আল কুরআনের অবমাননা জীবন দিয়ে রুখে দিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর জনতা

অধ্যাপক তাসনীম আলম#

Koran-Diboshপবিত্র আল কুরআন এবং নবী করিম (সা)-এর অবমাননায় বাংলাদেশের তৌহিদি জনতা কখনও চুপ করে থাকেনি। দলমত নির্বিশেষে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। বাংলাদেশের ৬৩টি জেলার মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জও একটি জেলা। এ জেলায় এমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানগণ এ জেলাটি সম্পর্কে ধারণা রাখে। এ জেলার মুসলমানগণ কুরআনের মর্যাদা রক্ষায় যেভাবে জীবন দিয়েছে তা সত্যিই অতুলনীয়।

১৯৮৫ সালের ১১ মে। আজ থেকে ৩০ বছর আগেকার একটি ঘটনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি স্মরণীয় ঘটনাই নয়, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর মুসলমানদের জন্য এটি প্রেরণার উৎস। ঘটনার সূত্রপাত ভারতে। ১৯৮৫ সালের ১০ এপ্রিল কুরআন বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়ে পদ্মপল চোপরা ও শীতল শিং নামক দু’জন ভারতীয় নাগরিক কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন। বিচারপতি পদ্মখস্তগির বিচার বিশ্লেষণ না করেই রিট পিটিশনটি গ্রহণ করেন। কুরআন মুসলমানদের নিকট তাদের জীবনের চেয়েও প্রিয় গ্রন্থ। কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এ খবর দাবানলের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু ভারত নয়, সারা দুনিয়ার মুসলমানের নিকট এ খবর পৌঁছে যায়। ভারতে শুরু হয় বিক্ষোভ। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বিক্ষুব্ধ মুসলমানেরা রাস্তায় নেমে আসে। দলমত নির্বিশেষে বাংলাদেশের মুসলমানগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকায় জুমার নামাজ শেষে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ‘কুরআনের অবমাননা জীবন দিয়ে রুখবো, দুনিয়ার মুসলমান এক হও’ ইত্যাদি শ্লোগানে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ বাহিনী ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ওপর লাঠিচার্জ করে। বহু মুসল্লি আহত হন। এ ঘটনা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আরো ক্ষিপ্ত করে তুলে। অন্যান্য জেলার মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের মুসলমানরাও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিতে থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল হোসাইন আহমদকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির বৈঠকে ১১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঈদগাহ ময়দানে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে জনগণের নিকট খবর পৌঁছানো হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, এ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হবে। প্রশাসন যেন কোনো উত্তেজনা সৃষ্টি না করে। সর্বস্তরের জনতার সাথে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরও এ কর্মসূচি সফল করার জন্য মাঠে-ময়দানে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। ‘শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে’ প্রশাসনকে বারবার অবহিত করার পরও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সমাবেশ বানচালের ষড়যন্ত্র করে। বিশেষ করে ওই সময়কার কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে চক্রান্ত শুরু হয়। ১১ মে ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা মাওলানা হুসাইন আহমদসহ কমিটির লোকদেরকে তার অফিসে ডেকে নেয় এবং কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। উপস্থিত ওলামায়ে কেরাম তাকে  বোঝানোর চেষ্টা করে যে, এটা কোনো সরকারবিরোধী সমাবেশ নয়। কুরআনপ্রেমিক তৌহিদি জনতার সমাবেশ। এখানে কোন ধরনের হট্টগোল হবে না। নির্ধারিত সময়ে আমরা সংক্ষিপ্ত কথা বলে দোয়া ও মুনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচি সমাপ্ত করে দেবো। কিন্তু আলেমসমাজের কথায় কর্ণপাত না করে সমাবেশ বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এভাবেই প্রশাসনের সাথে বৈঠক শেষ হয়। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয় যে, আজকের সমাবেশ হবে না। সাধারণ জনগণ এই মাইকিং শুনে বিভ্রান্ত হয়। তারা নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে জানতে পারে, প্রশাসন সমাবেশ বানচাল করার জন্য এ ধরনের মাইকিং করছে। এ খবরও দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছে যায়। জনগণ আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। দলে দলে মানুষ ঈদগাহ ময়দানের সামনে জড়ো হতে থাকে। ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াহেদুজ্জামানের নির্দেশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করে ময়দান দখল করে নেয়। হাজার হাজার জনতা হাজির হলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। আয়োজক নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের নিকট অনুরোধ জানায়, “আমরা ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশ করে জনগণকে সাথে নিয়ে মুনাজাত করে চলে যাবো। কোন ধরনের অসুবিধা হবে না।” কিন্তু কোনোভাবেই প্রশাসন রাজি হয় না। এ অবস্থায় হাজার হাজার মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট ও নাটের গুরু ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লা পুলিশকে গুলি করার নির্দেশ দেন। পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালাতে থাকে। নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালালে বহুসংখ্যক  তৌহিদি জনতা হতাহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের নিকট থেকে জানা যায়, গুলিকে ভয় না পেয়ে জনতা এগিয়ে যেতে থাকে। অবশেষে নেতৃবৃন্দ বহু কষ্ট করে বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পুলিশের গুলিতে আটজন শহীদ হন এবং বহু সংখ্যক আহত হন। মারাত্মকভাবে আহতদের চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু পুলিশ গাড়ি থামিয়ে বর্বরের মতো আহতদের ব্যাপক মারপিট করে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তান্ডবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়। জনগণের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের গুলিবর্ষণে শহীদ আটজন হলেনÑ মাদরাসার ছাত্র শীশ মোহাম্মদ, স্কুলছাত্র আব্দুল মতিন, রাশিদুল হক রাশিদ, রেলশ্রমিক নজরুল ইসলাম, রিকশাচালক মোক্তার হোসেন, কৃষক আলতাফুর রহমান সবুর, স্কুলছাত্র সেলিম ও সাহাবুদ্দিন। এত লোক আহত হয় যে, হাসপাতালে তিল ধারণের স্থান ছিল না। ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লার বাড়াবাড়িতে জনগণ এতই ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে যে, প্রশাসন বাধ্য হয়ে রাতে কারফিউ জারি করে। জনতার ভয়ে প্রশাসন ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লাকে বদলি করে রাতের আঁধারে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে যখন এ ঘটনা ঘটে তখন ঢাকায় আমরা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারিয়েট বৈঠক করছিলাম। কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে আমি বৈঠক পরিচালনা করছিলাম। এমন সময় আমরা খবর পাই- চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। ওই সময় এখনকার মত মোবাইল ছিল না। টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলতে হতো। টেলিফোনও হাতেগোনা। পুলিশের তান্ডবে পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হয়েছিল যে, আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। অনেক পরে ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে সদ্য বিদায় নেয়া জামায়াত নেতা লতিফুর রহমান ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করতে সমর্থ হই। তার নিকট থেকে বিস্তারিত খবর পাই। তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেই, যাতে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়।
সত্যিকার কতজন শহীদ হয়েছে তার সঠিক হিসাবও আমরা পাচ্ছিলাম না। কারণ ঐ সময় অনেককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হয়তো পুলিশ লাশ গুম করেছে। সেক্রেটারিয়েট বৈঠকের নির্ধারিত এজেন্ডা স্থগিত করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘটনা সম্পর্কে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করা হয়। দ্রুত একটি বুলেটিন বের করার দায়িত্ব দেয়া হয়। সেক্রেটারি জেনারেল ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহেরকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফর করেন। এক সপ্তাহ পর আমি কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সফর করি। স্থানীয় জামায়াত ও শিবির নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করি। এরপর স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সাথে নিয়ে শহীদ পরিবারে কাছে যাই এবং তাদেরকে সান্ত¡না প্রদান করি। আহতদেরও খোঁজখবর নিই। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার। সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। তৌহিদি জনতার রক্তে তার হাত রঞ্জিত হয়। ওয়াহেদুজ্জামান মোল্লা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিদায় নিলে তার শাস্তি তো দূরের কথা বরং তাকে প্রমোশন দেয়া হয় এবং সর্বশেষে সচিব পদে উন্নীত হয়।
কুরআনের মর্যাদা রক্ষার খাতিরে এভাবে ছাত্র-জনতার জীবন দানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ১১ মে-কে কুরআন দিবস হিসেবে পালন করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৌহিদি জনতার দাবি ছিল সরকার যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিবসটি ‘কুরআন দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু কোনো সরকারই এ ঘোষণা দেয়নি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবল আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত এ রিট পিটিশনটি খারিজ করে দেয় ভারতের আদালত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বীর জনতার এ আত্মত্যাগের ইতিহাস চির অম্লান হয়ে থাকবে। আল্লাহপাক চাঁপাইনবাবগঞ্জের তৌহিদি জনতাকে পরকালে বিশেষ মর্যাদা দান করুন এবং রক্তে ভেজা চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ইসলামী আন্দোলনের উর্বর ভূমিতে পরিণত হোক। এ দোয়াই করি।

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply