসাবে কাজ করে থাকেন। মাদরাসায় দীর্ঘ দিন যাবৎ এই পদ্ধতি চালু ছিল না। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০১৮ সালের জনবল কাঠামোতে মাদরাসায় আলিম পর্যায়ে একটি বিষয়ে দু’জন প্রভাষকের অনুমোদন দিয়েছে, এজন্য কর্তৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।
দীর্ঘদিন মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক ও আপামর সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর দাবির ফসল হিসাবে ফাযিলকে ডিগ্রি ও কামিলকে মাস্টার্স এর মান দেয়া হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স পরিচালনার জন্য ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁরই সহযোগিতায় স্বতন্ত্র মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য তাঁকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। মাদরাসাসমূহে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হলেও বিষয়ভিত্তিক এম.ফিল বা পিএইচ.ডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক নিয়োগের এ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। আমাদের একান্ত আশা সরকার উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে মাদরাসা সমূহের অনার্স-মাস্টার্স ক্লাসের জন্য বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন।
মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্সে কোর্সের উদ্বোধন একটি সোনালি অধ্যায়। তবে তা চারদলীয় সরকারের আমলে সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন ফাযিলকে ডিগ্রি ও কামিলকে মাস্টার্স এর মান প্রদান করার বিল পাস হয় এবং মহামান্য প্রেসিডেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত ও স্বাক্ষরিত হয়।
অনার্স ও মাস্টার্স পাস করার পর শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণা করার সুযোগ দেয়া আবশ্যক বলে মনে করি। তাদেরকে ইসলামি আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা এর অধীনে এম.ফিল ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ দিলে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা আরও গতিশীলতা লাভ করবে এবং শিক্ষার্থীগণও অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট এটাই আমাদের বিনীত প্রত্যাশা।
লেখক : অধ্যক্ষ, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদরাসা

SHARE

Leave a Reply