আলোকিত মন সমৃদ্ধ ভুবন -মাহাদী হাসান সানি

সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে আলো-আঁধারের আবর্তন। সেই সাথে চলে আসছে সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধ। সত্যকে সাধারণত তুলনা করা হয় আলোর সাথে আর মিথ্যার উপমা অন্ধকার। সত্য ও মিথ্যার এই যুদ্ধে সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। সে সমাজকে করে সুন্দর, নির্মল ও প্রাণচঞ্চল। প্রবহমান নদীর মত জীবনে প্রবাহিত করে শান্ত নীরব বায়ুধারা। গঠনমুখী ও কল্যাণমুখী চিন্তা প্রতিটি জীবনকে গড়ে তুলে মহৎ ও মহীয়ানরূপে। প্রীতি ও প্রেমে সিক্ত হয়ে তখন স্বর্গের সুখ ধূলির ধরায় নেমে আসে। ভরপুর অনাবিল হাসি ও আনন্দ সঞ্চারিত হয় জীবনের প্রতিটি প্রান্তরে। অন্য দিকে মিথ্যার অবস্থান ঠিক তার বিপরীত মেরুতে। সে সমাজকে করে কলুষিত, জীবনকে করে আগ্রাসী আর মরণকে করে বীভৎস। যে সমাজে সে সয়লাব হয় সেখানে মানবতা হয় নিষ্পেষিত, বিবেক হয় বিকৃত। ফলে অসহায়রা হয় বঞ্চিত, নিরপরাধীরা হয় লাঞ্ছিত আর জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। মানুষ তার মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে নেমে আসে পশুর স্তরে। সে তখন প্রদর্শন করে মানবিকতার পরিবর্তে হিং¯্রতা, কোমলতার পরিবর্তে কঠোরতা আর উষ্ণতার পরিবর্তে উন্মত্ততা। তার দাপটে সর্বদা আতঙ্কিত থাকে সমাজ। সে ভদ্র সমাজে বসায় বেহায়াপনা ও মদের আড্ডা আর মজলুমের ঘরে ঘরে চালায় প্রতিদিন জানাজা। চাকচিক্য আর তাক লাগানো রঙিন আভিজাত্যে সে আবৃত করে পুরো সমাজকে যার সবটাই থাকে মূলত অন্তঃসারশূন্য। অর্থহীন কাজ সমাদৃত হয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে আর মৌলিক চাহিদা উপেক্ষিত হয় করুণ আর্তনাদে। আর যখন মিথ্যার মোকাবেলায় সত্যের আগমন ঘটতে থাকে তখন মিথ্যা তার চূড়ান্ত রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে থাকে। সে সত্যকে পরাজিত করতে হীন সব কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়। সচ্চরিত্র নারীকে অপবাধ দেয় কলঙ্কের, দেশপ্রেমিককে বানায় দেশদ্রোহী এবং গুরু আসামির রশিতে ঝুলাতে চায় নির্দোষ বনি আদমকে।
এভাবে ক্রমাগত সত্য ও মিথ্যার যুদ্ধই এক সময় হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার ইতিহাস। কিন্তু আঁধার যত তীব্র হয় ততই নিকটবর্তী হতে থাকে তার বিদায়ের সময়। মিথ্যার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে ফুটে উঠতে থাকে সত্যের সোনালি আভা। সত্যের ধারালো তলোয়ারে দ্বিখন্ডিত হতে থাকে মিথ্যার প্রতিটি আবরণ। সে হয় মজলুমের সহায়ক, বিধবার অবলম্বন আর এতিমের অভিভাবক। ধনি-গরিব কিংবা সবল-দুবর্লের মাঝে গড়ে তোলে এক ভারসাম্যমূলক জীবনব্যবস্থা। সমাজের প্রতিটি স্তরকে সে নতুন করে ঢেলে সাজায় ফলে সমাজে নেমে আসে স্বস্তি, শান্তি ও সর্বোত্তম নিরাপত্তা। সত্যকে জানতে হলে প্রয়োজন একটি সুন্দর মন। আর সুন্দর মনের এর পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি রুচিকর পরিবেশ। একটি পরিবার, দল বা সমাজের সদস্যরা যখন একে অপরের প্রতি আন্তরিক, সহিষ্ণু ও ধৈর্যশীল হয় এবং সমাজের প্রতি হয় দায়িত্বশীল তখনই তা উপযোগী হয়ে ওঠে পরিশুদ্ধ মনের মানুষ জন্ম দেয়ার। যার সঞ্জীবনী সাহস ও শক্তি এই ধূলির ধরাকে পরিণত করে একটি বাহারি ফুলের বাগানে। ভ্রমরের গুঞ্জন আর প্রজাপতির রঙিন ডানায় স্বপ্নছবি একে মানুষ তখন প্রবেশ করে এক একটি নতুন সভ্যতায়। আকাশ ও জমিনের প্রতিটি বালিকণা থেকে শুরু করে প্রতিটি জলকণা সেই জনপদ আর সভ্যতাকে জানায় স্বশ্রদ্ধ সালাম ও অভিনন্দন।
সম্প্রতি বাংলাদেশসহ সমস্ত বিশ্বে সত্য ও মিথ্যার যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তাতে এক সময় সত্যেরই জয় হবে, এটিই স্বাভাবিক। হয়তবা এ পথের পথিকদেরকে আরো কিছুটা সময় ধৈর্য ও ত্যাগের নজরানা পেশ করতে হবে। এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের দোয়া মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই বলে দিয়েছেন, “বলো, হে আমাদের রব, আমাদেরকে যেখানে নিয়ে যাও সত্যের সাথে নিয়ে যাও, যেখান থেকে বের করে নাও সত্যের সাথে বের করে নাও এবং আমাদেরকে সাহায্যকারীরূপে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান কর।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৮০) সাথে সাথে তার পরের আয়াতেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, “সত্য যখন সমাগত মিথ্যা তখন বিলুপ্ত, আর মিথ্যাকে অবশ্যই বিলুপ্ত হতে হবে।” এ ঘোষণায় কোন ত্রুটি নেই, বিচ্যুতিও নেই। এটিই শাশ্বত ও চির অম্লান। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

SHARE