আল-আকসা মসজিদে আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে -এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল-আকসা মসজিদকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফিলিস্তিন। মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয়া এবং তিন ফিলিস্তিনিকে হত্যার পর সম্প্রতি ইসরাইলের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ স্থগিতের ঘোষণা দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
আল-আকসা মসজিদ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে সুইডেন, ফ্রান্স ও মিসর। সুইডেনের রাজনৈতিক সমন্বয়ক কার্ল স্কাউ বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করে এই সংঘর্ষ থামানোর পথ বের করা উচিত।
মক্কার মসজিদুল হারাম বা বায়তুল্লাহ ও মদিনার মসজিদে নববীর পর মুসলমানদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান হচ্ছে বায়তুল মুকাদ্দাস বা মসজিদুল আকসা। রাসূলুল্লাহ (সা) যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশে সফরকে বিশেষভাবে সওয়াবের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এর অন্যতম হচ্ছে মসজিদ আল-আকসা। ফিলিস্তিনের জেরুসালেম নগরীতে অবস্থিত বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে মুসলমানদের প্রথম কিবলা। অসংখ্য নবী-রাসূলের পদধূলিতে ধন্য এ নগরী। এ পবিত্র নগরীর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা বিশ্বের প্রতিটি মুমিন মুসলমানের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। কুরআন মজিদে বায়তুল মুকাদ্দাসকে পবিত্র ভূমি বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘স্মরণ করো, (মূসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল) হে আমার সম্প্রদায়- আল্লাহ তোমাদের জন্য যে পবিত্র ভূমি নির্দিষ্ট করেছেন তাতে তোমরা প্রবেশ করো এবং পশ্চাৎপসরণ করো না, তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।’ (সূরা আল-মায়িদা : ২১)
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, হজরত ইবরাহিম (আ) কাবাঘর পুনর্নির্মাণের ৪০ বছর পর হজরত ইয়াকুব (আ) জেরুসালেমে আল-আকসা মসজিদ নির্মাণ করেন। হজরত দাউদ (আ) বায়তুল মোকাদ্দাসে তার আমলের রাজধানী স্থাপন করেন এবং একটি বিশাল ইবাদতখানা নির্মাণে হাত দেন, যা হজরত সোলায়মান (আ) কর্তৃক জিনদের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। অতঃপর হজরত দাউদ (আ)-এর পুত্র নবী হজরত সোলায়মান (আ) জেরুসালেম নগরী পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং মহান আল্লাহর মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুনর্নির্মাণ করে গড়ে তোলেন মসজিদ আল-আকসা। এভাবে বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার মর্যাদা বাস্তবরূপ লাভ করে। এরপর হজরত ঈসা (আ)-এর সময় থেকে তার অনুসারীদের এবং মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির পর থেকে মুসলমানদের দ্বারা বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্রতম স্থান রূপে গণ্য হতে থাকে।
এ মসজিদকে কেন্দ্র করে ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে বহুদিন ধরেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
১৯৬৭ সালের পর ইসরাইল আল-আকসায় প্রবেশের অনুমতি পায়। তখন শুধু মুসলিমরা নামাজ পড়ত। মাঝে মাঝে ইহুদিদের প্রার্থনার সুযোগ করে দেয়া হতো। তবে এখন অনেকটাই বদলেছে পরিস্থিতি। ইসরাইল দখল নিতে চায় আল-আকসা, তার জের ধরে উত্তাল ফিলিস্তিন। জেরুসালেম এবং পশ্চিমতীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে দখলদার ইসরাইল। ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীকে পাথর ছুঁড়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষ।
২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় তিনশ’র বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ে ৫০ জন ইসরাইলির মৃত্যু হয়েছে।
ইসরাইলি সেনারা কিছুদিন পরপর নতুন নতুন অজুহাতে আল-আকসা মসজিদে হামলা চালিয়ে এর ক্ষতি করছে। আর ফিলিস্তিনের মুসলমানরা যখনই আল আকসা মসজিদকে বিপদের মুখে দেখেছে, তখনই তারা এ মসজিদ রক্ষার সংগ্রাম করেছে এবং ইহুদিবাদী সেনাদের হামলায় শাহাদত বরণ করছে।
ইসরাইলিরা আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু করে ১৯৬৯ সালে এটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে। তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলআবিব এ মসজিদ ধবংস করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। ইহুদিবাদীরা দাবি করছে, মসজিদুল আকসার নিচে হজরত সোলায়মান (আ)-এর উপাসনালয় অবিস্থত এবং সেটিকে খুঁজে বের করার জন্য তারা এ ধরনের ধবংসাত্মক কাজে হাত দিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে, ইহুদি জাতির মুক্তিদাতার আবির্ভাবের সময় এসে গেছে এবং তার আবির্ভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি করার জন্য আল আকসা মসজিদ ধবংস করে সেখানে সোলায়মান (আ)-এর উপাসনালয় নির্মাণ করতে হবে। আল আকসা মসজিদের নিচে ঐ উপাসনালয়ের অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিক ও প্রতœতত্ত্ববিদরা ব্যাপক সংশয় প্রকাশ করেছেন। বিখ্যাত প্রতœতত্ত্ববিদ মাইর বিন দোউফ ব্যাপক গবেষণা ও বহুবার মসজিদুল আকসা পরিদর্শনের পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গবেষণার ফলাফল লিখতে গিয়ে বলেন, হজরত ঈসা (আ)-এর উপাসনালয় কোনো অবস্থায়ই আল আকসা মসজিদের নিচে অবস্থিত নয়। ইহুদিবাদীরা তাদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে বৈধতা দেয়ার জন্য হোলোকাস্টের মতো যেসব কল্পকাহিনী তৈরি করেছে, সোলায়মান (আ)-এর উপাসনালয় সে রকমেরই একটি কল্পকাহিনী।
ইসরাইলের ১২৫টি উগ্র ইহুদিবাদী গোষ্ঠী আল আকসা মসজিদকে ধ্বংস করার দাবি জানাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি দিচ্ছে। এ পর্যন্ত ইহুদিবাদী সরকার মসজিদুল আকসার ভিত্তি দুর্বল করার জন্য এর নিচ দিয়ে ট্যানেল তৈরি করেছে এবং এর বেশ কিছু অংশ ধবংস করেছে। ১৯৮২ সালে আল আকসা মসজিদে এ ধরনের এক আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনি ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন। ১৯৯০ এর দশকে এ ঐতিহাসিক মসজিদের নিচে বহু খননকাজ চালানো হয়। ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ধরনের একটি ট্যানেল উদ্বোধন করতে গেলে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইহুদিবাদীদের সংঘর্ষ বেধে যায় এবং এতে বহু ফিলিস্তিনি শহীদ হন। মসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকের প্রাচীর ধ্বংসের ইসরাইলি পদক্ষেপের প্রতি মার্কিন সরকার সমর্থন জানালেও বিশ্বব্যাপী এ জঘন্য কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে গেছে। কারণ, ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র স্থান হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব ছাড়াও এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জাতিসংঘের বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো মসজিদুল আকসা ধ্বংসের কাজ শুরু হওয়ার পর এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থান এবং এ কারণে এটি বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কাজেই ঐ স্থানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জেরুসালেম শহরের পুরনো অংশে কোন খননকাজ চালানো যাবে না। কিন্তু ঐ এলাকার ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করার জন্য ইহুদিবাদী সরকার তাদের ওপর হামলা চালানোসহ তাদের কৃষিজমি ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সেখানে নতুন নতুন ইহুদি উপশহর নির্মাণ করছে। এভাবে পূর্ব জেরুসালেমকে পুরোপুরি ইহুদীকরণ করে মসজিদুল আকসা ধ্বংসের কাজে হাত দেয়া তেলআবিবের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের মুসলমানেরা ইহুদিদের অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন এবং ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের কবল থেকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে মুক্ত করার জন্য পুনরায় দৃঢ় শপথগ্রহণ করেন। কিন্তু তারপর ইহুদিবাদী সরকার মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী কোন কাজ করলে মুসলিম সরকারগুলো তেলআবিবের নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। এবার মুসলিম সরকারগুলোকে এ ব্যাপারে আরো বেশি সোচ্চার হতে হবে। ইহুদিবাদী সরকার যাতে আল আকসা মসজিদে আর কোন আগ্রাসন চালাতে না পারে সে লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। মুক্তিকামী ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য করতে হবে। আর তা নিতে পারলেই ইসরাইল সরকার সম্মিলিত মুসলিম ঐক্যের কাছে মাথা নত করে এ ধরনের আগ্রাসন থেকে বিরত থাকবে।
সবশেষে বলতে চাই, মুসলমানদের পারস্পরিক সুদৃঢ় ঐক্য, সম্প্রীতি ও সার্বক্ষণিক সতর্কতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগ্রহণ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে মুক্ত ও আল আকসা মসজিদকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply