আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি -মুনতাজ আল জাইদি

দারসুল কুরআন

আল-কুরআন অবতীর্ণের প্রাক্কালে স্বয়ং কুরআনই আরবদেরকে এর সম্মোহনী শক্তিতে সম্মোহিত করেছিল। যার অন্তরকে আল্লাহ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন তিনি এবং যাদের মনের ওপর ও চোখের ওপর পর্দা পড়ে গিয়েছিল তারাও এ কুরআনের সম্মোহনী প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
যদিও তারা এ কুরআন থেকে কোন উপকৃত হতে পারেনি। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তিত্ব এমন ছিল, যারা শুধুমাত্র নবী করীম (সা.)-এর স্ত্রী মুহতারামা খাদিজা (রা), তাঁর মুক্ত করা ক্রীতদাস হযরত যায়িদ (রা) প্রমুখ। এঁদেরকে ছাড়া প্রাথমিক অবস্থায় যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তখন রাসূল (সা.) এতো বেশি শক্তি ও ক্ষমতাশালী ছিলেন না যে, তারা তাঁর ক্ষমতা ও শক্তিমত্তায় বিমোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বরং তাদের ইসলাম গ্রহণের মূলে ছিল আল কুরআনের মায়াবী আকর্ষণ।
হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এবং ওয়ালিদ বিন মুগিরার প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা দুটো উপরোক্ত বক্তব্যকেই স্বীকৃতি দেয় এবং প্রমাণ করে যে, আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তি অত্যন্ত প্রবল। যা শুধু ঈমানদারদেরকেই নয়; বরং কাফিরদেকেও প্রভাবিত করতো।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে আতা ও মুজাহিদ এর রিওয়ায়েতে বর্ণনা করেছেন, যা ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ বিন আবু নাজিহ থেকে সঙ্কলন করেছেন, হযরত উমর (রা) বলেন-
“আমি সেদিনও ইসলাম থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেছিলাম, শরাব পানে মত্ত থাকতাম। আমাদের এক মিলনায়তন ছিল, যেখানে কুরাইশরা এসে জমায়েত হতো। সেদিন আমি তাদের সন্ধানে গেলাম কিন্তু কাউকে সেখানে পেলাম না। চিন্তা করলাম অমুক শরাব বিক্রেতার নিকট যাব, হয়তো সেখানে তাদেরকে পেয়েও যেতে পারি। কিন্তু সেখানেও তাদের কাউকে আমি পেলাম না। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, মসজিদে হারামে গিয়ে তাওয়াফ করিগে। সেখানে গেলাম। দেখলাম হযরত মুহাম্মদ (সা.) নামাযে মশগুল। তিনি শামের (সিরিয়ার) দিকে মুখ করে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। কা’বা তাঁর ও শামের মাঝে অবস্থিত। তিনি রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়েমেনির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন। তাঁকে দেখে ভাবলাম, আজ রাতে আমি চুপি চুপি শুনবো, তিনি কী পড়ছেন। আবার মনে হলো, যদি শোনার জন্য কাছে চলে যাই তবে তো আমি ধরা পড়ে যাব। তাই হাতিমের দিক থেকে এসে খানায়ে কা’বার গেলাফের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার ও তাঁর মাঝে একমাত্র কা’বার গেলাফ ছাড়া অন্য কোন আড়াল ছিল না। যখন আমি নবী করীম (সা.)-এর তিলাওয়াত শুনলাম তখন আমার মধ্যে এক ধরনের ভাবান্তর সৃষ্টি হলো। আমি কাঁদতে লাগলাম। আর পরিণতিতে আমার ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য হয়।”
ইবনে ইসহাকের আরেক বর্ণনায় আছে- একদিন উমর (রা) রাসূলে করীম (সা.)-কে হত্যা করার জন্য নগ্ন তরবারি নিয়ে রওয়ানা হলেন। সাফা পাহাড়ের পাদদেশে কতিপয় সাহাবীর সাথে নবী করীম (সা.) একটি ঘরে বসবাস করতেন। সেখানে প্রায় চল্লিশ জনের মতো পুরুষ ও মহিলা ছিল। পথিমধ্যে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: উমর! কোথায় যাচ্ছ? উমর তাঁর উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। নাঈম বললেন: বনি আবদে মুনাফের শত্রুতা পরে কারো, আগে নিজের বোন ফাতিমা এবং ভগ্নিপতি সাঈদ বিন যায়িদকে সামলাও। তারা মুসলমান হয়ে গেছে। তখন হযরত ওমর (রা) সেখানে গিয়ে দেখলেন, খাব্বাব (রা) তাদেরকে কুরআন শরীফ পড়াচ্ছেন।
উমর (রা) সরাসরি দরজার ভেতর ঢুকেছিল এবং ভগ্নিপতি সাঈদকে ধরে ফেললেন। নিজের বোন ফতিমাকে মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে দিলেন। কিছুক্ষণ বাগি¦তণ্ডার পর তারা যা পড়ছিল, তা দেখতে চাইলেন। তখন সূরা ত্ব-হা থেকে কিছু অংশ পাঠ করে তাকে শুনানো হলো। যখন সূরা ত্ব-হার কিছু অংশ শুনালেন, তখন মন্তব্য করলেন, ‘এতো অতি উত্তম কথাবার্তা’। তাপর তিনি রাসূলে করীম (সা.)-এর নিকট গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন। (সিরাতে ইবনে হিশাম)
এ বিষয়ে সমস্ত বর্ণনার মূল কথা একটি। তা হচ্ছে হযরত উমর (রা) কুরআনের কিছু অংশ পড়ে অথবা শুনে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। আমরা তো এ ঘটনা শুনি কিংবা বলি কিন্তু এদিকে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় না যে, হযরত উমর (রা)-এর পরিবর্তন হয়েছিল, তার মূলে ছিল আল-কুরআনের আকর্ষণ ও অপ্রতিরোধ্য সম্মোহনী শক্তি।

ওয়ালিদ বিন মুগিরার ঘটনা
ওয়ালিদ বিন মুগিরা কুরআনে হাকিমের কিছু অংশ শুনে তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। এটি দেখে কুরাইশরা বলাবলি শুরু করলো, সে মুসলমান হয়ে গেছে। ওয়ালিদ ছিল কুরাইশদের মধ্যে এক সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত ব্যক্তি। আবু জাহেলকে তার কাছে পাঠানো হলো। যেন সে কুরআনের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের কথা ঘোষণা দেয় যাতে কুরাইশরা তার ঐ কথায় প্রভাবিত হয়। ওয়ালিদ বলতে লাগলো: “আমি কুরআন সম্পর্কে কী বলবো? আল্লাহর কসম! আমি কবিতা ও কাব্যে তোমাদের চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখি কিন্তু মুহাম্মদের কাছে যে কুরআন শুনেছি তার সাথে এগুলোর কোনো মিল নেই। আল্লাহর শপথ! তার কাছে যা অবতীর্ণ হয় তা অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর এবং তা প্রাঞ্জল ভাষায় অবতীর্ণ। যা তার সামনে আসে তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ওটি বিজয়ী হওয়ার জন্য এসেছে পরাজিত হতে আসেনি।”
এ কথা শুনে আবু জাহেল বললো : ‘যতোক্ষণ তুমি কুরআনকে অবজ্ঞা না করবে ততোক্ষণ তোমার কওম তোমার ওপর নারাজ থাকবে।’ ওয়ালিদ বললো: ‘আমাকে একটু চিন্তা করার অবকাশ দাও।’ তারপর সে ঘোষণা দিলো: ‘এতো সুস্পষ্ট যাদু, তোমরা দেখো না, যে এর সংস্পর্শে যায় তাকেই তার পরিবার ও বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। [সিরাতে ইবনে হিশাম ও তাফসীরে ইবনে কাসীরে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে। -লেখক।]
এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে বলা হয়েছে : “সে চিন্তা করেছে এবং মনস্থির করেছে। সে ধ্বংস হোক, কিভাবে সে মনস্থির করেছে, (আবার বলছি) সে ধ্বংস হোক, কিভাবে সে মনস্থির করেছে! দেখেছে, সে আবার ভ্রুকুঞ্চিত ও মুখ বিকৃত করেছে। অতঃপর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছে এবং অহংকার করে বলেছে: এতো লোক পরম্পায় প্রাপ্ত যাদু বৈ আর কিছুই নয়।” (সূরা আল মুদ্দাসসির : ১৮-২৪)
এ হচ্ছে ঐ ব্যক্তির বক্তব্য যে ইসলামের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করতো। মুহাম্মদ (সা.)-এর নিকট পৌঁছুলে নিজের অজান্তেই তাদের মন ও মাথা ঝুঁকে পড়ে কিন্তু যখন বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে ফিরে আসে তখন সম্মান ও প্রতিপত্তি বজায় রাখার জন্য বিদ্রোহ তাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এতেই প্রমাণিত হয়, আল-কুরআনের আকর্ষণী শক্তি কতো তীব্র, যা যাদুকেও হার মানায়।
এবার চিন্তা করে দেখুন, আল-কুরআন হযরত উমর (রা) ও ওয়ালিদ বিন মুগিরা দু’জনের ওপরই প্রভাব ফেললো। কিন্তু তাদের আচার-আচরণে আসমান-জমিনের পার্থক্য। হযরত উমর (রা) আল্লাহকে ভয় পাবার কারণে আল্লাহ তাঁর দিলকে ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেন। পক্ষান্তরে ওয়ালিদ বিন মুগিরাকে অহংকার, দাম্ভিকতা ও নেতৃত্বের মোহ ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। কুরআন মজিদে কাফিরদের কথার যে উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে, তাও আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তির একটি প্রমাণ।
“তোমরা কুরআন শুনবে না এবং কুরআন পাঠের সময় চেঁচামেচি শুরু করবে, তাতে মন হয় তোমরা বিজয়ী হবে।” (সূরা হা-মিম সিজদা : ২৬)
এখানেও আল-কুরআনের সম্মোহনী শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের ভয় ছিল যদি সুষ্ঠুভাবে এ কুরআন শুনতে দেয়া হয় বা শোনা হয় তবে তার প্রভাব শ্রোতার ওপর অবশ্যই পড়বে এবং সে তার অনুসারী হয়ে যাবে। কাজেই সকাল-সন্ধ্যায় যেন কেউ কুরআন শুনে মোহগ্রস্ত হতে না পারে সে জন্যই শোরগোল করা বাঞ্ছনীয়। অবশ্য তাদেরকেও প্রতিনিয়ত কুরআন আকর্ষণ করছিল। কিন্তু যাদের ভেতর সামান্য মাত্রায় হলেও আল্লাহভীতি ছিল শুধু তারাই জাহেলিয়াতের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। যদি তারা এতে প্রভাবিত না হতো কিংবা প্রভাবিত হওয়ার ভয় না করতো তবে অনর্থক কেন তারা কুরআনের বিরুদ্ধে এতো কাঠখড় পোড়ালো? এতেই প্রমাণিত হয়, এ কুরআনের আকর্ষণ কত তীব্র, কতো দুর্নিবার।
আল-কুরআনে সুন্দরভাবে কুরাইশ কাফিরদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। যে বক্তব্য দিয়ে তারা কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত।
“তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা, যা সে লিখে রেখেছে। এগুলো সকাল-সন্ধ্যায় তাকে শেখানো হয়।” (সূরা আল-ফুরকান : ৫)
“(তারা আল্লাহর কালাম শুনে বলে:) ইচ্ছে করলে আমরাও এমন বলতে পারি। এতো পুরনো দিনের কিচ্ছা-কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নয়। (এ কুরআন) অলীক স্বপ্ন মাত্র। বরং তার মনগড়া কথা, (না) বরং সে একজন কবি।” (সূরা আল-আম্বিয়া : ৫)
“হে রাসূল, তাদেরকে বলে দিন, (যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে) তোমরা এ রকম দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে এসো। (কিংবা) এ রকম একটি সূরাই তৈরি করে আনো।” (সূরা বাকারা : ২৩)
কিন্তু তারা এ চ্যালেঞ্জের মুকাবেলায় একটি সূরাও তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। দশটিতো অনেক দূরের কথা। সত্যি কথা বলতে কি, তারা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণই করেনি। অবশ্য নবী করীম (সা.)-এর ওফাতের পর কতিপয় কুলাঙ্গার নবুওয়াতের দাবি করেছিল বটে, কিন্তু তার পরিণতি ভালো হয়নি। তাদের এ বাতুলতাকে কেউ গুরুত্বই দেয়নি।
রাসূল (সা.) কর্তৃক ইসলামের দাওয়াতের প্রাক্কালে পূর্ববর্তী নবীর অনুসারীদের মধ্যে যারা সত্যিকার অর্থে আলিম ও বুজুর্গ ছিল আল-কুরআনের প্রভাব তাদের ওপর তীব্রভাবেই পড়েছিল। ফলে তারা আল-কুরআনের ছায়াতলে স্থান লাভ করার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। সেসব ভাগ্যবানদের ব্যাপারে ইরশাদ হচ্ছে:
“আপনি সব মানুষের মধ্যে ইহুদি ও মুশরিকদেরকেই মুসলমানদের অধিকতর শত্রু হিসেবে পাবেন। আর মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রিষ্টান বলে। এর কারণ খ্রিষ্টানদের মধ্যে আলিম ও দরবেশে রয়েছে যারা অহংকার করে না। তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তার কথা শুনামাত্র দেখবেন তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে গেছে। কারণ তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা আরো বলে: হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম, অতএব আমাদেরকে অনুগতদের তালিকাভুক্ত করে নিন।” (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮২-৮৩)
জানার তীব্র আকাক্সক্ষার যে চিত্র পেশ করা হয়েছে তা শুধুমাত্র কুরআন শোনার মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি কুরআন শুনে নিজেদের অজান্তেই তাদের চোখের পানি পর্যন্ত নির্গত হয়েছে। ফলে তারা সত্যের মুখোমুখি হতে পেরেছেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আল-কুরআন যে সত্যের দাওয়াত ও শিক্ষা দিতে চায় তা তার নিজস্ব প্রভাব ছাড়া কোনো মতেই সম্ভব হতে পারে না। আল-কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে:
“যারা পূর্ব থেকেই আলিম, যখন তাদের সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা হয় তখন তরা নত মস্তকে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। এবং বলে: আমাদের পালনকর্তা পবিত্র মহান। অবশ্যই আমাদের প্রতিপালকের ওয়াদা পূর্ণ করা হবে।” (সূরা বনি ইসরাইল : ১০৭-১০৮)
কুরআন শুনে আল্লাহকে ভয় করার চিত্র নিম্নোক্ত আয়াতেও তুলে ধরা হয়েছে:
“আল্লাহ উত্তম বাণী (অর্থাৎ কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও পুনঃপুন পঠিত। এতে তাদের লোমহর্ষণ হয় যারা তার প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের চামড়া ও অন্তঃকরণ আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়।” (সূরা আয-যুমার : ২৩)
উপরোক্ত আয়াতসমূহ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, এ কুরআনের মধ্যে এমন এক প্রভাব নিহিত আছে যা তার পাঠক কিংবা শ্রোতাকে প্রভাবিত না করে ছাড়ে না। হৃদয়কে করে উত্তাল, চোখকে করে অশ্রুসজল। যে ঈমান গ্রহণে আগ্রহী সে কুরআন শুনামাত্রই তার আনুগত্যের শির নত হয়ে যায়। এমনকি, যে কুফরি ও হঠকারিতায় নিমজ্জিত সে-ও যদি এ কুরআন শোনে তবে তার ওপরও কুরআন প্রভাব ফেলে, কিন্তু সে এটিকে যাদু মনে করে উড়িয়ে দেয়। লোকদেরকে তা শুনতে বারণ করে। তবু সে এ কুরআনকে চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পায় না।

আল-কুরআনে সম্মোহনী শক্তির উৎস
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আল-কুরআন আরবদেরকে কিভাবে পরাজিত করলো এবং ঈমানদার ও কাফিরদের মধ্যে এটি কিভাবে এমন প্রচণ্ড প্রভাব ফেললো?
যে সমস্ত মনীষী কুরআন বুঝার ব্যাপারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছেন এবং আল-কুরআনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখনি ধরেছেন তারা তাদের সাধ্যমতো এ ব্যাপারে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। কতিপয় আলিম কুরআনি বিষয়বস্তুর মিল ও যোগসূত্র সম্পর্কে কিছু না বলে অন্যভাবে কিছুটা আলোচনা করেছেন। যা কুরআন এমন কিছু ঘটনাও বলে দিয়েছে যা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে। তা ছাড়া কুরআন বিশ্বপ্রকৃতি ও মানব সৃষ্টি সম্পর্কেও আলোকপাত করেছে ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ আল-কুরআনের প্রচুর বর্ণনা করা হয়েছে। যা আল-কুরআনের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। কিন্তু ছোট ছোট সেই সব সূরার ব্যাপারে বক্তব্য কী, যেখানে কোন শরয়ী বিধান বর্ণনা করা হয়নি? কিংবা যেখানে কোন অদৃশ্য জগতের বিবরণ পেশ করা হয়নি বা পার্থিব জগতের কোন জ্ঞানও বিতরণ করা হয়নি? যদিও ছোট সেই সূরাগুলোতে সব বিষয়ের সামষ্টিক আলোচনা করা হয়নি (যা আল-কুরআনের অনেক সূরায় করা হয়েছে)। তবু আল-কুরআন অবতীর্ণের প্রথম দিকে সেগুলো আরবদেরকে সম্মোহন করেছিল। ঐ সূরাগুলোর মাধ্যমেই এসেছিল তাদের চিন্তার জগতের আলোড়ন এবং তার সৌন্দর্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। একথা স্বীকার করতেই হবে যে, এ ছোট সূরাগুলোর যাদুকরী প্রভাব এতো তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য ছিল, যার কারণে শ্রোতা মোহগ্রস্ত না হয়ে পারতো না। আল-কুরআন স্বীয় বৈশিষ্ট্যের প্রভাবে কাফির ও মুমিনদেরকে তার প্রভাব বলয়ে টেনে নিতে সক্ষম হয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণ করে সৌভাগ্যশালী হয়েছেন, তাদের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে আল-কুরআন। এ কথা অস্বীকার করার কোন উপায়ই নেই যে, আল-কুরআনের ছোট একটি সূরা কিংবা তার অংশ বিশেষ তাদের জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। অবশ্যি ইসলাম পূর্ণতা প্রাপ্তির পর যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের পেছনে আল-কুরআন ছাড়াও কিছু আচার-আচরণে এবং বাহ্যিক তৎপরতা ক্রিয়াশীল ছিল। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের সৌভাগ্যবান মুমিনদের পেছনে ঈমানের ব্যাপারে যে বস্তুটি ক্রিয়াশীল ছিল তা কেবলমাত্র কুরআন ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইসলাম গ্রহণের মূল চালিকাশক্তি
ইসলাম পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার পর বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। যেমন-
১. কতিপয় লোক রাসূলে আকরাম (সা.) ও সাহাবা কিরামের আমল ও আখলাকে প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
২. যারা ইতঃপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে দ্বীনকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারা সকল প্রকার দুঃখ-কষ্ট-নির্যাতন ভোগ করছিল, কতিপয় লোক এ ব্যাপারে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়েছিল।
৩. কিছু লোক এ কথা চিন্তা করে ইসলাম গ্রহণ করেছিল যে, মুহাম্মদ (সা.) ও তার সঙ্গী সাথীরা সংখ্যায় অল্প কিন্তু তবু কোন পরাশক্তি তাদেরকে পরাস্ত করতে পারে না এটি আল্লাহর সাহায্য ও তত্ত্বাবধান ছাড়া কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না।
৪. কতিপয় লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল তখন যখন ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ইসলামের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার কার্যকরী ছিল। যা তারা ইতঃপূর্বে কখনো দেখেননি।
এ রকম আরো অনেক কারণেই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তার মধ্যে অন্যতম ছিল আল-কুরআনের প্রাণস্পর্শী আবেদন ও মোহিনী টান। যা ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় এককভাবে অবদান রেখেছে।
সম্মোহনী শক্তির উৎস কোথায়?
একটি কথা ভেবে দেখা দরকার, তখন পর্যন্ত শরীয়ত পরিপূর্ণ ছিল না, অদৃশ্য জগতের খবর ছিল না, জীবন ও জগৎ সম্পর্কেও জোরালোভাবে তেমন কিছু বলা হয়নি, ব্যবহারিক কোন দিক-নির্দেশনা তখনও কুরআন দেয়নি, কুরআনে অতি সামান্য একটি অংশ ইসলামের দাওয়াতি কাজ করার জন্য বর্তমান ছিল। তবু সেখানে যাদু ও সম্মোহনী শক্তির উৎস নিহিত ছিল। যার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে তারা বলতে বাধ্য হয়েছে:
এতো লোক পরম্পরায় প্রাপ্ত যাদু ছাড়া আর কিছুই নয়। ওয়ালিদ বিন মুগিরা ইসলাম গ্রহণ করতে চেয়েও তা গ্রহণ না করার ঘটনাটি সূরা আল-মুদ্দাসসিরে বর্ণিত হয়েছে। অবতীর্ণের ধারাবাহিকতায় এ সূরার অবস্থান তৃতীয়। সূরা আলাক এবং সূরা আল-মুজ্জাম্মিল এর পুর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব এ সূরাগুলো কিভাবে ওয়ালিদ বিন মুগিরাকে প্রভাবিত করেছিল, এতে এমন কী যাদু ছিল যা তাকে পেরেশান করে তুলেছিল?
মক্কায় অবতীর্ণ ছোট ছোট এ সূরাগুলো যখন আমরা অধ্যয়ন করি তখন সেখানে শরয়ী কোন আইন কিংবা পার্থিব কোন ব্যাপার সামান্যতম ইঙ্গিতও পাই না। অবশ্যই সূরা ‘আলাকে মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে সামান্য আলোচনা এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষকে জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তা ছাড়া পরবর্তী বছরসমূহের ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে। যেমন সূরা রূমে (পারস্য বিজয়ের ব্যাপারে) ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ওয়ালিদ যেটিকে যাদু বললো, আল-কুরআনে তার শেষ কোথায়?
এর উত্তর হচ্ছে- ওয়ালিদ আল-কুরআনের যে অংশকে যাদু বলে আখ্যায়িত করেছে অবশ্যই তা শরয়ী আহকাম ও পার্থিব কোন জ্ঞানের বহির্ভূত বস্তু ছিল। আলোচনার এমন কোন বিষয় সেখানে ছিল না যে ব্যাপারে সে কোন কথা বলতে পারতো। অবশ্য এ কথাও ঠিক, ইসলামী আকিদা ও আধ্যাত্মিকতা অর্জনের প্রচেষ্টা ছাড়াই সে তার সূক্ষ্ম রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিল।

এবার আসুন, সর্বপ্রথম অবতীর্ণ সূলা আল-‘আলাক সম্পর্কে একটু চিন্তা করে দেখে। প্রথম ১৫টি আয়াতের দিকে সূক্ষ্মভাবে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে এর শব্দগুলো জাহিলি যুগের কবি ও সাহিত্যিকদের ব্যবহৃত শব্দের অনুরূপ, যার সাথে গোটা আরব পরিচিত ছিল কিন্তু তাদের লেখায় অনেক সামঞ্জস্যহীন শব্দ ও বাক্যের সমাবেশ ঘটতো। অনেক সময় তাদের সে রচনার মধ্যে কোন অন্তমিল ও প্রসঙ্গ পাওয়া যেত না। কিন্তু সূরা আলাকের ব্যাপারটি কি তেমন?
অবশ্যেই নয়। বরং সেখানে সামঞ্জস্য ও দ্যোতনার এক অপূর্ব সমাহার। প্রতিটি বক্তব্য উন্নত সাহিত্যের মূর্ত প্রতীক। অথচ তা একেবারেই প্রথম দিকে অবতীর্ণ আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে ‘পড়ো’। তবে তা আল্লাহর পবিত্র ও সম্মানিত নামের সাথে হতে হবে। ‘ইকরা’ বা পড়ো শব্দ দিয়ে উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল কুরআন তিলাওয়াত বা অধ্যয়ন। এজন্যই আল্লাহর নাম নেয়ার প্রয়োজন যে, তিনি নিজের নামের সাথেই দাওয়াত দেন। আল্লাহর এক সিফাতি নাম ‘রব্ব’। অর্থ প্রতিপালক। তাই তিনি প্রতিপালন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ কথাগুলো আল্লাহর ভাষায়:
“পড়ো তোমার ঐ প্রতিপালকের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আলাক্ব : ০১)
তখন ছিল ইসলামী দাওয়াতের সূচনাকাল। এজন্য রব্ব-এর বিশ্লেষণ হিসেবে এমন একটি শব্দকে বেছে নেয়া হয়েছে যা জীবন শুরুর সাথে জড়িত। অর্থাৎ তিনি একক ‘রব্বা’ যিনি সৃষ্টি করেছেন।’
তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন ‘আলাক’ থেকে। অন্য কথায় তিনি মানুষের জীবন শুরু করেছেন জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে। কতো ছোট ও সাধারণ অবস্থা দিয়ে সূচনা।
কিন্তু আল্লাহ যেহেতু রব্ব বা প্রতিপালক হওয়ার সাথে সাথে তিনি খালিক (সৃষ্টিকর্তা) ও উঁচু স্তরের মেহেরবান। তাই ছোট্ট একটি মাংসপিণ্ডকে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ এক মানুষে রূপায়িত করেন। আর তার প্রকৃতি এমন, তাকে কোন কিছু শিখালে শেখার যোগ্যতা আছে। এ জন্যই বলা হয়েছে:
“তুমি কুরআন পাঠ করো, তোমার প্রতিপালক অত্যন্ত দয়ালূ। তিনি হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে (তা-ই) শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। (সূরা আ’লাক: ৩-৫)
কতো সুন্দরভাবে মানুষের শুরু থেকে পূর্ণতার দিকে নেয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়ের কথা একের পর এক বলা হয়েছে। যেন মানুষের চিন্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি সেই দাওয়াতের প্রতি সাড়া দেয়। বুদ্ধি-বিবেকের দাবি-ই ছিল এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা, কী সে ছিল এবং বর্তমান কোথায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এমনকি হয় না।
“সত্যি সত্যি মানুষ সীমালংঘন করে, কারণ সে নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে (অর্থাৎ তার শুরু ও শেষের কথা ভুলে গেছে)।” (সূরা আলাক : ৬-৭)
সে অহংকার ও দাম্ভিকতার বশে ভুলে গেছে বিধায় তাকে সতর্কতা ও ভর্ৎসনা মিশ্রিত বাক্যে সতর্ক করা হচ্ছে, “এতে কোন সন্দেহ নেই যে, তাদেরকে তোমার প্রভুর দিকেই ফিরিয়ে আনা হবে।” (সূরা আল-আলাক : ৮)
মানুষের বিদ্রোহ ও দাম্ভিকতার প্রসঙ্গ যখন চলছে তখন তাকে পরিপূর্ণ রূপদানের জন্য বলা হয়েছে। তারা শুধুমাত্র নিজেরাই বিদ্রোহী হয় না বরং অন্যদেরকেও বিদ্রোহী বানাবার প্রচেষ্টা করে।
“তুমি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেছ, যে নিষেধ করে আল্লাহর এক বান্দাকে যখন সে নামাযে দাঁড়ায়। (সূরা আল আলাক : ৯-১০)
কোন ব্যক্তিকে নামায পড়তে বাধা দেয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ। এ গর্হিত কাজটি তখনই বেশি বেড়ে যায় যখন নামাযী হেদায়েতের পথে অবিচল থাকেন এবং অন্যকে আল্লাহভীতি জাগ্রত করার চেষ্টা করেন।
“তুমি কি দেখেছ যদি সে সৎপথে থাকে অথবা আল্লাহভীতি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়।” (সূরা আল-আলাক : ১৩)
চিন্তা করুন, মানুষ সবকিছু থেকে অসতর্ক। এমনকি কিভাবে তার জন্ম এবং কোথায় তার শেষ সে খবরটুকু তার নেই।
“তুমি কি দেখেছ, যদি সে মিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে কি জানে, আল্লাহ সবকিছু দেখেন।” (সূরা আল-আলাক : ১৩-১৪)
অতঃপর তাদেরকে শাসানো হয়েছে: “কক্ষণো নয়। যদি সে বিরত না হয় তবে আমি তাকে মাথার চুলের গুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবোই- মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ।” (আল আলাক : ১৫-১৬)
যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছেন: অতএব সে তার সঙ্গী-সাথীকে আহ্বান করুক। আর আমি ডাকবো জাহান্নামের প্রহরীদেরকে। এ কথা শুনে শ্রোতাদের ধারণা হয়, সম্ভবত জাহান্নামের পাইক- পেয়াদা এবং ঐ ব্যক্তির সাথীদের মধ্যে সেদিন সংঘর্ষ বেঁধে যাবে। এটি একটি কাল্পনিক চিত্র, যা কল্পনার জগৎকে ছেয়ে ফেলে। রাসূল তাঁর নিজের অবস্থানে অটল থেকে রিসালাতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কেউ যদি তাঁর রিসালাতকে অস্বীকার কর মুখ ফিরিয়ে নেয় সে জন্য তিনি কোন পরওয়া করেন না। ইরশাদ হচ্ছে :
“কখনো তুমি তার কথায় প্রভাবিত হয়ো না, তুমি সিজদা করো ও আমার নৈকট্য অর্জন করো।” (সূরা আল-আলাক : ১৯)
ইসলামী দাওয়াতের এ ছিল বলিষ্ঠ সূচনা। এ সূরার বাক্যগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে যদিওবা অবিন্যাসিত মনে হতে পারে কিন্তু এগুলো বিন্যাসিত ও পরস্পর সংশ্লিষ্ট। এ হচ্ছে আল-কুরআনের প্রথম সূরা যার বর্ণনা স্টাইলেই তাঁর অন্তঃমিলের দিকটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এবার অবতীর্ণের দিক থেকে দ্বিতীয় সূরাটির দিকে লক্ষ্য করুন যা সূরা আল-মুজ্জাম্মিল নামে পরিচিত। অবশ্য ‘সূরা ক্বলমের’ প্রথম দিকের আয়াতগুলো এর পূর্বে অবতীর্ণ হতে পারে। যাহোক ওয়ালিদ সূরা আল-মুজ্জাম্মিলের নিম্নোক্ত আয়াত ক’টি শুনেই কুরআনকে যাদু বলে ‘আখ্যায়িত করেছিল:
“যেদিন পৃথিবী ও পর্বতমালা প্রকম্পিত হবে এবং পর্বতসমূহ হয়ে যাবে বহমান বালুকা স্তূপ। আমি তোমাদের কাছে একজন রাসূলকে তোমাদের জন্য সাক্ষী করে পাঠিয়েছি যেমন পাঠিয়েছিলাম ফিরাউনের কাছে একজন রাসূল। ফিরাউন সেই রাসূলকে অস্বীকার করলো, ফলে আমি তাকে কঠিন শাস্তি দিলাম। অতএব, তোমরা কিভাবে আত্মরক্ষা করবে যদি সেদিনকে তোমরা অস্বীকার করো, যেদিন বালককে বৃদ্ধ বানিয়ে দেবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে। তার প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে।” (সূরা আল-মুজ্জাম্মিল : ১৪-১৮)
উল্লিখিত আয়াতসমূহে কিয়ামতের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাই এমন এক ভয়ানক চিত্র যেখানে মানুষ কোন ছার গোটা সৃষ্টিলোকই তার আওতায় পড়ে যাবে। সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও ভারী হচ্ছে পৃথিবী ও পর্বতমালা। সেদিন সেগুলো কেঁপে উঠবে এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে এবং কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করা হবে না। শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করা হবে, যাদের নিকট রাসূল এসেছিলেন এবং তাঁর দাওয়াত পৌঁছেছে। সেই সাথে যাবতীয় দলিল-প্রমাণও পূর্ণ হয়ে গেছে।
মক্কার কাফিরদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তোমাদের জন্য যে রাসূল পাঠানো হয়েছে তিনি রাসূল হিসেবে নতুন ও প্রথম নন, তিনি তাদের মতোই একজন রাসূল, যাঁরা ফিরাউন ও তার মতো অন্যান্যদের নিকট প্রেরিত হয়েছিলেন। আর তোমাদের শান-শওকত ও ক্ষমতা-ইখতিয়ার নিশ্চয়ই ফিরাউনের চেয়ে বেশি নয়। সে ফিরাউনকে পর্যন্ত কঠিন শাস্তি দেয়া হয়েছে। কাজেই তোমরাও কি চাও সেই রকম শাস্তিতে নিমজ্জিত হতে? যখন পৃথিবীর মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তখন তোমরা যারা কুফরিতে লিপ্ত আছ, তারা আল্লাহর পাকড়াও থেকে কিভাবে বাঁচবে? অথচ সেদিনের ভয়াবহতা দেখে দুশ্চিন্তায় শিশুরা পর্যন্ত বুড়ো হয়ে যাবে। আসমান ফেটে যাবে, পৃথিবী ও পাহাড় পর্বত কেঁপে উঠবে। এ ভয়ঙ্কর চিত্রের ভয়াবহতা থেকে কোন সৃষ্টিই নিরাপদ থাকবে না। যখন কল্পনায় সেই বিভীষিকার চিত্র প্রতিফলিত হয় তখন কেউ প্রভাবিত না হয়ে পারে না। আর মানুষের অন্তরই এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহর এ ওয়াদা পুরো হওয়ার মতোই একটি ওয়াদা। যা কার্যকরী হওয়ার ব্যাপারে কোন জায়গাও নেই। কাজেই বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে সময় থাকতেই আল্লাহর পথে চলে আসা। সেই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের রাস্তায় চলার চেয়ে আল্লাহর পথে চলা অধিকতর সহজ।
আমরা চাই কিছু সময়ের জন্য হলেও (কুরআনে কারীমের দ্বীনের পবিত্রতা, ইসলামের দাওয়াতের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে) স্থান-কাল ও পত্রের ঊর্ধ্বে ওঠে কুরআনে কারীমের সেই শৈল্পিক সৌন্দর্য ও রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করতে যা মৌলিক নীতির মর্যাদা রাখে। যা কুরআনের মতোই শাশ্বত ও চিরন্তনী। শৈল্পিক এ সৌন্দর্য আল কুরআনকে অন্য সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেয়। ফলে দ্বীনি গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য পূর্ণতা লাভ করে ধাবিত হয় মনজিলে মাকসুদের দিকে।
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply