আল্লাহর নৈকট্য লাভে ঈমানের সহায়ক আমল -ড. মো: হাবিবুর রহমান

(দ্বিতীয় পর্ব)

পুণ্যকর্ম সম্পাদন ও হিফাজত করা
একজন মুমিন সব সময় পুণ্যকর্ম সম্পাদন করবে এবং পুণ্যকর্মে সহযোগিতা করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না।” (সূরা আল মায়েদা : ২)
মুমিন সর্বাবস্থায় পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে সেটাকে হিফাজত করবে, কারণ পুণ্যকর্ম নষ্ট করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার পাকানো সুতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে।” (সূরা আন-নাহল- ৯২)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, “তোমরা পুণ্য কর্মে দ্রুত অগ্রসর হও। কারণ শিগগিরই অন্ধকার রজনীর অংশের মত ফিত্না দেখা দেবে। তখন মানুষ সকালবেলা মু’মিন থাকবে, সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় মু’মিন থাকবে, সকালে কাফির হয়ে যাবে। তারা পার্থিব স্বার্থে দ্বীন বিক্রি করবে।” (সহীহ মুসলিম)

মাগফিরাতের পথে দ্রুত অগ্রসর হওয়া
ঈমানের সহায়ক ও ঈমান বৃদ্ধিকারী আমলের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে আপন প্রতিপালকের নিকট নাজাত ও জান্নাত প্রাপ্তির জন্য দ্রুত মাগফিরাতের পথে অগ্রসর হওয়া। এক্ষেত্রে কোন শৈথিল্য প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)
এই মাগফিরাত পাওয়া যাবে আল্লাহর রাস্তায় পূর্ণশক্তি দিয়ে জিহাদ করার মাধ্যমে, কারণ বদরের যুদ্ধের আগে রাসূল (সা) সাহাবীদেরকে যুদ্ধের কথা বলছিলেন আর একটু ইতস্তত করছিলেন, তখন মিকদাদ (রা) বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল (সা) (আপনি আমাদেরকে নিয়ে চলুন আল্লাহ আপনাকে যেদিকে নিয়ে যেতে বলেন) আমরা মুসা (আ)-এর উম্মতের মত বলব না যে, হে মুসা তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর আর আমরা আরাম করে বসে থাকব।”
বরং আমরা আপনার সাথী হয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকব যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের চোখের একটা পাতাও নড়ে। অর্থাৎ জীবন যতক্ষণ আছে ততক্ষণ আপনার সাথী হয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়তে থাকব। সাহাবীদের এমন মনোভাব দেখে রাসূল (সা) খুশি হয়ে বললেন, “(আমার সাহাবীরা তোমাদের মানসিকতা যখন এমন) তখন আমার সাথে চলো জান্নাতের দিকে যে জান্নাতের বিশালতা-প্রশস্ততা আকাশ আর জমিনের চেয়ে বেশি।” (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)

সকল অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা
সুখে-দুঃখে, বিপদ-মুসিবতে সকল অবস্থায় আল্লাহর ওপরে ভরসা করে জীবন পরিচালনা করা মুমিন জীবনের অন্যতম দায়িত্ব। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর কেবল আল্লাহর ওপরই মু’মিনদের তাওয়াক্কুল করা উচিত।” (সূরা ইবরাহিম : ১১)
রাসূল (সা) বলতেন, “হে আল্লাহ আমি আপনার জন্যই আত্মসমর্পণ করেছি, আপনারই প্রতি ঈমান এনেছি, আপনারই ওপর নির্ভর করেছি, আপনারই দিকে মনোনিবেশ করেছি এবং আপনারই জন্য কলহ করেছি।” (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)

মানুষদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকা :
ঈমানের সহায়ক ও ঈমান বৃদ্ধিকারী আমলের মধ্যে অন্যতম একটি আমল হচ্ছে মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করা। এটা মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবধারিত দায়িত্ব বা ফরজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর যেন তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে, ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আলে-ইমরান : ১০৪)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, “তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান কর এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর।” (সূরা আন নাহল : ১২৫)
এই পৃথিবীতে আল্লাহর পথে মানুষদেরকে আহবান করার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত?” (সূরা হা-মীম আস-সাজদা : ৩৩)
এ কাজের উপকারিতা সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, “আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির মুখ উজ্জ্বল করবেন যে আমার থেকে কোন কিছু শুনেছে এবং যেভাবে শুনেছে সেভাবেই তা অপরের কাছে পেঁৗঁছে দিয়েছে। কেননা অনেক সময় যাকে পৌঁছানো হয় সে ব্যক্তি শ্রোতা অপেক্ষা অধিক রক্ষণাবেক্ষণকারী বা জ্ঞানী হয়ে থাকে।” (সুনান আত-তিরমিজি)
কেউ যদি আল্লাহর পথে মানুষদেরকে আহবান না করে তাহলে সে ব্যক্তির কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “তুমি তোমার রবের দিকে আহ্বান কর এবং কিছুতেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আল কাসাস : ৮৭)

নিজের কাছে রক্ষিত আমানতসমূহ আদায় করা :
আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত আমানত ও নিজের কাছে রক্ষিত মানুষের আমানতসমূহ হেফাজত করা এবং হকদারের হক তার কাছে ফেরত দেয়া ঈমানের অধিকারী একজন মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালা করবে।” (সূরা আন-নিসা- ৫৮)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের খিয়ানত করো না। আর খিয়ানত করো না নিজেদের আমানতসমূহের, অথচ তোমরা জান।” (সূরা আনফাল- ২৭)

মুসলমানদের মাঝে আপস-মীমাংসা করে দেয়া :
এই পৃথিবীর সবচেয়ে সহানুভূতিশীল মানবতার জন্য কল্যাণকামী জীবনব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম। ইসলাম মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে। তাই মুসলমানদের মধ্যে বিবদমান সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাদের ওপরেই অর্পণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় মু’মিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।” (সূরা আল-হুজুরাত- ১০)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “দ্বীন হচ্ছে কল্যাণকামিতা। আমরা বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিমদের ইমাম (নেতা) এবং সকল মুসলিমের জন্য।” (সহীহ মুসলিম)

পাড়া-প্রতিবেশীর হক আদায় করা :
আল্লাহ তাআলা তার ইবাদত করার সাথে সাথে পিতা-মাতা, নিকট-আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীর হক আদায় করার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। যার মাধ্যমে একজনের সাথে অন্য জনের সম্পর্ক অটুট হয়, সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা ইবাদত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতিম, মিসকিন, নিকট আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে।” (সূরা আন-নিসা- ৩৬)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “হযরত জিবরাইল (আ) আগমন করে আমাকে পড়শির বিষয়ে অবিরত উপদেশ দিতে লাগলেন। এমনকি আমার মনে হলো, হয়ত তিনি অচিরেই পড়শিকে ওয়ারিশ করে দিবেন।” (সহীহ আল-বুখারি)

আল্লাহর রাস্তায় উত্তম বস্তু ব্যয় করা :
আল্লাহর দেয়া রিযিক থেকে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, সমাজের অসহায় দরিদ্র মানুষের জন্য, ইয়াতিম-মিসকিন, অনাথ-অনাথিনীসহ সকলশ্রেণির অভাবগ্রস্তদের জন্য ব্যয় করা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন “হে মু’মিনগণ, তোমরা ব্যয় কর উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর ইচ্ছা করো না যে, তা থেকে তোমরা ব্যয় করবে। অথচ চোখ বন্ধ করা ছাড়া যা তোমরা গ্রহণ করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত।” (সূরা আল-বাকারা- ২৬৭)
এ সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আসমান ও জমিন, যা তৈরি করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা সচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩-১৩৪)
রাসূল (সা) বলেছেন, “সর্বোত্তম দিনার হচ্ছে যা মানুষ পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য ব্যয় করে, উত্তম দিনার হচ্ছে যা মানুষ আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত পশুর জন্য ব্যয় করে এবং উত্তম দিনার হচ্ছে যা মানুষ আল্লাহর রাস্তায় নিয়োজিত সহযোগীদের জন্য ব্যয় করে।” (সহীহ মুসলিম)

পরিবার-পরিজনকে ইসলামের পথে পরিচালিত করা :
মুমিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে পরিবার পরিজনদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেয়া, তাদেরকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করা এবং দ্বীনের আলোয় আলোকিত করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে (জাহান্নামের) আগুন হতে বাঁচাও যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।” (সূরা আত-তাহরিম : ৬)
এ সম্পর্কে আরো বর্ণিত হয়েছে,“আর তোমার পরিবার-পরিজনকে সালাত আদায়ের আদেশ দাও এবং নিজেও তার ওপর অবিচল থাক।” (সূরা ত্বহা- ১৩২)
আমাদের অবহেলার কারণে যদি পরিবারের কোন সদস্য বিপথগামী হয়ে কুফরিতে নিমজ্জিত যায়, হিদায়াতের পথ থেকে গুমরাহির পথে চলে যায় সে কারণে কিয়ামতের দিন আমাদেরকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “আর কাফিররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নিচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়।” (সূরা হা-মীম আস-সাজদা : ২৯)

সুন্নাতের হিফাজত করা :
একজন মুমিনের দায়িত্ব হচ্ছে রাসূল (সা) এর সুন্নাতের অনুসরণ করা এবং সুন্নাতের হেফাজত করা। এর মাধ্যমে মুমিনের ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও।” (সূরা আল-হাশর-৭)
রাসূল (সা) বলেন, “আমার সব উম্মত বেহেশতে যাবে। তবে যারা অস্বীকার করবে তারা ছাড়া। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! কারা অস্বীকারকারী? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করলো সে বেহেশতে প্রবেশ করলো, আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে সে অস্বীকার কারী।” (সহীহ আল-বুখারি)

ইসলামের ওপর অটুট থাকা :
ঈমানের অধিকারী প্রত্যেকটি মুমিন সকল অবস্থায় আল্লাহর ওপরে দৃঢ় ঈমান পোষণ করবে এবং তার রাস্তায় টিকে থাকার চেষ্টা করবে তবেই নিয়ামতভরা জান্নাতের অধিবাসী হতে পারবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের রব আল্লাহ অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, তাতে তারা স্থায়ীভাবে থাকবে, তারা যা আমল করত তার পুরস্কার স্বরূপ।” (সূরা আহকাফ- ১৩-১৪)

পিতা-মাতা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ভালো আচরণ করা :
একজন মুমিনের দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে পিতা-মাতার বন্ধু-বান্ধবদের সাথেও সদাচরণ করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “পুণ্যকর্মের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম পুণ্যকর্ম হচ্ছে, কোন ব্যক্তি তার পিতার বন্ধুদের সাথে সুআচরণ করা।” (সহীহ মুসলিম)

মেহমানকে সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা :
ঈমানের সহায়ক ও ঈমান বৃদ্ধিকারী আর একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে মেহমানকে সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে সে যেন অবশ্যই মেহমানকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে সে অবশ্যই আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখবে।” (সহীহ আল-বুখারী)

নিজের হাতে হালাল জীবিকা উপার্জন করা :
আল্লাহ তাআলা আল-কুরআনে বলেছেন, “অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।” (সূরা জুমা- ১০)
আল্লাহ তাআলা এখানে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিবিশেষকে উদ্দেশ্য করেননি বরং সকল মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, নামায সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তোমরা জমিনে জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করো। নিজের হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। হালাল রিযিক উপার্জন করা, হালাল রিযিক ভক্ষণ করা একজন মুমিনের ঈমানকে বৃদ্ধি করে। আর হারাম ভক্ষণ করলে বান্দার কোন ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। তাই মুমিনের দায়িত্ব হালাল উপার্জন করা এবং হারাম উপার্জন পরিহার করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তাঁর অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকো। জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করো না। কোন ব্যক্তি তার জন্য নির্ধারিত রিযিক না পাওয়া পর্যন্ত মরবে না। যদিও তা পেতে কিছু বিলম্ব হয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং উপার্জনের উত্তম পন্থা অবলম্বন করো। হালাল পন্থায় উপার্জন করো এবং হারামের কাছেও যেয়ো না।” (সুনান ইব্ন মাযা)
আল-হাদিসে আরো বলা হয়েছে, “নিজের হাতে উপার্জিত জীবিকার চেয়ে উত্তম জীবিকা কেউ কখনো ভোগ করেনি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ) স্বহস্তে উপার্জিত সম্পদই ভোগ করতেন।” (সহীহ আল-বুখারি)

দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা এবং শিক্ষককে সম্মান করা :
একজন মুমিনের দায়িত্ব হচ্ছে দ্বীনের যথার্থ জ্ঞান অর্জন করা এবং যার কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেছে সেই শিক্ষককে সম্মান করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা করো, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করো, প্রশান্তি ও মর্যাদাবোধের জ্ঞান শিক্ষা করো এবং যার থেকে তোমরা ইল্ম শিক্ষা করো তাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করো।” (আল-মু’জামুল আওসাত ও আল-মু’জামুল কুবরা)

সন্তানদের সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেয়া :
মুমিন তার সন্তানদেরকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দিবে, শিরক-বিদায়াত থেকে বেঁচে থাকার জ্ঞান শিক্ষা দিবে এবং একজন খাঁটি ঈমানদার হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করবে। হযরত লুকমান (আ) তার সন্তানকে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে নসিহত করে বলেছেন, “প্রিয় বৎস, আল্লাহর সাথে র্শিক করো না; নিশ্চয় র্শিক হলো বড় যুল্ম’।” (সূরা লুকমান- ১৩)
তিনি তাঁর পুত্রকে আরো উপদেশ দিয়ে বলেছেন, “হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।” (সূরা লুকমান- ১৭)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা নিজেদের সন্তানদের সাথে কোমল ব্যবহার করো এবং তাদেরকে উত্তম তালিম ও তারবিয়াত প্রদান করো।” (সুনান ইব্ন মাযা)

গরিব-মিসকিনের অধিকার আদায় করা :
সমাজের গরিব-মিসকিনদের অধিকার আদায় করা, তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা একজন মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সব থেকে উত্তম কাজ কোনটি? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, কোন মুসলমানের অন্তরকে সন্তুষ্ট করা, সে যদি ক্ষুধার্ত থাকে তবে তাকে আহার দেয়া। যদি তার পরিধেয় বস্ত্র না থাকে, তাকে পরিধানের কাপড় দেয়া। যদি তার কোনো প্রয়োজন অপূর্ণ থাকে, তা পূর্ণ করে দেয়া।” (আল-মু’জামুল আওসাত)

ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা :
সমাজের সচ্ছল মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের ঋণগ্রস্তদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, এটা ঈমানের জন্য সহায়ক একটি কাজ। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করলে যার আনন্দ লাগে, সে যেন দরিদ্র ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় অথবা তার ওপর থেকে ঋণের বোঝা একেবারেই নামিয়ে দেয়।” (সহীহ মুসলিম)

শ্রমিকের মজুরি ঘাম শুকানোর আগেই পরিশোধ করা :
ইসলাম সবচেয়ে গুরুত্ব দেয় শ্রমিকের অধিকার আদায় করার ব্যাপারে। তাদের ওপরে কঠিন বোঝা চাপানোর ব্যাপারেও নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহও কারো ওপরে কোন কঠিন বোঝা চাপিয়ে দেন না। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কোন ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যরে বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা : ২৮৬)
আল-হাদিসে শ্রমিকের গায়ের ঘাম শোকানের আগেই তাদের মজুরি পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও।” (সুনান ইব্ন মাযা)

সন্দেহজনক কাজ বর্জন করা :
সর্বোত্তম ঈমানের মানদণ্ড হচ্ছে সন্দেহজনক হালাল থেকেও নিজেকে বিরত রাখা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট। এ দুয়ের মাঝখানে সন্দেহজনক কিছু জিনিস রয়েছে। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক গুনাহ বর্জন করবে, সে সুস্পষ্ট গুনাহ থেকে সহজেই রক্ষা পাবে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক গুনাহর কাজ করার দুঃসাহস দেখাবে, তার সুস্পষ্ট গুনাহর কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গুনাহর কাজগুলো হচ্ছে আল্লাহর নিষিদ্ধ এলাকা। যে জন্তু নিষিদ্ধ এলাকার আশপাশ দিয়ে বিচরণ করে, সে যে কোন সময় নিষিদ্ধ এলাকার ভিতরে ঢুকে পড়তে পারে।” (সহীহ আল-বুখারি)

অসহায়কে সাহায্য করা :
শুধু নামাজ-রোজা, হজ-জাকাত পালন করা, আর কিছু ভালো কাজ করাই পুণ্যের কাজ নয় বরং সমাজের অসহায়-দরিদ্রদের সাহায্য করা, তাদের অভাব-অনটনে সহযোগিতা করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুণ্যের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হলো যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতিম, অসহায়, মুসাফির ও প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে ব্যয় করা।” (সূরা আল-বাকারা-১৭৭)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজের ভাইকে পেট ভরে আহার করাবে এবং পানি দিয়ে তার পিপাসা মিটাবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন দোজখ থেকে সাত খন্দক দূরে রাখবেন। এক খন্দক থেকে অন্য খন্দকের দূরত্ব হবে পাঁচশত বছরের রাস্তা।” (আল-মুসতাদরিক আলা সহিহাইন)

সৎ পরামর্শ প্রদান করা :
একজন মুমিন সব সময় মানুষকে ভালো পরামর্শ দিবে, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “কোনো ব্যক্তি কাউকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করলে উদ্বুদ্ধকারী ব্যক্তি কাজটি সম্পন্নকারী ব্যক্তির তুল্য সওয়াব লাভ করবে। আর আল্লাহ বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা বড়ই পছন্দ করেন।” (মুসনাদ আবি হানিফা)

বড়দের সম্মান করা ও ছোটদের স্নেহ করা :
রাসূল (সা) বয়স্ক ও জ্ঞানীদেরকে সম্মান করতেন এবং ছোটদেরকে স্নেহ করতেন। আমাদের উপরেও দায়িত্ব রয়েছে বড়দের ও জ্ঞানীদের সম্মান করা এবং ছোটদের স্নেহ করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যারা বয়স্ক ও বুদ্ধিমান তারাই আমার কাছে (প্রথম কাতারে) থাকবে। এরপর যারা তাদের কাছাকাছি তারা দাঁড়াবে। তিনি তিনবার এ কথা বললেন।” (সুনান আত-তিরমিজি)
ছোটদের স্নেহ করা সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ছোটদের স্নেহ ও মমতা করে না এবং আমাদের বয়স্কদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে জানে না, সে আমাদের অন্তর্গত নয়।” (সুনান আত-তিরমিজি)

ইয়াতিমের প্রতি ভালো আচরণ করা :
ইয়াতিমদের সাথে ভালো আচরণ করা, তাদের সম্পদের হেফাজত করা একজন মুমিনের ওপর অবধারিত দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা ইয়াতিমদের ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “আর তোমরা ইয়াতিমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে দাও এবং তোমরা অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তু দ্বারা পরিবর্তন করো না এবং তাদের ধন-সম্পদকে তোমাদের ধন-সম্পদের সাথে খেয়ো না। নিশ্চয় তা বড় পাপ।” (সূরা আন-নিসা- ২)
ইয়াতিমদের রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “আমি ও ইয়াতিমের তত্ত্বাবধায়ক বেহেশতে এরূপ থাকব। (এই কথা বলে) তিনি নিজের তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করেন এবং আঙুল দুটোর মাধ্যখানে ফাঁক করলেন।” (সহীহ আল-বুখারি)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার মুসলমান মাতা-পিতার ইয়াতিম সন্তানকে লালন-পালন করে স্বাবলম্বী করে দেবে সে অবশ্যই জান্নাত লাভ করবে। আর কেউ কোনো মুসলমান গোলামকে মুক্ত করলে এ কাজ তার জন্য জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হবে। গোলামের প্রতিটি অঙ্গের পরিবর্তে তার অঙ্গসমূহ জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে।” (মুসনাদ আহমদ)

নারীদের প্রতি ভালো আচরণ করা :
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর।” (সূরা আন-নিসা- ১৯) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “আর তোমরা যতই কামনা কর না কেন তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান আচরণ করতে কখনো পারবে না। সুতরাং তোমরা (একজনের প্রতি) সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ো না, যার ফলে তোমরা (অপরকে) ঝুলন্তের মত করে রাখবে। আর যদি তোমরা মীমাংসা করে নাও এবং তাকওয়া অবলম্বন কর তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আন-নিসা- ১২৯)
রাসূল (সা) বলেছেন, “কোন মু’মিন পুরুষ অপর কোন মু’মিন নারীর সাথে দুশমনি পোষণ না করে। কারণ তার একটি দিক মন্দ হলেও অপর দিক সন্তোষজনক হবে।” (সহীহ মুসলিম)

স্ত্রীকে দেনমোহর প্রদান করা :
স্বেচ্ছায় সন্তুষ্টচিত্তে স্ত্রীকে দেনমোহর পরিশোধ করা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা নারীদেরকে সন্তুষ্টচিত্তে তাদের মোহর দিয়ে দাও, অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য তা থেকে খুশি হয়ে কিছু ছাড় দেয়, তাহলে তোমরা তা সানন্দে তৃপ্তিসহকারে খাও।” (সূরা আন-নিসা- ৪)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “সেই শর্তটি পূরণ করা সর্বাধিক অগ্রগণ্য যার বলে তোমরা নারীর সতীত্বের মালিক হয়েছো। (অর্থাৎ দেনমোহর)” (সহীহ আল-বুখারী)

অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করা :
আল্লাহর সাথে এবং বান্দাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারসমূহ পুরণ করা একজন মুমিনের অপরিহার্য কর্তব্য। এর মাধ্যমে মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি পায়। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আ‘লামিন বালেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।” (সূরা আল-মায়েদা- ১)
অঙ্গীকারসমূহ পূরণ করার পাশাপাশি আরো ৫টি কাজের কথা আল-হাদিসে বর্ণিত আছে। তাহলো: (ক) সত্য কথা বলা, (খ) আমানতকে পূর্ণ করা, (গ) লজ্জাস্থানকে হেফাজত করা, (ঘ) চোখকে নিম্নগামী করা এবং (ঙ) হাতকে সংযত রাখা। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত উবাদাতা ইবন সামিত (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন, তোমরা যদি আমাকে ছয়টি বিষয়ের জামিনদার হও আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জামিনদার হব। ১. যখন কথা বলবে সত্য বলবে, ২. তোমাদের ওয়াদাসমূহকে পূর্ণ করবে, ৩. তোমাদের আমানতকে পূর্ণ করবে, ৪. তোমাদের লজ্জাস্থানকে হিফাজত করবে, ৫. তোমাদের চোখকে নিম্নগামী করবে এবং ৬. তোমাদের হাতকে সংযত রাখবে।” (মুসনাদ আহমদ)

মানুষের সাথে ভালো আচরণ করা :
একজন মুমিন অন্যের খারাপ কথা ও কাজের জবাবে খারাপ আচরণ ও খারাপ বাক্য বিনিময় করবে না বরং সব সময় তার সাথে উত্তম ব্যবহার করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’।” (সূরা আল-ফুরকান- ৬৩)
রাসূল (সা) বলেছেন, “যে তোমার সাথে মূর্খের মত ব্যবহার করে, তুমি তার সাথে বিজ্ঞতার সাথে আচরণ করো। যে তোমার প্রতি জুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করো। যে আত্মীয় তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সাথে সম্পর্ক জুড়ে রাখো।” (মুসনাদ আল-বারায)
অন্যের সাথে সব সময় ভালো আচরণ করলে চরম শত্রুও বন্ধু হয়ে যেতে পারে। এ সম্পর্কে আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আর ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত কর তা দ্বারা যা উৎকৃষ্টতর, ফলে তোমার ও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (সূরা হা-মীম আস্-সাজদা-৩৪)

বিবাহ করার ক্ষেত্রে পাত্র বা পাত্রীর দ্বীনদারীকে
অগ্রাধিকার দেয়া :
বিবাহ করার ক্ষেত্রে পাত্র বা পাত্রীর দ্বীনদারীকে অগ্রাধিকার দেয়া একজন মুমিনের দায়িত্ব। এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেছেন, “চারটি জিনিসের ভিত্তিতে কোন মেয়েকে বিবাহ করা হয়। মেয়ের ধনসম্পদের প্রাচুর্য, তার বংশীয় মর্যাদা ও সম্ভ্রান্ততা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারি। তবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দাও দ্বীনদার নারী লাভ করাকে।” (সহীহ আল-বুখারী)

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, উপরোল্লেখিত আমলগুলো একজন মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া আরো কিছু আমল রয়েছে যা বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ভালো আমল না মন্দ আমল তা অনুধাবন করা যায়। এ সকল আমলকে অন্তরের কষ্টিপাথরে বিচার করে যেটা ভালো সেটা গ্রহণ করা বা মেনে চলা এবং যেটা খারাপ সেটা পরিত্যাগ করা। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আবু উমামা (রা) হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! ঈমান কাকে বলে? বা উহার নিদর্শন বা পরিচয় কী? উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, তোমাদের ভালো কাজ যখন তোমাদেরকে আনন্দ দান করবে এবং খারাপ ও অন্যায় কাজ তোমাদেরকে অনুতপ্ত করবে তখন তুমি বুঝবে যে, তুমি মু’মিন ব্যক্তি।” (মুসনাদ আহমদ)
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply