আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় অতি নিকটবর্তী – মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন

মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। ১৯৭৫ সালের ১ মার্চ সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম আব্দুল গফুর, মাতার নাম মরিয়ম বেগম। সিলেট এমসি কলেজ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে শিবিরের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর বিভিন্ন সময়ে সিলেট মহানগরীর সভাপতি, কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক, কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক, ২০০৩ সেশনে সেক্রেটারি জেনারেল এবং ২০০৪ ও ২০০৫ সেশনে কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি সৌদিআরব, পাকিস্তান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশ সফর করেন। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি জড়িত। বর্তমানে তিনি রমনা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান, ইউএইচডিটি আইডিয়াল মাদ্রাসার ম্যানেজমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান, ইসলামিক এইডের কার্যকরী কমিটির সদস্য, ফালাহ-ই-আম ট্রাস্টের সদস্য ও মাওলানা মওদূদী (রহ) রিসার্চ একাডেমীর সদস্য হিসেবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ছাত্রশিবির, বিশ্ব পরিস্থিতি ও বর্তমান পরিবর্তীত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইসলামী ছাত্রশিবির তথা যুবসমাজের দায়িত্ব-কর্তব্য কী হওয়া উচিত- এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয় তাঁর সাথে। ছাত্র সংবাদের পাঠকদের উদ্দেশ্যে তাঁর পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো-

ছাত্র সংবাদ : আপিন কখন কিভাবে এ নেয়ামতপূর্ণ সংগঠনের দাওয়াত পেয়েছেন?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : যতটুকু মনে পড়ে, ১৯৮৩ সালের প্রথম দিকে এ শহীদি কাফেলায় যোগদান করি। হাফেজ নিজাম উদ্দিন, জনাব গৌছ উদ্দিন, মাওলানা ফয়েজুর রহমান, আইয়ুব আলী প্রমুখ ভাইয়ের ব্যক্তিগত টার্গেটে এ সংগঠনে আসি। তাদের অনুপম চরিত্র, অমায়িক ব্যবহার, আমার প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ, আমাকে লেখাপড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ এবং সাংগঠনিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ভালো মানুষ হিসেবে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা এ সংগঠনে যোগদানে আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
ছাত্র সংবাদ : আপনার সাংগঠনিক জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা বলুন যা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে।
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : অনেকে মনে করেন মিছিলে গেলেই তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। তার ক্ষতি হতে পারে। মূলত হায়াত-মউত আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, যা ১ সেকেন্ড আগেও হবে না পরেও হবে না, কেউ কাউকে টার্গেট করে মারতে পারে না। কারো মৃত্যুর সময় হয়ে গেলে সে যদি লোহার সিন্দুকের ভেতরে তালাবদ্ধ থাকে তবুও তার মৃত্যু অবধারিত। ১৯৯৭ সালের কথা। আমি তখন মৌলভীবাজার জেলার সভাপতি ছিলাম। বড়লেখা থানার জুড়িতে একটি সিরাত মহফিল ছিল। সেখানে আমি ছিলাম প্রধান অতিথি। সেই প্রোগ্রামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে ছাত্রলীগ-যুবলীগ একই স্থানে পাল্টা কর্মসূচি দেয়। যার ফলে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। আমাদের ভাইয়েরা প্রোগ্রাম করতে না পারায় সেখান থেকে মিছিল করতে করতে বাজারের দিকে মসজিদে চলে যায় জোহরের নামাজ আদায় করার জন্য। আমি জেলা থেকে প্রোগামে যাচ্ছি, তা জানতে পেরে একই পথে একটি ব্রিজের পাশে আমার ওপর আক্রমণ করার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা। আমি মোটরসাইকেলযোগে ঐ স্থানে পৌঁছার ঠিক আগ মুহূর্তে আমিন আহমদ তাফাদার নামক একজন ছাত্রশিবিরের কর্মী ভাই ঐ রাস্তা দিয়ে মোটরসাইকেলযোগে যাচ্ছিলেন। তিনি দেখতে কিছুটা আমারই মতো হওয়ায় আমাকে মনে করে ঐ ভাইটির উপর আক্রমণ করে বসে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা। তিনি ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমিও সেখানে পৌঁছে যাই এবং আমাদের ভাইয়েরাও নামাজ শেষে সেখানে চলে আসে। আহত ভাইটিকে একটি সিএনজিযোগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পথেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। শাহাদাতের খবর শুনে আমরা তৎক্ষণাৎ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকি। আমাদের কঠোর আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তৎকালীন আওয়ামী সরকার মূল খুনিকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠাতে বাধ্য হয়। এ ঘটনার ২ বছর পর আমি তখন সিলেট মহানগরীর সভাপতি। একটি সাংগঠনিক প্রোগ্রামে মৌলভীবাজারে সফরে এসেছিলাম। তৎকালীন আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকারের রোষানলে পড়ে সে সময়ের মৌলভীবাজার জেলা আমীর জনাব সিরাজুল ইসলাম মতলিব, বর্তমান জেলা আমীর জনাব আব্দুল মান্নান এবং আমিসহ ৩৬ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয়। আমাদেরকে কারাগারের যে ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিলো সেই একই ওয়ার্ডে পূর্ব থেকেই শহীদ আমিন আহমদ তাফাদারের খুনের ঘটনার প্রধান আসামিকে রাখা হয়েছিল। সে সময় একদিন সকালে কারাগারে ঈদের জামায়াত শেষে সবার সাথে যখন ঈদের আলিঙ্গন করছি তখন একজন লোক হঠাৎ ঝটিকার মতো এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার কাছে মাফ চাইতে লাগল এবং সে নিজেকে শহীদ আমিন আহমদ তাফাদারের হত্যাকারী উল্লেখ করে আমাকে বলল, মূলত সেদিনকার আমাদের হত্যার টার্গেট ছিলেন আপনি কিন্তু আমরা আমাদের টার্গেট মিস করেছি। এ থেকে বোঝা যায় কেউ যদি কাউকে মারতে চায় আর আল্লাহর ফায়সালা যদি না থাকে তাহলে তাকে মারতে পারে না। তাই তো মাওলানা মওদূদী (রহ) ফাঁসির রায় শুনে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর ফায়সালা আসমানে হয়, জমিনে হয় না।’ শহীদ হওয়াটাও একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। মূলত সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিলাম আমি কিন্তু শাহাদাতের সৌভাগ্য অর্জন করলেন শহীদ আমিন আহমদ তাফাদার।
ছাত্র সংবাদ : আপনি কিভাবে সাংগঠনিক কাজ ও ছাত্রজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেন?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : সাংগঠনিক কাজ আর ছাত্রজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলা ছাত্রদের একটি মৌলিক দায়িত্ব। যদি সুন্দর পরিকল্পনা না থাকে, প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন শেষ না করা হয়, তাহলে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন। কারণ আমার একাডেমিক পড়ালেখা, পরীক্ষা, ক্লাসে যাওয়া এগুলো নিয়মিত বিষয়। সেগুলো বাদ দেয়া যাবে না। এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাকি সময়টা সাংগঠনিক কাজ করতে হবে। সে জন্য আমাকে প্রতিদিন রাতেই পরের দিনের কাজগুলো চিন্তাভাবনা করে লিখে নিতে হবে। কোনটা নিজে করব কোনটা অন্যকে দিয়ে করাবো সেভাবেই ঠিক করে নিতে হবে। আমাদের সংগঠনের সকল জনশক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে নিজের কাজটিও সহজ হয়ে যায় এবং একই সাথে সবাই কাজ পাওয়ার কারণে সকলেই সক্রিয় থাকে।
ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারার অন্যতম কারণ হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব, সময়ের অপচয়, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা ও অলসতা ইত্যাদি। সময় অপচয় বন্ধ করতে পারলে প্রতিটি মিনিট প্রতি সেকেন্ড হিসাব করে কাজে লাগাতে পারলে সাংগঠনিক কাজ ও পড়ালেখার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
মূলত যারা পড়ালেখায় ভালো তারা সাংগঠনিক কাজেও ভালো। এর উত্তম দৃষ্টান্ত শহীদ আবদুল মালেক। তিনি এসএসসি ও এইচএসসি দুটিতেই স্ট্যান্ড করেছিলেন। প্রাণরসায়নে সেরা ছাত্র ছিলেন তিনি। তিনি ফজরের নামাজের পর সাংগঠনিক কাজে বেরিয়ে যেতেন। কেউ যাতে ফজরের নামাজ কাজা না করে সে জন্য ডেকে ডেকে নামাজ পড়াতেন। মূলত আমিও ছাত্রজীবনে সময়ের গুরুত্ব ও সময়কে যথাযথ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। সময়ের গুরুত্ব দিতে পারলে সংগঠন ও ছাত্রজীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
ছাত্র সংবাদ : সাম্প্রতিক নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : সাম্প্রতিক যে চ্যালেঞ্জ এটা একটা ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। এজন্য শিবিরকে সেই চ্যালেঞ্জ প্রদানকারীদের কৌশল বুঝতে হবে। বিরোধীরা শিবিরকে উত্তেজিত করে মূল দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখতে চায়। এজন্য অত্যন্ত ধৈর্য, সহনশীলতা, প্রজ্ঞা ও কৌশলের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। ছোটখাটো বিষয় কৌশলে এড়িয়ে যেতে হবে। কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ কারণ খুঁজে বের করতে হবে। তার পর তা মোকাবেলার জন্য অনুকূল কী কী কাজ করা যায় সে ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সূরা হুজরাতে মহান আল্লাহর যে নির্দেশনা রয়েছে সেগুলো সর্বস্তরের দায়িত্বশীল ও জনশক্তিকে ভালো করে বুঝতে হবে। অর্থাৎ সঠিক তথ্য কালেকশনের মাধ্যমে প্রথমে আমাদের মেধা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সামাজিক শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে হয়। ১৯৯৯ সালের কথা, আমি তখন সিলেট মহানগরীর সভাপতি। একদিন সকালে আমার কাছে খবর এলো আমাদের একজন ওয়ার্ড সভাপতিকে ছাত্রলীগ একবাড়িতে আটক করে নির্যাতন করছে। সাথে সাথে আমাদের ভাইয়েরা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। সিলেট মহানগরী অফিসের বাইরে অনেক মোটরসাইকেল জড়ো হলো। সবাই প্রস্তুত এখনই আমাদের ভাইকে উদ্ধার করতে হবে। আমিও সবার সাথে একমত হলাম, যে কোনো মূল্যে আমাদের ভাইকে উদ্ধার করতে হবে। কিন্তু তার আগে আমি উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বললাম, আমরা মূল অভিযান শুরুর আগে দুইজন ভাইকে ঘটনাস্থলে পাঠাবো। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রকৃত অবস্থা জানার চেষ্টা করবে এবং একই সাথে ছাত্রলীগকে আহ্বান জানাবে আমাদের ভাইকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। সেদিন আমাদের এই প্রতিনিধিদের কাছে আটককৃত ভাইকে ছাত্রলীগ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এবং পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় ঘটনার জন্য ছাত্রলীগের বাড়াবাড়ির পাশাপাশি আমাদের ভাইটির কিছুটা অসতর্কতা ও দুর্বলতা ছিল। কিন্তু প্রথমেই মাথা গরম করে ঘটনাস্থলে সবাইকে না পাঠিয়ে অন্যভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করাতে নিশ্চিত একটি বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। হেকমতের যথার্থ ব্যবহারের পরও পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী হিম্মতকেও কাজে লাগাতে হবে। ছাত্রজীবনে একটি কথা বলতামÑ শিবির ছাড় দিতে জানে কিন্তু ছেড়ে দিতে জানে না। কারো ভয়ে ভীত হয়ে ময়দান বা ক্যাম্পাস ছাড়া যাবে না। বর্তমান যুগ হচ্ছে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। সুতরাং এদিক থেকেও আমাদেরকে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হতে হবে। শিবিরকে সবসময় সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করতে হবে যতটা পারা যায় পরিস্থিতিকে শান্ত রাখার। কারণ পরিস্থিতি যত শান্ত থাকবে মৌলিক কাজে ততবেশি সময় দেয়া যাবে। ছাত্রশিবিরের মূল কাজ হলো একাডেমিক ক্যারিয়ারকে উজ্জ্বল করার পাশাপাশি সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে ব্যাপক দাওয়াতি কাজ। আমাদের মূল কাজ হলো মানুষের চিন্তা জগতের পরিবর্তন সাধন। সে জন্য বৈরিতা বা দূরত্ব নয় বরং মানুষকে কাছে টানা এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করা। এ জন্য শুধুমাত্র ছাত্রসমাজকে টার্গেট নিলে হবে না, একই সাথে যুবসমাজ, শিক্ষক, অভিভাবক থেকে শুরু করে যতটা পারা যায় সমাজের সর্বশ্রেণীর মানুষের সাথে শিবিরের একটি আন্তরিক ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অবস্থা এমন হবে যে, শিবিরের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সমাজের সর্বস্তর থেকে তার প্রতিবাদের আওয়াজ উঠবে।
ছাত্র সংবাদ : বর্তমান পরিবেশে কোন্ বিষয়ের প্রতি শিবিরকর্মীদের সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : যে কোনো পরিস্থিতিতেই নিজেদের একাডেমিক কার্যক্রম এবং একই সাথে সাংগঠনিক অধ্যয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। আরো যেসব কাজ করতে হবেÑ সমর্থক, কর্মী ও অন্যান্য জনশক্তির মাঝে ব্যাপক পারস্পরিক যোগাযোগ করা, উপশাখার প্রোগ্রামাদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, ব্যক্তিগত টার্গেটভিত্তিক ও গ্র“প দাওয়াতি কাজ মানসম্মতভাবে চালু রাখা, যে কোনো মূল্যে চরিত্রকে হেফাজত করা এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রচেষ্টা ও তাঁর ওপর আরো বেশি তাওয়াক্কুল রাখা। এ সময়ে বিশেষ করে দেশ, জাতি, ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন এবং ইসলামী নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে তা রুখে দিতে বৃহত্তর আন্দোলনের সাথে সমন্বয় করে সর্বস্তরের ভাইদেরকে সাথে নিয়ে তীব্র গণ-আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার বিষয়টিকে শিবিরকর্মীদেরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ছাত্রশিবির কী যথার্থ ভূমিকা পালন করছে বলে আপনার মনে হয়?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : অবশ্যই যথার্থ ভূমিকা পালন করছে। আলহামদুলিল্লাহ! শিবির থেকে তৈরি হওয়া নেতৃত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের বর্তমান ব্যর্থ নেতৃত্বের মোকাবেলায় যার যার জায়গায় চমৎকার সফলতা প্রদর্শন করছেন। তারা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, সমাজ ও রাজনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছেন। অনেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবতার কল্যাণে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন। আজকে ইসলামী অর্থনীতি শুধু দেশে না সারাবিশ্বে একটি সফল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে সুনাগরিক তৈরির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখছেন। সুতরাং বর্তমান নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে নেতৃত্বের যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ছাত্রশিবির যে ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে তা যদি চলতে থাকে তাহলে অচিরেই সে সঙ্কট দূর হবে। ছাত্রশিবির থেকে বেরিয়ে যাওয়া জনশক্তি যেখানেই দায়িত্ব পালন করছেন, নিজেদেরকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ, যোগ্য ও সফল মানুষ হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান ব্যর্থ নেতৃত্বের প্রেক্ষাপটে ছাত্রশিবির থেকে তৈরি হওয়া নেতৃত্বকেই আগামী দিনে বাংলাদেশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করবে এটা বুঝতে পেরেই ষড়যন্ত্রকারীরা বিচারের নামে প্রহসনের আয়োজন করে নির্দোষ নেতৃবৃন্দকে শাস্তি দিতে চায়। এ ষড়যন্ত্র রুখে দেয়াই আমাদের সকলের বর্তমান সময়ের প্রধান কাজ। এ ষড়যন্ত্র রুখে দিতেই দিনের পর দিন রাজপথকেই আমাদের প্রিয় ঠিকানায় পরিণত করতে হবে। বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা দিতে হবেÑ আমরা ততক্ষণ নীরব হবো না, নিথর হবো না, নিস্তব্ধ হবো না, রাজপথ ছেড়ে দেবো না, যতক্ষণ পর্যন্ত সকল ষড়যন্ত্র বন্ধ করে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে আমাদের নির্দোষ প্রিয় নেতৃবৃন্দকে মুক্তি না দেয়া হবে।
ছাত্র সংবাদ : বর্তমান সরকার যেভাবে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের ওপর খড়গহস্ত, তাতে ছাত্রশিবিরের কাজের মধ্যে কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটছে বলে কি আপনার মনে হয়? কোন্ পন্থা অবলম্বন করলে জুলুম-নিপীড়নের সঠিক জবাব দেয়া যাবে বলে মনে করেন?
মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন : ছাত্রশিবির এ জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা বিরাট রহমত। শিবির একবিংশ শতাব্দীর একটি বিপ্লবী ও আদর্শবাদী কাফেলার নাম। খোদাহীনতা তথা নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিরুদ্ধে এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম ইসলামী ছাত্রশিবির। আজকে যুবসমাজ নেশা, অস্ত্র, মদ, জুয়া, ফেনসিডিলে জর্জরিত, যুবসমাজের উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে আমাদের মেয়ে, বোন, মায়ের জাতিরা ঠিকমতো রাস্তায় চলতে পারে না, আইন করে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়েও তা মোকাবেলা করা যাচ্ছে না। কারণ একদিকে সরকার নতুন নতুন আইন করছে অপর দিকে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মের অস্তিত্ব বিলীন করে দিচ্ছে। যার ফলে আইন করেও তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এ থেকে বোঝা যায় এর মধ্যে সরকারের দুরভিসন্ধি আছে। সরকার যখন শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সংরক্ষণ ও সন্ত্রাস দমনে পুরোপুরি ব্যর্থÑ তখন ইসলামী ছাত্রশিবির ছাত্রসমাজের কাছে একটি স্বতন্ত্র ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। শিবির এমন অনেক কাজ করে যে কাজটি করার কথা ছিল সরকারের। যেমন ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে প্রতি বছর অদম্য মেধাবী, অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী, মুুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের সংবর্ধনা প্রদান করাসহ তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে থাকে। পরিবেশবান্ধব সমাজের জন্য প্রতি বছর শিবির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। শিবির ছাত্রদের লেখাপড়া, চরিত্র গঠনসহ আরো এমন কিছু সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করে যার কোনো কোনোটি অভিভাবক ও শিক্ষকেরÑ কিন্তু তা পালন করছে ছাত্রশিবির। যেখানে ছাত্ররা শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করছে, অপমানিত করছে, শিবির সেখানে ভালো ব্যবহার ও ভালোবাসা দিয়ে ছাত্রদেরকে চারিত্রিক মাধুর্যবান ও ভালো মানুষ হিসেবে তৈরি করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। অথচ তার সোনার ছেলে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা কাটারাইফেল, হকিস্টিক, রামদা, অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসগুলোকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। মানুষ তাদেরকে চাপাতিলীগ, রাইফেল লীগ ইত্যাদি নামে ডাকছে। তাদেরকে দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ সম্ভব নয়, ডিজিটাল সন্ত্রাস কায়েম হতে পারে। অপর দিকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সৎ, মেধাবী, চরিত্রবান, আদর্শবান এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকেও অনেক অগ্রসর। তারাই পারে আদর্শ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। তাদের দিকে আজ দেশ তাকিয়ে আছে।
কিন্তু আমরা কী দেখছি? শিবিরের ওপর চালানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ক্যাম্পাসগুলোতে হলে যেতে দেয়া হচ্ছে না, ক্লাস করতে দেয়া হচ্ছে না। তাদেরকে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হচ্ছে। তবুও ছাত্রশিবির থেমে নেই। ছাত্রশিবির সবকিছু নিয়মতান্ত্রিকভাবে ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করে সাধারণ ছাত্রদের কাছে দাওয়াতি কাজ, ব্যক্তিগত পড়ালেখা, সাংগঠনিক কাজ সবকিছু চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও এই মুহূর্তে এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। সুতরাং রাষ্ট্র, শিক্ষকসমাজ, অভিভাবকমণ্ডলীসহ সর্বস্তরের জনগণকে ছাত্রশিবিরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া দরকার। আর শিবিরকে আকাশের মতো উদার ও দরদভরা মন নিয়ে সকল ছাত্রের কাছে যেতে হবে। ছাত্রশিবিরের গঠনমূলক কাজগুলোকে প্রত্যেক দল, শিক্ষকসমাজ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, সর্বশ্রেণীর মানুষের কাছে ব্যাপক দাওয়াতি চেতনা নিয়ে তুলে ধরতে হবে। ছাত্রশিবির প্রকাশিত পত্রিকা ও প্রকাশনাসমূহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। “সোমবারে দাওয়াতি বার”সহ অন্যান্য দিনেও দাওয়াতি কাজ করতে হবে। মূলত পড়ালেখা, চরিত্র গঠন, দাওয়াতি কাজকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান সরকার ইসলামী আন্দোলন বিশেষ করে ছাত্রশিবিরকে অত্যন্ত ভয় পাচ্ছে। অথচ ছাত্রশিবিরকে ভয়ের কারণ নেই। তারা অত্যন্ত ভদ্র, বিনম্র, শান্তশিষ্ট, তাদের মধ্যে সুনাগরিকের সকল গুণাবলি বিদ্যমান। এ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, ক্রিমিনাল বিশেষজ্ঞ যারা আছেন তাদের কাছে খোঁজ নিলে সরকার জানতে ও বুঝতে পারবে শিবির কতটা অপরাধমুক্ত ও ক্লিন চরিত্রের অধিকারী। তাদের ব্যাপারে একটি ছোট অপরাধও খুঁজে বের করতে পারবে না। ছাত্রশিবির ক্যান্টিনে খেয়েছে অথচ টাকা দেয়নি এমন কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। ক্রাইম বা অপরাধ বলতে যা বুঝায় সকল কালিমা থেকে ছাত্রশিবির মুক্ত। এরকম অপরাধমুক্ত স্বচ্ছ ইমেজের একটি ছাত্রসংগঠনের ওপর সরকার খড়গহস্ত, তাহলে এই সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠেÑ আসলে তারা কী চায়? কাদের হাতে দেশকে তুলে দিতে চায়? বর্তমান সময়ে সরকারি দমন-পীড়নের ফলে ছাত্রশিবিরের কাজে বাধার সৃষ্টি হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। জন্মলগ্ন থেকে ছাত্রশিবির বারবার বাধার সম্মুখীন হয়েছে। বই-পুস্তক, কুরআন-হাদিস, কাপড় চোপড় পুড়িয়ে হল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন মানতে দেয়া হয়নি। কিন্তু কোনো বাধার মুখে ছাত্রশিবির দমে যায়নি। ছাত্রশিবির জানে বাধা এলে তা কিভাবে মোকাবেলা করতে হয়। এই সংগঠনটির জন্ম থেমে যাওয়ার জন্য হয়নি। বরং মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছার তীব্র আকাক্সক্ষা এর পথ চলার সাথী। সুতরাং ব্যত্যয় কিছু ঘটতে পারে। বাধা কিছু আসতে পারে। ছাত্রশিবির এ বাধার কাছে কখনো হার মানবে না। থমকে দাঁড়াবে না। ছাত্রশিবিরের ওপর এই আস্থা ও বিশ্বাস সবার আছে যে এসব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে তারা এগিয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। ছাত্রশিবির যে ধারায় কাজ করে এই সমাজের বেশির ভাগ মানুষ তা সমর্থন করে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ছাত্রশিবিরের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে এক একটি মিডিয়ার ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের ক্রান্তিকালে ও জাতির বৃহত্তর প্রয়োজনে ছাত্রশিবিরকে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে হবে। অতীতের সকল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিবিরের অবিস্মরণীয় ভূমিকা রয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতে কুরআন অবমাননার প্রতিবাদে বাংলাদেশে ছাত্রশিবির ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। কুরআনের মর্যাদা রক্ষায় শীষ মোহাম্মদ, সেলিম, রাশিদুল হকসহ আরো অনেকে জীবন দিয়েছেন। কাশ্মীর, ফিলিস্তিনসহ পৃথিবীর যেখানেই মুসলমানদের ওপর আঘাত এসেছে ছাত্রশিবির বাংলাদেশের রাজপথ থেকে তার তীব্র প্রতিবাদ করেছে। সে জন্য অনেক মেধাবী ভাইকে হারাতে হয়েছে। অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে। আজকে বাংলাদেশের যে সঙ্কট তা অত্যন্ত পরিকল্পিত। এ সঙ্কটের মূল হোতা বর্তমান স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকার। সঙ্কট তৈরির লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ এ ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত মিলে সরকার গঠনের পর থেকে। তারা তাদের আন্তর্জাতিক বন্ধুমহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল এই বলে যে, বাংলাদেশ জঙ্গিদের আখড়া হয়ে যাচ্ছে। এই আতঙ্ক তৈরি করে তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। সেই ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ১/১১ এবং এই ১/১১-এর মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার ছিল তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফসল। বর্তমান আওয়ামী সরকার তাদের সব অবৈধ কাজকে বৈধতা দিয়েছে। এই ১/১১ সৃষ্টি করতে আওয়ামী লীগ ২৮ অক্টোবরের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছিল। জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর লগি-বৈঠা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা। নৃশংসভাবে হত্যা করে শহীদ মুজাহিদ, শিপন, মাসুম, রফিক, ফয়সালসহ অনেককে। আহত করে অসংখ্য ভাইকে। অপরদিকে ১/১১ এর ধারাবাহিকতায় মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যোগসাজশে ২০০৮ সালের পাতানো ও ডিজিটাল কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী দেশপ্রেমিক চৌকস ৫৭ জন সেনা অফিসারকে হত্যা এবং তাদের পরিবার-পরিজনের ওপর নৃশংস বর্বরতা চালানোর পরও খুনিদেরকে রক্ষায় সকল প্রকার সহযোগিতা প্রদান, প্রতিবেশী দেশকে ট্রানজিটের নামে করিডোর প্রদান, নিজেদের ন্যায্য অধিকার তিস্তার পানি আদায়ে চরম ব্যর্থতা, টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে দেশের এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলকে মরুভূমি বানানোর পাঁয়তারা এসবই সচেতন দেশবাসীকে ভাবিয়ে তুলছে। নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী ঘরে ঘরে চাকরি প্রদান, ১০ টাকা কেজি চাল, বিনামূল্যে সার ইত্যাদি ভুলে গিয়ে চাকরি প্রদান তো দূরে থাক আজ ঘরে ঘরে শিক্ষিত বেকারের হাহাকার, দলীয় বিবেচনায় অযোগ্যদের চাকরি প্রদান ও ভিন্নমতাবলম্বী অসংখ্য লোকের চাকরিচ্যুতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্র্ধ্বগতি, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ নাগরিক সমস্যা সমাধানে সরকারের চরম ব্যর্থতায় জনজীবন আজ সার্বিকভাবে বিপর্যস্ত। বিশেষ করে সংবিধান থেকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস উঠিয়ে দেয়া, মুসলিম বিশ্বের সাথে বিশেষ সম্পর্কচ্ছেদ, ধর্মনিরপেক্ষতা তথা ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু, পর্দার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী নারীনীতি প্রণয়ন, আন্তঃধর্মীয় বিবাহ আইন করার অপচেষ্টা, আলেম-ওলামা, দাড়ি-টুপি, মসজিদ-মাদ্রাসা বিরোধী অবস্থান, ইসলামবিরোধী নানামুখী ভূমিকাসহ বাংলাদেশের সার্বিক ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের ইসলামপ্রিয় জনগণ আজ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
দেশ চালাতে চরমভাবে ব্যর্থ সরকার বিরোধী দলের আন্দোলনকে দুর্বল করে ক্ষমতার মসনদকে পাকাপোক্ত করতে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। জামায়াত-শিবির ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, গ্রেফতার ও রিমান্ডের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, আদালত কর্তৃক জামিন লাভের পরও সাজানো মামলা দিয়ে বারবার জেলগেট থেকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে প্রেরণ সরকারের রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। দেশ পরিচালনায় অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাকে আড়াল করতে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে সরকার। দেশে আজ গুম, খুন, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সরকারি বাহিনী কর্তৃক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের মেধাবী ছাত্রনেতা ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসসহ অসংখ্য বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণকে গুমের মাধ্যমে দেশে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী থাবা থেকে সাংবাদিক সমাজও রেহাই পাচ্ছেন না।
দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অগ্রসেনানী, দেশ ও জনগণের স্বার্থের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর, সাবেক মন্ত্রী, সংগ্রামী জননেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক আমীরে জামায়াত, ডাকসুর সাবেক জিএস, ভাষাসৈনিক প্রফেসর গোলাম আযম, নায়েবে আমীর প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সফলমন্ত্রী জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আব্দুল কাদের মোল্লাকে ৪০ বছর আগের তামাদি হয়ে যাওয়া তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে দীর্ঘ দু’বছর ধরে কারাগারে আটক রেখেছে। অতি সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নায়েবে আমীর বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মাওলানা আবদুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীকেও মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। এ বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচারে উদ্যোগ মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান নিয়েছিলেন। তদন্ত করে যুদ্ধাপরাধীদের ১৯৫ জনের চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছিল। তালিকাভুক্ত সবাই ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অফিসার। কোনো বেসামরিক নাগরিকের নাম ঐ তালিকায় ছিল না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ১৯৭৩ সালের আইনেও বেসামরিক নাগরিককে বিচারের বাইরে রাখা হয়েছিল। বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে যারা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহযোগিতা করেছিল তাদের বিচারের জন্য দালাল আইন করা হয়। এই আইনে লক্ষাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়। ৩৭ হাজার ৪ শ’ ৭১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২ হাজার ৮ শ’ ৪৮ জনকে বিচারে সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭ শ’ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। আজকে জামায়াতে ইসলামীর যেসব সম্মানিত নেতৃবৃন্দকে তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ অথবা মানবতাবিরোধী অপরাধের মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে তাঁরা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের গঠিত তদন্ত কমিশনের করা ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর চূড়ান্ত তালিকায় ছিলেন না এবং কলাবলেরটরস আইনে গ্রেফতারকৃত লক্ষাধিক লোকের তালিকায়ও বর্তমান গ্রেফতারকৃত জামায়াত নেতৃবৃন্দের কারোর নাম ছিল না। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দালাল আইন বলবৎ থাকা ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার পরও বর্তমানে কারাগারে আটক জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে সারা দেশের কোনো থানায় মামলা দায়ের তো দূরে থাক একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়নি। উপরন্তু ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরও বর্তমান গ্রেফতারকৃত জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ অথবা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থাপন করেনি। রাজনৈতিকভাবে জামায়াতকে মোকাবেলা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে এই মুক্তিকামী কাফেলাকে পথের কাঁটা মনে করে এই অবৈধ ট্র্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন মুছে দিতে পাঁয়তারা করছে।
এ অবস্থায় অতীতে কুরআনের মর্যাদা রক্ষায় যেভাবে শিবিরের স্কুলপর্যায়ের ভাইয়েরাসহ অসংখ্য শিবিরনেতা ও কর্মীগণ জীবন দিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেভাবে শিবির বলিষ্ঠ প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সংঙ্কট ও ক্রান্তিকালে স্বৈরাচারী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাজপথে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে অটুট রাখা ও সকল ষড়যন্ত্রকে রুখে দিয়ে গণতন্ত্রের অভিযাত্রাকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও সাহসী ভূমিকা পালন করেছে বর্তমানেও শিবিরকে আবার জেগে উঠতে হবে। রুখে দিতে হবে স্বৈরাচারের কালো হাত। এখন কাজ হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলে সকল জুলুমের জবাব দেয়া। আর সেই জবাব দেয়ার জন্য একজন সমর্থক থেকে দায়িত্বশীল পর্যন্ত সকলকে আরো সংঘবদ্ধ হতে হবে। ছাত্রশিবিরের বর্তমান ও প্রাক্তন সমর্থক, কর্মী, সাথী, সদস্য ও শুভাকাক্সক্ষী কারো আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা সাবেক সফল কৃষি ও শিল্প মন্ত্রী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংগ্রামী আমীর জননেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, ডাকসুর সাবেক জিএস ভাষাসৈনিক প্রফেসর গোলাম আযম, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ দেশের কোটি কোটি মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্দোষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দিয়ে দলীয় ট্র্যাইব্যুনাল ও সাজানো সাক্ষী দিয়ে তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে আর ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন ও বর্তমান হাজার হাজার নেতাকর্মীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে না, হৃদয়ে উত্তাল তরঙ্গমালা সৃষ্টি হবে না, চোখের পানিতে বুক ভাসবে না, গায়ে ক্ষত সৃষ্টি হবে না, নেতৃবৃন্দের মুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের অদম্য বাসনা তৈরি হবে না এটাতো হতে পারে না। আমরা তো সেসব অভিযাত্রী যারা আমাদের জীবনের চাইতেও আল্লাহ তাঁর রাসূল, তাঁর দ্বীন, জান্নাত, ইসলামী আন্দোলন ও ইসলামী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে বেশি ভালোবাসি। শিবিরতো সেই সংগ্রামী কাফেলার নাম যারা অতীতে এ জনপদে কোনো বাধাকেই পরোয়া করেনি, যেখানেই যখনই আঘাত এসেছে প্রতিবাদ করেছে। প্রয়োজনে সাধ্যমতো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। আমাদের একটি পোস্টারের অংশবিশেষ ছিঁড়ে ফেললে কিংবা ওয়ালরাইটিংয়ের ওপর কালি মারলে কিংবা হলের সিট থেকে আমাদের কোনো ভাইকে বের করে দিলে আমরা তো চুপ করে নীরবে তা মেনে নিইনি। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী কিংবা কোনো কর্মসূচিতে বাধা এলে জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ করতে আমরা তো পিছু হটিনি। এসব কারণে আমাদের অনেক ভাই জীবনের মায়া ত্যাগ করে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে হাসিমুখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। তাহলে আজকে কোন্ জিনিস আমাদেরকে ধোঁকায় ফেলেছে? কে আমাদেরকে মৃত্যুর ভয় দেখায়? মৃত্যুতো আমাদের একদিন আসবেই জানি। সুতরাং সেই মৃত্যু যদি হয় শহীদি মৃত্যু, সেটা কতোই না সৌভাগ্যের! সুতরাং আর দেরি নয়, সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সবাইকে নিয়ে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। হাজার হাজার নেতাকর্মী রাজপথে নেমে এলে এই সরকারের জুলুম-নির্যাতনের সমুচিত জবাব দেয়া সম্ভব। বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল বাতিল কর, অবিলম্বে আমীরে জামায়াতসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তি দাও  এই স্লোগান নিয়ে শিক্ষাঙ্গন ও রাজপথে একটি দুর্বার ও শক্তিশালী ছাত্র-আন্দোলন গড়ে তোলা হচ্ছে বর্তমান সময়ে শিবিরের মূল দায়িত্ব। এই আন্দোলনে যদি শিবির সফল হতে পারে তাহলে আগামী বাংলাদেশ তাদের জন্য হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এটাকে তাদের একাডেমিক কাজ মনে করতে হবে। হয়তো এই মুহূর্তে তাদের পড়ালেখার ক্ষতি হবে। কারো কারো জীবনের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু আগামীর ছাত্রসমাজ একটি সুন্দর ক্যাম্পাস ও পরিশীলিত রাজনীতি পাবে, সুন্দর সমাজ পাবে। যেখানে থাকবে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, মেধা মনুষ্যত্ব বিকাশের পরিপূর্ণ সুযোগ। সেই ধরনের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মানসিকতা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় অতি নিকটবর্তী।

SHARE

Leave a Reply