আল্লাহর রহমতে সিক্ত বদর প্রান্তর -মাওলানা এ টি এম মা’ছুম

বিশ্ব প্রকৃতিতে মহান আল্লাহ তায়ালার বিধান চালু রয়েছে যার কারণে প্রাকৃতিক জগতের কোথাও কোন বিপর্যয় নেই, সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজ করছে। ঠিক মানবসমাজের মধ্যে শান্তি, স্থিতি ও নিরাপত্তার জন্য সে মহান আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে শেষ নবী, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা সা. পর্যন্ত হাজার হাজার নবী-রাসূলের আগমন ঘটে। আল্লাহর নবীগণ আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য আল্লাহর নির্দেশেই জিহাদ বা আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ ও স্বাভাবিক পথে মানুষের মন-মেজাজ, চিন্তা-চেতনা ও অভ্যাসের পরিবর্তন করে দুনিয়ায় কল্যাণধর্মী সমাজ কায়েম করেন।
নবী-রাসূলগণের এ আদর্শ আন্দোলনেরই সর্বশেষ নক্ষত্র ছিলেন শেষ নবী, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ মোস্তফা সা.। তাঁর নেতৃত্বে ইসলাম ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিপূর্ণতা লাভ করে। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে তিনি বিশ্ব মানবতার মুক্তির যে আন্দোলন করে গিয়েছেন তা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য একমাত্র আদর্শ আন্দোলন রূপে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে। তাঁর ২৩ বছরের আন্দোলনী জীবনের মৌলিকভাবে দু’টি অধ্যায় আমরা দেখতে পাই-
এক : মাক্কী অধ্যায়- হিজরতের পূর্ব যুগ সংগ্রামের যুগ এ সময়ে তিনি ইবাদত ও খিলাফতের দিকে বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানান এবং এ দু’য়ের ভিত্তিতে লোক তৈরি ও সংগঠিত করেন।
দুই : মাদানী অধ্যায়- হিজরতের পরের যুগ বিজয়ের যুগ এ সময়ে হুকুমতে ইলাহিয়া প্রতিষ্ঠা তথা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব জাহিলিয়াতের হাত থেকে উদ্ধার করে মহান আল্লাহ ও রাসূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।
মাক্কী অধ্যায়ের দীর্ঘ ১৩ বছর প্রিয় নবী সা. অত্যন্ত দরদভরা মন নিয়ে পথভ্রষ্ট আরব জাতিকে দ্বীনের দাওয়াত দেন। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি কোন জোরজবরদস্তি ও শক্তি প্রয়োগ করেননি, তবুও খোদাদ্রোহী শক্তি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে অন্যায়, অশোভন আচরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। তাঁর পরিচালিত মানবতার মুক্তির আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য কাফের খোদাদ্রোহী শক্তি সব ধরনের হীন ও নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করে চলছিল। আল্লাহর নবী সা. ও তাঁর সঙ্গী সাথীগণ ধৈর্যের সাথে এসব বাধা প্রতিবন্ধকতা ও যুলুম নির্যাতন সহ্য করে সামনের দিকে অগ্রসর হন।
তিনি চাইলে এসব বিরোধিতা মোকাবিলা করতে পারতেন। কারণ তিনি ও তাঁর সঙ্গী সাথীগণ বিদেশী কোন লোক ছিলেন না, মক্কারই স্থায়ী বাসিন্দা ও প্রভাবশালী পরিবারের লোক ছিলেন। তাছাড়া সে সময়ে সাধারণভাবে সকলেই তীর, তলোয়ারসহ অস্ত্রশস্ত্র সাথে রাখতে পারতেন তা বৈধ ছিল, আর এভাবে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত অবস্থায় বিচরণ করা আরবদের জীবনের একটা গৌরবময় দিক ছিল। তারপরও আল্লাহর নবী সা. কাফেরদের অত্যাচার যুলুমের মোকাবিলায় পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে মানবতার নবী, শান্তির নবী, শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলন পরিচালনা করেন। তৌহিদ, রেসালাত ও আখেরাতের ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে তিনি মানুষের চিন্তা-চেতনায়, আমলে-আন্দোলন পরিবর্তন এনেই স্বাভাবিকভাবে একটি বাঞ্ছিত বিপ্লব সৃষ্টিতে তৎপর ছিলেন। এ পথেই তাঁর আন্দোলন অভাবনীয় সফলতা অর্জন করে। এতো বাধার পরও যখন দ্বীনের আন্দোলন অগ্রসর হতে থাকে তখন খোদাদ্রোহী শক্তি যুলুম নির্যাতন আরো বাড়িয়ে দেয়, এক পর্যায়ে এসে মক্কী জীবনের শেষ দিনগুলোতে বিরোধিতা তীব্র আকার ধারণ করলে সাহাবাগণ আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হন। সর্বশেষ আল্লাহর নবীকে সা. দুনিয়া থেকে শেষ করে দেয়ার মত জঘন্যতম ঘৃণ্য সিদ্ধান্ত নিতেও কাফেররা দ্বিধা করেনি। যা ছিল কাফেরদের সীমাহীন বাড়াবাড়ি। তবুও আল্লাহর নবী সশস্ত্র প্রতিরোধের চিন্তা না করে হিজরত করে চলে যাবার জন্য আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় থাকলেন। এক সময়ে আল্লাহর হুকুম পেয়ে তিনি ও তাঁর সাথীগণ সহায়-সম্বল রেখে, নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে মদিনায় গিয়ে একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করেন এবং এ রাষ্ট্রের সাথে ইহুদি খ্রিষ্টানসহ সকলকেই শামিল করেন, ঐতিহাসিক মদিনা সনদে স্বাক্ষর করে সকলকে নিয়ে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলেন। কিন্তু না কাফেররা সেখানেও আল্লাহর নবী সা. ও মুসলমানদেরকে থাকতে দেবে না। মদিনা আক্রমণের জন্য তারা ষড়যন্ত্র শুরু করলো। পরিস্থিতি ঘোলাটে করার কোন চেষ্টাই তারা বাদ দেয়নি। তারা মদিনার ইহুদি সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাইর নিকট এ মর্মে চিঠি পাঠায় যে তোমরা মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছো তাকে হয়তো তাড়িয়ে দাও না হয় আমরা মদিনা আক্রমণ করে তোমাদের পুরুষদের হত্যা করব এবং মেয়েদের বাঁদী বানাব। এ চিঠি পেয়ে উবাই গোপনে ষড়যন্ত্র শুরু করে। প্রিয় নবী সা. তাকে ডেকে এনে এসব চক্রান্ত বন্ধের নির্দেশ দিলে সে আপাতত থেমে যায়। আল্লাহর নবী সা. ধৈর্যের সাথে অগ্রসর হতে থাকেন। মদিনার পক্ষ থেকে কোন উসকানিমূলক আচরণ করা হয়নি। কিন্তু তবুও কাফেররা তাদের তৎপরতা জোরদার করতে থাকলো। পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে লাগল, মদিনায় পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করতে হলো। রাষ্ট্রের সীমান্তে টহলের ব্যবস্থা করা ও কুরাইশদের গোয়েন্দা তৎপরতা দমনে এ সময় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা হয়। সীমান্তে প্রভাব বিস্তার ও বিভিন্ন গোত্রের সাথে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর হলো। এমনি অবস্থায় ২য় হিজরির শাবান মাসে কোরাইশদের এক বিরাট বাণিজ্যিক কাফেলা সিরিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মুসলিম অধিকৃত এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছে। কাফেলাটির সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আশরাফি মূল্যের ধন-সম্পদ, যুদ্ধের জন্য অস্ত্রশস্ত্র ও কাফেলার সাথে আবু সুফিয়ান ও আমর ইবনুল আসসহ ৩০-৪০ জনের মত তত্ত্বাবধায়ক ছিল। তারা নিজেরাই আশঙ্কা করলো যে মদিনার নিকটে পৌঁছলে মুসলমানরা হয়ত তাদের উপর হামলা করে বসতে পারে। কাফেলার নেতা ছিল আবু সুফিয়ান সে এ বিপদাশঙ্কা উপলব্ধি করে এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্য দ্রুত মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। ঐ লোকটি মক্কায় পৌঁছেই এই বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে তাদের কাফেলার উপর মুসলমানরা লুটতরাজ চালাচ্ছে সুতরাং সাহায্যের জন্য সবাই ছুটে চলো। কাফেলায় যে ধন-সম্পদ ছিল তার সাথে মক্কার অধিকাংশ লোকের স্বার্থ জড়িত থাকায় তা জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয় তাই কাফেলার সাহায্যের ডাকে সবাই সাড়া দিয়ে সহস্রাধিক লোকের এক বিরাট বাহিনী মদিনায় আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। পথিমধ্যে আবু সুফিয়ান খবর পাঠালো যে তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা নিরাপদে চলে এসেছে সাহায্যের আর প্রয়োজন নেই তোমরা ফিরে আস। কিন্তু আবু জেহেল ফিরতে রাজি হলো না। আবু জেহেলের সাথে মতভেদ করে জাহরা ও আদি গোত্রের প্রধানগণ প্রায় ৩ শত লোক নিয়ে মক্কায় চলে আসে বাকি এক হাজারের বিরাট বাহিনী নিয়ে আবু জেহেল ও অন্যান্য সর্দাররা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য অগ্রসর হয়। এর কিছুদিন পূর্বেই পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকায় যুদ্ধের অনুমতি দিয়ে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়, যা সূরা হজ্জের ৩৯ থেকে ৪১ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে (সিরাতে ইবনে হিশাম)।
প্রিয় নবী সা. কোরাইশ বাহিনীর অগ্রসর হবার খবর পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে পরিস্থিতি গভীর সংকটের দিকে এগুচ্ছে। এ অবস্থায় কোরাইশরা সফল হলে ইসলামের নাম গন্ধও থাকবে না। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্নে এবং আত্মরক্ষার স্বীকৃত অধিকার হিসেবে কোরাইশদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মোকাবিলা করার জন্য মহানবী সা. সিদ্ধান্ত নেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি অবতীর্ণ হলো যে বাণিজ্যিক কাফেলা নয় কুরাইশদের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রতিহত করাই আল্লাহর ইচ্ছা। প্রিয় নবী সা. আনসার ও মুহাজিরদের সাথে পরামর্শ করে সর্বসম্মতভাবে কুরাইশ বাহিনীর মোকাবিলায় যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে মদিনা থেকে যাত্রা করেন।
উভয় বাহিনীর অবস্থা
কুরাইশ বাহিনী -সংখ্যা-এক হাজারের অধিক।
ষ সে যুগের সব ধরনের অস্ত্রে সুসজ্জিত।
ষ যুদ্ধের বাহন ছিল অনেক : ৭ শত উট ও ১ শত অশ্ব।
ষ মক্কার প্রায় সকল নেতৃস্থানীয় লোক এ যুদ্ধে অংশ নেয়।
ষ সেনাপতি ছিল উতবা বিন রবিয়া।
ষ মদ, নারী, যুদ্ধ সঙ্গীতের মূর্ছনা সব কিছু নিয়ে এ বাহিনী যুদ্ধ উন্মাদনায় টগবগ করছিল।
ষ কুরাইশ বাহিনী বদরের যে স্থানে এসে অবস্থান নিয়েছিল যুদ্ধের জন্য তা ছিল সুবিধাজনক।
মুসলিম বাহিনী
অন্যদিকে রাসূলের সা. নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী বদরের অপর প্রান্তে এসে শিবির স্থাপন করে।
ষ সৈন্য সংখ্যা : তিনশতের কিছু বেশি।
ষ যুদ্ধসম্ভার ও রসদপত্র অপ্রতুল।
ষ যানবাহন ও যুদ্ধের ঘোড়া ছিল সামান্য সংখ্যক ;
ষ ৭০টি উট, ২টি অশ্ব, ৬ লৌহবর্ম ও ৮টি তরবারি ;
ষ যুদ্ধে মুসলমানদের অবস্থানস্থল ছিল অসুবিধাজনক ;
ষ মুসলমানদের শিবিরে ছিল এক ভিন্ন রকমের পরিবেশ।
ঈমানি জযবা, শাহাদাতের তামান্না, আল্লাহর ওপর একান্ত নির্ভরতা, আখলাকি সৌন্দর্য, নেতার জন্য নেতার নির্দেশে জীবন দিতে প্রস্তুত, সৈন্যবাহিনীর সুশৃঙ্খল অবস্থা সব মিলে এ বাহিনীটি এক নিঃস্বার্থ আল্লাহপ্রেমিক স্বর্গীয় বাহিনী রূপে প্রতিভাত হচ্ছিল।
১৬ই রমজান প্রিয় নবী সা. তাঁর কাফেলা নিয়ে বদরের কাছাকাছি পৌঁছলেন। এটি মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত একটি প্রান্তর। এখানে পৌঁছার পর জানা গেল যে কুরাইশ বাহিনী প্রান্তরের অপর সীমান্তে এসে পৌঁছেছে। তাই নবী সা.-এর নির্দেশে এখানে ছাউনি ফেলা হলো।
বদরের ময়দানে উপস্থিত দু’টি দলের ব্যাপারে সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হলো-
“নিশ্চয়ই সে দুটো দলের মধ্যে তোমাদের জন্য অনেক শিক্ষার নিদর্শন ছিল যারা পরস্পর (বদরে) যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। একটি দল আল্লাহর পথে লড়াই করছিল আর অপর দলটি ছিল কাফেরদের। এরা স্বচক্ষে তাদেরকে দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ যাকে চান তাঁকে তাঁর সাহায্য ও বিজয় দান করেন। এর মধ্যে চক্ষুষ্মান লোকদের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩)
যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার রহমত, বরকত ও সীমাহীন সাহায্য বাঁধভাঙা জোয়ারের মত আসতে শুরু করে। ১৬ তারিখ রাতে মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমতস্বরূপ দু’টি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলো-
প্রথমত: মুসলিম সৈন্যগণ অত্যন্ত প্রশান্তি ও সুনিদ্রার ভেতর দিয়ে রাত যাপন করলো প্রত্যুষে তারা সতেজ বল বীর্য নিয়ে ঘুম থেকে জাগলো।
দ্বিতীয়ত : রাতে খুব বৃষ্টিপাত হলো। তার ফলে লবণাক্ত জমি শক্ত হয়ে গেল এবং মুসলমানদের পক্ষে ময়দান খুব উপযোগী হয়ে গেল। অন্য দিকে এ বৃষ্টির ফলে কাফেরদের অধিকৃত অংশে পানি জমে কর্দমাক্ত হয়ে গেল যার কারণে তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে অসুবিধায় পড়ল। রাতে সমস্ত সৈন্য যখন বিশ্রাম নিচ্ছেন তখন মহান আল্লাহর নবী সা. রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল রইলেন। ১৭ই রমজান ফজরের পর তিনি মুসলিম সৈন্যদের সামনে জিহাদ সম্পর্কে এক উদ্দীপনাময় বক্তব্য রাখলেন। অতঃপর যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী সৈন্যদের শ্রেণিবিন্যাস করা হলো।
আল্লাহর দরবারে প্রিয় নবীর সাহায্য প্রার্থনা
ময়দানে যখন উভয় পক্ষের সৈন্যদল মুখোমুখি এসে দাঁড়াল একপক্ষ অন্যপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানায়। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলমানদের পক্ষ থেকে ৩ জন, কাফের বাহিনীর পক্ষ থেকে ৩ জন এগিয়ে আসল কিছুক্ষণের মধ্যে কাফের বাহিনীর ৩ জন নিহত হয়ে মাটিতে লুটে পড়ল এরপর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এ সময়ে নবী করীম সা. আল্লাহর দরবারের হাত তুললেন এবং অতীব বিনয় ও নম্রতার সাথে ফরিয়াদ জানালেন “হে আল্লাহ এই কুরাইশরা চরম ঔদ্ধত্য ও অহমিকা নিয়ে তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে এসেছে। অতএব আমায় তোমার প্রতিশ্রুত সাহায্য দান কর। হে আল্লাহ আজ এ মুষ্টিমেয় দলটি যদি ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে দুনিয়ায় তোমার বন্দেগি করার আর কেউ থাকবে না।” এক অসম যুদ্ধের প্রাক্কালে রহমতের নবীর সা. এ আকুতি কবুল হয়ে গেল। রাসূলের সা. দোয়ার পরপর আল্লাহ ফেরেশতাদের প্রতি অহি পাঠালেন-
“স্মরণ কর সে সময়ের কথা যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদেরকে তোমাদের রব যে আমি সাথে রয়েছি তোমাদের। সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির দৃঢ় করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেবো। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে হত্যা কর জোড়ায় জোড়ায়।” (সূরা আনফাল : ১২)
সূরা আনফালের ৯নং আয়াতে বলা হয়েছে-
“তোমরা যখন ফরিয়াদ করছিলে স্বীয় রবের নিকট তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদ কবুল করলেন যে আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব ধারাবাহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে।”
ফেরেশতাদের অবতরণ
বদরের প্রান্তরে তখন তুমুল যুদ্ধ চলছে। রাসূলের সা. নিকট জিবরাইল (আ) আসলেন সুসংবাদ নিয়ে। মহান আল্লাহর নবী সা. তাঁর জন্য তৈরি নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাথা তুলে বললেন আবু বকর খুশি হও তোমাদের কাছে মহান আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছেছে। হযরত জিবরাইল (আ) ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়ার আগে আগে আসছেন, ধুলো বালি উড়ছে। এরপর নবী সা. বর্ম পরিহিত অবস্থায় কামরার বাইরে এসে সম্মুখে অগ্রসরমান অবস্থায় কাফের বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলছিলেন যে এ দলতো শিগগিরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে। (সূরা ক্বামার : ৪৫)
সাহাবাগণ রাসূলকে সা. যুদ্ধের ময়দানে পেয়ে আরো উদ্দীপিত হল। নবী করিম সা. এক মুষ্টি বালি নিয়ে “চেহারা সমূহ বিকৃত হয়ে যাক” বলে কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন যা কাফেরদের প্রত্যেকের চোখে, মুখে, গলায় প্রবেশ করলো একজনও বাদ গেল না। এ কাজটিও মহান আল্লাহর সাহায্যের আরেকটি দিক বলে কুরআন ঘোষণা করেছে-
“সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি মাটির মুষ্টি নিক্ষেপ করনি যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে তখন তা নিক্ষেপ করেছিলেন স্বয়ং আল্লাহ।” (সূরা আনফাল : ১৭)
একদিকে আল্লাহর সাহায্য, অন্য দিকে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত দল মুসলিম বাহিনীর জীবন কুরবান করার অদম্য আগ্রহ ও দুশমনের ওপর আঘাত হানার ক্ষিপ্রতা। যা মহান আল্লাহর নাফরমান, চরম উদ্ধত্য ও অহমিকায় উন্মাদ যালিম কুরাইশ বাহিনীকে খুব সহসা ধরাশায়ী করে ফেলল, তাদের চোখের সামনে যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি উতবা সহ শায়বা, আবু জেহেল, উমাইয়াও তাদের প্রায় সব কমান্ডার হয়ত নিহত, না হয় আহত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছে দেখে গোটা বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে দিগি¦দিক ছুটাছুটি শুরু করলো। এক সহস্রাধিক সুসজ্জিত কাফের বাহিনী অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো, তাদের ৭০ জনের মতো বন্দি হলো। এ যুদ্ধে মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের উপর দীর্ঘ দিনের যুলুম-নির্যাতনের হোতা ও চরম সীমালাঙ্ঘনকারী কুরাইশ বাহিনীর মেরুদণ্ড একেবারেই ভেঙে দেন। যুগে যুগে এভাবেই খোদাদ্রোহী শক্তির দম্ভ চূর্ণ করে মহান আল্লাহর নবীগণ সত্য দ্বীনের ঝাণ্ডাকে দুনিয়ায় উড্ডীন করেছিলেন। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের মধ্যে ৬ জন মুহাজির ও ৮ জন আনসার শহীদ হন।
ফেরেশতাগণের সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
রাসূলে পাক সা.-এর ক্রীতদাস আবু রাফে বর্ণনা করেন যে, সে সময় আমি হযরত আব্বাসের ক্রীতদাস ছিলাম। হযরত আব্বাস ও আমার পরিবার ইসলাম কবুল করেছিল তবে তা আমরা গোপন রাখি। যুদ্ধে মুসলমানদের জয়ের কথা শুনে আমরা আনন্দ করছিলাম। এ সময় কাবার পাশে আবু লাহাব এসে বসলো আবু সুফিয়ানও সেখানে হাজির হলো এরা বদরের যুদ্ধে যায়নি; মক্কায় ছিল। চতুর্দিকে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আবু লাহাব জিজ্ঞেস করলো যুদ্ধের খবর কী? আবু সুফিয়ান বলল আমার কাছে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা পৌঁছেছে, তাহলো আমাদের বাহিনী সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করেছে তাদের কোন দোষ নেই।
প্রকৃতপক্ষে এমন গোরা চওড়া লোকদের সাথে আমাদের মোকাবিলা হয়েছিল যারা আকাশ ও জমিনের মাঝামাঝি চিত্রলা ঘোড়ায় সওয়ার ছিল। খোদার কসম তারা কোন কিছুই ছাড়ছিল না এবং কোন জিনিস তাদের মোকাবিলায় টিকতে পারছিল না। আবু রাফে বলেন আমি এ বর্ণনা শুনে বললাম খোদার কসম তারা ছিলেন ফেরেশতা এ কথা শুনে আবু লাহাব আমার মুখে সজোরে চড় দিল আমি তার সাথে লেগে গেলাম সে আমাকে উপরে তুলে আছাড় দিল ও প্রহার করতে লাগলো। এ অন্যায় দেখে উম্মে ফজল উঠে তাঁবুর এক কঞ্চি দিয়ে আবু লাহাবকে প্রহার করতে লাগলো এবং বললো সে দাস তার কেউ নেই বলে তুমি তাকে এভাবে মারবে তা হতে পারে না।
আবু লাহাব আঘাত খেয়ে অপমানিত হয়ে চলে গেল। এ ঘটনার ৭ দিন পর আবু লাহাব প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। তার অবস্থা এমন হলো যে, তার লাশের কাছে সন্তানরাও গেলো না। তিন দিন পর লোকে খারাপ বলবে ভয়ে একটি গর্ত খুঁড়ে সে গর্তে কাঠের মাধ্যমে ধাক্কা দিয়ে মহান আল্লাহ ও রাসূলের সা. এ দুশমনের লাশ ফেলে দিল ও পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে গর্তের মুখ বন্ধ করে দিল। বদর যুদ্ধের মাধ্যমে কোরাইশদের জন্য যে গজব নেমে এসেছিল আবু লাহাব তারই শিকার হলো। ইবনে সাদের বর্ণনায় হযরত ইকরামা রা. থেকে বর্ণিত আছে যে বদরের প্রান্তরে মানুষের মাথা কর্তিত হয়ে পড়ে ছিল। হাত, পা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল অথচ বুঝা যাচ্ছিল না যে কে তাকে মেরেছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একজন আনসারী মুসলমান একজন মোশরেককে ধরার জন্য দৌড়াচ্ছিলেন হঠাৎ সে মোশরেকের উপর চাবুকের আঘাতের শব্দ শোনা গেল কে যেন বলছিল যাও সামনে এগোও। সাহাবী লক্ষ্য করলেন যে সে চিৎ হয়ে পড়ে রয়েছে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন, রক্তক্ষরণ হচ্ছিল কিন্তু আঘাতকারীকে দেখা যাচ্ছিল না। এ বর্ণনা শুনে নবী সা. বললেন তা ছিল তৃতীয় আসমানের সাহায্য (মুসলিম দ্বিতীয়)।
আবু দাউদ মাজানি বলেন আমি একজন মুশরিককে মারার জন্য দৌড়াচ্ছিলাম তার গলায় আমার তলোয়ার পৌঁছার আগেই কর্তিত মস্তক মাটিতে গড়িয়ে পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম যে তাকে অন্য অদৃশ্য কেউ হত্যা করেছে। আরেকজন আনসারি হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে এলেন। আব্বাস বলেন, আল্লাহর শপথ আমাকে তো এ লোকটি গ্রেফতার করেনি। আমাকে মুণ্ডিত মস্তকের একজন লোক গ্রেফতার করেছে। সে সুদর্শন লোকটি একটি চিত্রল ঘোড়ার পিঠে আসীন ছিল। তাকে তো এখন দেখছি না। নবী সা. বললেন তিনি একজন ফেরেশতা ছিলেন।
মুসলমানদের অনেক দুর্যোগের দিনে ফেরেশতারা সাহায্য করেছেন কিন্তু বদরের মত আর কোন দিন তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি। অন্যান্য যুদ্ধে ফেরেশতারা সংখ্যা বৃদ্ধি করে ও রসদ জুগিয়ে সাহায্য করতেন। কিন্তু অসি চালনা করতেন না। (ইবনে হিশাম)
রণক্ষেত্র থেকে ইবলিসের পলায়ন
ফিরিশতা নাজিল হতে দেখে ইবলিস পালাতে লাগলো। সে সোরাকার সুরত ধরে যুদ্ধের ময়দানে ছিল, হারেস ইবনে হিশাম তাকে ধরে ফেললে ইবলিস তাকে এক ঘুষি মেরে ফেলে দিয়ে ছুটে চললো। মুশরিকরা বললো সোরাকা আমাদেরকে রেখে কোথায় যাচ্ছে। সে বললো আমি যা দেখতে পাচ্ছি তোমরা তা দেখতে পাচ্ছ না। এরপর সে গিয়ে সমুদ্রে আত্মগোপন করলো। (সূরা আনফাল : ৪৮)
বদর যুদ্ধ শুধু নিছক দু’টি দলের যুদ্ধই নয় বরং তা কিয়ামত পর্যন্তকার সময়ের জন্য সত্য-মিথ্যার ক্ষেত্রে মানবজাতিকে অসংখ্য শিক্ষণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে যাবে। এটাও আল্লাহর রহমতেরই ভিন্ন দিক।
১. এ যুদ্ধে গোটা মানবগোষ্ঠীকে মহান আল্লাহ তায়ালা দু’ভাগে বিভক্ত করে দেন এবং পুনরায় উভয়ের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কার্যক্রম ও নৈতিক বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেন।
২. এ দু’দলের মধ্যে শুধু বা ‘আল্লাহর দলই’ টিকে থাকবে। যারা ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের জন্য ধ্বংস, তাদের জন্য আজাব অপেক্ষা করছে।
৩. ইসলামের উপর টিকে থাকতে হলে আন্দোলন, সংগ্রামই একমাত্র পথ। জিহাদি জীবন ঈমানদারের ভূষণ, খাঁটি-অখাঁটি যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যম। (সূরা নিসা : ৭৬)
৪. মহান আল্লাহর অপরাজেয় শক্তি ক্ষমতা থেকে গাফিল হয়ে নিজের সমর্থক ও সংখ্যা শক্তি, অস্ত্রবল, মদ-নারী, সাজ সরঞ্জামের অহংকার বিজয়ের জন্য মূল বিষয় নয়। বরং ঈমান, তাকওয়া, নৈতিক মান রক্ষা, তাওয়াক্কুল, সাহস-হিম্মত, আল্লাহর সাথে নিবিড় সম্পর্ক ও তাঁর নিকট ধর্না দিতে পারাই বিজয়ের জন্য প্রয়োজন যা মুসলমানদের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে ছিল। (সূরা আনফাল : ২২)
৫. ইসলামী জীবনব্যবস্থায় আমির বা নেতার আনুগত্য হচ্ছে দেহের ভিতর রূহের সমতুল্য। সাহাবায়ে কেরাম এক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ ছিলেন। তবুও আরো বেশি করে আনুগত্যের আহ্বান জানানো হয়।
৬. বাতিলের সাথে মোকাবিলার ক্ষেত্র হলো সমাজ, রাষ্ট্র ও যুদ্ধের ময়দান। ঘরের মধ্যে, চার দেয়ালের ভিতরে, বনে-জংগলে বসে থাকলে বাতিলের সাথে সাক্ষাৎ হবে না। যে ময়দান বাতিল শক্তি দখলে রাখতে চায়, যে ময়দানে বাতিল শক্তি আল্লাহর আইনকে উৎখাত করে নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী সকল মুমিন নারী-পুরুষকে সে ময়দানেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে এবং এ চ্যালেঞ্জে পিছপা হওয়া যাবে না। (সূরা আনফাল : ৬১)
৭. বিজয় সূচিত হলে অহংকার ও নিজের কৃতিত্ব জাহির করবে না বরং আল্লাহর প্রশংসা করবে যা বদরে মুসলিম বাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল। (সূরা আনফাল : ৪৭)
৮. বদরের যুদ্ধ ছিল ৩-৪ জন কাফেরের মোকাবিলায় মাত্র একজন মুসলমান। এ ধরনের একটি ভায়াবহ ও অসম যুদ্ধে গমনের পূর্বে আল্লাহর নবী সা. আনসার ও মুহাজিরদের পৃথক পৃথকভাবে মতামত জানতে চাইলেন। সবচেয়ে কঠিন অগ্নি পরীক্ষায় পড়লেন মুহাজিরগণ কারণ তাদেরকে যুদ্ধ করতে হবে তাদেরই ভাই, বন্ধু, আত্মীয় পরিজনদের সাথে, তলোয়ার চালাতে হবে তাদেরই আপনজন মক্কার লোকদের উপর। কিন্তু না কোন সমস্যা হলো না যারা দ্বীনকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছে; আল্লাহর সন্তুষ্টি যাদের একমাত্র কাম্য তাদেরকে অন্য কিছু ভাবিয়ে তুলতে পারে না। এ অবস্থায় মুহাজিরদের পক্ষ থেকে মিকদাদ ইবনে আমর বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর হুকুমে অগ্রসর হউন আমরা আপনার সাথে থাকবো। আমরা বনি ইসরাইলের মত বলব না যে, হে মূসা! তুমি এবং তোমার খোদা গিয়ে যুদ্ধ কর আমরা এখানে বসে থাকলাম, বরং আমরা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছি যে আপনি এবং আপনার রব যুদ্ধ করুন আমরা আপনার সাথে জান বাজি রেখে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব। অন্যদিকে আনসারদের জন্যও এ যুদ্ধে যাওয়াটা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ এ যুদ্ধে মদিনার ক্ষুদ্র অঞ্চলটিকে গোটা আরব দুনিয়ার সাথে প্রকাশ্য দুশমনির ও চিরদ্বন্দ্বের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেবে। কিন্তু মুহাজিরদের চেয়ে আনসারগণ পিছনে থাকার পাত্র নয়। আনসারদের পক্ষ থেকে হযরত সা’দ ইবনে মু’য়াজ বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়েছি, আপনি যে সত্য নিয়ে এসেছেন আমরা তার সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি অগ্রসর হউন, আপনি যদি আমাদের সাগরে ঝাঁপ দিতে বলেন আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে তাই করব, ইনশাআল্লাহ। আগামীকাল যুদ্ধের ময়দানে আমাদের কার্যক্রম ও তৎপরতায় আপনার চক্ষু শীতল হয়ে যাবে (ইবনে হিশাম)। আনসার ও মুহাজিরগণের মহান আল্লাহর জন্যে, রাসূলের সা. জন্যে ও সত্যের জন্য গভীর মহব্বত এবং জিহাদের ময়দানে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার মাধ্যমে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক কঠিন পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
৯. বদর যুদ্ধের মাধ্যমে রাসূল সা. প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হলো এবং তার বিস্তৃতির দ্বার উন্মুক্ত হলো। অন্যান্য তাগুতি রাষ্ট্রসমূহের পতনের পালা শুরু হলো এবং কালক্রমে হিংসা-বিদ্বেষ যুলুম-শোষণ, কলহ-বিবাদ ও মানবতা-মনুষ্যত্বের বিনাশ সাধনকারী ব্যর্থ রোম ও পারস্য সা¤্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করে ইসলাম অর্ধ পৃথিবীব্যাপী এক আলোকিত সমাজ মানবজাতিকে উপহার দেন।
সে সোনালি অতীত ফিরে আনতে হলে বদর প্রান্তরের সেনাপতি আখেরি নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর তখনকার সঙ্গী-সাথীদের হুবহু অনুকরণে আজকের মুসলিম তরুণদেরকে গড়ে উঠতে হবে, সংঘবদ্ধ হতে হবে মুসলিম দুনিয়াকে দ্বীন ও ঈমানের ভিত্তিতে। আর লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে অগণিত ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে চলা নব্য সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী ক্ষয়িষ্ণু শক্তির কবল থেকে বিশ্বকে ও মানবতাকে উদ্ধারের মহৎ কর্মকে।
আমরা তা পারলে সকল শক্তি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ যাঁর হাতে নিবদ্ধ, বদর, উহুদ, খন্দক, মুতা ও তাবুকসহ অসংখ্য স্থানে সাহায্য ও বিজয় দানের মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা এ যুগের মুমিনদেরকেও সন্দেহাতীতভাবে স্বর্গীয় সাহায্যে সিক্ত করবেন। সেটাই হউক আমাদের অঙ্গীকার।
লেখক : কলামিস্ট, গবেষক ও ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply