আল্লাহর সৈনিকের পরাজয় নেই -মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

মুসলমান হতে পারা একজন মানুষের জন্য পৃথিবীতে সবচেয়ে সৌভাগ্যের ব্যাপার। দ্বীন কায়েমের পথে অগ্রসর হতে পারা আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি। আল্লাহর গোলামির জন্য নিবেদিতরাই আল্লাহর সৈনিক। আল্লাহর সৈনিকেরা আল্লাহর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নিজের জীবনের বিনিময়ে জান্নাতকে খরিদ করে নিয়েছে- “(আসল ব্যাপার হলো) আল্লাহ মু’মিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল বেহেশতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন।” (সূরা তওবা : ১১১) প্রত্যেক মানুষই এভাবে আল্লাহর আরশে আজিমে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। আল্লাহর তরফ থেকে সকল আত্মাই জিজ্ঞাসিত হয়েছিল, “আমি কি তোমাদের রব নই?” সব আত্মার জবাব ছিল “হ্যাঁ, আপনিই আমাদের রব।” (সূরা আল আ’রাফ : ১৭২)
পৃথিবীতে ভৃত্য মালিকের গোলামি করে থাকে, মুনিবের কাছে ভৃত্য ফাঁকি দিতে পারে, মিথ্যাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে কিন্তু আল্লাহর কাছে বান্দা ফাঁকি দিতে পারে না; কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞাত। তাই নিতান্তই আল্লাহর গোলাম তাঁর দায়িত্ব পালন বা আল্লাহর আনুগত্য প্রদর্শনে কোন প্রকার গাফিলতি বা নেফাকির আশ্রয় নিতে পারে না। বান্দার সকল চিন্তা-ভাবনা ও কর্মতৎপরতা আল্লাহর গোলামিকে ঘিরে-“আমিতো একমুখী হয়ে তাঁর দিকেই আমার মুখ ফিরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি কখনো মুশরিকদের মধ্যে শামিল নই।” (সূরা আন-আম : ৭৯)
পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চের নানান রঙের মিলনমেলায় অনেক আত্মাই (মানুষ) তাদের কৃত ওয়াদা ও গৌরবান্বিত স্বপরিচয় দিব্যি ভুলে যায়। তাই আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসুলদের (সা) মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছেন ও তাদের পরিচয় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন-
“হে মানুষ! কোন জিনিস তোমাকে ধোঁকায় ফেলে রেখেছে তোমার মহান প্রভুর ব্যাপারে?” (সূরা ইনফিতার : ৬)
“আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।” (সূরা বাইয়্যেনাহ : ৫)
“অবশ্যই আমরা সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।” (সূরা তীন : ৪)
“আমি অবশ্যই আদম সন্তানদের মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে আমি তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদেরকে আমি পবিত্র বস্তু থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেছি এবং আমি অন্য যত কিছুই সৃষ্টি করেছি, তার অধিকাংশের ওপর তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি।” (সূরা ইসরা : ৭০)
আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৈনিকদের জন্য জীবনব্যাপী কর্মসূচি ঠিক করে দিয়েছেন। যার বদৌলতে নিশ্চিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব- “যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে, আর যারা কুফরি করেছে তারা তাগুদের পথে লড়াই করে। তাই শয়তানের সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও। জেনে রাখ শয়তানের চক্রান্ত বড়ই দুর্বল।” (সূরা নিসা : ৭৬)

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই জীবনের
মূল লক্ষ্য
আল্লাহর গোলামরা দুনিয়ার সকল বাধা বিপত্তি ও ঝড়-ঝঞ্ঝা, চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে ধৈর্যের মজবুত তরবারিকে পুঁজি করে সম্মুখে এগিয়ে যাবে। পৃথিবীর সাময়িক চলার পথে আল্লাহর গোলামদের জন্য বিজয় অথবা সাময়িক পরাজয় দুটোই জীবনের অংশ হিসেবে হাজির হতে পারে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন আল্লাহর পথে দৃঢ়পদে চলাই একজন মুমিনের জন্য শিরোধার্য। সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা, ক্ষুধা, দরিদ্রতা, ঐশ্বর্য কোন কিছুই তাকে মঞ্জিল থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা মুমিনের পরিচয় নির্দেশ করেছেন, “তারাই সত্যিকারের মুমিন যারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, এরপর এতে কোন সন্দেহ করেনি এবং আল্লাহর পথে জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে। এরাই সাচ্চা লোক।” (সূরা হুজুরাত : ১৫)
জয়-পরাজয় যাই আসুক না কেন তারা আল্লাহর পথে কায়েম থাকার ব্যাপারে কোন সন্দেহ পোষণ করে না। এই কন্টকাকীর্ণ পথের সাথীরা কেউ যদি আসন্ন বিপদের ভয়াবহতা দেখে পিছু হটে তাতেও সত্যাশ্রয়ী মানুষদের কোন পরোয়া নেই। জীবনের বাঁকে বাঁকে সবখানে শুধু আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল থেকে তার সাহায্য প্রাপ্তির প্রত্যাশায় প্রতীক্ষায় থাকে। জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে শুধু মাবুদের সন্তুষ্টিই একমাত্র তাদের কামনা বাসনা হয়ে থাকে। নিজের অথবা কারো স্বপ্নসাধ বাস্তবায়ন করা তার উদ্দেশ্য থাকে না বরং মুনিবের সন্তুষ্টি অর্জনই জীবনের একমাত্র কামনা বাসনা হয়ে থাকে। মু’মিনদের দুনিয়ার সাময়িক অর্জন, যশ, খ্যাতি সব কিছুর পেছনেই উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহর গোলামি করা। সে কথাই আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় রাসূলের কাছে নির্দেশ করেছেন, “হে নবী! তুমি বলো আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সব কিছুই সারা জাহানের মালিক আল্লাহ তায়ালার জন্য।” (সূরা আন আম : ১৬২)
আল্লাহর খালেসভাবে দাসত্ব করাই একজন গোলামের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহর গোলামদের আলাদা ব্যক্তিসত্তা বলতে কিছু নেই। আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক নিজেদের পরিচালনা করাই তাদের জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। আল্লাহর গোলামরাই আল্লাহর প্রতিনিধি। সামগ্রিকভাবে দুনিয়াকে আল্লাহর গোলামিভুক্ত করাই তাদের দায়িত্ব। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে শাসকগোষ্ঠী আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে- “আমি যদি এদের জমিনে প্রতিষ্ঠা দান করি, তাহলে এরা নামাজ প্রতিষ্ঠা ও জাকাত আদায় করবে, তারা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে, তবে সব কাজের চূড়ান্ত পরিণতি একান্তভাবে আল্লাহ তায়ালারই এখতিয়ারভুক্ত।” (সূরা হজ : ৪১)
কারণ খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবলমাত্র মানবজীবনে সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করা সম্ভব-“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসন কর্তৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জীবনবিধানকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।” (সূরা নুর : ৫৫)
প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়ায় আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা মুমিনদের অন্যতম দায়িত্ব। দ্বীনে হক বাতিল মতাদর্শের ওপর বিজয়ী হলে সবাই এর ফল ভোগ করবে। তবে এই বিজয় যদি মুমিনদের ব্যক্তিপর্যায়ে কাউকে কলুষিত (ক্ষমতার মোহ, নেফাকি, আত্মতৃপ্তি) করে ফেলে তা হবে ব্যক্তির জন্য এক মহা বিপর্যয়। ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা লাভ করুক অথবা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত থাকুক এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সবাইকে পানাহ চাওয়া উচিত। আর মুমিনের দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় যদি সামান্য কোন ঘাটতি না থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠা না হলেও ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর কাছে একজন মকবুল বান্দা হিসেবে প্রতীয়মান হবে। আল্লাহ তাঁর বান্দার বাহ্যিক বিষয়ে নয় বরং অন্তর্গত বিষয়েই লক্ষ্য রাখেন। “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কর্মের দিকে লক্ষ্য করেন।” (মুসলিম, হাদিস নম্বর ৬৭০৮)
মুমিন জীবনের উদ্দেশ্য বর্ণনায় মাওলানা মওদূদী (রহ) সাফল্যের শর্তাবলি বইয়ে লিখেছেন, ‘সমাজ সংস্কার ও পরিগঠনে ব্রতী কর্মীদের খোদার বাণী বুলন্দ করা এবং দ্বীনের প্রতিষ্ঠা নিছক তাদের জীবনের একটি আকাক্সক্ষার পর্যায়ভুক্ত হবে না বরং এটিকে তাদের জীবনোদ্দেশ্যে পরিণত করতে হবে। এক ধরনের লোক দ্বীন সম্পর্কে অবগত হয়, তার ওপর ঈমান রাখে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে কিন্তু তার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম তাদের জীবনের লক্ষ্য বিবেচিত হয় না বরং সততা ও সৎকর্ম করে এবং এই সঙ্গে নিজেদের দুনিয়ার কাজ কারবারে লিপ্ত থাকে। নিঃসন্দেহে এরা সৎ লোক। ইসলামী জীবনব্যবস্থা কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে এরা তার ভালো নাগরিকও হতে পারে। কিন্তু যেখানে জাহেলি জীবনব্যবস্থা চতুর্দিক আচ্ছন্ন করে রাখে এবং তাকে সরিয়ে তদস্থলে ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার প্রশ্ন দেখা দেয় সেখানে নিছক এ ধরনের সৎলোকদের উপস্থিতি কোনো কাজে আসে না বরং সেখানে এমন সব লোকের প্রয়োজন হয় যাদের জীবনোদ্দেশ্য রূপে এ কাজ বিবেচিত হয়। দুনিয়ার অন্যান্য কাজ তারা অবশ্যই করবে কিন্তু তাদের জীবন একমাত্র এ উদ্দেশ্যের চারিদিকে আবর্তন করবে। এ উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য তারা হবে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ। এ জন্য নিজেদের সময়-সামর্থ্য, ধন-মাল ও দেহ-প্রাণের সকল শক্তি এবং মন মস্তিষ্কের পরিপূর্ণ যোগ্যতা ব্যয় করতে তারা প্রস্তুত হবে। এমনকি যদি জীবন উৎসর্গ করার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে তাতেও তারা পিছপা হবে না। এ ধরনের লোকেরাই জাহেলিয়াতের আগাছা কেটে ইসলামের পথ পরিষ্কার করতে পারে।
দ্বীনের সঠিক নির্ভুল জ্ঞান, তার প্রতি অটল বিশ্বাস, সেই অনুযায়ী চরিত্র গঠন এবং তার প্রতিষ্ঠাকে জীবনোদ্দেশ্যে পরিণত করা এগুলো এমন সব মৌলিক গুণ যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে ইসলামী জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টারত প্রত্যেকটি ব্যক্তির মধ্যে থাকা উচিত। এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থাৎ এ গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ ছাড়া এ কাজ সম্পাদনের কল্পনাই করা যেতে পারে না।

বলাবাহুল্য, এহেন ব্যক্তিরা যদি সত্যিই কিছু করতে চায় তাহলে তাদের একটি দলভুক্ত হয়ে এ কাজ করা অপরিহার্য। তারা যেকোনো দলভুক্ত হোক এবং যেকোনো নামে কাজ করুক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না। প্রত্যেক বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি জানে, নিছক ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সমাজব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন আনা যেতে পারে না। এ জন্য বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টা নয়, সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
কেন আল্লাহর সৈনিকেরা
পরাজিত হয় না?
আল্লাহ তায়ালা তাঁর গোলামদেরকে সেরা সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। (সূরা বাকারা : ৩০) প্রতিনিধির কাজ হলো তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। পারতপক্ষে দায়িত্ব পালনে কোন ধরনের অবহেলা প্রদর্শন না করা। আল্লাহর প্রতিনিধি সর্বতোভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে- “তাদের নীতি হয়, আল্লাহ যেসব সম্পর্ক ও বন্ধন অক্ষুন্ন রাখার হুকুম দিয়েছেন সেগুলো তারা অক্ষুন্ন রাখে, নিজেদের রবকে ভয় করে।” (সূরা আর রা’দ : ২১) উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে কোন দেশের বিদেশমন্ত্রী দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দেশের বাইরে গেলেন। কিন্তু বিদেশমন্ত্রী যখন দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজের মনোবাসনা (নিছক দেশ ভ্রমণ বা ব্যক্তিগত কাজ বা আমোদফুর্তি) চরিতার্থে ব্যস্ত থাকেন নিঃন্দেহে তখন তার দেশীয় আইনে শাস্তি হবে। এমনকি ভ্রমণের জরিমানাও তাকে দিতে হতে পারে! তেমনি আল্লাহর প্রতিনিধি হেলায় ফেলায় দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধিত্বেও সফরের সময় নষ্ট করা নেহাত বোকামি বৈ কী হতে পারে? তাই আল্লাহ তায়ালা কোন গাইডলাইন ছাড়াই পৃথিবীতে মানুষকে এমনি এমনিই পাঠিয়ে দেননি। বরং তিনি তার প্রিয় বান্দাদেরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েই পাঠিয়েছেন। তাবৎ দুনিয়ার সকল পরীক্ষা নিরীক্ষাকে মোকাবেলা করে আল্লাহর পথে কায়েম থাকাই আল্লাহর গোলামদের জীবনের অন্যতম মিশন। তাই তারা তাদের জীবন, মাল-সম্পদ হারানোকে মোটেও ভয় পায় না। কারণ আল্লাহর তার গোলামদের সাথে আগেই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। (সূরা তওবা : ১১১) এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গেলেই নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি হক পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটাতে পারে। পরীক্ষার বিষয়বস্তু আল্লাহ তায়ালা আগেই ঠিক করে দিয়েছেন- “এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে, তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।” (সূরা বাকারা : ১৫৫)
তাই বান্দার কাজ হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার ওপর তাওয়াক্কুল থাকা- “আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা না করার কী কারণ থাকতে পারে, অথচ তিনি আমাদেরকে আমাদের পথ বলে দিয়েছেন। তোমরা আমাদেরকে যে পীড়ন করেছ, তজ্জন্য আমরা সবর করব। ভরসাকারীগণের আল্লাহর ওপরই ভরসা করা উচিত।” (সূরা ইবরাহিম : ১২) মুমিনদের নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে সার্বক্ষণিক এই চিন্তা-চেতনায় মত্ত থাকে যে, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট (হা-মিম আস সিজদাহ : ৩৩) একজন মুমিনকে পৃথিবীর কোন ধরনের পরীক্ষা কখনো কাবু করতে পারে না। জেল-জুলুম-ফাঁসির মঞ্চকে তারা থোড়াই কেয়ার করে। যেমন হযরত বেলাল, খোবায়েব-খাব্বাব, আম্মার-ইয়াসির ও হযরত হাসান ও হোসাইন (রা)কে কাবু করতে পারেনি। যারা শাহাদতের মৃত্যুকে হাসিমুখে আলিঙ্গন করে নিয়েছেন তার পরও কোন আল্লাহদ্রোহিতার সাথে আপস করেননি। শুধুমাত্র আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করার অপরাধে তার কওমের লোকেরা অসংখ্য নবী ও রাসূলকে হত্যা করেছে। এসব পরীক্ষ নতুন কোন বিষয় নয়। এটাই ইসলামী ঝান্ডাধারী মোজাহিদদের জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। এই কন্টকাকীর্ণ পথে চলতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা হয়ত মোজাহিদদের হাতে বিজয়ী ঝান্ডা তুলে দিতে পারেন অথবা জুলুম-নির্যাতন, দুঃখ-কষ্টের মাধ্যমে আল্লাহ পরীক্ষা নিতে পারেন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের অবয়বে পরীক্ষা এসে হাজির হয়ে নিজেদের দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিতে চায়, নিজের অবস্থানকে সন্দেহ সংশয়ের মাঝে ফেলে দেয়!
এমন পরীক্ষায় মুমিনরা ছাড়া কেবা উত্তীর্ণ হতে পারে?- “তোমরা কি মনে করো, তোমরা এমনি এমনি বেহেশতে প্রবেশ করে যাবে, অথচ আল্লাহ তায়ালা এ কথাটি জেনে নেবেন না যে কে জেহাদ করতে প্রস্তুত হয়েছে এবং এ কে এই কঠোর বিপদে ধৈর্য ধারণ করতে পেরেছে!” (সুরা আলে ইমরান : ১৪২)
এতে হতাশ বা হত-বিহবল হওয়ার কিছু নেই। হতাশ না হওয়া, মুষড়ে না পড়া ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল থাকা এতেই মুমিন জীবনের জন্য প্রকৃত সফলতা! তাই বিশ্বব্যাপী মুসলিম মিল্লাতের ওপর ইসলামবিদ্বেষীদের যে ভয়াল হামলা চলছে এতে হকচকিত হওয়ার কিছু নেই, আমাদের কাজ হচ্ছে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বের সবটুকু পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। আর মুমিনরা যা অসাধ্য, তা মহান আল্লাহর সেই অপূরণ তার অসীম কৃপায় তিনি পূরণ করে দেবেন।
আল্লাহ-অর্পিত দায়িত্বপালনের পেরেশানিই মু’মিনদেরকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে উন্নীত করে। আল্লাহ তার সেরা সৃষ্টজীবকে খেলাফতের দায়িত্ব দিয়ে প্রকৃতপক্ষে তার প্রতিনিধিত্ব করছে কি না তাই তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চান।
আল্লাহর পথে থেকে যদি জীবনের সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যায় তাতেও মুমিনজীবনে তেমন কিছু হারানোর নেই। কারণ আল্লাহর রাস্তায় জীবনকে পরিচালিত করতে পারাই মু’মিন জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। মু’মিনের জীবন থাকলেও তাতে কোনো পরাজয় নেই, আবার আল্লাহর রাহে চলতে গিয়ে বাতিলের মোকাবেলায় জীবন সংহার হয়ে গেলেও পরাজয়ের কিছু নেই। হাতি মরলেও যেমন লক্ষ টাকায় হাড় বিক্রি হয়, জীবিত থাকলেও লক্ষ টাকাই তার দাম। তেমনি আল্লাহর সৈনিকেরাও অপরাজেয়, যদি জীবন আল্লাহর গোলামির ওপর কায়েম রাখা যায়। গানের পাখি কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার গানে লিখেছেন- ‘একজন মোজাহিদ কখনো বসে থাকে না, যতই আসুক বাধা, যতই আসুক বিপদ, থমকে দাঁড়ায় না, … মুষড়ে পড়ে না।’ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে শত প্রতিকূলতার মাঝেও দ্বীনে হকের ওপর টিকে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply