আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের দিন -মুহাম্মদ আসাদ উল্লাহ আদিল

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَاْلفَتْحُ (۱) وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُوْنَ فِيْ دِيْنِ اللهِ اَفْوَاجًا (۲) فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا (۳)

বাংলা অনুবাদ
১. যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে ২. এবং আপনি দেখবেন দলে দলে মানুষ আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে ৩. তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি মহা ক্ষমাশীল।

নামকরণ ও পরিচিতি
আল কুরআনের সূরাগুলোর নামকরণ করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। তাফসীরের পরিভাষায় যেটিকে توقيف من الله বলা হয়। এক্ষেত্রে দুটি মূলনীতি ১. সংশ্লিষ্ট সূরা থেকে একটি শব্দকে বাছাই করে নামকরণ করা। এ রকম সূরা সর্বমোট ১১১টি। ২. বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ্য রেখে সংশ্লিষ্ট সূরার নামকরণ করা। এ রকম সূরা মোট ৩টি। (সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা আল আম্বিয়া)। সূরা আন্ নছর এমন একটি সূরা যার প্রথম আয়াতের উল্লিখিত نصر শব্দকে নামকরণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। এ সূরার মধ্যে রাসূল সা.-এর বিদায়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে বিধায় এ সূরাকে সূরা আত্ তাওদি (سورة التوديع) বা ‘বিদায় দানকারী’ সূরা বলা হয়। (কুরতুবী)
ধারাবাহিকতার দিক থেকে পবিত্র কুরআনে সূরাটি ১১০ নম্বর স্থানে সন্নিবেশিত। এটি সর্বশেষ নাজিলকৃত পূর্ণাঙ্গ সূরা, যার আয়াত সংখ্যা ৩টি, শব্দসংখ্যা ১৯টি, বর্ণ সংখ্যা ৭৯টি, এটি মাদানী সূরা।

নাজিলের সময়কাল ও তাৎপর্য
ক) রাইসুল মুফাস্সিরিন হযরত আবদুল্লাহ ইবেন আব্বাস রা. একবার ওবায়দুল্লাহ বিন উতবা রা.কে জিজ্ঞেস করেন, আল কুরআনের কোন সূরাটি সর্বশেষ নাজিল হয়েছে জানো কি? ওবায়দুল্লাহ রা. বলেন, জানি ‘সূরা আন্ নছর’, ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছ।’ (মুসলিম-৩০২৪, তাফসীর অধ্যায়)
খ) আবদুল্লাহ ইবেন ওমর রা. বলেন, সূরাটি বিদায় হজে আইয়ামে তাশরিকের মধ্যবর্তী সময়ে মিনায় নাজিল হয়। অতঃপর তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে তাঁর প্রসিদ্ধ ভাষণটি পেশ করেন। (বায়হাকি-১৫২, ৯৪৬৪)।
গ) ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যখন সূরা নছর নাজিল হয়, তখন রাসূল সা. বলেন, আমার বিদায়ের সময় নিকটবর্তী হয়েছে। (আহমদ, ইবনে জারির)।
ঘ) উম্মুল মোমেনিন হজরত উম্মে হাবিবা রা. বলেন, যখন সূরা নছর নাজিল হয় তখন রাসূল রা. বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি স্বীয় উম্মতের মাঝে পূর্বের নবীর অর্ধেক বয়সের বেশি সময় অবস্থান করেছেন। ঈসা ইবনে মারয়াম (আ) বনি ইসরাইলের মধ্যে ৪০ বছর অবস্থান করেছিলেন, আর এটা হচ্ছে উম্মতের মাঝে আমার অবস্থানের ২০তম বছর। আমি এ বছর ইন্তেকাল করব।’
ঙ) ইবনে ওমর রা. বলেন, সূরা নছর বিদায় হজে নাজিল হয়েছে। অতঃপর একই সময়ে নাজিল হয় ) اليوم اكملت لكم دينكم واتممت عليكم نعمتي ورضيت لكم الإسلام دينا ) (সূরা মায়িদা : ৩) এরপর রাসূল সা. মাত্র ৮০ দিন জীবিত ছিলেন।
তারপর কালালার বিখ্যাত আয়াতটি নাজিল হয়। এটি রাসূল সা.-এর ইন্তেকালের ৫০ দিন পূর্বের ঘটনা। ( يستفتونك، قل الله يفتيكم فى الكللة) (সূরা নিসা : ১৭৬)
অতঃপর মৃত্যুর ৩৫ দিন পূর্বে নাজিল হয় সূরা তাওবার সর্বশেষ দু’টি আয়াত: ( لقد جاءكم رسول من انفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم باالمؤمنين رؤوف رحيم، فان تولوا فقل حسبي الله لا اله الا هو، عليه توكلت وهو رب العرش العظيم،) (সূরা তাওবা : ১২৮-১২৯)
অতঃপর মৃত্যুর ২১ দিন মতান্তরে ৭ দিন পূর্বে নাজিল হয় সূরা বাকারার ২৮১ নং আয়াতটি: (واتقوا يوما ترجعون فيه الى الله، ثم توفي كل نفس ما كسبت وهم لا يظلمون) (কুরতুবী)।
উপরের আলোচনায় এ কথা পরিষ্কার হয়েছে যে, সূরা নছর আল কুরআনের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসেবে বিদায় হজের সময় নাজিল হয়। এর পরে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন আয়াত নাজিল হলেও কোনো পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়নি।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, একদিন ওমর রা. জ্যেষ্ঠ বদরি সাহাবীদের মজলিসে আমাকে ডেকে বসলেন। এতে অনেকে সংকোচ বোধ করেন। প্রাচীনতম সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আওফ রা. বলেন, (أتساله ولنا بنون مثله) ‘আপনি ওকে জিজ্ঞেস করবেন? অথচ ওর বয়সের ছেলেরা আমাদের ঘরে রয়েছে।’ ওমর রা. বললেন, সত্বর জানতে পারবেন। অতঃপর তিনি সবাইকে সূরা নছরের তাৎপর্য জিজ্ঞেস করেন, তখন সকলে প্রায় একই জবাব দিলেন যে, “এর মাধ্যমে আল্লাহ তার নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, যখন বিজয় লাভ হবে, তখন যেন তিনি তওবা-ইস্তেগফার করেন।” এবার তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম (انما هو اجل رسول الله صلى الله عليه وسلم اعلمه اياه) এ সূরার মাধ্যমে আল্লাহ তার রাসূলের মৃত্যু ঘনিয়ে আসার খবর দিয়েছেন। অতঃপর বললাম (اذا جاء نصر الله والفتح) “যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এসে গেছে” অর্থ (فذلك علامة موتك) এটাতে আপনার মৃত্যুর আলামত এসে গেছে। অতঃপর (فسبح بحمد ربك واستغفره) এক্ষনে তুমি তোমার প্রভুর প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর ও তওবা-ইস্তেগফার কর। এ ব্যাখ্যা শোনার পর ওমর রা. বললেন, (والله لا اعلم منها الا تعلم تلوموني عليه) আপনারা আমাকে এ ছেলের ব্যাপারে তিরস্কার করেছিলেন? আল্লাহর কসম! হে ইবনে আব্বাস। তুমি যা বলেছ এর বাইরে আমি এর অর্থ অন্য কিছুই জানি না। (বুখারী-৩৬২৭, তিরমিযী-৩৩৬২, কুরতুবী, ইবনে কাসির)
এ জন্য এ সূরাকে (سورة التوديع) বা ‘বিদায় দানকারী’ সূরা বলা হয়। (কুরতুবী)

বিষয়বস্তু
মক্কা বিজয়ের পর আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গোত্রীয় প্রতিনিধিদল মদীনায় আসতে থাকে এবং দলে দলে মানুষ মুসলমান হতে থাকে। সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে প্রথম দুটি আয়াতে। অতঃপর উক্ত অনুগ্রহ লাভের শুকরিয়া স্বরূপ রাসূলের উচিত আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করা এবং বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করা, এ কথাগুলো বলা হয়েছে শেষ আয়াতে।

প্রথম আয়াতের তাফসীর
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَاْلفَتْحُ When there comes the help of Allah & victory অর্থাৎ আল্লাহর সাহায্য বলতে এখানে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধসমূহে আল্লাহর সাহায্যকে বুঝানো হচ্ছে। যেমন বদর, ওহুদ, খন্দক প্রভৃতি। অতঃপর (الفتح) তথা বিজয় অর্থ মক্কা বিজয় যা ৮ম হিজরির ১৭ রমাদান মঙ্গলবার সকালে সংঘটিত হয়েছিল। এখানে (عطف الخاص على العام) করা হয়েছে। অর্থাৎ সকল সাহায্য বিশেষ করে মক্কা বিজয় যেমন বলা হয়েছে (تنزل الملائكة والروح) কদরের রাত্রিতে নাজিল হয় ফেরেশতাম-লী ও জিবরাইল (আ) (সূরা কদর : ৪)। ইমাম কুরতুবী বলেন, এখানে (إذا) অর্থ (قد) অর্থাৎ (قد جاء نصر الله والفتح) অবশ্যই এসেছে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। কেননা সূরা নছর নাযিল হয়েছে মক্কা বিজয়ের প্রায় সোয়া দু’বছর পরে ১০ম হিজরির জিলহজ মাসের সম্ভবত ১২ তারিখে মিনায়। সুতরাং ‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়’ এরূপ অর্থ করা ঠিক হবে না। (إذا) সাধারণত শর্তের অর্থ দেয়, যা ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হয়, যেমন রাসূল সা. বলেন (وإذاستعنت فاستعن بالله) অর্থাৎ যখন তুমি সাহায্য কামনা করবে একমাত্র আল্লাহর কাছে চাও। আবার এটি ‘নিশ্চয়তা’ অর্থেও আসে। যেমন (وإذا رأوا تجارة او لهوا انفضوا اليها وتركوك قائما) (সূরা জুমআ : ১১)।
মাত্র ২০ বছর পূর্বে মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ সা. বিশ্ব মানবতাকে লক্ষ্য করে ডাক দিয়েছিলেন (يا ايها الناس قولوا لا اله الا الله تفلحون) অর্থাৎ ‘বল হে মানব সকল! তোমরা ঘোষণা দাও, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো প্রভু নেই, সার্বভৌমত্বের মালিক নেই। তবে তোমরা সফলকাম হবে।’ অল্প সময়ের ব্যবধানে এ দাওয়াত সকল বাধা বিপত্তি ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ গোটা আরবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। যে মক্কা থেকে রজনীর শেষে একাকী আবু বকর রা.সহ নিঃস্ব অবস্থায় মদীনায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সে মক্কা আজ মুহাম্মদ সা.-এর করতলে মহাসম্মানী ও কাবাঘরের চাবি আজ তাঁর হাতের মুঠোয় শোভা পাচ্ছে। সর্বদা জুলুম ও উৎখাতের ভয়ে যারা ছিল আতঙ্কগ্রস্ত আল্লাহর ভাষায় সে ‘মুুস্তাদে আফিন’রা আজ বিজয়ের পতাকা হাতে ‘লিল্লাহি তাকবির’ ধ্বনিতে মুখরিত করছে মক্কার প্রতিটি গলিপথ। কুরআনের ভাষায় (واذكروا اذ انتم قليل مستضعفون فى الارض تخافون ان يتخطفكم الناس فاواكم وايدكم بنصره ورزقكم من الطيبات لعلكم تشكرون) স্মরণ কর যখন তোমরা ছিলে সংখ্যায় নগণ্য, পৃথিবীতে তোমরাই ছিলে মোস্তাদে আফিনদের অন্তর্ভুক্ত, সর্বদায় আতঙ্কে ছিলে যে, লোকেরা তোমাদেরকে উৎখাত ও নির্মূল করে দেবে, সে অবস্থা হতে আল্লাহ তোমাদেরকে আশ্রয় দিয়েছেন, তার অপার সাহায্যে শক্তিশালী করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা ও শোকর আদায় কর। (সূরা আনফাল : ২৬)

দ্বিতীয় আয়াতের তাফসীর
وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُوْنَ فِيْ دِيْنِ اللهِ اَفْوَاجًا ‘এবং তখন তুমি দেখবে মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে।’ মক্কা বিজয়ের পরের বছর তথা নবম হিজরিকে ইসলামের ইতিহাসে (عام الوفود) অর্থাৎ প্রতিনিধি দলসমূহের আগমনের বছর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সময় আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকেরা দলে দলে মদীনায় এসে ইসলাম কবুল করছিল। জীবনীকারগণ আবদুল কায়েস গোত্র, সাকিক গোত্র, ইয়েমেন, হামাদান, নাজরান, তাঈ, আশআরি ও সর্বশেষ নাখঈ গোত্রের প্রতিনিধিদলসহ ৭০ এর অধিক প্রতিনিধিদলের বর্ণনা রয়েছেন। মক্কা বিজয়ের পর দলে দলে ইসলাম কবুলের অন্যতম কারণ ছিল বিশ্বাসগত (ঞৎঁংঃ ইধংরং)। কারণ লোকেরা তখন বলতে লাগলো, যে হারাম শরিফকে আল্লাহ তায়ালা হস্তীওয়ালাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই হারামের তত্ত্বাবধায়ক তার কওমের ওপর যখন মুহাম্মদ সা. জয়লাভ করেছেন তখন তিনি অবশ্যই সত্য নবী। (বুখারী-৮৬০২, মিশকাত-১১২৬)
ইকরিমা ও মুকাতিল (রহ.) বলেন (ورأيت الناس) বলতে বিশেষভাবে ইয়েমেনি প্রতিনিধিদলকে বুঝনো হয়েছে। কেননা এদের প্রায় সাতশো লোক মুসলমান হয়ে কেউ আজান দিতে দিতে, কেউ কুরআন পাঠ করতে করতে, কেউ (لا اله الا الله) বলতে বলতে মদীনায় এসে উপস্থিত হয়েছিল। যাতে রাসূল সা. খুবই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু ওমর রা. ও আব্বাস রা. কাঁদতে থাকেন। ইকরিমা ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সা. খুশি হয়ে বলেন (اتاكم اهل اليمن، اضعف قلوبا وارق أفئدة الفقه يمان والحكمة يمانية) ইয়েমেনবাসীরা তোমাদের কাছে এসে গেছে, এদের অন্তর বড়ই দুর্বল, হৃদয় খুবই নরম, বুঝশক্তি ইয়েমেনিদের এবং দূরদর্শিতা ইয়েমেনিদের। (বুখারী-৮৩৯০, মুসলিম-৫২)।
আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন গোত্রে অপেক্ষা করছিল ও পর্যবেক্ষণ করছিল মুহাম্মদ সা. যদি সত্য নবী হন, তবে তার হাতে মক্কা বিজয় হবে। যখন আল্লাহর সাহায্যে মক্কা বিজয় হলো, তখন চারপাশের শত শত গোত্র দলে দলে ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করছিল। (ইবেন কাসির, ফতহুল বারী)।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রা.-এর প্রতিবেশী হজরত আম্মার রা. সফর হতে ফিরে এসে হজরত জাবিরের রা. সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। সেই প্রতিবেশী মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, দ্বন্দ্ব-কলহ ইত্যাদির কথা ব্যক্ত করলে তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, আমি রাসূল সা. থেকে স্বীয় কানে শুনেছি (قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان الناس دخلوا في دين الله افواجا وسيخرجون منه افواجا) ‘একটি সময় আসবে লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করবে এবং শিগগিরই দলে দলে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যেতেও শুরু করবে।’ অধিকাংশ প্রতিনিধিদলই খুশি মনে রাসূল সা.-এর দরবারে এসে ইসলাম কবুল করতেন, কেউ বা আগেই ইসলাম কবুল করে মদীনায় আসতেন, যাদের দেখেই স্বাভাবিকভাবে রাসূল সা. অত্যন্ত খুশি হতেন, পক্ষান্তরে দূরদর্শী সাহাবীরা যেকোনো সময় রাসূল সা.-এর মৃত্যুর আশঙ্কায় কেঁদে বুক ভাসাতেন। দশম হিজরি সনে সমগ্র আরবে ইসলাম কবুল করেনি এমন মুশরিকের অস্তিত্ব পাওয়া কঠিন ছিল।

তৃতীয় আয়াতের তাফসীর
فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا অর্থাৎ “তখন তুমি তোমার পালনকর্তার প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয়ই তিনি সর্বাধিক তওবা কবুলকারী।” অর্থাৎ (سبحه تسبيحا مقرونا بالحمد) তুমি তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা বর্ণনা কর। তাসবিহ (تسبيح) অর্থ (تنزيه الله تعالى عمالا يليق بشانه) অর্থাৎ আল্লাহর মর্যাদার উপযুক্ত নয় এমন সবকিছু থেকে তাঁকে পবিত্র করা। হাম্দ (حمد) অর্থ (الثناء على الله بالكمال مع المحبة والتعظيم) অর্থাৎ ভালোবাসা ও সম্মান সহকারে পূর্ণভাবে আল্লাহর প্রশংসা করা। অত্র আয়াতে পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনাকে একত্রিত করা হয়েছে। এটি আল্লাহর প্রথম নির্দেশ আর দ্বিতীয় নির্দেশটি হলো, (استغفار) যার অর্থ (طلب المغفرة) বা ঝববশরহম ভড়ৎমরাবহবংং ক্ষমা প্রার্থনা করা। আর মাগফিরাত (مغفرة) অর্থ (ستره الله تعالى على عبده ذنوبه مع محوها والتجاوز عنها) অর্থাৎ পাপ দূরীকরণ ও ক্ষমার মাধ্যমে বান্দার পাপসমূহের উপর আল্লাহর পর্দা আরোপ করা। বস্তুত বান্দার এটিই সবচেয়ে বড় চাওয়া। কেননা বান্দা সর্বদা ভুলকারী। আল্লাহ যদি দয়া না করেন তাহলে সে ধ্বংস হয়ে যাবে। এ জন্য আল্লাহ আমাদেরকে দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন (ربنا ظلمنا انفسنا وان لم تغفرلنا وترحمنا لنكونن من الخسرين) (সূরা আরাফ : ২৩)
রাসূল সা. বলেছেন (لن ينجي احدا منكم عمله قالوا ولا انت يا رسول الله؟ قال ولا انا الا ان يتغمدني الله برحمته) অর্থাৎ তোমাদের কেউ তার আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, সাহাবীগণ বললেন, আপনিও নন হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, “না, যদি না আল্লাহ তাঁর রহমত দ্বারা আমাকে আবৃৃত করেন।” (বুখারী-৬৪৬৩, মুসলিম-২৮১৬, মিশকাত-২৩৭১)।
রাসূল সা. আরো বলেন (من نوقش الحساب فقد هلك) অর্থাৎ যার হিসাব তন্ন তন্ন করে নেয়া হবে সে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে (বুখারী)।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, এর অর্থ (فصل حامدا له على ما اتاك من الظفر والفتح وسل الله الغفران) অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে যে সফলতা ও বিজয় দান করেছেন সে জন্য আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর, (কুরতুবী)।
এখানে মক্কা বিজয়কে অধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণ এখানে আল্লাহর ঘর বায়তুল্লাহর অবস্থান। যা ছিল তাওহিদের মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং যা ছিল হজরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ) এর হাতে নির্মিত আল্লাহর ঘর। অথচ সেটি র্শিকের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত: আরবরা ভাবত, বায়তুল্লাহর অধিকারীরাই (أهل الله) বা আল্লাহ ওয়ালা। অতএব কাবাকে র্শিকমুক্ত করা এবং মানুষের ভুল বিশ্বাস ভেঙে দেয়ার জন্য মক্কা বিজয় খুবই জরুরি ছিল। যেটির ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন (واخرى تحبونها نصر من الله وفتح قريب وبشر المؤمنين) অর্থাৎ তিনি তোমাদের দান করবেন এমন কিছু, যা তোমরা কামনা কর; আল্লাহর সাহায্য ও আসন্ন বিজয়। মুমিনদেরকে উহার সুসংবাদ দাও। (সূরা সফ-১৩)
(تواب) এর ওজন (فعال) যা (اسم فاعل مبالغة) যার দ্বারা কর্তার কাজে আধিক্য বুঝায়। এটি আল্লাহ ও বান্দাহ উভয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। বান্দার ক্ষেত্রে হলে অর্থ হবে আল্লাহর প্রতি অধিক তাওবাকারী (التائب الى الله) এবং আল্লাহর ক্ষেত্রে হলে অর্থ হবে বান্দার তাওবা অধিক কবুলকারী (التائب على العبد)। এখানে (انه كان توابا) অর্থ (لم يزل عزوجل توابا على عبده اذا استغفره) অর্থাৎ আল্লাহ সর্বদা বান্দার তাওবা কবুলকারী, যখনই সে তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে।
হজরত আয়েশা রা. বলেন, সূরা নছর নাযিল হওয়ার পর থেকে রাসূলুল্লাহ সা. এমন কোনো সালাত আদায় করেনি, যেখানে রুকু ও সিজদায় নি¤েœর দোয়াটি পাঠ করেননি- (سبحانك اللهم ربنا وبحمدك اللهم اغفرلي)। অর্থাৎ সকল পবিত্রতা তোমার হে আল্লাহ, তুমি আমাদের পালনকর্তা, তোমার জন্য সকল প্রশংসা হে আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা কর। (বুখারী-৭৯৪, মুসলিম-৪৮৪, মিশকাত-৮৭১)
অন্য বর্ণনায়, ওফাতের পূর্বে রাসূল সা. (سبحانك اللهم ربنا وبحمدك استغفرك واتوب اليك) এ দোয়াটি বেশি পড়তেন। হজরত আয়েশা রা. রাসূল সা.কে অধিক হারে এ বাক্যগুলো পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল? আপনি এই যে কথাগুলো পড়ছেন, এগুলো কোন ধরনের কালেমা? তিনি জবাবে বলেন, আমার জন্য একটি আলামত নির্ধারণ করা হয়েছে, বলা হয়েছে, যখন আমি সেই আলামত দেখতে পাবো তখনই যেন এই কালিমা পড়ি এবং সে আলামতটি হচ্ছে (اذا جاء نصر الله والفتح) (মুসনদে আহমদ, মুসলিম)।
হজরত উম্মে সালমা রা. বলেন, রাসূল সা.-এর জীবনের শেষ দিকে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে তার পবিত্র জবানে সর্বক্ষণ এ কথাই শুনা যেতো (سبحان الله وبحمده), আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! সা. আপনি এ জিকিরটি বেশি করে করেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ আমাকে হুকুম দিয়েছেন, তারপর তিনি এ সূরাটি পড়লেন।
আমরা দেখি কোনো বিপ্লবী নেতা যদি তার জীবদ্দশায় কোনো বিপ্লবে সফল হয় তাহলে সে ঢাকঢোল পিঠিয়ে, নেচে-গেয়ে বিজয় উৎসব পালন করে ও নিজের নেতৃত্বের গর্ব করে বেড়ায়। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সা.কে আমরা দেখি ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে অধঃপতিত একটি জাতির আকিদা-বিশ্বাস, চিন্তাধারা, আচার-আচরণ, নৈতিক চরিত্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি, সমাজনীতি, অর্থব্যবস্থা, রাজনীতি ও সামরিক যোগ্যতা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন। এত বড় বিপ্লবের পরও তাঁকে উৎসব পালন করার নয় বরং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করার এবং তাঁর কাছে মাগফিরাতের দোয়া করার হুকুম দেয়া হয়।
প্রশ্ন হলো, রাসূল সা.-এর আগে-পরে সব গুনাহ মাফ, এমতাবস্থায় তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার হুকুম দেয়ার অর্থ কী? এরূপ প্রশ্ন একবার আয়িশা রা. করলে জবাবে রাসূল সা. বলেছিলেন (افلا اكون عبدا شكورا؟) অর্থাৎ আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? (বুখারী-১১৩০, মুসলিম-২৮১৯)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন (الاستغفار تعبد يجب اتيانه لا للمغفرة بل تعبدا) অর্থাৎ ক্ষমা প্রার্থনা হলো দাসত্ব-প্রকাশ করা যা আল্লাহর নিকট পেশ করা ওয়াজিব। ক্ষমার জন্য নয় বরং দাসত্ব প্রকাশ করার জন্য অর্থাৎ রাসূল সা.-এর ক্ষমা প্রার্থনার অর্থ আল্লাহর প্রতি অধিক হারে বিনয় ও দাসত্ব প্রকাশ করা। তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে তাঁর উম্মতের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যেন তারা যে কোনো অর্জনে শঙ্কাহীন না হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা ছেড়ে না দেয়। তিনি বলেন নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছেন, তখন অন্যদের কেমন করা উচিত? (কুরতুবী)।
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সা. দৈনিক ৭০-১০০ বারের অধিক তওবা-ইস্তিগফার করতেন এবং নি¤েœর দোয়াটি পড়তেন।
استغفر الله الذي لا اله الا هو الحي القيوم واتوب اليه (তিরমিযী, আবু দাউদ ১৫১৭)
হাদীসে এসেছে কোনো মজলিস, দ্বীনি ক্লাস বা বৈঠকে নি¤েœাক্ত দোয়াটি পড়লে আল্লাহ তায়ালা বৈঠকে আলোচিত বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্তরে বইয়ের সিলমোহর করার মতো স্থির করে দেন (سبحانك اللهم وبحمدك اشهد ان لا اله الا انت استغفرك واتوب اليك), (আবু দাউদ-৪৮৫৭)। মূলত এ দোয়াটি সূরা আন্ নছরের শেষ আয়াত থেকে গৃহীত। অর্থাৎ (فسبح) থেকে (سبحانك اللهم), (بحمد) থেকে (وبحمدك), (ربك) থেকে রবের ঘোষণা স্বরূপ (اشهد ان لا اله الا انت), (واستغفره) থেকে (استغفرك) এবং (انه كان توابا) থেকে (واتوب اليك) গৃহীত।

শিক্ষণীয় বিষয়
– সকল প্রকার সাহায্য ও বিজয়ের মূল উৎস আল্লাহ তায়ালা।
– একটি সংগ্রামমুখর যুগের পরেই একটি বিজয়ের যুগ আসে।
– আল্লাহ তায়ালার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে সাহায্য ও বিজয় আসবেই।
– বিজয় ও সফলতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে বেশি বেশি আল্লাহর শোকর গুজার ও তাসবিহ পাঠ করতে হবে।
– সমস্ত সফলতা ও কল্যাণ আল্লাহর হাতে।
– ব্যক্তিগত সফলতা থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সফলতা অর্জনের পরও আল্লাহর শুকর আদায় করা।
– যেকোনো দায়িত্ব সফলভাবে সম্পন্ন করার পর অদৃশ্য ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
– বান্দা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়, ভুল করা অপরাধ নয় বরং তাওবা না করা, ক্ষমা না চাওয়া অপরাধ। (والذين عملوا السيئات ثم تابوا من بعدها وامنوا إنّ ربك من بعدها لغفور رحيم) (সূরা আ’রাফ: ৭/১৫৩)
– বান্দার অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর ক্ষমা তার চেয়েও বৃহৎ। (افلا يتوبون الى الله ويستغفرونه والله غفور رحيم) (সূরা মায়িদা: ৫/৭৪)
– তাওবাকারী বান্দাকে আল্লাহ ভালোবাসেন। (الله افرح بتوبة عبده من احدكم سقط على بعيره وقد اضله في ارض فلاة) (বুখারী, মুসলিম)
– তাওবার জন্য লক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে-
ক) আন্তরিকতার সাথে অপরাধের স্বীকৃতি দেয়া ও গভীরভাবে অনুতপ্ত হওয়া। (ربنا اغفرلنا ذنوبنا واسرافنا في امرنا وثبت اقدامنا وانصرنا على القوم الكافرين) (সূরা আলে ইমরান: ৩/১৪৭)
খ) অপরাধ করার সাথে সাথে তাওবা করা। (يا ايها الذين امنوا توبوا الى الله توبة نصوحا) (সূরা তাহরিম: ৬৬/৮)
গ) দ্বিতীয়বার অপরাধ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়া।
ঘ) কৃত অপরাধ কাফ্ফারা স্বরূপ অতিরিক্ত সালাত, নফল রোজা ও সাদাকাহ করা।
ঙ) বেশি বেশি ইস্তিগ্ফার জারি রাখা। (استغفروا ربكم ثم توبوا اليه) (সূরা হুদ: ১১/৩)
চ) (حق الله) নষ্ট হলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া আর (حق العباد) নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে প্রথমে ক্ষমা চেয়ে তারপর আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া।
ছ) বান্দার কোনো সম্পদ অর্থকড়ি বা কোনো হক নিজের দখলে রেখে অথবা সুদি কারবার অব্যাহত রেখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেও কোনো কাজে আসবে না। আগে বান্দার হক ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা সুদি কারবার বন্ধ করতে হবে তারপর তাওবা কবুল হবে।
ঞ) আশান্বিত মন নিয়ে তাওবা করা। (لا تقنطوا من رحمة الله ان الله يغفر الذنوب جميعا) (সূরা জুমার ৩৯/৫৩)।
মহান আল্লাহ সূরা আন নছরের শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের জীবন গড়ার তাওফিক দিন, আমিন।

লেখক : অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল ইংলিশ স্কুল চট্টগ্রাম

SHARE

Leave a Reply